ফন্ট সাইজ:
থিম:
রক্তমুকুট

57

লেখক: জান্নাতুল ফেরদৌস

আমিরাবাদের আকাশ সকাল থেকেই মেঘলা। রাজপ্রাসাদের প্রধান ফটক থেকে রাজকীয় মসজিদ পর্যন্ত পথজুড়ে মানুষের ভিড়। প্রজারা এসেছে শেষবারের মতো সম্রাট হারুণ ওয়াসেমকে দেখতে, সম্ভ্রান্ত বণিক পরিবার গুলো এসেছে রাজপরিবারের শোকের অংশ হতে, কিছু দুর্বিত্তরা এসেছে মানুষটির মৃত্যুতে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে। সুশাসনের আড়ালে যাদের ওপর জুলুম অত্যাচার করা হতো। তবে কোনো অভিযোগের আলোচনা নেই। যা আছে যার যার মনে। আজ একজন মৃত মানুষের শেষ বিদায়ের দিন, আজ কিছু বলাটা ঠিক হবে না।

রাজকীয় মসজিদের আঙিনায় জানাজার ব্যবস্থা করা হয়েছে। সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছেন রাজ্যের কর্মকর্তা, সেনাপতি, সাধারণ প্রজা এবং দূরদূরান্ত থেকে আসা মানুষজন। সাদা কাফনে ঢাকা হারুণ ওয়াসেমের নিথর দেহ রাখা হয়েছে সামনে। মেহরাব দাঁড়িয়ে আছে একেবারে প্রথম সারিতে। তার পরনে সাদা পোশাক। দাড়ি-গোঁফের আড়ালে জমে আছে কয়েক রাতের অনিদ্রা। চোখ দুটো লাল, অশ্রু যেন শুকিয়ে গেছে।

গত কয়েক দিনে তার জীবনের সব হিসাব ওলটপালট হয়ে গেছে। যে মানুষটির ছায়ায় সে বড় হয়েছে, সেই মানুষটির মৃত্যু হয়েছে তার চোখের সামনে। আর মৃত্যুর পর সেই মানুষটির বিরুদ্ধেই উঠে এসেছে এমন সব অভিযোগ, যেগুলো মেনে নেওয়ার মতো শক্তি তার নেই।

মেহরাবের একটু পেছনে দাঁড়িয়ে আছে ইয়ামিন। মূল ফটকের পাশে বসে আছে আয়েশা বেগম। তাঁর চোখও কান্নায় ফুলে আছে। সাহাবাদের পক্ষ থেকে শাখা ও সাহারা এসেছে।

সাহারা গিয়ে শাশুড়ির পাশে দাঁড়াল। তার গালের ওপর আগের দিনের আঘাতের চিহ্ন মিলিয়ে গেছে। তার চোখ মেহরাবের দিকে গেল। মেহরাবও তাকে দেখল। কিন্তু চোখাচোখি হতেই সে মুখ ফিরিয়ে নিল। সাহারার বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। তবু সে নিজের জায়গা থেকে নড়ল না। জানাজার নামাজ শুরু হলো। ইমাম সামনে দাঁড়িয়ে তাকবির দিলেন। শত শত মানুষ নীরবে তার অনুসরণ করল। প্রাসাদের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা সৈন্যরাও মাথা নিচু করে রইল।

নামাজ শেষে হারুণ ওয়াসেমের মরদেহ কবরস্থানের দিকে নিয়ে যাওয়া হলো। মেহরাব নিজেই বাবার খাটিয়ার পাশে হাঁটছিল। কয়েকবার তার মনে হলো, বাবার সঙ্গে শেষবারের মতো কথা বলা দরকার। বলতে হবে, সে এখনো তাঁর ছেলে। বলতে হবে, যত অভিযোগই উঠুক, মেহরাব তা মানে না। সে বরাবরই যোগ্য শাসক ছিল। আজ একজন ন্যায়পরায়ণ শাসকের মৃত্যু হলো। কিন্তু মৃত মানুষকে তো আর কিছু বললে শুনবে না। তার বাবা আর তাকে মেহু বলে ডাকবে না।

কবরস্থানে পৌঁছে দাফনের প্রস্তুতি সম্পন্ন হলো। প্রয়োজনীয় নিয়ম মেনে হারুণ ওয়াসেমকে কবরে শায়িত করা হলো। মাটি দেওয়া শেষ হলে মেহরাব দীর্ঘক্ষণ কবরের পাশে দাঁড়িয়ে রইল। চারপাশের মানুষ একে একে সরে যাচ্ছে। আয়েশা বেগম কাছে এসে ছেলের কাঁধে হাত রাখলেন। অশ্রুসিক্ত নয়নে তাকিয়ে বললেন

“মেহরাব, চল বাবা”

মেহরাব নড়ল না।

“আরেকটু থাকতে দাও না, আম্মা”

আয়েশা বেগমের চোখ আবার ভিজে উঠল। মেহরাব নিচের দিকে তাকিয়ে বলল,

“মা, আব্বা কি সত্যিই এত খারাপ ছিলেন?”

আয়েশা বেগমের হাত থেমে গেল।;তিনি ছেলের মুখের দিকে তাকালেন। এই প্রশ্নের উত্তর তার কাছেও নেই।

“আমি জানি না, বাবা। মানুষকে কাছ থেকে দেখলেও তার মনের সব কথা জানা যায় না। হয়ত সত্যি বলছে, নয়তো মিথ্যা। যে নেই তার ঠিক ভুল আমরা আর যাচাই না করি হু?”

মেহরাব তিক্তভাবে হাসল।

“আমি তো তাকে চিনতাম, আম্মা”

আয়েশা বেগম ছেলের মাথায় হাত রাখলেন। মেহরাব শেষবারের মতো কবরের দিকে তাকিয়ে মায়ের সাথে ফিরে চলল।

****

দাফনের পর আমিরাবাদ মহলে শোকের পরিবেশ নেমে এল। রাজপ্রাসাদের ভিতর দাস-দাসী জনসমাগমে গমগম করত, সভা ব্যস্ততায় মুখর থাকত, সেগুলো এখন অনেকটাই নিস্তব্ধ। মহলের প্রহরীরা যেন বোবা হয়ে গেছে। রাজকর্মচারীরা প্রয়োজন ছাড়া কেউ কারও কক্ষে যাচ্ছে না। মেহরাব নিজের কক্ষে ফিরে দরজা বন্ধ করে দিল। কারও সঙ্গে কথা বলতে চাইছে না।

টেবিলের ওপর বাবার ব্যবহৃত একটি আংটি রাখা। দাফনের আগে আংটিটি তাঁর ব্যক্তিগত জিনিসপত্রের সঙ্গে পাওয়া গিয়েছিল। মেহরাব সেটি হাতে তুলে নিয়ে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল।

তার মনে পড়ছে শৈশবের কথা। প্রথমবার ঘোড়ায় চড়তে গিয়ে পড়ে যাওয়ার পর মেহরাব হাটুতে আঘাত পায়। তার পিতার সে কি আহাজারি সেসময়। মেহরাবের চোখ ভিজে আসে। মেহরাবের প্রতিটি জন্মদিনে গোটা রাজ্যের প্রতিটি প্রজার বাড়িতে সুস্বাদু সব খাবার পাঠাতেন মেহরাবকে সাথে নিয়ে। সেই মানুষটি কি নিজের আয়ত্তে থাকা অঙ্গরাজ্যের ওপর এমন জুলুম চালাতে পারে? মেহরাব আংটিটি মুঠোয় চেপে ধরল।

“নাহহ... সবকিছু তো মিথ্যা হতে পারে না”

কিন্তু ইংরেজ নেতার কথা মনে পড়তেই তার রাগে শরীর জ্বলতে লাগল। লোকটি তার বাবাকে হত্যা করেছে। তার ওপর এখন বাবার বিরুদ্ধে একের পর এক অভিযোগ তুলেছে। মেহরাব হতাশ হয় এই ভেবে যে সাহারা অন্তত তার পাশে দাঁড়াতে পারত। কিন্তু সাহারা কী করেছে? বাবার সুশাসনের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলেছে। ক্ষতিপূরণের দাবি জানিয়েছে। আর সে যখন রাগের মাথায় সাহারাকে চড় মেরেছে, সাহারাও সঙ্গে সঙ্গে তাকে চড় মেরেছে। মেহরাব নিজের গালে হাত বুলিয়ে নিল। প্রিয় নারীর করা অপমান তার মনে গেঁথে আছে। সে ভেবেছিল, সাহারা অন্তত তাকে এতটা আঘাত করবে না। অথচ সাহারা তার সামনে দাঁড়িয়ে স্পষ্ট জানিয়ে দিল, অন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ালে সে মেহরাবের বিরুদ্ধেও যাবে। সে যেন একই সঙ্গে পিতা ও প্রিয় মানুষ দুজনকেই হারিয়ে ফেলেছে।

মহলের দক্ষিণ দিকের কক্ষে সাহারা বসে আছে জানালার পাশে। তার সামনে একটি গরম পানির পেয়ালা। মেহরাবের সঙ্গে শেষ কথোপকথন বারবার মনে পড়ছে। সে জানত, মেহরাব তার বাবাকে ভালোবাসে। পিতার মৃত্যু তাকে ভেতর থেকে ভেঙে দিয়েছে। এমন সময়ে বাবার বিরুদ্ধে অভিযোগ শোনা তার জন্য কত কঠিন, তা সাহারা বুঝতে পারে। কিন্তু মেহরাবও কি বুঝেছে, তার জন্য বিষয়টি কতটা কঠিন ছিল?

সাহারা নিজের স্বামীর কাছে সত্যের পক্ষে রায় চেয়েছিল। মেহরাব যেন প্রমাণ যাচাই করে ন্যায়বিচারের পথে হাঁটে। তার বদলে মেহরাব তাকে চড় মেরেছে। সাহারা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

“আমি কি খুব বেশি কিছু চেয়েছিলাম, যুবরাজ?”

কিছুক্ষণ পর দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হলো।

“ভেতরে আসুন”

শাখা ঢুকল। বোনের মুখ দেখে সে বুঝতে পারল, সাহারা এখনো মেহরাবের আচরণ নিয়ে দুঃখ পাচ্ছে। শাখা পাশে বসে বলল,

“ওর সঙ্গে কথা বলেছিস?”

“না, আপা”

শাখা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

“ওনার বাবার মৃত্যু হয়েছে। ওনার ওপর দিয়ে অনেক কিছু যাচ্ছে। সময় লাগবে। তুই ছেলেমানুষী করিস না। বড় আম্মি শুনলে তোকে কিন্তু বকবে সারা”

সাহারা নিচু গলায় বলল,

“আমি ওর শোক বুঝি, আপা। কিন্তু আমার গায়ে হাত তোলার অধিকার ওকে কে দিয়েছে?”

শাখা বোনের হাত ধরল।

“কেউ দেয়নি। কিন্তু ও তোর স্বামী, তোর অভি..”

“আমি ওকে ভালোবাসি বলেই কি সব অপমান সহ্য করতে হবে?”

“না। ভালোবাসা মানে নিজের সম্মান বিসর্জন দেওয়া নয় তা ঠিক আছে কিন্তু….”

সাহারা বোনকে থামিয়ে দিল। শাখা দীঘশ্বাস ছেড়ে বলল,

“তুই নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাক ভালো কথা। তবে ওকে ভাবার সময় দে। রাগের মধ্যে মানুষ নিজের ভুলটা দেখতে পায় না।”

সাহারা জানালার বাইরে তাকাল।

“আমি ওর কাছে ক্ষমা চাইতে যাব না, আপা। আমি মোটেও অন্যায় কিছু বলিনি বা করিনি। তাই তার জন্য আমার লজ্জিত হওয়ার কিছু নেই।

শাখা মাথা নেড়ে বলল,

“সেটা তোর সিদ্ধান্ত। বেলা বাড়ছে, আমাকে বেরোতে হবে। আসছি আমি। আপার আবার জ্বর প্রচন্ড”

****

দিন গড়ায় বেশ কিছু। সাহাবাদ রাজপ্রাসাদের পশ্চিম দিকের ছোট্ট দপ্তরে সেদিন ফাইয়াজের হাতে প্রথম মাইনের টাকা তুলে দেওয়া হলো।

বাইজিদ শাহের নির্দেশে তাকে রাজপ্রাসাদের নিরাপত্তাবাহিনীতে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। একসময় যে মানুষটি দলবল নিয়ে বিভিন্ন রাজ্যে লুটপাট আজ সে মহলে প্রহরীর দায়িত্ব পালন করে এবং মাস শেষে নিজের পরিশ্রমের পারিশ্রমিক গ্রহণ করে।

ফাইয়াজ টাকাগুলো হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা একজন প্রহরী হেসে নলল

“কী সর্দার? প্রথম মাইনে বলে বিশ্বাস হচ্ছে না?”

ফাইয়াজ মৃদু হাসল।

“বিশ্বাস হচ্ছে। কিন্তু এতদিন নিজের হাতে যা এসেছে, তার সবকিছুর পেছনে শান্তি ছিল না। আজকের টাকাটা অন্তত নিজের পরিশ্রমের।”

প্রহরী বলল,

“তাহলে ভালো করে জমা করো। সামনে সংসার করতে হবে, তাও আবার শাহজাদীকে নিয়ে”

ফাইয়াজের মুখে অল্প হাসি ফুটে উঠল।

“সেই চেষ্টাই করছি।”

টাকা গুনে হিসাব করে দেখল। তারপর কোমরের কাছে রাখা ছোট থলিতে টাকাগুলো সাবধানে রেখে দিল। মহলের বাইরে এসে সে একটি নিরিবিলি জায়গায় দাঁড়াল। মনে মনে হিসাব করতে লাগল প্রতি মাসে যদি এই পরিমাণ টাকা জমাতে পারে, তাহলে আরও পাঁচ মাসের মাইনে পেলেই ভালোভাবে একটি ছোট ঘর তৈরি করার মতো অর্থ তার হাতে থাকবে।

একটা নিজের ঘর, যেখানে দিনের শেষে ফিরে এসে সে শান্তিতে বসতে পারবে। আর সেই ঘরে শাখা থাকবে। ভাবনাটা মনে আসতেই ফাইয়াজের মুখে অজান্তেই হাসি ফুটল। কিন্তু পরক্ষণেই হাসিটা ম্লান হয়ে গেল। শাখাকে সে কদিন ধরে ঠিকমতো দেখতেই পাচ্ছে না। সকালে কখনো শুনছে, শাহজাদি রাজকীয় সভায় গেছেন। দুপুরে খবর আসছে, তিনি সৈন্যদের নিয়ে বাইরে বেরিয়েছেন। খোজ নিলে কেউ বলছে, সীমান্তের কাজে ব্যস্ত। আর সন্ধ্যায় প্রাসাদে ফিরলেও তার সঙ্গে দেখা করার সুযোগ হচ্ছে না।

ফাইয়াজ জানে, শাখার দায়িত্ব অনেক। রাজ্যের কাজ তার কাছে ব্যক্তিগত সুখের চেয়ে বড়। তবু মন তো সবসময় যুক্তি মানে না। প্রহরীটি চলে যাওয়ার পর ফাইয়াজ নিজের থলিটা একবার ছুঁয়ে দেখল।

“আর পাঁচ মাস, শাখা। আর পাঁচ মাস পর তোমাকে দেখাব, আমি কীভাবে একটা ঘর বানিয়েছি। তুমি চাইলে সেই ঘরের উঠোনে কয়েকটা ফুল গাছও লাগাবে। সেই ঘরটা তোমার হবে।”

ফাইয়াজের মনে হয় এই মহল এই প্রাসাদ কিছুই শাখার না। তারা কেবল স্বার্থে ব্যবহার করছে শাখা করছে। প্রাসাদের দিকে তাকাল সে। কখন দেখা হবে শাখার সঙ্গে? কখন সে নিজের মাইনের কথা তাকে বলতে পারবে?

*****

বিকেলের দিকে সাহাবাদ রাজপ্রাসাদের প্রধান ফটকে হঠাৎ কোলাহল শুরু হলো। দূর থেকে একের পর এক গরুর গাড়ি এগিয়ে আসছে।

প্রথমে প্রহরীরা ভেবেছিল, হয়তো রাজ্যের কোনো অঞ্চল থেকে খাদ্যশস্য এসেছে। কিন্তু গাড়ির সংখ্যা বাড়তে থাকায় তারা অবাক হয়ে গেল।

একটি, দুটি, পাঁচটি করে প্রায় এক ডজন গাড়ি।

প্রতিটি গাড়ি কাপড় দিয়ে ঢাকা। কয়েকটি গাড়ির পাশে সশস্ত্র সৈন্য পাহারা দিচ্ছে।

প্রধান ফটকের দায়িত্বে থাকা প্রহরী হাত তুলে বহর থামাল।

“কে তোমরা? কী নিয়ে এসেছ?”

সামনের গাড়ির পাশে থাকা সৈন্য উত্তর দিল,

“রাজপ্রাসাদের জন্য মালামাল। শাহজাদি শাখা নেওয়াজের নির্দেশ আছে।”

প্রহরী সঙ্গে সঙ্গে সোজা হয়ে দাঁড়াল।

“ফটক খুলে দাও!”

বিশাল ফটক খুলে গেল। এক এক করে গরুর গাড়িগুলো রাজপ্রাসাদের ভেতরের প্রশস্ত উঠোনে প্রবেশ করল। কিছুক্ষণের মধ্যে খবর ছড়িয়ে পড়ল। শাখা নেওয়াজ বহু গাড়ি ভর্তি সম্পদ নিয়ে ফিরেছেন। বাইজিদ শাহ দরবারের একটি বৈঠক শেষ করে নিজের কক্ষে ফিরছিলেন। খবর শুনে তিনি সরাসরি উঠোনে চলে এলেন।

মেহেরুন্নেসাও খবর পেয়ে সেখানে এলেন। জান্নাত সুনেহেরা এবং কয়েকজন রাজকর্মচারীও উপস্থিত হলো। গাড়িগুলোর সামনে দাঁড়িয়ে শাখা সৈন্যদের নির্দেশ দিচ্ছিল।

“সবগুলো গাড়ি সারিবদ্ধ করে দাঁড় করাও। পাহারার ব্যবস্থা করো। হিসাবের দায়িত্বে যারা আছ, তারা একে একে সব মালামালের তালিকা তৈরি করবে।”

বাইজিদ শাহ এগিয়ে এলেন।

“শাখা, এতগুলো গাড়ি কোথা থেকে আনলে?”

শাখা মামার দিকে ফিরে হাসল।

“একটু কাজ ছিল, মামা। কাজ শেষ করে ফিরেছি।

বাইজিদ গাড়িগুলোর দিকে তাকালেন।

“কী কাজ? আর এই গাড়িগুলোতে কী আছে?”

শাখা সৈন্যদের দিকে ইশারা করল।

“ঢাকনাগুলো খুলে দাও।”

সৈন্যরা একে একে কাপড় সরিয়ে দিল। উঠোনে উপস্থিত সবাই বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল। গাড়িতে সোনার মুদ্রাভর্তি সিন্দুক, রুপার বাসন, মূল্যবান কাপড়, বিদেশি মুদ্রার থলি। কয়েকটি গাড়িতে বাক্সভর্তি নথি ও হিসাবের খাতা। একজন রাজকর্মচারী বিস্ময়ে বলল,

“এ তো বিপুল সম্পদ!”

বাইজিদ শাহের মুখ গম্ভীর হয়ে গেল।

“শাখা, এসব কার সম্পদ?”

“ইংরেজ বিজ্ঞানী ও তাদের সহযোগীদের কাছ থেকে জব্দ করেছি।”

সুনেহেরা অবাক হয়ে বলল,

“তুমি একা এত বড় অভিযান চালিয়েছ?”

“আমি একা নই। আমাদের সৈন্যরা সঙ্গে ছিল। ইংরেজদের গোপন আস্তানা থেকে তাদের অর্থসম্পদ জব্দ করা হয়েছে। যারা এই কাজে জড়িত ছিল, তাদের কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এই অর্থ পাহাড়ের সেই বিরল গাছগাছড়া পাচারের সঙ্গে জড়িত”

বাইজিদ শাহ গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

“কিন্তু এসব সম্পদ আমাদের প্রয়োজন নেই। অন্যের কান্না, লুট আর অবৈধ ব্যবসার মাধ্যমে অর্জিত সম্পদ আমি নিজের রাজকোষে রাখতে চাই না। আমাদের রাজ্যে অভাব কখনোই ছিল না। আর থাকলেও সেই অভাব মেটাতে অন্যায়ের টাকা প্রয়োজন নেই।”

শাখা কিছুক্ষণ মামার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর বলল,

“আমি এসব আপনার জন্য আনিনি, মামা”

বাইজিদ একটু অবাক হলেন।

“তাহলে?”

শাখা গাড়িগুলোর দিকে হাত বাড়িয়ে বলল,

“নাসিরাবাদের জন্য।”

নামটি শুনে উঠোনে দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজন প্রবীণ কর্মকর্তা একে অন্যের মুখের দিকে তাকালেন। নাসিরাবাদ! একসময় সে রাজ্য সমৃদ্ধ ছিল, বাজারে দূরদূরান্তের বণিকেরা আসত। সেই রাজ্য এখন অনেকটাই পরিত্যক্ত। পুরোনো প্রাসাদের অনেক অংশ ভেঙে পড়েছে। রাজ্যের বেশিরভাগ অঞ্চল জনশূন্য। বহু পরিবার দারিদ্র্য ও নিরাপত্তাহীনতার কারণে পাহাড়ের দুর্গম এলাকায় আশ্রয় নিয়েছে। বাইজিদ শাহ ধীরে বললেন,

“নাসিরাবাদকে আবার গড়ে তুলতে চাস?”

“হ্যা। আমি চাই, নাসিরাবাদের পরিত্যক্ত প্রাসাদগুলো সংস্কার করা হোক। ভাঙা রাস্তা মেরামত করা হোক। বাজারগুলো আবার চালু হোক। কৃষিজমি ব্যবহারযোগ্য করে তোলা হোক। নিরাপদ পানির ব্যবস্থা করা হোক। পাহাড়ের যেসব মানুষ বছরের পর বছর কষ্টে জীবন কাটাচ্ছে, তারা চাইলে সমতলে এসে নাসিরাবাদে বসতি গড়তে পারবে।”

মেহেরুন্নেসা বিস্মিত হয়ে বললেন,

“এত বড় পরিকল্পনা? তুই পারবি?”

শাখা মেহেরুন্নেসার দিকে তাকিয়ে বলল,

“আমি জানি, আম্মাজান। তাই তো অর্থ আর লোকবল সবকিছু হিসাব করে এগোতে চাই। এই সম্পদ প্রাসাদ সাজানোর জন্য নয়, মানুষের জীবন সাজানোর জন্য ব্যবহার করতে চাই।”

শাখা একটু এগিয়ে এসে বলল

“আপা আমি বেশ সময় নিয়ে পাহাড়ি অঞ্চল পর্যবেক্ষণ করেছি। পাহাড়ের অনেক পরিবার আছে, যারা শীতের সময় নিরাপদ আশ্রয় পায় না। শিশুরা পড়াশোনার সুযোগ পায় না। চিকিৎসার জন্য অনেক দূর যেতে হয়। তারা যদি নাসিরাবাদে গিয়ে নতুন জীবন শুরু করতে পারে, তাহলে ভালো হবে না বলো?”

মেহেরুন্নোসা শাখার কাছে এসে তার হাত ধরলেন।

“তুই এসব নিয়ে কত দিন ধরে ভাবছিস?

“অনেক দিন ধরে। কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো আমাকে আরও নিশ্চিত করেছে। শুধু শত্রুকে পরাজিত করলেই হবে না। যে মানুষগুলো তাদের অত্যাচারের কারণে সব হারিয়েছে, তাদের আবার দাঁড়ানোর সুযোগ দিতে হবে।”

সুনেহেরা এতক্ষণ সব শুনে বলল

“নাসিরাবাদ পরিচালনা করবে কে?”

শাখা সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলল,

“আমি”

উঠোনে উপস্থিত সবাই নীরব হয়ে গেল। শাখা স্পষ্ট কণ্ঠে বলল,

“আমি নাসিরাবাদের উত্তরাধিকারী। নাসিরাবাদকে এমন ভাবে পুনর্গঠন করতে চাই যেন ভবিষ্যতে কোনো শত্রু তার মানুষের দুর্বলতার সুযোগ নিতে না পারে। আমি চাই, নাসিরাবাদের শাসনব্যবস্থা শক্ত হোক, অর্থনীতি স্বচ্ছ হোক, আর মানুষ তাদের শাসকের ওপর আস্থা রাখতে পারে। আর আমি হব সেই যোগ্য সম্রাজ্ঞী”

বাইজিদ বলল

“তুই নাসিরাবাদের সম্রাজ্ঞী হতে চাস?”

শাখা ফিক করে হাসল

“আমিই তো নাসিরাবাদ এর সম্রাজ্ঞী। হওয়ার কী আছে? আমি কেবল রাজ্যটাতে প্রাণ ফেরাতে চাচ্ছি।

****

সন্ধ্যার আলো ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে। একটু দূরে দাঁড়িয়ে ফাইয়াজ পুরো দৃশ্য দেখছিল।

সে শাখাকে দেখতে এসেছে, কিন্তু কাছে যাওয়ার সাহস পাচ্ছিল না। এত মানুষের সামনে তাকে বিরক্ত করতে চায় না। শাখা হঠাৎ চোখ তুলে তাকে দেখতে পেল। দুজনের চোখাচোখি হলো।

ফাইয়াজের মুখে অজান্তেই হাসি ফুটল। শাখাও এক মুহূর্তের জন্য মৃদু হাসল। তারপর আবার কাজে ফিরে গেল। ফাইয়াজের কাছে ওই এক মুহূর্তের হাসিই অনেক। সে নিজের থলিতে রাখা প্রথম মাইনের টাকার কথা মনে করল। ইশশশ রে এটা না শাখাকে দেখাতে চেয়েছিল?

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে 57 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন