পাহাড়ি গ্রামের রাত তখন গভীর। দূরের পাহাড়গুলো কুয়াশায় ঢেকে গেছে। বাতাসে শীতের কামড়। কাঠের ছোট্ট ঘরের ভেতর চুলোর আগুন অনেক আগেই নিভে গেছে, তবু মাটির দেয়ালে দিনের উষ্ণতা সামান্য রয়ে গেছে।
জান্নাত ঘরের এক পাশে বিছানায় ঘুমিয়ে ছিল।
তার মুখে ঘুমের ছাপ থাকলেও ভ্রু দুটো সামান্য কুঁচকে। স্বপ্নের ভেতরেও যেন কোনো অচেনা পথ তাকে তাড়া করে ফিরছিল। নদীর শব্দ, ঘোড়ার ক্ষীণ হ্রেষাধ্বনি, দূর থেকে ভেসে আসা কারও ডাক। কিন্তু কোনো মুখই সে মনে করতে পারছিল না। ঘরের বাইরে উঠোনে ইয়ামিন বসে ছিল। পাশে তার দাদি। বৃদ্ধা শীতের চাদর গায়ে জড়িয়ে ধীরে ধীরে শুকনো কাঠ ভাঙছিলেন। সকালে ইয়ামিন পাশের রাজ্যে যাবে তাই সকাল হিয়ার আগেই রান্নাবান্না শেষ করে দিতে হবে।
হঠাৎ দূর থেকে হৈচৈয়ের শব্দ ভেসে এল। প্রথমে ক্ষীণ তারপর ক্রমশ স্পষ্ট।
“এই বাড়ির দরজা খোলো! মোড়লপুত্র এসেছে! সবাই বেরিয়ে আসো!”
ইয়ামিন চমকে উঠল। দাদি হাতের কাঠটা নামিয়ে বললেন,
“এত রাতে আবার কারা?”
ইয়ামিন উঠে দাঁড়াল। উঠোনের বাইরে তখন কয়েকজন লোক হাতে মশাল নিয়ে দাঁড়িয়ে গেছে। তাদের সামনে মোড়লপুত্র। তার সঙ্গে গ্রামের আরও কয়েকজন যুবক। পেছনে কৌতূহলী গ্রামবাসীরা একে একে জড়ো হচ্ছে।
মোড়লপুত্র উচ্চস্বরে বলল,
“ইয়ামিন! বাইরে আয়!”
ইয়ামিন দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়াল।
“কী হয়েছে?”
মোড়লপুত্র ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসল।
“কী হয়েছে, সেটা তুই জানিস না?”
“না।”
“তাহলে সবাইকে বলব?”
তার কথায় আশপাশের লোকজন গুঞ্জন শুরু করল। মোড়লপুত্র এক পা এগিয়ে এসে বলল,
“আজ সন্ধ্যায় তোকে আর মায়াকে এক কক্ষে দেখেছে গ্রামের মানুষ। দরজা বন্ধ ছিল। একজন পুরুষ আর একজন নারী একই ঘরে কী করছিল?”
দাদি সঙ্গে সঙ্গে সামনে এসে দাঁড়ালেন।
“মুখ সামলে কথা বলো। মায়া অসুস্থ। সে এই বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে।”
মোড়লপুত্র কটমট করে তাকাল।
“আশ্রয় নিয়েছে, না কি অন্য কিছু? তা আমরা জেনে গেছি বুড়ি”
কথাটা শুনে কয়েকজন গ্রামবাসী নিচু স্বরে হাসল। মহিলারা বলল,
“এতদিন তো বলছিল মেয়েটা তার আত্মীয়। আত্মীয় হলে এত লুকোচুরি কেন?”
আরেকজন ব্যাঙ্গ করে বলল,
“মেয়েটা দেখতে যেমন, নিশ্চয়ই কোনো বড় ঘরের মানুষ। কিন্তু এখানে এসে ইয়ামিনের ঘরে থাকছে কেন?”
ইয়ামিনের মুখ শক্ত হয়ে গেল।
“আপনারা যা ভাবছেন, তা নয়।”
মোড়লপুত্র সঙ্গে সঙ্গে বলল,
“তাহলে কী? বল! সবাই শুনুক।”
ইয়ামিন উত্তর দেওয়ার আগে ঘরের ভেতর থেকে সামান্য শব্দ হলো। জান্নাত ঘুম ভেঙে উঠে বসেছে। বাইরের চিৎকার তার কানে পৌঁছেছে। সে কিছু বুঝতে না পারলেও কণ্ঠগুলো চিনতে পারল। উঠে দরজার দিকে এগিয়ে এল।
দরজা খুলতেই মশালের আলো তার মুখে পড়ল।
গ্রামবাসীদের মধ্যে আবার গুঞ্জন উঠল।
“এই তো মায়া! ওকে জিজ্ঞেস করো! ওর আর ইয়ামিনের সম্পর্ক কী?”
মোড়লপুত্র চোখ সরু করে জান্নাতের দিকে তাকাল।
“তুমি আর ইয়ামিন এক কক্ষে ছিলে?”
জান্নাত কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর শান্ত গলায় বলল,
“আমি এই বাড়িতে থাকি। তিনি এই বাড়ির মানুষ। এতে অপরাধ কোথায়?”
মোড়লপুত্র হেসে উঠল।
“অপরাধ কোথায়, সেটা গ্রামের নিয়ম ঠিক করবে। এখানে কোনো নারী-পুরুষ ইচ্ছেমতো একসঙ্গে থাকতে পারে না।”
জান্নাতের চোখে বিরক্তি ফুটে উঠল।
“আমি ওনার বাড়িতে থাকি। ওনার কক্ষে নয়”
“সেটা পরে দেখা যাবে। আগে বলো, ইয়ামিনের সঙ্গে তোমার সম্পর্ক কী?”
জান্নাত উত্তর দিল না। তার ভেতরে অস্বস্তি বাড়তে লাগল।বগ্রামবাসীদের কেউ কেউ এবার প্রকাশ্যেই কথা বলতে শুরু করল।
“মেয়েটা নিশ্চয়ই কিছু লুকাচ্ছে। ইয়ামিনও চুপ করে আছে কেন? এভাবে একটা অচেনা মেয়েকে ঘরে রাখা ঠিক হয়নি। গ্রামের মানসম্মান বলে কিছু আছে!”
দাদি রাগে কাঁপতে কাঁপতে বললেন,
“তোমাদের লজ্জা করে না? অসুস্থ একটা মেয়েকে নিয়ে রাতের বেলায় বাড়ি বয়ে এসে এমন কথা বলছ?”
মোড়লপুত্র দাদির দিকে তাকিয়ে ঠান্ডা গলায় বলল,
“দাদি, আপনি চুপ থাকুন। আপনার নাতি গ্রামের মান সম্মান নষ্ট করেছে।”
ইয়ামিন এবার সামনে এগিয়ে এল।
“খবরদার ভাইজান। আমার দাদির সাথে এভাবে কথা বলবেন না।”
মোড়লপুত্রের লোকজন সঙ্গে সঙ্গে এক পা এগিয়ে এল।
“কী করবি তুই?”
ইয়ামিন থেমে গেল। তারও রাগ ছিল, কিন্তু দাদির কথা মনে পড়তেই সে নিজেকে সামলে নিল।
মোড়লপুত্র আবার জান্নাতের দিকে তাকাল।
“তুমি এখনই বলবে, ইয়ামিনের সঙ্গে তোমার সম্পর্ক কী। নইলে তোমাকে এই গ্রামে থাকতে দেওয়া হবে না। সাথে কঠিনতম শাস্তি দেওয়া হবে”
জান্নাত ঠান্ডা স্বরে বলল,
“আমি কোথায় থাকব, সেটা আপনি ঠিক করবেন?”
চারপাশে আবার গুঞ্জন উঠল। মোড়লপুত্রের মুখ কালো হয়ে গেল।
“তুমি এখনও বুঝতে পারছ না, কার সঙ্গে কথা বলছ।”
“খুব ভালোভাবেই বুঝতে পারছি।”
“তাহলে বুঝে কথা বলো।”
জান্নাত এক পা সামনে এগিয়ে বলল,
“আপনি গ্রামবাসীদের সামনে একজন অসুস্থ নারীকে অপমান করছেন। এটাকে ক্ষমতা বলে না। এটাকে দুর্বলতার পরিচয় বলে। কাপুরুষ কোথাকার”
কথাটা শুনে সবাই চুপ হয়ে গেল। মোড়লপুত্রের চোখে ক্রোধ জ্বলে উঠল। সে ইয়ামিনের দিকে ফিরল।
“তুই বল। এই মেয়েটা তোর কী হয়?”
ইয়ামিন চুপ করে রইল। তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর মুখে সন্দেহ, অবজ্ঞা আর কৌতূহল। পেছনে দাদি ভয়ে কাঁপছেন। পাশে জান্নাত স্থির দাঁড়িয়ে আছে। মোড়লপুত্র আবার বলল,
“বল! নাকি সত্যিটা সবাইকে জানাতে হবে?”
ইয়ামিনের বুকের ভেতর ধুকপুক শুরু হলো।
সে জানত, সত্য বললেও বিপদ। মিথ্যা বললেও বিপদ। কিন্তু জান্নাতকে এই লোকগুলোর সামনে দাঁড় করিয়ে রাখা যায় না। মোড়লপুত্রের একজন লোক কুৎসিত হাসি দিয়ে বলল,
“মেয়েটাকে যদি নিজের ঘরে রাখতে চাস, তাহলে সম্পর্কের নাম দিতে হবে। নইলে গ্রামের বিচার বসবে।”
জান্নাত রেগে কিছু বলতে যাবে তার আগে ইয়ামিন জান্নাতের সামনে এসে দাঁড়াল। তার কণ্ঠ কাঁপছিল, কিন্তু কথাটা বের হলো খুব কষ্টে
“সে আমার স্ত্রী।”
চারপাশের সব শব্দ যেন এক মুহূর্তে থেমে গেল।
মশালের আগুন বাতাসে দুলল। দাদি বিস্ময়ে ইয়ামিনের দিকে তাকিয়ে রইলেন। জান্নাতও স্থির হয়ে গেল। চোখ ধীরে ধীরে ইয়ামিনের মুখে উঠল।
মোড়লপুত্র অবিশ্বাসে হেসে উঠল।
“কী বললি?”
ইয়ামিন এবার আরও দৃঢ় গলায় বলল,
“মায়া আমার স্ত্রী।”
“কবে বিয়ে করেছিস?”
“কিছুদিন আগে।”
“কোথায়?”
ইয়ামিন এক মুহূর্ত থেমে বলল,
“পাহাড়ের ওপারের মসজিদে।”
মোড়লপুত্রের চোখে সন্দেহ ঘন হয়ে উঠল।
“সাক্ষী কে ছিল?”
ইয়ামিন উত্তর দিল না। মোড়লপুত্রের লোকজন একে অন্যের দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করতে লাগল। গ্রামবাসীদের মধ্যে কয়েকজন বলল,
“তাহলে এতদিন লুকিয়ে রেখেছিল কেন? মেয়েটা তো কিছুই জানে না মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে ভাজা মাছ টাও উল্টে খেতে জানে না। অথচ তলে তলে এত?”
আরেকজন বলল
“মেয়েটা ধনী ঘরের রে। মেয়েটার স্মৃতি নেই। তাই সুযোগ নিয়েছে।”
জান্নাতের চোখে এবার বিস্ময় থেকে ধীরে ধীরে কঠোরতা নেমে এল। সে ইয়ামিনের দিকে তাকিয়ে নিচু গলায় বলল,
“আপনি কী বললেন?”
ইয়ামিন তার দিকে তাকাতে পারল না।
“এখন কিছু বলবেন না। দয়া করুন”
“আপনি আমাকে আপনার স্ত্রী বললেন?”
“আপনাকে বাঁচানোর জন্য….”
জান্নাত আর কিছু শুনল না। সে সামনে এগিয়ে এসে সবার দিকে তাকাল।
“আমি কারও স্ত্রী কি না, সেটা আমি নিজেই জানি না?”
মোড়লপুত্র সঙ্গে সঙ্গে বলল,
“তাহলে ইয়ামিন মিথ্যা বলেছে?”
জান্নাত তার দিকে তাকাল।
“তোর মত কাপুরুষকে জবাব দিতে আমি বাধ্য নই”
মোড়লপুত্রের মুখ শক্ত হয়ে গেল।
“এর ফল কিন্তু ভালো হবে না।”
ইয়ামিন এবার জান্নাতের পাশে এসে দাঁড়াল।
“যা করার আমার সঙ্গে করবেন। তাকে আর কিছু বলবেন না।”
মোড়লপুত্র ঠান্ডা হাসল।
“তুই বুঝতে পারছিস না, ইয়ামিন। আজ তুই সবাইকে সামনে দাঁড়িয়ে নিজের মুখে বলেছিস মায়া তোর স্ত্রী। এখন এই কথার দায়িত্বও তোকে নিতে হবে।”
দাদি কাঁপা গলায় বললেন,
“কি বলছিস ইয়ামিন, ওরা আমাদের শেষ করে দেবে।”
মোড়লপুত্র ফিরে যাওয়ার আগে জান্নাতের দিকে তাকাল।
“আগামীকাল গ্রামের বিচার বসবে। সেখানে প্রমাণ করতে হবে, তোমাদের বিয়ের কথা সত্যি। আর যদি প্রমাণ না করতে পারো…”
সে বাকিটা শেষ করল না। শুধু ঠোঁটের কোণে ভয়ংকর হাসি ফুটিয়ে তুলল। তার দলবল ধীরে ধীরে সরে গেল। গ্রামবাসীরাও গুঞ্জন করতে করতে তাদের পেছনে হাঁটল। উঠোন ফাঁকা হয়ে গেল। জান্নাত ধীরে ধীরে ইয়ামিনের দিকে ফিরল।
“আপনি কেন বললেন?”
ইয়ামিন মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল।
“ওরা আপনাকে নিয়ে যা বলছিল, আমি সহ্য করতে পারছিলাম না।”
“তাই আমাকে আপনার স্ত্রী বানিয়ে দিলেন? এখন আপনার মিথ্যেটা আমাদের দুজনকেই বিপদে ফেলেছে।”
ইয়ামিন কষ্টভরা চোখে তাকাল।
“আমি কাল সবার সামনে সত্যি বলে দেব।”
জান্নাত দূরের অন্ধকার পাহাড়ের দিকে তাকাল।
“সত্যি বললে তারা আপনাদের গ্রামছাড়া করবে। এই গ্রামে থাকতে দেবে না।”
“তাহলে?”
জান্নাত উত্তর দিল না। সে যেন আবার কোনো অদৃশ্য ফাঁদের মধ্যে আটকে গেছে। পরিকল্পনা মাফিক সবটা হলো না। এবার কি করবে বুঝে আসে না জান্নাত এর।
মোড়লপুত্র চলে যাওয়ার পরও গ্রামের মানুষজন পুরোপুরি ছত্রভঙ্গ হলো না। কেউ উঠোনের পাশে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিল শেষ দেখার। জীবনের সবচেয়ে ব্যক্তিগত বিষয়টাও এখন গ্রামের সবার বিচার করার অধিকার হয়ে গেছে। কিছুক্ষণ পর মোড়লকে সঙ্গে করে তারা আবার ফিরে এলো
চারপাশে আবার গুঞ্জন উঠল। মোড়ল কে পিড়ি পেতে বসতে দেওয়া হলো। মোড়ল বলল
“যা ঘটনা শুনলাম। বিয়ে কোথায় হয়েছে, কেউ দেখেনি। কোনো সাক্ষী নেই। মেয়েটাও তো কিছু মনে করতে পারছে না।”
এলাকাবাসী হৈহৈ করে উঠল। মোড়লপুত্র হাত তুলে সবাইকে চুপ করাল।
“আগামীকাল পাহাড়ের কাজী দিয়ে তোদের বিয়ে হবে। গ্রামের সবার সামনে, নিয়ম মেনে।”
ইয়ামিনের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
“কিন্তু…..”
“কোনো কিন্তু নয়।”
মোড়লপুত্র তার দিকে আঙুল তুলে বলল,
“যদি সত্যিই স্বামী-স্ত্রী হয়ে থাকিস, তাহলে আবার বিয়ে করতে আপত্তি কোথায়? আর যদি আপত্তি থাকে, তাহলে বুঝব তুই মিথ্যা বলেছিস।”
জান্নাত ঠান্ডা চোখে তাকিয়ে রইল। মোড়লপুত্র এবার তার দিকে ফিরল।
“কাল সূর্য ওঠার পর তোমাকে প্রস্তুত থাকতে হবে, মায়া। এই গ্রামের নিয়ম অমান্য করলে এদের জন্য এই পাহাড়ে জায়গা থাকবে না।”
মোড়ল চলে গেল। তার সঙ্গে লোকজনও চলে গেল। কিছু মানুষ সহানুভূতির চোখে তাকাল, কেউ সন্দেহে, কেউ আবার নিছক কৌতূহলে।
উঠোনে শেষ পর্যন্ত শুধু ইয়ামিন, তার দাদি আর জান্নাত রইল। দাদি দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাটিতে বসে পড়লেন।
“হায় আল্লাহ। এই ছেলেটা কী করে এমন কথা বলল!”
ইয়ামিন মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে ছিল। জান্নাত তার দিকে তাকাল।
“আপনি কি করে এই বোকামি টা করলেন?
ইয়ামিন ধীরে মাথা তুলল।
“আমি তখন কিছু ভাবতে পারিনি।”
তার কণ্ঠে অনুতাপ।
“ওরা আপনাকে নিয়ে যা বলছিল আমি সহ্য করতে পারছিলাম না। মনে হচ্ছিল, আমি যদি কিছু না বলি, তাহলে ওরা আপনাকে আরও অপমান করবে।”
জান্নাত কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল,
“আপনি আমাকে বাঁচাতে চেয়েছিলেন। সেটা আমি বুঝেছি। কিন্তু ওরাও এটা ইচ্ছে করেই করেছে যাতে আপনি বা আমি এমন কিছু বলি”
ইয়ামিন নত চোখে তাকাল।
“আপনি রাগ করেছেন?”
“হ্যা রাগ করেছি।”
ইয়ামিনের মুখ আরও নিচু হয়ে গেল। জান্নাত বলল,
“কিন্তু আপনার ওপর নয়। পরিস্থিতির ওপর।”
একটু থেমে আবার বলল
“এখন তো সত্যিই আমাদের বিয়ে করতে হবে।”
“আপনি চাইলে আমি কাল সবার সামনে বলে দেব, আমি মিথ্যা বলেছিলাম।”
জান্নাত তৎক্ষণাৎ মাথা নাড়ল।
“তাহলে তারা আমাকে এই গ্রামে থাকতে দেবে না।”
“আপনি তো আমার সঙ্গে থাকতে বাধ্য নন।”
জান্নাত কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল। আসলেই তো। সে গো বাধ্য নয়। চোখ ভরে এলো পানিতে। এই মানুষটি তাকে কখনো নিজের ইচ্ছের বিরুদ্ধে কিছু করতে বলেনি। প্রতিবার বিপদ এলে নিজের ভয়, নিজের অসহায়তা ভুলে তার সামনে দাঁড়িয়েছে। জান্নাত ধীরে বলল,
“কাল যা হবে, তা আমার সম্মতিতেই হবে। কেউ আমাকে জোর করতে পারবে না।”
ইয়ামিন সঙ্গে সঙ্গে মাথা নত করল।
“আমি কথা দিচ্ছি।”
দাদি চোখ মুছে বললেন,
“আল্লাহ জানেন, এই বিয়েতে কী লেখা আছে। তবে ছেলেটা তোকে কখনো কষ্ট দেবে না, মায়া।”
জান্নাত দাদির দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
“আমি জানি, দাদি।”
ইয়ামিন সেই হাসি দেখে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে রইল।
তারপর লজ্জায় চোখ সরিয়ে নিল। এবার কালকের অপেক্ষা।
*****
রাত নামতেই সাহাবাদের চারপাশে অস্বাভাবিক নীরবতা নেমে এল। প্রাসাদ থেকে খানিকটা দূরে, জঙ্গলের আড়ালে, বেশ কয়েকজন অশ্বারোহী নীরবে দাঁড়িয়ে ছিল। তাদের সামনে ফাইয়াজ।
কোমরে অস্ত্র, হাতে লাগাম। তার পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা লোকগুলোও প্রস্তুত। দলের একজন সতর্ক ভঙ্গিতে বলল।
“সর্দার, তাহলে রওনা হওয়া যাক?”
একসঙ্গে কয়েকটি ঘোড়া অন্ধকার ভেদ করে এগিয়ে গেল। প্রাসাদের উত্তর ফটকে তখন চারজন প্রহরী দায়িত্বে ছিল। দূর থেকে ঘোড়ার শব্দ শুনে তারা সতর্ক হয়ে দাঁড়াল।
“কে ওখানে?”
অন্ধকারের ভেতর থেকে ফাইয়াজের কণ্ঠ ভেসে এল,
“সাহাবাদের মানুষ। জরুরি সংবাদ আছে।”
প্রহরীরা অস্ত্র শক্ত করে ধরল।
“রাতের এই সময়ে কোনো সংবাদ গ্রহণ করা হবে না। পরিচয় দাও।”
ফাইয়াজ ঘোড়া থামাল।
“দরজা খোলো। জমিদারের কাছে যেতে হবে।”
একজন প্রহরী এগিয়ে এসে বলল,
“জমিদারের কাছে যাওয়ার অনুমতি আছে?”
ফাইয়াজ উত্তর দেওয়ার আগেই পেছন থেকে তার দলের একজন ফিসফিস করে বলল,
“সময় নষ্ট হচ্ছে।”
প্রহরী সন্দেহভরে তাদের দিকে তাকাল।
“তোমরা কারা?”
ফাইয়াজ শেষবারের মতো শান্ত থাকার চেষ্টা করল।
“আমরা শত্রু নই। কিন্তু এখনই ভেতরে ঢুকতে হবে।”
প্রহরী অস্ত্র উঁচু করল।
“পেছনে সরে দাঁড়াও!”
পরের মুহূর্তে উত্তেজনা বিস্ফোরিত হলো। ফাইয়াজ ঘোড়া ঘুরিয়ে এক প্রহরীর আঘাত এড়িয়ে গেল। তার দলের লোকেরা সামনে এগিয়ে এসে ফটকের কাছে ধস্তাধস্তিতে জড়িয়ে পড়ল। মশালের আলোয় অস্ত্রের ঝলক দেখা গেল, প্রহরীদের চিৎকারে রাতের নীরবতা ভেঙে গেল।
“আক্রমণ!”
“ফটক বন্ধ করো!”
“সাহায্যের জন্য ডাকো!”
ফাইয়াজ সরাসরি কাউকে আঘাত না করে প্রহরীদের অস্ত্র সরিয়ে দিতে চেষ্টা করছিল। কিন্তু সংঘর্ষ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ল। এক প্রহরী মাটিতে পড়ে গেল, আরেকজন পেছনে সরে গিয়ে শিঙা বাজাল। সেই শব্দ মুহূর্তের মধ্যে পুরো প্রাসাদে ছড়িয়ে গেল। ফাইয়াজের দলের একজন চিৎকার করে বলল,
“ফটক খুলে গেছে!”
ফাইয়াজ ঘোড়া থেকে নেমে দৌড়ে ভেতরে ঢুকল।
তার পেছনে একে একে লোকগুলোও প্রাসাদের আঙিনায় প্রবেশ করল। প্রহরীরা এবার চারদিক থেকে ছুটে আসছিল। প্রাসাদের ভেতর মশাল জ্বলে উঠল। জানালাগুলো খুলে গেল। ঘুমন্ত সৈন্যরা অস্ত্র হাতে বেরিয়ে এল। নারীদের কণ্ঠে আতঙ্কের শব্দ শোনা গেল। ফাইয়াজ চারদিকে তাকাল। এই প্রাসাদে সে আগে বহুবার এসেছে কখনো ব্যবসায়ীর পরিচয়ে, কখনো গোপন সংবাদবাহক হয়ে। কিন্তু আজ সে আক্রমণকারী।
দলের একজন তার পাশে এসে বলল,
“সর্দার, সামনে প্রধান অঙ্গন। সেখানে বেশি প্রহরী।”
ফাইয়াজ কঠিন গলায় বলল,
“কেউ অকারণে রক্তপাত করবে না। আমাদের লক্ষ্য রাজপরিবারের কাছে পৌঁছানো।”
প্রধান অঙ্গনে পৌঁছাতেই আরও একদল প্রহরী তাদের পথ আটকাল। সামনে দাঁড়ানো অধিনায়ক গর্জে উঠল,
“অস্ত্র নামাও! সাহাবাদ প্রাসাদে আক্রমণ করে কেউ জীবিত ফিরতে পারবে না।”
ফাইয়াজ পাশ কাটিয়ে তার আঘাত ঠেকাল। দুজনের অস্ত্রের সংঘর্ষে ধাতব শব্দ উঠল। ফাইয়াজ দ্রুত আঘাত ফিরিয়ে অধিনায়কের অস্ত্র দূরে সরিয়ে দিল। একই সময়ে তার দলের লোকেরা প্রহরীদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ল।
অঙ্গনের চারপাশে চিৎকার, দৌড়ঝাঁপ আর মশালের আলো একাকার হয়ে গেল। কিছুক্ষণ আগেই চোখ লেগে এসেছিলো শাখার। মহলের অবস্থা কর্ণে যেতেই ঘুম উবে গেল। বেড়িয়ে এলো অস্ত্র হাতে।