ফন্ট সাইজ:
থিম:
রক্তমুকুট

50

লেখক: জান্নাতুল ফেরদৌস

ফাইয়াজের সামনে দিয়ে একটা তীর ছুটে এসে বাইজিদের পাশের মাটিতে গেঁথে গেল। বাইজিদ আতকে ওঠে। পরের মুহূর্তেই চারদিক থেকে একসঙ্গে কয়েকটি তীর ছুটে এলো।

“জমিদার সাহেব!”

ফাইয়াজ চিৎকার করে উঠল। দৌড়ে এসে বাইজিদের সামনে দাঁড়িয়ে নিজের অস্ত্র তুলে একের পর এক তীর ঠেকাতে লাগল। একটা তীর তার খুব কাছ দিয়ে চলে গেল। আরেকটা ঢাল দিয়ে সামনে ঠেকিয়ে সুরক্ষা নিশ্চিত করল। ফাইয়াজ চিৎকার করে বলল,

“জমিদার সাহেব, নিচু হন!”

বাইজিদ সঙ্গে সঙ্গে নিচু হয়ে গেলেন। ফাইয়াজ চারপাশে তাকিয়ে দেখল, তীরগুলো আসছে মহলের মিনারের দিক থেকে। উঁচু মিনারের ওপর কয়েকজন মুখোশধারী দাঁড়িয়ে আছে। তারা আবার ধনুক তুলল। ফাইয়াজ সঙ্গে সঙ্গে একটা ঢালের আড়ালে বাইজিদকে নিয়ে গেল।

“ওদের থামান! মিনারে লোক আছে!”

প্রহরীরা দৌড়ে ছুটে গেল। ফাইয়াজও তাদের পেছনে যেতে উদ্যত হলো। আরও একটি তীর ছুটে এলো। ফাইয়াজ ঘুরে দাঁড়িয়ে সেটাও ঠেকিয়ে দিল। কিছুক্ষণ পর মিনারের ওপর থাকা মুখোশধারীরা পালিয়ে গেল। বাগানের চারপাশে প্রহরীরা ছড়িয়ে পড়ল। ফাইয়াজ দ্রুত বাইজিদের কাছে এসে বলল,

“আপনি ঠিক আছেন?”

বাইজিদ নিজের পোশাকটা একবার দেখে নিলেন। তারপর ফাইয়াজের দিকে তাকালেন।

মুখে কোনো ভয় নেই। বরং ঠোঁটের কোণে হালকা একটা হাসি। ফাইয়াজ অবাক হয়ে বলল,

“আ..আপনি ঠিক আছেন?”

বাইজিদ কোনো উত্তর দিলেন না। শুধু বললেন,

“সাবাশ! তুমি তোমার দায়িত্ব ঠিক ভাবেই পালন করছো।”

তারপর সেখান থেকে চলে গেলেন। ফাইয়াজ কিছুক্ষণ তাঁর চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল।

তার মনে প্রশ্ন জাগল। কিন্তু সে জানে না, এই পুরো ঘটনাটাই ছিল বাইজিদের পরিকল্পনা। নিজের কক্ষে ফিরে দরজা বন্ধ করলেন বাইজিদ শাহ। তাঁর মুখের সেই গম্ভীর ভাবটা বদলে গেল।

তিনি মৃদু হেসে বললেন,

“এ তো সবে শুরু, প্রতি পদে পদে তোমার পরীক্ষা নেওয়া হবে সর্দার। যে ভুলটা চন্দ্রার ক্ষেত্রে করেছিলাম সেটা তোমার ক্ষেত্রে করতে পারব না”

বাইজিদ জানতেন, ফাইয়াজকে মহলে জায়গা দেওয়া এত সহজ হবে না। একজন সাবেক ডাকাত সর্দার। যে একসময় নিজের লোক নিয়ে সাহাবাদের বিরুদ্ধে গুটিচাল করে গেছে। আজ সে হঠাৎ প্রহরীর পোশাক পরে মহল পাহারা দিচ্ছে। বাইজিদ কীভাবে তাকে এত সহজে বিশ্বাস করবেন? সে চাইলে যে কোনো মুহূর্তে মহলের বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলতে পারে। আজকের ঘটনাটা ছিল শুধু প্রথম পরীক্ষা। তিনি দেখতে চেয়েছিলেন, বিপদ সামনে এলে ফাইয়াজ কী করে। সে নিজের প্রাণের কথা ভাবে, নাকি দায়িত্বের? বাইজিদ জানতেন উত্তরটা তিনি পেয়েছেন। ফাইয়াজ তাঁকে বাঁচিয়েছে। কিন্তু তাতেই পরীক্ষা শেষ নয়। আসল পরীক্ষা তো এখন শুরু। বাইজিদ জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ালেন। মনে পড়ে গেল বহু পুরোনো একটা ঘটনা। চন্দ্রপ্রভা। তিনি তাকে নিজের বোনের মতোই দেখেছিলেন। তবুও সেই মানুষই একসময় এই মহলের ভেতরে থেকে ঘাতকতা করেছিল।

বাইজিদ বললেন,

“রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও বিশ্বাস করা যায়। আবার আপনজন হয়েও বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারে।”

তারপর কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন,

“তাহলে একজন ডাকাত সর্দারকে কীভাবে এত সহজে বিশ্বাস করি?”

বাইজিদের ঠোঁটে আবার মৃদু হাসি ফুটল।

“না, ফাইয়াজ। তোমাকে আরও পরীক্ষা দিতে হবে।”

বাইরে প্রহরীদের পায়ের শব্দ শোনা যাচ্ছে। সেই প্রহরীদের একজন হয়ে ফাইয়াজ দাঁড়িয়ে আছে মহলেরই দরজার সামনে।

****

পাহাড়ি বাড়িটা পুরোপুরি ঘুমিয়ে আছে। বাইরে হাড় কাঁপানো শীত। জানালার ফাঁক দিয়ে ঠান্ডা বাতাস ঢুকে ঘরের পর্দাটা মাঝে মাঝে নড়ে উঠছে। জান্নাত ঘুমিয়ে ছিল। হঠাৎ দূর থেকে কেমন এক বাঁশির সুর ভেসে এলো। প্রথমে খুব ক্ষীণ। জান্নাত ঘুমের মধ্যেই একটু নড়েচড়ে উঠল।

আবার সেই সুর। এবার আগের চেয়ে পরিষ্কার। জান্নাত ধীরে ধীরে চোখ খুলল। কিছুক্ষণ ছাদের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর উঠে বসল। ঘরের ভেতর অন্ধকার। পাশে রাখা ছোট প্রদীপটার আলো প্রায় নিভে এসেছে। বাঁশির সুরটা আবার শোনা গেল। জান্নাত বিছানা থেকে নামল। কেন উঠছে, কোথায় যাবে এসব যেন তার মাথায় নেই।

দরজাটা খুলে সে বাইরে বেরিয়ে গেল। বাড়ির বাইরে পা রাখতেই ঠান্ডায় তার শরীর কেঁপে উঠল। চারপাশে ঘন কুয়াশা। পাহাড়ের গাছগুলো অন্ধকারে আরও বড় আর ভয়ংকর দেখাচ্ছে।

বাঁশির সুরটা এবার জঙ্গলের দিক থেকে আসছে।

জান্নাত সেদিকেই হাঁটতে শুরু করল। পায়ের নিচে শুকনো পাতা মচমচ করে শব্দ করছে। কখনো পাথরে পা পড়ছে। কখনো ভেজা মাটিতে পা ডুবে যাচ্ছে। কিন্তু জান্নাত থামছে না। জঙ্গলের ভেতর যত এগোতে লাগল, ইয়ামিনদের বাড়ির আলো তত দূরে চলে গেল। একসময় পেছনে তাকালে আর গ্রামের কোনো আলো দেখা গেল না। শুধু কালো গাছ আর কুয়াশা। সামনে আবার বাঁশির সুর। জান্নাত সেই সুরের পেছনে হাঁটতেই থাকল। অনেকটা পথ পেরিয়ে হঠাৎ গাছপালা একটু ফাঁকা হয়ে গেল। সামনে একটা পুরনো বাড়ি দেখা গেল। বাড়িটা অনেক বছর ধরে পরিত্যক্ত বলে মনে হচ্ছে। দেয়ালের আস্তর উঠে গেছে। কোথাও ইট বেরিয়ে আছে। ছাদের এক পাশ ভাঙা। উঠানের চারপাশে আগাছা জন্মে আছে। তবুও বাড়িটার ভেতরে আলো জ্বলছে। জান্নাত থেমে গেল। বাঁশির সুরও থেমে গেল।

চারপাশে শুধু বাতাসের শব্দ। বাড়ির ভেতর থেকে খুব আস্তে একটা শব্দ এলো। কেউ যেন কথা বলছে। জান্নাত বাড়িটার দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। দরজাটা একটু খোলা। ভেতর থেকে হলুদ আলো বাইরে পড়ছে। জান্নাত দরজার ফাঁক দিয়ে ভেতরে তাকাল। ঘরের মেঝেতে কয়েকজন তান্ত্রিক বসে আছে। সবার সামনে ধূপ জ্বলছে।

ঘরের মাঝখানে একটা ছোট আগুন জ্বলছে। তান্ত্রিকদের কয়েকজনের গায়ে কালো কাপড়। কারও গলায় মালা। সবাই চুপচাপ বসে আছে।

আর তাদের মাঝখানে রাখা বাঁশিটা। জান্নাত দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে রইল। ভেতরের একজন। মাথা তুলে দরজার দিকে তাকাল।

তার চোখ সরাসরি গিয়ে পড়ল জান্নাতের ওপর।

শয়তানের মত বিচ্ছিরি ভাবে হাসলো সে। জান্নাত ঘরে ঢুকে গেল।

বেশ কিছুক্ষণ পেরিয়ে গেল। পুরনো বাড়িটার ভেতর থেকে আর কোনো শব্দ পাওয়া গেল না।

না বাঁশির সুর। না তান্ত্রিকদের ফিসফিসানি কোনো মন্ত্রের শব্দ। পুরো বাড়িটা হঠাৎ যেন নিস্তব্ধ হয়ে গেল। আচমকা কড়রর… শব্দে পুরনো কাঠের দরজাটা খুলে গেল। জান্নাত বেরিয়ে এলো। হাঁটার মধ্যে কোনো তাড়াহুড়ো নেই। ধীরে ধীরে পা ফেলছে। পরনের কাপড়ের বিভিন্ন জায়গায় রক্তের দাগ লেগে আছে। কয়েক গোছা চুল মুখের সামনে এসে পড়েছে। কিন্তু তার মুখে কোনো আতঙ্ক নেই। অদ্ভুত এক শান্ত ভাব।

যেন সে অনেকক্ষণ ঘুমিয়ে উঠে বাইরে এসেছে।

জান্নাত একবারও পেছনে তাকাল না। পুরনো বাড়িটার দরজা তার পেছনে খোলা রয়ে গেল।

ভেতরের ঘরগুলো অন্ধকার। মাটিতে পড়ে থাকা জিনিসপত্র, উল্টে যাওয়া প্রদীপ আর ছড়িয়ে থাকা তান্ত্রিকদের সামগ্রীগুলো আর তাদের বিক্ষত লা'শ দূর থেকেই দেখা যাচ্ছে। জান্নাত সেদিকে তাকালও না। সে জঙ্গলের সরু পথ ধরে হাঁটতে শুরু করল।

*****

রাত তখন শেষের দিকে। আকাশের কালো রং একটু একটু করে হালকা হচ্ছে। জঙ্গলের ভেতর এখনো আলো ঢোকেনি। ঘন কুয়াশায় কয়েক হাত দূরের গাছও ঠিকমতো দেখা যাচ্ছে না। জান্নাত ধীরে ধীরে হাঁটছে। তার পায়ের নিচে শুকনো পাতাগুলো মচমচ করে উঠছে। কখনো কোনো ডাল তার কাপড়ে আটকে যাচ্ছে। সে হাত দিয়ে সরিয়ে আবার হাঁটছে।একটা পাথরে পা পিছলে গেল। সে সামলে নিল নিজেকে। তারপর আবার হাঁটা শুরু করল। কিছুক্ষণ পর দূর থেকে পানির শব্দ ভেসে আসে। ঝর্ণা আছে সামনেই। জান্নাত সেই শব্দের দিকে এগিয়ে গেল। ঝর্ণার কাছে পৌঁছাতেই ঠান্ডা বাতাস তার ভেজা মুখে এসে লাগল। পাথরের ওপর দিয়ে স্বচ্ছ পানি নেমে আসছে। চারপাশে কুয়াশা জমে আছে। এত শীত যে নিঃশ্বাস ছাড়লেই সাদা ধোঁয়ার মতো বের হচ্ছে। জান্নাত ঝর্ণার সামনে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ পানির দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর ধীরে ধীরে পানিতে নামল। ঠান্ডা পানিতে পা দিতেই তার শরীর কেঁপে উঠল। তবুও সে থামল না। একটু একটু করে পুরো শরীর পানিতে ভিজিয়ে নিল। তার কাপড়ে লেগে থাকা রক্তের দাগ পানির সঙ্গে ধুয়ে যেতে লাগল। ঝর্ণার স্রোত সেই পানি পাহাড়ের নিচে নিয়ে যাচ্ছে। জান্নাত নিজের হাতের দিকে তাকাল। তার হাতেও রক্তের দাগ ছিল। সে হাত দুটো পানির নিচে রাখল। বারবার ঘষে ধুয়ে ফেলল। তারপর মুখে পানি দিল। চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। তার মুখে তখনও কোনো ভয় নেই। কোনো অনুশোচনা নেই। শুধু একটা অদ্ভুত শূন্যতা। দূরে একটা পাখি ডাক শোনা যায়। জান্নাত চোখ খুলল।

আকাশের দিকে তাকাল। ভোর হয়ে আসছে। পাহাড়ের ওপরে কালো আকাশের নিচে হালকা নীলচে আলো ফুটতে শুরু করেছে। সে ঝর্ণা থেকে উঠে এলো। ভেজা কাপড় শরীরে লেগে আছে। ভেজা চুল পিঠ বেয়ে নেমে এসেছে। এত ঠান্ডার মধ্যেও সে কোনো তাড়াহুড়ো করল না। পাথরের ওপর দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ নিজের কাপড় ঠিক করল। তারপর আবার বাড়ির পথ ধরল।

---

ফেরার পথটা আগের চেয়ে অনেক শান্ত। জঙ্গলের অন্ধকার ধীরে ধীরে কমে আসছে। গাছের পাতায় জমে থাকা শিশির টুপটুপ করে নিচে পড়ছে। জান্নাত একা হাঁটছে। তার ভেজা চুল থেকে পানি ঝরছে। পায়ের নিচে ভেজা মাটি। দূরে ইয়ামিনদের বাড়িটা দেখা গেল। ছোট্ট কাঠ আর পাথরের সেই বাড়ি। জান্নাত চুপচাপ দরজার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। ভেতরে সবাই এখনো ঘুমিয়ে।

সে খুব আস্তে দরজা খুলল। কাঠের দরজা সামান্য শব্দ করতেই জান্নাত থেমে গেল। নাহহ কেউ জাগেনি। নিজের ঘরে গিয়ে ভেজা কাপড় বদলে ফেলল। চুল থেকে তখনও পানি পড়ছে। জান্নাত বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ল। চোখ বন্ধ করে ঘুমানোর চেষ্টা করছে। বিষয়টা ইয়ামিনকে জদনাবে সময় করে। বাইরে তখন ভোরের আলো ফুটে উঠছে। পাহাড়ের গায়ে সূর্যের আলো পড়ছে। কিছুক্ষণ পর ইয়ামিনের দাদি ঘুম থেকে উঠবে। ইয়ামিনও উঠবে। তারা ভাববে, জান্নাত সারা রাত নিজের ঘরেই ঘুমিয়েছে। সবকিছু মনে আছে, কিন্তু কিছুই বলবে না।

পরদিন সারাদিন সাহাবাদে মোটামুটি শান্তই ছিল। সন্ধ্যা নামার পর থেকে রোজকার মত প্রহরীরা টহল দিতেও বেরোলো। রাত প্রায় দ্বিতীয় প্রহরে। এমন সময় নগরের দিক থেকে হঠাৎ চিৎকারের শব্দ ভেসে এলো।

“বাঁচাও! বাঁচাও”

“ডাকাত! ডাকাত!”

একটার পর একটা চিৎকার হাহাকার ভেসে আসছে লোকালয় থেকে। মহলের ভেতর থাকা সবাই থমকে গেল। শাখা তখন নিজের কক্ষে ছিল। শব্দগুলো কানে যেতেই সে দরজা খুলে দ্রুত বাইরে বেরিয়ে এলো। তার মুখ এমনিতেই কয়েকদিন ধরে ভার হয়ে ছিল। ফাইয়াজকে নিয়ে মামার সিদ্ধান্ত, ফাইয়াজের প্রহরীর কাজ নেওয়া সবকিছু নিয়েই তার ভেতরে রাগ আর অভিমান জমে ছিল।

তার ওপর এখন নগরে ডাকাতের হামলা। শাখা সোজা অস্ত্রাগারের দিকে গেল। একজন প্রহরী তাকে দেখে বলল,

“শাহজাদী, আপনি কোথায় যাচ্ছেন?

শাখা ঘোড়ার লাগাম হাতে নিয়ে বলল,

“নগরে।”

“কিন্তু….”

“আমার সঙ্গে কয়েকজন ঘোড়সওয়ার আসবে। বাকিরা মহল পাহারা দেবে।”

তার রাগান্বিত রুপ দেখে প্রহরী আর কিছু বলল না। শাখা অস্ত্র তুলে নিল। কোমরে তরবারি বাঁধল। তারপর ঘোড়ায় উঠে বসতেই কয়েকজন সৈন্য তার পেছনে এসে দাঁড়াল। তাদের হুংকার দিয়ে বলল

“চলো!”

ঘোড়ার খুরের শব্দে মহলের ফটক কেঁপে উঠল। শাখা দ্রুত নগরের দিকে ছুটে গেল। নগরে পৌঁছে সে দেখল, কয়েক জায়গায় দোকানের দরজা বন্ধ। মানুষজন ঘর থেকে বেরিয়ে আতঙ্কে এদিক-ওদিক ছুটছে। কয়েকজন ডাকাত ঘোড়ায় চড়ে নগরের রাস্তা দিয়ে পালাচ্ছে। শাখা তাদের দেখেই চিৎকার করল,

“ওদের পিছু নাও!”

ঘোড়াগুলো আরও দ্রুত ছুটল। ডাকাতরা বুঝতে পারল, পেছনে সৈন্য এসেছে। তারা নগর ছেড়ে বাইরের পথ ধরে ছুটতে শুরু করল। শাখা তাদের পিছু ছাড়ল না। একসময় নগরের লোকালয় পেরিয়ে গেল ছুটতে ছুটতে। সামনে শুধু খোলা জমি। জমি অংশও পেরিয়ে গেল। মাটি রং বদলাচ্ছে। আমিরাবাদ এর মরুভূমির সীমানা শুরু হলো। ঘোড়ার খুরে বালি উড়ছে। সামনের ডাকাতদের ঘোড়াগুলো দূরে ছোট ছোট বিন্দুর মতো দেখা যাচ্ছে। একজন সৈন্য বলল,

“শাহজাদী, আর এগোনো ঠিক হবে না। এখন গভীর রাত। সামনে ওদের বড় দল থাকতে পারে।”

শাখা কঠিন গলায় বলল,

“ওরা ফের সাহাবাদের মানুষের ঘরে ঢুকে হামলা করেছে। আজ কাউকে ছাড়ব না।”

শাখা আরও জোরে ঘোড়াকে ছুটিয়ে দিল। অনেকটা পথ যাওয়ার পর ডাকাতরা অবশেষে থামল। তারা বুঝে গেছে, আর পালিয়ে লাভ নেই।

শাখা ঘোড়া থামিয়ে তাদের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।

তার সঙ্গে থাকা সৈন্যরাও চারদিক ঘিরে ফেলল।

ডাকাতদের একজন অস্ত্র তুলে চিৎকার করল,

“এ কি রে? এ তো নারী। এক নারীর ভয়ে আমরা ছুটছিলাম। ছি ছি ছি। ইজ্জত আর রইলো না”

শাখা ঘোড়া থেকে নামল। তরবারি বের করল।

“তাহলে এসো, লড়াই করো।”

ডাকাতরা একসঙ্গে এগিয়ে এলো। শাখা সামনে থাকা প্রথম লোকটির আঘাত ঠেকিয়ে তাকে সরিয়ে দিল। আরেকজন তার দিকে এগিয়ে এলে শাখা দ্রুত সরে গিয়ে পাল্টা আঘাত করল। তার চোখে আগুনের মত রাগ। ফাইয়াজের কথা মনে পড়ছে। তারা ভাবত সআ সময় তার দলই এ রাজ্যে লুটপাট চালিয়েছে। কিনৃতু আজ তার ভুল ভাঙল। গত কয়েকদিনের সব অভিমান যেন এই মুহূর্তে তার ভেতর জমে থাকা আগুন হয়ে উঠেছে।

একসময় তার সৈন্যরা বাকি ডাকাতদেরও পরাস্ত করল। মরুভূমির বালির ওপর আবার নীরবতা নেমে এলো। শাখা ধপ করে বালির ওপর বসে তার বুক দ্রুত ওঠানামা করছে। হাতে ধরা তরবারিটাও নিচে নামল। একজন সৈন্য এগিয়ে এসে বলল,

“শাহজাদী, সবাই শেষ।”

শাখা কোনো উত্তর দিল না। আকাশের দিকে তাকাল। রাত অনেকটা নেমে গেছে। তারপর ঘোড়ায় উঠে বলল,

“মহলে ফিরে চলো।”

ফেরার সময় শাখা একটাও কথা বলল না। ভলর হয়ে গেছে ফিরতে ফিরতে। মহলের ফটক দিয়ে ঢোকার সময়ও তার মুখ গম্ভীর। ঘোড়া থেকে নেমে সে সোজা ভেতরে চলে গেল। চোখে তখনও রাগ। কিন্তু সেই রাগের আসল কারণ ডাকাতরা ছিল না। ডাকাতদের ওপর সে শুধু সেই রাগটা ঢেলে দিয়েছে। কারণ তার ভেতরে জমে থাকা অভিমানটা এখনো অন্য একজনকে ঘিরেই।

ফাইয়াজ মহলের ফটকে দাড়িয়ে প্রহরীর দায়িত্ব পালন করছে। শাখা র'ক্তাক্ত শরীরে বড় বড় পা ফেলে মহলে ঢুকল। পিছনে কতগুলো সৈন্য। ফাইয়াজ চিন্তিত হয় তার আঘাত লেগেছে কিনা। কিন্তু ডাকতে পারে না। যতই প্রেমিকা হোক সে, নিজে তো একজন প্রহরী। সকলের সামনে ডাকলে শাখা লজ্জিত হতে পারে।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে 50 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন