ফন্ট সাইজ:
থিম:
রক্তমুকুট

52

লেখক: জান্নাতুল ফেরদৌস

ভোর হওয়ার আগেই আমিরাবাদ মহলে খবর পৌঁছে গেল, সম্রাটের শালাবাবু আলীরাজকে জঙ্গলের পাশের জলাশয়ের ধারে অচেতন অবস্থায় পাওয়া গেছে। খবরটা শোনার পর মহলে হুলস্থুল বেধে গেল। আয়েশা বেগম ভাই টর জন্য কেঁদেকুটে অস্থির। জীবিত নাকি মৃত, কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারছে না! সম্রাট হারুণ ওয়াসেম তখন নিজের কক্ষে ছিলেন। খবরটা নিয়ে একজন প্রহরী ছুটে এসে তাঁর সামনে দাঁড়াতেই তিনি উঠে দাঁড়ালেন।

“কী বললে? আলীরাজকে কোথায় পাওয়া গেছে?”

প্রহরী মাথা নিচু করে বলল,

“জাহাপনা, জঙ্গলের পাশের জলাশয়ের ধারে। গ্রামের লোকেরা প্রথমে দেখতে পায়। কেউ কাছে যাওয়ার সাহস পাচ্ছিল না। পরে আমাদের প্রহরীরা গিয়ে তাঁকে উদ্ধার করেছে।”

হারুণের মুখের রং বদলে গেল।

“এখন কোথায় সে?”

“মহলে আনা হচ্ছে, জাহাপনা।”

হারুণ আর একটি কথাও বললেন না। দ্রুত কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেলেন। মহলের ভেতরে তখন হুলস্থুল অবস্থা। প্রধান ফটক দিয়ে আলীরাজকে নিয়ে প্রবেশ করল কয়েকজন প্রহরী। তাঁর ভেজা পোশাক বদলে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হলো। শরীর থেকে কাদা পরিষ্কার করে তাঁকে দ্রুত চিকিৎসাকক্ষে নিয়ে যাওয়া হলো। মেহরাব তখনও শিকার থেকে ফেরেনি।

আলীরাজকে বিছানায় শুইয়ে পরীক্ষা করলেন মহলের অভিজ্ঞ হেকিম কবিরাজেরা। একজন তাঁর শ্বাস পরীক্ষা করলেন, আরেকজন নাড়ি দেখলেন। দীর্ঘ সময় ধরে পরীক্ষা করার পর তাঁরা জানালেন

“শ্বাস খুব দুর্বল। তবে একেবারে বন্ধ হয়ে যায়নি। এখনই যথাযথ চিকিৎসা শুরু করতে হবে।

হারুণ বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন।

“যেভাবেই হোক, ওকে বাঁচান। চিকিৎসায় যা প্রয়োজন, সব দেওয়া হবে। কিচ্ছুর যেন কমতি না থাকে”

প্রধান হেকিম মাথা নত করলেন।

“আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি, জাহাপনা।”

কক্ষের বাইরে একের পর এক মানুষ জমা হচ্ছে। যদিও উচ্চস্বরে কথা বলছে না। তবুও প্রহরীরা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে সবাইকে দূরে সরিয়ে রাখছে। কিছুক্ষণ পর শিকারের পোশাক পরা অবস্থাতেই মেহরাব মহলে ফিরে এল। ফটক পেরিয়ে ভেতরে ঢুকতেই সে অস্বাভাবিক নীরবতা লক্ষ করল। সাধারণত এই সময়ে মহলের উঠোনে লোকজনের ব্যস্ততা থাকে। পরিচারকেরা এদিক-ওদিক ছোটাছুটি করে, প্রহরীদের কণ্ঠ শোনা যায়। অথচ আজ সবাই যেন কোনো ভয়ংকর সংবাদ শোনার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে।

মেহরাব ঘোড়া থেকে নেমে একজন প্রহরীকে ডেকে বলল,

“কী হয়েছে? সবাই এমন চুপচাপ কেন?”

প্রহরী ইতস্তত করে উত্তর দিল,

“যুবরাজ, আপনার মামা আলীরাজকে জঙ্গলের পাশের জলাশয় থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। তিনি অচেতন।”

বিষ্ময়ে মেহরাবের মুখ কঠিন হয়ে গেল।

“কী বললে!”

সে আর কিছু না বলে চিকিৎসাকক্ষের দিকে ছুটল। ভেতরে ঢুকে বিছানায় আলীরাজকে পড়ে থাকতে দেখে তার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। আলীরাজের মুখ ফ্যাকাশে। চোখ বন্ধ। ঠোঁটের কোণে সামান্য নীলচে আভা। পাশে রাখা কাপড়গুলো ভেজা, মেঝের একপাশে তাঁর জুতা ও গায়ের শাল রাখা। মেহরাব বিছানার কাছে গিয়ে দাঁড়াল।

“আলীরাজ!”

কোনো উত্তর নেই। সে বন্ধুর কাঁধে হাত রাখল।

“এই, চোখ খোল। কী হয়েছে তোর? আলী? এই আলী? মামা চোখ খোল না”

আলীরাজ সারা দিচ্ছে না। মেহরাবের চোখে উদ্বেগ ফুটে উঠল।

“হেকিম সাহেব, ওর কী হয়েছে?”

প্রধান হেকিম বললেন,

“জলাশয়ের পানিতে দীর্ঘ সময় থাকার কারণে শরীর অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পড়েছে। আমরা চিকিৎসা করছি। তবে এখনই নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না।”

মেহরাব দাঁত চেপে বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে রইল।

হারুণও এসে ছেলের পাশে দাঁড়ালেন।

“নিজেকে সামলাও, মেহরাব। চিকিৎসকেরা চেষ্টা করছেন।”

মেহরাব বাবার দিকে তাকাল।

“কে ওকে এই অবস্থায় ফেলেছে, বাবা? আলীরাজ নিজে থেকে ওই জলাশয়ের ধারে কেন যাবে?”

হারুণ উত্তর দিতে পারলেন না। তাঁর নিজের মনেও একই প্রশ্ন ঘুরছিল। আলীরাজ সাধারণ প্রজা নয়। সে রাজপরিবারের ঘনিষ্ঠ, অস্ত্র চালাতে জানে, বিপদের পরিস্থিতি সামলাতে পারে। এমন একজন মানুষ কীভাবে রাতের অন্ধকারে জলাশয়ের ধারে অচেতন হয়ে পড়ে রইল?

আরও অদ্ভুত ব্যাপার আলীরাজ সেদিন মেহরাবের সঙ্গে শিকারে যায়নি। কেন যায়নি?

সে কি আগে থেকেই কোনো বিপদের আশঙ্কা করেছিল? নাকি অন্য কোনো কারণে জঙ্গলে গিয়েছিল? প্রশ্নগুলো একটার পর একটা মাথায় আসছিল মেহরাবের।

সকাল গড়িয়ে দুপুর হলো। মহলের চিকিৎসাকক্ষের বাইরে উদ্বিগ্ন মানুষের ভিড় কমল না। আয়েশা বেগম অন্দর থেকে ফের ছুটে এলেন। তিনি হারুণের পাশে দাঁড়িয়ে বারবার জানতে চাইলেন, আলীরাজের জ্ঞান ফিরেছে কি না। মেহরাব একবারও চিকিৎসাকক্ষ থেকে দূরে গেল না। অবশেষে দীর্ঘ চিকিৎসার পর প্রধান হেকিম বাইরে এসে দাঁড়ালেন। তাঁর মুখের দিকে তাকিয়েই সবাই এগিয়ে এল। হারুণ প্রশ্ন করলেন,

“কী অবস্থা এখন?”

হেকিম দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন,

“আল্লাহর রহমতে বিপদের সবচেয়ে কঠিন সময়টা আপাতত পার হয়েছে। তাঁর শ্বাস স্বাভাবিক হচ্ছে। শরীরও ধীরে ধীরে সাড়া দিচ্ছে। তবে জ্ঞান ফিরতে সময় লাগতে পারে। আপাতত তাঁকে বিশ্রামে রাখতে হবে।”

কথাটা শুনে আয়েশা বেগম স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন। মেহরাব চোখ বন্ধ করে মাথা নিচু করল।

“আলহামদুলিল্লাহ!”

হারুণের মুখেও কিছুটা স্বস্তি ফিরল। কিন্তু স্বস্তির আড়ালে উদ্বেগ থেকেই গেল। আলীরাজ বেঁচে গেছে, এটাই এখন বড় কথা। কিন্তু তার সঙ্গে কী ঘটেছিল, সেটা মোটেও ছেড়ে দেয়া যাবে না। কয় বছর আগে প্রতীককেও এভাবেই মারা হয়েছিল। হারুন ওয়াসেম সাহারাকে বলল মেহরাবকে কক্ষে নিয়ে যেতে আর কিছু খাবার খাওয়াতে। সাহারা মেহরাবের বাহু ধরে কক্ষে নিয়ে গেল।

****

দুপুর গড়াতেই আমিরাবাদ মহলের প্রধান ফটকের সামনে বহু মানুষের শোরগোল শোনা গেল। ঘোড়ার খুরের আওয়াজ আর একসঙ্গে অনেক মানুষের পদশব্দ সাথে চ্যাচামেচি। ফটকের প্রহরীরা সতর্ক হয়ে গেল। একজন প্রহরী উঁচু জায়গায় উঠে দূরের পথের দিকে তাকাল।

দেখা গেল, একদল পাহাড়ি যোদ্ধা মহলের দিকে এগিয়ে আসছে। তাদের পরনে ধুলো-মাখা পোশাক। কারও কাঁধে ধনুক, কারও কোমরে তলোয়ার। কয়েকজনের হাতে লম্বা বর্শা। তাদের চলার ভঙ্গিতে ক্লান্তি থাকলেও শৃঙ্খলার অভাব ছিল না। দলের একেবারে সামনে ঘোড়ার পিঠে বসে আছে এক নারী। দীর্ঘ মরু অঞ্চল পেরিয়ে এসে তার পোশাকের রং ও ধুলোয় মলিন। কোমরে বাঁধা অস্ত্র। সে আর কেউ নয়, জান্নাত।

আর তার ঠিক পাশে ঘোড়ায় বসে আছে ইয়ামিন।

যে ইয়ামিন এতদিন ছিল পাহাড়ের সাধারণ যুবক, আজ তার উপস্থিতি যেন পুরো দলটাকে আলাদা গুরুত্ব দিচ্ছিল।

মহলের ফটকে পৌঁছানোর পর জান্নাত ঘোড়া থামাল। পাহাড়ি যোদ্ধারাও তার পেছনে থেমে গেল। প্রধান প্রহরী সামনে এসে পথ আটকাল।

“থামুন! সম্রাটের অনুমতি ছাড়া এত লোক নিয়ে মহলে প্রবেশ করা যাবে না।”

জান্নাত ঘোড়া থেকে নেমে শান্তভাবে প্রহরীর দিকে তাকাল।

“সম্রাটের সঙ্গে দেখা করতে এসেছি।”

“আপনার পরিচয়?”

“জান্নাত।”

প্রহরী নামটা শুনে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তারপর যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে না পেরে বলল,

“কোন জান্নাত?”

জান্নাতের ঠোঁটে ক্ষীণ হাসি ফুটল।

“সাহাবাদের বড় শাহজাদী, জান্নাত”

প্রহরী এবার সত্যিই হতভম্ব হয়ে গেল। সাহাবাদের রাজকন্যা জান্নাত! যার নিখোঁজ হওয়ার খবর একসময় দুই রাজ্যের মানুষকে অস্থির করে তুলেছিল, যার জন্য দিনের পর দিন অনুসন্ধান চালানো হয়েছিল, সেই জান্নাত এখন আমিরাবাদের ফটকে দাঁড়িয়ে! প্রহরী দ্রুত অন্যদের দিকে তাকিয়ে নির্দেশ দিল,

“ফটক খুলে দাও। ভেতরে খবর পাঠাও!”

বিশাল ফটক ধীরে ধীরে খুলে গেল। জান্নাত আবার ঘোড়ায় উঠল। তার ইশারায় পাহাড়ি যোদ্ধারা সারিবদ্ধভাবে মহলের ভেতরে প্রবেশ করল। ইয়ামিনও তার পাশে এগিয়ে চলল। মহলের উঠোনে তখন যারা উপস্থিত ছিল, সবাই থমকে দাঁড়িয়ে গেল। একে অপরকে ফিসফিস করে বলল,

“এ কি সত্যিই সাহাবাদের রাজকন্যা? তাহলে পাহাড়িরা তার সঙ্গে কেন এসেছে?”

খবর দ্রুত সম্রাটের কানে পৌঁছে গেল। হারুণ ওয়াসেম চিকিৎসাকক্ষের বাইরে মেহরাবের সঙ্গে কথা বলছিলেন। একজন প্রহরী দৌড়ে এসে মাথা নত করল।

“জাহাপনা, সাহাবাদের রাজকন্যা জান্নাত মহলে এসেছেন।”

হারুণ ভ্রু কুঁচকে তাকালেন।

“জান্নাত?”

“জি, জাহাপনা। তাঁর সঙ্গে অনেক পাহাড়ি যোদ্ধা এসেছে।”

মেহরাবও অবাক হয়ে বাবার দিকে তাকাল।

“জান্নাত এখানে কেন এসেছে?”

হারুণ কিছুক্ষণ চিন্তা করলেন। তারপর বললেন,

“তাকে দরবারে নিয়ে আসো।”

প্রহরী চলে গেল। হারুণ মেহরাবের দিকে তাকালেন।

“চলো। দেখি, সাহাবাদের রাজকন্যা এবার কী উদ্দেশ্যে আমিরাবাদে এসেছে।”

হারুন ওয়াসেম চলে গেল। মেহরাব দাঁড়িয়ে থাকে সেখানেই। জান্নাতের মুখোমুখি হতে কেমন দ্বিধা কাজ করে তার। প্রথমবার জান্নাতকে দেখে যে অনুভূতি মনে বাসা বেঁধেছিল সেটাই তাকে বিব্রত করে বারংবার। মনে পড়ে শেষবার তার অশ্রু ঝড়ার কথা। জান্নাতের চিঠি যখন মেহরাবের কাছে পৌঁছায়। জান্নাত জানায় তিনদিন আগে তার বিয়ে হয়ে গেছে। মেহরাব যেন তাকে ভুলে যায়। মেহরাব এর দুনিয়া নাড়িয়ে দিয়েছিল সেই লেখাগুলে। কিন্তু জান্নাত কেন তা জানালো তার উত্তর পায় না মেহরাব। তার তো বিয়ে হয়নি। তবে কেন জানালো সে বিবাহিত?

দুদিকে মাথা নেড়ে সবটা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলে মেহরাব। এখন সে বিবাহিত, স্ত্রী আছে তার। সবচেয়ে বড় কথা তার অর্ধাঙ্গিনী জান্নাতেরই ছোট বোন। সব ভাবনা ঠেলে দিয়ে দরবারের দিকে হাটা ধরল।

****

দরবারকক্ষের দরজা খুলে দেওয়া হলো। ভেতরে সম্রাটের আসনের দুই পাশে রাজকর্মচারী, সেনাপতি এবং কয়েকজন উপদেষ্টা বসে ছিলেন। দরবারের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকার জায়গা খালি রাখা। জান্নাত প্রবেশ করতেই সবার দৃষ্টি তার দিকে চলে গেল। তার পেছনে ইয়ামিন। আর তাদের পেছনে পাহাড়ি যোদ্ধারা। সবাই না শুধু বিশেষ এবং বিজ্ঞ কয়েকজন। জান্নাত দরবারের মাঝখানে এসে থামল। সে সম্রাটকে যথাযথ সম্মান জানাল, কিন্তু তার ভঙ্গিতে ভীত বা দুর্বল হওয়ার কোনো লক্ষণ ছিল না।

হারুণ ওয়াসেম সিংহাসনে বসে তাকে পর্যবেক্ষণ করলেন।

“হ্যা জান্নাত। বহুদিন পর তোমাকে দেখলাম। শুনেছিলাম, তুমি নিখোঁজ হয়েছিলে। এখন আবার পাহাড়ি যোদ্ধাদের নিয়ে আমার দরবারে উপস্থিত হয়েছ। কী কারণে এসেছ আম্মা?”

জান্নাত উত্তর দেওয়ার আগে একবার ইয়ামিনের দিকে তাকাল। তারপর বলল,

“আমিরাবাদের কাছে আমার কিছু প্রশ্ন আছে, সম্রাট। তবে তার আগে একজন মানুষের পরিচয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন।”

হারুণের চোখ সরু হয়ে এল।

“কার পরিচয়?”

মেহরাব এসে দাড়ালো সম্রাটের পাশে। জান্নাত নিজের পাশের মানুষটির দিকে হাত বাড়াল।

“ইয়ামিনের।”

দরবারে চাপা গুঞ্জন উঠল। হারুণ ইয়ামিনের দিকে তাকালেন।

“ইয়ামিন? এ কি পাহাড়ি যুবক?”

জান্নাত শান্ত গলায় বলল,

“আপনি তাঁকে পাহাড়ি যুবক হিসেবে চিনলেও, তাঁর পরিচয় শুধু এটুকু নয়।

ইয়ামিন সোজা দৃষ্টি দিল হারুন ওয়াসেম এর দিকে। হারুণ দরদর করে ঘামছে এই শীতেও। জান্নাতকে বললেন,

“স্পষ্ট করে বলো”

জান্নাত এবার দরবারের সবাইকে শুনিয়ে বলল,

“ইয়ামিন সম্রাট হারুণ ওয়াসেমের বড় ছেলে”

এক মুহূর্তে পুরো দরবার নিস্তব্ধ হয়ে গেল। সভাসদরা শ্বাস নিতেও ভুলে গেল। একসঙ্গে কয়েকজন কথা বলে উঠল।

“কী বলছেন রাজকন্যা! মাথা ঠিক আছে তার? এ অসম্ভব! সম্রাটের তো বড় ছেলে এ হলে তাহলে যুবরাজ মেহরাব?

মেহরাব নিজেও স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখ একবার জান্নাতের দিকে, আরেকবার ইয়ামিনের দিকে চলে গেল। হারুণ ওয়াসেমের মুখের অভিব্যক্তি বদলে গেল। তিনি সিংহাসনের হাতলে হাত চেপে ধরে বললেন,

“তুমি কী বলছ, জান্নাত? বুঝে কথা বলছো তুমি?”

জান্নাতের কণ্ঠ এবার আরও দৃঢ় হলো।

“আমি বুঝেই কথা বলছি, সম্রাট।”

“বুঝে বলছো মানে? প্রমাণ কোথায়? যাকে তাকে এনে তুমি সম্রাটপুত্র বানিয়ে দেবে?”

“প্রমাণ আছে।”

“হ্যা তাহলে দেখাও!”

হারুণের কণ্ঠ দরবারকক্ষের দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হলো। জান্নাত কিছু বলার আগেই একজন রাজকর্মচারী সামনে এগিয়ে এল।

“জাহাপনা, এভাবে রাজপরিবারের উত্তরাধিকার নিয়ে দাবি তোলা যায় না। একজন অচেনা পাহাড়ি যুবককে সম্রাটের বড় ছেলে বললেই তো আর তিনি রাজপুত্র হয়ে যান না!”

আরেকজন সভাসদ বললেন

“ঠিক বলেছেন। রাজকন্যা জান্নাত হয়তো কোনো ভুল তথ্য পেয়েছেন। অথবা এর পেছনে অন্য কোনো উদ্দেশ্য রয়েছে।”

জান্নাত তাদের দিকে তাকাল, কিন্তু উত্তর দিল না।

সেই নীরবতাকে দুর্বলতা ভেবে একজন সেনাপতি বলে উঠল,

“পাহাড়ি যোদ্ধাদের নিয়ে দরবারে এসে এমন দাবি তোলা রাজকীয় শিষ্টাচারের পরিপন্থী। আমরা এ দাবি মেনে নিতে পারি না।”

পাহাড়ি যোদ্ধাদের সারিতে চাপা অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ল। কয়েকজন নিজেদের মধ্যে কথা বলতে শুরু করল। ইয়ামিন তখনও চুপ। জান্নাত এক পা সামনে এগিয়ে এল।

“আপনারা প্রমাণ দেখতে চাইছেন, আমি দেখাব। কিন্তু প্রমাণ দেখার আগেই একজন মানুষকে অপমান করার অধিকার আপনাদের কে দিয়েছে?”

দরবারের কয়েকজন মুখ চাওয়াচাওয়ি করল। হারুণ বললেন,

“আমার রাজ্যের উত্তরাধিকার নিয়ে কথা হচ্ছে। এখানে আবেগ দিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না।”

জান্নাত মাথা নাড়ল।

“আমিও আবেগ দিয়ে কথা বলছি না।”

তারপর সে ইয়ামিনের দিকে ফিরল।

“ইয়ামিন, আপনার বাঁ হাতটা একটু সামনে আনবেন?”

ইয়ামিন একবার জান্নাতের দিকে তাকাল। তারপর নিজের বাঁ হাতের আস্তিন গুটিয়ে বাহু সামনে আনল। সবার চোখ তার বাহুর দিকে চলে গেল। সেখানে একটি উল্কি করা। পুরোনো, কিন্তু স্পষ্ট। একটি বিশেষ রাজচিহ্ন মাঝখানে সূর্যের মতো নকশা, তার চারপাশে বাঁকানো রেখা। মেহরাব ফট করে নিজের বাহুর দিকে তাকালো। তার বাহুতেও একই চিহ্ন। জন্মের পরই রাজবাড়ির সকল শিশুদের এই উল্কি এঁকে দেয় আমিরাবাদ এর উত্তরাধিকার বংশ।

দরবারের প্রবীণ রাজকর্মচারীদের মধ্যে একজন হঠাৎ উঠে দাঁড়ালেন। তার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেছে।

“এই চিহ্ন…? বহু বছর আগে রাজপরিবারের পুরোনো নথিতে এই চিহ্নের ব্যাপারে লিখিত ছিল। এই নকশা সাধারণ কোনো উল্কি নয়। এ কেবল রাজপরিবারের উত্তরাধিকারীদের করা হয়”

হারুণের মুখের রং বদলে গেল। তিনি সিংহাসন থেকে সামান্য সামনে ঝুঁকলেন। বৃদ্ধ বললেন,

“জাহাপনা, এই চিহ্ন রাজপরিবারের রক্তের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি পুরোনো পরিচয়চিহ্ন।”

জান্নাত এবার হারুণের দিকে তাকাল।

“এখনও কি বলবেন, আমি কোনো প্রমাণ ছাড়াই কথা বলছি?”

হারুণের চোখ ইয়ামিনের বাহুতে স্থির হয়ে গেল।

তিনি যেন বিশ্বাস করতে পারছিলেন না, নিজের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা পাহাড়ি যুবকের শরীরে এমন একটি চিহ্ন থাকতে পারে। মেহরাবও নির্বাক। সে ধীরে ধীরে ইয়ামিনের দিকে এগিয়ে গেল। উল্কিটা আরও ভালো করে দেখল। তার মুখে বিস্ময়, অবিশ্বাস আর অজস্র প্রশ্ন।

“এই চিহ্ন তুমি কোথায় পেয়েছ?”

ইয়ামিন শান্তভাবে উত্তর দিল,

“আমি যখন ছোট ছিলাম, তখন থেকেই এটা আমার বাহুতে আছে। এর অর্থ আমি জানতাম না। পাহাড়ে বড় হয়েছি। আমার অতীত সম্পর্কে খুব বেশি কিছু জানি না।”

মেহরাব প্রশ্ন করল,

“তোমার পরিবার?”

ইয়ামিন কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,

আমাকে ছোটবেলায় একটি কূপের পাশে পাওয়া গিয়েছিল। যিনি আমাকে বড় করেছেন, সেই বৃদ্ধা ছাড়া আমার অতীত সম্পর্কে কেউ কিছু জানে না।”

কথাটা শুনে দরবারের পরিবেশ আরও ভারী হয়ে উঠল। হারুণের আঙুল সিংহাসনের হাতল আঁকড়ে ধরল। একটি পুরোনো স্মৃতি যেন তাঁর মনের দরজায় ধাক্কা দিতে লাগল। বহু বছর আগের সেই অন্ধকার অধ্যায় যেগুলো তিনি ভেবেছিলেন সময়ের সঙ্গে চাপা পড়ে গেছে।

তিনি ধীরে ধীরে ইয়ামিনের দিকে তাকালেন।

তারপর জান্নাতের দিকে।

“তুমি কোথায় এই তথ্য পেয়েছ?”

জান্নাত বলল

“আপনার প্রথম স্ত্রীকে কারা যেন হত্যা….”

হারুণ ব্যস্ত হয়ে তাকে থামিয়ে দিল। এ মেয়ে হাএে হাড়ি ভেঙে দিলে সর্বনাশ। তার চোখ বড় হয়ে গেছে। ঠোঁট সামান্য ফাঁক। যেন এক মুহূর্তে তাঁর সমস্ত হিসাব ওলটপালট করে দিয়েছে জান্নাত।

দরবারের সবাই তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।

কেউ আর জান্নাতকে থামানোর কথা বলল না। হারুণ ওয়াসেম বিস্ময়ে প্রায় হা হয়ে তাকিয়ে রইলেন ইয়ামিনের বাহুর সেই উল্কির দিকে। তাহলে সেদিন ইয়ামিন বেঁচে গেছিল?

জান্নাত কঠিন চোখে তাকিয়ে সম্রাটকে বললেন।

“এটা শুধু ইয়ামিনের পরিচয় পর্ব গেল। এর সঙ্গে জড়িত সকল সত্য, যা এতদিন ধরে গোপন রাখা হয়েছিল। সেসব সামনে এলে আমিরাবাদের সব গণ্যমান্য সম্মানিত মানুষদের মুখোশ খুলে যাবে”

হারুণের চোখে এবার বিস্ময়ের সঙ্গে সতর্কতাও ফুটে উঠল। এখন পাহাড়ি দের সাথে যদি নিজের লোকেরাও তার বিপক্ষে চলে যায়? না না, পরিস্থিতি সামলে নিতে হবে। মেহরাব বাবার দিকে এগিয়ে এসে ভঙ্গুর গলায় বলল

“এসব কি বাবা? তুমি না বলেছিলে বিন ইয়ামিন একজন রাজদ্রোহী বণিকের সন্তান? তাহলে ওর শরীরে এই উল্কা কি করে এলো?”

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে 52 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন