আমিরাবাদ রাজপ্রাসাদের ভয়াবহ সংঘর্ষ শেষ হয়েছে। রাজকোষের দরজা ভাঙা, মূল্যবান আসবাবপত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে আছে, রাজকীয় নথির ঘরের আলমারিগুলো ফাঁকা। বারান্দার এক পাশে আহত সৈন্যদের চিকিৎসা চলছে। অন্য পাশে সারিবদ্ধভাবে বসিয়ে রাখা হয়েছে আত্মসমর্পণকারী ইংরেজ সৈন্যদের।
প্রাসাদের প্রধান সভাকক্ষের বাইরে মশাল হাতে দাঁড়িয়ে আছে সাহাবাদের সৈন্যরা। তাদের পোশাকে দীর্ঘ যাত্রার ধুলো, মুখে ক্লান্তি, কিন্তু চোখে বিজয়ের দৃঢ়তা। সবার সামনে দাঁড়িয়ে শাখা নেওয়াজ নিজের তলোয়ারটি একজন সৈন্যের হাতে তুলে দিল।
“কয়েদিদের আলাদা করে রাখো। যারা অস্ত্র ফেলে আত্মসমর্পণ করেছে, তাদেরও কঠোর পাহারায় রাখতে হবে। কেউ যেন পালাতে না পারে। আর ইংরেজ দলের নেতাকে অন্যদের থেকে আলাদা কক্ষে নিয়ে যাও।”
সেনাপতি মাথা নত করল।
“আপনার যা আদেশ, শাহজাদি।”
শাখা একটু থেমে বলল,
“আর রাজপ্রাসাদের যেসব নথি এখনো উদ্ধার করা সম্ভব, সেগুলো সংগ্রহ করো। কোনো কাগজ যেন নষ্ট না হয়। এই লুটের পেছনে কারা ছিল, তার প্রমাণ আমাদের প্রয়োজন।”
কথাটা শুনে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সাহারা শাখার দিকে তাকাল।
“প্রমাণ শুধু এই রাতের জন্য প্রয়োজন নয়, আপা। পনেরো বছর ধরে যে প্রশ্নগুলোর উত্তর আমরা খুঁজছি, সেগুলোরও।”
শাখা বোনের দিকে তাকিয়ে গম্ভীরভাবে মাথা নাড়ল।
“জানি”
প্রাসাদের উত্তর দিকের একটি পাথরের কক্ষে ইংরেজ নেতাকে নিয়ে আসা হলো। তার দুই হাত বাঁধা চোখে তবও সেই উদ্ধত ভাব। কক্ষের মাঝখানে একটি ভারী কাঠের টেবিল। তার এক পাশে বসেছে শাখা, সাহারা ও মেহরাব। ইয়ামিন দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে। কয়েকজন সশস্ত্র প্রহরী দেয়ালের পাশে অবস্থান নিয়েছে। মেহরাবের মুখ পাথরের মতো কঠিন। তার চোখে এখনো পিতার মৃত্যুর দৃশ্য জ্বলছে। শাখা প্রথমে কথা বলল।
“আপাতত তোমার কাছে আমরা জানতে চাই, আজ রাতে আমিরাবাদ রাজপ্রাসাদে কী করতে এসেছিলে? উদ্দেশ্য কি শুধুই লুট?”
লোকটি কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে হাসল।
“যে কাজ করতে এসেছিলাম, তা প্রায় শেষ করেই ফেলেছিলাম। রাজকোষ আমাদের হাতে ছিল। অস্ত্রাগার খালি হচ্ছিল। রাজদলিলও নিয়ে যাচ্ছিলাম। তোমাদের বাহিনী না এলে এতক্ষণে আমরা নদীপথে অনেক দূরে চলে যেতাম।”
মেহরাব টেবিলে হাত চাপড়াল।
“তাহলে স্বীকার করছ, আমার রাজপ্রাসাদ লুট করার জন্যই এসেছিলে?”
“অবশ্যই।”
“আর আমার বাবাকে কেন হত্যা করেছ?”
ইংরেজ নেতা তার দিকে তাকাল।
“হ্যা তোমার বাবাকে আমি হত্যা করেছি। কিন্তু তাকে এই রাতের ষড়যন্ত্রে টেনে আনার জন্য আমাকে বেশি পরিশ্রম করতে হয়নি। উল্টো সেই আমাকে উস্কেছে”
মেহরাবের চোখে আগুন জ্বলে উঠল।
“কী বলতে চাইছ?”
লোকটি একটু সামনের দিকে ঝুঁকল।
“আমি বলতে চাইছি, রাজপুত্র, তুমি যে মানুষটিকল এতক্ষণ নিজের রাজ্যের সম্রাট এবং তোমার পিতা ভেবে তার জন্য দুঃখ পাচ্ছ। এই লুটের পরিকল্পনার মূল হোতা সেই মানুষটিই ছিল।”
ইংরেজ নেতার ঠোঁটে বিদ্রূপাত্মক হাসি ফুটল।
“এই রাজপ্রাসাদে আমাদের প্রবেশের ব্যবস্থা সে নিজেই করেছিল। দিনের আলো থাকতে থাকতে সে বহু প্রহরীকে সীমান্তে পাঠিয়েছে। তোমার আপত্তি সত্ত্বেও তাদের ফিরিয়ে নেয়নি। তুমি ভেবেছিলে, সে রাজ্যের নিরাপত্তা নিয়ে ভুল সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। অথচ সে ভালো করেই জানত, রাতে কী ঘটতে যাচ্ছে।”
মেহরাব চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়াল।
“মিথ্যা! তোর এত বড় সাহস, তুই আমার বাবার ন্যায়পরায়ণতা নিয়ে অপবাদ দিচ্ছিস?”
ইংরেজ নেতা নির্বিকারভাবে বলল,
“মিথ্যা হলে তোমার বাবা আমাদের সঙ্গে একই রাতে পালানোর পরিকল্পনা করত নদ। তোমার বাবার পরিকল্পনা ছিল, রাজপ্রাসাদ লুট হবে, তিনি বন্দি হওয়ার অভিনয় করবেন, আর আমরা সব সম্পদ নিয়ে বেরিয়ে যাব। পরে তিনি সুযোগ বুঝে আমাদের সঙ্গে চলে যেতেন। কেউ তাকে দায়ী করতে পারত না। সবাই ভাবত, ইংরেজরা তাকে বন্দি করে সবকিছু লুট করেছে।”
মেহরাবের মুখ বিবর্ণ হয়ে গেল। ইংরেজ নেতা আবার বলল,
“কিন্তু আমি তাকে সঙ্গে নিয়ে যাওয়ার প্রয়োজন দেখিনি। ভাগ দিতে হতো। তাই তাকে সরিয়ে দিয়েছি। তাছাড়াও যে নিজের রাজ্য, পুত্র পরিজনের সাথে বেইমানি করতে পারে সে যে আমাদের সাথে বেইমানি করবে না তার নিশ্চয়তা কি?”
মেহরাব টেবিলের ওপর রাখা পানির পেয়ালাটি মেঝেতে ছুড়ে ফেলল।
“তুমি আমার বাবাকে হত্যা করেছ, আর এখন তার নামে কুৎসা রটাচ্ছ! আমি আজই তেমার গর্দান নিয়ে নেব”
“আমি তোমার বাবাকে হত্যা করেছি, এটা অস্বীকার করছি না। কিন্তু তার অপরাধগুলোও অস্বীকার করতে পারব না। হাহহ তুমি চাইলে প্রমাণও দিতে পারি।”
শাখা এবার সামনে ঝুঁকল।
“কীসের প্রমাণ?”
ইংরেজ নেতা ধীরে ধীরে উত্তর দিল,
“পাহাড়ের মূল্যবান গাছগাছড়া বিদেশে পাচারের প্রমাণ। সাহাবাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের ষড়যন্ত্রের প্রমাণ। পনেরো বছর আগের যুদ্ধের প্রমাণ। এমনকি সাহাবাদের বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘটিত লুট, খুন আর অপহরণের পেছনে কারা ছিল, তারও প্রমাণ।”
সাহারার মুখ শক্ত হয়ে গেল।
“সব খুলে বলো।”
ইংরেজ নেতা এবার দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“ঠিক আছে। আমি নিজেই যেহেতু তোমাদের হাতে বন্দি হয়েছি, তাই আর গোপন রাখার প্রয়োজন দেখছি না।”
মেহরাব বিরক্ত হয়ে বলল
“ওর কথা তোমরা এত গুরুত্বের সাথে কেন শুনতে চাইছে বুঝলাম না। ও যে সব সত্যি বলবে তার নিশ্চয়তা কি?”
মেহরাবের কথা পাত্তা না দিয়ে লোকটা বলতে লাগল
“পাহাড়ের গাছগাছড়া শুধু সাধারণ ঔষধি উদ্ভিদ নয়। তোমাদের পাহাড়ি অঞ্চলে এমন কিছু বিরল উদ্ভিদ জন্মায়, যেগুলোর জন্য বিদেশি ব্যবসায়ীরা বিপুল অর্থ দিতে প্রস্তুত। আমরা সেগুলো সংগ্রহ করে বিদেশে পাঠাতাম।”
ইয়ামিনের মুখ গম্ভীর হয়ে উঠল।
“সেগুলো সংগ্রহ করার অনুমতি তোমাদের কে দিয়েছিল?”
ইংরেজ নেতা হাসল।
“অনুমতি? প্রথমদিকে আমরা স্থানীয় লোকদের টাকা দিতাম। পরে তাদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা শুরু হয়। যারা বাধা দিত, তাদের মেরে ফেলা হতো। যারা আমাদের সাহায্য করত, তাদের বেশি টাকা দেওয়া হতো।”
ইয়ামিন এক পা এগিয়ে এল।
“আমাদের পাহাড়ের মানুষদের মধ্যে যারা নিখোঁজ হয়েছে, তাহলে তাদের ব্যাপারেও জানিস?”
লোকটি ইয়ামিনের দিকে তাকিয়ে বলল,
“সবাইকে তো আর আমরা নিজের হাতে তুলে নিয়ে যাইনি। অনেক সময় স্থানীয় দালালদের দিয়ে কাজ করানো হয়েছে। পাহাড়ি লোকেরাই সকল গতিবিধি আমাদের কাছে পৌঁছে দিত। এসবের পিছনেও ছিল সম্রাট হারুন ওয়াসেম”
ইয়ামিনের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। সাহারা জিজ্ঞেস করল,
“এই ব্যবসার অর্থ কোথায় যেত?”
“এক অংশ বিদেশি ব্যবসায়ীদের কাছে। আরেক অংশ হারুণ ওয়াসেমের কাছে।”
মেহরাব সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল,
“অসম্ভব! আমার বাবা একজন সৎ শাসক ছিলেন আমি ছোট থেকে দেখে এসেছি। এই লোকটা যা নয় তাই বলে যাচ্ছে আর তোমরা তা বিশ্বাস করছো। কেন?”
ইংরেজ নেতা তার দিকে তাকাল।
“তোমার বাবা জানতেন, রাজ্যের বিরল সম্পদ থেকে কীভাবে বিপুল অর্থ আয় করা যায়। আমাদের সঙ্গে তার সমঝোতা ছিল। আমরা পাহাড় থেকে উদ্ভিদ সংগ্রহ করতাম, আর তিনি আমাদের নিরাপদ পথ, স্থানীয় সহযোগী এবং প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক সুরক্ষা দিতেন।”
“আমার বাবা রাজ্যের সম্পদ বিদেশে পাচার করবেন, এটা আমি বিশ্বাস করি না!”
“তাহলে রাজপ্রাসাদের গোপন নথির ঘরে থাকা হিসাবের খাতাগুলো দেখো। সেগুলোর কয়েকটি আমরা নিয়ে যাচ্ছিলাম। সেখানে অর্থের হিসাব, চালানের বিবরণ এবং কয়েকজন স্থানীয় সহযোগীর নাম রয়েছে।”
শাখা তৎক্ষণাৎ প্রহরীর দিকে তাকাল।
“উদ্ধার করা নথিগুলো এখানে নিয়ে এসো। আর যেগুলো লুটের সময় হারিয়ে গেছে, সেগুলো কোথায় নেওয়া হয়েছে, তা খুঁজে বের করো।”
প্রহরী দ্রুত বেরিয়ে গেল। ইংরেজ নেতা আবার বলল,
“তোমাদের পাহাড়ি অঞ্চল দখল করার পরিকল্পনাও ছিল। কারণ পাহাড়ের নিয়ন্ত্রণ হারালে এই ব্যবসা বন্ধ হয়ে যেত। আর ব্যবসা বন্ধ হলে হারুণের আয়ও কমে যেত। স্থানীয়দের মধ্যে বিভেদ তৈরি করা, তাদের নেতাদের একে অন্যের বিরুদ্ধে দাঁড় করানো, পাহাড়ের পথগুলো নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া, সবই সেই পরিকল্পনার অংশ ছিল।”
ইয়ামিনের চোখে কঠোরতা ফুটে উঠল। শাখা এবার নিজের সামনে রাখা কাগজ সরিয়ে বলল,
“পাহাড়ের সম্পদের কথা হলো। এবার বলো, সাহাবাদের সঙ্গে তোমাদের শত্রুতা কেন?”
ইংরেজ নেতা মৃদু হাসল।
“সাহাবাদ ছিল আমাদের পরিকল্পনার পথে সবচেয়ে বড় বাধা। তোমাদের রাজপরিবার
কখনোই সাহাবাদের উত্তরের জঙ্গলে আমাদের প্রবেশাধিকার দেয়নি। অথচ ওই জঙ্গল ছিল বিপুল ঔষধি গাছগাছালি আর বিরল প্রাণীর খনি”
সাহারা বলল,
“তাই তোমরা সাহাবাদকে ধ্বংস করতে চেয়েছিলে?”
“শুধু ধ্বংস নয়, সম্রাটের পরিকল্পনা ছিল ফাইয়াজকে দিয়ে সাহাবাদে লুট এবং শাহ্ পরিবারকে শেষ করে দেওয়া। কিন্তু ডাকাত সর্দার শাহজাদীর প্রেমে পঠল। নয়তো এতদিনে আমাদের সকল পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হয়ে যেত”
শাখার চোখ সরু হয়ে গেল।
“লুট, খুন, অপহরণ এসবও কি সেই পরিকল্পনার অংশ?
“অনেকগুলো। কিছু ঘটনা সরাসরি আমাদের লোকেরা ঘটিয়েছে। কিছু ঘটিয়েছে স্থানীয় ভাড়াটে লোকজন। আবার কিছু ঘটনায় হারুণের নিজস্ব লোকেরা জড়িত ছিল।”
মেহরাব আর নিজেকে সামলাতে পারল না।
“তুই থামবি? আমার বাবার নাম নিয়ে একটা কথাও আর বলবি না! আজ তো তোকে…”
ইংরেজ নেতা বিরক্তির সঙ্গে বলল,
“তোমরাই সত্যিটা শুনতে চাইছো আবার তোমরাই সেটা নিতে পারছো না?”
“আমার বাবার নাম আর মুখে আনবি না জানোয়ার”
শাখা মেহরাবের দিকে তাকিয়ে বলল,
“যুবরাজ, ওকে বলতে দিন। সত্যটা জানা দরকার।”
মেহরাব তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে শাখার দিকে তাকাল।
“তোমরা সবাই আগে থেকেই আমার বাবাকে অপরাধী বানিয়ে রেখেছ! এখন নতুন করে ওর মুখ থেকে শুনতে আরও ভালো লাগছে তেমাদের”
সাহারা কিছুটা রেগে বলল,
“কেউ কাউকে আগে থেকে অপরাধী বানায়নি। আমরা প্রমাণ চাইছি।”
ইংরেজ নেতা আবার কথা শুরু করল।
“হারুণ ওয়াসেম জানত, সাহাবাদকে সরাসরি আক্রমণ করলে তার বিরুদ্ধে প্রকাশ্য যুদ্ধ শুরু হবে। তাই সে নানা সময়ে গোপনে আঘাত করেছে।”
সাহারার চোখে আগুন জ্বলে উঠল।
“আর আমাদের পরিবারকে?”
“তোমাদের পরিবার ছিল এই পরিকল্পনার সবচেয়ে বড় বাধা। তোমাদের মধ্যে কেউ দুর্বল হলে, কেউ নিখোঁজ হলে, কেউ রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ালে সাহাবাদকে নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হতো।”
শাখা চুপচাপ শুনছিল। তার মুখে কোনো আবেগ প্রকাশ পাচ্ছিল না, কিন্তু হাতের আঙুলগুলো শক্ত হয়ে টেবিলের কিনারা চেপে ধরেছিল। পনেরো বছর ধরে তাদের পরিবার যে ক্ষতি, শোক আর অনিশ্চয়তার ভেতর দিয়ে গেছে, সেই সবকিছুর পেছনে যদি সত্যিই একই হাত থাকে, তবে এই মুহূর্তে তার রাগ প্রকাশ করার ভাষা নেই। সে ধীরে বলল,
“এবার পনেরো বছর আগের যুদ্ধের কথা বলো। যেটা নাসিরাবাদ এর সাথে সাহাবাদের হয়েছিল”
ইংরেজ নেতার মুখের হাসি এবার মিলিয়ে গেল।
“পনেরো বছর আগে সাহাবাদের বিরুদ্ধে যে যুদ্ধ হয়েছিল, তার পেছনেও হারুণ ওয়াসেমের নেতৃত্ব ছিল।”
মেহরাব হাতে তালি দিল
“বাহহহ! এখানেও আমার বাবা?”
“হ্যা সেই যুদ্ধের পরিকল্পনা ও পরিচালনায় হারুণ ওয়াসেমের ভূমিকা ছিল। আক্রমণের সিদ্ধান্ত, সহযোগীদের সঙ্গে সমন্বয় এবং যুদ্ধের জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার কাজে সে নেতৃত্ব দিয়েছিল। অঙ্কুর এবং তার বাহিনীকে সম্রাট আগাগোড়া সাহায্য দিয়েছে”
শাখা প্রশ্ন করল
“তাহলে এত বছর ধরে সাহাবাদে যে লুট হয়েছে, যে খুন হয়েছে, যে মানুষ অপহৃত হয়েছে সবকিছুর পেছনে হারুণের হাত ছিল?”
ইংরেজ নেতা এবার একটু সতর্ক হয়ে উত্তর দিল,
“সব ঘটনার জন্য একই ব্যক্তি সরাসরি আদেশ দিয়েছে, এমন দাবি আমি করছি না। কিন্তু বহু ঘটনার পরিকল্পনা, অর্থায়ন বা সুযোগ তৈরি করার সঙ্গে হারুণ ওয়াসেম জড়িত ছিল। তার সহযোগীরা দীর্ঘদিন ধরে এই কাজগুলো চালিয়েছে। কিছু ঘটনার হিসাব আমাদের নথিতে আছে। কিছু ঘটনার সাক্ষীও আছে।”
শাখা ঠান্ডা গলায় বলল,
“অর্থাৎ হারুণ ওয়াসেম শুধু এক রাতের লুটের পরিকল্পনাকারী ছিল না। সে বহু বছরের ষড়যন্ত্রের অংশ ছিল। ছিহহ ঘেন্না হচ্ছে ঘেন্না। একজন সম্রাএ ন্যায়ের মুখেশের আড়ালে এসব করত?”
মেহরাব এবার চেয়ারটিকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল।
“মুখ সামলে কথা বলো শাখা। যথেষ্ট হয়েছে! আমার বাবা মারা গেছেন! তোমরা তার মৃতদেহের সামনে দাঁড়িয়ে তার বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযোগ তুলছ! তোমাদের লজ্জা করছে না? একজন শাসক এত বছর ধরে এই রাজ্য পরিচালনা করে আসছে। এত গুলো অঙ্গরাজ্য তার অধীনে কেউ তো কখনও অভিযোগ করতে পারল না।”
সাহারা বলল,
“রক্ষক থেকে ভক্ষক হয়ে সে দুটো রাজ্য ইতিমধ্যেই খেয়ে নিয়েছে। নাসিরাবাদ আর মণিপুর। সাহাবাদ খাওয়া টা বাদ ছিল। ওটা খেয়ে বাকি দুই অঙ্গরাজ্যও খেয়ে নিতেন আপনার ন্যায় পরায়ণ পিতা”
“চুপ করো, সাহারা!”
মেহরাবের কণ্ঠ এত জোরে উঠল যে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা প্রহরীরাও সোজা হয়ে দাঁড়াল।
“তুমি আমার বাবাকে চেনো না। তোমরা কেউ তাকে চেনো না! চিনি আমি”
সাহারা এবার আর উত্তর দিল না। মেহরাব ইংরেজ নেতার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
“তুই আমার বাবাকে হত্যা করেছিস। রাজপ্রাসাদ লুট করতে চেয়েছিস । এখন নিজের অপরাধ ঢাকতে তার নামে মিথ্যা বলছিস। তাই না?”
ইংরেজ নেতা বলল,
“আমার অপরাধের বিচার হবে। আমি পালিয়ে যাচ্ছি না। কিন্তু আমার অপরাধের জন্য তোমার বাবার অপরাধ মুছে যাবে না।”
“চুপ!”
মেহরাব তার জামার সামনের অংশ মুঠোয় চেপে ধরল। প্রহরীরা এগিয়ে আসতে চাইলে শাখা হাত তুলে তাদের থামাল। মেহরাব গর্জে উঠল,
“আমার বাবাকে আমি নিজের চোখে দেখেছি। তিনি আমাকে বড় করেছেন। আমাকে রাজ্য পরিচালনা শিখিয়েছেন। আর তুই বলছিস তিনি পনেরো বছর ধরে সাহাবাদকে ধ্বংস করার ষড়যন্ত্র করেছেন?”
ইংরেজ নেতা শান্তভাবে বলল,
“একজন মানুষ তার সন্তানের প্রতি ভালো হতে পারে, অথচ অন্য মানুষের প্রতি নিষ্ঠুর হয়”
মেহরাব তাকে ছেড়ে দিল, কিন্তু পরক্ষণেই হাত তুলে তার গালে আঘাত করল।
“তুই আমার বাবাকে চিনিস না!”
ইংরেজ নেতা টলতে টলতে সামলে দাঁড়াল। ভাঙা ভাঙা বাংলায় বলল
“আমি তাহাকে তোমার চাইয়ে অন্যভাবে চিনিতাম, রাজপুত্র।”
মেহরাব আবার এগিয়ে গেল।
“আর একটা কথা বললে তোকে এখনই…”
“মেহরাব!”
শাখার কঠোর কণ্ঠে সে থেমে গেল। শাখা উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
“এটা জিজ্ঞাসাবাদের কক্ষ। এখানে আমরা প্রমাণ সংগ্রহ করতে এসেছি, ব্যক্তিগত প্রতিশোধ নিতে নয়। ওকে স্পর্শ করবেন না”
মেহরাব শাখার দিকে তাকাল।
“তুমি আমাকে আদেশ দিচ্ছ?”
“আমি আপনাকে মনে করিয়ে দিচ্ছি, একজন শাসকের রাগেরও সীমা থাকা উচিত”
“তোমরা আমার কাছ থেকে কী চাও? আমার পিতার নাম মুছে ফেলতে চাও? আমাকে অপরাধীর ছেলে হিসেবে দাঁড় করাতে চাও?”
শাখা বলল,
“আমরা চাই, তুমি সত্যের সামনে দাঁড়াও।”
মেহরাব তিক্তভাবে হাসল।
“সত্য? সত্য হলো, এই ইংরেজ আমার বাবাকে হত্যা করেছে। এটাই আমার কাছে যথেষ্ট।”
সাহারা এতক্ষণ চুপ করে ছিল। এবার সে উঠে দাঁড়াল।
“আপনার কাছে যথেষ্ট হতে পারে। কিন্তু সাহাবাদের সেই পরিবারগুলোর কাছে যথেষ্ট নয়, যারা পনেরো বছর ধরে তাদের স্বজনদের হারিয়ে আসছে। যুবতী মেয়ে গুলোকে টেনে হিচড়ে ঘর থেকে বের করে নিয়ে গেছে। তারা আমাদের মুখের দিকে চেয়ে। এ বিচার আমাদের চাই ই চাই”
মেহরাব তার দিকে ফিরল।
“সারা তুমিও?”
সাহারা দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
“হ্যাঁ, আমিও।”
“তুমি আমার বাবাকে অপরাধী বলছ?”
“আমি বলছি, অভিযোগগুলো তদন্ত করতে হবে। প্রমাণগুলো পরীক্ষা করতে হবে। আর যদি সত্যি হয়, তবে দায়ীদের বিচার করতে হবে।”
মেহরাবের চোখে ক্ষোভ জমে উঠল।
“তোমাদের সাহাবাদের জন্য আমার বাবাকে অপমান করতে দেব না! আমার বাবা চাইলে তো সাহাবাদ এমনিতেই কেড়ে নিতে পারত, এআ ছল করার তো প্রয়োজন ছিল না তার”
সাহারা ধীরে বলল,
“আপনার বাবার সম্মান রক্ষার নামে অন্য মানুষের কান্নাকে মিথ্যা বানিয়ে দিবেন না, মেহরাব। চিরন্তন সত্য টরাই যে আপনার বাবা একজন অযোগ্য এবং প্রতারক শাসক”
মেহরাব এক মুহূর্ত তার দিকে তাকালো। তারপর আচমকা হাত তুলে সাহারার গালে চড় মারল।
পাথরের কক্ষের নীরবতায় খুব জোরে শোনা গেল শব্দটা। সাহারার মুখ একদিকে ঘুরে গেল।
দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা ইয়ামিন সঙ্গে সঙ্গে এগিয়ে এল।
“মেহরাব!”
শাখাও উঠে দাঁড়াল।
“আপনি এটা কী করলেন?”
কিন্তু সাহারা হাত তুলে দুজনকেই থামিয়ে দিল।
ধীরে ধীরে মুখ ফিরিয়ে মেহরাবের দিকে তাকাল।
“আপনি এ নিয়ে দ্বিতীয়বার আমাকে মারলেন”
মেহরাবের বুক ওঠানামা করছে। রাগের মাথায় সো কি একটা কাজ করে ফেলল। চুল খামচে ধরে এগিয়ে আসে সাহারার কাছে।
“সারা আমি দুঃখীত,তুমি আমার বাবাকে অপমান করেছ আর….”
মেহরাবের কথা শেষ হওয়ার আগেই সাহারা ঠাস করে এক চড় বসিয়ে দিল মেহরাবের গালে। কক্ষে থাকা প্রত্যেকে হতভম্ব সাহারার কাজে। মেহরাব যেন পাথর হয়ে গেছে বিষ্ময়ে। সাহারার চোখ থেকে আগুণ ঝড়ছে।