ফন্ট সাইজ:
থিম:
রক্তমুকুট

42

লেখক: জান্নাতুল ফেরদৌস

সেই রাতটা আলীরাজের জন্য ভয়াবহ হয়ে উঠল।

গা কাপিয়ে জ্বর আসলো। শরীরটা অস্বাভাবিক ঠান্ডা হয়ে গেল। তারপর কাঁপুনি। এমন কাঁপুনি, যেন শীতল বাতাস তার হাড়ের ভেতর ঢুকে গেছে।

দাসীরা একের পর এক কম্বল এনে গায়ে জড়িয়ে দিল। তবু আলীরাজের গা কাঁপা থামল না। বিছানায় আধশোয়া হয়ে চোখ মেলে তাকাল। কপাল জ্বরে পুড়ছে। অথচ হাত-পা বরফের মতো ঠান্ডা।

“পানি……”

দাসী পানির পেয়ালা এগিয়ে দিল। আলীরাজ পেয়ালাটা হাতে নিতেই তার আঙুল কেঁপে উঠল। অল্প পানি ঠোঁটে ছোঁয়াতে পারল, বাকিটা বিছানার চাদরে পড়ে গেল। দাসী ভীত গলায় বলল

“কী হয়েছে, সাহেব?

আলীরাজ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ফিসফিস করে বলল,

“ও আবারও এসেছিল”

“কে?”

আলীরাজ চোখ বন্ধ করল।

“সেই নারী। নাচছিলো”

দাসী আর কোনো প্রশ্ন করল না। আলীরাজের চোখে ভয়ংকর আতঙ্ক। কিছুক্ষণ পর হাকিম এসে নাড়ি পরীক্ষা করলেন। ওষুধ দিলেন, কপালে ভেজা কাপড় রাখতে বললেন। কিন্তু জ্বরের ঘোরে আলীরাজ বারবার একই কথা বলতে লাগল,

“ও নাচছিল। জলাশয়ের ধারে ও নাচছিলো। আমাকে দেখেছিল ও”

****

সকাল হতেই আমিরাবাদ প্রাসাদে ব্যস্ততা শুরু হলো। সম্রাট হারুন ওয়াসেমের নির্দেশে ফরেস্ট হাউসে অবস্থানরত ইংরেজদের মহলে ডেকে পাঠানো হয়েছে। আগের রাতেই তাদের কাছে সম্রাটের পত্র পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল। পত্রে লেখা ছিল

“আগামী প্রভাতে তোমরা আমিরাবাদ প্রাসাদে উপস্থিত হবে। রাজ্যের সাধারণ প্রজাদের ন্যায় পোশাক পরিধান করবে। কোনো সামরিক পোশাক, অস্ত্র অথবা বাহ্যিক পরিচয়ের চিহ্ন সঙ্গে আনবে না। আদেশ অমান্য করলে তা রাজদ্রোহের সমতুল্য বলে গণ্য হবে।”

ইংরেজরা পত্র পাওয়ার পর দীর্ঘ সময় নিজেদের মধ্যে আলোচনা করেছিল। তারা বুঝল সম্রাট সবকিছু জেনে-বুঝে তাদের ভালোর জন্যই এমনটা করছে। তাই তারা প্রকাশ্যে কোনো বিরোধিতা করল না। ভোরের আলো ফুটতেই ফরেস্ট হাউস থেকে কয়েকটি ঘোড়া বের হলো।

তাদের ওপর বসে থাকা লোকগুলোর পোশাক দেখে দূর থেকে বোঝার উপায় ছিল না, তারা বিদেশি। চুল ও গায়ের রং ঢাকতে কালো কাপড়ে নাকমুখ ঢেকে নিলো।

কারও পরনে সাদা পাঞ্জাবি, কারও গায়ে মলিন ধূসর চাদর, কারও মাথায় সাধারণ পাগড়ি। মুখে কোনো সামরিক চিহ্ন নেই। তাদের চলাফেরায় সতর্কতা। বারবার চারপাশ দেখছিল।

সাহারা তখন প্রাসাদের পূর্ব বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল। দূর থেকেই তাদের আগমন দেখল। প্রথমে পোশাক দেখে সন্দেহ হয়নি। কিন্তু ঘোড়া থেকে নামার সময় একজনের কাঁধের ভঙ্গি তার চোখে পড়ল। তারপর আরেকজনের হাঁটার ধরন। সাহারার মনে হঠাৎ আগের দিনের জঙ্গলের দৃশ্য ফিরে এলো। যাদের সে সেখানে দেখেছিল। সাহারা চোখ সরু করল।

“এরা তো এ রাজ্যের মানুষ নয়। হে হে চাদু। পোশাক বদলেছো শুধু। শরীর চোখ তো আর বদলাওনি”

মেহরাব তখন ব্যায়ামাগারে। সাহারা তার কাছে যাওয়ার কথা ভাবল, কিন্তু পরক্ষণেই থেমে গেল।

মেহরাব নিশ্চয়ই বাবার সঙ্গে থাকবে। আর যদি সে সরাসরি বলে যে ইংরেজদের মধ্যে কয়েকজনকে সে চিনেছে, তাহলে হয়তো তারা সতর্ক হয়ে যাবে। তাকে আগে জানতে হবে, বৈঠকে কী আলোচনা হয়। সাহারা দ্রুত আলোচনা কক্ষের দিকে এগিয়ে গেল। প্রাসাদের ওই অংশে সাধারণত অনুমতি ছাড়া কেউ প্রবেশ করে না। কিন্তু রাজপরিবারের সদস্য হিসেবে তাকে আটকানোর সাহস কোনো প্রহরীর ছিল না।

যদিও দরজা তখনও খোলা হয়নি। সাহারা চারপাশে তাকাল। দূরে কয়েকজন দাসী ফুল সাজাচ্ছে। করিডোরের শেষে দুজন প্রহরী দাঁড়িয়ে আছে। সে আস্তে করে পাশের ছোট দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ল। আলোচনা কক্ষটি বিশাল।

দেয়ালে পুরোনো যুদ্ধের ছবি। উঁচু জানালায় ভারী পর্দা। মাঝখানে লম্বা কাঠের টেবিল, তার চারপাশে কয়েকটি ভারী চেয়ার। টেবিলের নিচে যথেষ্ট জায়গা ছিল। সাহারা এক মুহূর্তও দেরি করল না। ওড়না গুটিয়ে নিচু হয়ে টেবিলের তলায় ঢুকে পড়ল। তারপর নিজের শ্বাস স্বাভাবিক করার চেষ্টা করল। মেঝেতে ধুলোর গন্ধ। কাঠের পুরোনো গন্ধ। আর কোথাও যেন হালকা ধাতব গন্ধ লেগে আছে। সাহারা ভ্রু কুঁচকাল। এই গন্ধটা সে আগের দিন ফরেস্ট হাউসেও পেয়েছিল। তার সন্দেহ আরও গভীর হলো। কিছুক্ষণ পর বাইরে পায়ের শব্দ শোনা গেল। প্রথমে প্রহরীরা ঢুকল গমগম পায়ে। তারপর কয়েকজন নায়েব। তারপর মেহরাব। সবশেষে সম্রাট হারুন ওয়াসেম প্রবেশ করলেন। সাহারা টেবিলের নিচে শ্বাস আটকে বসে রইল। হারুন ওয়াসেম নিজের আসনে বসলেন। মেহরাব তার ডান পাশে। নায়েবরা বিপরীতে। কিছুক্ষণ পর ইংরেজরাও কক্ষে প্রবেশ করল। তারা মাথা নত করে দাঁড়াল। সম্রাট তাদের বসতে বললেন না।

“তোমরা জানো কেন তোমাদের ডাকা হয়েছে?”

ইংরেজদের নেতা শান্ত মুখে বলল,

“সম্রাট মহোদয়, আমরা ধারণা করিয়াছি, ফরেস্ট হাউস নিয়া কিছু ভুল বোঝাবুঝি হইয়াছে।”

হারুন ওয়াসেম ঠান্ডা দৃষ্টিতে তার দিকে তাকালেন।

“ভুল বোঝাবুঝি?”

“জি। আমরা সেখানে কেবল গবেষণার কাজে ছিলাম।”

মেহরাব টেবিলের ওপর একটি নথি রাখল।

“তাহলে এই মানচিত্রগুলো কী?”

ইংরেজ নেতা নথিটির দিকে তাকাল। তার মুখে বিস্ময় ফুটে উঠল না। বরং সে যেন আগে থেকেই এই প্রশ্নের জন্য প্রস্তুত ছিল।

“সীমান্তের পথঘাট সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা অপরাধ নয়, যুবরাজ”

“সাধারণ গবেষণার নামে সেনা চলাচলের রাস্তা, সরবরাহের পথ আর পাহারার অবস্থান নথিভুক্ত করা অপরাধ নয়?”

মেহরাবের কণ্ঠ কঠিন হয়ে উঠল। লোকটি ছোক গিলে সম্রাটের দিকে তাকালেন। সম্রাট চোখের ইশারায় শান্ত থাকতে বললেন তাদের”

হারুন ওয়াসেম এবার বললেন,

“তোমাদের বাড়িতে যে সব সরঞ্জাম পাওয়া গেছে, সেগুলোর ব্যাখ্যা দাও”

“কৃষি ও চিকিৎসা সংক্রান্ত পরীক্ষা।”

“আর সেই সিলমোহরযুক্ত বাক্সগুলো?”

“গবেষণার উপকরণ।”

“আর ধাতব পাত্রগুলো?”

“পরীক্ষার কাজে ব্যবহৃত হয়”

সম্রাট মৃদু হেসে উঠলেন। কিন্তু ঘাপলা করলো মেহরাব

“তোমরা কি মনে করো, আমি এতটাই অজ্ঞ?”

ইংরেজদের মধ্যে চাপা অস্বস্তি ছড়িয়ে পড়ল।

টেবিলের নিচে সাহারা মুঠো শক্ত করল।

সে জানে, সম্রাটের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটি মিথ্যা বলছে। কিন্তু তার কাছে আরও বড় প্রশ্ন এই লোকগুলো আসলে কী লুকাচ্ছে? মেহরাব এবার আরেকটি খাতা খুলল।

“এই হিসাবের খাতায় আমাদের সীমান্তের কাছে সরঞ্জাম পাঠানোর উল্লেখ আছে। তারিখ, পরিমাণ, লোকসংখ্যা সব লেখা।”

সম্রাট দাঁতে দাঁত চিপে তাদের দিকে তাকালো। মনে মনে আওড়ালো

“গর্দভ এর দল সব। এত গুরুত্বপূর্ণ জিনিস যেখানে সেখানে ফেলে রেখে চলে যায় এদিক ওদিক”

ইংরেজ নেতা ধীরে বলল,

“এই খাতা আমাদের নয়”

“তাহলে তোমাদের ঘরে কেন পাওয়া গেল?”

“কেউ রাখিয়া গেছে মেইবি”

“কে? কাকে সন্দেহ করছো?”

লোকটি চুপ করে রইল। হারুন ওয়াসেম কন্ঠ নিচু করে বলল

“তোমরা আমার রাজ্যের ভেতরে অনুমতি ছাড়া স্থাপনা বানিয়েছ। সেখানে গোপনে কাজ করেছ। আর এখন বলছ, তোমাদের কিছুই জানা নেই?”

ইংরেজ নেতা এবার সামান্য ঝুঁকে বলল,

“সম্রাট মহোদয়, আপনিও জানেন, সীমান্ত অঞ্চলে অনেক দল কাজ করে। সবকিছুর দায় আমাদের ওপর চাপানো ঠিক হবে না।”

মেহরাব তৎক্ষণাৎ বলল,

“তোমরা কি বলতে চাইছ, ওই বাড়িতে অন্য কেউও আসা-যাওয়া করত?”

“সম্ভবত”

“কাদের কথা বলছ?”

লোকটি এবার মেহরাবের দিকে তাকাল। তার চোখে এক মুহূর্তের জন্য অদ্ভুত ঝিলিক দেখা গেল।

“যাহারা আমাদেরও বন্দি করিয়া রাখিয়াছিল।”

কক্ষে নীরবতা নেমে এলো। হারুন ওয়াসেম সামান্য সামনে ঝুঁকলেন।

“তোমাদের বন্দি করা হয়েছিল?”

“জি”

“কারা করেছিল?”

“আমরা জানি না।”

মেহরাবের কণ্ঠে বিস্ময়,

“কিন্তু আমরা যখন সেখানে গিয়েছিলাম, তোমাদের কাউকে বন্দি অবস্থায় দেখিনি।”

ইংরেজ নেতা ধীরে বলল,

“তখন হয়তো তারা আমাদের সরিয়ে নিয়েছিল।”

সাহারা টেবিলের নিচে বসে চোখ বন্ধ করল। তার মনে পড়ল সেই লোহার ঘেরা ভবন। ভেতরে থাকা অস্বাভাবিক মানুষগুলো। তাদের অস্থির দৃষ্টি। আর লোহার শিক ধরে টানতে থাকা হাত। সাহারা বুঝতে পারল, এই বৈঠকে যা বলা হচ্ছে সব মিথ্যা। আর এতে সম্রাটের উস্কানি আছে।

হারুন ওয়াসেম এবার নায়েবের দিকে তাকালেন।

“ওই ভবনের ব্যাপারে আর কোনো খবর পাওয়া গেছে?”

নায়েব মাথা নত করল।

“জি, সম্রাট। আমাদের লোকেরা জানিয়েছে, ইংরেজদের একটি দল সেখানে বন্দি অবস্থায় ছিল। তবে তাদের বন্দি করেছিল অন্য কেউ।”

“কারা?”

“বর্ম পরিহিত সৈন্যদের একটি দল।”

মেহরাব চমকে উঠল।

“বর্ম পরিহিত সৈন্য?”

নায়েব বলল,

“জি। তাদের পোশাক দেখে মনে হয়েছে তারা আমিরাবাদ এর সৈন্য নয়”

হারুন ওয়াসেমের চোখ এবার ইংরেজদের ওপর স্থির হলো।

“তোমরা কি তাদের চেনো?”

ইংরেজ নেতা চুপ করে রইল। এই নীরবতাই যেন উত্তর হয়ে দাঁড়াল। টেবিলের নিচে সাহারার বুক ধুকপুক করতে লাগল। মেহরাব এখনো জানে না, তার নিজের বাবার রাজ্যের ভেতরেই কতগুলো গোপন শক্তি একে অপরের বিরুদ্ধে কাজ করছে।

হারুন ওয়াসেম বললেন,

“আজ তোমরা এখান থেকে বের হবে না। তোমাদের প্রত্যেককে আলাদা করে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।”

ইংরেজ নেতা মাথা তুলল।

“সম্রাট, আমাদের সঙ্গে এমন আচরণ….

“চুপ!”

হারুন ওয়াসেমের এক শব্দে কক্ষের বাতাস জমে গেল।

“তোমরা আমার রাজ্যে দাঁড়িয়ে আমার কাছেই শর্ত দেবে? এত দুঃসাহস?”

তারপর তিনি প্রহরীদের নির্দেশ দিলেন,

“ওদের বাইরে নিয়ে যাও। আলাদা কক্ষে রাখবে। কেউ কারও সঙ্গে কথা বলতে পারবে না।”

ইংরেজদের নিয়ে প্রহরীরা বেরিয়ে গেল। কিন্তু দরজা বন্ধ হওয়ার আগমুহূর্তে সাহারা টেবিলের নিচ থেকে একটি জিনিস দেখতে পেল। ইংরেজ নেতার পোশাকের ভাঁজ থেকে ছোট্ট ধাতব চিহ্ন বেরিয়ে এসেছিল। এই চিহ্নটি খুব পরিচিত। সে আগের দিন সেই একই চিহ্ন একজনের গলায় দেখেছিল। আর সেই চিহ্নের নকশা লোহার ঘেরা ভবনের দরজায় খোদাই করা ছিল। সম্রাট মেহরাব কে বাণিজ্যিক পন্য গুলো খুঁটিয়ে দেখতে বলল। মেহরাব বেড়িয়ে যেতেই সম্রাট হারুন ওয়াসেম ধীর পায়ে এসে নিজের আসনে বসলেন। আর টেবিলের অপর পাশে বসে রইল ইংরেজদের তিনজন প্রতিনিধি, সাধারণ সাহাবাদি পোশাকে।

সাহারার বুকের ভেতর আগুন জ্বলছিল। কিন্তু সে নড়ল না। সম্রাট বলতে লাগল

“আপনারা জানেন, সাহাবাদ এখন দুর্বল অবস্থায় আছে। তাদের জমিদার বাইজিদ শাহ বহুদিন ধরে রাজ্যের ভেতরের সমস্যাগুলো সামলাতে ব্যস্ত। সীমান্তে অস্থিরতা, প্রজাদের মধ্যে বিভাজন, রাজপরিবারের ভেতরের দ্বন্দ্ব সব মিলিয়ে এটাই আমাদের জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত সময়।”

ইংরেজদের প্রধান প্রতিনিধি ঠোঁটের কোণে হাসি টেনে বলল,

“আমরা বিষয়টি বহুদিন ধরেই পর্যবেক্ষণ করছি, মহামান্য। বাইজিদ শাহকে সরিয়ে দেওয়া গেলে সাহাবাদের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া কঠিন হবে না।”

নায়েব ভ্রু কুঁচকে তাকালেন।

“বাইজিদ শাহকে সরিয়ে দেওয়া মানে কী জনাব? আপনারা কি তাকে হত্যা করার কথা বলছেন?”

ঘরে কয়েক মুহূর্ত নীরবতা নেমে এল। সম্রাটের চোখ নায়েবের দিকে উঠল। তারপর খুব শান্ত স্বরে বললেন,

“রাজনীতি কখনো সরল পথে চলে না। কাউকে সরিয়ে দেওয়া মানেই সবসময় তরবারি চালানো নয়। কখনো তার বিরুদ্ধে প্রজাদের দাঁড় করাতে হয়। কখনো তার লোকদের কিনে নিতে হয়। কখনো তার নিজের ঘরের ভেতরেই সন্দেহ তৈরি করতে হয়।”

ইংরেজ প্রতিনিধি মাথা নেড়ে বলল,

“আমাদের পরিকল্পনা তিনটি ধাপে ভাগ করা হয়েছে।”

সে টেবিলের ওপর একটি নকশা মেলে ধরল।

“প্রথম ধাপে সাহাবাদের বাজার ও খাদ্য সরবরাহের পথ আমাদের নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। দ্বিতীয় ধাপে জমিদারের বিশ্বস্ত সৈন্যদের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করতে হবে। আর তৃতীয় ধাপে বাইজিদ শাহকে প্রজাদের চোখে ব্যর্থ শাসক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।”

আরেকজন প্রতিনিধি নথি খুলে বলল,

“তারপর সীমান্তে ছোটখাটো সংঘর্ষ তৈরি হবে। প্রজারা নিরাপত্তার জন্য নতুন শাসকের দাবি তুলবে। তখন আমিরাবাদ সাহায্যের নামে সাহাবাদের প্রশাসনে প্রবেশ করবে।”

টেবিলের নিচে সাহারার হাত মুঠো হয়ে গেল। তার নখ নিজের তালুতে গেঁথে যাচ্ছিল। সম্রাট ধীরে বললেন,

“আর যদি বাইজিদ শাহ স্বেচ্ছায় ক্ষমতা ছাড়তে না চায়?”

ইংরেজ প্রতিনিধি এবার আরও নিচু স্বরে বলল,

“তাহলে তাকে হত্যা করা ছাড়া উপায় নাই মহামান্য”

সাহারার মুখ কঠিন হয়ে উঠল। এরা সাহাবাদের জনগণকে কী মনে করে? দাবার ঘুঁটি?

ইংরেজ লোকটি নির্বিকারভাবে বলল

“যে জনগণকে পরিচালনা করা যায় না, তাদের পরিচালিত করতে হয় ভয় দিয়ে।”

সাহারার বুকের ভেতর যেন কেউ জ্বলন্ত কয়লা ছুড়ে দিল। কিন্তু বৈঠক এখানেই শেষ হলো না। সম্রাট হাত বাড়িয়ে টেবিলের ওপর রাখা আরেকটি নথি তুলে নিলেন।

“এবার দ্বিতীয় বিষয়।”

ইংরেজদের একজন একটু সামনের দিকে ঝুঁকল।

সম্রাট বললেন,

“শিশুদের ব্যাপারে তোমাদের অগ্রগতি কতদূর?”

সাহারার নিঃশ্বাস আটকে গেল। নায়েবও স্থির হয়ে গেলেন। ইংরেজ প্রতিনিধি চোখ নামিয়ে বলল,

“সাহাবাদের পাহাড়ি ও নদীসংলগ্ন গ্রামগুলোতে নজরদারি চলছে। যেসব পরিবার দরিদ্র, যাদের সন্তানদের দেখাশোনার লোক কম, তাদের চিহ্নিত করা হয়েছে।”

“কতজন?”

“এখনও নির্দিষ্ট সংখ্যা বলা যাচ্ছে না। তবে কয়েকটি শিশুকে ইতিমধ্যে লক্ষ্য করা হয়েছে। তাদের কেউ বাজারে কাজ করে, কেউ নদীর ধারে ঘোরে, কেউ আবার একা জঙ্গলে ফল-মূল কুড়ায়”

সাহারার চোখ অন্ধকার হয়ে এল। এই মুহূর্তে উঠে দাঁড়িয়ে পুরো ঘরটাকে আগুনে পুড়িয়ে দিতে মন চাচ্ছে সাহারার। সম্রাট ঠান্ডা স্বরে বললেন,

“অপহরণের কাজ যেন একসঙ্গে না হয়। একসঙ্গে অনেক শিশু নিখোঁজ হলে সন্দেহ তৈরি হবে। একেকটি গ্রাম থেকে একজন করে। কখনো দুই সপ্তাহের ব্যবধানে, কখনো এক মাস পরে।”

অন্য প্রতিনিধি নথিতে দাগ টেনে বলল,

“শিশুদের সরাসরি এখান থেকে নেওয়া হবে না। প্রথমে তাদের পাহাড়ি আশ্রয়কেন্দ্রে রাখা হবে। তারপর নদীপথে পাঠানো হবে। সেখানে পাঠিয়ে তাদের পরিচয় বদলে দেওয়া হবে।”

নায়েব হঠাৎ আসনে সোজা হয়ে বসলেন।

“সম্রাট! এই নোংরা গুটিচালে আমারা শিশুদের না জড়াই?”

“তুমি আবেগ দিয়ে রাজনীতি বুঝতে পারবে না, নায়েব। শিশুদের দিয়েই এই গবেষণার কাজ করানো যায়। তাদের ভয় দেখিয়ে আনুগত্য শেখানো যায়। আর সবচেয়ে বড় কথা তাদের হারিয়ে যাওয়া সাহাবাদে আরও বেশি ভীতি ঢুকাবে”

সাহারার শরীর কেঁপে উঠল। তার চোখের সামনে ভেসে উঠল সাহাবাদের ছোট ছোট গ্রাম। মাটির উঠোনে খেলতে থাকা শিশুরা। নদীর ধারে দৌড়ানো কিশোরেরা। মায়েদের কোল। বাবাদের অপেক্ষা। এই মানুষগুলো তাদের সন্তানদেরও ছাড়বে না। ইংরেজ প্রতিনিধি ধীরে বলল,

“আমাদের প্রয়োজন শুধু শ্রমিক নয়, মহামান্য। কিছু শিশু বিশেষ পরীক্ষার জন্যও উপযোগী হতে পারে।”

নায়েবের চোখ হঠাৎ রক্তবর্ণ হয়ে উঠল।

“পরীক্ষা?”

সম্রাটের কণ্ঠ এবার কঠিন হয়ে উঠল।

“এই বিষয়ে এখন আর আলোচনা নয়।”

কিন্তু সাহারা শুনে ফেলেছে। বিশেষ পরীক্ষা।

শিশু অপহরণ, সাহাবাদ দখল। বাইজিদ শাহকে সরিয়ে দেওয়া। সবকিছু যেন এক সুতোয় বাঁধা।

ইংরেজ প্রতিনিধি নত হয়ে বলল,

“আমরা আপনার নির্দেশ অনুযায়ী কাজ করব।”

সম্রাট উঠে দাঁড়ালেন।

“বৈঠক এখানেই শেষ। তোমরা আগামী তিন দিনের মধ্যে প্রথম তালিকা প্রস্তুত করবে। আর মনে রেখো সাহাবাদের কেউ যেন বুঝতে না পারে, তাদের সন্তানরা কোথায় যাচ্ছে। মেহরাব কে আর জঙ্গলের দিকে যেতে দিব না। এতটুকু আস্থা অর্জন করে ফেলেছি”

সাহারা টেবিলের নিচে রাগে ফুসছে। তার বুকের ভেতর প্রচণ্ড শব্দ হলেও মুখ থেকে কোনো আওয়াজ বের হলো না। একজন একজন করে সবাই কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেল। সাহারা অপেক্ষা করল। দরজা বন্ধ হওয়ার পরও সে কয়েক মুহূর্ত বসে রইল। তারপর ধীরে ধীরে টেবিলের নিচ থেকে বেরিয়ে এল। তার মুখ সাদা। চোখ দুটো জ্বলছে। দরজার দিকে তাকাল। তারপর দ্রুত কক্ষ থেকে বেরিয়ে মেহরাবের কাছে ছুটল।

তাকে জানাতে হবে তার পিতা কেবল তার কাছে ভালো সাজতে তার সামনে কয়েকজন ইংরেজ কর্মচারি বন্দি করেছে। মূলত তার বাবাও তাদের সাথে জড়িত।

মেহরাব সব পন্য সামগ্রি দেখে শুনে মাত্রই কক্ষে এসে দাঁড়িয়েছেন। সাহারা হাঁপাতে হাঁপাতে তার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।

“যুবরাজ।”

মেহরাব ফিরে তাকালেন।

“এত হাঁপাচ্ছো কেন সারা? কি হয়েছে?”

সাহারা কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর কান্নারত গলায় বলল,

“আপনাকে সবটা বলতে হবে যা যা শুনেছি।”

মেহরাবের চোখ সরু হয়ে এল।

“কী শুনেছ তুমি?”

সাহারার ঠোঁট কাঁপল।

“সম্রাট কীভাবে সাহাবাদের জমিদারকে সরিয়ে দিতে চান, কীভাবে সাহাবাদ দখল করতে চান সব শুনেছি।”

মেহরাব চুপ করে রইলেন। সাহারা আরও বলল,

“শুধু তাই নয়। আপনার পিতা সাহাবাদ থেকে শিশু অপহরণ করার নির্দেশ দিয়েছেন। একেকটি গ্রাম থেকে অনেকজন করে শিশু। তাদের লুকিয়ে রাখা হবে। নদীপথে পাঠানো হবে। তাদের দেহ দিয়ে ওরা কিসের যেন গবেষণা চালাবে।”

মেহরাবের মুখের রং বদলে গেল

“আর কিছু?”

সাহারা এবার চোখ তুলে তাকাল। তার চোখে পানি ছিল দহনের ন্যায়

“তারা বলেছে, কিছু শিশুকে বিশেষ পরীক্ষার জন্য ব্যবহার করা হবে।”

মেহরাবের নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠল। দেয়ালের পাশে হাত রাখল

“তোমার মাথা ঠিক আছে সারা? কি যা তা বলছো?”

সাহারা তীব্র স্বরে বলল,

“হ্যাঁ। আপনার পিতা শুধু সাহাবাদের জমিদারকে সরাতে চা….”

“সাহারা, থামো।”

“কেন থামব আমি?”

তার কণ্ঠ ক্রমেই উঁচু হয়ে উঠল।

“আপনি কি জানেন, একটা মা তার সন্তান হারালে কেমন হয়? আপনি কি জানেন, একটা শিশু নিজের ঘর থেকে তুলে নিয়ে গেলে তার পৃথিবীটা কীভাবে অন্ধকার হয়ে যায়?”

মেহরাব কঠিন গলায় বললেন,

“আমি জানি না। কিন্তু আমি এটা জানি, তুমি এখন রাগের মাথায় ভুলভাল কিছু বলবে, যার পরিণতি ভয়াবহ হবে। আমারও রাগ চরে যাবে”

সাহারা তীক্ষ্ণ চোখে তাকাল।

“ভয়াবহ? এর চেয়ে ভয়াবহ আর কী হতে পারে? আপনার পিতা মানুষ নয়। একজন……”

মেহরাবের চোখে সতর্কতা জ্বলে উঠল।

“সাহারা।”

কিন্তু সাহারা তখন আর নিজেকে সামলাতে পারল না। রাগে, অপমানে, অসহায়তায় তার কণ্ঠ কেঁপে উঠল।

“আপনার পিতা একজন জালিম, নীচ, শয়তান!”

শব্দগুলো ঘর জুড়ে প্রতিধ্বনিত হলো। সাথে সাথে মেহরাবের হাত উঠল। একটি থাপ্পড় এসে পড়ল সাহারার গালে। শব্দটা খুব জোরে হয়নি। কিন্তু সাহারা যেন পাথর হয়ে গেল। তার মুখ একদিকে ঘুরে গেল। কয়েক মুহূর্ত সে স্থির দাঁড়িয়ে রইল। তারপর ধীরে ধীরে মুখ ফিরিয়ে মেহরাবের দিকে তাকাল। মেহরাবের নিজের হাতও কাঁপছিলো

সে যেন নিজেই বিশ্বাস করতে পারছে না কী করল।

“সাহারা…”

সাহারা কোনো উত্তর দিল না। তার চোখে পানি জমল। কিন্তু গড়িয়ে পড়ল না।খুব শান্ত স্বরে বলল,

“আপনি আমাকে মারলেন?”

মেহরাব এক পা এগিয়ে এলেন।

“আমি… আমি তোমাকে মারতে চাইনি।”

সাহারা পিছিয়ে গেল দুম করে কয়েক পা

“তুমি আমার পিতাকে……”

মেহরাবের মুখ কঠিন হয়ে উঠল।

“তুমি জানো না, এই দেয়ালেরও কান আছে। তুমি জানো না, তোমার একটি কথার জন্য তোমাকে বন্দি করা হতে পারে। তোমাকে সাহাবাদে ফেরত পাঠানো হতে পারে। এমনকি……”

“এমনকি কী?”

সাহারার কণ্ঠে গভীর আঘাত।

“আপনার পিতা আমাকে মেরে ফেলতে পারেন? তাই তো?”

মেহরাব আরেকটু এগিয়ে এসে বলল

“তোমাকে আমার থেকে দূরে সরিয়ে দিলে আমি বাঁচবো কীভাবে বলো তো। এাব বলে না সারা। আমি আমার পিতাকে চিনি”

সাহারা গালে হাত রাখল। তার চোখ মেহরাবের চোখ থেকে সরল না।

“আপনি আমাকে স্বেচ্ছায় হারালেন আজ যুবরাজ”

“আচ্ছা আচ্ছা আমি ভুল করেছি।”

সাহারা তিক্তভাবে হাসল।

“ভুল?”

সে এক পা পেছনে সরে গেল।

“আপনি যখন আপনার পিতার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারেন না, তখন অন্তত তার অপরাধের কথা শুনে রাগ করা মানুষটাকে মারবেন না, যুবরাজ।”

মেহরাবের চোখে অপরাধবোধ ছড়িয়ে পড়ল।

“সাহারা, আমার কথা শোনো।”

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে 42 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন