ফন্ট সাইজ:
থিম:
রক্তমুকুট

55

লেখক: জান্নাতুল ফেরদৌস

রাত গভীর। মহলের পেছনের পুরোনো মিনার থেকে ধরা সেই নারীকে দুজন প্রহরী সঙ্গে নিয়ে ইয়ামিন মহলের একটি নির্জন কক্ষে নিয়ে এল।

নারীর হাত বাঁধা তবুও মুখে কোনো ভয় নেই। তেজে ধস্তাধস্তি করছে প্রহরীদের সাথে। ইয়ামিন দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বলল,

“এখানে থাকবে। এক পা নড়বে না”

নারীটি ঠান্ডা গলায় বলল,

“তুমি জানো না, আমাকে আটকে রেখে কী বিপদ ডেকে আনছ। বাইরের আগুন ঘরে টেনে আনলে যুবরাজ”

“বিপদ তো তুই ডেকে এনেছিস নিজের। এবার দেখ বিপদ কাকে বলে”

“আমাকে ছেড়ে দাও”

“আগে বল, কে তুই?”

মেয়েটা চুপ করে রইল। ইয়ামিন প্রহরীদের বলল,

“কেউ একা ওর কাছে যাবে না। আর দরজা আমার অনুমতি ছাড়া খুলবে না।”

এরপর সে বেরিয়ে গেল। কিছুক্ষণের মধ্যেই মহলের গুরুত্বপূর্ণ লোকজনকে খবর দেওয়া হলো। মেহরাব, সাহারা, আয়েশা বেগম, আলীরাজ এক এক করে সবাই এসে উপস্থিত হলো। ইয়ামিন তাদের সামনে পুরো ঘটনা বলল।

“রাতে আমি বারান্দায় বসে ছিলাম। তখন পেছনের মিনার থেকে ঘুঙুরের শব্দ শুনি। গিয়ে দেখি ওই নারী নাচছে। আলীরাজও ওইদিকে যাচ্ছিলেন। আমি তাকে আটকানোর চেষ্টা করি। পরে বুঝতে পারি, ওই নারী পাহাড়ের সেই তান্ত্রিকদের দলের একজন। তারা দীর্ঘদিন ধরে পাহাড়ের অনিষ্ট করে আসছিল কুফরি আর কালো যাদু দিয়ে।”

সাহারার মুখ গম্ভীর হয়ে গেল।

“ইয়া আল্লাহ। মামা বাবু আপনি কেন গেছিলেন ওখানে?”

আলীরাজ আহম্মকের মত মাথা নেড়ে বলল

“ওর কাছে গেলে আমার মাথা ঠিকমতো কাজ করে না। মনে হয় আমাকে কেউ টেনে নিয়ে যাচ্ছে।”

আয়েশা বেগম ঝাঁঝিয়ে উঠল

“তো যাস কেন? মাথা কাজ করে না তো ওই নষ্ট মেয়েছেলের কাছে যাওয়ার দরকারই বা কি”

ইয়ামিন আয়েশাকে থামিয়ে বলল

“আম্মা অহেতুক বকবেন না ওকে। নিজের নিয়ন্ত্রণে যায় না কেউ ওর কাছে। সম্মোহন করে টেনে নেয় ওই ছলনাময়ী”

সাহারা সঙ্গে সঙ্গে ইয়ামিনের দিকে তাকাল।

“আপনি কীভাবে ওর প্রভাব থেকে বাঁচলেন?”

ইয়ামিন কিছুক্ষণ চুপ করে বলল,

“আমি জানি না। আমি শুধু নিজের বিশ্বাসের কথা মনে রেখে নিজেকে স্থির রেখেছিলাম। সাথে ছিল আল্লাহর পবিত্র কালাম”

মেহরাব বলল,

“ওকে কাল জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে”

ইয়ামিন মাথা নেড়ে সম্মতি দিল। কিন্তু সাহারার মনে তখন অন্য একটা প্রশ্ন জেগে উঠেছে। এই নারী কি একা এসেছিল? আর ইয়ামিন যে তান্ত্রিকদের কথা বলছে সেই দলকেই কি জান্নাত হত্যা করেছে?

সাহাবাদে রাত আরও গভীর। জান্নাত একা হাঁটছিল কারাগারের পথ দিয়ে। তার সামনে প্রহরী দরজা খুলে দিল। ভেতরে মুয়াজ বসে ছিল। একসময় যে মানুষটি জান্নাতের ভবিষ্যৎ স্বামী হবে বলে মহলে এসেছিল, আজ সে সাহাবাদের কারাগারের বন্দি। জান্নাত কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল। মুয়াজও তাকিয়ে রইল। জান্নাত বলল,

“আমি একটা উত্তর নিতে এসেছি।”

মুয়াজ চুপ।

“কেন আমাকে মারতে চেয়েছিলেন?”

মুয়াজের চোখ নেমে গেল। জান্নাত আবার বলল,

“আপনি যদি আমাকে সত্যিই ভালোবাসতেন, তাহলে আমাকে হত্যা করার চেষ্টা করতে না। এছাড়া আপনার সাথে তো আমার শত্রুতা নেই। আপনার পরিবারের সাথেও আমার পরিবারের শত্রুতা নেই। তাই আজ আমি জানতে চাই কার নির্দেশে? কার নির্দেশে বা কোন উদ্দেশ্যে এমন জঘন্য কাজ করলেন আপনি?”

মুয়াজ দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

“হারুণ ওয়াসেম”

জান্নাতের চোখ সরু হয়ে গেল।

“কী বললেন?”

“জি শাহজাদী, হারুণ ওয়াসেম আমাকে নির্দেশ দিয়েছিল। আমি জানি আমাকে আজ হোক বা কাল মৃত্যুদন্ড দেওয়া হবে। তাই সত্যিটা চেপে আর লাভ কি বলুন”

জান্নাত মোড়া টেনে বসল

“কিন্তু হারুণ ওয়াসেম আমাকে কেন মারতে বলবেন?”

মুয়াজ এবার বলতে শুরু করল।

“একদিন হারুণ ওয়াসেম ফাইয়াজের ডেরার কাছে ছিল। সে আপনাকে সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে দেখেছিল”

জান্নাত স্থির হয়ে গেল।

“আমাকে?”

“হ্যাঁ।”

“তারপর?”

“সরাট ধারণা করেছিল, ফাইয়াজের সঙ্গে আপমার কোনো সম্পর্ক আছে।”

জান্নাতের মুখে অবিশ্বাস ফুটে উঠল।

“শুধু এই সন্দেহের জন্য কেউ কাওকে হত্যা করতে পারে নাকি?”

“উঁহু। ফাইয়াজ সম্রাটের কত বড় শক্তি ছিল তা হয়তো আপনাদের অজানা। সেদিন মহলে ডাকাত পড়েছিল তাও সম্রাট হারুণ ওয়াসেমের নির্দেশেই। ফাইয়াজ তার হয়ে আপনাদের হত্যা করতে এসেছিল। বিমিময়ে পেত লুট কৃত মালামাল”

মুয়াজ একটু থামল।

“হারুণ আমাকে বলেছিল, যদি আমি আপনাকে হত্যা করতে পারি, তাহলে সাহাবাদে আমার জন্য বড় একটি বাণিজ্য ঘাঁটি তৈরি করে দেবে।”

জান্নাতের চোখে ঘৃণা ফুটে উঠল।

“অর্থাৎ সাহাবাদের মাটিতে ব্যবসা করার লোভ দেখিয়ে আমাকে হত্যা করাতে চেয়েছিলেন উনি?”

“হ্যাঁ”

“আর আপনি রাজি হয়েছিলেন?”

মুয়াজ মাথা নিচু করল।

“হ্যাঁ।”

জান্নাত কয়েক মুহূর্ত তার দিকে তাকিয়ে রইল।

“হাহ….কিন্তু তুমি আমার কাছে পৌঁছাতে পারোনি”

মুয়াজ তিক্তভাবে হাসল।

“সেটাই সমস্যা ছিল। আপনার দুই বোন বাইরে বের হতো। শাখা, সাহারা তাদের গতিবিধি জানা যেত। কিন্তু আপনি কখনোই একা মহলের বাইরে বের হতেন না। মহলের ভেতরে আপনার কাছে পৌঁছানোর একমাত্র সহজ উপায় ছিল বিয়ে”

জান্নাতের বুকের ভেতর কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল। মুয়াজ চোখ বন্ধ করল।

“কিন্তু তখন আমার একটা গোপন ছিল। সৌদামিনী”

কারাগারের বাতাস ভারী হয়ে উঠল

“আমি তাকে ভালোবাসতাম। কিন্তু বাবা তাকে মেনে নিত না। সে ছিল গরিব ঘরের মেয়ে। তাই আমরা গোপনে বিয়ে করেছিলাম।”

জান্নাত প্রশ্ন করল

“তারপরও আমাকে বিয়ে করতে এলে?”

মুয়াজ উত্তর দিতে পারল না। কিছুক্ষণ পর বলল,

“হারুণের পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে আমি তোমাকে বিয়ের মাধ্যমে মহলে ঢুকতে চেয়েছিলাম।”

জান্নাতের মুখ শক্ত হয়ে গেল। মুয়াজ বলতে লাগল,

“যেদিন আপনাকে অজ্ঞান করে বিয়ের পোশাকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, আমরা তো ভেবেছিলাম সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী হবে। কিন্তু হঠাৎ একজন অচেনা যুবক এসে আমাদের ওপর আক্রমণ করে”

জান্নাতের চোখ বড় হয়ে গেল।

“যুবক?”

“হ্যাঁ। তাকে আমি আগে কখনো দেখিনি। আমাদের লোকজনকে আহত করে সরিয়ে দিয়ে আপনাকেকে নিয়ে চলে যায়।”

জান্নাত পেছনে সরে গেল। মুয়াজের পরের কথাটা শুনে তার বুক যেন থেমে গেল।

“আর আমার লোকেরা, যারা পরে নদীতে পৌছায়। তারা আপনাকে মনে করে সৌদামিনীকে হত্যা করে।”

জান্নাত কিছু বলতে পারল না। তার চোখের সামনে হঠাৎ একের পর এক পুরোনো স্মৃতি ভেসে উঠতে লাগল। নদীর পানি। অন্ধকার। শরীরের দুর্বলতায় এগোতে পারছিল না। তারপর একজন যুবকের মুখ আবছা দেখল। তারপর ইয়ামিনের অদ্ভুত যত্ন, আদরে বাড়িতে রাখা। মানে সবটা পরিকল্পিত ছিল? ইয়ামিন জান্নাতকে চিনত আগে থেকেই?

“তাহলে ইয়ামিন আমাকে নদী থেকে ভেসে যাওয়ার সময় উদ্ধার করেনি”

মুয়াজ চুপ। জান্নাতের চোখ আরও বড় হয়ে উঠল।

“সে আমাকে ওদের হাত থেকে বাঁচিয়ে নিয়ে গিয়েছিল পরিকল্পনা করে”

মুয়াজ কোনো উত্তর দিল না। জান্নাতের মাথার ভেতর যেন ঝড় উঠেছে। সে এতদিন ভেবেছিল ইয়ামিন তাকে কাকতালীয়ভাবে পেয়েছিল। কিন্তু পরিকল্পনা ছিল জান্নাতের দিক থেকে। ভেবেছিল তার অতীতের কিছুই ইয়ামিন জানে না। কিন্তু যদি তা না হয়? যদি ইয়ামিন প্রথম দিন থেকেই জানত সে কে? যদি সে জানত, কারা জান্নাতকে খুঁজছে?

যদি সেই অচেনা যুবক ইয়ামিনই হয়ে থাকে? জান্নাত হঠাৎ মুয়াজের দিকে তাকাল।

“তুমি ওই যুবকের মুখ দেখেছিলে?”

মুয়াজ মাথা নাড়ল।

“না। আমি ওখানে ছিলাম না। আমি তো এই মহলেই ছিলাম”

জান্নাত আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না। দরজার দিকে এগিয়ে গেল। প্রহরী দরজা খুলে দিল। জান্নাত দ্রুত কারাগারের করিডোর পেরিয়ে গেল।

****

সকাল থেকেই আমিরাবাদ মহলে অস্বাভাবিক ব্যস্ততা। একটার পর একটা ঘোড়া মহলের প্রধান ফটক পেরিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে। প্রহরীদের দল অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে পশ্চিম ও উত্তর সীমান্তের দিকে রওনা হচ্ছে। মেহরাব দূর থেকে দাঁড়িয়ে বিষয়টা দেখছিল। তার ভ্রু কুঁচকে আছে। দ্রুত বাবার কক্ষে ঢুকে পড়ল। হারুণ ওয়াসেম তখন কয়েকজন সেনাপতির সঙ্গে বসে কিছু কাগজ দেখছিলেন। মেহরাব কোনো ভূমিকা না করে বলল,

“আব্বা, এত প্রহরীকে সীমান্তে পাঠাচ্ছেন কেন?”

হারুণ মুখ তুললেন।

“সীমান্তে নজরদারি বাড়ানো দরকার।”

“আজই?”

“হ্যাঁ।”

“কিন্তু এত প্রহরী চলে গেলে তো মহলের ভেতরের নিরাপত্তা কমে যাবে”

হারুণ হেসে বললেন,

“সেসব আমার মাথায় আছে। তুমি অযথা চিন্তা করছ।”

মেহরাব এবার একটু কঠিন গলায় বলল,

“আব্বা আমি অযথা চিন্তা করছি না। এই মুহূর্তে আমিরাবাদের ভেতরে পাহারা কমানো কোনোভাবেই ঠিক হবে না।”

“তুমি কি আমাকে রাজ্য পরিচালনা শেখাবে?”

মেহরাব থেমে গেল। কয়েক মুহূর্ত বাবার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,

“আমি শুধু সতর্ক করছি। যা ভালো বোঝেন এরপর”

“সতর্কতা যথেষ্ট আমিও বুঝি মেহু”

মেহরাব আর তর্ক করল না। কিন্তু বেরিয়ে যাওয়ার সময় তার মনে অস্বস্তিটা আরও বেড়ে গেল। বাবার সিদ্ধান্তটা তার কাছে অযৌক্তিক নয় অস্বাভাবিকও

*****

দিন গড়িয়ে সন্ধ্যা হলো। তারপর রাত। আকাশে মেঘ জমেছে। শীতের বিদায় বেলা চলে। বৃষ্টি হতে পারে। চাঁদের আলো নেই বললেই চলে। মহলের ভেতর নীরবতা। যে প্রহরীরা প্রতিদিন আগাগোড়া টহল দেয়, তাদের সংখ্যা আজ চোখে পড়ার মতো কম। মেহরাব নিজের কক্ষে বসে ছিল। দূরে ঘোড়ার ক্ষীণ শব্দ শোনা গেল। সে উঠে জানালার কাছে গেল। হয়ত প্রহরীরা ফেরত আসছে। অন্ধকারে কিছুই স্পষ্ট দেখা গেল না। কিছুক্ষণ পর ধাম! করে মহলের একটি বাইরের দরজা ভেঙে পড়ার শব্দ হলো।

মেহরাব চমকে উঠল। তারপর একসঙ্গে বহু মানুষের চিৎকার

“সবাইকে ঘিরে ফেলো! কেউ পালাতে পারবে না! আগে রাজকোষের দিকে যাও!”

মেহরাব দরজা খুলে বাইরে বেরোতেই কয়েকজন সশস্ত্র লোক তার দিকে অস্ত্র তাক করল। একজন চিৎকার করে বলল,

“পেছনে যাও!”

মেহরাব থেমে গেল। তারপর দূরে দেখতে পেল প্রায় একশোর মতো লোক মহলের বিভিন্ন অংশে ঢুকে পড়েছে। তাদের অনেকের পোশাক বিদেশিদের মতো। বাকিরা হারুণের গোপন লোক। আর তাদের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে সেই ইংরেজ নেতা। মেহরাবের বুকের ভেতর কেঁপে উঠল।

“ইংরেজরা…?”

ঠিক তখনই হারুণ ওয়াসেমকে দুজন লোক ধরে নিয়ে এল। তার হাত বাঁধা। মুখে ভয়ের অভিনয়।

চিৎকার করে বললেন,

“আমাকে ছেড়ে দাও! আমাকে বাঁচাও। ইয়ামিন আমার বাচ্চা। আমাকে উদ্ধার করো”

মেহরাব হতভম্ব।

“আব্বা!”

হারুণ তার দিকে তাকিয়ে বললেন,

“মেহরাব! তুমি পালাও!”

“কি বলছেন আব্বা? সবাইকে বিপদের মুখে রেখে আমিনপালাব কাপুরুষের মতন?”

ইংরেজ নেতা হেসে উঠল।

“কেউ পালাইবার সুযোগই পাইবে না রাজপুত্র”

মেহরাব তার দিকে তাকাল।

“তুমি আমিরাবাদে ঢোকার সাহস কীভাবে পেলে? বিশ্বাসঘাতক, প্রতারক”

“তোমার বাবার সৌজন্যে।”

মেহরাবের চোখ সরু হয়ে গেল। কিন্তু হারুণ এমনভাবে অভিনয় করছিলেন যেন তিনি সত্যিই আতঙ্কিত।

“ওরা সব নিয়ে যাবে! হায় হায় হায় আমার প্রজাদের কি হবে এবার?”

“আব্বা, আপনি চিন্তা করবেন না।”

হারুণ চিৎকার করে বললেন,

“আগে নিজেদের বাঁচাও তোমরা”

মেহরাব এগিয়ে যেতে চাইতেই কয়েকজন লোক তাকে আটকে দিল। ইংরেজ নেতা হাত তুলে বলল,

“রাজপুত্রকে এখনই কিছু করো না। আমাদের কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত সবাইকে জীবিত রাখো।”

তারপর সে নিজের লোকদের নির্দেশ দিল,

“রাজকোষ খুলে ফেলো! অস্ত্রাগারে যাও! রাজপরিবারের নথি, সিলমোহর, মূল্যবান জিনিস সব নিয়ে নাও!”

একদল লোক ছুটে গেল রাজকোষের দিকে। আরেকদল অস্ত্রাগারের দিকে। কেউ রাজকীয় নথির ঘরে ঢুকে পড়ল। মহলের একের পর এক কক্ষ তছনছ হতে লাগল। হারুণ তখনও বন্দির অভিনয় করে দাঁড়িয়ে আছেন। আবার মিছেমিছি চিৎকার করছেন,

“ওগুলো নিও না! ওগুলো আমার রাজস্বের হিসাব। তোমরা সব নিয়ে যাও তাও আমার প্রজাদের কিছু কোরো না!”

মেহরাব বাবার দিকে তাকিয়ে আছে। মনে হচ্ছে আজ তার বাবা সত্যিই অসহায়। সে বুঝতে পারছিল না, কীভাবে এই বিপদ থেকে সবাইকে রক্ষা করবে।

****

প্রায় বেশ সময় পর পর। রাজকোষের অধিকাংশ মূল্যবান জিনিস সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। রাজপরিবারের গুরুত্বপূর্ণ দলিলের সিন্দুকও ইংরেজদের হাতে। অস্ত্রাগার প্রায় খালি। মহলের মূল্যবান সামগ্রী একের পর এক বাইরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ইংরেজ নেতা সন্তুষ্ট চোখে চারপাশ দেখল।

“সবকিছু প্রায় আমাদের।”

তার পাশে থাকা একজন বলল,

“স্যার, এবার চলে যাওয়া উচিত”

ইংরেজ নেতা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ধীরে ধীরে হারুণের দিকে তাকাল। হারুণ তখনও বাঁধা অবস্থায় দাঁড়িয়ে। তারও চোখে মুখে সন্তুষ্টি উপচে পড়ছে। পরিকল্পনা মত এখন ইংরেজদের সাথে সেও চলে যাবে। কিন্তু ইংরেজি নেতা করে বসল এক দুঃসাহসিক কাজ

“তোমাকে সঙ্গে নিলে তো ভাগ দিতে হবে”

হারুণের মুখ শুকিয়ে গেল।

“এ কি বলছো তুমি? আমরা তো একসঙ্গে পালাব বলে ঠিক করেছিলাম তুমি আমার সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করবে?”

ইংরেজ নেতা ঠান্ডা হাসল।

“বিশ্বাসঘাতকতা? সে তো তোমার থেকেই শিখিয়াছি মহামান্য”

সে চারপাশের সিন্দুকগুলোর দিকে তাকাল।

“এগুলো এখন আমার”

হারুণ কাঁপা গলায় বললেন,

“তোমাকে এই রাজ্যে ঢুকিয়েছি আমি…..”

হারুণ কিছু বলতে যাচ্ছিলেন। কিন্তু তার আগেই ইংরেজ নেতা নিজের লোকদের দিকে তাকিয়ে কিছু একটা ইশারা করল। পরের মুহূর্তেই হারুণ ওয়াসেমকে হত্যা করা হলো। মেহরাবের চোখের সামনে। সবকিছু যেন এক মুহূর্তে থেমে গেল।

“আব্বা!”

তার চিৎকারে পুরো মহল কেঁপে উঠল। সে ছুটে যেতে চাইলে কয়েকজন তাকে ধরে ফেলল।

মেহরাব পাগলের মতো ছটফট করতে লাগল।

“আমার বাবাকে তোমরা হত্যা করলে! জালিয়াতের দল সব। তোদের ছাড়ব না আমি”

ইংরেজ নেতা নির্বিকার।

“কাহার জন্য কাঁদিতেছো যুবক? তুমি জানো সে কি করিয়াছে…..”

মেহরাবের চোখ রক্তিম হয়ে উঠল।

“তুই...তুই আমার বাবাকে মেরেছিস।”

ইংরেজ নেতা হাসল।

“রাজপুত্র, আবেগ দিয়ে যুদ্ধ জেতা যায় না।”

মেহরাব গর্জে উঠল,

“আজ তোকে বুঝিয়ে দেব, আমিরাবাদের একজন সন্তানের সামনে তার পিতাকে হত্যা করার মূল্য কী!”

ইংরেজ নেতার দানবীয় হাসিতে কেঁপে উঠল পুরো মহল।

“হ’ত্যা করো সবাইকে”

ঠিক সেই মুহূর্তে মহলের বাইরে প্রচণ্ড শব্দ। প্রধান ফটকের দিক থেকে প্রহরীদের চিৎকার শোনা গেল।

“অন্য কোনো বাহিনীআসছে! ফটক বন্ধ করো!”

ইংরেজ নেতা চমকে উঠল।

“কী হচ্ছে?”

একজন লোক দৌড়ে এসে বলল,

“হুজুর! বাইরে বিরাট বাহিনী!”

“কার?”

লোকটি হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,

“সাহাবাদের পতাকা!”

মেহরাবের চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল। তারপর দূর থেকে ভেসে এল যুদ্ধের স্লোগান। আর তার সামনে ঘোড়ার পিঠে ঝড়ের মতো এগিয়ে আসছে একজন নারী। হাতে তলোয়ার। চোখে আগুন। পেছনে অসংখ্য অশ্বারোহী। সবার সামনে থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছে শাখা নেওয়াজ। শাখা ঘোড়া থামিয়ে মহলের দিকে তাকাল। তার কণ্ঠ রাতের অন্ধকার ছেদ করে উঠল

“লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ….আল্লাহু আকবার”

তার পেছনে হাজারো কণ্ঠ একসঙ্গে গর্জে উঠল।

“আল্লাহু আকবার!”

ইংরেজদের মধ্যে মুহূর্তেই আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ল। একজন বলল,

“আমরা তো ভেবেছিলাম সীমান্তের সব সৈন্য দূরে!”

শাখার ঠোঁটে কঠিন হাসি ফুটল।

“সীমান্তে যারা গেছে, তারা তোমাদের জন্য ছিল না।”

সে তলোয়ার উঁচিয়ে বলল,

“তোমাদের জন্য ছিলাম আমি”

এরপর শুরু হলো প্রচণ্ড সংঘর্ষ। সাহাবাদের বাহিনী চারদিক থেকে মহল ঘিরে ফেলল। ইংরেজরা পালানোর চেষ্টা করল। কেউ অস্ত্রাগারের দিকে ছুটল। কেউ পেছনের দরজার দিকে। কিন্তু শাখার বাহিনী প্রতিটি পথ বন্ধ করে দিয়েছে। মেহরাবও শেষ পর্যন্ত নিজের বাঁধন থেকে মুক্ত হয়ে অস্ত্র হাতে তুলে নিল। তার চোখে আগুন, পিতার হত্যার প্রতিশোধ। সংঘর্ষ দীর্ঘ হলো। ইংরেজদের প্রতিরোধ ভেঙে পড়তে শুরু করল। তাদের প্রায় অর্ধেক সৈন্য যুদ্ধে নিহত হলো। বাকিরা অস্ত্র ফেলে আত্মসমর্পণ করল।

তাদের হাত বাঁধা হলো। সাহাবাদের সৈন্যরা একে একে তাদের কারাগারের দিকে নিয়ে যেতে লাগল। আর মহলের ভেতর চারদিকে লুটপাটের চিহ্ন। ভাঙা দরজা, ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে কাগজ পত্র, খালি সিন্দুক আর রাজপ্রাসাদের এক প্রান্তে নিথর পড়ে আছেন হারুণ ওয়াসেম। মেহরাব ধীরে ধীরে বাবার কাছে গিয়ে হাঁটু গেড়ে বসল। তার চোখ থেকে অশ্রু ঝরছে। সে কাঁপা গলায় বলল,

“বাবা! বাবা ওঠো বাবা। বাবা ওঠো নাআআআ। তুমি এভাবে আমাদের ছেড়ে যেতে পারো না”

তার পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা শাখা কিছু বলল না।

তিক্ত হাসি ফুটল তার ঠোঁটে। কোন পিতার জন্য কাদছে মেহরাব। কিছুক্ষণ পর প্রবেশ করল উয়ামিন আর সাহারা। সাহারা খুড়িয়ে খুড়িয়ে হাঁটছে। জান্নাতও আছে পিছনে। মূলত তাদের পরিকল্পনাতেই ধরা পরল এই ঘাতক চক্র।

মহলের ধ্বংসস্তূপের মাঝখানে দাড়িয়ে সবাই নীরব। সম্রাটের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে শুরু হতে চলেছে সিংহাসনের জন্য আরও ভয়ংকর এক লড়াই।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে 55 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন