ফন্ট সাইজ:
থিম:
রক্তমুকুট

53

লেখক: জান্নাতুল ফেরদৌস

দরবারকক্ষের বিশাল জানালা দিয়ে বিকেলের আলো এসে পড়েছে মেঝের ওপর। ঘরের পরিবেশের ভারী ভাবটা কাটছে না। উপস্থিত প্রত্যেকের চোখ ইয়ামিনের বাহুতে আঁকা উল্কির দিকে আর সম্রাট হারুণ ওয়াসেমের মুখের দিকে।

জান্নাতের কথাগুলো এখনো সবার কানে বাজছে।

ইয়ামিন সম্রাটের বড় ছেলে! একজন সাধারণ পাহাড়ি যুবক নাকি আমিরাবাদের সিংহাসনের উত্তরাধিকারী! কেউ যেন বিষয়টা সহজে মেনে নিতে পারছে না। কিন্তু সবচেয়ে বেশি বিচলিত হয়ে পড়েছে মেহরাব।

সে একবার ইয়ামিনের দিকে তাকাচ্ছে, আরেকবার নিজের বাবার দিকে। তার মাথার ভেতর একের পর এক প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। এত বছর ধরে সে নিজেকে সম্রাটের একমাত্র ছেলে বলে জেনে এসেছে। তার ছোট যে ছিল প্রতীক, সে তো মারা গেছে। অথচ আজ হঠাৎ জানতে পারছে, তার একজন বড় ভাই আছে! একজন রক্তের সম্পর্কের মানুষ, যার অস্তিত্ব সম্পর্কে তাকে কখনো কিছুই জানানো হয়নি।

মেহরাব ধীরে ধীরে বাবার দিকে এগিয়ে গেল।

“বাবা! আমার একজন বড় ভাই আছে?”

হারুণ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। মেহরাব আবার প্রশ্ন করল,

“সত্যিই কি আমার একজন বড় ভাই আছে, বাবা? তুমি এত বছর ধরে আমাকে এই কথাটা বলোনি কেন বাবা?”

দরবারকক্ষের সবাই নীরব হয়ে গেল। মেহরাবের কণ্ঠ ক্রমেই ভারী হয়ে উঠল।

“আমি ছোটবেলা থেকে নিজের একমাত্র ভাই হিসেবে প্রতীককে দেখেছি। ও মারা যাওয়ার পর তো আমিই তোমার একমাত্র ছেলে। তাহলে আজ কেন আমাকে অন্য একজনের কাছ থেকে জানতে হচ্ছে যে আমার একজন বড় ভাই আছে?”

হারুণ ঠোঁট ভিজিয়ে নিলেন।

“মেহরাব, ব্যাপারটা হয়েছে কি…”

“তাহলে সেই ব্যাপারটাই বরং আমাকে বুঝিয়ে বলো!”

মেহরাবের কণ্ঠে অভিমান।

“আমি কি এতটাই পর ছিলাম তোমার কাছে যে নিজের ভাইয়ের কথা জানার অধিকারটুকুও আমার ছিল না?”

হারুণ মুখ খুলে কিছু বলতে পারলেন না। মেহরাব একবার ইয়ামিনের দিকে তাকাল। ইয়ামিন তখনও চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। তার মুখে কোনো অভিযোগ নেই। যেন এত বড় একটি সত্য জানার পরও সে নিজেকে সামলে রেখেছে। এই দৃশ্যটা মেহরাবের কষ্ট আরও বাড়িয়ে দিল। সে আবার বাবার দিকে ফিরে বলল,

“আর একটা কথা বলো বাবা। যদি সে সত্যিই তোমার বড় ছেলে হয়, তাহলে এত বছর ধরে তার খোঁজ নাওনি কেন? সে কোথায় ছিল, কীভাবে বড় হয়েছে, বেঁচে আছে কি না একবারও জানতে ইচ্ছে করেনি তোমার?”

হারুণের মুখে অস্বস্তি ফুটে উঠল।

“আমি... আমি জানতাম না ও কোথায় আছে”

“কেন জানতে না?”

মেহরাবের প্রশ্নের উত্তর দিতে গিয়ে হারুণ এবার সত্যিই বিপাকে পড়ে গেলেন।

“তখন পরিস্থিতি অন্যরকম ছিল। অনেক ঘটনা ঘটেছিল। সবকিছু তোমাকে এখন বোঝানো সম্ভব নয়। পরে বলব। তুমি আপাতত চুপ থাকো মেহু”

মেহরাব তীক্ষ্ণ চোখে তাকাল।

“এত বছরেও যা সম্ভব হয়নহ আজও সম্ভব হবে না বাবা”

হারুণ চুপ। দরবারের দাঁড়িয়ে থাকা কর্মচারীরা নিজেদের মধ্যে কথা বলছিল। হারুণের কানে সেগুলো পৌঁছাতেই তাঁর মুখ আরও গম্ভীর হয়ে উঠল। তিনি বুঝতে পারল, এখন আর বিষয়টা এড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই। জান্নাতের সামনে ইয়ামিনের বাহুর উল্কি দেখানো হয়েছে। উপস্থিত প্রবীণ কর্মচারীরাও চিহ্নটি চিনতে পেরেছেন। প্রজাদের মধ্যেও খবর ছড়িয়ে পড়তে শুরু করেছে। এখন সব অস্বীকার করলে তাঁর নিজের অবস্থানই সন্দেহের মুখে পড়বে। হারুণ ধীরে ধীরে সিংহাসন থেকে উঠে দাঁড়ালেন। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,

“হ্যাঁ, মেহরাব। ইয়ামিন আমার ছেলে।”

দরবারে আবারও চাপা গুঞ্জন উঠল। হারুণ কণ্ঠ ভারী করে বললেন,

“সে তোমার বড় ভাই।”

মেহরাবের মুখে কষ্টের ছাপ।

“তাহলে এত বছর ধরে কথাটা লুকিয়ে রেখেছিলে কেন?”

হারুণ এবার মাথা নিচু করলেন।

“আমি ভুল করেছি।”

কথাটা বলেই তিনি চোখ মুছতে শুরু করলেন।

“তখনকার পরিস্থিতিতে আমি অনেক ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম, সময়ের সঙ্গে সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু আমি বুঝতে পারিনি, আমার নীরবতার কারণে আমার নিজের সন্তানদের মধ্যে এত বড় দূরত্ব তৈরি হবে।”

তিনি ইয়ামিনের দিকে তাকালেন।

“বাবা, আমাকে ক্ষমা করো।”

ইয়ামিন কিছু বলল না। হারুণের চোখে পানি জমল। তিনি আবার বললেন,

“আমি তোমাকে খুঁজে পাইনি। তোমাকে নিজের কাছে রাখতে পারিনি। একজন বাবা হিসেবে এর চেয়ে বড় ব্যর্থতা আর কী হতে পারে?”

কথাগুলো বলার সময় তাঁর কণ্ঠ ভেঙে যাচ্ছিল। তিনি দুই হাত দিয়ে মুখ ঢেকে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন। দরবারের অনেকে দৃশ্যটা দেখে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়ল। কিন্তু জান্নাতের মুখে কোনো পরিবর্তন এল না। সে হারুণের দিকে তাকিয়ে রইল। সম্রাটের প্রতিটি শব্দ আলাদা করে যাচাই করছে। হারুণ এবার ইয়ামিনের কাছে এগিয়ে গেলেন।

“আমাকে আরেকটা সুযোগ দাও, বাবা। তোমাকে আমি আর হারাতে চাই না।”

ইয়ামিন একটু অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। সে কখনো ভাবেনি, তার জীবনের পরিচয় এভাবে প্রকাশিত হবে। পাহাড়ের বাইরে এত বড় একটি রাজ্য, এত মানুষ, এত নিয়মকানুন এসব তার কাছে অপরিচিত। তবু সে মাথা নিচু করে বলল,

“আমি আপনার ওপর কোনো অভিযোগ রাখতে চাই না।”

হারুণ সঙ্গে সঙ্গে তাকে বুকে টেনে নিতে চাইলেন। ইয়ামিন কিছুটা ইতস্তত করলেও নিজেকে সরিয়ে নিল না। মেহরাব দূর থেকে দৃশ্যটা দেখছিল। সে বাবাকে ভালোবাসে, শ্রদ্ধা করে। কিন্তু আজকের এই ঘটনা তার বিশ্বাসে গভীর আঘাত করেছে।

তবু ইয়ামিনকে দেখে তার মনে অন্যরকম একটা অনুভূতি জন্ম নিচ্ছিল। রক্তের সম্পর্কের মানুষ।

তার নিজের বড় ভাই। তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। ক্ষমতা লোভী হলে হয়তো দুঃখ পেত, রাগ হতো। যে তার সব কেড়ে নিবে। কিন্তু তার স্বচ্ছ মনটা প্রিয়জনের উপস্থিতিতেই খুশি!

***

রাজপরিবারের পরিচয় ও প্রজাদের সাক্ষ্য হারুণের স্বীকারোক্তির পর জান্নাত আর সময় নষ্ট করল না। সে দরবারের মাঝখানে দাঁড়িয়ে বলল,

“যেহেতু সম্রাট নিজেই ইয়ামিনের পরিচয় স্বীকার করেছেন, তাই আমি চাই বিষয়টা শুধু এই দরবারের চার দেয়ালের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থাকুক।”

হারুণ চোখ তুলে তাকালেন।

“কী বলতে চাইছ?”

“আমি চাই, রাজপরিবারের প্রবীণ সদস্য, রাজকর্মচারী এবং প্রজাদের প্রতিনিধিদের সামনে বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হোক। ভবিষ্যতে কেউ যেন ইয়ামিনের পরিচয় অস্বীকার করতে না পারে।”

দরবারের একজন মন্ত্রী আপত্তি জানালেন।

“শাহজাদী, রাজপরিবারের অভ্যন্তরীণ বিষয় প্রজাদের সামনে প্রকাশ করা….”

জান্নাত তাঁর কথা শেষ করতে দিল না।

“যে পরিচয় এত বছর গোপন রাখা হয়েছে, তার ফল শুধু রাজপরিবার ভোগ করেনি। একজন মানুষ নিজের জন্মপরিচয় না জেনে বড় হয়েছে। তার ভাই জানত না যে সে আছে। এই গোপনীয়তার কারণে ভবিষ্যতে রাজ্যে আরও বড় সমস্যা তৈরি হতে পারে। তাই বিষয়টি পরিষ্কার হওয়া প্রয়োজন। তাছাড়া ইয়ামিন ভবিষ্যত শাসক। তাি তারও প্রজাদের সাথে পরিচয় হওয়ার দরকার আছে”

মেহরাব জান্নাতের কথায় সমর্থন জানাল।

“আমি তার সঙ্গে একমত। আমার ভাইয়ের পরিচয় সবাই জানুক। এখানে লুকানোর কিছু থাকা উচিত নয়।”

হারুণ ছেলের দিকে তাকালেন। কিছুক্ষণ পর ধীরে মাথা নাড়লেন।

“ঠিক আছে। আজই রাজপরিবারের ঘোষণা দেওয়া হবে।”

এরপর মহলের বাইরে প্রজাদের প্রতিনিধিদের ডাকা হলো। প্রবীণ রাজকর্মচারীরা পুরোনো নথিপত্র যাচাইয়ের ব্যবস্থা করলেন। রাজপরিবারের পরিচিত চিহ্ন ও সংরক্ষিত দলিলগুলোও সামনে আনা হলো। ইয়ামিনকে নিয়ে কোনো চূড়ান্ত উত্তরাধিকার-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত আজই নেওয়া হবে না। ইহা সময় সাপেক্ষ ব্যাপার। তবে হারুণ ওয়াসেমের প্রকাশ্য স্বীকারোক্তি এবং উপস্থিত সাক্ষীদের সামনে তাঁর পরিচয় স্বীকার করে নেওয়া এ দুটো ঘটনা আমিরাবাদের ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করল। প্রজাদের প্রতিনিধিদের সামনে হারুণ ঘোষণা করলেন,

“ইয়ামিন আমার জ্যেষ্ঠ পুত্র। এতদিন তার পরিচয় গোপন ছিল। আজ থেকে রাজপরিবারে তার অস্তিত্ব ও পরিচয় প্রকাশ্যে স্বীকৃত হলো।”

চারপাশে ফিসফাস শুরু হলো। কেউ বিস্মিত, কেউ আনন্দিত, কেউ আবার পুরো বিষয়টা নিয়ে চিন্তিত। কিন্তু ইয়ামিনের নিজের মুখে তখনও বিশেষ কোনো প্রতিক্রিয়া নেই। সে যেন নিজের পরিচয়ের চেয়ে মানুষের মুখের দিকে বেশি তাকাচ্ছে। জান্নাত সবকিছু পর্যবেক্ষণ করছিল। তার কাজ আপাতত শেষ। সে হারুণকে বলল,

“আমি এখন সাহাবাদে ফিরে যাব”

কথাটা শুনে ইয়ামিন সঙ্গে সঙ্গে তার দিকে তাকাল।

“এখনই?”

জান্নাত মাথা নাড়ল।

“হ্যাঁ। সাহাবাদে আমার অনেক কাজ পড়ে আছে”

ইয়ামিন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল,

“আরেকটু থেকে যেতে পারতে”

জান্নাতের চোখে কোমলতা ফুটে উঠল।

“এখানে আমার থাকার সময় বা প্রয়োজন কোনোটাই নেই, ইয়ামিন। পাহাড়ের মানুষদেরও আমার অপেক্ষায় থাকতে হয়। আর সাহাবাদে আমার পরিবার আছে।”

ইয়ামিন আর কিছু বলল না। কিন্তু তার মুখের পরিবর্তন জান্নাতের চোখ এড়াল না। এই কয়েক দিনে জান্নাতের সঙ্গে তার যে পরিচয়, বিশ্বাস আর নির্ভরতার সম্পর্ক তৈরি হয়েছে, তা সে সহজে অস্বীকার করতে পারবে না। জান্নাত তার অতীতের অন্ধকারে আলো ফেলেছে। নিজের পরিচয়ের সামনে দাঁড়াতে সাহায্য করেছে। এখন সেই মানুষটাই চলে যাচ্ছে। জান্নাত ঘোড়ার দিকে এগিয়ে গেল। পাহাড়ি যোদ্ধারা প্রস্তুত হয়ে দাঁড়াল।

ইয়ামিন কিছুদূর তার পেছনে হাঁটল।

“সাহাবাদে পৌঁছে খবর দেবেন”

জান্নাত ঘোড়ায় ওঠার আগে তার দিকে তাকাল।

“পথের খবর পেলে জানাব”

“আর নিজের খেয়াল রাখবেন”

জান্নাত মৃদু হেসে বলল,

“আপনিও”

ইয়ামিনের মুখে সামান্য হাসি ফুটল, কিন্তু চোখের মন খারাপটা ঢাকা পড়ল না। জান্নাত ঘোড়ায় উঠল। তারপর পাহাড়ি যোদ্ধাদের নিয়ে মহলের ফটক পেরিয়ে চলে গেল। ইয়ামিন অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। ধুলোর মধ্যে ঘোড়ার খুরের শব্দ ক্রমে ক্ষীণ হয়ে এল। দূরের পথের বাঁকে জান্নাতকে আর দেখা গেল না। তবু ইয়ামিন সেখান থেকে সরল না। মেহরাব তার পাশে এসে দাঁড়াল।

“মন খারাপ?”

ইয়ামিন একটু চমকে তাকাল।

“না।”

মেহরাব মৃদু হেসে বলল,

“আমাকে মিথ্যা বলতে হবে না। আমি মুখ দেখলঃ বুঝে যাই কথা কোনদিক দিয়ে পালাচ্ছে”

ইয়ামিন দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

“মানুষটা আমাকে আমার নিজের পরিচয় ফিরিয়ে দিল। অথচ আমি তাকে ধন্যবাদ দেওয়ার মতো কথাও খুঁজে পেলাম না।”

মেহরাব তার কাঁধে হাত রাখল।

“তাহলে যখন আবার দেখা হবে, তখন বলো। এমনিতে ওর আসা যাওয়া লেগেই থাকবে। যদিও আসে না। ওর ছোটবোন সাহারা আমার স্ত্রী”

ইয়ামিন অবাক হয়ে তাকাল।

“তাই?”

“হ্যা চলো। তোমাকে তোমার কক্ষ দেখিয়ে দিই”

*****

রাত নামার পর আমিরাবাদ মহলের পরিবেশ কিছুটা শান্ত হলো। দিনের ব্যস্ততা শেষ হয়েছে। দেয়ালে জ্বালানো মশালগুলো থেকে হলুদ আলো ছড়িয়ে পড়ছে চারিদিকে। প্রহরীদের কণ্ঠ মাঝেমধ্যে শোনা যাচ্ছে। কোথাও কোথাও দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ। ইয়ামিনকে মহলের একটি কক্ষে থাকার ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়েছিল। কক্ষটি বড় হলেও তার কাছে বেশ অচেনা লাগছিল। ভারী পর্দা, কারুকাজ করা আসবাব, নরম বিছানা, দেয়ালে ঝোলানো পুরোনো চিত্রকর্ম সবকিছু যেন অন্য এক জগতের অংশ।

সে জানালার পাশে দাঁড়িয়ে বাইরে তাকিয়ে ছিল।

দূরে পাহাড় নেই। পরিচিত জঙ্গলের শব্দ নেই।

বৃদ্ধার ছোট্ট বাড়িটাও নেই। সবকিছু বদলে গেছে, অথচ তার নিজের ভেতরটা এখনো আগের মতোই। ঠিক তখনই দরজায় টোকা পড়ল। ইয়ামিন ফিরে তাকাল।

“কে?”

বাইরে থেকে উত্তর এল,

“আমি! মেহরাব।”

ইয়ামিন দরজা খুলে দিল। মেহরাব ভেতরে ঢুকে কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর আর নিজেকে সামলাতে পারল না। এগিয়ে এসে ইয়ামিনকে জড়িয়ে ধরল। ইয়ামিন প্রথমে একেবারে হতভম্ব হয়ে গেল।

“আরে! কী হলো?”

মেহরাব তাকে আরও শক্ত করে ধরে বলল,

“আমার একটা বড় ভাই আছে”

কণ্ঠটা কেঁপে উঠল তার।

“এত বছর ধরে আমি জানতামই না!”

ইয়ামিন চুপ করে রইল। মেহরাব এবার একটু সরে তার মুখের দিকে তাকাল। চোখে পানি জমেছে।

“তুমি বুঝতে পারছ? আমি কত বিলাসি জীবন যাপন করেছি। অথচ আমার নিজের ভাই পাহাড়ে বড় হয়েছে। কী খেয়েছে, কোথায় থেকেছে, কী কষ্ট পেয়েছে আমি কিছুই জানি না!”

ইয়ামিন অপ্রস্তুত হয়ে মাথা চুলকাল।

“আচ্ছা, আচ্ছা! এখন তো পেয়েছিস। এত কান্নাকাটি করার কী আছে?”

মেহরাব হেসে ফেলল, যদিও চোখের পানি পুরোপুরি শুকায়নি।

“তুই বুঝবি না।”

“আমি বুঝব না কেন? আমারও তো একটা ভাই জুটেছে!”

কথাটা শুনে দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।

তারপর মেহরাব আবার তাকে জড়িয়ে ধরল।

“আমি তোমাকে আর কোথাও হারাতে চাই না।”

ইয়ামিনের মুখের হাসি একটু ম্লান হলো। সে ধীরে মেহরাবের পিঠে হাত রাখল।

“হারাবি না। আমি কোথাও পালাচ্ছি না।”

মেহরাব সরে এসে বিছানার পাশে বসে পড়ল।

“তুমি আমার সঙ্গে থাকবে তো?”

ইয়ামিন কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল।

“কোথায় থাকব, সেটা পরে দেখা যাবে। আগে বল, তোর এত বড় মহল, এত লোকজন, এত নিয়মকানুন এসবের মধ্যে আমি কীভাবে থাকব?”

মেহরাব হেসে বলল,

“ধীরে ধীরে শিখে যাবে।”

ইয়ামিন সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়ল।

“না ভাই, একটা কথা আগেই বলে রাখি। আমি মূর্খ-সুর্খ মানুষ। রাজ্যের হিসাব, দরবারের নিয়ম, বড় বড় লোকেদের সাথে ওঠাবসা, মন্ত্রীদের সঙ্গে কথা বলা এসব আমার দ্বারা হবে না”

মেহরাব বলল,

“এখনই তোমাকে এসব করতে বলছে কে?”

ইয়ামিন হাত নেড়ে বলল,

“আমি এসব বুঝি না। পাহাড়ে আমি নিজের মতো ছিলাম। যা দরকার, নিজের হাতে করেছি। এখানে এসে যদি সবাই আমাকে রাজপুত্রের মতো চলতে বলে, তাহলে তো বিপদ!”

মেহরাব হেসে উঠল।

“তাহলে তুমি কী করতে চাও?

ইয়ামিন এক মুহূর্তও দেরি করল না।

“তুই রাজ্য সামলাস। তুই এসব শিখেছিস, তুই পারবি। আমি তোর পাশে থাকব। তোদের পেয়েছি এই আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি। কিন্তু ভাই, রাজ্যপাটের ভার আমার ঘাড়ে চাপাস না।”

মেহরাবের হাসি ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল। সে ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বলল,

“তুমি সত্যিই এসব চাইছো না?”

ইয়ামিন মাথা নাড়ল।

“আমার কাছে রাজা হওয়ার চেয়ে অনেক বড় একটা ব্যাপার ঘটেছে আজ।”

“কী?”

ইয়ামিন মৃদু হেসে বলল,

“আমি আমার পরিবারকে পেয়েছি। একজন বাবা পেয়েছি, একজন ভাই পেয়েছি। এতদিন আমি জানতামই না আমার পরিচয় কী। এখন অন্তত জানি, আমি কোথা থেকে এসেছি। আমার কাছে এই পাওয়াটাই অনেক বড়।”

মেহরাব আর কোনো কথা বলল না। সে শুধু ভাইয়ের হাতটা শক্ত করে ধরল। দুজনের মধ্যে দীর্ঘ সময় নীরবতা রইল। তারপর মেহরাব উঠে দাঁড়াল।

“চল, মায়ের কাছে যাই।”

ইয়ামিন একটু অস্বস্তিতে পড়ল।

“এখন?”

“হ্যাঁ। আম্মা তোমাকে ভালো করে দেখতেই পারেনি। সারাদিন এত লোকজন, এত কথা সব মিলিয়ে সময়ই পাওয়া যায়নি।”

ইয়ামিন মাথা নাড়ল।

“আচ্ছা চল”

আয়েশা বেগম নিজের কক্ষে বসে ছিলেন।

সারাদিনের ঘটনাগুলো তাঁর মনেও নানা প্রশ্ন তৈরি করেছে। হারুণের বড় ছেলে এত বছর কোথায় ছিল? কেন তাকে কেউ খুঁজে পায়নি? আর এখন সে ফিরে আসায় রাজপরিবারের ভবিষ্যৎ কোন দিকে যাবে? প্রথমে ইয়ামিনের কথা শুনে তাঁর মনে স্বস্তির বদলে অস্বস্তিই বেশি হয়েছিল। ইয়ামিন হারুণের প্রথম পক্ষের ছেলে।

অর্থাৎ আয়েশার সতিনের ছেলে। তার ওপর সে যদি জ্যেষ্ঠ পুত্র হয়, তাহলে রাজপরিবারের উত্তরাধিকার নিয়ে নতুন আলোচনা শুরু হতে পারে।

এতদিন ধরে তিনি ভেবেছেন, মেহরাবই একদিন সবকিছুর দায়িত্ব নেবে। এখন ইয়ামিনের আগমনে সেই ভবিষ্যৎ বদলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আয়েশা এসব ভাবছিলেন, ঠিক তখনই মেহরাব দরজায় এসে দাঁড়াল।

“আম্মা, ভেতরে আসব? ভাইজানকে নিয়ে এসেছি”

আয়েশা মুখ তুলে তাকালেন।

“এসো”

মেহরাবের পেছনে ইয়ামিনকে দেখে তিনি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। ইয়ামিন সম্মান জানিয়ে মাথা নত করল।

“আসসালামু আলাইকুম।”

আয়েশা উত্তর দিলেন,

“ওয়ালাইকুম আসসালাম”

মেহরাব মায়ের পাশে গিয়ে বসে বলল,

“আম্মা, দেখো তেমার বড় ছেলে। আমার বড় ভাই।”

আয়েশা ইয়ামিনের দিকে তাকালেন।

“তুমি এত বছর কোথায় ছিলে?”

ইয়ামিন শান্তভাবে উত্তর দিল,

“পাহাড়ে। ছোটবেলা থেকে সেখানেই বড় হয়েছি।”

“তোমার পরিবার সম্পর্কে কিছু জানতে পারোনি?”

“যিনি আমাকে বড় করেছেন, সেই বৃদ্ধা ছাড়া আর কেউ ছিল না। তিনিই আমাকে নিজের নাতির মতো মানুষ করেছেন।”

আয়েশা কপাল কুঁচকালো। একটা পাহাড়ি ছেলে তার ছেলের সিংহাসন কেড়ে নিবে নাকি? সে কটমট করে মেহরাবের দিকে তাকালো। কেমন বেয়াক্কেলের মত নাচছে ছেলেটাকে নিয়ে। সে যে ওর প্রতিদ্বন্দ্বী তা কি হিসেব করেছে? নাহহহ যা করার এবার তাকেই করতে হবে।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে 53 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন