ফন্ট সাইজ:
থিম:
রক্তমুকুট

49

লেখক: জান্নাতুল ফেরদৌস

দিন কেটে গেল আরও কয়েকটা। সাহাবাদের মহল ধীরে ধীরে আবার আগের ছন্দে ফিরতে শুরু করল। সবকিছু যেন স্বাভাবিক। শুধু শাখা আর আগের মতো নেই। তবে সে চেষ্টা করছিল, নিজেকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা। ফাইয়াজের সঙ্গে সেই রাতের দেখা হওয়ার পর কয়েকদিন আর কারাগারের দিকে যায়নি সে। বাইজিদের নির্দেশও অমান্য করেনি। বরং ইচ্ছা করেই নিজেকে রাজ্যের কাজে ব্যস্ত রেখেছে। সৈন্যদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছে নিয়ম করে। নিজেও প্রশিক্ষণ প্রাঙ্গণে সম দিচ্ছে। সুনেহেরার সঙ্গে রাজ্যের নানা বিষয়ে কথাও বলছে। হাসারও চেষ্টা করছে আগের মত।

কিন্তু একা হলেই সেই লোহার শিকের ওপারে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটার চোখ দুটো মনে পড়ে যায়। তখন বুকের ভেতরটা আবার ভারী হয়ে আসে।

বাইজিদ প্রতিনিয়ত চোখ রাখছে শাখার ওপর।

শাখা স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করছে, এটা তিনি বুঝতেন। কিন্তু তার অভিজ্ঞতা বলছিল, কিছু কিছু বিষ মুখ বন্ধ করে রাখলে ন্যায় মরে যায়।

ভেতরে ভেতরে আরও ছড়িয়ে পড়ে। সন্ধ্যায় দরবার শেষ হওয়ার পর বাইজিদ একা নিজের কক্ষে বসেছিলেন। সামনে কয়েকটি নথি খোলা।

কিন্তু তার মন সেগুলোর মধ্যে নেই। তিনি ধীরে জানালার দিকে তাকালেন। শাখা আর ফাইয়াজ দুজনের মধ্যে যে সম্পর্ক তৈরি হয়েছে, সেটা তিনি অস্বীকার করতে পারেন না। আর জোর করে আলাদা করে রাখলে? হয়তো একদিন এর বিস্ফোরণ আরও ভয়ংকর হবে। বাইজিদ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

“এভাবে ধামাচাপা দিয়ে রাখলে বিষটা আরও বড় হবে।”

তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন আগামীকাল শাখাকে ডেকে কথা বলবেন। রাগ করে নয়, বাবা হিসেবে তাকে বোঝাবেন। ফাইয়াজ কে, কী করেছে, আর তার চারপাশে কী বিপদ তৈরি হয়েছে। শাখা যথেষ্ট বুঝদার মেয়ে। আশা রাখা যায় সে বুঝবে। বাইজিদ সর্বোচ্চ চেষ্টা করবে শাখাকে বোঝানোর।

****

মহলের অধিকাংশ প্রদীপ নিভে গেছে। প্রহরীরা নিজেদের নির্দিষ্ট জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। প্রধান অন্দরমহলের পথ দিয়ে শাখা বেরিয়ে এল।

তার পোশাক সাধারণ, মাথায় চাদর। দুই-একজন প্রহরী তাকে দেখে সরে দাঁড়াল। একজন বিস্মিত হয়ে বলল,

“ক্ষমা করবেন শাহজাদী, এত রাতে কোথায় যাচ্ছেন?”

শাখা থামল না। শুধু বলল,

“কারাগারে।”

প্রহরী হতভম্ব।

“কিন্তু জমিদার সাহেব…..”

শাখা এবার থামল। কঠিন চোখে তাকাল তাদের দিকে। প্রহরীরা একে অপরের দিকে তাকাল। কেউ তাকে আটকানোর সাহস পেল না। শাখা সবার চোখের সামনে দিয়েই হাঁটল। দীর্ঘ পাথরের করিডোর পেরিয়ে। প্রধান ফটক পেরিয়ে কারাগারের দিকে। তার পায়ের শব্দ যেন রাতের নীরবতার মধ্যে একেকটা ঘোষণা হয়ে বাজছিল।

কারাগারের ভেতরে তখন ফাইয়াজ একা। আগের মতোই দেয়ালে হেলান দিয়ে বসে আছে। তার চোখ বন্ধ। মনে অস্থিরতা। সে জানে না বাইরে কী হচ্ছে। জানে না শাখা কেমন আছে। জানে না বাইজিদ তার বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। হঠাৎ করিডোরে পায়ের শব্দ। ফাইয়াজ চোখ খুলল। শব্দটা ধীরে ধীরে কাছে আসছে। তারপর থেমে গেল তার কক্ষের সামনে। ফাইয়াজ তাকাল। শাখা এসেছে। আজ আর গোপনে নয়। সবার সামনে দিয়ে এসে দাঁড়িয়েছে। ফাইয়াজ উঠে দাঁড়াল। কিছুক্ষণ দুজনের চোখে চোখ। তারপর ফাইয়াজ নিচু স্বরে বলল,

“তুমি আবার এসেছো?”

শাখা শিকের কাছে এসে দাঁড়াল।

“হ্যাঁ।”

“কেন?”

“আপনার সঙ্গে কথা বলতে।”

ফাইয়াজ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। শাখা ধীরে বলল,

“কি সিদ্ধান্তঃ নিলেন? আমার প্রস্তাবে রাজি?”

ফাইয়াজ ফিচেল হাসলো। না সুচক মাথা নাড়ল। শাখা বিরক্ত হয়ে রাগে লোহার শিক খাবলে ধরল। ফাইয়াজ আরও একটু এগিয়ে এসে বলল

“যেতে পারি। শুধু সাহাবাদ কেন? দুনিয়া ছেড়ে যেতেও রাজি। শর্ত একটাই, তোমাকেও আমার সঙ্গে যেতে হবে”

শাখা আশ্চর্য হলো ফাইয়াজের কথায়। সাথে বিরক্তও। তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলল

“আপনি ভাবলেন কি করে? আপনার মত একজন ডাকাতের সাথে আমি আমার পরিবার পরিজন রাজ্য ফেলে রেখে যাব। আমি আমার আপনজনদের ছেড়ে আপনার কাছে যাব?”

“আপনজন?”

ফাইয়াজের কথায় চোখ সরু করে তাকায় শাখা। ফাইয়াজ দুই হাতে শিক ধরে মাথা ঠেকায় শিকের সাথে

“শুনেন শাহজাদী, আপনার বাবা এই পরিবারের জমিদারের নায়েব ছিলেন। আপনার মা-ও এই পরিবারের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিলেন। তাদের সন্তান আপনি। আপনি ভাবলেন কি করে এরা আপনার আপনজন? এরা কেবলই আপনাকে ব্যবহার করছে”

শাখার মুখ শক্ত হয়ে গেল। ফাইয়াজ আরও শিকের কাছে এগিয়ে এল।

“আপনি ভাবছেন আপনি এই পরিবারের একজন। কিন্তু চিরন্তন সত্য এটাই যে আপনি এদের কেউ নন।”

শাখার চোখে বিস্ময়।

“আপনাকে ওরা ব্যবহার করছে, শুধু ব্যবহার। আপনার সাহস আছে। আপনার আনুগত্য আছে। আপনি এই রাজ্যের জন্য নিজের জীবন পর্যন্ত দিতে পারেন। আর ওরা ঠিক সেটাই চায়।”

শাখা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ফাইয়াজ বলল,

“আপনাকে সামনে রেখে ওরা নিজেদের রাজ্য বাঁচাবে। আপনার অনুভূতি, আপনার বিশ্বাস সবকিছু ব্যবহার করবে। দিন শেষে দেখবেন আপনার বলতে কিচ্ছু নেই শাহজাদী”

শাখার চোখে এবার রাগের সঙ্গে দ্বিধাও ফুটে উঠল।

“আপনি এসব কেন বলছেন?”

ফাইয়াজ কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর শান্ত স্বরে বলল,

“কারণ আমি চাই না তুমি এমন একটা পরিবারের জন্য নিজেকে শেষ করে দাও। আরে তোমার মায়ের চাইতে বড় বিশ্বাসঘাতক এরা। তোমার মা তো নাসিরাবাদের ভালোর জন্যই এদের হত্যা করতে চেয়েছিল”

শাখা ক্রোধ জিদ নিয়ে বলল

“তাহলে সাহাবাদের ভালোর জন্য আমিও আপনাক হত্যা করতে চাই”

ফাইয়াজ বিরক্তির ন্যায় দীর্ঘশ্বাস ফেলল

“এত সাহাবাদ এর নাম জপ করো না। তুমি চন্দ্রপ্রভার কন্যা। নাসিরাবাদ এর একমাত্র উত্তরাধিকারী।”

শাখা বজ্রকন্ঠে বলল

“আমি নেওয়াজে আবিদের কন্যা। সাহাবাদ এর রক্ষাকারী। আমার পিতা এই রাজ্যের আনুগত্য করেছে, এই রাজ্যের জন্য জীবন দিয়েছে। প্রয়োজনে আমিও তাই দিব”

আর কোনো কথা না বলে বেড়িয়ে এলো শাখা। রাগে ঘৃণায় তার শরীর রি রি করছে।

***

শাখা কারাগারে গিয়েছিল, এই খবরটা শেষ পর্যন্ত বাইজিদ শাহের কানে পৌঁছাল। খবরটা শুনে তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে বসে রইলেন। তিনি জানতেন, ফাইয়াজের সঙ্গে শাখার সম্পর্কটা নিছক আবেগের নয়। মেয়েটা নিজের চোখে দেখেছে ফাইয়াজকে ডাকাত হিসেবে। তারপরও তাকে কারাগারে দেখতে গেছে। এর অর্থ একটাই, ফাইয়াজকে নিয়ে শাখার মনে বিরাট আশা তৈরি হয়েছে। এটা নিষেধ করে থামানো যাবে না।

পরদিন সকালে বাইজিদ শাহ সভাকক্ষে বসার নির্দেশ দিলেন। সেখানে রাজ্যের সবাইকে ডাকা হয়নি। ছিলেন শুধু কয়েকজন ঘনিষ্ঠ মানুষ। ঘরের চারপাশে প্রহরীরা দাঁড়িয়ে। মাঝখানে রাখা বড় কাঠের টেবিলের এক পাশে বসেছেন বাইজিদ শাহ। তাঁর মুখটা গম্ভীর। কিছুক্ষণ পর দরজা খুলে শাখাকে ভেতরে আনা হলো। তারপর আনা হলো ফাইয়াজকে। ফাইয়াজের হাতে কোনো শিকল ছিল না। কিন্তু তার মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছিল, সে বুঝতে পারছে না তাকে কেন এখানে আনা হয়েছে।

শাখা কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে রইল। ফাইয়াজ একবার তার দিকে তাকাল। শাখার চোখেও তখন অস্থিরতা। বাইজিদ শাহ দুজনের দিকে তাকিয়ে ধীর গলায় বললেন,

“ফাইয়াজ, তোমাকে আমি ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”

কথাটা শুনেই ফাইয়াজ বুঝে ফেলেছে। এখানে কোনো উদ্দেশ্য আছে

“আমাকে…? ছেড়ে দেবেন?”

“হ্যাঁ। তবে একটা শর্ত আছে।”

ফাইয়াজ চুপ করে তাকিয়ে রইল।

“তোমাকে সাহাবাদ ছেড়ে চলে যেতে হবে”

কথাটা শুনে ফাইয়াজের মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। সে সঙ্গে সঙ্গে শাখার দিকে তাকাল। শাখা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু তার চোখে স্পষ্ট ভয়ের রেখা। ফাইয়াজ কয়েক মুহূর্ত কোনো কথা বলতে পারল না। তারপর বাইজিদের সামনে এক পা এগিয়ে এসে বলল,

“আমি সাহাবাদ ছেড়ে কোথায় যাব?”

বাইজিদ কোনো উত্তর দিলেন না। ফাইয়াজ কাঁপা কাঁপা গলায় বলল,

“আমি জানি আমি ভুল করেছি। আমি জানি আমার অতীত ভালো না। আমি ডাকাত ছিলাম। অনেক অন্যায় করেছি। কিন্তু...কিন্তু এখন আমি শাখাকে ছেড়ে যেতে পারব না”

শাখার চোখে পানি জমে উঠল। ফাইয়াজ আবার বলল,

“আপনি আমাকে শাস্তি দিন। আমাকে যা করতে বলেন আমি করব। কিন্তু আমাকে সাহাবাদ থেকে বের করে দেবেন না।”

বাইজিদ কঠিন মুখে তাকিয়ে রইলেন।

“তোমার জন্য এই রাজ্যে আর কোনো জায়গা নেই।”

ফাইয়াজ মাথা নিচু করে ফেলল। কিছুক্ষণ পর সে বলল,

“শাখা ছাড়া আমারও আর কোনো জায়গা নেই।”

শাখা আর চোখের পানি ধরে রাখতে পারল না। মুখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিল, যেন কেউ তার চোখের পানি দেখতে না পায়। ফাইয়াজ সেটা দেখে আরও ভেঙে পড়ল।

“শাখা...তুমি বলো না ওনাকে। আমি সব ছেড়ে দিয়ে তোমায় নিয়ে বাঁচবো। আমার কেউ নেই দুনিয়ায়। ছোট থেকে খাবারের জন্য সংগ্রাম ঋেকে শুরু করে টিকে থাকার জন্য কত কি না করেছি। এমন আপন জন ছিল না আমার মুখে এক লোকমা খাবার তুলে দেবে। বড় অনাদরে বড় হয়েছি আমি শাখা। এই প্রথম তোমাকে পেয়ছি নিজের বলতে। তুমি ওনাকে বলো না, আমাকে যেন তুমি হারা না করে”

শাখা কোনো উত্তর দিল না। ফাইয়াজ আবার বাইজিদের দিকে তাকাল।

“আমি ওকে নিয়ে কোথাও যাব না। আপনার অনুমতি ছাড়া কিছু করব না। শুধু আমাকে একটা সুযোগ দিন। আমি বদলে যেতে চাই।”

বাইজিদ শাহ এবার কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন।

তারপর তাঁর চোখ একবার শাখার দিকে গেল।

তিনি বুঝতে পারছিলেন, ফাইয়াজকে সাহাবাদ থেকে বের করে দিলেই সমস্যার সমাধান হবে না। সে হয়তো আবার ফিরে আসবে। আর শাখার মনও তখন আরও অস্থির হয়ে উঠবে। কিন্তু যৌবনকালে সেও এক নারীর প্রেমে পড়েছিল। যে তার বর্তমান স্ত্রী। এই প্রেমিক সত্ত্বা বড্ড বেহায়া। সেদিক থেকে ভাবলে ফাইয়াজ সেই পাগলামি টাই করছে। তাই তিনি মনে মনে যে পরিকল্পনা করেছিলেন, সেটাই এবার সামনে আনলেন। গম্ভীর গলায় বললেন,

“ঠিক আছে।”

ফাইয়াজ মাথা তুলল। বাইজিদ বললেন,

“তোমাকে সাহাবাদ থেকে যেতে হবে না।”

শাখাও অবাক হয়ে মামার দিকে তাকাল। ফাইয়াজের চোখে আবার আশার আলো ফুটে উঠল।

“তাহলে...?”

“তবে ডাকাতির জীবন তোমাকে পুরোপুরি ছাড়তে হবে।”

“আমি পারব”

“সৎ পথে উপার্জন করতে হবে। পারবে?”

“হ্যা হ্যা করব আমি। পারব পারব”

“নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে,আর নিজের জন্য একটা ঘর বানাতে হবে।”

ফাইয়াজের চোখ স্থির হয়ে গেল। বাইজিদ সরাসরি শাখার দিকে তাকিয়ে বললেন,

“তুমি যদি সত্যিই সৎ পথে ফিরে আসতে পারো, নিজের উপার্জনে একটা ঘর বানাতে পারো, তাহলে আমি শাখাকে তোমার সঙ্গে বিয়ে দিতে রাজি।”

ঘরের ভেতর কয়েক মুহূর্ত সম্পূর্ণ নীরবতা নেমে এলো। শাখা বিস্ময়ে মামার দিকে তাকিয়ে রইল।

সে যেন কথাটা বিশ্বাস করতে পারছিল না। ফাইয়াজও কিছুক্ষণ কোনো কথা বলল না।

তারপর ধীরে ধীরে বাইজিদের সামনে মাথা নত করল। কান্নাজড়িত কন্ঠে বলল

“আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ জমিদার সাহেব। আমার ভালোবাসা ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য”

বাইজিদ বললেন,

“উহু, আগে সবটা করে দেখাও।

ফাইয়াজ মাথা তুলে একবার শাখার দিকে তাকাল। শাখার গাল বেয়ে তখন নীরবে পানি গড়িয়ে পড়ছে। ফাইয়াজ কিছু বলল না। শুধু চোখে একটা প্রতিশ্রুতি নিয়ে সভাকক্ষ থেকে বেরিয়ে গেল।

****

পরদিন থেকেই ফাইয়াজ কাজ খুঁজতে বের হলো।

সাহাবাদের নগরের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ঘুরল সে। কোথাও দোকানে লোক লাগবে কি না জিজ্ঞেস করল। কেউ তাকে কাজ দিল না।

একজন দোকানদার তাকে চিনে ফেলতেই মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দিল।

“তুমি তো ফাইয়াজ! ডাকাতদের সর্দার! আমার দোকানে তোমার মতো লোককে কাজ দিতে পারব না। চলে যাও।”

ফাইয়াজ আর কিছু বলল না। সেখান থেকে চলে গেল। পরদিন গ্রামের দিকে গেল। এক কৃষকের কাছে গিয়ে বলল,

“আমার কাজ দরকার। জমিতে কাজ করতে পারি। যা বলবেন করব।”

কৃষক কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,

“অ্যাই তুমি ফাইয়াজ না?”

ফাইয়াজ মাথা নিচু করল।

“হ্যাঁ।”

“তোমাকে বাপু আমি কাজে রাখতে পারব না।”

“কেন?”

“কেন মানে? তুমি ডাকাত ছিলে। রাতে যদি আমার ঘরেই ঢুকে পড়ো?”

ফাইয়াজ মাথা নিচু করে চলে এলো সেখান থেকে। এভাবে একের পর এক জায়গায় গেল সে। কেউ তাকে রাখল না। কেউ বিশ্বাস করল না তার অতীত এর জন্য। বিকেলের দিকে ফাইয়াজ নগরের বাইরে একটা পুরোনো গাছের নিচে বসে পড়ল। সারাদিনে সে কিছু খায়নি। তার সামনে দিয়ে মানুষজন যাতায়াত করছে। কেউ তাকে চিনে পাশ কাটিয়ে যাচ্ছে, কেউ ফিসফিস করে এটা ওটা বলছে। ফাইয়াজ নিজের দুই হাতের দিকে তাকিয়ে রইল। এই হাত দিয়েই সে একসময় অস্ত্র ধরেছে। এই হাত দিয়েই অন্যায়ের পথে হেঁটেছে। কত অনৈতিক লাজ করেছে। তখন মানুষ তাকে ভয় পেত। আজ সেই হাত দিয়েই সে সৎভাবে কাজ করতে চায়। কিন্তু কেউ তাকে সুযোগ দিতে রাজি নয়।

বাইজিদের কথা তার কানে বারবার বাজতে লাগল।

‘সৎ পথে উপার্জন করো।’

সে পারছে না। কিন্তু শাখাকে ছেড়ে দেওয়ার কথাও ভাবতে পারছে না। সূর্য ডুবে যাওয়ার পর ফাইয়াজ উঠে দাঁড়াল। তারপর আবার সাহাবাদ মহলের দিকে হাঁটতে শুরু করল।

রাত হয়ে গেছে। মহলের প্রধান ফটকের কাছে প্রহরীরা দাঁড়িয়ে ছিল। ফাইয়াজকে আসতে দেখে তারা সতর্ক হয়ে গেল। ফাইয়াজ কারও সঙ্গে কথা না বলে সরাসরি বাইজিদ শাহের কাছে যাওয়ার অনুমতি চাইল। কিছুক্ষণ পর তাকে সভাকক্ষে ডাকা হলো। বাইজিদ তখন একাই বসেছিলেন।

ফাইয়াজ ভেতরে ঢুকেই মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। বাইজিদ তাকিয়ে বললেন,

“কী হলো?”

ফাইয়াজ কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ধীরে বলল,

“কাজ পাইনি।”

বাইজিদ চুপ করে রইলেন।

“নগরে গেছি। গ্রামেও গেছি। সবাই আমাকে চেনে। সবাই জানে আমি কে ছিলাম। কেউ কাজ দিতে চায় না।”

তার গলা ভারী হয়ে এলো।

“আমি জানি আমার অতীতের জন্যই এমন হচ্ছে। আমি কাউকে দোষ দিচ্ছি না।”

বাইজিদ এবার বললেন,

“তাহলে আর কি? চলে যাও সাহাবাদ ছেড়ে। অন্যত্র গিয়ে আবার সমাজের যুবক দের টেনে নিয়ে ডাকাত দল বানাও।”

ফাইয়াজ মাথা তুলে তাকাল। চোখ দুটো লাল হয়ে আছে।

“আমাকে তাড়িয়ে দেবেন না। আমি শাখাকে ছাড়া থাকতে পারব না”

বাইজিদ চুপ করে রইলেন। ফাইয়াজ এবার আরও নিচু গলায় বলল,

“আমি এই মহলেই কাজ করব। যে কাজ দেবেন করব। ঘোড়া দেখাশোনা করব, ওদের সাথক পাহারা দেব, যা বলবেন তাই করব। কিছুই আমার কাছে ছোট না”

সে এক পা এগিয়ে এলো।

“আমাকে প্রহরী করে রাখুন।”

বাইজিদ তাকিয়ে রইলেন। ফাইয়াজ বলল,

“আমি অস্ত্র চালাতে জানি। মহল পাহারা দিতে পারব। আপনার লোকদের সঙ্গে থাকব। আপনার চোখের সামনে থাকব। শুধু... আমাকে সাহাবাদ আর শাখার জীবন থেকে তাড়াবেন না।”

তার গলা কাপছে

“শাখাকে ছেড়ে আমি কোথাও যেতে পারব না।”

বাইজিদ কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইলেন।

তারপর ধীরে ধীরে বললেন,

“ঠিক আছে।”

ফাইয়াজ যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারল না।

“আমি তোমাকে মহলের প্রহরী হিসেবে রাখছি।”

ফাইয়াজ সঙ্গে সঙ্গে মাথা নত করল।

“ধন্যবাদ, ধন্যবাদ জনাব”

বাইজিদ আর কিছু বললেন না। ফাইয়াজকে মহলের প্রহরী বানানো শুধু তাকে কাজ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নয়। এবার তাকে নিজের চোখের সামনে রাখা যাবে। তারপর দেখা যাবে ডাকাত ফাইয়াজ সত্যিই বদলেছে, নাকি শাখার জন্য বদলে যাওয়ার অভিনয় করছে। মহলের অন্য প্রান্তে, জানালার আড়ালে দাঁড়িয়ে শাখা সবকিছু দেখছিল। কথা শোনা না গেলেও তাদের অঙ্গভঙ্গি দেখে আচ করতে পারছিল কিছুটা।

ফাইয়াজ প্রহরীর পোশাকে মহলের উঠানে দাঁড়াতেই শাখার সঙ্গে তার চোখাচোখি হলো। দুজনের কেউ কিছু বলল না। শাখার চোখ আবার ভিজে উঠল। ফাইয়াজ শুধু দূর থেকে মাথা নত করল। শাখাও চোখের পানি মুছে নিল। সরে গেল জানালার আড়াল থেকে। প্রহরী রা ফাইয়াজকে অবাক চোখে দেখছে। এই কি তবে প্রেম? ক্ষমতাধর ডাকাত সর্দার ও জমিদার মহলে গোলামী করছে প্রেয়সীর জন্য। বাইজিদ শাহ্ এদিকে আসতেই প্রহরীরা যে যার কাজে মন দিল। ফাইয়াজ বর্শা হাতে ফটকের সামনে দাঁড়িয়ে। বাইজিদ ইশারা করল বাগানের দিকে আসতে। গেল ফাইয়াজ। বেঞ্চে বসলো বাইজিদ, ফাইয়াজকেও পাশে বসার নির্দেশ দিল। ফাইয়াজ বসল না। জমিদারের পাশে বসা প্রহরীর জন্য বেমানান। সে সবুজ ঘাসের ওপর বসল।

বাইজিদ মনোযোগ দিয়ে তাকে দেখে বলল

“আচ্ছা বলোতো। তুমি এই পথে আসলে কি করে? ভালো কিছুও তো করতে পারতে। গোমার পরিবার নেই? তাদলর কথা ভাবোনি কখনও?”

ফাইয়াজ মুচকি হাসলো। দুঃখেও মানুষ হাসে যে, সেই হাসি। বলতে লাগলো

“আমার আব্বা ছিল বড় একজন বণিক। আম্মাও ছিল ভালো ঘরের মাইয়া। আমার বয়স যখন নয় বছর। আম্মারে বাবা মাইরা ফেলল।”

বাইজিদ এর ভ্রু কুঞ্চিত হয়ে আসে।

“কেন মারল?”

“আমাদের বাড়ির কামের লোকের সাথে আব্বার সম্পর্ক হইছিল। আম্মা সেটা জেনে বুঝেও চুপ করে থাকত। কিন্তু দিনকে দিন তাদলর বেহায়াপনা বাড়ল। মা সহ্য করতে না পেরে প্রতিবাদ করত। প্রতিবারই মাইর খাইত আব্বার হাতে। একদি মেরেই ফেলল। তারপর বিয়ে করল সেই কামের বেডি রে। ওই মহিলা আমাকে রোজ মারত। খাওন দিত না। বহুবার গরম লোহার সেঁক

দিছে গায়ে। আমার একটা ছোট বোন ছিল। চার বছরের। ওরে সেই কামের বেডির ভাই বেইজ্জতি করে মারল।”

বাইজিদ চোখ খিঁচে বন্ধ করে নিলো। মুখ বিকৃত হয়ে আসে। ফাইয়াজের চোখ থেকে দুই ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ল

“মজার ব্যাপার হলো আব্বা কোনো বিচার করল না। সেই রাতে কি জেদ জন্ম দিলো। আব্বা, তার বউ আর সেই বউ এর ভাই, তিন জনকেই শ্যাস কইরা দিলাম। ছাড়লাম বাড়ি। পথ ঘাট ঘুরতে ঘুরতে এসে পড়লাম আমিরাবাদ। জঙ্গলে এক লোক আমারে ধরে নিয়ে গেল আচমকা। তাদের ডেরায় যাওয়ার পর বুঝলাম ওরা ডাকাত। তখন আমার বয়স দশ। চার-পাঁচ জনের সাথে হাতাহাতি করে আহত করছিলাম। সর্দার আমারে ম্যালা পছন্দ করল। বড় হলাম তার কাছেই। ফারিস আলী থেকে হয়ে গেলাম ফাইয়াজ আবরার।”

ফাইয়াজ দীর্ঘশ্বাস ফেলল

“ওরা আমারে কুকুর এর মতন বড় করছে। ছিনতাই করে আনতে না পারলে মারত। খাবার দিত না। ব্যাথায় উঠতে পারতাম না। এম্নেই হয়ে উঠলাম অমানুষ। তবে শাখা যখন থেকে জীবনে আসলো। ক্যান জানি আমি মানুষ মানুষ অনুভব করতাম নিজেরে। মায়া কাজ করত ওর ওপর। আস্তে আস্তে তা এই নরপশুর মনে বাসা বেঁধে বসলো। এখন আমি যেকোনো মূল্যে শাখাকে চাই। শাখা আমাকে যতই ভালোবাসুক, তা এই রাজ্যের ভাললবাসার কাছে কিছুই না। তাই আমিই থেকে…….”

কথার মধ্যে খেয়াল করল দুজন লোক মহলের চূড়া থেকে তীর তাক করেছে বাইজিদলর দিকে।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে 49 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন