সন্ধ্যার পর আমিরাবাদ রাজপ্রাসাদের পরিবেশ ধীরে ধীরে নিস্তব্ধ হয়ে এসেছে। রাজকোষের হিসাব নিয়ে মেহরাব তখনও নিজের কক্ষে ব্যস্ত। টেবিলের ওপর ছড়িয়ে থাকা নথিপত্রের একটির পর একটি পাতা উল্টাচ্ছিল সে। হারুণ ওয়াসেমের মৃত্যুর পর রাজ্যের প্রতিটি সিদ্ধান্ত এখন তার কাছে আগের চেয়ে অনেক বেশি কঠিন মনে হচ্ছে। সাহারা পালঙ্কে বসে আছে। মুখটা ভাড়। মেহরাবের ভীষণ ইচ্ছে করছে তাকে কাছে টেনে বসিয়ে আদর করে বোঝাতে। লক্ষীটি জিদ করে না। একটু বোঝার চেষ্টা করো। সারাও বোধহয় তাই চায়। কিন্তু তাদের মধ্যে কয়েকদিনের যা দূরত্বের দেওয়াল সৃষ্টি হয়েছে। তা ভেদ করে মেহরাব যেতে পারছে না। দরজায় কড়া নাড়ার শব্দ হলো
“ভেতরে আসো”
দরজা খুলে একজন প্রহরী প্রবেশ করল। তার পোশাকে ধুলো,
“যুবরাজ, কারাগার থেকে জরুরি সংবাদ আছে”
মেহরাব নথি থেকে মুখ তুলল।
“কী হয়েছে?”
“যে নারীকে কয়েক দিন আগে আটক করা হয়েছিল, সে কারাগারে ভয়াবহ অশান্তি সৃষ্টি করেছে। একাধিক রক্ষীকে আহত করেছে। তাকে অন্য কক্ষে স্থানান্তর করতে গেলে সে বাধা দিয়েছে। কয়েকজন প্রহরীকে সামলাতে গিয়ে আরও লোক ডাকতে হয়েছে। ভীষণ ভয়ংকর ওই মহিলা”
মেহরাবের চোখ সরু হয়ে এল।
“তারাময়ী?”
“জি, যুবরাজ”
মেহরাব চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। তারাময়ীকে ইয়ামিন আটক করেছিল। সেই নারীকে ঘিরে রহস্যের শেষ নেই। জঙ্গলে আলীরাজের অদ্ভুত অভিজ্ঞতা, পুকুরের ধারে তার উপস্থিতি, রাজপ্রাসাদের পেছনের মিনারে নৃত্যশিল্পীর ছদ্মবেশে আসা এবং ইয়ামিনের কথায় তার সঙ্গে পাহাড়ের এক রহস্যময় গোষ্ঠীর সম্পর্ক সবকিছুই এখনো তদন্তাধীন। হারুণ ওয়াসেমের মৃত্যুতে তার বিষয়টা চাপা পড়ে গেছে। মেহরাব বলল,
“রক্ষীদের অবস্থা কেমন?”
“আহতদের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে, যুবরাজ। কারও অবস্থা গুরুতর বলে এখনো জানানো হয়নি। তবে ওই নারীকে সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছে”
মেহরাব কিছুক্ষণ চিন্তা করল। তারপর বলল,
“প্রহরী যত লাগে লাগাও, আগে তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করো। আর কেউ যেন প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য তার ওপর হাত না তোলে। আর তাকে পাহারা দেওয়ার জন্য অভিজ্ঞ রক্ষী নিয়োগ করো। আগামীকাল সকালে তার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। আজকের রাতটা একটু কষ্ট করে দেখে রাখো”
প্রহরী মাথা নত করে চলে গেল। মেহরাব আবার নথির দিকে তাকালেও মনোযোগ ফিরল না। বন্দি একজন নারী কীভাবে একাধিক রক্ষীকে আহত করার মতো পরিস্থিতি তৈরি করল, তার চেয়েও বড় প্রশ্ন সে আসলে কী চায়? মেহরাব সাহারার দিকে তাকাল।
“শুনলে? তারাময়ী একাধিক রক্ষীকে আহত করেছে”
সাহারা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল,
“ওকে আর সাধারণ বন্দির মতো জিজ্ঞাসাবাদ করলে চলবে না। ও কেন এমন করছে, কার নির্দেশে কাজ করছে, আর মামা-বাবুর সঙ্গে তার সম্পর্ক কী এসব জানা প্রয়োজন আগে”
মেহরাব মাথা নাড়ল।
“আমি রক্ষীদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে বলেছি।”
সাহারা বলল,
“আগামীকাল সকালে তাকে রাজপ্রাসাদের উদ্যানে হাজির করা হোক। সেখানে আমি, আপনি, বড় ভাইজান, মামা-বাবু, আম্মা সকলে উপস্থিত থাকব। তার পরিচয় ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে প্রশ্ন করা হবে।”
মেহরাব সম্মতি জানাল।
“ঠিক আছে। তবে পর্যাপ্ত প্রহরা থাকবে। বহিরাগত রা যেন না আসে। কোনো অপ্রয়োজনীয় উত্তেজনা চাই না। মস্তিষ্ক ভীষণ পীড়ায় আছে এমনিতেই”
সাহারা দরজার দিকে এগিয়ে গেল। বেরিয়ে যাওয়ার আগে বলল,
“তারাময়ীকে নিয়ে যত রহস্যই থাকুক, আমরা যেন রাগের বশে কোনো সিদ্ধান্ত না নিই। সত্য জানার আগে তাকে শাস্তি দেওয়া হবে না। একজন মানুষকে হ’ত্যা করাই সমাধান নয়। এর শিকড় কতদূর ওবদি বিস্তৃত তা দেখার আছে আমার”
মেহরাব তার দিকে তাকিয়ে রইল। সাহারার এই দৃঢ়তা তার পরিচিত। তাদের মধ্যে মতবিরোধ যতই থাকুক, অন্যায়ের বিচার করার ক্ষেত্রে সাহারা নিজের অবস্থান থেকে সহজে সরে না।
সেই রাতেই বন্দিশালার নিরাপত্তা আরও জোরদার করা হলো। কিন্তু কারাগারের অন্ধকার কক্ষে বসে তারাময়ী কী ভাবছিল, তা কেউ জানত না। এ নারীর বড়সড় পরিচয় আছে। যেকোনো শাহজাদী যুবরাজ যুদ্ধবিদ্যায় তার কাছে কিছুই না। এ কোনো সাধারণ ঘরের সনৃতান হতেই পারে না।
****
পরদিন সকাল। সূর্যের আলো রাজপ্রাসাদের পূর্বদিকের উদ্যানে ছড়িয়ে পড়েছে। ফুলের বাগানের মাঝখানে একটি প্রশস্ত পাথরের চত্বর। চারপাশে শ্বেতপাথরের স্তম্ভ, তার পাশে সারি সারি গাছ। চত্বরের একদিকে রাজপরিবারের সদস্যদের বসার জন্য কয়েকটি আসন রাখা হয়েছে।
সাহারার নির্দেশে সেখানে যথেষ্ট প্রহরী মোতায়েন করা হয়েছে। কারাগার থেকে তারাময়ীকে আনা হবে বলে খবর ছড়িয়ে পড়তেই রাজপ্রাসাদের কর্মচারী, কয়েকজন মন্ত্রী এবং কৌতূহলী রাজকর্মচারী দূরে দাঁড়িয়ে জড়ো হলো। মেহরাব একটি আসনে বসে আছে। তার পাশে সাহারা। কিছুটা দূরে ইয়ামিন দাঁড়িয়ে, আর আলীরাজ অন্য একটি স্তম্ভের পাশে হাত ভাঁজ করে অপেক্ষা করছে। হারুণ ওয়াসেমের আসনটির পাশে বসেছে আয়েশা বেগম। তবে মহিলাটার ভিতর শোকের ছায়া নেই বললেই চলে। জাহিদা দাঁড়িয়ে ইয়ামিনের পিছনে। একটু পরপর ঝুঁকে কি যেন বলছে।
আলীরাজের মুখে ভীষণ গম্ভীর। তারাময়ীর সঙ্গে আগের ঘটনাগুলো সে ভুলতে পারেনি। জঙ্গলের সেই রহস্যময় সাক্ষাৎ, পানির ধারে তার অস্বাভাবিক আচরণ, পরে মিনারে নৃত্যরত অবস্থায় দেখা। সবকিছুই তাকে অস্বস্তিতে রেখেছে। ইয়ামিন তার দিকে তাকিয়ে বলল,
“কী হলো, আলীরাজ? আজ তোমাকে বেশ চুপচাপ দেখাচ্ছে”
আলীরাজ গম্ভীর মুখে উত্তর দিল,
“যে নারীর কারণে আমি পুকুরের পানিতে ডুবে যাওয়ার মতো পরিস্থিতিতে পড়েছিলাম, তার মুখটা অন্তত একবার দেখতে চাই। এত দিন ঘোমটার আড়ালে থেকে আমাদের সবাইকে ঘুরিয়েছে। আজ দেখব তাকে”
ইয়ামিনের ঠোঁটে ক্ষীণ হাসি ফুটল।
“মুখ দেখেই বা কি হবে এখন। না দেখেই প্রেমে পড়েছিলে। হা হা”
“তবু মুখটা দেখা দরকার”
কথা শেষ হতেই উদ্যানে প্রবেশপথের দিকে কয়েকজন প্রহরীকে দেখা গেল। তাদের মাঝখানে হেঁটে আসছে এক নারী। মাথা থেকে মুখ পর্যন্ত গাঢ় ঘোমটায় ঢাকা। হাত বাঁধা নয়, তবে দুই পাশে প্রহরীরা সতর্কভাবে তাকে ঘিরে রেখেছে। তারাময়ী ধীর পায়ে চত্বরের মাঝখানে এসে থামল। সাহারা উঠে দাঁড়াল।
“তোমার নাম তারাময়ী, তাই তো?”
নারীটি মাথা সামান্য নত করল। সাহারা প্রশ্ন করল,
“তুমি কারাগারে রক্ষীদের আহত করেছ কেন?”
তারাময়ী উত্তর দিল না। মেহরাব এবার কঠোর কণ্ঠে বলল,
“তোমাকে প্রশ্ন করা হচ্ছে। উত্তর দাও”
তারাময়ী মুখ তুলে তাকাল। ঘোমটার আড়াল থেকে তার কণ্ঠ ভেসে এল।
“আমাকে বন্দি করে রেখেছে যারা, তাদের সব প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার কোনো বাধ্যবাধকতা আমার নেই। বিনিময়ে আমাকে যে কোনো শাস্তি দিতে পারেন। আমি প্রস্তুত”
আলীরাজ বিরক্ত হয়ে সামনে এগিয়ে এল।
“বেশ! তাহলে আগে মুখটা দেখাও। এত দিন ধরে ঘোমটার আড়ালে থেকে কী লুকাচ্ছ? সেটাই আগে দেখি বরং”
তারাময়ী তার দিকে মুখ ফেরাল।
“আপনি আমার মুখ দেখতে চাইতে পারেন না। এটা তো শাস্তির মধ্যে পড়ে না”
সাহারা হাত তুলে তাকে থামাল। তারপর তারাময়ীর দিকে তাকিয়ে বলল,
“আগে তোমার পরিচয় যাচাই করা হবে। তুমি এখানে কী উদ্দেশ্যে এসেছিলে, কার নির্দেশে কাজ করছিলে, আর মামাবাবুকেই কেন নিশানা করলে? সঙ্গে তোমার আগের পরিচয় কী? এসব জানতে হবে। ঘোমটা সরাও।”
তারাময়ী স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
“আমি ঘোমটা সরাব না।”
সাহারার কণ্ঠ কঠোর হলো।
“তুমি বন্দি। তদন্তের প্রয়োজনে তোমার পরিচয় যাচাই করা হবে। আবার বলছি, ঘোমটা সরাও।”
তারাময়ী এবার এক পা পিছিয়ে গেল। প্রহরীরা সতর্ক হয়ে উঠল। সাহারা পাশে দাঁড়ানো দুই দাসীকে ইশারা করল। দাসীরা এগিয়ে এলে তারাময়ী মুখ ফিরিয়ে ঘোমটা ধরে রাখার চেষ্টা করল। তাদের হাত সরিয়ে দিতে চাইল, কিন্তু প্রহরীরা তাকে স্থির থাকতে বলল। অল্পক্ষণের টানাটানির পর দাসীরা তার মুখের ওপর থেকে ঘোমটা সরিয়ে দিল। ঠিক সেই মুহূর্তে পুরো চত্বর নীরব হয়ে গেল। তার মুখ দেখে উপস্থিত অনেকেই বিস্ময়ে তাকিয়ে রইল।
তারাময়ী অসাধারণ সুন্দরী। দীর্ঘ কালো চুল, সুগঠিত মুখাবয়ব, গভীর চোখ, স্থির দৃষ্টি। অসম্ভব সুন্দরী সে। তার সৌন্দর্যে কোমলতা যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে এক দুর্বোধ্য কঠোরতা।
মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে রইল। ঘোমটা সরিয়ে দেওয়ায় তার চোখে অপমানের ছায়া থাকলেও মুখে ভয়ের চিহ্ন নেই। আলীরাজ যেন মুহূর্তের জন্য কথা বলার ক্ষমতা হারিয়ে ফেলল।
তার চোখ স্থির হয়ে রইল তারাময়ীর মুখে। নিজের অজান্তেই এক পা এগিয়ে গেল।
ইয়ামিনও বিস্ময়ে তাকিয়ে আছে। তারাময়ীকে আগেও দেখেছে সে, কিন্তু তার মুখ দেখেনি। তার চোখে কৌতূহল, নিজেকে সামলে রেখেছে।
আলীরাজের দিকে তাকিয়ে ইয়ামিন নিচু স্বরে বলল,
“আলীরাজ, কী হলো তোমার?”
আলীরাজ উত্তর দিল না। সাহারা বিষয়টি লক্ষ করলেও আপাতত কিছু বলল না। সে তারাময়ীর দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল,
“এবার বলো, তোমার প্রকৃত পরিচয় কী?”
তারাময়ী ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটিয়ে বলল,
“আমার মুখ দেখে কি মনে হচ্ছে, আমি কোনো ভয়ংকর অপরাধী?”
সাহারা জবাব দিল,
“সৌন্দর্য দিয়ে অপরাধের বিচার হয় না। তোমার কাজের বিচার হবে প্রমাণ দিয়ে।”
তারাময়ীর হাসি মিলিয়ে গেল। ঠিক তখনই আয়েশা বেগম মুখ খুললেন। কারাগারের অশান্তির কথা শুনে তিনি সকাল থেকেই বিরক্ত ছিলেন। তার ভাইয়ের ওপর আক্রমণ করেছিল এই নারী। আগে থেকেই সহ্য করতে পারে না তারাময়ীকে। তারাময়ীর মুখ দেখেই তিনি থমকে দাঁড়ালেন। তারপর ক্রুদ্ধ কণ্ঠে বললেন,
“ছি! ছি! এই মেয়েকে নিয়ে এত আয়োজনের কী আছে? এ আমার ভাইকে মারতে চেয়েছিল! রাজপ্রাসাদে ছদ্মবেশে ঢুকে আমাদের ক্ষতি করতে এসেছে। একে দ্রুত হ’ত্যা করার ব্যবস্থা করো!”
উদ্যানের ভেতর আবার গুঞ্জন উঠল। তারাময়ী আয়েশার দিকে তাকাল। তার মুখে ভয়ের বদলে অদ্ভুত এক নির্লিপ্ততা। আয়েশা আরও বললেন,
“এমন মানুষকে বাঁচিয়ে রাখলে আবার বিপদ ঘটাবে। আজ রক্ষীদের আহত করেছে, কাল হয়তো রাজপরিবারের কারও ক্ষতি করবে!”
সাহারা সামনে এগিয়ে এল।
“আমি আপনার উদ্বেগ বুঝতে পারছি আমৃমা। কিন্তু ওকে এখনই হত্যা করা হবে না, ওর থেকে আগে সবটা জানতে হবে”
আয়েশা বিস্মিত হয়ে তাকালেন।
“কেন? তেমার কাছে কি ও নিরপরাধ?”
“আমি তা বলিনি। আমি বলছি…..”
আয়েশা ক্ষুব্ধ স্বরে বললেন,
“এত আনুষ্ঠানিকতা বন্ধ করো তোমরা”
মেহরাব বলল।
“সাহারার কথাই ঠিক আম্মা। তারাময়ীকে নিরাপদ বন্দিত্বে রাখা হবে। জিজ্ঞাসাবাদ শেষ না হওয়া পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে চূড়ান্ত শাস্তির সিদ্ধান্ত হবে না।”
আয়েশা অসন্তুষ্ট মুখে চুপ করে গেলেন। সাহারা তারাময়ীর দিকে ফিরে বলল,
“তুমি শুনেছ। তোমাকে আপাতত বাঁচিয়ে রাখা হচ্ছে, কারণ তোমার কাছ থেকে সত্য জানতে চাই। কিন্তু আবার কোনো রক্ষীকে আহত করার চেষ্টা করলে, সেদিনই তোমার গর্দান নেবো আমি”
তারাময়ী শান্তভাবে উত্তর দিল,
“বুঝেছি”
“তাহলে প্রথম প্রশ্নের উত্তর দাও। তুমি আলীরাজকে আগে থেকে চিনতে?”
তারাময়ী ধীরে আলীরাজের দিকে তাকাল। আলীরাজের চোখ তখনও তার মুখের ওপর স্থির।
তারাময়ী মৃদু হাসল।
“আপনি কি সত্যিই আমায় চিনতে পারছেন না?” সারা বুঝল এ কিছু বলবে না এভাবে। প্রহরীদের নির্দেশ দিল,
“তারাময়ীকে আবার কারাগারে নিয়ে যাও। তবে আগের কক্ষে নয়। নিরাপদ কক্ষে রাখবে, চিকিৎসক দিয়ে তার শারীরিক অবস্থা পরীক্ষা করাবে এবং রক্ষীদের পালা করে পাহারা দিতে হবে। কোনো অবস্থাতেই িকে একা ছেড়ে দেওয়া যাবে না।”
প্রহরীরা তারাময়ীকে নিয়ে চলে গেল। আলীরাজ তখনও চুপ করে দাঁড়িয়ে। ইয়ামিন তার কাঁধে হাত রাখল।
“কী হয়েছে তোমার? এমনভাবে তাকিয়ে আছ কেন?”
আলীরাজ ধীরে মাথা নাড়ল। ইয়ামিন বলল,
“আবেগের বশে কোনো সিদ্ধান্ত নিয়ো না। আগে সত্যটা জানতে হবে।”
আলীরাজ এবার চোখ নামিয়ে ফেলল। কিন্তু তারাময়ীর শেষ প্রশ্নটি তার কানে বাজতে থাকল
“আপনি কি সত্যিই আমাকে চিনতে পারছেন না?”
****
সাহাবাদ মহলে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আজকের দিনটি। সকালের ব্যস্ততা পেরিয়ে রাজমহলের বাগানবাড়িটি সাজানো হয়েছে নতুন করে। প্রাসাদের মূল ভবন থেকে কিছুটা দূরে, ফুলে ঘেরা একটি শান্ত স্থানে এই ভবনটি তৈরি ও সংস্কার করা হয়েছিল। চারপাশে উঁচু গাছ, সামনের দিকে প্রশস্ত বারান্দা, পেছনে ছোট একটি বাগান। ভবনটির জানালা দিয়ে বিকেলের আলো ভেতরে এসে পড়ে, আর রাতের বেলায় চাঁদের আলোয় পুরো জায়গাটি রূপকথার মতো দেখায়।
সুনেহেরা ও মাহাদির জন্য এই ভবনটি ঠিক করা হয়েছে। বিয়ের পর তাঁরা এখানেই থাকবেন রাজপ্রাসাদের ব্যস্ততা থেকে কিছুটা দূরে, নিজেদের মতো করে। বাগানবাড়ির প্রবেশপথে সাদা ও লাল ফুল দিয়ে সাজানো তোরণ। বারান্দার স্তম্ভে ঝুলছে ফুলের মালা। ভেতরে আত্মীয়স্বজন ও ঘনিষ্ঠজনদের জন্য আসন রাখা হয়েছে। আয়োজনটি রাজপরিবারের মর্যাদা অনুযায়ী হলেও সেখানে অযথা আড়ম্বরের চেয়ে আন্তরিকতার ছাপ বেশি।
বাইজিদ শাহ নিজে বিয়ের আয়োজনের তদারকি করছিলেন। মেহেরুন্নেসাও পাশে ছিলেন। জান্নাত, শাখা ও সাহারা তিন বোনেরই উপস্থিত থাকার কথা, যদিও শাখা নাসিরাবাদের কাজে ব্যস্ত থাকায় সময়মতো পৌঁছাতে পারবে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা ছিল। কিন্তু সে ঠিকই এসে গেছে। ফাইয়াজকে সম্পূর্ণ জামাই এর মর্যাদাই দেওয়া হচ্ছে।
জান্নাত সকালে সুনেহেরার কাছে এসে তাঁকে সাজতে সাহায্য করল। সুনেহেরা আয়নার সামনে বসে ছিলেন। তাঁর মুখে লাজুক হাসি, চোখে অদ্ভুত এক প্রশান্তি। জান্নাত পেছন থেকে তাঁর চুল গুছিয়ে দিতে দিতে বলল,
“মণি মা। তোমাকে আজ একেবারে সারার মত লাগছে”
সুনেহেরা আয়নায় তার প্রতিবিম্বের দিকে তাকাল। যৌবন বয়সে সে সাহারার মতই ছিল। কিন্তু সাহারা এখনও আসেনি বলে মনটা খারাপ হয়ে গেল সুনেহেরার। অবশ্য তার দিকটাও বুঝতে হবে। আমিরাবাদ এর অবস্থা যে কি জঘন্য তা তো মোটামুটি সবারই জানা। জান্নাত তার কাঁধে হাত রাখল।
“ও মা তুমি মামা কে বলবে আমাকে একটা হরিণ ছানা এনে দিতে?”
সুনেহেরা হেসে ফেলল
“তুইও না! এত বড় হয়ে গেছিস, তবু সেই ছোটবেলার মতোই কথা বলিস।”
জান্নাত সুনেহেরার গালে গাল লাগিয়ে বলল
“আমি গোমার সেই ছোট্ট জান্নাতই আছি।”
সুনেহেরা তার হাত ধরে নিজের কাছে টেনে নিলেন।
“সেটাই থাকিস। পৃথিবী যতই বদলাক, আমাদের এই সম্পর্ক যেন না বদলায়।”
জান্নাত তাঁকে জড়িয়ে ধরল। কিছুক্ষণ পর বাইরে থেকে খবর এল, মাহাদি এসে পৌঁছেছেন।
সুনেহেরার মুখে লজ্জার আভা ছড়িয়ে পড়ল। জান্নাত সেটা দেখে হাসি চাপতে পারল না।
“মণি মা, এখন কিন্তু আর উত্তরের প্রাসাদে ছুটে যেতে হবে না। তোমার বাঁশিওয়ালা নিজেই তোমার কাছে চলে এসেছে”
সুনেহেরা তাকে ধমক দিল
“যা, দুষ্টুমি করিস না”
জান্নাত হাসতে হাসতে কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেল।
বাগানবাড়ির মূল কক্ষে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হলো। উপস্থিত স্বজনদের দোয়া ও শুভকামনার মধ্যে সুনেহেরা ও মাহাদি জীবনের নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করলেন। অনেকে অবশ্য কানাঘুঁষা করল, এই বয়সে বিয়ে করছে হ্যান ত্যান। অথচ সুনেহেরা গোটা যৌবনকাল কাটিয়েছে সাহাবাদ আর প্রজাদের রক্ষা করতে। আজ তাদেরই কিছুসংখ্যক আবার এ নিয়ে কটাক্ষ করছে। এতে অবশ্য বাইজিদেরও কিছু আসে যায় না। সুনেহেরার তো একদমই না।
বহু বছরের বিচ্ছেদের পর দুজন মানুষ অবশেষে একসঙ্গে পথ চলার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
বাগানবাড়িটি তাঁদের নতুন আশ্রয় হয়ে উঠবে। এমন এক জায়গা, যেখানে অতীতের স্মৃতি থাকবে, কিন্তু সেই স্মৃতির ভারে ভবিষ্যৎকে আর থেমে থাকতে হবে না। তারা সংসার করবে আবার। সাহাবাদের মহলে আনন্দের আলো জ্বলছে।
তাদের দেওয়া হলো বড় এক পেয়ালা ভর্তি দুধ। তাতে গোলাপের পাপড়ি ছড়ানো। সেখানে ফেলা হয়েছে একটি আংটি। জান্নাত আর শাখা দুই দলে আছে। জানৃনাত মাহাদির দলে, আর শাখা সুনেহেরার। আংটি হাতড়াতে গিয়ে সুনেহেরার হাতে কিছু একটা ফুটল। সামান্য মুখ কুচকালেও তাতে গুরুত্ব না দিয়ে আংটি খুঁজল। বিজয়ীও হলো সে। কিন্তু খানিকক্ষণ বাদেই হাত হাত নীলচে বর্ণ ধারণ করতে শুরু করল। চোখেও সাব ঝাপসা দেখছে।