সাহাবাদের মহলে কয়েকটা দিন অস্বাভাবিক নীরবতায় কেটে গেল। শাখা আগের মতো কারও সঙ্গে তেমন কথা বলে না। দরবারে প্রয়োজন ছাড়া যায় না, প্রাসাদের বাগানেও আর দেখা যায় না, এমনকি সন্ধ্যার পর বারান্দায় দাঁড়িয়ে গ্রাম গুলো খুঁটিয়ে দেখাও যেন তার অভ্যাস থেকে হারিয়ে গেল। কেউ জিজ্ঞেস করলে সেই এক উত্তর
“কিছু হয়নি।”
কিন্তু তার চোখ বলে অন্য কথা। বাইজিদ শাহও বিষয়টি বুঝেছিলেন। তাই তিনি মহলের সকল প্রহরীকে কঠোর নির্দেশ দিয়েছে ফাইয়াজ যে সাহাবাদের কারাগারে বন্দি, এই কথা যেন কোনোভাবেই শাখার কানে না যায়। কেউ যদি বলে, কঠোর শাস্তি হবে। কারাগারের দিকে শাখা যেন না যায় সেটাও আলাদা করে বলে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু প্রাসাদের দেয়াল যত উঁচুই হোক, মানুষের মুখ তা টপকাবেই। সন্ধ্যায় শাখার বিশ্বস্ত এক সৈনিক তার কক্ষে এসে হাজির। শাখা তখন জানালার পাশে বসে ছিল। কিছুক্ষণ ইতস্তত করে বলল,
“শাহজাদী”
শাখা তাকাল। লোকটি মাথা নিচু করল।
“অভয় দিলে, একটা কথা বলব?”
“বলো।”
“আপনি রাগ করবেন না।”
শাখার বুকের ভেতর অজানা আশঙ্কা জেগে উঠল।
“কী হয়েছে?”
সৈনিক ধীরে বলল,
“ডাকাত সর্দার আবরার ফাইয়াজ এই মহলেই আছে।”
শাখা হচকচিয়ে উঠে দাঁড়াল
“কি বলছো? কোথায়?”
সৈনিক চারপাশে তাকিয়ে আরও নিচু গলায় বলল,
“এই মহলের কারাগারে।”
শাখা এগিয়ে আসে
“কী বললে?”
“কারাগারের ভেতরের আলাদা কক্ষে রাখা হয়েছে তাকে।”
শাখা আর কিছু বলল না। সৈনিক বুঝতে পারল, তার মুখ থেকে আর কোনো কথা বের করা উচিত নয়। সে মাথা নত করে চলে গেল। দরজা বন্ধ হওয়ার পর শাখা অনেকক্ষণ একই জায়গায় দাঁড়িয়ে রইল। ফাইয়াজকে ছাড়েনি তবে। শাখাকে মিথ্যা বলছে সবাই। এবার মাথায় ধরল বিষয়টা। এত সহজে ফাইয়াজকে ছেড়ে দেওয়ার পাত্র নয় বাইজিদ। কিন্তু তাকে বাঁচিয়ে রেখেছে? তাদের নিশ্চয়ই আরও কোনো পরিকল্পনা আছে যা শাখাকে জানাচ্ছে না। আরেকটি কথা মনে পড়ল, বাইজিদ তাকে কারাগারে যেতে নিষেধ করেছেন।
কঠোরভাবে। সেই রাতেই শাখা সিদ্ধান্ত নিল। সে যাবে। যে করেই হোক। রাত গভীর হওয়ার অপেক্ষা করল সে। মহলের একের পর এক প্রদীপ নিভে যাচ্ছে। করিডোরগুলো ফাঁকা হতে শুরু করল। প্রহরীদের পায়ের শব্দও ধীরে ধীরে নির্দিষ্ট ছন্দে পরিণত হলো। তারা নিজেদের মত টহল দিয়ে যাচ্ছে। শাখা কালো চাদর জড়িয়ে কক্ষ থেকে বের হলো। সরু পথটা পেরিয়ে সে পেছনের সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামল। কারাগারের পথটায় কড়া পাহারা থাকে সব সময়।
প্রথম ফটকে দুজন প্রহরী। দুজনই ঘুমে ঢুলছে। শাখা অন্ধকার স্তম্ভের আড়াল ঘুরে অন্য পথ ধরল। দ্বিতীয় ফটকের কাছে প্রহরীদের কথাবার্তার শব্দ শোনা গেল। দেয়ালের ছায়ায় স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল রইল শাখা। একটা ঢিল ছুড়লো তাদের পাশে। তারা শব্দ শুনে অন্যদিকে ঘুরতেই শাখা ফটক পেরিয়ে গেল। সামনে আরও একটি লোহার দরজা। তারপর পাথরের সরু সিড়ি। চারপাশে স্যাঁতসেঁতে গন্ধ। দেয়ালে ঝোলানো মশালের আলো বাতাসে কাঁপছে। পাশের ফোয়ারা থেকে ফোঁটা ফোঁটা পানি পড়ার শব্দ বারবার প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। শাখার বুকের ভেতর হৃদস্পন্দন ক্রমশ বেড়ে যাচ্ছিল। অবশেষে সেই কক্ষের হদিস পেল, যেখানে ফাইয়াজকে রাখা হয়েছে। শাখা দরজার পাশে এসে দাঁড়াল। ভেতর থেকে কোনো শব্দ আসছে না। সে ধীরে ধীরে লোহার শিকের কাছে এগিয়ে গেল। পাথরের দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে মেঝেতে বসে আছে ফাইয়াজ। মাথাটা সামান্য নিচু। মুখে কয়েক দিনের ক্লান্তি। কারাগারের ম্লান আলোয় তাকে আগের চেয়ে অনেক বেশি নিঃসঙ্গ মনে হচ্ছিল।
কিন্তু তার চোখ দুটো অস্থির বড্ড। সেও যেন অপেক্ষা করছিল। কিসের জন্য সে নিজেও জানে না। লোহার শিকে ক্ষীণ শব্দ হলো। ফাইয়াজ মাথা তুলল। প্রথমে অন্ধকারে কিছু বুঝতে পারল না।
তারপর শিকের ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা অবয়বটা একটু এগিয়ে এল। ফাইয়াজের চোখ স্থির হয়ে গেল।
“শাখা।”
এক মুহূর্তের জন্য যেন সময় থেমে গেল। ফাইয়াজ ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। এগিয়ে আসলো অবিশ্বাস্য চাহনিতে। দুজনের মাঝখানে শুধু কয়েকটি লোহার শিক। কেউ কোনো কথা বলল না। শাখার ঠোঁট কাঁপছে। না বেরোচ্ছে কান্না, না বেরোচ্ছে কোনো শব্দ বা কথা। ফাইয়াজও চুপ। শুধু তাকিয়ে আছে। শাখার চোখ ছলছল করছে। ফাইয়াজের চোখেও সেই একই আভা। কয়েকদিনের জমে থাকা অভিমান, ভয়, অনিশ্চয়তা, না বলা প্রশ্ন সব যেন সেই এক দৃষ্টির মধ্যে এসে থেমে আছে। শাখা ধীরে শিকের ওপর হাত রাখল। ফাইয়াজও এক পা এগিয়ে এল।
তার হাত উঠল। কিন্তু লোহার শিকের ওপারে এসে থেমে গেল। স্পর্শ হলো না। হওয়ারও উপায় নেই। কেউ কোনো কথা বলতে পারল না। পড়ে নিল একে অপরের চোখের ভাষা। শাখার চোখের কোণে জমে থাকা জল অবশেষে গড়িয়ে পড়ল।
ফাইয়াজ তাকিয়ে রইল সেই জলকণার দিকে। আবার চোখ স্থির হলো শাখার চোখে। কথা বলার মতো অসংখ্য কথা ছিল তাদের। কিন্তু কেউ একটি শব্দও উচ্চারণ করল না। কারাগারের পথে প্রহরীর পায়ের শব্দ। মশালের আগুনের ক্ষীণ কটকট শব্দ। কেউ এগিয়ে আসছে এদিক। দুই মানুষের নীরব দৃষ্টি লোহার শিক পেরিয়ে একে অপরকে ছুঁয়ে যাচ্ছে গভীর ভাবে। তীব্র জিদ আর অনুরাগ নিয়ে শাখাই আগে বলল
“কেন বন্দি হয়েছেন এখানে? কেন পালিয়ে যাননি?”
ফাইয়াজ কিছু বলতে উদ্যত হতেই শাখা চেতে উঠল আরও। পরোয়া করল না কারো
“একদম বানানো গল্প বলবেন না আমায়। আপনি ধরা না দিলে কারও ক্ষমতা ছিল না আপনাকে ধরার”
ফাইয়াজ একদৃষ্টে চেয়ে আছে শাখার দিকে। শাখার চোখে দিয়ে যেন আগুণ ঝড়ছে
“ছেড়ে দিচ্ছি আপনাকে। চলে যান সাহাবাদ ছেড়ে। আর কক্ষণও আসবেন না না এই রাজ্যে”
ফাইয়াজের ঠোঁটে হাসি। চোখের কোণে পানি চকচক করছে। গলা ভেঙে গেছে তার। অপরিচিত শোনালো গলার স্বর
“প্রথম প্রহরে আত্মহত্যা করা ফাঁসির আসামির শাস্তি মকুব হলো তৃতীয় প্রহরে এসে? হা হা শাহজাদী। ওরা যদি আমাকে ডাকাত হিসেবে ধরত আমি অবশ্যই পালাতাম। কিন্তু ওরা আমাকে তোমায় ভালোবাসার জন্য শাস্তি দিচ্ছে”
“তো কেন ভোগ করছেন শাস্তি? আপনার মত একজন খু’নি, ডাকাত, লুটের ভালোবাসা চাই না তো আমি”
ভাইয়াজ এর হাসি মুখটা বিরস হয়ে এল। বুকের মাঝে যেন বড় কোনো পাথর জমে গেল। দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল
“তোমাকে ভালোবাসার অপরাধে আমার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হোক, বেঁচে থাকতে এই কারাগার থেকে আমার মুক্তি না হোক”
শাখা তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলল
“সম্মুখসমরে দাঁড়িয়ে দেখলাম, আমরা দুজন পরিচিত”
ফাইয়াজ ও হাসলো
“আমার হার তো নিশ্চিত ছিল, যেখানে প্রতিপক্ষ তুমি স্বয়ং”
শাখা আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না।
ফাইয়াজের চোখের দিকে শেষবার তাকিয়েই পিছু হটলো সে। চাদরটা শক্ত করে গায়ে জড়িয়ে দ্রুত পায়ে কারাগার পেরিয়ে অন্ধকারের মধ্যে মিলিয়ে গেল। তার বুকের ভেতর তখন ঝড়। নিয়তি এ কি খেলা খেলল তার সাথে। কক্ষে এসে গগনবিদারী কান্নায় ফেটে পড়ল সে।
কিন্তু গোপন সাক্ষাৎ গোপন রইল না। ভোর হওয়ার আগেই খবর পৌঁছে গেল বাইজিদ শাহের কাছে
“গতরাতে শাহজাদী শাখা কারাগারে গিয়েছিলেন। কারাগারের ভেতরের প্রহরীরা পরে বিষয়টি বুঝতে পারে।”
বাইজিদ বিষয়টা শুনে চুপ করে রইলেন। তিনি জানতেন, এই দিনটা একদিন আসবেই। শাখাকে ফাইয়াজের কাছ থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু হৃদয়ের ওপর প্রহরা বসানো যায় না। বাইজিদ জানালার বাইরে তাকিয়ে শুধু বললেন,
“ওকে এখন কিছু বলো না।”
প্রহরী মাথা নত করল। কিন্তু বাইজিদের মনে একটা আশঙ্কা জন্ম নিল, ফাইয়াজকে ঘিরে শাখার এই দুর্বলতা যদি আবার সাহাবাদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে? তার উত্তর তিনি জানে না।
*******
দুপুরের আগে সাহাবাদের মহলের প্রধান ফটকে এসে হাজির হলো জান্নাত। সাহাবাদের হারিয়ে যাওয়া বড় শাহজাদী। মূহূর্তেই খবর অনৃদরে পৌছে গেল। সুনেহেরা খবরটি শুনেই আর এক মুহূর্ত অপেক্ষা করতে পারলেন না। দৌড়ে বেরিয়ে এলেন। তার পেছনে মেহেরুন্নেসা। প্রধান ফটকের সামনে এসে দুজনেই থমকে দাঁড়ালেন। একদম সাধারন পোষাকে এসেছে জান্নাত। মায়ের চোখে জল এসে গেল।
“জান্নাত…মা আমার….”
এর বেশি শব্দ বের হলো না মেহেরুন্নেসার মুখ থেকে। তিনি ছুটে গিয়ে মেয়েকে জড়িয়ে ধরলেন।
সুনেহেরাও আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না।
জান্নাত দুজনের মাঝখানে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখও ভিজে উঠল। এতদিনের দূরত্বের পর নিজের মানুষের এই স্পর্শ, কীভাবে সহ্য করবে সে? সুনেহেরার সাথে অবশ্য দেখা হয়েছে কয়েকবার। তবে তা প্রকাশ করা যাবে না। মেহেরুন্নেসা বারবার তার মুখে হাত বুলিয়ে দেখছিলেন।
“তুই কোথায় ছিলি মা? কেমন করে বেঁচে ছিলি? কত খুঁজেছি তোকে…”
জান্নাত মায়ের হাত চেপে ধরল।
“আম্মা…”
মেয়ের মুখে আম্মা ডাক শুনেই মেহেরুন্নেসার চোখের জল আরও বেড়ে গেল। সুনেহেরা তার মাথায় হাত রেখে বললেন,
“তুই ফিরে এসেছিস। এটাই যথেষ্ট।”
জান্নাত কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ধীরে ধীরে বলল,
“আমি তেমাের সাথে থাকতে ফিরে আসিনি, মণি মা ।”
দুজনেই তাকালেন। জান্নাতের চোখে এবার দৃঢ়তা।
“তোমার মনে আছে আম্মা? এতদিন অন্য রাজ্যের রাজা, মহারাজা, জমিদাররা বাবাকে কথা শুনিয়েছে। কারণ বাবার ছেলে নেই।”
মেহেরুন্নেসার চোখে আবেগ ফুটে উঠল। জান্নাত দৃঢ় স্বরে বলল,
“তারা প্রশ্ন করেছে ছেলে নেই, তাহলে রাজ্য শাসন করবে কে?”
মায়ের দিকে তাকাল।
“আমরা করে দেখাব আম্মা। আমরা তিন বোন ঢাল হয়ে সাহাবাদ রক্ষা করব।”
সুনেহেরা কিছু বলতে গিয়ে থেমে গেলেন। এখন কিছু বলা ঠিক হবে না। কিছুক্ষণ পর জান্নাত শান্ত স্বরে বলল,
“তবে আমি এখন একটা কাজ করতে চাই।”
মেহেরুন্নেসা জিজ্ঞেস করলেন,
“কী?”
জান্নাত উত্তর দিল,
“আমি শুধু মুয়াজের সঙ্গে দেখা করতে চাই।”
কথাটা শুনে সুনেহেরা ও মেহেরুন্নেসা দুজনেই একে অপরের দিকে তাকালেন। জান্নাতের মুখে তখন কোনো কঠোরতা নেই। খুবই সাধারণ ভাবে বলল কথাটা।
“আমি মূলত এজন্যই এসেছি। আমাকে আবার ফিরে যেতে হবে আম্মা।”
মেহেরুন্নেসা রাগে আরও কেঁদে ফেললেন
“না কোত্থাও যাবি না তুই। আমি আর যেতে দিব না তোকে। গোল্লায় যাক সব। আমার মেয়েরা আমার বুকে থাকবে”
জান্নাত মাকে জড়িয়ে ধরল এসে। কিছুটা অভিনয় করে বলল
“ভুলে যাবেন না বেগম। আমরা সম্রাজ্ঞী মেহেরুন্নেসা নূর এর কন্যা। আমরা লেজ গুটিয়ে ঘরে থাকতে জানি না। আমরা অপ শক্তিকে প্রতিহত করতে জানি। এটা আমাদের আম্মার শিক্ষা”
মেহেরুন্নেসা আর সুনেহেরা দুজনেই হেসে ফেলল। জান্নাতকে ঘরে গেল তারা। জান্নাত শাখার খোঁজ করল মহলে ঢুকেই। প্রহরী রা জানালো বাগান বাড়ির দিকে গেছে।
*****
সন্ধ্যার পর সাহাবাদের মহলে আবারও উৎসবের আবহ তৈরি হলো। প্রধান ফটক দিয়ে একসঙ্গে কয়েকটি অশ্বারোহী দল প্রবেশ করল। তাদের মাঝখানে মেহরাব। আজ শুধু আমিরাবাদের যুবরাজ হয়ে আসেনি, আজ সাহাবাদের মহলে এসেছে জামাই হয়ে। বাইজিদ শাহ নিজে প্রধান সিঁড়ি পর্যন্ত এগিয়ে গেলেন। মেহরাব ঘোড়া থেকে নামতেই বাইজিদ তাকে কাছে টেনে নিলেন।
“এসো, বাবা।”
মেহরাব বিনয়ের সঙ্গে মাথা নত করল।
“বাবা! এত আয়োজন কিসের জন্য”
বাইজিদ হেসে তার কাঁধে হাত রাখলেন।
“আজ প্রথম বার তুমি আমার জামাই হয়ে এসেছ।”
মেহরাবও মৃদু হাসল।
“আপনার আদর থেকে পালানোর উপায় আছে?”
“একদম নেই।”
কথাটা শুনে আশপাশের কয়েকজন হেসে উঠল।
সাহারা একটু দূরে দাঁড়িয়ে সব দেখছিল। তার মুখে বহুদিন পর স্বস্তির ছাপ। মেহরাবের আগমন যেন মহলের ভারী পরিবেশটাকেও কিছুটা হালকা করে দিল। কিন্তু সাহারার আসার উদ্দেশ্য কেবল কুশল বিনিময় নয়। আজ রাতেই তাদের অন্য একটি কাজ আছে। রাত গভীর হলো। মহলের একের পর এক আলো নিভে গেল। প্রহরীদের পায়ের শব্দ কমে আসে। সবাই যখন ঘুমে ডুবে, তখন সাহাবাদের তিন রাজকন্যা নিজেদের কক্ষ থেকে বের হলো। জান্নাত সামনে। তার পাশে শাখা। আর একটু পেছনে সাহারা। তিনজনের কারও পরনে একরঙা পোষাক। গাঢ় চাদরে নিজেদের আড়াল করে তারা মহলের পেছনের গোপন পথ দিয়ে বেরিয়ে গেল উত্তরের জঙ্গলে।
চাঁদ মেঘের আড়ালে। গাছের ডালপালার ফাঁক দিয়ে সামান্য আলো মাটিতে পড়ছে। কোথাও শুকনো পাতার মচমচ শব্দ, কোথাও রাতজাগা পাখির ডাক। শাখা নিচু স্বরে বলল,
“আর কতদূর?”
জান্নাত উত্তর দিল,
“আর বেশি নয়।”
সাহারা চারপাশে তাকাল।
“আচ্ছা তোরা ঠিক পথে যাচ্ছিস তো?”
জান্নাত থামল।
“বাবার কাছ থেকে ছোটবেলায় একটা কথা শুনেছিলাম। জায়গা শুধু কথায় মনে রাখা যায় না। তাই তো আমি ইয়ামিনকে দিয়ে আঁকিয়ে নিয়ে এসেছি”
সামনের অন্ধকারের দিকে তাকাল। আর কয়েক পা এগোতেই তারা শুনতে পেল জলের শব্দ। জঙ্গলের বুক চিরে একটি সরু নদী বয়ে যাচ্ছে।
তিনজন নদীর পাড়ে এসে দাঁড়াল। চাঁদের আলোয় নদীটাকে মনে হচ্ছিল কালো রুপালি ফিতের মতো। নদীর একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে বিশাল এক বটগাছ। শিকড় মাটির অনেকটা গভীরে নেমে গেছে। কয়েকটি ঝুরি নেমে এসে আবার কাণ্ডের সঙ্গে মিশে গেছে। গাছটার বয়স যেন এই জঙ্গলেরই সমান। জান্নাত ধীরে ধীরে গাছটির কাছে গেল। কাণ্ডের এক পাশে হাত রাখল। তারপর একটি নির্দিষ্ট কোটরের সামনে এসে কিছু খুজতে লাগল। শাখা নিঃশ্বাস আটকে তাকিয়ে আছে
“এখানে?”
জান্নাত মাথা নাড়ল। তিনজন মিলে কোটরের ভেতরের শুকনো পাতা সরাতে লাগল। কাঠের মতো কিছুতে হাত লাগল। তারপর ধাতুর মত চব্দ হলো টং! করে। জান্নাত হাত ঢুকিয়ে আরও কিছু শুকনো মাটি সরাল। অবশেষে দেখা গেল একটি বিশাল পিতলের সিন্দুক। পুরোনো, ভারী, সময়ের ছাপ তার গায়ে স্পষ্ট। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে তালাটি এখনও অক্ষত। শাখা ফিসফিস করে বলল,
“এত বছর ধরে এটা এখানে ছিল?”
জান্নাত বলল,
“হ্যাঁ।”
“এর ভেতরে কী?”
জান্নাত কিছুক্ষণ সিন্দুকটির দিকে তাকিয়ে রইল।
“সাহাবাদের ইতিহাস। যা দীর্ঘদিন ধরে কারাগারে বসে লিপিবদ্ধ করেছেন সাহাবাদের অপরাজেয় সাহসী একজন নারী যোদ্ধা, ‘উম্মে মিরান’।
সাহারা কাছে এল। জান্নাতের চোখ এবার গম্ভীর হয়ে উঠল। সে তালার ওপর হাত রাখল।
“বাকের শাহ্ ক্ষমতায় বসার পর থেকে আজ পর্যন্ত যা কিছু ঘটেছে। আর যেসব রহস্যের উত্তর আমরা এতদিন খুঁজে পাইনি সেগুলোর অনেক কিছুর সূত্রও এখানে আছে।”
শাখা স্তব্ধ হয়ে সিন্দুকটির দিকে তাকিয়ে রইল।
সাহারা ধীরে বলল,
“তাহলে এতদিন ধরে আমাদের চোখের সামনে থেকেও…”
“কেউ জানত না,”
তারা তিনজন মিলে সিন্দুকটি কোটর থেকে বের করল। নদীর পাড়ের একটি সমতল পাথরের ওপর সেটি রাখা হলো। জান্নাত তালার দিকে তাকাল। ঢাকনা টা সরাতেই পাওয়া গেল বিভিন্ন পুস্তক, নথি। সাহারা দুজনের হাত ধরল। তিন বোন পাশাপাশি দাঁড়াল। চারপাশে অন্ধকার জঙ্গল। পায়ের নিচে ঠান্ডা মাটি। পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে সরু নদী। মাথার ওপর শতবর্ষী বটগাছ।
জান্নাত প্রথমে বলল,
“আমরা প্রতিজ্ঞা করি, সাহাবাদকে রক্ষা করব।”
শাখা বলল,
“যে অপশক্তিই আসুক, তাকে প্রতিহত করব।”
সাহারা বলল,
“শুধু সাহাবাদ নয়।”
জান্নাত তাদের হাত আরও শক্ত করে ধরল।
“পাহাড়, মরু আর আমিরাবাদ এই তিন ভূখণ্ডকেও আমরা রক্ষা করব। মানুষের জন্য। আমাদের পূর্বপুরুষদের জন্য। আর ভবিষ্যতের জন্য। প্রজাদের জন্য। সাহাবাদ আমাদের জন্মভূমি। আমাদের প্রাণ। আমাদের মাটি। এই মাটি আমরা রক্ষা করব। প্রত্যেকটা শত্রুর র’ক্ত দিয়ে আমরা সাহাবাদ এর মুকুট গড়ব। আর তার নাম হবে ‘র’ক্তমুকুট’।
তিন বোন একসঙ্গে উচ্চারণ করল
“অপশক্তির হাত থেকে আমরা তিন ভূখণ্ডকে রক্ষা করব।”
কথাটা শেষ হতেই জঙ্গলে তাদের পিছনে হঠাৎ অদ্ভুত একটা শব্দ হলো। যেন পাথর গড়িয়প পড়ল। তিনজনই ঘুরে তাকাল। মনে হলো গাছের আড়ালে যেন কেউ দাঁড়িয়ে ছিল।