আয়েশার চোখে কৌতূহল ফুটে উঠল।
“তেমার টাকা কড়ি তেমন নেই বললেই চলে। এত বিশাল সৈন্য বহর ভাড়া করলে কি করে”
“ভাড়া করিনি তো”
“করো নি?”
ইয়ামিন মৃদু হেসে বলল,
“না, বেগম সাহেবা। অর্থ বলতে, পাহাড়ে যা পেয়েছি, তা দিয়েই চলেছি। তবে আমার কোনো অভাব ছিল বলে মনে হয়নি। যিনি আমাকে মানুষ করেছেন, তিনি কখনো আমাকে যথেষ্ট দিয়েছেন”
আয়েশা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। ইয়ামিনের কথায় কোনো অভিযোগ নেই। নিজের অতীত নিয়ে কাউকে দোষ দিচ্ছে না। নিজের পরিচয় ফিরে পেয়েও কারও সামনে বড়াই করছে না।
বারবার মেহরাবের দিকে তাকাচ্ছে, এদের সাথে সম্পর্কটা কীভাবে গড়ে তুলবে, সেটাই তার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
মেহরাব হঠাৎ বলে উঠল,
“আম্মা, জানো? ভাইজান রাজ্যপাটের দায়িত্ব নিতে চায় না। বলছে, আমি যেন সব সামলাই।”
আয়েশা অবাক হয়ে ইয়ামিনের দিকে তাকালেন।
ইয়ামিন একটু লজ্জা পেয়ে বলল,
“আমি তো এসব জানি না, বেগম সাহেবা। আমার দ্বারা ভুল হয়ে গেলে রাজ্যের ক্ষতি হবে। মেহরাব এসব শিখেছে। ও-ই ভালো পারবে।”
মেহরাব হেসে বলল,
“দেখলে আম্মা? আমার ভাই আমাকে এখন থেকেই দায়িত্ব দিয়ে দিচ্ছে! আর ভাইজান কি বেগম সাহেবা বেগম সাহেবা করছেো? আচ্ছা আমি তোমার ভাই হলে আম্মা কি তোমার আম্মা না?”
আয়েশাও অনিচ্ছা সত্ত্বেও হেসে ফেললেন। মনে জমে থাকা কিছুটা অস্বস্তি নরম হয়ে এল।
বুঝতে পারলেন, ইয়ামিন এখানে এসে মেহরাবের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে চাইছে না। বরং দুই ভাইয়ের সম্পর্কের মধ্যে কোনো দূরত্ব তৈরি হোক, সেটাই সে চায় না। আয়েশা উঠে দাঁড়ালেন।
“তোমরা দুজন বসো। আমি আসছি।”
মেহরাব বলল,
“কোথায় যাচ্ছ আম্মা?”
আয়েশা মৃদু হেসে বললেন,
“তোমাদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা করতে।”
ইয়ামিন তাড়াতাড়ি বলল,
“আপনাকে কষ্ট করতে হবে না। যা আছে, তাই দিলেই হবে।”
আয়েশা তার দিকে তাকালেন।
“এতে কষ্টের কী আছে, বাবা? এত বছর পর আমার বড় ছেলে ফিরেছে। আজ দুজনকে একসঙ্গে বসিয়ে খাওয়াতে পারলে আমারও ভালো লাগবে।”
কথাটা বলে তিনি কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেলেন।
ইয়ামিন কিছুক্ষণ দরজার দিকে তাকিয়ে রইল।
মেহরাব তার কাঁধে হাত রেখে বলল,
“দেখলি? মা তোকে পছন্দ করে ফেলেছে।”
ইয়ামিন হেসে ফেলল। মেহরাব বলল,
“মানুষ চিনতে আমার মায়ের ভুল হয় না।”
রাতের খাবারের সময় আয়েশা বেগম নিজেই দুই ছেলেকে নিয়ে বসালেন। বড় খাবারকক্ষের লম্বা টেবিলে নানা রকম খাবার সাজানো হয়েছে। পরিচারকেরা একে একে পাত্রগুলো রেখে চলে গেল। জানালার বাইরে রাতের অন্ধকার। মেহরাব আর ইয়ামিন পাশাপাশি বসল। আয়েশা তাদের দুজনের প্লেটে খাবার তুলে দিলেন।
“ইয়ামিন, এই খাবারগুলো তোমার পছন্দ হবে কি না জানি না। কোনোটা ভালো না লাগলে বলবে।”
ইয়ামিন বিনয়ের সঙ্গে বলল,
“সবই ভালো লাগবে, বেগম সাহেবা। আপনি এত কিছু করেছেন, এটাই অনেক।”
আয়েশা একটু হেসে বললেন,
“আমাকে বেগম সাহেবা বলে ডাকতে হবে না। চাইলে মা বলতে পারো”
কথাটা শুনে ইয়ামিনের হাত থেমে গেল। একবার আয়েশার মুখের দিকে তাকাল। আয়েশা নিজেও যেন কথাটা বলে একটু থমকে গেলেন। কিন্তু পরক্ষণেই নিজের স্বাভাবিক ভাব ফিরিয়ে এনে বললেন,
“তুমি তো আমারই ছেলে। এই মহলে তোমাকে পরের মানুষ ভেবে রাখব কেন?”
ইয়ামিনের গলায় কথা আটকে গেল। সে ধীরে বলল,
“জি... মা”
আয়েশা মুখ ফিরিয়ে খাবারের পাত্রের দিকে তাকালেন। তাঁর চোখেও সামান্য আর্দ্রতা জমেছে।
মেহরাব পরিস্থিতি হালকা করতে বলে উঠল,
“আম্মা, আজ কিন্তু ভাইয়ের পাতে আমার চেয়ে বেশি খাবার দিয়েছ!”
আয়েশা সঙ্গে সঙ্গে বললেন,
“তুমি তো রোজ আমার হাতের খাবার খাও। তোমার ভাই এত বছর পর এসেছে। আজ একটু বেশি যত্ন করলে তোমার এত আপত্তি কেন?”
ইয়ামিন হেসে উঠল।
“না, না। আমার জন্য তোমাদের ঝগড়া করার দরকার নেই। আমি নিজের হাতে তুলে নিতে পারব।”
মেহরাব বলল,
“তুই নিজের হাতে সব করতে চাস কেন? এখন থেকে তোকে একটু আদরও সহ্য করতে হবে।”
ইয়ামিন হেসে মাথা নাড়ল।
“সেটাই তো শিখতে হবে দেখছি!”
তিনজনের হাসিতে খাবারকক্ষের পরিবেশ উষ্ণ হয়ে উঠল। আয়েশা মাঝেমধ্যে ইয়ামিনের পাতে খাবার তুলে দিচ্ছিলেন। যদিও তার মনে যে সামান্য ঈর্ষা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে আশঙ্কা ছিল, তা একেবারে উধাও হয়ে যায়নি। কিন্তু ইয়ামিনের আচরণ তাঁকে ভাবাচ্ছিল। এই যুবক ক্ষমতা চাইছে না। মেহরাবকে সরিয়ে নিজে সামনে আসতে চাইছে না। বরং তার কাছে পরিবারের সঙ্গে একসঙ্গে বসে খাওয়াটাই বড় পাওয়া।
আয়েশা মনে মনে ভাবলেন, যে ছেলে এত সহজে নিজের বড় পরিচয় নিয়ে অহংকার করে না, তাকে শুধু সতিনের ছেলে বলে দূরে ঠেলে রাখা কি ঠিক হবে? তিনি আবার ইয়ামিনের থালায় খাবার তুলে দিলেন।
“আরও নাও, বাবা।”
*****
রাত আরও গভীর হলো। মহলের অধিকাংশ আলো নিভিয়ে দেওয়া হয়েছে। প্রবেশপথে শুধু প্রয়োজনীয় মশাল জ্বলছে। প্রহরীরা নির্দিষ্ট দূরত্বে দাঁড়িয়ে পাহারা দিচ্ছে। সম্রাট হারুণ ওয়াসেমের ঘুম আসছিল না। নিজের কক্ষে একা বসে ছিলেন। সামনে রাখা পানির পাত্রে হাত দিয়েও পান করলেন না। জানালার বাইরে অন্ধকার বাগানের দিকে তাকিয়ে রইলেন। দিনের ঘটনাগুলো তাঁর মাথার ভেতর ঘুরছিল। ইয়ামিন ফিরে এসেছে। জান্নাত তাকে সবার সামনে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে। মেহরাব তার অস্তিত্ব নিয়ে প্রশ্ন করছে। প্রজাদের প্রতিনিধিরা সাক্ষী থেকেছে এই ঘটনার।
সবচেয়ে বড় কথা, এখন ইয়ামিনের অস্তিত্ব আর গোপন নেই। হারুণ এতদিন ধরে যেসব হিসাব নিজের মতো করে সাজিয়ে রেখেছিলেন, সেগুলো একে একে ভেঙে পড়ছে। তিনি জানতেন, সাহাবাদের রাজকন্যারা সহজে কোনো বিষয় ছেড়ে দেয় না। জান্নাত, শাখা আর সাহারা তিনজনের প্রত্যেকেরই নিজস্ব শক্তি আছে। তারা যদি একবার তাঁর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যায়, তাহলে আমিরাবাদে তাঁর অবস্থান ধরে রাখা কঠিন হবে।
তার ওপর ফাইয়াজের দলও আর তাঁর নিয়ন্ত্রণে নেই। যে শক্তিকে কাজে লাগিয়ে তিনি এতদিন নিজের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে চেয়েছিলেন, সেই শক্তিই এখন সাহাবাদের পক্ষে চলে গেছে।
হারুণ টেবিলের ওপর হাত রাখলেন।
“সবকিছু আমার হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে। এই সাহাবাদের মেয়েরা কি আমার পরিবার ছাড়া কাওকে চোখে দেখে না?”
তিনি ঘণ্টা বাজালেন। কিছুক্ষণ পর একজন বিশ্বস্ত প্রহরী প্রবেশ করল।
“জাহাপনা?”
হারুণ নিচু গলায় বললেন,
“ইংরেজদের প্রধানকে খবর পাঠাও। আজ রাতেই তাকে আমার সঙ্গে দেখা করতে হবে। কাউকে যেন কিছু জানতে না দেওয়া হয়।”
প্রহরী মাথা নত করে বেরিয়ে গেল। রাতের আরও কিছুটা সময় পেরিয়ে গেল। মহলের পেছনের একটি নির্জন প্রবেশপথ দিয়ে ইংরেজদের প্রধানকে ভেতরে আনা হলো। তার সঙ্গে কেবল একজন বিশ্বস্ত সহকারী। সে বাইরে অপেক্ষা করছিল। হারুণের ব্যক্তিগত বৈঠককক্ষে প্রবেশ করে সে চারপাশে একবার তাকাল।
“আপনি এত রাতে ডেকেছেন, সম্রাট?”
হারুণ দরজার দিকে তাকিয়ে নিশ্চিত হলেন, সেটি বন্ধ করা হয়েছে। তারপর বললেন,
“আমাদের হাতে আর বেশি সময় নেই।”
ইংরেজ লোকটি ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
“কী হইয়াছে?”
হারুণ তিক্ত স্বরে বললেন,
“যা হওয়ার কথা ছিল, তার উল্টো হচ্ছে। সাহাবাদের মেয়েরা একের পর এক আমার পরিকল্পনা ভেস্তে দিচ্ছে। পাহাড়ের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছি। ফাইয়াজের দলও এখন তাদের পক্ষ নিয়েছে। আর আজ ইয়ামিনকেও ফিরিয়ে এনেছে। আমার পুত্র হয়েও দুইজনই ন্যায়ের পক্ষে। শ্যাহ। মানুষ করতে পারলাম না”
ইংরেজ প্রধান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
“আপনি ইয়ামিনের কথা বলিতেছেন
হারুণের চোখ সরু হয়ে এল।
“তুমি খবর পেয়েছ?”
“চারিদিক জানাজানি হইয়া গিয়াছে আর হামরা জানিবো না ইহা কি হইতে পারে?”
হারুণ বিরক্ত হয়ে বললেন,
“এই কারণেই বলছি, আমাদের হাতে আর সময় নেই। যত দ্রুত সম্ভব এই মহল লুট করে এখান থেকে চলে যেতে হবে। এখানে আমার সময় ঘনিয়ে এসেছে।”
ইংরেজ লোকটি তাঁর দিকে তাকিয়ে রইল। হারুণের কণ্ঠে আর আত্মবিশ্বাস নেই। ভয়, ক্ষোভ আর তাড়াহুড়ো তাকে নাড়িয়ে দিচ্ছে
“সাহাবাদের কন্যারা যদি আমাকে হাতে পায়, তাহলে তারা আমাকে কারাগারে পাঠাবে। আর যদি তাদের মনে হয় আমার বেঁচে থাকা রাজ্যের জন্য বিপজ্জনক, তাহলে মৃত্যুদণ্ড দিতেও দ্বিধা করবে না। আমি এত বছর ধরে যে ক্ষমতা ধরে রেখেছি, তা এভাবে শেষ হতে দিতে পারি না।”
ইংরেজ প্রধান বলল,
“তাহলে আপনার পরিকল্পনা কী?”
হারুণ এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে উত্তর দিলেন,
“আগামীকাল রাতেই অভিযান শেষ করতে হবে। মহলের সম্পদ, রাজকোষের মূল্যবান সামগ্রী এবং যেসব নথি আমাদের বিপদে ফেলতে পারে, সবকিছু নিয়ে বেরিয়ে যেতে হবে।”
ইংরেজ লোকটি বলল,
“এত অল্প সময়ে সবকিছু সরানো সহজ হইবে না”
“সহজ করার সময় আমার নেই!”
হারুণের কণ্ঠ কঠিন হয়ে উঠল।
“যা নেওয়া সম্ভব, নিতে হবে। যা সঙ্গে নেওয়া সম্ভব নয়, তা শত্রুর হাতে পড়তে দেওয়া যাবে না। আমাদের লোকদের প্রস্তুত করো। মহলের নিরাপত্তার দুর্বল জায়গাগুলো চিহ্নিত করো। তবে কোনো খবর যেন আগেভাগে বাইরে না যায়। আর আমি যথা সম্ভব আরকি যতদূর পারি প্রহরীদের সীমান্তের অপর দিকে পাঠিয়ে দিব কাজের বাহানায়। এতে সৈন্য কম থাকবে, ধরা পরার সুযোগ কম”
ইংরেজ প্রধান মাথা নাড়ল।
“বাদবাকি আমি ব্যবস্থা করিবো”
হারুণ দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাথা টেবিলে ঠেকালো। বাইরে রাতের অন্ধকার আরও ঘন হয়ে এসেছে। এই মহলই এখন তার কাছে ফাঁদ বলে মনে হচ্ছে।
হারুণ জানতেন, এই পরিস্থিতি চলতে থাকলে একদিন তাঁকে জবাবদিহি করতেই হবে। তাই তিনি পালানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। কিন্তু পালানোর আগে নিজের হাতে যা নেওয়া সম্ভব, তার কিছুই তিনি ছেড়ে যেতে চান না। বৈঠক শেষ হলে ইংরেজ প্রধান উঠে দাঁড়াল। গোপন পথ দিয়ে বেরিয়ে গেল। হারুণ টেবিলের ওপর রাখা রাজমোহর হাতে নিয়ে আঙুলের মধ্যে ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সেটার দিকে তাকালেন। এটা তার আদেশের প্রতীক, সেটাই এখন তাঁর কাছে হারিয়ে যেতে বসা ক্ষমতার স্মারক। তিনি মুঠো বন্ধ করলেন।
“আমি এত সহজে হারব না।”
মহলের অন্য প্রান্তে তখন দুই ভাইয়ের কক্ষে আলো জ্বলছিল। মেহরাব আর ইয়ামিন পাশাপাশি বসে নিজেদের অতীত নিয়ে কথা বলছে। একজনের শৈশব কেটেছে রাজমহলের নিয়মের মধ্যে। অন্যজনের শৈশব কেটেছে পাহাড়ের কুঁড়েঘরে। একজনকে রাজ্যের ভবিষ্যৎ শাসক হিসেবে বড় করা হয়েছে। অন্যজন নিজের জন্মপরিচয় না জেনেই জীবন কাটিয়েছে। তবু রক্তের সম্পর্কের টান তাদের মধ্যে অদ্ভুতভাবে জায়গা করে নিচ্ছিল। মেহরাব হাসতে হাসতে বলল,
“একদিন তোকে আমার সঙ্গে শিকারে যেতেই হবে।”
ইয়ামিন বলল,
“সে তোর সাথে শিকারে যেতে পারি। তবে রাজপুত্রের মতো সাজিয়ে নিয়ে যাবি না যেন!”
মেহরাব হেসে উঠল।
“তুমি যেমন আছিস, তেমনই যাবি। তোমার ভাই যে মধ্যপ্রাচ্যের একজন সুনামধন্য শিকারী তা কি জানো ভাইজান?”
“তাহলে চল একদিন আমার সাথে প্রতিযোগিতা কর”
দুজনেই হাত মেলালো হেসে। মেহরাব দাঁড়িয়ে বলল
“আমি উঠি এখন। আমার বউ আবার অপেক্ষা করছে”
****
পর ইয়ামিন খুব ভোরেই ঘুম থেকে উঠল। রাজপ্রাসাদের বিছানা, নরম পোশাক, চাকর-বাকর এসবের কোনোটাই তার কাছে এখনো স্বাভাবিক লাগছে না। পাহাড়ের খোলা বাতাসে বড় হওয়া মানুষ সে। এত নিয়ম, এত আনুষ্ঠানিকতা, এত মানুষের ভিড় সবকিছুই তার কাছে অচেনা। বারান্দার এক পাশে দাঁড়িয়ে নিচের বাগানের দিকে তাকিয়ে রইল।
ঠিক তখনই পেছন থেকে মিষ্টি গলায় ডাক এল
“ইয়ামিন সাহেব!”
ইয়ামিন ঘুরে তাকাল। জাহিদা দাঁড়িয়ে আছে।
আজও তার মুখে অকারণ হাসি।
“জি?”
জাহিদা ধীরে ধীরে তার কাছে এসে দাঁড়াল।
“সকাল থেকে আপনাকে খুঁজছিলাম।”
“কেন?”
“এমনিই। আপনার সঙ্গে একটু কথা বলতে ইচ্ছে করছিল।,
ইয়ামিন ভদ্রভাবে মাথা নেড়ে বলল,
“কী কথা? আর আপনাকে ঠিক চিনলাম না”
জাহিদা উত্তর না দিয়ে তার পাশে দাঁড়িয়ে পড়ল।
ইয়ামিন একটু সরে গেল। জাহিদাও সঙ্গে সঙ্গে এক পা এগিয়ে এল। ইয়ামিন এবার সরাসরি তাকাল।
“জি আপনি কিছু বলবেন?”
“আপনি আমাকে এড়িয়ে যাচ্ছেন কেন?”
“ইয়ে না মানে, এড়িয়ে কোথায় যাচ্ছি?”
“তাহলে এত দূরে দূরে দাঁড়াচ্ছেন কেন?”
ইয়ামিন শান্ত গলায় বলল,
“আমি মানুষের সঙ্গে এত ঘেঁষাঘেঁষি করে কথা বলতে অভ্যস্ত নই। তার ওপর মেয়েলোক”
জাহিদা হেসে ফেলল।
“আপনি তো গ্রামের ছেলে। এসব শিখতে সময় লাগবে।”
কথাটা শুনে ইয়ামিনের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।
“এখন তো মনে হচ্ছে গ্রামের ছেলে হয়ে ভালোই আছি”
জাহিদা এবার আরও কাছে এসে দাঁড়াল।
“রাগ করেছেন?”
“না”
“তাহলে হাসছেন না কেন?”
ইয়ামিন উত্তর না দিয়ে বারান্দা থেকে সরে যাওয়ার চেষ্টা করল।:জাহিদাও পিছু নিল। এভাবে সকাল থেকে প্রায় প্রতিটি জায়গাতেই জাহিদার উপস্থিতি দেখা গেল। ইয়ামিন যেখানে যায়, কিছুক্ষণ পর সেখানেই জাহিদা। খাবার ঘরে বসলে পাশে এসে বসে। বাগানে গেলে বাগানে আসে। মেহরাবের সঙ্গে কথা বললে দূরে দাঁড়িয়ে শুনতে থাকে।
পুরো বিষয়টি দেখছিল সাহারা। বুঝতে পারছিল, জাহিদার আচরণ নিছক সৌজন্য নয়। আর ইয়ামিন বিষয়টি বুঝতে না পারলেও বিরক্ত হচ্ছে এটাও তার চোখ এড়াল না। কিছুক্ষণ পর সাহারা এগিয়ে আসলো দুজনের কাছে
“জাহিদা।”
জাহিদা ঘুরে দাঁড়াল।
“জি, বারে ভাবি জান?”
“এসব কি?”
জাহিদা কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে হাসল।
“আমি তো উনাকে সঙ্গ দিচ্ছিলাম আরকি”
সাহারা শান্ত গলায় বলল,
“তোর ছোঁকছোঁকানি স্বভাবটা আর গেল না রে। মুখপুড়ি ভাসুর হয় তোর ভাসুর। তার গা ঘেঁষছিস নির্লজ্জের মতন”
শক্ত করে হাত ধরে মুচড়ে দিয়ে বলল
“একটা গা ঘেঁষে শান্তি হয়নি তোর? আবার এনারও গা ঘেঁষছিস? ভাইজান শুনেন। এ হচ্ছে জাহিদা, আপনাদের সবচেয়ে ছোট ভাই প্রতীক এর বউ। সে মারা গেছেন। এই মুখপুড়িটাকে রেখে গেছেন আপনাদের দুই ভাই এর হাড় মাস এক করে খেতে”
ইয়ামিন অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে মুচকি হাসলো। জাহিদাকে হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে গেল সাহারা।
****
সন্ধ্যা নামার পর মহল শান্ত রুপ নেয়। দিনের কোলাহল কমে গেছে। আকাশে চাঁদ উঠেছে। মহলের পেছনের দিকটা তুলনামূলক নির্জন। সেখানে পুরোনো একটি মিনার রয়েছে, যেটি বহুদিন ধরে প্রায় ব্যবহার হয় না। রাত গভীর হওয়ার আগে ইয়ামিন নিজের কক্ষে বসেছিল।
তার সামনে একটি কাগজ। দোয়াত আর কালি হাতে নিয়ে অনেকক্ষণ ধরে সে কিছু লিখতে পারছিল না। তারপর ধীরে ধীরে লিখল
“মায়া, তুমি কেমন আছ?...
থামল হাত। কত কথা জমে আছে মনে। কিন্তু লি লিখবে বুঝে আসে না।
“কী লিখব তোমা কে?”
জান্নাতকে সে অনেক কিছু বলতে চায়। এই নতুন রাজপ্রাসাদে এসে কেমন লাগছে। মেহরাব তাকে কীভাবে ভাই বলে আপন করে নিয়েছে। আয়েশা বেগম তাকে মা বলে ডাকতে বলেছেন। সবকিছু। কিন্তু সবচেয়ে বেশি বলতে চায়
“তুমি থাকলে হয়তো এই মহলটাকে এত অপরিচিত লাগত না।”
ইয়ামিন আবার কলম ধরল। ঠিক তখনই ঝনঝন… ঝনঝন…ঘুঙুরের শব্দে তার হাত থামল। শব্দটা দূর থেকে আসছে। ইয়ামিন উঠে দাঁড়াল। আবার শব্দ হলো। ঝনঝন... ঝনঝন...
শব্দের সঙ্গে অদ্ভুত এক ছন্দ। যেন কেউ নাচছে।
ইয়ামিন বারান্দায় এসে দাঁড়াল। মহলের পেছনের দিকে তাকিয়ে তার চোখ স্থির হয়ে গেল।
পুরোনো মিনারের ওপর একজন নারী নাচছে।
লম্বা পোশাক। চুল খোলা। মাথা ঘোমটূয় ঢাকা পায়ের ঘুঙুরের শব্দ রাতের নীরবতা কেটে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে। ইয়ামিনের বুকের ভেতর অস্বস্তি তৈরি হলো।
“এখানে কে?”
ঠিক তখন পাশের কক্ষের দরজা খুলল। আলীরাজ বেরিয়ে এলেন। তার চোখ যেন সেই মিনারের দিকেই স্থির। ইয়ামিন সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারল বিষয়টা স্বাভাবিক নয়। সে দ্রুত এগিয়ে গিয়ে আলীরাজের হাত ধরে ফেলল।
“কোথায় যাচ্ছেন?”
আলীরাজ চমকে তাকালেন।
“এইই, ছাড়ো আমাকে।”
“আপনি ওইদিকে যাচ্ছেন কেন”
আলীরাজ হাত ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলেন।
“তুই বুঝবি না।”
“আমি না বুঝলেও এটা বুঝতে পারছি, আপনি ভুল জায়গায় যাচ্ছেন। আপনার মরণ ডাকছে আপনাকে”
আলীরাজ এবার কঠিন গলায় বললেন,
“ইয়ামিন, আমার হাত ছাড়।”
“না।”
দুজনের মধ্যে কয়েক মুহূর্ত টানাটানি হলো। আবার সেই ঘুঙুর বাজল। ঝনঝন... ঝনঝন...
আলীরাজ যেন সেই শব্দের টানে আরও অস্থির হয়ে উঠলেন। ইয়ামিন তার পথ আটকে দাঁড়াল।
“আপনি এক পা-ও যাবেন না”
আলীরাজ ফিসফিস করে বলল,
“ও আমাকে ডাকছে।”
আলীরাজ আচমকা তাকে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে গেলেন। ইয়ামিন পেছন থেকে ডাকল। কিন্তু আলীরাজ থামল না। ইয়ামিন দ্রুত তার পিছু নিল। হাঁটতে হাঁটতে সে নিজের বিশ্বাসের পরিচিত আয়াত ও সূরার কথা মনে করে নিচু স্বরে পাঠ করতে লাগল। তার কণ্ঠ স্থির। ভয় থাকলেও মনকে স্থির রাখার চেষ্টা করছিল সে। মিনারের কাছাকাছি পৌঁছাতেই নারীটি নাচ থামাল। তারপর ধীরে ধীরে মাথা তুলল। তার চোখ সরাসরি ইয়ামিনের দিকে। এক মুহূর্তের জন্য চারপাশ যেন স্তব্ধ হয়ে গেল। নারীটি হাত তুলল।
ঠোঁটে অদ্ভুত হাসি। ইয়ামিনের চোখ তার চোখের সঙ্গে মিলল। কিন্তু এবারও কিছু হলো না। নারীর মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। সে বিস্মিত। ইয়ামিন এক পা এগিয়ে গেল।
“তুই কে? বল কে তুই”
নারীটি পেছাতে শুরু করল।
“আমাকে তোমার ভয় করছে না?
ইয়ামিন শান্ত গলায় বলল,
“ভয় পাচ্ছি। কিন্তু ভয় পাওয়া আর নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানো এক জিনিস নয়।”
নারীটি হঠাৎ ঘুরে পালাতে চাইতেই ইয়ামিন ঝাঁপিয়ে পড়ে তার হাত ধরে ফেলল। সে ছটফট করতে লাগল।
“ছাড়ো! ছাড়ো আমায়”
“আগে বল, কে তুই?”
“ছাড়ো!
“তুই পাহাড়ের ওই তান্ত্রিক দলের লোক তাই না?”