সকাল গড়িয়ে দুপুরের দিকে এগোচ্ছে। সাহাবাদ মহলের দরবারকক্ষ আজ বেশ সরগরম। বিশাল কক্ষের মাঝখানে পিতলের ঝাড়বাতি থেকে আলো ছড়িয়ে পড়েছে। এক পাশে বসেছেন সাহাবাদের শাসক বাইজিদ শাহ, পাশে তার অর্ধাঙ্গিনী মেহেরুন্নেসা নূর। দরবারের অন্য প্রান্তে কয়েকজন সেনাপতি, মন্ত্রী এবং রাজকর্মচারী উপস্থিত রয়েছেন।
শাখা সকাল থেকেই ব্যস্ত। নাসিরাবাদ পুনর্গঠনের জন্য অর্থ, শ্রমিক, নির্মাণসামগ্রী ও নিরাপত্তাব্যবস্থা সবকিছুর হিসাব একসঙ্গে সামলাতে হচ্ছে তাকে। তার পরও আজকের দরবারে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সে।
কক্ষের এক পাশে দাঁড়িয়ে আছে ফাইয়াজ। পরনে সাধারণ পোশাকের ওপর রাজপ্রহরীর পরিচয়চিহ্ন। একসময় যে মানুষটির নাম শুনলে সাধারণ মানুষ আতঙ্কিত ছিল, আজ সে-ই সাহাবাদের মহলে প্রহরীর বেশে। নিজের অতীতকে পেছনে ফেলে এগিয়ে যাওয়ার একরোখা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। শাখা নিজের আসন থেকে উঠে দাঁড়াল।
“মামা, আজ নাসিরাবাদ পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলার আছে”
বাইজিদ শাহ তার দিকে তাকালেন।
“বলো, শাখা”
শাখা প্রথমে উপস্থিত সেনাপতিদের দিকে তাকাল, তারপর স্পষ্ট কণ্ঠে বলল,
“ইংরেজদের বিরুদ্ধে যে অভিযান পরিচালিত হয়েছে, সেই অভিযানের নেতৃত্ব দিয়েছি আমি, এ কথা আপনারা জানেন। কিন্তু এই অভিযানের সাফল্যের পেছনে আরেকজন মানুষের অবদান রয়েছে। বলতে পারেন তার জন্যউ এই অসাধ্য এত দ্রুত আর সহজে সাধন করতে পেরেছি আমরা”
কক্ষের ভেতর চাপা গুঞ্জন উঠল। শাখা ফাইয়াজের দিকে ফিরল।
“ফাইয়াজ!”
কয়েকজন রাজকর্মচারী বিস্ময়ে পরস্পরের মুখের দিকে তাকাল। একজন বয়স্ক সেনাপতি ভ্রু কুঁচকে বললেন,
“ফাইয়াজ? ফাইয়াজ তো ডাকাত দলের সর্দার ছিল? ও এসবে….?”
ফাইয়াজ প্রতিবাদ করল না। স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। শাখা উত্তর দিল,
“হ্যাঁ, ফাইয়াজ। একসময় সে হারুণ ওয়াসেমের ঘনিষ্ঠ সহযোগী ছিল। ফলে হারুণের অনেক গোপন পরিকল্পনা, ইংরেজদের সঙ্গে তার যোগাযোগ এবং তাদের চলাচলের পথ সম্পর্কে ফাইয়াজের প্রত্যক্ষ ধারণা ছিল। অতীতের সেই পরিচয়ই আমাদের অভিযানে সবচেয়ে বড় সুবিধা এনে দিয়েছে।”
বাইজিদ শাহ মনোযোগ দিয়ে শুনছিলেন। শাখা এবার দরবারের মাঝখানে কয়েক পা এগিয়ে গেল।
“ইংরেজরা কোথায় অবস্থান করছিল, কোন পথে তাদের লোকজন যাতায়াত করত, কোথায় তাদের অর্থসম্পদ লুকিয়ে রাখা হয়েছিল, ফাইয়াজের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতেই আমরা পরিকল্পনা সাজিয়েছি। তার তথ্য যাচাই করে সেনাদের পাঠানো হয়েছে। সেই পরিকল্পনা অনুসরণ করেই আমরা তাদের ঘাঁটি ঘিরে ফেলতে পেরেছি। ইংরেজদের বিতাড়িত করা, তাদের সহযোগীদের আটক করা এবং তাদের লুকানো সম্পদের সন্ধান পাওয়া। এই সাফল্যের পেছনে ফাইয়াজের অবদান অস্বীকার করার উপায় নেই।”
একজন মন্ত্রী সংশয় প্রকাশ করলেন,
“কিন্তু যে মানুষ একসময় তাদেরই পক্ষের লোক ছিল, তাকে এতটা ভরসা করা কতটা নিরাপদ?”
শাখার চোখে কঠোরতা ফুটে উঠল।
“কোনো মানুষকে কি তার অতীতের জন্য সারাজীবন একই অপরাধের শাস্তি পেতে হবে? ফাইয়াজ তার পুরোনো জীবন ছেড়ে সৎ পথে ফিরতে চাইছে। সে এখন রাজপ্রহরী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে। তার দেওয়া তথ্যের সত্যতা আমরা যাচাই করেছি, তার কাজের ফলও নিজের চোখে দেখেছি। এরপরও যদি আমরা তাকে শুধু তার পুরোনো পরিচয় দিয়ে বিচার করি, তাহলে পরিবর্তনের সুযোগটা কোথায়? তার চাইতে বড় কথা হলো, আমি তাকে ভালোবাসি”
নির্লজ্জের মত সভা ভর্তি মানুষের সামনে শাখা কথাটা বলে ফেলল। তার এক কথায় কক্ষ নীরব হয়ে গেল। শাখা এবার বাইজিদ শাহের দিকে তাকাল।
“মামা, নাসিরাবাদকে নতুন করে গড়ে তোলা আমার একার পক্ষে সম্ভব নয়। আমি চাই, এই বিশাল উদ্যোগে ফাইয়াজ আমার সঙ্গে থাকুক। নাসিরাবাদে কোথায় কীভাবে কাজ শুরু করতে হবে, নিরাপত্তার জন্য কোন বিষয়গুলো আগে দেখতে হবে এসব ক্ষেত্রে তার অভিজ্ঞতা আমাদের কাজে আসবে। সে আমার ভাবী জীবন সঙ্গী। আমি তাকেই সঙ্গে রাখতে চাই”
বাইজিদ কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তাঁর দৃষ্টি ফাইয়াজের ওপর স্থির হলো।
“ফাইয়াজ, তোমার অতীত সম্পর্কে আমি অজ্ঞ নই। তোমাকে রাজপ্রহরীর দায়িত্ব দেওয়ার আগেও তোমার পরীক্ষা নিয়েছি। এখন আমাদের মেয়ের এই উদ্যোগে তোমাকে সঙ্গে নেওয়া হচ্ছে। তুমি কি বুঝতে পারছ, এর অর্থ কী?”
ফাইয়াজ এক পা এগিয়ে এসে মাথা নত করল।
“জি, মহাশয়। এর অর্থ, আমাকে শুধু নিজের জন্য নয়, সাহাবাদ ও নাসিরাবাদের মানুষের জন্যও কাজ করতে হবে। আমার পুরোনো পরিচয়ের কারণে কেউ আমাকে বিশ্বাস না করলে আমি তাকে দোষ দেব না। আমি চাই, আমার কাজ দেখে একদিন মানুষ নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিক আমি বদলেছি কি না। মহাশয়! আমি আপনার আর আমার শাখার বিশ্বাস কক্ষণও নষ্ট করব না”
বাইজিদের মুখের অভিব্যক্তি কিছুটা কোমল হলো। শাখা ফাইয়াজের দিকে তাকাল। তার চোখে প্রশংসা ফুটে উঠল। বাইজিদ ঘোষণা করলেন,
“তাহলে আমার অনুমতি রইল। শাখা নাসিরাবাদ পুনর্গঠনের দায়িত্বে থাকবে। ফাইয়াজ তার সহযোগী হিসেবে কাজ করবে”
মেহেরুন্নেসা এতক্ষণ নীরবে সব শুনছিলেন। তিনি মেয়ের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন।
“শাখা, বড় কোনো স্বপ্ন পূরণ করতে হলে শুধু সাহস থাকলেই হয় না। সঠিক মানুষকে পাশে রাখার বিচক্ষণতাও লাগে”
শাখা মামির কথার উত্তরে হাসল। দরবার শেষ হওয়ার আগে শাখা প্রয়োজনীয় নথিপত্র গুছিয়ে নিল। ফাইয়াজও নিজের দায়িত্ব বুঝে নিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই নাসিরাবাদের উদ্দেশে যাত্রা শুরু হবে। দরবারকক্ষ থেকে বের হওয়ার সময় শাখা নিচু স্বরে বলল,
“হুহহহ আসছে”
ফাইয়াজ তার দিকে তাকাল।
“কি হলো সম্রাজ্ঞী? আমি কি কিছু ভুল বলেছি?”
শাখা ভেংচি কেটে বেড়িয়ে গেল। ফাইয়াজ পিছন পিছন ডাকে
“ও মহারানী!”
শাখা কথা না বলে হাঁটতে লাগল। ফাইয়াজ দৌড়ে ওর কাছে এগিয়ে এসে বলল
“ভাবছি, মহারানী হওয়ার পর যদি আমাকে আর পাত্তা না দেন? আমি কিন্তু আবার ডাকাত হয়ে যাব”
চট করে থেমে গেল শাখার পা। বড় বড় চোখ করে তাকাতেই ফাইয়াজ মাথা চুলকে হেসে বলল
“তারপর তোমাকে ডাকাতি করে পালাবো”
“বেশি কথা না বলে ঘোড়ায় চড়ুন। প্রথমে পুরোনো বাজারের পাশ দিয়ে যাব। সেখানে নির্মাণসামগ্রীর কিছু দোকান আছে। নাসিরাবাদে কাজ শুরু করার আগে তাদের সঙ্গে কথা বলতে হবে। প্রয়োজনীয় কাঠ, লোহা, পাথর আর চুনের সরবরাহ নিশ্চিত করা দরকার।”
ফাইয়াজ মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল। কিছুক্ষণের মধ্যেই ছোট দলটি রাজপথ ধরে এগিয়ে গেল। পথের দুপাশে দোকানপাট, মাটির ঘর, ছোট ছোট কারিগরদের কর্মশালা। বাজারের কাছে পৌঁছাতেই কয়েকজন দোকানি ফাইয়াজকে চিনতে পারল। তাদের একজন অন্যজনের কানে কানে কিছু বলল। তারপর ইচ্ছাকৃতভাবে এমন জোরে কথা বলল, যাতে ফাইয়াজ শুনতে পায়।
“আরে, ওই যে! আমাদের সেই ডাকাত সর্দার! এখন দেখছি রাজকীয় কাজের লোক হয়েছে!”
আরেকজন ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে উঠল।
“দুনিয়া কত বদলে গেল! আগে যার নাম শুনলে দোকানের দরজা বন্ধ করে দিতাম, এখন সে-ই কামলা দিতে যাচ্ছে!”
“কী আর করবে? ডাকাতি করার দিন তো শেষ। এখন ভালো মানুষের সাজতে হচ্ছে!”
কথাগুলো শুনে আশপাশের কয়েকজন মানুষ তাদের দিকে তাকালো। কেউ আবার হাসি চাপতে চেষ্টা করল। ফাইয়াজের হাত লাগামের ওপর শক্ত হয়ে উঠল। তার চোয়াল শক্ত হলো, ক্ষণিকের জন্য ক্রোধ ফুটে উঠল।বএকসময় এমন কটাক্ষের জবাব সে অস্ত্র দিয়ে দিত। কেউ তার সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলার সাহস পেত না। কিন্তু আজ সে নিজের রাগকে সংযত করল।
শাখা ঘোড়ার গতি কমিয়ে তার দিকে তাকাল।
“ফাইয়াজ?”
ফাইয়াজ মাথা তুলে তাকাল। তারপর ঘোড়া থামিয়ে দোকানিদের দিকে ফিরল। তার কণ্ঠে রাগ ছিল, কিন্তু হুমকি ছিল না।
“তোমরা ঠিকই বলেছ। আমি একসময় ডাকাত ছিলাম। নিজের ভুলে অনেকের ক্ষতি করেছি। সেই অতীত অস্বীকার করার কোনো ইচ্ছা আমার নেই”
দোকানিরা কিছুটা অবাক হয়ে একে অন্যের দিকে তাকাল। তারা হয়তো ভেবেছিল, ফাইয়াজ রেগে গিয়ে ঝগড়া শুরু করবে। ফাইয়াজ আবার বলল,
“কিন্তু একটা কথা বলি? তখন যখন খারাপ ছিলাম, তোমরা আমাকে ভয় পেতে। আমার সামনে কথা বলার সাহস করতে না। আর এখন যখন সেই জীবন ছেড়ে ভালো হতে চাইছি, তখন তোমরা আমাকে নিয়ে ব্যঙ্গ করছ”
সে একটু থামল। বাজারের কোলাহলের মধ্যেও তার কণ্ঠ স্পষ্ট শোনা গেল।
“এই হচ্ছে আমাদের সমাজ। মানুষ ভুল করলে তাকে অপরাধী বলে দূরে ঠেলে দেয়, আর সে ভুল শুধরে ফিরে আসতে চাইলে তার অতীত টেনে হাসাহাসি করে। কেউ জানতে চায় না, সে সত্যিই বদলাতে চাইছে কি না। কেউ সুযোগ দিতে চায় না। সবাই শুধু পুরোনো পরিচয়টা আঁকড়ে ধরে ছোট করতে চায়”
কথা শেষ করে সে আর দাঁড়াল না। ঘোড়ার লাগাম টেনে আবার এগিয়ে গেল। শাখা কিছুক্ষণ তার পাশে নীরবে চলল। বাজার পেরিয়ে নিরিবিলি পথ শুরু হলে সে বলল,
“তুমি চাইলে তাদের কঠিন জবাব দিতে পারতে।”
ফাইয়াজ মৃদু হেসে বলল,
“তুমি বলছো? বেশ বেশ। নাহহ, একসময় সেটাই করতাম। ভাবতাম, মানুষ ভয় পেলেই বুঝি সম্মান করে”
“এখন কী মনে হয়?”
“ভয় আর সম্মান এক জিনিস নয়”
শাখা তার দিকে তাকিয়ে রইল। এই মানুষটিকে সে প্রতিদিন যেন নতুন করে চিনছে। ফাইয়াজ বলল,
“আমি জানি, আমার অতীতের দায় শুধু কয়েকটা ভালো কাজ করলেই মুছে যাবে না। যাদের ক্ষতি করেছি, তাদের সবার কাছে ক্ষমা চাওয়ার সুযোগও হয়তো পাব না। কিন্তু যত দিন বেঁচে থাকব, চেষ্টা করব যেন আমার কারণে আর কোনো মানুষের ক্ষতি না হয়”
শাখার চোখে কোমলতা ফুটে উঠল। ফাইয়াজ তার দিকে তাকাল।
“তুমি কি সত্যিই বিশ্বাস করো, একদিন মানুষ সব আমাকে মেনে নেবে?
শাখা গাল ফুলিয়ে বলল
“কই দরবারে তো একটাবারও বললেন না ভালোবাসেন আমাকে”
“ইশশশশশ আমার লজ্জা করে না নাকি?”
তাদের ঘোড়ার খুরের শব্দ আবার পথের নীরবতা ভেঙে এগিয়ে চলল। দূরে নাসিরাবাদের দিকে যাওয়া পথের দুপাশে ছড়িয়ে থাকা পরিত্যক্ত বসতিগুলো দেখা যাচ্ছিল। প্রতিটি বাড়িতে ভাঙা দেয়াল, কোথাও আগাছায় ঢেকে যাওয়া উঠান, বহু দিন বন্ধ থাকা দোকানের কাঠের দরজা।
শাখা সেদিকে তাকিয়ে বলল,
“এই পথের দুপাশে আবার দোকান খুলবে। মানুষ নিজেদের হাতে ঘর বানাবে। শিশুরা পাঠশালায় যাবে। সন্ধ্যায় বাজার আবার রমরমা হবে”
*****
গতকাল সকালে সাহাবাদের রাজমহল থেকে একটি পত্র পাঠানো হয়েছিল ইয়ামিনের কাছে। পত্রটি লিখেছিল জান্নাত,
“আজ বিকেলে সাহাবাদের নদীর পাড়ে আপনার সঙ্গে একান্তে কথা বলতে চাই। কিছু প্রশ্ন আছে, যেগুলোর উত্তর আমার জানা প্রয়োজন। সময়মতো আসবেন।”
পত্রটি পাওয়ার পর থেকে ইয়ামিনের মন অশান্ত হয়ে আছে। সে জানে, জান্নাত কী জানতে চাইতে পারে। এত দিন সব কথা খুলে বলেনি কিন্তু আজ হয়তো আর এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। বিকেলের আলো নদীর বুকে ছড়িয়ে পড়ছে। সাহাবাদের নদীর পাড়ে বাতাস শান্ত। দূরে কয়েকজন জেলে নৌকা গুটিয়ে তীরে ফিরছে। নদীর ধারে পুরোনো একটি বটগাছের ছায়া দীর্ঘ হয়ে পড়েছে। জান্নাত সেখানে দাঁড়িয়ে আছে।
তার পরনে শুভ্র পোশাক, মাথার ওড়নাটি বাতাসে দুলছে। এক হাতে সে ওড়নার প্রান্ত ধরে রেখেছে, অন্য হাতটি অন্যমনস্কভাবে গাছের ঝুলে থাকা শিকড়ে ছুঁয়ে আছে। বারবার নদীর পথের দিকে তাকাচ্ছে।
মুয়াজের ঘটনার সঙ্গে ইয়ামিনের সম্পর্কের কথা যত ভাবছে, ততই নতুন প্রশ্ন মাথায় আসছে। কেন ইয়ামিন তাকে উদ্ধার করেছিল? কীভাবল সে জান্নাতকে চিনতে পেরেছিল? আর সবচেয়ে বড় কথা, ইয়ামিন কি আগে থেকেই তার খোঁজ রাখত? ঘোড়ার খুরের শব্দ শুনে জান্নাত মুখ তুলে তাকাল। দূরের পথ ধরে ইয়ামিন আসছে। তার ঘোড়াটি নদীর পাড়ের কাছে এসে ধীর হলো। ইয়ামিন ঘোড়া থেকে নেমে লাগামটি গাছের পাশে বেঁধে দিল। তারপর জান্নাতের দিকে এগিয়ে এল।
কাছে এসে সে থামল।
“অনেকক্ষণ অপেক্ষা করছেন?”
জান্নাত শান্ত কণ্ঠে বলল,
“না। এই তো এলাম”
ইয়ামিন তার মুখের দিকে তাকাল। জান্নাতের চোখে আজ যে গাম্ভীর্য, তা সে সহজেই বুঝতে পারল।
“পত্রে লিখেছিলেন, কিছু প্রশ্ন আছে। কী জানতে চান?”
জান্নাত কয়েক মুহূর্ত তার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর সরাসরি প্রশ্ন করল,
“মুয়াজের লোকদের আক্রমণ করে আমাকে সেখান থেকে নিয়ে গিয়েছিলেন কেন?”
ইয়ামিন নীরব হয়ে গেল। জান্নাত আবার বলল,
“আপনি আমাকে নদীর কাছ থেকে পেয়েছিলেন, এ কথা আমি এত দিন বিশ্বাস করেছি। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, পুরো ঘটনা তা ছিল না। আপনি আমাকে আগে থেকেই চিনতেন। আমার সম্পর্কে জানতেন। তাই না?”
ইয়ামিনের দৃষ্টি নদীর দিকে গেল। যেন কথাগুলো সাজানোর জন্য কিছুটা সময় নিচ্ছে।
“হ্যাঁ। আমি তোমাকে আগে থেকেই চিনতাম।”
জান্নাতের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।
“কত দিন আগে থেকে?”
ইয়ামিন এবার তার দিকে তাকাল।
“তখন আমার বয়স আঠারো।”
জান্নাত অবিশ্বাসের চোখে তাকাল।
“আঠারো?”
“হ্যাঁ। তখন আমি পাহাড়ের জীবনেই অভ্যস্ত। আমার দাদি আমাকে বড় করেছেন। পাহাড়ের বাইরের রাজ্যগুলো সম্পর্কে জানার কৌতূহল ছিল। একবার ছদ্মবেশে সাহাবাদের এক জমিদারবাড়িতে ঢুকেছিলাম। সেখানেই প্রথম তোমাকে দেখি। তুমি বাড়ির ভেতরের উঠান দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলে। তোমার সঙ্গে কয়েকজন দাসী ছিল। তুমি তাদের সঙ্গে কথা বলছিলে”
জান্নাত চুপ করে শুনছে। ইয়ামিন বলল,
“আমি জানি না কেন, কিন্তু সেদিন তোমাকে দেখার পর থেকে তোমার কথা মাথা থেকে সরাতে পারিনি। তখন আমি খুব অল্প বয়সী। নিজের অনুভূতির নামও ঠিকমতো জানতাম না। তখনকার আমি আর এখনকার আমি এক মানুষ হলেও, আমার বোধবুদ্ধি এক ছিল না। কিশোর বয়সের সেই অনুভূতিটা ছিল একরকম মুগ্ধতা। তোমার সম্পর্কে জানতে ইচ্ছে করত। তুমি কেমন আছ, তোমার জীবনে কী ঘটছে এসব জানতে চাইতাম। তবে আমি তোমার কাছে যাওয়ার সাহস করিনি।”
জান্নাতের চোখে প্রশ্নের তীব্রতা বাড়ল।
“আপনি কি আমাকে অনুসরণ করতেন?”
ইয়ামিন কিছুক্ষণ নীরব রইল। তারপর সত্যিটা স্বীকার করল।
“হ্যাঁ, জান্নাত। দূর থেকে তোমার খোঁজ রাখতাম। তোমার আশপাশে বিপদ আছে কি না, তুমি কোথাও গেলে নিরাপদে ফিরেছ কি না, এসব জানার চেষ্টা করতাম। আমি বুঝতে পারিনি, আমার সেই আচরণ তোমার কাছে কেমন মনে হতে পারে। তখন নিজের অনুভূতিকেই সবচেয়ে বড় করে দেখেছিলাম।”
“আপনি এত বড় একটা কথা আমার কাছ থেকে লুকিয়ে রেখেছেন?”
ইয়ামিন সঙ্গে সঙ্গে বলল,
“আমি জানি, তোমার কাছে এটা অন্যায় মনে হতে পারে। তোমার অনুমতি ছাড়া তোমার ব্যক্তিগত জীবনের খোঁজ রাখা ঠিক হয়নি। তখন আমি নিজেকে বোঝাতাম, তোমার কোনো ক্ষতি হোক চাই না বলেই এসব করছি। কিন্তু এখন বুঝি, ভালো চাওয়া আর কারও জীবনের ওপর নিজের অধিকার ভেবে নেওয়া এক কথা নয়।”
“তাহলে মুয়াজের ঘটনার দিনও আপনি আমার খোঁজ রাখছিলেন?”
“হ্যাঁ।”
“আপনি জানতেন, সেদিন আমার বিয়ে হচ্ছিল?”
ইয়ামিনের মুখ গম্ভীর হয়ে গেল।
“যতটুকু জানতে পেরেছিলাম, ততটুকুই জানতাম। ওটা ছিল বিয়ে নামক ফাঁদ। তখন আর দূরে দাঁড়িয়ে থাকার সুযোগ ছিল না।”
জান্নাতের কণ্ঠ কেঁপে উঠল।
“কিন্তু আপনি আমাকে আগে জানাননি কেন? আপনি যে আমাকে চিনতেন, যে আমার খোঁজ রাখতেন একবারও বলেননি কেন?”
ইয়ামিন উত্তর দেওয়ার আগে কিছুক্ষণ নীরব থাকল।
“ভয় পেয়েছিলাম।”
জান্নাত বিস্মিত হলো
“আপনি ভয় পেয়েছিলেন?”
“হ্যাঁ। তোমার সামনে দাঁড়িয়ে যদি বলতাম, বহু বছর ধরে তোমাকে দূর থেকে দেখে আসছি, তোমার খোঁজ রাখছি তুমি হয়তো আমাকে বিশ্বাস করতে না। হয়তো ভাবতে, আমি খারাপ ছেলে। অসৎ উদ্দেশ্য আছে। আর আমি নিজেও বুঝতে পারছিলাম না, আমার অনুভূতিটা কীভাবে তোমাকে জানাব”
সে একটু থামল।
“পরে যখন তোমাকে বিপদের মধ্যে দেখলাম, তখন নিজের ভয় নিয়ে ভাবার সময় ছিল না। তোমাকে সেখান থেকে সরিয়ে আনা জরুরি ছিল। আমি চেয়েছিলাম তুমি নিরাপদে থাকো। কিন্তু তোমাকে সত্যিটা বলার সাহস তখনও আমার হয়নি।”
“আপনি কি মনে করেন, আমাকে রক্ষা করেছেন বলে সব গোপন রাখার অধিকার আপনার ছিল?”
ইয়ামিন মাথা নাড়ল।
“না। আমার সে অধিকার ছিল না”
তার স্বীকারোক্তিতে জান্নাত কিছুটা থমকে গেল। সে হয়তো আশা করেছিল, ইয়ামিন নিজের কাজের পক্ষে যুক্তি দেখাবে। কিন্তু ইয়ামিন নিজের ভুল অস্বীকার করল না।
“আমি তোমাকে ভালোবেসেছিলাম”
জান্নাতের চোখ ছলছল করে উঠল
“আপনি জানেন আমি আস্ত একটা গোলক ধাঁধায় পড়ে গেছি। কত্ত কিছু জদনার জন্য ঘুরছি আমি। কাকে প্রশ্ন করব, কার থেকে জানবো?”
ইয়ামিনের বদনে অনুশোচনা ফুটে উঠল।
“আমাকে প্রশ্ন করো। যত প্রশ্ন আছে, সব করো। আমি আর কোনো কথা লুকাতে চাই না। তবে তোমার কাছে একটা অনুরোধ, আমার অতীতের কাজের বিচার তুমি করবে করো , কিন্তু আমার বর্তমানের কথাগুলোও শুনবে”
জান্নাত মাথা তুলল।
“আমি আপনার কথা শুনছি, ইয়ামিন। কিন্তু আজ শুধু এটুকু জেনে ফিরে যেতে চাই না। মুয়াজের লোকদের কাছ থেকে আমাকে উদ্ধার করার সময় আপনি ঠিক কী জানতেন, কার কাছ থেকে খবর পেয়েছিলেন, আর আমার জীবনের কোন কোন ঘটনা আপনার জানা ছিল সব জানতে চাই।”
“সব বলব। একটাও কথা লুকাব না।”
সূর্য তখন দিগন্তের কাছে নেমে এসেছে। নদীর পানি ধীরে ধীরে গাঢ় রং ধারণ করছে। তাদের মাঝখানে কয়েক হাত দূরত্ব। ইয়ামিন মাথা চুলকে বলল
“ওদিকে তোমার বোন আর আমার ভাই এর মধ্যে বিশাল ফাটাফাটি। কে যেন কার মাথা ফাটিয়ে দিয়েছে শুনলাম”