সাহাবাদের জমিদার মহলে ডাকাতির খবর ছড়িয়ে পড়ার পর কয়েকদিন কেটে গেছে।
মহলের ভেতর-বাইরে এখনও সেই ঘটনার রেশ কাটেনি। প্রহরীদের চলাফেরা বেড়েছে, রাত নামলেই প্রধান ফটকে দ্বিগুণ পাহারা বসছে। জমিদার মহল অধীর অপেক্ষায় ছিল। আর যাই হোক অন্তত আত্মীয়তার খাতিরে হলেও সম্রাট একবার আসবেন। কিন্তু নাহ, একটা পত্র পর্যন্ত আসেনি সমবেদনা জানিয়ে। সাহারার মন পড়ে আছে নিজের বাপের বাড়ি। খবর শুনেও যেতে পারেনি। শাখা গুরুতর আহত হয়েছে। আপাকে একটা বার দেখার জন্য মনটা আকুল হয়ে আছে।
কিন্তু সম্রাট হারুন ওয়াসেম তাকে যেতে দেননি।
সাহারা কয়েকবার অনুমতি চেয়েছিল। প্রতিবারই সম্রাটের একই উত্তর
“এখন আমিরাবাদ ছেড়ে কোথাও যেও না। মেহরাব আসুক। তারপরে যেখানে যাওয়ার যেও”
সাহারা বুঝেছিল, এর পেছনে পুরো চাল টাই সম্রাটের দেওয়া। কিন্তু মেহরাব বাণিজ্যের কাজে আরব দেশে। তার অনুপস্থিতিতে বাবার সঙ্গে সরাসরি বিরোধে যেতে চায়নি সে। আজ মেহরাবের ফেরার কথা। সেই সকাল থেকেই সাহারা যেন অস্থির হয়ে আছে। মহলের বারান্দায় দাঁড়িয়ে দূরের পথের দিকে তাকিয়ে ছিল সে। বিকেলের রোদ ফিকে হয়ে আসছিল। প্রাসাদের উঁচু দেয়ালের ওপারে ঘোড়ার ক্ষীণ শব্দ শোনা গেলেই সাহারার চোখ সেদিকে চলে যায় বারবার। কেউ না কেউ না কেউ এসে থামে রাজবাড়িতে। কিন্তু মেহরাবের দেখা নেই। তবে কি আজ আসবে না সে? অবশেষে সন্ধ্যার কিছু আগে প্রাসাদের প্রধান ফটকে সৈন্যদের হুরস্থুল দেখা গেল। একটু পরেই মেহরাব ঘোড়া থেকে নামল। দীর্ঘ যাত্রার ক্লান্তি তার মুখে স্পষ্ট। পোশাকেও পথের ধুলো লেগে আছে। কয়েকজন সৈন্য তার সঙ্গে ছিল। তাদের নির্দেশ দিয়ে সে সরাসরি নিজের কক্ষে চলে গেল। সাহারা আর অপেক্ষা করল না, গেল পিছু পিছু। কক্ষে ঢুকতেই মেহরাব পাগড়ি খুলে পাশে রাখল। সাহারা দরজার কাছে দাঁড়িয়েই বলল,
“আপনি খুব ক্লান্ত যুবরাজ?”
মেহরাব ক্লান্ত চোখে তাকিয়ে হালকা হাসল।
“অনেকটা। এত দূর থেকে এসেছি তো। বসো।”
সাহারা ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে বসল। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
“আপনাকে একটা কথা বলার ছিল।”
মেহরাব বুঝল, কথাটা সাধারণ নয়। নয়ত এ সময় উপস্থাপন করত না সাহারা
“কী হয়েছে?”
সাহারা এক নিঃশ্বাসে সবটা বলল। সাহাবাদের জমিদার মহলে ডাকাতির ঘটনা। ফাইয়াজের দল। শাখার সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ। শাখার আহত হওয়া। এরপর বাইজিদের সিদ্ধান্তে তাদের ছেড়ে দেওয়া। সব টা গুছিয়ে বলল। মেহরাব একটাও কথা বলল না। শুধু শুনে গেল। শেষে বলল,
“তো তুমি একবারও যাওনি?”
সাহারা নিচু স্বরে বলল,
“আসলে…..”
“বাবার কাছে সাহাবাদে যাওয়ার অনুমতি চেয়েছিলে?”
“হ্যাঁ।”
“দিয়েছে?”
সাহারা মাথা নাড়ল।
“না।”
মেহরাব কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল,
“কাল সকালে আমার সঙ্গে যাবে।”
সাহারা তাকাল।
“আপনি আমাকে নিয়ে যাবেন?”
“হ্যাঁ।”
“কিন্তু…..”
“বাবার সঙ্গে আমি কথা বলব।”
সাহারার চোখে সামান্য স্বস্তি ফুটে উঠল। মেহরাব উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল,
“আজ আর এসব নিয়ে ভাবতে চাই না। খুব ক্লান্ত আমি। কাল সকালে বের হব।”
সাহারা মাথা নাড়ল।
“ঠিক আছে।”
সে উঠে দাঁড়াল। দরজার কাছে গিয়ে আবার ফিরে তাকাল মেহরাবের দিকে। মেহরাব তখন চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিচ্ছে। সাহারা আর কিছু বলল না। চলে গেল মেহরাবের নাশতা প্রস্তত করতে।
*****
আমিরাবাদের রাজপ্রাসাদের বিশাল দরবারকক্ষ।
রাত ঘনিয়ে এসেছে। সম্রাট হারুন ওয়াসেম একা বসে ছিলেন। সামনে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নথি। পাশে নায়েব দাঁড়িয়ে। ঠিক তখনই দরবারের বাইরে একজন দূত এসে থামল।
“সম্রাটের জন্য পত্র।”
হারুন চোখ তুললেন।
“কার?”
“ইংরেজদের কাছ থেকে।”
পত্রটি সঙ্গে সঙ্গে তার হাতে তুলে দেওয়া হলো।
হারুন সিল ভাঙলেন। প্রথম কয়েকটি লাইন পড়তেই তার ভ্রু কুঁচকে গেল। আরও কিছুক্ষণ পড়ার পর পত্রটি টেবিলের ওপর রেখে বললেন,
“ওরা গতরাতে জঙ্গলে ঢুকেছিল?”
নায়েব মাথা নোয়াল।
“জি, সম্রাট।”
“তারপর?”
“পাহাড়িরা তাদের ওপর আক্রমণ করেছে।”
হারুনের চোখ সরু হয়ে এল।
“পাহাড়িরা?”
“জি।”
হারুন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,
“মোড়ল কোথায় ছিল?”
নায়েব এবার একটু ইতস্তত করল।
“মোড়ল... পলাতক।”
হারুন চোখ সরু করে মাথা তুললেন।
“পলাতক?”
“জি, সম্রাট।”
“সে তার লোকজনকে রেখে পালিয়ে গেল?”
নায়েব এবার নিচু গলায় বলল,
“মোড়লের সাঙ্গপাঙ্গদেরও আর পাওয়া যায়নি।”
হারুনের মুখ কঠিন হয়ে উঠল।
“মানে?”
নায়েব উত্তর দেওয়ার আগে একবার চারপাশে তাকাল। তারপর ফিসফিস করে বলল,
“তাদের হত্যা করেছে কোনো এক নারী যোদ্ধা।”
কক্ষের বাতাস যেন হিমশীতল হয়ে সম্রাটের সবাঙ্গ কাপিয়ে দিল। হারুন ধীরে ধীরে বললেন,
“নারী যোদ্ধা?”
“জি।”
“কে সে?”
“কেউ জানে না। পাহাড়িরাও তাকে চেনে না। আপাতত সে ই ক্ষমতা দখল করেছে। এখন সবাই তার কথাই মানছে।”
হারুনের আঙুল টেবিলের ওপর ধীরে ধীরে ঠুকতে লাগল।
“মোড়ল পালিয়েছে, তার লোকজন নেই, আর একজন অচেনা নারী এসে পাহাড়িদের নেতৃত্ব দিচ্ছে। মানে কি যা তা কারবার। হচ্ছে টা কি এসব?”
হারুন আবার পত্রটির দিকে তাকালেন। ইংরেজদের পত্রে লেখা ছিল জঙ্গলের ভেতরে তাদের প্রবেশের পর পাহাড়িরা হঠাৎ তাদের পথ আটকে দেয়। এরপর তাদের ওপর আক্রমণ হয় এবং তারা পিছু হটতে বাধ্য হয়। কিন্তু পত্রে একটি কথাই বারবার উল্লেখ করা হয়েছিল যে একজন নারী। সে নারীকে কেউ আগে সেখানে দেখেনি।
হারুন পত্রটি ভাঁজ করলেন। তার চোখে চিন্তার ছায়া।
“নায়েব।”
“জি, সম্রাট।”
“পাহাড়ে নতুন যে নেতৃত্ব এসেছে... তার খবর আমার চাই। যত দ্রুত সম্ভব।”
কিছুক্ষণ থেমে আবার বললেন,
“আর একটা কথা।”
“জি?”
“মোড়লকে খুঁজে বের করো।”
নায়েব মাথা নোয়াল।
“জী, সম্রাট।”
সম্রাট জানালার বাইরে তাকালেন। দূরে রাতের অন্ধকার। পাহাড়ের দিকে যেন সেই অন্ধকার আরও ঘন হয়ে আছে। বিরক্ত হয়ে টেবিলে হাত ঠুকলেন
“এ আবার কোন নতুন আপদ পাহাড়ে উঠেছে!”
সাহাবাদের সীমান্তের কাছে বিস্তৃত সেই দুর্গম পাহাড়ি অঞ্চল। সাধারণ চোখে জায়গাটা হয়তো কেবল পাথর, বন আর দুর্গম পথের সমষ্টি। কিন্তু ওই পাহাড়ের মূল্য তার দৃশ্যমান সৌন্দর্যের চেয়ে অনেক বেশি। ওই জঙ্গলে জন্মায় বহু দুর্লভ গাছগাছড়া। মূল্যবান ভেষজ। এমন কিছু উদ্ভিদ, যেগুলো বাইরের রাজ্যে পাওয়া যায় না। সেগুলো সংগ্রহ করে বিশেষজ্ঞদের হাতে পাঠানো হয়। সেখান থেকে তৈরি হয় নানা ধরনের ঔষধ। রোগ নিরাময়ের কাজে ব্যবহৃত সেই ঔষধের বড় অংশই পরে পাঠানো হয় বিলেতে। আর সেই ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমিরাবাদেরও বিশাল লাভ। হারুন ধীরে ধীরে বললেন,
“তুমি জানো, ওই পাহাড় থেকে বছরে কত অর্থ আসে?”
নায়েব মাথা নিচু করে বলল,
“জি, সম্রাট। হিসাব অনুযায়ী লাভের পরিমাণ খুবই বড়।”
“শুধু আমাদের নয়। ইংরেজরাও লাভ পায়। আমরা লাভ পাই। ব্যবসাটা দুপক্ষের জন্যই সুবিধার।”
তারপর ঘুরে দাঁড়ালেন।
“আর এখন সেখানে একজন অচেনা নারী পাহাড়িদের নেতৃত্ব দিচ্ছে!”
নায়েব বলল,
“সম্ভবত সে বাইরের লোকদের পাহাড়ে ঢুকতে দিচ্ছে না।”
হারুনের কপালের ভাঁজ আরও গভীর হলো।
“সেটাই তো সমস্যা।”
তিনি ধীরে ধীরে পায়চারি করতে লাগলেন।
“আজ ইংরেজদের পথ বন্ধ করেছে। তারপর যদি ঘোষণা করে কোনো বাইরের মানুষ ওই জঙ্গলে ঢুকতে পারবে না?”
হারুন থেমে গেলেন। কিছুক্ষণ পর ঠান্ডা গলায় বললেন,
“তাহলে শুধু ইংরেজদের ব্যবসা ই নয়, আমাদের অর্থও বন্ধ হয়ে যাবে।”
তার চোখ এবার কঠিন হয়ে উঠল।
“একজন নারী এসে যদি পাহাড়ের পথ বন্ধ করে দেয়, এর চেয়ে লজ্জাজুআর কি ই বা হতে পারে আমাদের কাছে। আর ওই পাহাড় সরাসরি আমাদের রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত নয়। কেবল অঙ্গরাজ্য। সরাসরি ঘোষণা দেওয়ার অধিকারও আমাদের নেই”
টেবিলের ওপর রাখা ইংরেজদের পত্রটির দিকে তাকালেন।
“ওরা নিজেদের লাভের জন্য পাহাড়ে যায়। আমরা আমাদের লাভের জন্য ওদের সুযোগ দিই। কিন্তু এখন যদি পাহাড়িরা নিজেদের আইন বানিয়ে নেয়…”
কথাটা শেষ করলেন না। নায়েব বলল,
“তাহলে তাকে থামাতে হবে, সম্রাট।”
হারুন কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন,
“না।”
নায়েব অবাক হয়ে তাকাল। হারুনের ঠোঁটে খুব ক্ষীণ হাসি ফুটল।
“আগে জানতে হবেসে কে।”
“তারপর?”
হারুন জানালার বাইরে অন্ধকার পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“তারপর ঠিক করা হবে, তাকে থামাতে হবে, নাকি তাকে দিয়েই পাহাড়টা নিয়ন্ত্রণ করাতে হবে।”
কক্ষের ভেতর আবার নীরবতা নেমে এল। নায়েব অল্প এগিয়ে এসে বলল
“কি করতে চাইছেন জাঁহাপনা?”
“আমাদের লাভের এক অংশ তাকেও দেওয়া হোক। তারপর দেখো কি বলে”
*****
মেহরাবের কক্ষে ছোট একটা প্রদীপ জ্বলছে। জানালার বাইরে শীতের বাতাস। দূরের প্রাসাদের মিনারগুলো কুয়াশার ভেতর অস্পষ্ট হয়ে আছে। মেহরাব জানালার পাশে বসে ছিল, গায়ে মোটা শাল জড়ানো। দীর্ঘ বাণিজ্যযাত্রা শেষে ফিরেছে বলে শরীরেও ক্লান্তির ছাপ। সাহারা তখন কক্ষে নেই। ঠিক সেই সময় দরজায় মৃদু শব্দ হলো। মেহরাব মুখ ঘুরিয়ে তাকাল। দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল আলীরাজ। মেহরাব তাকে দেখে বলল,
“মামা? বসো।”
আলীরাজ এগিয়ে এসে তার সামনে থাকা আসনে বসল। কিছুক্ষণ মেহরাবের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর হঠাৎ বলল,
“এতদিন সেভাবে জিজ্ঞেস করিনি।”
মেহরাব ভ্রু তুলল।
“কী?”
“অকারণে হুট করে সাহারাকে কী করে বিয়ে করলি?”
মেহরাব কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর জানালার বাইরে তাকিয়ে ধীরে ধীরে বলল,
“ঘটনাটা অকারণে হয়নি, মামা।”
আলীরাজ একটু সামনে ঝুঁকল।
“তাহলে?”
মেহরাব দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“সেদিন রাতে আমরা সাহাবাদের উত্তরের প্রাসাদে গিয়েছিলাম।”
“তুই আর সাহারা?”
“হ্যাঁ। ওখানে আমরা একদল ভিনদেশি মানুষকে দেখতে পাই। নিজেদের তান্ত্রিক বলে পরিচয় দিচ্ছিল। অদ্ভুত সব কুসংস্কারে বিশ্বাস করত তারা। তাদের বিশ্বাস ছিল, কোনো এক বিশেষ আচার সম্পন্ন করতে হলে একজন নিখুঁত সুন্দরী কুমারী মেয়েকে বলি দিতে হবে।”
আলীরাজের চোখ সরু হয়ে এল।
“সাহারাকে ইঙ্গিত করেছিল?”
মেহরাব মাথা নাড়ল।
“হ্যাঁ।”
তারপর মেহরাব বলল,
“আমি তাদের বোঝানোর চেষ্টা করি। বলি, এসব কুসংস্কার ভিত্তিহীন। নিরপরাধ মানুষকে হত্যা করা হারাম। কোনো আচার বা বিশ্বাসের নামে একজন মানুষকে বলি দেওয়া যায় না। তারা শুনল না।
মেহরাবের কণ্ঠ কঠিন হয়ে উঠল।
“বরং তারা বলল, সাহারার মতো এমন নিখুঁত সুন্দরী কুমারী মেয়েকেই নাকি তাদের প্রয়োজন।”
আলীরাজ চুপ করে রইল।
“তখন আমি তাদের বললাম…..”
মেহরাব একটু থেমে বলল
“সাহারা আমার স্ত্রী।”
আলীরাজ এবার হালকা হাসল।
“সেই সময়েই?”
“ওদের থামানোর জন্য বলেছিলাম।”
“বিশ্বাস করেছিল?”
“না।”
মেহরাবের মুখে তিক্ত হাসি ফুটল।
“ওরা কিছুতেই বিশ্বাস করেনি। এরপর পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়ে গেল। আমাদের সেখানেই আটকে রাখা হলো। কি এক গুড়ো পদার্থ নাকে মুখে উড়িয়ে দিল। শরীর অসার হয়ে আসলো। নড়ার শক্তি পেলাম না।”
আলীরাজ এবার গম্ভীর হয়ে গেল।
“তারপর?”
“ওরা আমাদের আটকে রাখার পাশাপাশি সাহাবাদে গুজব ছড়াতে শুরু করল। শাহজাদী আর যুবরাজ নাকি অনৈতিক কোনো কাজে মাঝরাতে উত্তরের প্রাসাদে যায়।”
আলীরাজের মুখ থেকে হাসি মিলিয়ে গেল।
“কী?”
মেহরাব বলল,
“আমরা তখন বন্দি। বাইরে কী হচ্ছে, কিছুই করার উপায় ছিল না। অথচ আমাদের নাম ব্যবহার করে সাহাবাদের মানুষের মধ্যে নোংরা কথা ছড়ানো হচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত সেখান থেকে বের হতে পেরেছিলাম আমরা। কিন্তু তখন সাহারা আর বাড়িতে ফিরতে চাইছিল না।”
আলীরাজ বুঝতে পারল।
“মানুষের সামনে মুখ দেখাতে লজ্জা লাগছিল?”
“শুধু লজ্জা নয়। গুজব সত্যি না হলেও মানুষ কথা বলবে। কেউ বিশ্বাস করবে, কেউ করবে না। কিন্তু একজন রাজকন্যার জন্য এমন অপবাদ বহন করা সহজ নয়।”
আলীরাজ বলল
“বলতে থাক। থামছিস কেন?”
মেহরাব জানালার দিকে তাকিয়ে বলল
“আমরা সাহাবাদের এক কাজীর কাছে গেলাম। এবার আর কাউকে বোঝানোর জন্য বা কাউকে থামানোর জন্যও নয়। সত্যিই বিয়ে করলাম। মন থেকে।”
আলীরাজ কিছুক্ষণ কোনো কথা বলল না। তারপর মৃদু হেসে মাথা নাড়ল।
“তুই তাহলে যেটা প্রথমে বাঁচানোর জন্য বলেছিলি, শেষ পর্যন্ত সেটাই সত্যি করে ফেললি।”
মেহরাবও সামান্য হাসল।
“হয়তো।”
“আর সাহারা?”
“সে আর মহলে মুখ দেখাতে চায়নি। তাই আমার সঙ্গে আমিরাবাদে চলে এসেছে। আমিও বউ ছেড়ে আসতে চাইনি”
আলীরাজ কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইল।
তারপর বলল,
“এখন বুঝলাম। এই তবে ঘটনা। তবে ঘটনা এমনি ঘটে না ভাগ্নে। তোমার নজর ভালো না। আগে থেকেই বদ নজর ছিল সারার উপ্রে। অস্বীকার করতে পারবা?”
মেহরাব পানি মুখে নিয়ে বিশম খেল আলীরাজের কথায়। আলীরাজ টুস টুস ভাটি ভাটি বলে বলে মেহরাবের মাথায় চাপড় দিতে থাকল। মেহরাব শালের ভাঁজ একটু ঠিক করে নিল। ঠিক তখনই দরজার বাইরে কারও নূপূরের শব্দ শোনা গেল।
দুজনেই তাকাল দরজার দিকে। হাতে রুটি আর মাংসের বড় থালা নিয়ে কক্ষে প্রবেশ করল সাহারা। মেহরাবের কাঁধ চাপড়ে উঠে গেল আলীরাজ। সাহারা নিচু হয়ে খাবার বাড়তে বাড়তে বাঁকা হাসলো। মনে মনে বলল
“আপনার বলা গল্পটাই আমার সাজানো নাটক যুবরাজ”
*****
সাহাবাদের কারাগারের সবচেয়ে ভেতরের অংশটা দিনের আলোতেও অন্ধকার হয়ে থাকে। মোটা পাথরের দেয়াল। লোহার দরজা। সরু জানালা দিয়ে সামান্য আলো ঢোকে, তাও দিনের বেশিরভাগ সময় বন্ধ থাকে। সেই কারাগারের একেবারে আলাদা একটি কক্ষে রাখা হয়েছে ফাইয়াজকে। সন্ধ্যায় হঠাৎ কারাগারের প্রহরীরা সতর্ক ভঙ্গিতে কদমবুসি করল। বাইজিদ শাহ আসছেন। দরজা খুলে দেওয়া হলো। বাইজিদ ধীর পায়ে ভেতরে ঢুকলেন। সঙ্গে মাত্র দুজন প্রহরী। ফাইয়াজ দেয়ালের সঙ্গে হেলান দিয়ে বসে ছিল। বাইজিদের উপস্থিতি টের পেয়েও উঠল না।
বাইজিদ তার সামনে গিয়ে দাঁড়ালেন।
“ফাইয়াজ।”
ফাইয়াজ ধীরে চোখ তুলল।
“জমিদার সাহেব।”
বাইজিদের মুখ কঠিন।
“তোমার সঙ্গে আজ কিছু কথা বলতে এসেছি।”
ফাইয়াজ মৃদু হাসল।
“প্রশ্ন করবেন?”
“হ্যাঁ।”
বাইজিদ একটু এগিয়ে এলেন।
“সাহাবাদের মহলে হামলা করার পেছনে কার নির্দেশ ছিল?”
ফাইয়াজ চুপ।
“কে তোমাদের পাঠিয়েছিল? তোমার দলের এত লোক। এত প্রস্তুতি আর হামলার ধরণ দেখে বেশ করে বুঝেছি উদ্দেশ্য কেবল লুট করা নয়। এটা হঠাৎ করে করা কোনো ডাকাতির চেষ্টাও নয়। এ পরিকল্পিত উচ্ছেদ চেষ্টা”
ফাইয়াজ মাথা নিচু করল। বাইজিদের কণ্ঠ আরও কঠিন হলো।
“বলো কার ষড়যন্ত্র?”
ফাইয়াজ কোনো উত্তর দিল না। বাইজিদ রেগে বলল
“তুমি জানো, তোমার এই নীরবতার মূল্য কী হতে পারে?”
ফাইয়াজ মৃদু হেসে বলল,
“জানি।”
বাইজিদ কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইলেন।
তারপর ধীরে বললেন,
“তোমাকে হত্যা করার আদেশ দিতে আমার খুব বেশি সময় লাগবে না।”
কিন্তু ফাইয়াজের মুখে ভয় দেখা গেল না। বরং সে হেসে উঠল। বাইজিদ ভ্রু কুঁচকালেন।
“হাসছ কেন?”
ফাইয়াজ ধীরে উঠে দাঁড়াল।
“আপনি কি জানেন? আমাকে হ’ত্যা করা হলে শাখা সাহাবাদ ধ্বংস করে ফেলবে।”
বাইজিদের মুখের কঠোরতা এক মুহূর্তে বদলে গেল।
“শাখা?”
ফাইয়াজ এবার আর হাসল না।
“আপনি জানেন, সে আমাকে কেন বাঁচিয়েছিল।”
বাইজিদ নীরব।
“আপনি এটাও দেখেছেন, আমার জন্য সে নিজের লোকদের সামনে দাঁড়িয়েছে। আজ যদি জানতে পারে আপনি আমাকে হত্যা করেছেন…”
সে বাকিটা শেষ করল না। প্রয়োজনও হলো না।
বাইজিদ কিছুক্ষণ নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে রইলেন।
কারণ তিনি জানতেন শাখা আবেগের বশে কী করতে পারে, সেটা তিনি ইতিমধ্যে দেখেছেন।
ফাইয়াজ আবার বলল,
“আমাকে হত্যা করতে চাইলে করতে পারেন। কিন্তু তারপর যখন শাখা আমার লোকেদের নেতৃত্ব দিয়ে হামলা করবে? তখন?”
বাইজিদ দীর্ঘক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইলেন। ফিক করে হেসে বলল
“শাখা এমন কাজ জীবনেও করবে না। তুমি হয়তো জানো না শাখা কার সন্তান? শাখা আবিদের সন্তান। সাহাবাদের জন্য জীবন দোওয়া সেই দেশপ্রেমিক নায়েব নেওয়াজে আবিদ শাখার পিতা।”
ফাইয়াজ কুটিল হেসে বলল
“আর আপনাদের পথে নামানো সেই ধ্বংসবতী নারী চন্দ্রপ্রভা কিন্তু তারই মাতা। ভুলে যাবেন না জমিদার সাহেব”
বাইজিদের শিরদাঁড়া বেয়ে একটা শীতল স্রোত নেমে গেল। এই দুই সপ্তাহে ফাইয়াজ এসব কি করে জানলো? ফাইয়াজ হাসলো
“কি করে জানলাম ভাবছে? হা হা জমিদার সাহেব। সাথে কাদের নিয়ে ঘুরছেন জানেন? এরাও আমার লোক”
বাইজিদ পিছনে ঘুরার আগেই এক জোড়া তলোয়ার এসে ঠেকলো তার ঘাড়ে