ফন্ট সাইজ:
থিম:
রক্তমুকুট

46

লেখক: জান্নাতুল ফেরদৌস

দিনের শেষ আলো অনেক আগেই পাহাড়ের গা থেকে সরে গেছে। একের পর এক অন্ধকার পাহাড় যেন আকাশের দিকে উঠে দাঁড়িয়ে আছে। নিচের গ্রামটুকু কুয়াশায় আধো ঢাকা। দূরে কোথাও একটা পাহাড়ি ঝরনার শব্দ শোনা যাচ্ছে একটানা, একঘেয়ে। পাহাড়ের অন্য প্রান্তে ছোট্ট কাজীঘরটায় আলো জ্বলছে। মাটির দেয়াল আর কাঠের খুঁটির তৈরি পুরোনো ঘর। সামনে কয়েকটা মশাল জ্বলছে। বাতাসে তাদের আগুন বারবার কেঁপে উঠছে। ঘরের ভেতরে কাজী বসে আছেন।

তার সামনে বিয়ের প্রয়োজনীয় কাগজপত্র। একপাশে ইয়ামিন। অন্যদিকে বসে জান্নাত।

আজ তাকে দেখে মনে হচ্ছে না সে সেই পরিচিত পাহাড়ি গ্রামের মায়া। গায়ে বিয়ের পোশাক।

মাথার ওপর লম্বা ঘোমটা। চেহারা শান্ত।

শান্ত মুখের আড়ালে কী চলছে, কেউ বুঝতে পারছে না। মোড়লপুত্রের মুখে তখন বিজয়ের হাসি। এতদিন যে মেয়েটিকে নিজের ইচ্ছেমতো নত করতে পারেনি, আজ তাকে কাজীঘরে এনে বসাতে পেরেছে সে। তার পাশে দাঁড়িয়ে কয়েকজন লোক। তারা পাহারা দিচ্ছে। কেউ যেন পালাতে না পারে। কিন্তু জান্নাতের এত শান্ত আচরণ ভাবাচ্ছে সবাইকে। কাজী বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা শুরু করার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন।

ঠিক তখনই জান্নাত এর ওষ্ঠে খেলে যায় রহস্যের হাসি।তার চোখ ঘরের চারপাশে ঘুরল। দরজা, জানালা, দাঁড়িয়ে থাকা লোকগুলো, তারপর ইয়ামিন। ইয়ামিনের চোখেও অস্বস্তি। সে যেন বুঝতে পারছে না কীভাবে পরিস্থিতি এতদূর গড়াল। জান্নাত কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল। কাজীঘরের বাইরে আচমকা একটা শব্দ হলো। কেউ যেন দ্রুত পায়ের শব্দে পাশ দিয়ে চলে গেল। পাহারায় থাকা একজন লোক দরজার দিকে তাকাল। এক মুহূর্তের অসতর্কতার ই সুযোগ নিল জান্নাত। এরপর কাজীঘরের ভেতর থেকে শুরু হলো চিৎকার। কেউ বুঝতে পারছে না কী ঘটছে ভিতরে। বাইরের কয়েকজন পাহারাদার দরজার দিকে ছুটে গেল। দরজা বন্ধ ভিতর থেকে। কাঠের আসবাব উল্টে পড়ার শব্দ। কেউ আতঙ্কে জান্নাতের নাম ধরে ডাকল। কয়েক মুহূর্ত পর আবার একটা চিৎকার। বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা লোকগুলো একে অপরের দিকে তাকাল। কেউ ভেতরে ঢোকার সাহস পেল না। শেষ পর্যন্ত একজন দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই তার মুখের সমস্ত রং সরে গেল। সে আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না। পেছনে ফিরে দৌড় দিল। তাতেও শেষ রক্ষা হলো না। শোওওও করে এক তীর এসে বিধলো তার কাধে।

****

কিছুটা সময় পর মোড়লবাড়ির দরজা আচমকা খুলে গেল। একজন লোক টলতে টলতে ভেতরে ঢুকল। তার শ্বাস ভারী। পোশাক এলোমেলো।

কাধ চুই র’ক্ত ঝড়ছে। চোখে আতঙ্ক, যেন মৃত্যুর মুখ থেকে পালিয়ে এসেছে। বারান্দায় তখন আর তার গিন্নি বসে ছিল। গিন্নি স্বামীর হাতে পান তুলে দিচ্ছিল। লোকটিকে দেখে মোড়ল ভ্রু কুঁচকে উঠল।

“কিরে? তোর এই অবস্থা কেন?”

লোকটি উত্তর দিতে পারল না। দুই হাত দিয়ে দরজার খুঁটি আঁকড়ে দাঁড়িয়ে রইল। মোড়ল উঠে দাঁড়াল।

“কী হয়েছে?”

লোকটি এবার কোনোভাবে বলল,

“মোড়ল…”

“কী?”

“মোড়লপুত্র…আর নেই।”

মোড়লের মুখের হাসি মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল।

“কী বললি?”

লোকটি মাথা নাড়ল।

“আর নেই…”

“কি যা তা বলছিস? কি হয়েছে আমার খোকার?”

মোড়লের গলা এবার কাঁপছে। লোকটি দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়াল।

“মায়াকে আর ইয়ামিনকে কাজীঘরে নিয়ে গিয়েছিলাম।”

মোড়ল এক পা এগিয়ে গেল।

“তারপর?”

লোকটি চোখ বন্ধ করল। মনে হলো সে যেন এখনও সেই দৃশ্য থেকে বেরোতে পারেনি।

“বিয়ে…বিয়ে দেওয়ার আগেই……

“বল। তারপর?”

লোকটি মোড়লের চোখের দিকে তাকাল।

তার চোখে এমন আতঙ্ক ছিল যে মোড়লের বুকের ভেতর অজানা একটা ভয় ঢুকে গেল।

“ও…”

“কে?”

“মায়া।”

একটু থেমে সে বলল

“মায়া সবাইকে বিভৎস ভাবে হ'ত্যা করেছে”

মোড়লের গিন্নি শিউরে উঠল। লোকটি কাঁপা গলায় বলতে লাগল,

“আমরা কেউ তাকে থামাতে পারিনি। যারা ভেতরে ছিল… কেউ বেরোতে পারেনি।”

মোড়লের ঠোঁট কাঁপল।

“আমার ছেলে?”

লোকটি চোখ নামিয়ে ফেলল।

“মোড়লপুত্রও…”

বাকিটা বলতে পারল না। মোড়ল যেন পাথর হয়ে গেল। তারপর লোকটি শেষ শক্তিটুকু দিয়ে বলল,

“শুধু ইয়ামিনকে… কিছু করেনি।”

তারপর তার হাঁটু ভেঙে গেল। সে মাটিতে পড়ে গেল। মোড়লের গিন্নি চিৎকার করে উঠল। কিন্তু মোড়ল যেন কিছুই শুনল না। সে আর কাউকে কিছু বলল না। দৌড়ে বেরিয়ে গেল বাড়ি থেকে।

পাহাড়ের পথ। মোড়ল দৌড়াচ্ছে। বয়সের ভারে হাঁপিয়ে উঠছে, তবু থামছে না। কাজীঘরটা পাহাড়ের ওপরের দিকে। সেখানে যাওয়ার পাথরের সিঁড়িগুলো রাতের শিশিরে ভেজা। মোড়ল একবার পিছনে তাকাল। কেউ নেই।

তবু তার মনে হচ্ছে অন্ধকারের ভেতর কেউ তাকে দেখছে। সে আরও দ্রুত উঠতে লাগল। শেষ সিঁড়িটা পার হতেই সামনে কাজীঘর দেখা গেল।

দরজা আধখোলা। মশালের আলো নিভে আসছে। চারপাশ অস্বাভাবিক নীরব। মোড়ল থেমে গেল। তার বুক ধড়ফড় করছে। সে আর সামনে এগোল না। ঠিক তখন কাঠের দরজাটা খুলে গেল। মোড়লের চোখ স্থির হয়ে গেল।

দরজার ভেতর থেকে একজন নারী বেরিয়ে এল।

মাথায় লম্বা ঘোমটা। গায়ে বিয়ের পোশাক।

পাহাড়ি বাতাসে তার ঘোমটার প্রান্ত উড়ছে। হাতে একটি তলোয়ার। মশালের শেষ আলোয় তলোয়ারটির গায়ে লালচে দাগ দেখা গেল। মোড়লের বুকের ভেতরটা হিম হয়ে গেল। নারীটি সিঁড়ির প্রথম ধাপে পা রাখল। তারপর দ্বিতীয় ধাপে। তারপর তৃতীয়টিতে। একেক টা সিড়ি পাড় হচ্ছে আর মৃত্যু মোড়লের দিকে এগিয়ে আসছে।

ঘোমটার আড়াল থেকে মুখটা যখন সামান্য দৃশ্যমান হলো মোড়ল তাকে চিনে ফেলল।

“মায়া?”

কিন্তু এ কি সেই মায়া? স্মৃতিহীন, অসহায় এক তরুণী? কই আজ তো তার চোখে অসহায়তা নেই। এ যে হিংস্র বাঘিনী

মোড়ল আর এগোনোর সাহস পেল না। ঘুরে দাঁড়িয়ে সে দৌড়াতে শুরু করল। পাহাড়ের আঁকাবাঁকা পথে নামতে নামতে একবারও পেছনে তাকাল না। পেছনে যদি তাকায়, আজ সর্বনাশ নিশ্চিত। একবার ধরতে পারলে এর হাত থেকে পালানোর কোনো পথ নেই। জান্নাত সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামছে। বউয়ের সাজে তলোয়ার হাতে। মোড়ল সেদিন পাহাড় থেকে পালিয়েছিল। যে পাহাড়কে এতদিন নিজের সম্পত্তি ভেবে শাসন করেছে, সেই পাহাড়েই তার শেষ রাত হয়ে গেছে।

*****

পরদিন সকাল। সূর্য তখনও পুরোপুরি পাহাড়ের মাথার ওপরে ওঠেনি। কুয়াশার চাদর ধীরে ধীরে সরছে। রাতের ঘটনার কথা ইতিমধ্যে এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়িতে পৌঁছে গেছে। কাজীঘরের সামনে ভিড়। কেউ কাছে যাওয়ার সাহস করছে না। কেউ বলছে, রাতে ভয়ংকর কিছু ঘটেছে।

কেউ বলছে, পাহাড় আর আগের মতো নেই বিভীষিকা ভর করেছে পাহাড়ে। অনেকে পাহাড়ে ওঠার সাহস পাচ্ছে না। পাহাড়ের ওপরের পথটার দিকে তাকিয়ে আছে। হঠাৎ দূর থেকে ঘোড়ার শব্দ শোনা গেল। সবাই মুখ ঘুরিয়ে তাকাল। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে জান্নাত নেমে আসছে। গায়ে যুদ্ধের রাজকীয় পোশাক। সঙ্গে রয়েছে ইয়ামিন। ইয়ামিনের পেছনে দাঁড়িয়ে আছে পাহাড়ের কয়েকজন যুবক। জান্নাত সবার সামনে এসে থামল। তারপর জিজ্ঞেস করল,

“মোড়ল কোথায়?”

কেউ উত্তর দিতে সাহস পেল না। শেষ পর্যন্ত একজন বৃদ্ধ সামনে এসে বলল,

“রাতে পালিয়েছে।”

জান্নাতের চোখে সামান্য কঠোরতা ফুটে উঠল।

“পাহাড় ছেড়ে?”

বৃদ্ধ মাথা নেড়ে বলল,

“জি।”

জান্নাত চারপাশে তাকাল। তারপর শান্ত গলায় বলল,

“আজ থেকে এই পাহাড়ে তার কোনো অধিকার নেই।”

কথাটা খুব সাধারণভাবে বললেও আশ্চর্যভাবে কেউ প্রতিবাদ করল না। কয়েকজন বৃদ্ধ একে অপরের দিকে তাকাল। এতদিন পরে প্রথমবার কেউ তাদের হয়ে কথা বলেছে। মোড়লের অত্যাচার থেকে তাদের নিস্তার পাওয়া ছিল অসম্ভব প্রায়। এত বছরে বহু কিশোরী যুবতী হারিয়েছে এই পাহাড় থেকে। তার প্রত্যেকটাতে ছিল মোড়ল আর মোড়লের পুত্রের হাত। জান্নাত আবার বলল,

“কেউ তার লোকদের ভয় পাবে না। কারও জমি কেড়ে নেওয়া হবে না। কারও ঘর থেকে জোর করে কিছু নেওয়া হবে না। পাহাড়ের পথ, ঝরনা, বন কোনোটাই কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়।”

একজন যুবক সাহস করে বলল,

“কিন্তু মোড়লের লোকেরা ফিরে এলে?”

জান্নাত তার দিকে তাকাল।

“তখন আমরা সবাই মিলে তাদের উত্তর দিব।”

সেদিন দুপুরেই জান্নাত ইয়ামিনকে নিয়ে পাহাড়ের উঁচু সমতল জায়গাটায় গেল। সেখানে পুরোনো একটি কাঠের চাতাল ছিল। ইয়ামিন কিছু বলতে যাচ্ছিল। জান্নাত হাত তুলে থামিয়ে দিল। তার চোখ তখন নিচের পুরো পাহাড়ের দিকে।

“তুমি এই পাহাড়ের প্রতিটি পথ চেনো?”

জান্নাত হুট করে ইয়ামিনকে তুমি বলছে। ইয়ামিন মাথা নেড়ে বলল,

“চিনি।”

“কোন পথ দিয়ে বাইরের লোক আসে সাধারণত?”

“দক্ষিণের জঙ্গল দিয়ে।”

“আর নদীর দিক?”

“ওদিক দিয়েও আসা যায়। তবে পথ কঠিন, ডিঙি নৌকা দিয়ে আসা কষ্ট ই।”

জান্নাত কিছুক্ষণ ভাবল। তারপর বলল,

“আজ থেকে পাহারা বসবে।”

ইয়ামিন অবাক হয়ে তাকাল।

“পাহারা?”

“হ্যাঁ।”

“কার?”

জান্নাত চারপাশে দাঁড়িয়ে থাকা যুবকদের দিকে তাকাল।

“যারা পাহাড়কে নিজের ঘর বলে মনে করে, তারা পাহাড় পাহারা দেবে। যারা নিজের ঘরের মা বোনেদের সুরক্ষা চায় তারা পাহারা দেবে।”

কেউ কিছু বলল না। তারপর একজন যুবক এগিয়ে এসে বলল,

“আমি থাকব।”

আরেকজন বলল,

“আমিও।”

ক্রমে আরও কয়েকজন এগিয়ে এল। জান্নাত ইয়ামিনের দিকে তাকাল।

“তুমি তাদের নেতৃত্ব দেবে।”

ইয়ামিন যেন বিশ্বাস করতে পারল না।

“আমি?”

“হ্যাঁ।”

“কিন্তুু আমি তো সৈন্য নই। আমার তেমন প্রশিক্ষণ….”

জান্নাতের ঠোঁটে সামান্য হাসি ফুটল।

“সৈন্য হতে যুদ্ধের গল্প জানা লাগে না। নিজের মানুষকে রক্ষা করার ইচ্ছা লাগে। সামনে রাজ্য শাসন করতে হবে যুবরাজ। প্রশিক্ষণ নিন”

ইয়ামিন আর কিছু বলল না। সেদিন থেকেই পাহাড়ে একটি নতুন দল তৈরি হলো। তাদের সৈন্য বলত। কেউ বলত পাহারাদার। আবার কেউ কেউ বলত জান্নাতের পাহাড়ি বাহিনী। তাদের কোনো রাজকীয় পোশাক ছিল না। কাঠের লাঠি কেউ পুরোনো অস্ত্র ই ছিল তাদের হাতিয়ার।

*****

কয়েকদিন পর জান্নাতের নজর গেল জঙ্গলের দিকে। ইয়ামিন তাকে নিয়ে গেল পাহাড়ের দক্ষিণের ঘন বনে। সেখানে গিয়ে জান্নাত থেমে গেল। কাটা গাছের গুঁড়ি পড়ে আছে। কিছু জায়গায় মাটির ওপর বুটের পায়ের ছাপ। আর একটু দূরে ঝোপের মধ্যে পাওয়া গেল কয়েকটি খালি কাঠের বাক্স। জান্নাত বাক্সগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল।

“এগুলো কার?”

ইয়ামিন বলল,

“ইংরেজদের লোকেরা মাঝে মাঝে আসে।”

“কী নেয়?”

“গাছের ছাল, শিকড়, পাতা আরও অনেক কিছু। সেসব দেখে কাজ নেই শাহজাদী চলুন”

জান্নাত নিচু হয়ে মাটিতে পড়ে থাকা শুকনো একটি গাছের অংশ হাতে তুলে নিল। তার চোখ হঠাৎ অদ্ভুতভাবে স্থির হয়ে গেল। মনে হলো কোনো পুরোনো জ্ঞান তার ভেতরে কোথাও নড়ে উঠেছে। ইয়ামিন অবাক হয়ে তাকাল।

“কিন দেখছেন বলুন তো?”

“যে জিনিসের মূল্য পাহাড়ের মানুষ জানে না, বাইরের লোকেরা সেটার মূল্য জানে।”

সে উঠে দাঁড়াল।

“আজ থেকে জঙ্গলে কোনো বাইরের লোক অনুমতি ছাড়া ঢুকবে না।”

ইয়ামিন মাথা নেড়ে বলল,

“আর যারা আগে থেকোই আসত তারা তো আসবে?”

জান্নাতের চোখ এবার কঠিন হয়ে উঠল। সে চারপাশে তাকাল।

“এই পাহাড়ের গাছ পাহাড়ের। এই মাটির ঔষধি পাহাড়ের মানুষের। কেউ চুরি করে নিয়ে যাবে তা তো হতে পারে না। কোনো বহিরাগত আসলে তাকে বন্দি করবে”

সেদিন থেকেই পাহাড়ের প্রতিটি প্রবেশপথে পাহারা বসানো হলো। জঙ্গলের ভেতরে চিহ্নিত হলো পুরোনো পথ। কোন পথে কাঠ বহন করা হয়, কোন পথে বাইরের লোকেরা ঢোকে সবকিছুর হিসাব রাখা শুরু হলো। ইয়ামিন প্রতিদিন নতুন লোকদের নিয়ে পাহারা দিত। জান্নাত বহু ঔষধি সম্পর্কে জানল যারা বছরের পর বছর জঙ্গলে ঘুরেছে তাদের কাছ থেকে।

কোন গাছ ঔষধি। কোন গাছ বিরল। কোন ঝরনার পানি কোথায় গিয়ে মেশে। কোন পাহাড়ি পথ বর্ষায় বন্ধ হয়ে যায়। সব জানতে শুরু করল।

কেউ বুঝতে পারছিল না স্মৃতি হারানো এই মেয়েটি এত কিছু শেখার আগ্রহ কোথা থেকে পেল। কেবল ইয়ামিন জানলেও পাহাড়ের সকলের নিকট জান্নাতের পরিচয় গোপন রাখল জান্নাত।

*****

এক সন্ধ্যায় ইয়ামিন পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে পাহারা দেখছিল। সবাই ঠিকঠাক আছে কিনা। দূরে সূর্য ডুবে যাচ্ছে। নিচে পুরো পাহাড় অন্ধকারে ঢেকে যাচ্ছে। তার পাশে এসে দাঁড়াল জান্নাত।

ইয়ামিন বলল,

“আপনি কেমন বদলে গেছেন।”

জান্নাত নিচের পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে রইল।

“হয়তো।”

“কিন্তু কীভাবে?”

জান্নাত উত্তর দিল না। তার চোখ তখন দূরের জঙ্গলের দিকে। অনেক দূরে কোথাও ধোঁয়া উঠছে। কেউ আগুন জ্বালিয়েছে নাকি?। নাকি কেউ আবার জঙ্গলে ঢুকেছে? জান্নাতের চোখ সরু হয়ে গেল।

“ইয়ামিন।”

“জি?”

“কাল ভোরে লোক নিয়ে দক্ষিণের জঙ্গলে যাবে।”

“কেন?”

জান্নাত ধীরে বলল,

“আমার মনে হচ্ছে ওরা আবার এসেছে।”

ইয়ামিন দূরের ধোঁয়ার দিকে তাকিয়ে সে খুব ধীরে বলল,

“আমরা তো এখনও ধরতে পারি ওদের। এক্ষুনি যাচ্ছি”

“ইয়ামিন নাহহহহ! আমরা সংখ্যা এবং অভিজ্ঞতায় ওদের চেয়ে অনেক কম।”

ইয়ামিন দমল। জান্নাত ইয়ামিন এর হাত ধরে বলল

“অনেক অজানা গল্প আছে আপনার আমার। চলুন সেগুলোর আলাপ সেরে নিই”

*****

দীর্ঘ দিন হয়ে গেছে শাখা আর ফাইয়াজের দেখা হয় না। শাখার ক্ষত ধীরে ধীরে শুকিয়ে এসেছে। প্রথম কয়েকদিন তার চলাফেরায় কষ্ট ছিল, বাহু নাড়ালেই ব্যথা অনুভূত হতো। চিকিৎসক বিশ্রামের পরামর্শ দিয়েছিল। তাই প্রাসাদের দাসীরা সারাক্ষণ তার পাশে থেকেছে। কিন্তু শারীরিক ক্ষতের চেয়েও গভীর ছিল মনের ক্ষত। সেই শক্ত শাখা ভেঙে পড়েছে অচিরেই। বোনকে দেখতো আসার অনুমতিটুকু পায়নি সাহারা।

সেদিনের পর থেকে তার ফাইয়াজের সঙ্গে আর একবারও দেখা হয়নি। শাখা জানত, ফাইয়াজকে বন্দি করা হয়েছিল। কিন্তু এরপর? সে কোথায় আছে? কী অবস্থায় আছে? তার দলের লোকদের কী হয়েছে? এসব প্রশ্ন সে কাউকে করেনি। অন্তত সরাসরি নয়। কিন্তু প্রতিদিন রাত হলেই অজান্তে তার মনে সেই একই দৃশ্য ফিরে আসত। ফাইয়াজের এই রুপ সে কোনোভাবেই ভুলতে পারছে না। মন থেকে সরাতেই পারছে না। ফাইয়াজও কারাগারে চার দেওয়াল এর ভিতর থেকে চাতকের ন্যায় চেয়ে থাকে শাখার অপেক্ষায়।

শাখা মনকে বোঝায়। ও একজন ডাকাত। সাহাবাদের শত্রু। তার জন্য কষ্ট পাওয়া উচিত নয়। কিন্তু হৃদয় সবসময় যুক্তির কথা শোনে না। সকালে শাখা নিজের কক্ষ থেকে বের হলো। আজ তাকে আগের চেয়ে অনেক সুস্থ দেখাচ্ছে। বাহুর ক্ষত এখনও কাপড়ে ঢাকা, তবে হাঁটার সময় আর আগের মতো কষ্ট হচ্ছে না। দুজন দাসী তার পেছনে আসতে চাইলে শাখা হাত তুলে থামিয়ে দিল।

“তোমরা যাও।”

দাসীরা একে অপরের দিকে তাকাল।

“কিন্তু শাহজাদী…”

“আমি মামার কাছে যাচ্ছি।”

আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে শাখা এগিয়ে গেল। বাইজিদ শাহ তখন সভাকক্ষে ছিলেন। শাখাকে দেখে তিনি অবাক হলেন।

“এই অবস্থায় এখানে কেন?”

শাখা কোনো ভূমিকা না করে সরাসরি সামনে গিয়ে দাঁড়াল। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

“মামা…”

বাইজিদ তার মুখের দিকে তাকালেন।

“কী হয়েছে?”

শাখা চোখ নামিয়ে নিল। তারপর খুব স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করে জিজ্ঞেস করল,

“সেদিন… ফাইয়াজ আর তার লোকদের আপনি কী করেছিলেন?”

বাইজিদ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। প্রশ্নটা যেন তিনি আগেই অনুমান করেছিলেন।

“কেন জানতে চাইছিস?”

শাখা উত্তর দিল না। শুধু অপেক্ষা করতে লাগল।

বাইজিদ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

“ওদের ছেড়ে দিয়েছি।”

শাখার চোখ হঠাৎ তার মুখের দিকে উঠল।

“ছেড়ে দিয়েছেন?”

“হ্যাঁ।”

কয়েক মুহূর্ত শাখা কোনো কথা বলতে পারল না।

তার বুকের ভেতর যেন এতক্ষণ আটকে থাকা কোনো ভার একটু নড়ে উঠল। সে ধীরে জিজ্ঞেস করল,

“সবাইকে?”

“যারা বেঁচে ছিল, তাদের।”

শাখা আবার নীরব হয়ে গেল। বাইজিদ তার মুখের পরিবর্তন লক্ষ্য করছিলেন।

“তুই কি ওর খবর জানতে এসেছিস?”

শাখা সঙ্গে সঙ্গে চোখ সরিয়ে নিল।

“না।”

একটু থেমে বলল,

“শুধু জানতে চেয়েছিলাম।”

বাইজিদ মৃদু হেসে ফেললেন তারপর গম্ভীর স্বরে বললেন,

“কিছু মানুষকে দূরে রাখাই মঙ্গল”

শাখা কোনো উত্তর দিল না। ঘুরে দাঁড়াল। কিন্তু দরজার কাছে গিয়ে আবার থেমে গেল। খুব ধীরে বলল,

“ওরা এখন কোথায়?”

বাইজিদ কয়েক মুহূর্ত তার দিকে তাকিয়ে থেকে বললেন,

“আমি কি করে জানব? দেখ গিয়ে আবার কাকে লুট করার পরিকল্পনা করছে। ডাকাত দের আর কাজ কি”

শাখা আর কিছু বলল না। কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেল। করিডোরে এসে সে থেমে দাঁড়াল। দীর্ঘদিন পর তার বুকে স্বস্তি জন্ম নিয়েছে। ফাইয়াজ বেঁচে আছে। এইটুকুই আপাতত যথেষ্ট। কিন্তু ফাইয়াজ কি এখনও তাকে মনে রেখেছে? আবার মনকে বোঝালো, কোনো ডাকাত কে সে কখনোই মনে রাখবে না। তার সাথে সম্পর্ক ওই ওবদিই সমাপ্ত।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে 46 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন