ফন্ট সাইজ:
থিম:
রক্তমুকুট

58

লেখক: জান্নাতুল ফেরদৌস

“আমি কিশোর বয়স থেকেই তোমাকে চোখে চোখে রাখি। ভালোবাসি সেই বয়স থেকেই।”

জান্নাত বটগাছের নিচে চুপচাপ দাঁড়িয়ে। সামনে ইয়ামিন। এতক্ষণে তাদের কথোপকথন অনেক দূর এগিয়েছে। ইয়ামিন নিজের অতীতের যে অংশগুলো এত দিন আড়াল করে রেখেছিল, তার কিছুটা আজ প্রকাশ করেছে। কিন্তু জান্নাতের মনে আরও একটি প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে জিজ্ঞেস করল,

“আরও একটা কথা জিজ্ঞেস করব?”

“হ্যা অবশ্যই। করো না”

“আপনি যে রাজবাড়ির সন্তান, সেটা কি আগে থেকেই জানতেন?”

প্রশ্নটা শুনে ইয়ামিনের মুখের অভিব্যক্তি বদলে গেল। কিছুক্ষণ জান্নাতের দিকে তাকিয়ে রইল। নদীর দিকে দৃষ্টি সরিয়ে নরম কণ্ঠে বলল,

“জানতাম”

জান্নাত যেন উত্তরটা শুনে নুজের কানকে বিশ্বাস করতে পারল না।

“আপনি জানতেন?”

“হ্যাঁ। আমি যে আমিরাবাদের রাজপরিবারের সঙ্গে রক্তের সম্পর্কে জড়িত, সে কথা জানতাম। কিন্তু এটাও জানতাম, ওই রাজ্যপাট আমি কখনো পাব না”

জান্নাত ভ্রু কুঁচকে তাকাল।

“কেন? আপনি তো হারুণ ওয়াসেমের জ্যেষ্ঠ পুত্র হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছিলেন। মেহরাবও আপনাকে ভাই হিসেবে গ্রহণ করেছে।”

ইয়ামিন মৃদু হাসল। তবে সেই হাসিতে কোনো আনন্দ নেই

“স্বীকৃতি পাওয়া আর সিংহাসনের অধিকারী হওয়া এক কথা নয়, জান্নাত। রাজপরিবারের ইতিহাসে এমন অনেক গোপন কথা আছে, যেগুলো বাইরে থেকে দেখে বোঝা যায় না। আমি ছোটবেলা থেকেই পাহাড়ে বড় হয়েছি। রাজপ্রাসাদের নিয়ম, রাজনীতির হিসাব, সিংহাসনের জন্য মানুষের টানাপোড়েন এসবের মধ্যে আমার বেড়ে ওঠা হয়নি। পরে যখন নিজের পরিচয় সম্পর্কে জানতে পারলাম, তখনও আমার মনে হয়নি, ওই রাজ্যপাট আমার জন্য। আর তাছাড়াও, তুমি ছিলে বলেই ওরা মেনে নিয়েছে। নয়তো….”

সে একটু থামল।

“আমার জীবনে রাজমুকুটের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ছিল নিজের পরিচয়টা বোঝা। আমি কে, কোথা থেকে এসেছি, কেন আমাকে পাহাড়ের জীবনে বড় হতে হলো এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছি কেবলই। কিন্তু কখনো সিংহাসনের স্বপ্ন দেখিনি।”

জান্নাত নীরবে তার কথা শুনল।

“আপনি কি কখনো মনে করেননি, আপনার সঙ্গে অন্যায় হয়েছে?”

“মনে হয়েছে। কিন্তু সব অন্যায়ের প্রতিকার সিংহাসনে বসে হয় না। কিছু প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হয়, কিছু সত্য প্রকাশ করতে হয়। আর কিছু সিদ্ধান্ত নিতে হয় নিজের বিবেক দিয়ে।”

ইয়ামিন এবার জান্নাতের দিকে তাকাল।

“আমি যদি রাজ্যপাটের জন্য লড়াই করতাম, তাহলে হয়তো অনেক কিছু পেতাম। কিন্তু তার বিনিময়ে কী হারাতাম, তোমার ধারণা আছে?”

জান্নাত কিছুক্ষণ তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।

তারপর হঠাৎ বলল,

“আমিও একজনকে ভালোবাসি”

কথাটা শুনে ইয়ামিনের মুখে যেন আঁধার নেমে এলো। চোখ জোড়া ছলছল করতে চদয়। একটু সোজা হয়ে দাঁড়াল। চোখে কৌতূহল, ঠোঁটে অনিচ্ছুক হাসি।

“ওহ, তাই নাকি?”

জান্নাত মাথা নাড়ল।

“হ্যাঁ”

ইয়ামিনের কণ্ঠে স্পষ্ট জানার আগ্রহ।

“কে সে?”

জান্নাত উত্তর দিল না। মুখে এমন এক অভিব্যক্তি, যেন বহু দিনের কোনো স্মৃতি মনে পড়েছে। ইয়ামিন আরেকটু কাছে এসে বলল,

“জান্নাত, বলবে না?”

জান্নাত তার দিকে ফিরে বলল

“একজন যুবক ফুলওয়ালা সেজে একদিন আমার কক্ষে ফুল রেখে গিয়েছিল।

ইয়ামিনের ঠোঁটের জোর করে আনা হাসি তখনও অটুট।

“ফুলওয়ালা?”

“হ্যাঁ। সে মহলে আসত। কখনো ফুলের ঝুড়ি হাতে, কখনো অন্য কোনো ছদ্মবেশে। প্রথম প্রথম আমি তাকে সাধারণ ফুল বিক্রেতা ভেবেছিলাম। কিন্তু পরে লক্ষ করলাম, সে যখনই মহলে আসে, আমার আশপাশেই থাকার চেষ্টা করে। কখনো দূর থেকে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে, আবার আমি তাকালে চোখ সরিয়ে নেয়।”

ইয়ামিনের হাসি একটু ম্লান হলো। সে মন দিয়ে জান্নাতের কথা শুনছে। জান্নাত বলতে থাকল,

“একদিন আমার কক্ষে ফুল রেখে যাওয়ার থেকে আমি তাকে ভালোবাসতে শুরু করি। ফুলের সঙ্গে কোনো চিঠি ছিল না, কোনো নামও ছিল না। তবুও আমার মনে হয়েছিল এই ফুলগুলো আমাকে কিছু বলতে এসেছে”

ইয়ামিনের মুখের আনন্দ ধীরে ধীরে স্তিমিত হয়ে এল। জান্নাত সেটা লক্ষ করলেও কিছু বলল না।

সে এবার একটু হেসে বলল,

“আমি তাকে লক্ষ করতাম। সে মহলে এলে আমার চোখ বারবার তার দিকে চলে যেত। কেন এমন হতো, তখন বুঝতে পারিনি। পরে একদিন তার বাহুতে একটা উল্কি দেখতে পাই। রাজপরিবারের চিহ্ন। তখন বুঝতে পারি, সে সাধারণ কোনো যুবক নয়। সে রাজপরিবারের উত্তরাধিকারী”

ইয়ামিনের বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। তার মনে পড়ল, ছদ্মবেশে রাজপ্রাসাদের আশপাশে ঘোরার সেই দিনগুলোর কথা। মনে পড়ল, জান্নাতের কক্ষে ফুল রেখে আসার আগে কতক্ষণ দ্বিধায় দাঁড়িয়ে ছিল সে। মনে পড়ল, দূর থেকে জান্নাতকে দেখে ফিরে আসার সময় নিজের মনে কত প্রশ্ন জমিয়ে রেখেছিল। জান্নাত যে তার কথাই বলছে, তা বুঝতে তার আর দেরি হলো না।

তবু সে নিজেকে সামলে নিয়ে জিজ্ঞেস করল,

“তারপর?”

জান্নাত এবার তার দিকে তাকাল।

“তারপর আর কী? আমি তাকে ভালোবেসে ফেললাম”

ইয়ামিনের মুখের হাসি পুরোপুরি মিলিয়ে গেল। জান্নাত তার মুখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,

“ওমা,আপনি এত চুপ হয়ে গেলেন কেন?”

ইয়ামিন গলা পরিষ্কার করে বলল,

“ভাবছিলাম, সেই ফুলওয়ালা যুবকটা তোমার ভাগ্য ভালো করে দিয়েছে”

জান্নাত মৃদু হাসল।

“কেন?”

“কারণ, সে এমন একজনের ভালোবাসা পেয়েছে, যে তার পরিচয় জানার আগেই তাকে লক্ষ করত। একজন সাধারণ যুবককে কোনো শাহজাদি ভালোবাসে, চারটে খানি কথা নাকি?”

জান্নাতের হাসি একটু গভীর হলো।

“আপনি কি মনে করেন, আমি শুধু তার রাজপরিবারের পরিচয়ের জন্য তাকে ভালোবেসেছি?”

“এহহে একদমই না। তোমার কথা শুনে তা মনে হচ্ছে না। আমি আবার তা কখন বললাম?”

ইয়ামিনের কণ্ঠে এক অদ্ভুত কোমলতা ফুটে উঠল। তার চোখে এখনও বিষণ্নতার ছায়া, কিন্তু সেখানে একটুখানি আনন্দও ফিরে এসেছে। জান্নাত বলল,

“আমি তাকে ভালোবেসেছি, এতটুকু কারণই যথেষ্ট ছিল আমার জন্য”

ইয়ামিন জান্নাতের গা ঘেষে বসে বলল

“তা মহারানী, নদীর স্রোত তো নাসিরাবাদ এর দিকে। আপনি পাহাড়ি এলাকার দিকে কি করে ভেসে গেলেন?”

জান্নাত তাকাতেই ইয়ামিন ভ্রু নাচালো। জান্নাত ব্যাঙ্গ করে হেসে বলল

“স্রোতের বিপরীতেই ভেসে গেলাম, ১২ বছর মনে পুষেছি যে আপনাকে”

কিছুক্ষণ তারা এভাবেই হাসাহাসি করল। নদীর ওপারে সূর্যের আলো নিভে আসছে। দূরের মসজিদ থেকে মাগরিবের আজান ভেসে এলো। জান্নাত আকাশের দিকে তাকাল।

“সন্ধ্যা হয়ে যাচ্ছে। এবার ফিরতে হবে।”

ইয়ামিন মাথা নাড়ল।

“চলো, তোমাকে মহলের পথ পর্যন্ত এগিয়ে দিই।”

“দরকার নেই। আমি যেতে পারব।”

“জানি। তবু কিছুটা পথ একসঙ্গে হাঁটতে পারি।”

জান্নাত আর আপত্তি করল না।

দুজন পাশাপাশি নদীর পাড় ধরে এগিয়ে গেল। কিছু দূর গিয়ে তাদের পথ আলাদা হলো। জান্নাত বিদায় নেওয়ার আগে একবার ইয়ামিনের দিকে তাকাল।

“পড়শু আবার আসবেন। কথা আছে”

ইয়ামিন শান্ত কণ্ঠে বলল,

“কাল কেন নয়?”

“কাল পাত্রপক্ষ আসবে মহলে”

জান্নাত চলে গেল। ইয়ামিন হা করে তাকিয়ে রইল সেদিকে। পাত্রপক্ষ মানে? কার জন্য আসবে? শাখা তো ফাইয়াজকে ভালোবাসে তা সবাই জানে। সাহার বিবাহিত। বাকি রইল…..

“এই মায়া রানী। আমি কিন্তু কচু গাছে ফাসি দেব বলে দিলাম”

ইয়ামিন ঘোড়ার কাছে ফিরে এসে লাগাম হাতে নিল। তার মনে একদিকে নিজের অতীতের গোপন কথা প্রকাশ করার স্বস্তি, অন্যদিকে জান্নাতের বলা পাত্রপক্ষের কথা। মেজাজ বিগড়ে গেল। তবে জান্নাত তাকে আগে থেকেই ভালো বাসতো এই উপলব্ধি তার কাছে যেকোনো রাজমুকুটের চেয়ে মূল্যবান।

******

মাগরিবের পর জান্নাত রাজমহলে ফিরে এল। দীর্ঘ কথোপকথনের পর তার মন ভারী হলেও ইয়ামিনের সঙ্গে কিছু সত্য ভাগ করে নিতে পেরে সে খানিকটা স্বস্তি অনুভব করছিল। প্রাসাদের করিডর ধরে নিজের কক্ষের দিকে না গিয়ে সে প্রথমে সুনেহেরার কক্ষের দিকে গেল। একজন দাসি জানিয়েছে তাকে ডাকছিল সুনেহেরা।

সুনেহেরা তখন জানালার পাশে বসে কয়েকটি নথি দেখছিলেন। কক্ষের এক পাশে জ্বলছিল প্রদীপ। জান্নাত প্রবেশ করতেই তিনি মুখ তুলে তাকালেন।

“আয়, জান্নাত। কোথায় ছিলি এতক্ষণ?

জান্নাত তাঁর সামনে এসে বসল।

“নদীর পাড়ে গিয়েছিলাম মনি মা”

সুনেহেরা নথিগুলো সরিয়ে রাখলেন।

“ইয়ামিনের সঙ্গে দেখা করতে?”

জান্নাত একটু অবাক হয়ে তাকাল।

“হুম”

সুনেহেরা মৃদু হাসলেন।

“তুই গতকাল ওকে পত্র পাঠিয়েছিস, সেটা আমার অজানা নয়। তোর মুখ দেখেই বুঝতে পারছি, আজ অনেক কথা হয়েছে।”

জান্নাত কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,

“মনি মা, ইয়ামিন অনেক কিছু জানত, যা আমি জানতাম না। সে আমাকে বহু বছর আগে থেকেই চিনত। ছদ্মবেশে একবার জমিদারবাড়িতে ঢুকে আমাকে দেখেছিল। তখন তার বয়স আঠারো। সেই সময় থেকেই সে আমার খোঁজ রাখত।”

সুনেহেরার মুখ গম্ভীর হয়ে উঠল।

“আর কী বলেছে?”

জান্নাত ইয়ামিনের রাজপরিবারের পরিচয় সম্পর্কে জানা, সিংহাসনের প্রতি অনাগ্রহ এবং মুয়াজের লোকদের হাত থেকে তাকে উদ্ধার করার ঘটনাগুলো বিস্তারিত বলল। সুনেহেরা মন দিয়ে শুনলেন। তারপর বললেন,

“তবে মনে রাখিস, বিশ্বাস মানে অন্ধ হয়ে যাওয়া নয়।”

জান্নাত ফুপুর হাতের ওপর নিজের হাত রাখল।

“তোমার থেকে কিছু কখনও লুকাইনি মনি মা। তোমার সাথে বললে আমার সবকিছু একটু সহজ মনে হয়”

সুনেহেরা তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।

“তুই আমার বড় মেয়ে জান্নাত। চাই না কোনো ভুল সিদ্ধান্তে তোর ক্ষতি হোক। সব বলবি আমায়”

জান্নাতের চোখ আর্দ্র হয়ে উঠল। সে একটু ঝুঁকে সুনেহেরাকে জড়িয়ে ধরল। কিছুক্ষণ পর সুনেহেরা নিজেই বললেন,

“আচ্ছা, তোর কথা তো অনেক হলো। এবার আমার একটা কথা শোন।”

জান্নাত তাঁর মুখের দিকে তাকাল।

“হ্যা বলো”

“মাহাদি আজ আমার সঙ্গে কথা বলেছে”

জান্নাতের চোখ বড় হয়ে গেল।

“মামা? তারপর তারপর?

সুনেহেরা মাথা নাড়লেন। জান্নাতের ঠোঁটে দুষ্টু হাসি ফুটে উঠল।

“কী কথা হয়েছে? বলো না মনি মা”

সুনেহেরা তাকে কটাক্ষ করলেন।

“বাবাহহ এত আগ্রহ তোর?”

“আগ্রহ তো হবেই! এত বছর ধরে তোমাদের দুজনের মধ্যে যে গল্পটা অসমাপ্ত পড়ে আছে, সেটার শেষটা সুন্দর হওয়ারও তো দরকার আছে”

সুনেহেরা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তাঁর দৃষ্টি জানালার বাইরে চলে গেল।

“জীবনে কিছু ভুল সময়ের কারণে হয়, কিছু ভুল নিজের সিদ্ধান্তের কারণে। মাহাদি আর আমি বহু বছর একে অপরের থেকে দূরে থেকেছি। অনেক কিছু হারিয়েছি। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, আর অপেক্ষা করে লাভ নেই।”

জান্নাতের হাসি ধীরে ধীরে কোমল হয়ে এল।

“তার মানে?”

সুনেহেরা এবার সরাসরি জান্নাতের চোখের দিকে তাকালেন।

“আমরা বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।”

জান্নাত আনন্দে উঠে দাঁড়িয়ে সুনেহেরার গলা জড়িয়ে বলল

“সত্যি?”

সুনেহেরা হেসে ফেললেন।

“হ্যাঁ, সত্যি।”

জান্নাত তাকে জড়িয়ে ধরল।

“আমি তো ভেবেছিলাম, তোমরা সারাজীবন শুধু একে অপরের জন্য অপেক্ষা করেই কাটিয়ে দেবে”

সুনেহেরা তার পিঠে হাত বুলিয়ে দিলেন।

“আমিও তাই ভেবেছিলাম হয়তো। কিন্তু এবার অতীতের যে ক্ষতগুলো সারানো সম্ভব, সেগুলো সারানোর চেষ্টা করব। আর যে সময় হারিয়ে গেছে, তাকে ফিরিয়ে আনার মিথ্যা চেষ্টা করব না। সামনে যতটুকু সময় আছে, সেটুকু একসঙ্গে কাটাতে চাই।”

জান্নাত আবেগভরা চোখে বলল,

“তোমরা দুজন সুখী হও, এটাই চাই।”

******

আমিরাবাদ রাজপ্রাসাদের পশ্চিম দিকের কক্ষটিতে আলো জ্বলছে। হারুণ ওয়াসেমের মৃত্যুর পর থেকে প্রাসাদের পরিবেশ বদলে গেছে। রাজকোষের ক্ষতি, ইংরেজদের ষড়যন্ত্র, হারুণের গোপন অপরাধের অভিযোগ সবকিছু মিলিয়ে রাজপরিবারের প্রতিটি মানুষ এক অনিশ্চিত সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। মেহরাব নিজের কক্ষে দাঁড়িয়ে কয়েকটি নথি দেখছিল। টেবিলের ওপর ছড়িয়ে আছে রাজকোষের হিসাব, উদ্ধার করা সম্পদের তালিকা এবং ইংরেজদের কাছ থেকে পাওয়া কিছু নথির অনুলিপি।

তার চোখ লালচে। কয়েক রাত ধরে ঠিকমতো ঘুমাতে পারেনি সে। বাবার মৃত্যু, তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ এবং সাহারার সঙ্গে সম্পর্কের টানাপোড়েন, সবকিছু তাকে ভেতর থেকে ক্ষতবিক্ষত করে দিচ্ছে। দরজার কাছে পায়ের শব্দ হলো। সাহারা প্রবেশ করল। মেহরাব মুখ না তুলেই বলল,

“কিছু বলবে?”

সাহারা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে রইল।

“হ্যাঁ। নথিগুলোর বিষয়ে কথা বলতে এসেছি।”

মেহরাব এবার মুখ তুলল।

“আবার বাবার বিরুদ্ধে পাওয়া নথি?”

মেহরাবের মুখ শক্ত হয়ে গেল।

“সাহারা, আমি তোমাকে আগেই বলেছি, বাবার বিরুদ্ধে আনা প্রতিটি অভিযোগ আমি যাচাই করব। কিন্তু তার মানে এই নয় যে, ইংরেজদের কথাই সত্য ধরে নিতে হবে। আর তোমার এত তাড়াহুড়ো কেন লেগেছে তাই বুঝলাম না”

সাহারা শান্ত কণ্ঠে বলল,

“আমি তো আপনাকে সেটাই বলছি না? অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে। যাদের ক্ষতি হয়েছে, তাদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে। সাহাবাদের কাছ থেকে যে সম্পদ অন্যায়ভাবে নেওয়া হয়েছে, তার ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করতে হবে।”

মেহরাব নথিগুলো টেবিলে রেখে উঠে দাঁড়াল।

“সাহাবাদ! সাহাবাদ! সাহাবাদ! তোমার কাছে যখন সাহাবাদ এতই গুরুত্বপূর্ণ তবে বিয়ে কেন করেছো? তুমি কি একবারও ভেবে দেখেছ, বাবার বিরুদ্ধে এসব অভিযোগ সত্য হলে আমার অবস্থাটা কী হবে? আমি নিজের বাবাকে হারিয়েছি, সাহারা! এখন কি আমাকে একজন মৃত মানুষের জন্যও তর্ক করতে হবে?”

সাহারার মুখে কষ্ট ফুটে উঠল। তবু সে নিজেকে সামলে বলল,

“আমি জানি, আপনার কষ্ট হচ্ছে। আমিও চাইনি, আপনার জীবনে এমন দিন আসুক। কিন্তু আপনার কষ্টের কারণে অন্যদের কষ্টকে অস্বীকার কর…..”

মেহরাব তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাল।

“তুমি কি মনে করো, আমি বাবার অপরাধ ঢাকতে চাই?”

“আমি মনে করি, আপনি এখনো সত্যিটা মেনে নেওয়ার জন্য প্রস্তুত নন।”

কথাটা শুনে মেহরাবের মুখ লাল হয়ে উঠল ক্ষোভে

“তাহলে সবটা জেনেও কেন সময় দিচ্ছ না? তুমি আমাকে চেনো না, সাহারা!”

সাহারা বলল

“আমি আপনাকে চিনি বলেই আপনার সামনে দাঁড়িয়ে এসব বলছি! অন্য কেউ হলে হয়তো আপনার সঙ্গে তর্ক করত না। আপনার রাগের ভয়ে চুপ করে থাকত। কিন্তু আমি তা পারব না।”

মেহরাব টেবিলের ওপর হাত রাখল।

“তুমি সবসময় নিজের সিদ্ধান্তকেই সঠিক মনে করো!”

মেহরাব মাথার চুল খামচে ধরে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করল।

“আচ্ছা তুমি চাও টা কি? বলো”

সাহারা এক পা এগিয়ে এল।

“আমি চাই, সাহাবাদের যে সম্পদ অন্যায়ভাবে নেওয়া হয়েছে, তার হিসাব প্রকাশ করুন। আর প্রমাণ পাওয়া গেলে ক্ষতিপূরণ দিতে সম্মত হোন”

“আর যদি প্রমাণ না পাওয়া যায়?”

“সব প্রমাণ ইতিমধ্যেই সামনে যুবরাজ। আপনি কেবল অন্ধের ভূমিকা পালন করছেন। কালো কাপড় বাঁধা আপনার চোখে, তাই সব টা দেখার পরও ঘাপটি মেরে আছেন। বুঝেছি, আপনি এভাবেই থাকবেন। আমিই থাকব না আপনার সাথে। কালই চলে যাব আমি সাহাবাদে। কক্ষণও আমার ছায়াও দেখবেন না, চেগারা তো দূর”

মেহরাবের চোখে ক্ষোভের পাশাপাশি গভীর আঘাত ফুটে উঠল।

“তুমি আবার আমাকে ছেড়ে যাওয়ার কথা বলছ?

সাহারা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ধীরে বলল,

“আমি আপনাকে ছেড়ে যাওয়ার কথা বলছি না, যুবরাজ। আমি বলছি, অন্যায়ের পাশে দাঁড়াতে পারব না। আপনি যদি ন্যায়বিচারের পথ বেছে নেন, আমি আপনার সঙ্গেই থাকব। কিন্তু আপনি যদি সত্যের মুখ বন্ধ করতে চান, তাহলে আপনার স্ত্রী হয়েও আমি তার বিরোধিতা করব। আজ রাতটা সময় পাচ্ছেন আপনি সিদ্ধান্ত নেওয়ার। নয়তো কালই আমি এই রাজ্য ছাড়ব”

মেহরাব মুখ ফিরিয়ে নিল। তার বুকের মধ্যে জমে থাকা কষ্ট যেন রাগের রূপ নিয়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে। মুখ খুললেই এবার কিছু ভুলভাল বেড়িয়ে যাবে। সাহারা কটাক্ষ করে বলল

“অবশ্য আপনি ন্যায় করবেন ই কোথ থেকে? শরীরে তো হারুণ ওয়াসেমের রক্ত বইছে”

মেহরাবের চোখ ভিজে উঠল, তবুও সে তা লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করল।

“তাহলে আমার কী করা উচিত, সারা?”

সাহারা মাথা নাড়ল। মেহরাব জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। বাইরে অন্ধকার প্রাসাদের উঠানে প্রহরীরা টহল দিচ্ছে। দূরের মিনার থেকে রাতের বাতাস ভেসে আসছে। কিছুক্ষণ পর সে বলল,

“আমাকে সময় দাও সারা। সঙ্গ না দিলেও, সময় দাও”

সাহারা স্থির কণ্ঠে উত্তর দিল,

“সময় দেব। কিন্তু ন্যায়বিচারকে অনির্দিষ্টকালের জন্য অপেক্ষা করাতে পারবেন না”

মেহরাব চোখ বন্ধ করল। সাহারা দরজার দিকে এগিয়ে গেল। বেরিয়ে যাওয়ার আগে একবার ফিরে তাকাল।

“আমি আপনার শত্রু নই, যুবরাজ। আপনার পাশে দাঁড়াতে চাই বলেই আপনাকে সত্যের মুখোমুখি হতে বলছি।”

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে 58 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন