বিকেলের সূর্য পশ্চিম আকাশের দিকে হেলে পড়েছে। সাহাবাদ রাজমহলের উত্তর দিকের বাগানটিতে ছায়া দীর্ঘ হয়ে এসেছে। বাগানের মাঝখানে একটি পুরোনো পুকুর, তার চারপাশে শ্বেতপাথরের পথ। পথের দুপাশে গোলাপ, বেলি, রজনীগন্ধা আর নানা রঙের ফুল ফুটে আছে। বাতাসে মিশে আছে মাটির ভেজা গন্ধ। বাগানের এক পাশে দাঁড়িয়ে আছে সুনেহেরা। পরনে গাঢ় সবুজ পোশাক, মাথার ওড়নাটি কাঁধের ওপর আলগাভাবে রাখা। সামনে পুকুরের জলে পদ্মপাতা ভাসছে, কিন্তু সেদিকে তাঁর মন নেই।
আজ সকালে মাহাদির সঙ্গে তাঁর কথা হয়েছে। এত বছরের বিচ্ছেদ, অভিমান আর হারিয়ে যাওয়া সময়ের পর তাঁরা দুজন বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। সিদ্ধান্তটি নেওয়ার পর থেকে সুনেহেরার বুকের মধ্যে এক অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে।
তখনই বাগানের অন্য প্রান্ত থেকে ভেসে এল বাঁশির সুর। সুনেহেরা স্থির হয়ে গেলেন। সুরটা খুব পরিচিত। চোখের পাতা কেঁপে উঠল। বহু বছর পেরিয়ে গেছে, কত ঋতু বদলে গেছে, কত মানুষ জীবন থেকে হারিয়ে গেছে তবু এই সুর সে ভুলতে পারেনি। মাথা ঘুরিয়ে তাকালো। বাগানের শেষ প্রান্তে, পুরোনো কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে দাঁড়িয়ে আছেন মাহাদি ইকরাম। তার হাতে বাঁশি। চোখ বন্ধ করে বাজাচ্ছেন তিনি। বাতাসে পোশাকের প্রান্ত দুলছে। সুরের প্রতিটি বাঁকে যেন ফিরে আসছে বহু পুরোনো দিনের স্মৃতি। সুনেহেরার চোখ ভিজে উঠল।
এই বাঁশির সুর শুনলেই সে ছুটে যেত উত্তরের প্রাসাদে। রাজমহলের অন্য কোনো প্রান্তে থাকলেও ভুল হতো না তার। ও জানত, এই সুর অন্য কারও নয়, মাহাদির। কিন্তু মাহাদি যে তার সাথে লুকোচুরি খেলেছে বহু বছর। এক সময় এই নারী বহু অপেক্ষা প্রতিক্ষায় থেকেছে কখন মাহাদি মহলে ফিরবে। ক্লান্ত-শ্রান্ত শরীরেও সুনেহেরার করা বায়না সে মেটাতো। চলমান প্রশিক্ষণ ছেড়ে টেনে নিয়ে যেত এদিক ওদিক ঘুরতে। সেই দিনগুলো এখন স্মৃতি।
আর নিজেকে আটকে রাখতে পারল না। ছুটে গেল কৃষ্ণচূড়া গাছটির দিকে। মাহাদি বাঁশি বাজানো থামিয়ে চোখ খুলল। সুনেহেরাকে সামনে দেখে তার মুখে হাসি ফুটে উঠল।
“এসেছেন শাহজাদি?”
সুনেহেরা তার সামনে এসে দাঁড়াল। নিঃশ্বাস কিছুটা দ্রুত চলছে।
“আপনি এভাবে লুকোচুরি খেলেছেন আমার সাথে?”
“আমার ভালোবাসার প্রতি আস্থা ছিল। এই সুর শুনে আপনি কোনো দিন উত্তরের প্রাসাদে আসা বন্ধ করেননি মহারানী। আপনি বেশ জানতেন ওটা আমি”
সুনেহেরা চোখ নামিয়ে ফেলল। মাহাদি বাঁশিটি নামিয়ে হাতে ধরে রাখল।
“আমাদের বয়স বেড়েছে। আমাদের জীবনে অনেক ক্ষতি হয়েছে। আমরা দুজনেই বহু কিছু হারিয়েছি, যা কোনো দিন ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। কিন্তু তাই বলে কি আমাদের জীবনে আর কোনো আনন্দ থাকতে পারে না?”
সুনেহেরা তার দিকে তাকাল
“আমি কখনো ভাবিনি, আবার আপনার সামনে দাড়িয়ে এভাবে কথা বলতে পারব। ভেবেছিলাম গেলেন বুঝি আজন্মকালের জন্য হারিয়ে”
মাহাদি মৃদু হেসে বলল,
“আমিও ভাবিনি। মাঝেমধ্যে মনে হতো, আপনি হয়তো এবার আমাকে ঘৃণা করতে শুরু করেছেন। হয়তো আমার মুখও দেখতে চাইবেন না আর”
সুনেহেরা কষ্টের হাসি হাসল
“ঘৃণা করা অসম্ভব। হ্যা তবে, আপনার প্রতি আমার যে অভিমান ছিল, তা কখনো কখনো নিজের ওপরই রাগ হয়ে ফিরে আসত। মনে হতো, কেন এত বছর অপেক্ষা করলাম? কেন নিজেকে বোঝাতে পারলাম না যে আমাদের গল্পটা শেষ হয়ে গেছে?”
মাহাদির মুখ গম্ভীর হয়ে উঠল।
“কই আমি তো আপনাকে অপেক্ষা করতে বলিনি, শাহজাদী”
“অথচ বেশ জানতেন আমি আজন্ম অপেক্ষা করব। আচ্ছা, আপনি কি কখনো আমাকে ভুলে গিয়েছিলেন?”
প্রশ্নটা করার পর সুনেহেরা নিজেই যেন একটু থমকে গেল। এত বছর পরও প্রশ্নটি তার মনে রয়ে গেছে, তা সল বুঝতে পারেনি। মাহাদি উত্তর দিতে তাড়াহুড়ো করল না। বাঁশিটা পাশে রাখা পাথরের বেঞ্চের ওপর রাখল। তারপর সুনেহেরার দিকে ফিরে বলল
“মানুষ অনেক কিছু ভুলে যাওয়ার চেষ্টা করে। কিন্তু কিছু স্মৃতি ভুলে যাওয়ার জন্য নয়। সেগুলো নিজের সঙ্গে নিয়েই বেঁচে থাকতে হয়।”
সুনেহেরার চোখের কোণে অশ্রু জমল। মাহাদি আবার বলল
“প্রাসাদের সেই বারান্দা, তোমার ছুটে আসা, তোমার রাগ করে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া সব মনে আছে। মনে আছে, একদিন তুমি বলেছিলে, আমি যদি কোনো দিন তোমাকে ছেড়ে চলে যাই, তুমি……..”
সুনেহেরা হালকা হেসে ফেললেন।
“থামলেন কেন? ভালোই তো লাগছে আপনার মুখে তুমি শুনতে”
দুজনের মাঝখানে নীরবতা নেমে এল। দূরে পাখিরা গাছের ডালে ফিরছে। সন্ধ্যার আগের আলোয় বাগানটা সোনালি হয়ে উঠছে। সুনেহেরা নিচু স্বরে বলল,
“পাথর মানব, এবার আর হারিয়ে যাবেন না তো?”
মাহাদি তার দিকে তাকাল। চোখে গভীর আন্তরিকতা।
“আমি তোমাকে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দেব না। জীবন আমাদের হাতে নেই। কিন্তু যত দিন বেঁচে থাকব, তোমার কাছ থেকে পালিয়ে যাব না। কোনো সিদ্ধান্ত নিলে তোমাকে জানাব। কোনো বিপদ এলে তোমার সঙ্গে কথা বলব। আর কোনো ভুল বোঝাবুঝিকে এত বড় হতে দেব না যে আমাদের আবার বছরের পর বছর আলাদা থাকতে হয়।”
সুনেহেরা ধীরে তার হাত ধরল
“আমি আর কোনো রাজ্য, কোনো ক্ষমতা, কোনো প্রতিশোধ চাই না। আমি শুধু চাই, আমাদের বাকি জীবনটুকু যেন অকারণ অভিমানে নষ্ট না হয়।”
মাহাদি তার হাতের ওপর নিজের হাত রাখল
“তাহলে এবার আমাদের দুজনকেই পুরোনো ভুল থেকে শিখতে হবে”
সুনেহেরা মাথা নাড়ল। মাহাদি আবার বাঁশিটি হাতে তুলে নিল
“একটা সুর শোনাবো?”
সুনেহেরা হাসল। মাহাদি বাঁশিতে ঠোঁট রাখল। সুর ভেসে উঠল বাগানে। সুনেহেরা চোখ বন্ধ করল।
এই সুরে আছে নতুন করে সবটা শুরু করার সাহস, ক্ষমা করার শক্তি এবং বহু বছরের অপেক্ষার পর ফিরে পাওয়া একটুখানি শান্তি।
****
সন্ধ্যা নামার আগমুহূর্তে জান্নাত নিজের কক্ষ থেকে বেরিয়ে এল। সুনেহেরা ও মাহাদির বিয়ের সিদ্ধান্তের খবর জানার পর তার মন ভালো হয়ে আছে। ফুপুর মুখে বহু বছর পর এমন প্রশান্তি দেখে তার নিজেরও আনন্দ হচ্ছে। কক্ষে কিছু ফুল রাখার ইচ্ছে হলো তার। তাই দাসীদের কাউকে সঙ্গে না নিয়ে নিজেই বাগানে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। মহলের পেছনের ফুলের বাগানটি তুলনামূলক নির্জন। সেখানে কয়েকটি পুরোনো গাছ, মাঝখানে সরু পথ এবং এক পাশে গোলাপের সারি। সন্ধ্যার আগে ফুলগুলো তুললে সেগুলো রাত পর্যন্ত সতেজ থাকবে। জান্নাত ধীরে ধীরে গোলাপের ঝোপের দিকে এগিয়ে গেল। একটি সাদা গোলাপের দিকে হাত বাড়াতেই পেছন থেকে পায়ের শব্দ শোনা গেল।
সে ঘুরে দাঁড়ানোর আগেই একজন লম্বা, চওড়া কাঁধের পুরুষ দ্রুত এগিয়ে এসে তার হাত ধরে ফেলল। জান্নাত চমকে উঠল।
“অ্যাই অ্যাই। কে আপনি? হাত ছাড়ুন!”
লোকটি তার হাত ছাড়ল না। বরং জান্নাতকে একপাশে সরিয়ে নিয়ে নিচু স্বরে হিসহিসিয়ে বলল,
“চুপ করুন শাহজাদি। চিৎকার করবেন না।”
অপরিচিতের এমন আচরণে জান্নাতের চোখ কঠিন হয়ে উঠল।
“আপনি জানেন, সাহাবাদ হলের বাগানে দাঁড়িয়ে আপনি কার হাত ধরেছেন?”
লোকটি উত্তর দিল না। জান্নাত হাত ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল। লোকটি তার কবজি ধরে রেখেছিল বলে সে নিজের ভারসাম্য হারিয়ে এক পা পিছিয়ে গেল। সঙ্গে সঙ্গে অন্য হাত দিয়ে লোকটির বাহু ঠেলে দিল। লোকটি তাকে আঘাত করার চেষ্টা করেনি অবশ্য। জান্নাত আবার হাত ছাড়াতে গিয়ে দুজনের মধ্যে ধস্তাধস্তি শুরু হয়ে গেল।
গোলাপের কয়েকটি ডালের কাঁটায় চিরে গেল জান্নাতের হাত। মাটিতে ঝরে পড়ল কয়েকটি ফুল। জান্নাত নিজের হাত মুক্ত করে লোকটির বুকের সামনে হাত রেখে তাকে দূরে সরিয়ে দিল।
“আর একবার আমার গায়ে হাত দিলে প্রহরীদের ডাকব!”
লোকটি এবার হাত সরিয়ে নিল। তার চোখে বিরক্তির বদলে যেন বিস্ময়। লোকটি তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। সন্ধ্যার আলোয় তার মুখের বেশির ভাগ অংশ স্পষ্ট হলেও প্রথম মুহূর্তে জান্নাত তাকে চিনতে পারেনি। লোকটির চেহারা বলিষ্ঠ, কাঁধ প্রশস্ত, মুখে বয়সের ছাপ। তবে তার চোখ… জান্নাতের বুকের মধ্যে কেঁপে উঠল। এই চোখ সে আগে দেখেছে। কোথায়? তার স্মৃতির ভেতর ভেসে উঠল এক পুরোনো দিনের ছবি জঙ্গলঘেরা পথ, ঘন গাছের ছায়া, দূরে পাহাড়ের ঢাল। সে তখন বিপদের মধ্যে ছিল। পথ চিনতে পারছিল না। একজন অপরিচিত পুরুষ তাকে জঙ্গল পেরিয়ে নিরাপদ পথে পৌঁছে দিয়েছিল।
সেই মানুষটির মুখ পুরোপুরি মনে না থাকলেও চোখ দুটি তার মনে গেঁথে ছিল। জান্নাত এবার স্থির দৃষ্টিতে লোকটির দিকে তাকাল।
“আপনি…”
লোকটি নীরব রইল। জান্নাত এক পা এগিয়ে এল।
“আপনি সেই মানুষ, যিনি একবার আমাকে জঙ্গল পার করে দিয়েছিলেন। তাই না?”
লোকটির মুখে ক্ষীণ হাসি ফুটে উঠল।
“যাক, অবশেষে চিনতে পেরেছেন।”
জান্নাতের চোখে বিস্ময় ছড়িয়ে পড়ল। কিন্তু পরমুহূর্তেই তার মুখ কঠিন হয়ে গেল।
“আপনি আমাকে চিনতেন, অথচ এভাবে এসে আমার হাত ধরলেন কেন? কি অসভ্যতামো এসব?”
লোকটি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
“আপনার সঙ্গে কথা বলার প্রয়োজন ছিল। আজ আপনাকে একা পেয়ে…”
“তাই বলে আমাকে এভাবে ভয় দেখাবেন? আপনি কথা বলতে চাইলে দূর থেকে ডাকতে পারতেন। প্রহরীর মাধ্যমে খবর পাঠাতে পারতেন।”
লোকটি মাথা নিচু করল।
“হ্যা হ্যা। আমার এভাবে আসা উচিত হয়নি।”
জান্নাত নিজের কবজির দিকে একবার তাকিয়ে আবার তার মুখের দিকে ফিরল।
“আপনার পরিচয় কী? কেন আমার সঙ্গে দেখা করতে চান?”
লোকটির মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। সে এবার নিজের পরিচয় দেওয়ার আগে চারপাশে তাকাল। তারপর নিচু কণ্ঠে বলল,
“আমি রুবায়েত ফারনাজের সন্তান। আমার নাম তাহান শায়ের”
জান্নাতের মুখের অভিব্যক্তি বদলে গেল।
“রুবায়েত?”
“হ্যাঁ। আমি নাসিরাবাদের শাহজাদা।”
কয়েক মুহূর্ত জান্নাত কোনো কথা বলতে পারল না। নাসিরাবাদ? ওই রাজ্যকে নতুন করে গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখছে শাখা। রাজ্যের পরিত্যক্ত প্রাসাদ, ভাঙা নগর আর হারিয়ে যাওয়া ইতিহাস ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনা চলছে। সেই নাসিরাবাদের শাহজাদা আজ সাহাবাদের রাজমহলের বাগানে দাঁড়িয়ে! জান্নাত ধীরে বলল,
“আপনি যদি নাসিরাবাদের শাহজাদা হন, তাহলে এত দিন কোথায় ছিলেন? আর এখন কেন এসেছেন?”
লোকটি উত্তর দিতে যাচ্ছিল, কিন্তু জান্নাত হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিল।
“না, দাঁড়ান। আপনার পরিচয় সম্পর্কে আমাকে আগে নিশ্চিত হতে হবে। আমি আমার আম্মা সম্রাজ্ঞী মেহেরুন্নেসা নূর এর সঙ্গে কথা বলব। তারপর আপনার সঙ্গে আবার কথা হবে।”
লোকটি তার দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল।
“আপনার যা ভালো মনে হয়, করুন। আমি অপেক্ষা করব”
জান্নাত আর কিছু বলল না। সে দ্রুত বাগান থেকে বেরিয়ে মহলের ভেতরে চলে গেল। তার মনে এখন একের পর এক প্রশ্ন। রুবায়েত কে ছিলেন?
কেন তাঁর সন্তান এত দিন আড়ালে ছিলেন? আর নাসিরাবাদের রাজপরিবারের সঙ্গে সাহাবাদের অতীতের সম্পর্কই বা কী? সে যতদূর জানে চন্দ্রপ্রভা মানে শাখারমা নাসিরাবাদের শাহজাদি ছিল। এই রুবায়েত আবার কে?
জান্নাত দ্রুত মেহেরুন্নেসার কক্ষে প্রবেশ করল। মেহেরুন্নেসা কয়েকজন পরিচারিকার সঙ্গে পরদিনের আয়োজন নিয়ে কথা বলছিলেন।
মেয়েকে অস্থির অবস্থায় দেখে তিনি সঙ্গে সঙ্গে অন্যদের বিদায় দিলেন।
“কী হয়েছে, জান্নাত? তুই এত অস্থির কেন?”
জান্নাত তাঁর সামনে এসে দাঁড়াল।
“আম্মা, আমি আজ বাগানে একজন মানুষের সঙ্গে দেখা করেছি। তিনি নিজেকে নাসিরাবাদের শাহজাদা বলে পরিচয় দিয়েছেন।”
মেহেরুন্নিসার মুখের ভঙ্গি বদলে গেল
“নাসিরাবাদের শাহজাদা?”
“হ্যাঁ। তিনি বলেছেন, তিনি রুবায়েতের সন্তান।”
নামটি উচ্চারিত হতেই মেহেরুন্নেসা নীরব হয়ে গেলেন। জান্নাত মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে বুঝল, এই নাম তাঁর কাছে অপরিচিত নয়।
“আম্মা, রুবায়েত কে ছিলেন? তুমি তাকে চেনো?”
মেহেরুন্নেসা আসন ছেড়ে উঠে জানালার কাছে গেলেন। কিছুক্ষণ বাইরে তাকিয়ে থেকে ফিরে এলেন মেয়ের সামনে।
“রুবায়েত ফারনাজ ছিলেন নাসিরাবাদের জ্যেষ্ঠ শাহজাদি। তাঁর জন্ম ও বেড়ে ওঠা নাসিরাবাদের রাজপরিবারে। তিনি ছিলেন বুদ্ধিমতী, সাহসী একজন নারী। তাঁর সঙ্গে তোমার বাবা বাইজিদ শাহের বিয়ের কথা হয়েছিল”
জান্নাত বিস্ময়ে তাকাল।
“বাবার সঙ্গে?”
“হ্যাঁ। তখন দুই রাজপরিবারের মধ্যে সম্পর্ক দৃঢ় করার জন্য এই বিয়ের প্রস্তাব এসেছিল। দুই পক্ষের আলোচনাও অনেক দূর এগিয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই বিয়ে হয়নি।”
জান্নাত ধীরে ধীরে বসে পড়ল।
“কেন হয়নি, আম্মা?”
“সে অনেক কথা। তোর কাকা অরণ্য শাহ্ মহলে অসুস্থ হওয়ায় তোর বাবা বিয়ে না করে ফিরে আসে। এর কিছু বছর পরে রুবায়েত সিমরানকে হত্যা করেছিল”
জান্নাতের চোখ বিস্ফারিত হয়ে গেল।
“ফুপু-আম্মাকে রুবায়েত হত্যা করেছিলেন?”
“হ্যাঁ।”
মেহেরুন্নিসার কণ্ঠ ভারী হয়ে এল।
“সেই ঘটনার পর সুনেহেরা আপা রুবায়েতের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। সিমরানের মৃত্যুর প্রতিশোধ নিতে শেষ পর্যন্ত সুনেহেরা আপাই রুবায়েতকে হত্যা করেন।”
জান্নাতের মনে হলো, তার চারপাশের সবকিছু যেন হঠাৎ অচেনা হয়ে গেছে। সুনেহেরার এমন এক র’ক্তাক্ত অতীত জড়িয়ে আছে! জান্নাত ধীরে জিজ্ঞেস করল,
“তাহলে রুবায়েতের সন্তান বেঁচে আছেন?”
মেহেরুন্নেসা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
“হতে পারে। তবে আমরা যতদূর জানি রুবায়েত অবিবাহিত ছিল। জানি না, ওর পুত্র এত দিন কোথায় ছিলেন, কীভাবে বড় হয়েছেন, কিংবা এখন কেন সাহাবাদে এসেছেন।”
জান্নাত কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর বলল,
“মা, তিনি আমাকে আগে একবার জঙ্গল পার করে দিয়েছিলেন। তখন আমি তাঁর পরিচয় জানতাম না। আজ বাগানে এসে তিনি আমার হাত ধরে কথা বলতে চেয়েছেন। আমি তাঁকে চিনতে পেরেছি, কিন্তু তাঁর উদ্দেশ্য বুঝতে পারিনি।”
মেহেরুন্নেসার মুখ কঠিন হয়ে উঠল।
“তুই একা থাকলে এমন পরিস্থিতিতে আর যাবি না। সে শাহজাদা হলেও তার পরিচয় যাচাই না করে তাঁলকে বিশ্বাস করা ঠিক হবে না। আর শাহজাদা হয়ে থাকলে তো আরও বিপদ। ওর শ ভালো নাকি? গোটা বংশই জানোয়ারের”
জান্নাত মাথা নাড়ল। তার মনে হঠাৎ শাখার কথা এল। শাখা তো নাসিরাবাদ পুনর্গঠনের জন্য কাজ শুরু করেছে। যদি সত্যিই নাসিরাবাদের রাজপরিবারের কোনো উত্তরাধিকারী ফিরে এসে থাকে, তাহলে শাখার পরিকল্পনায় তার প্রভাব পড়তে পারে। সে মায়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
“আম্মা, শাখা যদি নাসিরাবাদের সম্রাজ্ঞী হতে চায়, তাহলে এই মানুষটির উপস্থিতি কি তার জন্য কোনো সমস্যা তৈরি করবে?”
মেহেরুন্নেসা কিছুক্ষণ ভেবে বললেন,
“সমস্যা তৈরি করতে পারে, আবার সমাধানের পথও আছে। সবকিছু নির্ভর করছে তিনি আসলে কে, কী চান এবং নাসিরাবাদের মানুষের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর পরিকল্পনা কী? তার ওপর”
জান্নাত উঠে দাঁড়াল।
“তাহলে বিষয়টা শাখাকে জানানো দরকার”
“অবশ্যই। তবে তার আগে তোর বাবার সঙ্গে কথা বলব। রুবায়েতের নাম বহু পুরোনো একটি অধ্যায়ের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। সেই অধ্যায় খুললে শুধু নাসিরাবাদ নয়, সাহাবাদের রাজপরিবারেও তার প্রভাব পড়বে। জান্নাত মায়ের হাত ধরে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। তারপর কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেল। কক্ষ থেকে বেরিয়ে জান্নাত দীর্ঘ করিডর ধরে হাঁটতে লাগল। জানালার বাইরে সন্ধ্যা পুরোপুরি নেমে এসেছে। প্রাসাদের উঠানে মশাল জ্বলছে, প্রহরীরা নিজেদের অবস্থান বদলাচ্ছে।
জান্নাত মনে মনে সিদ্ধান্ত নিল, পরদিনই শাখার সঙ্গে দেখা করবে। নাসিরাবাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে এত বড় উদ্যোগের সময় এই খবর গোপন রাখা যাবে না।