ফন্ট সাইজ:
থিম:
রক্তমুকুট

51

লেখক: জান্নাতুল ফেরদৌস

আমিরাবাদ মহলে ইংরেজ ব্যবসায়ীরা আজ সম্রাট হারুণ ওয়াসেমের সঙ্গে দেখা করতে আসবে। সাহারা সকাল থেকেই সবকিছু ঠিক করে রেখেছিল। আজ সে মেহরাবের সামনে তার বাবার আসল রূপটা তুলে ধরবে। এতদিন ধরে যে মানুষটাকে মেহরাব যোগ্য শাসক আর ভালো বাবা হিসেবে দেখে এসেছে, তার আড়ালে লুকিয়ে থাকা অন্য মানুষটাকে আজ নিজের চোখে দেখাবে সাহারা। গোপন বৈঠকখানার ভেতর সব প্রস্তুত। ঘরের একপাশে ভারী পর্দা ঝুলছে। সেই পর্দার আড়ালেই লুকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে মেহরাব আর সাহারা। মেহরাব এর মন সায় দিচ্ছে না। কিন্তু সাহারার কথাও ফেলে দেওয়ার মত না।

“কি করছি আমরা বলো তো সারা। বাচ্চাদের মতো”

সাহারা মাথা নাড়ল।

“আজ আপনি নিজের কানেই শুনবেন। তাহলেই তো হয়ে যায়। আরেকটু ধৈর্য ধরে দাড়ান দয়া করে”

মেহরাব আর কিছু বলল না। কিছুক্ষণ পর দরজার বাইরে পায়ের শব্দ শোনা গেল। সম্রাট হারুণ ওয়াসেম প্রবেশ করলেন। তার কিছুক্ষণ পর একে একে কয়েকজন ইংরেজ ব্যবসায়ী ঘরে ঢুকল। হারুণ তাদের বসতে বললেন। সাহারা পর্দার আড়াল থেকে সবকিছু দেখছিল। তার বুকের ভেতর ধুকপুক করছে। আজ যদি পাহাড়ি অঞ্চলের গাছগাছড়া লুটের বিষয়টা উঠে আসে, তাহলে মেহরাব নিজের কানেই শুনবে।

হারুণ ওয়াসেম চেয়ারে বসে ইংরেজদের দিকে তাকালেন। একজন ইংরেজ ব্যবসায়ী কাগজ খুলে বলল,

“সম্রাট, পাহাড়ি অঞ্চলের….”

হারুণ ওয়াসেম আলতো হাত উচু করলেন। টেবিলের ওপর রাখা কলমটা হাতে তুলে নিয়ে খুব স্বাভাবিকভাবে ইংরেজ ব্যবসায়ীর দিকে তাকিয়ে সামান্য একটা ইশারা করলেন। ইংরেজ লোকটি মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। হারুণ শান্ত গলায় বললেন,

“সে বিষয়টা না হয় পরে হবে। আজ বরং ব্যবসার হিসাবটা আগে দেখা যাক।

ইংরেজ ব্যবসায়ী বুঝে গেল। সে সঙ্গে সঙ্গে কথার দিক বদলে ফেলল।

“অবশ্যই, সম্রাট। গতবার যে বাণিজ্যিক চুক্তির কথা হয়েছিল, সেটার কিছু পরিবর্তন নিয়ে আমরা আলোচনা করতে চাই।”

হারুণ মাথা নাড়লেন।

“বলুন।”

পর্দার আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা সাহারার মুখের ভাব বদলে গেল। সে মেহরাবের দিকে তাকাল। মেহরাবও মন দিয়ে কথা শুনছে। ইংরেজ ব্যবসায়ী বলল,

“এই বছর আমাদের পণ্য আমদানি আরও বাড়াতে চাই। বিশেষ করে কাপড়, ধাতু এবং অন্যান্য বাণিজ্যিক পণ্যের ক্ষেত্রে।”

হারুণ বললেন,

“আমিরাবাদের বন্দর ব্যবহার করতে পারেন। তবে করের বিষয়টা আগের মতো থাকবে।”

আরেকজন ইংরেজ বলল,

“কর কিছুটা কমানো গেলে আমাদের বাণিজ্য আরও বাড়বে।”

হারুণ হেসে বললেন,

“সেটা নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে।”

এরপর একের পর এক ব্যবসার হিসাব নিয়ে কথা হতে লাগল। কই কোনো পাহাড়ের কথা তো নেই।

কোনো গাছগাছড়ার কথা নেই। কোনো লুটের কথা নেই। কোনো গোপন পরিকল্পনার কথাও নেই। হারুণ খুব স্বাভাবিকভাবে সব আলোচনা চালিয়ে গেলেন। সাহারা পর্দার আড়াল থেকে দাঁড়িয়ে সব শুনছিল। তার মুখ ধীরে ধীরে কঠিন হয়ে উঠল। সে বুঝে গেল হারুণ টের পেয়েছে।

আর ইচ্ছা করেই সব কথা ঘুরিয়ে দিয়েছে। কিছুক্ষণ পর বৈঠক শেষ হলো। ইংরেজ ব্যবসায়ীরা উঠে দাঁড়াল। হারুণ তাদের বিদায় জানালেন। দরজা বন্ধ হওয়ার পর ঘরে নীরবতা নেমে এলো। কিছুক্ষণ পর সাহারা পর্দার আড়াল থেকে বেরিয়ে এল। মেহরাবও তার পেছনে বের হলো। মেহরাবের মুখে কোনো রাগ নেই। বরং তার চোখে সাহারার প্রতি অভিমান। সাহারা বলল,

“আপনি বুঝতে পারছেন না কী হয়েছে।”

মেহরাব শান্ত গলায় বলল,

“সারা! তুমি আমার বাবাকে যা ভাবছ, তিনি তা নন। তিনি একজন ন্যায়পরায়ণ শাসক। ছোট থেকে তাকে দেখে আসছি। আজকে তোমার কথায় বাবাকে সন্দেহ করে নিজেকে বড্ড বেশি অপরাধী লাগছে”

সাহারা অবাক হয়ে তাকাল।

“যুবরাজ….”

মেহরাব হাত তুলে সাহারাকে থামিয়ে দিল

“তুমি আমাকে এখানে নিয়ে এসেছিলে আমাকে নিজের বাবার আসল চেহারা দেখাবে বলে। দেখে নিয়েছি আমি। আশা করি তুমিও দেখেছো”

সে একটু থামল।

“যদিও দেখাতে চেয়েছিলে তার নোংরা রুপ। কিন্তু আমরা কী দেখলাম?”

সাহারা চুপ করে রইল । মেহরাব বলল,

“আমার বাবা পুরোটা সময় ইংরেজদের সঙ্গে ব্যবসার কথাই বললেন। কই কোথাও তো তোমার বলা সেই কথাগুলো তো উঠল না।”

সাহারা এবার বলল,

“আমার মনে হয় তিনি আমাদের উপস্থিতি বুঝে গিয়েছিলেন”

মেহরাব মাথা নাড়ল। এবার রাগ হচ্ছে বড্ড

“তুমি আবারও একই কথা বলছ সারা? তুমি সবকিছুর পেছনে আমার বাবার দোষ খুঁজে নিচ্ছ?”

সাহারা কিছু বলতে পারল না। মেহরাব দরজার দিকে এগিয়ে গেল। যাওয়ার আগে শুধু বলল,

“আমার বাবা এমন নন, সাহারা। তিনি বরাবরই একজন যোগ্য শাসক। ছিলেন, আছেন এবং থাকবেন”

দরজা খুলে সে বেরিয়ে গেল। সাহারা একা দাঁড়িয়ে রইল। হারুণ ওয়াসেম মাত্র কয়েক মুহূর্তের একটি ইশারায় পুরো বৈঠকের বিষয় বদলে দিয়েছে। মেহরাবকে কিছুই শুনতে দেয়নি।

আর সবচেয়ে বড় কথা আজও সে নিজের ছেলের চোখে যোগ্য শাসক হয়েই রয়ে গেল। সাহারা বেশ করে বুঝল এর সাথে লড়াই করা এত সহজ হবে না। বৈঠকখানার দরজা পেরিয়ে বের হওয়ার পরও সাহারার কানে মেহরাবের কথা গুলো বাজছিল। এখন তো ওকে বিশ্বাস করানো আরও কঠিন হবে। বুকের ভেতরটা আরও ভারী হয়ে উঠল। হাটতে লাগলো পিছনের সরু পথ ধরে।

আমিরাবাদ মহলের এই অংশটা দিনের বেলাতেও বেশ নির্জন। পুরোনো পাথরের দেয়ালগুলোতে জায়গায় জায়গায় শ্যাওলা জমে আছে। উঁচু খিলানওয়ালা জানালাগুলো দিয়ে বিকেলের আলো ঢুকছে, সেই আলোও অন্ধকার কাটাতে পারছে না। দূরে প্রহরীর পায়ের শব্দ শোনা যাচ্ছিল। সাহারা কারও সঙ্গে কথা বলল না।

মহলের পেছনের দরজা দিয়ে বেরিয়ে সে বাগানের দিকে চলে গেল। বাগান পেরিয়ে আরও দূরে তাকালেই দেখা যায় সেই পুরোনো মিনারটা।

আমিরাবাদের সবচেয়ে পুরোনো মিনারগুলোর একটি। অনেক বছর ধরে সেটার চূড়ায় কেউ খুব একটা যায় না। পাথরের গায়ে সময়ের দাগ, সিঁড়ির ধাপে ধুলো আর শুকনো পাতা জমে থাকে। মিনারের চারপাশে বড় বড় গাছ। সন্ধ্যার পর জায়গাটা এতটাই নির্জন হয়ে যায় যে দূর থেকে দেখলে মনে হয়, মহলের বাকি অংশের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্কই নেই। সাহারা সেদিকেই এগিয়ে গেল। মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হচ্ছে এই ভেবে যে সে ব্যর্থ হয়েছে। মেহরাবকে সত্যিটা দেখাতে পারেনি। যে মুহূর্তে ইংরেজ ব্যবসায়ী পাহাড়ের কথা তুলেছিল, ঠিক সেই মুহূর্তেই হারুণ সব বুঝে ফেলেছিলেন।

মিনারের কাছে পৌঁছে সে চারপাশে তাকাল। কেউ নেই। শীতের বাতাসে গাছের পাতার ঝড়ছে। দূরের জঙ্গল থেকে পাখির ডাক ভেসে আসছে। কোথাও একটা শুকনো ডাল ভেঙে পড়ার শব্দ হলো। সাহারা মিনারের ভেতরে ঢুকে সরু পাথরের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে লাগল। সিঁড়িগুলো ঘোরানো। একটার পর একটা। উপরে উঠতে উঠতেই জমিন ধীরে ধীরে আড়ালে চলে গেল। বাতাস তার ওড়না উড়িয়ে দিচ্ছে। গায়ে শীতবস্ত্র নেই। অবশেষে সে মিনারের চূড়ায় পৌঁছাল। সেখানে একটা ছোট পাথরের চত্বর। চারদিকে কোমরসমান দেয়াল। সাহারা গিয়ে সেই দেয়ালের পাশে বসে পড়ল। এই মিনার গুলোর ওপর দাঁড়িয়ে প্রহরীরা প্রাসাদের আশেপাশের এলাকা ওবদি নজর রাখে। অনেক উঁচু হওয়ায় বহু দূর ওবদি দেখা যায়। আমিরাবাদ মহলের ছাদগুলো নিচে ছোট ছোট মনে হচ্ছে। আর তারও বাইরে ঘন জঙ্গল। সাহারা অনেকক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে রইল। তার চোখে পানি জমে উঠল। পানি আর ধরে রাখতে পারল না। নীরবে কাঁদতে লাগল সে।

রাগে, অভিমানে, নিজের ওপর ক্ষোভে। সে চোখ মুছে ফিসফিস করে বলল,

“আমাকে কি আর ভালোবাসে সে? বিয়েটা তো নিছক আমার ছলনার। যদি ভালোবাসতে, তবে অবশ্যই বিশ্বাস করতো আমার কথা”

মেহরাবের মুখটা বড্ড মনে পড়ল। সাহারা আরও কষ্ট পেল।

“আপনি আমাকে বিশ্বাস করলেন না…?”

সে মুখটা দুই হাতের মধ্যে লুকিয়ে ফেলল। কিছুক্ষণ পর নিজেকে সামলে নিয়ে আবার নিচের দিকে তাকাল। সাহারা লক্ষ্য করলো ঘন গাছের আড়াল থেকে একজন মানুষ বেরিয়ে আসছে। প্রথমে শুধু ছায়াটা দেখা গেল। তারপর লোকটা একটু সামনে আসতেই সাহারা চিনতে পারল। আলীরাজ। সাহারা ভ্রু কুঁচকে তাকাল।

“মামা এই সন্ধ্যা বেলা জঙ্গলে কী করতে গেছিল?”

আলীরাজ একা। কিন্তু তার হাতে কিছু একটা রয়েছে। একটা ছোট ঘটি। আর ঘটিটা পুরোপুরি লাল কাপড়ে মোড়া। সাহারা অবাক হয়ে গেল।

আলীরাজ জঙ্গলের ভেতর থেকে কী নিয়ে আসছে? এই সময়? আর লাল কাপড়ে মোড়া ঘটিটাই বা কী? সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়াল। চোখের পানি তখনও শুকায়নি। কিন্তু কৌতূহল তার সব মন খারাপকে মুহূর্তের জন্য সরিয়ে দিল। দ্রুত মিনারের সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে শুরু করল। প্রায় দৌড়েই নিচে নামতে লাগল। মিনারের দরজা দিয়ে বেরিয়ে সে জঙ্গলের দিকের পথ ধরে এগিয়ে গেল। আলীরাজ তখনও অনেকটা দূরে।

সাহারা তাকে ডাকতে যাবে ঠিক তখনই সামনে একটা অবয়ব এসে দাঁড়াল। সাহারা থেমে গেল।

মেহরাব! কখন এখানে এসে দাঁড়িয়েছে, সাহারা বুঝতেই পারেনি। মেহরাব কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল। সাহারা বিরক্ত হয়ে বলল,

“আপনি এখানে?”

মেহরাব উত্তর দিল না। তার চোখে অপরাধবোধ আর অনুতাপ। সে ধীরে বলল,

“তোমার সঙ্গে একটু কথা ছিল।”

সাহারা পাশ কাটিয়ে যেতে চাইল। মেহরাব তার পথ আটকাল না। পিছন থেকে ডেকে বলল,

“আমি জানি তুমি আমার ওপর রাগ করে আছ।”

সাহারা দাড়িয়ে পড়ল

“আর তোমার রাগ করার কারণও আছে।”

মেহরাব সাহারার দিকে হাত বাড়িয়ে দিল।

“চলো।”

সাহারা তাকাল তার দিকে।

“কোথায়?”

“কক্ষে”

“কিন্তু…”

মেহরাব তার কথা শেষ করতে দিল না। সাহারার হাত ধরে নিজের কাছে টেনে নিল। ফর্সা গাল বেয়ে পড়া নোনাজলের দাগ দেখে বেশ বুঝল তার বন বিড়াল কান্না করেছে।

“সারা! আমি তোমাকে কাঁদাতে চাইনি”

সাহারার চোখ বেয়ে আবার একটা অশ্রুবিন্দু গড়িয়ে পড়ল। মেহরাব তার মাথায় হাত রাখল।

“কেঁদো না লক্ষীটি”

সাহারা আর কিছু বলল না। তার এতক্ষণকার রাগ, অভিমান আর কষ্টের মধ্যে স্বামীর এই অনুতপ্ত আচরণ একটা নরম জায়গা তৈরি করে দিল। মেহরাব তাকে সঙ্গে নিয়ে মহলের ভেতরের দিকে হাঁটতে শুরু করল। সাহারা কয়েকবার পেছনে তাকানোর চেষ্টা করল। মহলের বিশাল দরজা তাদের দুজনকে ভেতরে নিয়ে নিল।

******

পরদিন দুপুর থেকেই মেহরাবের শিকারের প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেল। আকাশে তখন রোদের তেজ কিছুটা কমেছে। মহলের পেছনের বিশাল অশ্বশালার সামনে কয়েকজন সৈনিক ঘোড়া প্রস্তুত করছিল। লাগাম পরীক্ষা করে তীর-ধনুক গুছিয়ে দিচ্ছে। মেহরাব নিজের কক্ষে পোশাক বদলে বেরিয়ে এল। কোমরে ছোট তলোয়ার। কাঁধে ধনুক ঝোলানো। সিঁড়ি দিয়ে নামতেই আলীরাজকে দেখা গেল। মেহরাব বলল,

“চলো”

“কোথায়?”

মেহরাব অবাক হয়ে তাকাল।

“শিকারে। আর কোথায়? বিয়ের পর যাওয়াই হয়নি”

আলীরাজ মাথা নাড়ল।

“আজ আমি যাব না”

মেহরাব থেমে গেল।

“ওমা, কী হলো তোমার?”

“কিছু হয়নি।”

“তাহলে যাবে না কেন?”

আলীরাজ মৃদু হেসে বলল,

“আজ মন চাইছে না।”

মেহরাব কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থাকল। আলীরাজ সাধারণত তার শিকারের সঙ্গী। বহুবার জঙ্গলে পাশাপাশি ঘোড়া ছুটিয়েছে তারা। বিপদে একে অন্যের পাশে থেকেছে। তাই আজ তার এই অস্বীকৃতি একটু অস্বাভাবিক লাগল। এমনি তে তো পিছু ছাড়ে না। অনুরোধ করলেও রেখে যাওয়া যায় না। তবু মেহরাব জোর করল না।

“ঠিক আছে। আমি একাই যাব।”

আলীরাজ মাথা নাড়ল।

“সাবধানে যাস”

মেহরাব ঘোড়ায় উঠে লাগাম টেনে ধরল।

“প্রেমে টেমে পড়লে নাকি?”

আলীরাজ একগাল হেসে বলল

“কঠিন প্রেমে পড়ছি মামা। খেতে বসে দেখি তোর মামি ডালের বাটিতে সাঁতার কাটতেছে”

দুজনেই হো হো করে হেসে উঠল। মেহরাব ঘোড়া ছুটিয়ে মহলের ফটক পেরিয়ে জঙ্গলের পথ ধরে চলে গেল। আলীরাজ অনেকক্ষণ তার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর নিজের কক্ষে ফিরে গেল।

*****

সন্ধ্যা নামার পর আমিরাবাদ মহলের চারপাশের দৃশ্য ভিন্ন রুপ ধারণ করে। দিনের কোলাহল থেমে গেছে। পাখিরা গাছের ডালে ফিরে গেছে। মহলের উঁচু মিনারগুলো অন্ধকারে আরও বিশাল দেখাচ্ছে। জঙ্গলের ওপর কুয়াশার পাতলা আস্তরণ নামতে শুরু করেছে। আলীরাজ একা বসে ছিল। হঠাৎ তার মনে হলো জঙ্গলে যেতে হবে। কেন যেতে হবে, সে নিজেও জানে না। শুধু মনে হচ্ছিল, কেউ যেন তাকে ডাকছে। একটা অদ্ভুত টানে সে উঠে দাঁড়াল। কাউকে কিছু না জানিয়েই মহলের পেছনের পথ দিয়ে জঙ্গলের দিকে চলে গেল। সূর্য তখন প্রায় ডুবে গেছে।

জঙ্গলের ভেতর ঢুকতেই চারপাশের আলো আরও কমে গেল। গাছের ডালপালা একে অপরের সঙ্গে মিশে মাথার ওপর অন্ধকার ছাউনি তৈরি করেছে। শুকনো পাতার ওপর আলীরাজের পায়ের শব্দ স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিল। কিছুদূর যাওয়ার পর সে থামল। সামনে একটা জলাশয়। জল একেবারে স্থির। চারপাশে কুয়াশা। জলাশয়ের ওপারে একটা বিশাল গাছ দাঁড়িয়ে আছে। সেই গাছের নিচে দাঁড়িয়ে আছে একজন নারী। মাথা থেকে মুখ পর্যন্ত লাল কাপড়ে ঢাকা।

লম্বা পোশাক বাতাসে সামান্য নড়ছে। কিন্তু নারীটি একদম স্থির। আলীরাজ সামনে এগিয়ে গেল। তার হাত অজান্তেই কোমরের তলোয়ারের দিকে চলে গেল।

“কে আপনি?”

কোনো উত্তর এল না। আলীরাজ আরও এক পা এগিয়ে গেল।

“আমি আপনাকে জিজ্ঞেস করছি, কে আপনি?”

এবার নারীটি ধীরে মাথা তুলল। কাপড়ের আড়াল থেকে শান্ত রিনরিনে মেয়েলী কন্ঠ ভেসে এলো

“আমি তারা”

আলীরাজ ভ্রু কুচকালো

“তারা?”

নারীটি বলল,

“ভালো নাম তারাময়ী”

আলীরাজ কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,

“আপনার মুখটা দেখা যাচ্ছে না। ঘোমটা আলীরাজ এবার একটু কাছে গেল।

“আপনি কি আমাকে ভয় পাচ্ছেন?”

তারাময়ী ধীরে মাথা নাড়ল।

“না”

“তাহলে ঘোমটা সরান”

তারাময়ী ঘেমটা তুলল। আলীরাজ ঢ়েন আটকে গেল সেই বদনে। ঘোরে ঢুকে গেল সাথে সাথে। তলোয়ার এর হাতল ঢিলে হয়ে এলো। তারাময়ী এগিয়ে এলো সামনে

“আলীরাজ…”

আলীরাজ কোনো উত্তর দিল না। তার চোখ তারাময়ীর চোখে আটকে। তারাময়ী তার পাঞ্জাবির বুকের অংশ মুঠো করে ধরল। আলীরাজ যেন বাধা দেওয়ার কথাটাও ভুলে গেছে। তারাময়ী ধীরে ধীরে তাকে পেছনের দিকে টানতে লাগল। টানতে টানতে নিয়ে এলো জলাশয়ের কিনারা পর্যন্ত। আলীরাজ তখনও নির্বাক। টানের সাথে হেঁটে আসছে। তারাময়ী তাকে জলাশয়ের পানির দিকে টেনে নিল। আলীরাজ ভারসাম্য হারিয়ে পানিতে পড়ে গেল।

চারপাশের স্থির পানি মুহূর্তে ছিটকে উঠল। সে হাত-পা ছুড়তে চেষ্টা করল। কিন্তু তারাময়ীর হাত তখনও তার পাঞ্জাবির বুকের কাপড় শক্ত করে ধরে আছে। আলীরাজের চোখে তখনও সেই ঘের। ঢ়েন সম্মোহিত করা হয়েছে তাকে। তারাময়ী তাকে পানির নিচে ঠেলে দিল। কয়েক মুহূর্ত পর শুধু জলাশয়ের ওপর কয়েকটা ঢেউ দেখা গেল।

তারাময়ী ধীরে ধীরে হাত ছেড়ে দিল। আলীরাজ পানির নিচে হারিয়ে গেল। তারাময়ী স্থির হয়ে জলাশয়ের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর খুব শান্তভাবে নিজের লাল ঘোমটা আবার মুখের ওপর টেনে দিল।

*****

ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই জঙ্গলের পাশের গ্রামটায় অস্বাভাবিক একটা গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ল। খবর মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল পুরো গ্রামে। জলাশয়ের ধারে একজন মানুষ পড়ে আছে। গ্রামের কয়েকজন লোক লাঠি হাতে জঙ্গলের জলাশয়ের দিকে এগিয়ে গেল। ভোরের কুয়াশা চারিদিকে ছেয়ে আছে। গাছের পাতায় জমে থাকা শিশির টুপটাপ করে নিচে পড়ছে।

জলাশয়ের কাছে পৌঁছাতেই সবাই থেমে গেল। কিনারায় পড়ে আছে একজন পুরুষ। তার পোশাক ভেজা। শরীরের কিছু অংশ কাদায় মাখা। মুখটা একদিকে ফিরিয়ে রাখা। কেউ তাকে চিনতে পারছিল না। কেউ কাছে গিয়ে শরীরে হাত দেওয়ার সাহস পাচ্ছে না। একজন বলল,

“দেখে তো মনে হচ্ছে মারা গেছে।”

সঙ্গে সঙ্গে আরেকজন তাকে থামিয়ে দিল।

“মারা গেছে কী করে বুঝলি?”

“নড়ছে না তো!”

“নড়ছে না মানেই মৃত? জ্ঞান ও তো হারাতে পারে”

হঠাৎ একজনের চোখ আটকে গেল লোকটির পোশাকের দিকে।

“একটু দাঁড়াও”

সবাই তার দিকে তাকাল। লোকটা আরও ভালো করে তাকিয়ে চিৎকার করে বলল,

“কি সব্বোনাশ। এ তো সম্রাটের শালাবাবু!”

মুহূর্তের মধ্যে চারপাশে ফিসফাস শুরু হয়ে গেল।

“আলীরাজ?”

“হ্যাঁ...হ্যাঁ আলীরাজ!”

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে 51 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন