ফন্ট সাইজ:
থিম:
রক্তমুকুট

61

লেখক: জান্নাতুল ফেরদৌস

সুনেহেরা আর মাহাদির দুধের মধ্যে আংটি খোঁজার খেলাটা ইতিমধ্যেই শেষ হয়েছে। রুপোর পাত্র দুটো ঘরের একপাশে রাখা ছোট টেবিলের ওপর। দুধের ছিটেফোঁটা লেগে আছে সুনেহেরার আঙুলে, আর মাহাদির ঠোঁটে মৃদু হাসি। চারপাশে বিয়ের আনন্দের রেশ। কয়েকজন দাসী হাসিমুখে পাত্রগুলো সরিয়ে নিচ্ছে। কেউ সুনেহেরাকে নিয়ে মজা করছে, কেউ মাহাদিকে খোঁচা দিয়ে বলছে, এত বয়সেও নাকি তিনি নিজের স্ত্রীকে খেলায় হারাতে পারেননি! মাহাদি মৃদু হেসে সুনেহেরার দিকে তাকাল।

"এত বছর পর তোমাকে কাছে পেয়েছি। এই খেলায় জেতার চেয়ে তোমার সঙ্গে এমন একটা মুহূর্ত কাটানো আমার কাছে অনেক বেশি মূল্যবান।"

সুনেহেরা তাঁর দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল। দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর পাওয়া এই মানুষটিকে এখনো যেন পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারছেন না। মনে হচ্ছে, চোখের সামনে দেখা দৃশ্যটুকু বুঝি কোনো স্বপ্ন। একটু পরেই ঘুম ভাঙবে, আবার ফিরে যেতে হবে সেই নিঃসঙ্গ দিনগুলোতে। মাহাদির হাতটা নিজের হাতের মধ্যে নিল

“মানুষ বদলায়, সময় বদলায়, অথচ আপনি একটুও বদলাননি।"

মাহাদি তাঁর হাতের ওপর নিজের অন্য হাতটা রাখল।

"মানুষ বদলায় প্রিয়তমা, প্রেমিক বদলায় না। তাছাড়াও বদলেছি তো। তোমাকে পেয়ে তোমাকে আগলে রেখে বাঁচতে শিখব না হয় এখন থেকে"

কথাটা শুনে সুনেহেরার চোখের কোণে জল চিকচিক করে উঠল। মুখ ফিরিয়ে নিল, যেন কেউ তার চোখের জল দেখে না ফেলে। বুকের ভেতর অস্বস্তিকর একটা মোচড় অনুভব করছে। লোকসমাগমে ব্যাপারটাকে গুরুত্ব দিল না সুনেহেরা। বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা, দীর্ঘ সময় ধরে মানুষের ভিড়ে থাকা, ক্লান্তি সব মিলিয়ে শরীর খারাপ লাগতেই পারে। কিন্তু সময় গড়ানোর সাথে সাথে অস্বস্তিটা বাড়তে লাগল। সুনেহেরা নিজের ডান হাতের আঙুলগুলো মুঠো করে আবার খুলল। আঙুলের ডগায় কেমন যেন ঝিনঝিন করছে। হাতের তালুতে অস্বাভাবিক জ্বালাপোড়া। ভ্রু কুঁচকে নিজের হাতের দিকে তাকাল।

"শুনছেন?..."

এমন করুন কন্ঠ শুনপ মাহাদির মুখের হাসি মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল।

"কী হয়েছে, শাহজাদী?"

"জানি না। হঠাৎ শরীরটা কেমন যেন লাগছে। হাতের মধ্যে জ্বালা করছে।"

মাহাদি তাঁর হাতটা নিজের হাতে তুলে নিল। আঙুলের ডগা পরীক্ষা করে দেখল। তারপর সুনেহেরার মুখের দিকে তাকিয়ে বলল

"তুমি কি খুব ক্লান্ত? একটু বসো। আমি হেকিমকে ডেকে আনছি।"

সুনেহেরা মাথা নাড়তে গেল। কিন্তু মাথা ঘোরার মতো অনুভূতি হওয়ায় পাশের চেয়ারটার হাতল শক্ত করে ধরে ফেলল। একজন দাসী দ্রুত এগিয়ে এসে তাকে ধরে ফেলল।

"শেহজাদী! আপনার কী হয়েছে?"

"কিছু না... একটু মাথা ঘুরছে।"

সুনেহেরা নিজের হাতের দিকে আবার তাকাল।

চোখ যেন বিস্ফারিত হয়ে গেল। আঙুলের গাঁটের কাছে ত্বকের রং বদলে যাচ্ছে। প্রথমে হালকা বেগুনি মনে হলেও কয়েক মুহূর্তের মধ্যে সেই রং কুচকুচে নীল হয়ে উঠল। নীলচে দাগগুলো ধীরে ধীরে হাতের পিঠের দিকে ছড়িয়ে পড়ছে।

সুনেহেরা আতঙ্কে নিজের হাতটা মাহাদির সামনে তুলে ধরল

"এটা কী হচ্ছে আমার হাতে?"

মাহাদি যেন কয়েক মুহূর্তের জন্য পাথর হয়ে গেলেন।

“শাহজাদি!"

স্ত্রীর হাতটা শক্ত করে ধরে পাশে বসাল।

"কেউ হেকিমকে ডাকো!"

তাঁর বজ্রকণ্ঠে পুরো ঘর কেপে উঠল। দাসীরা ছুটে বেরিয়ে গেল। এমতাবস্থায় দিক বেদিক না পেয়ে কাঁদতে শুরু করল, কেউ আবার ভয়ে সুনেহেরার কাছাকাছি আসার সাহস পাচ্ছে না। কিন্তু বিপদ যে আর অপেক্ষা করল না। সুনেহেরার কবজি পেরিয়ে নীলচে ছোপ তাঁর বাহুর দিকে উঠতে শুরু করেছে। তাঁর মুখের রংও ধীরে ধীরে ফ্যাকাশে হয়ে যাচ্ছে। মাহাদি তাঁকে নিজের বুকের কাছে ধরে রাখল।

"আমার দিকে তাকাও, সুনেহেরা। চোখ বন্ধ করবে না। শুনতে পাচ্ছ? আমি তোমার পাশেই আছি।"

সুনেহেরা কষ্ট করে তাঁর দিকে তাকাল। চোখে ভয় অবিশ্বাস আর অসহায়তা।

"আমার কী হচ্ছে, মাহাদি? আমি তো... আমি তো একটু আগেও ভালো ছিলাম!"

"কিছু হবে না তোমার। চিকিৎসক আসছেন। তুমি শুধু আমার সঙ্গে কথা বলো।"

"আমার খুব ভয় করছে..."

মাহাদির গলা কেঁপে উঠল।

"আমারও করছে। কিন্তু আমি তোমাকে কিছু হতে দেব না। বহুবছর পর তোমাকে পেয়েছি। আমি তোমাকে হারাতে পারব না"

সে সুনেহেরার কপালে হাত রাখল। তাঁর নিজের চোখেও জল জমে উঠেছে। এত বছর পর ফিরে পাওয়া মানুষটিকে আবার হারানোর আশঙ্কা তাকে ভেতর থেকে ছিন্নভিন্ন করে দিচ্ছে।

ঘরের বাইরে হৈচৈ ছড়িয়ে পড়েছে। বিয়ের আনন্দে মুখরিত মহলের করিডরে একের পর এক মানুষ জড়ো হচ্ছে। কেউ খবর পেয়ে ছুটে এসেছে, কেউ আবার কী হয়েছে না জেনেই কান্নায় ভেঙে পড়েছে। একজন দাসী দৌড়ে এসে দরজায় দাঁড়িয়ে কাঁপা গলায় বলল,

"সম্রাজ্ঞী মেহেরুন্নেসাকে খবর দেওয়া হয়েছে! রাজকুমারী জান্নাতকেও ডাকা হয়েছে!"

মাহাদি মাথা তুলে তাকালেন।

"খবর দেওয়া হয়েছে মানে? সবাইকে ডাকো! শাখাকে খবর পাঠাও! আর কেউ যেন ঘরের ভেতরে অকারণে ভিড় না করে!"

কিন্তু ততক্ষণে ভিড় সামলানো কঠিন হয়ে পড়েছে। আতঙ্কের মধ্যে নতুন বিপদ।

কিছুক্ষণের মধ্যেই মেহেরুন্নেসা দ্রুত পায়ে ঘরে প্রবেশ করলেন। তাঁর পেছনে জান্নাত। দুজনের মুখেই উৎকণ্ঠা। সুনেহেরাকে মাহাদির বাহুতে প্রায় ঢলে পড়া অবস্থায় দেখে জান্নাত ছুটে গেলেন।

"মণি মা!"

হাঁটু গেড়ে সুনেহেরার পাশে বসে তাঁর হাতটা ধরতে গেলে। কিন্তু নীলচে হয়ে যাওয়া ত্বক দেখে নিজের হাত মাঝপথে থামিয়ে ফেললেন।

"এ কী হয়েছে মণি মার?"

মাহাদি অসহায় চোখে তাকাল

"আমি জানি না। খেলা শেষ হওয়ার কিছুক্ষণ পর যখন তোমরা খাবার আনতে গেলে। তখন থেকেই ওর শরীর খারাপ লাগছিল। প্রথমে হাত জ্বালা করছিল, তারপর দেখলাম শরীরের রং বদলে যাচ্ছে।"

মেহেরুন্নেসা সুনেহেরার বাহুর দিকে তাকিয়ে শিউরে উঠলেন।

"আল্লাহ! এ তো ভীষণ দ্রুত ছড়িয়ে যাচ্ছে"

সুনেহেরা কষ্ট করে চোখ খুললেন।

"ভাবি... আমার শরীরটা..."

মেহেরুন্নেসা তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।

"কথা বলার দরকার নেই, আপা। চিকিৎসক আসছেন। তুমি শুধু ধৈর্য ধরো।"

জান্নাতের চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে।

"মণি মা , তুমি ঠিক হয়ে যাবে। একদম ঠিক হয়ে যাবে তুমি”

সুনেহেরা হাসার চেষ্টা করল। কিন্তু তাঁর ঠোঁট কাঁপল মাত্র

"তাই তো... কত কথা বাকি..."

মাহাদি তাঁর হাত নিজের দুই হাতের মধ্যে চেপে ধরলেন।

"সব কথা হবে। শুধু একটু ধৈর্য ধরো।"

হেকিম এসে পরীক্ষা করল

“সব্বোনাশ, এতো বিষক্রিয়া।”

অন্দরে কলরব পড়ে গেছে ততক্ষণে। বাইরে থেকে একসঙ্গে কয়েকটি কণ্ঠ ভেসে এল।

"দুধের পাত্রগুলো কোথায়?"

"কেউ পাত্র দুটো সরিয়েছে?"

"দুধ কে এনেছিল?"

প্রশ্নগুলো শুনে ঘরের ভেতরের সবাই থমকে গেল। একজন প্রহরী দ্রুত এসে জানাল,

"মহামান্য, দুধের পাত্র দুটি এখনো পাশের ঘরে রয়েছে। কেউ সেগুলো ফেলে দেয়নি।"

মেহেরুন্নেসা তীক্ষ্ণ চোখে তাকালেন।

"কেউ পাত্রে হাত দেবে না। চিকিৎসক ও রাজকীয় তদন্তকারী না দেখা পর্যন্ত সবকিছু যেভাবে আছে, সেভাবেই থাকবে।"

কিন্তু বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা লোকজনের মধ্যে ততক্ষণে সন্দেহ ছড়িয়ে পড়েছে। একজন বয়স্ক পরিচারক বলেই ফেলল,

"বিয়ের আনন্দের মধ্যে এমন ঘটনা! নিশ্চয়ই কেউ ইচ্ছা করে কিছু করেছে!"

আরেকজন তৎক্ষণাৎ বলল,

"এত বড় মহলে শত্রুর অভাব আছে নাকি? রাজপরিবারকে আঘাত করার সুযোগ কেউ হাতছাড়া করবে না!"

কথাগুলো এক কান থেকে আরেক কানে ছড়িয়ে পড়ল। কিছুক্ষণের মধ্যেই কয়েকজন প্রহরী, পরিচারক এবং সভাসদ একত্র হয়ে গেল। সবার মুখে আতঙ্ক, কিন্তু সেই আতঙ্কের মধ্যে ক্রমশ জায়গা করে নিচ্ছে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করার তাড়না। ঠিক তখনই এক পরিচারিকা হঠাৎ বলে উঠল,

"দুধ তো ফাইয়াজ নিয়ে এসেছিল!"

কথাটা শুনে আশপাশের সবাই তার দিকে ফিরে তাকাল।

"কী বললে তুমি?"

পরিচারিকাটি এবার আরও জোরে বলল,

"আমি নিজের চোখে দেখেছি। দুধের পাত্র নিয়ে ফাইয়াজই এসেছিল। তারপর পাত্রগুলো এখানে রাখা হয়।"

"ফাইয়াজ?"

"সেই প্রাক্তন ডাকাত? তাকে রাজপরিবারের এত কাছে আনার ফল তো এমনই হবে! একদিন ডাকাত ছিল, আর আজ রাজকীয় প্রহরী সেজেছে। মানুষের পুরোনো স্বভাব কি এত সহজে বদলায়?"

একজন বৃদ্ধ সভাসদ গম্ভীর গলায় বললেন,

"আমরা কি ভুলে গেছি, অতীতে সে কী করত? তার হাতে দুধের পাত্র এসেছে, আর সেই দুধ স্পর্শ করার পরই শাহজাদীর এই অবস্থা। ঘটনাগুলো কি নিছক কাকতালীয়?"

আরেকজন বলল,

"হয়তো প্রতিশোধ নিয়েছে! রাজপরিবার তাকে আশ্রয় দিয়েছে, সম্মান দিয়েছে। তবু তার মনে পুরোনো ক্ষোভ থাকতে পারে।"

"হ্যাঁ! হয়তো ভেবেছে, সুযোগ পেয়েছি যখন, আঘাতটা এমন জায়গায় করি যাতে সবাই মনে রাখে!"

কথাগুলো ক্রমশ আরও ভয়ংকর হয়ে উঠল।

কেউ আর নিশ্চিত হওয়ার অপেক্ষা করছে না। কেউ দুধ পরীক্ষা করেনি, কেউ ফাইয়াজকে জিজ্ঞাসাও করেনি। শুধু তার অতীত আর দুধ নিয়ে আসার ঘটনাটুকুই যেন তাকে অপরাধী বানানোর জন্য যথেষ্ট হয়ে উঠেছে।

প্রহরীদের কয়লকজন দ্রুত ফাইয়াজকে খুঁজে বের করল। ফাইয়াজ তখন মহলের বাইরের করিডরে দাঁড়িয়ে বিয়ের অনুষ্ঠানের কাজে ব্যবহৃত সামগ্রী সরানোর নির্দেশ দিচ্ছিল। সুনেহেরার অসুস্থতার খবর তার কাছেও পৌঁছেছিল, তবে ঘটনার প্রকৃত কারণ সে জানত না। একজন প্রহরী দ্রুত তার সামনে এসে দাঁড়াল।

"ফাইয়াজ, তোমাকে মহারানির সামনে হাজির হতে হবে।"

ফাইয়াজ বিস্মিত হয়ে তাকাল।

"কেন? শাহজাদীর শরীর খারাপ হয়েছে শুনেছি। চিকিৎসক এসেছে?"

প্রহরী কঠোর গলায় বলল,

"তোমাকে যা জিজ্ঞেস করা হবে, তার উত্তর দেবে। আমাদের সঙ্গে চলো।"

ফাইয়াজের ভ্রু কুঁচকে গেল।

"আমাকে আবার কি জিজ্ঞেস করবে? বেশ চলো”

প্রহরী পাশে দাঁড়ানো আরেকজনকে ইশারা করল।

"ওকে নিয়ে চলো।"

দুজন প্রহরী তার দুই পাশে এসে দাঁড়াল।

ফাইয়াজ এবার বিরক্ত হয়ে উঠল।

"আমি অপরাধী নই যে আমাকে এভাবে ঘিরে ধরতে হবে। কী হয়েছে, সেটা অন্তত বলো! আর আমি যাচ্ছি তো"

"শাহজাদী সুনেহেরার শরীর নীল হয়ে যাচ্ছে। আর দুধ তুমি এনেছিলে।"

কথাটা শুনে ফাইয়াজের মুখের রং বদলে গেল।

"কী বললে? তাঁর শরীর নীল হয়ে যাচ্ছে?"

"হ্যাঁ। সবাই বলছে, তুমি দুধে কিছু মিশিয়েছ।"

ফাইয়াজ যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারল না।

"কী বলছ তুমি! আমি কেন এমন কাজ করতে যাব?"

প্রহরী ঠান্ডা গলায় উত্তর দিল,

"সেটা গিয়ে মহারানিকে বোঝাবে।"

ফাইয়াজ একবার চোখ বন্ধ করে গভীর শ্বাস নিল। তারপর দৃঢ় কণ্ঠে বলল,

"ঠিক আছে। আমি নিজেই যাচ্ছি। আমি নির্দোষ। আমার ভয় নেই।"

তাকে নিয়ে প্রহরীরা যখন মূল কক্ষের দিকে এগিয়ে গেল, তখন করিডরের দুপাশে দাঁড়ানো লোকজন ফিসফিস করে উঠল।

"ওই যে, সেই লোক! শাহজাদির কিছু হলে ওকে ছাড়বে না! দেখতে ভদ্র সেজেছে, ভেতরে কী আছে কে জানে!"

প্রতিটি কথা ফাইয়াজের কানে পৌঁছাচ্ছিল। সে প্রতিবাদ করতে চেয়েও করল না। আগে দেখতে হবে সুনেহেরার কী হয়েছে? আর কীভাবে মানুষ প্রমাণ ছাড়াই তাকে অপরাধী ভাবতে পারছে?

মূল কক্ষে প্রবেশ করতেই ফাইয়াজ দেখল, পরিবেশ গরম। একপাশে সুনেহেরাকে শুইয়ে রাখা হয়েছে। মাহাদি তার মাথার কাছে বসে আছেন। জান্নাত ও মেহেরুন্নেসা পাশে দাঁড়িয়ে। কয়েকজন দাসী কাঁদছে। চিকিৎসক এসে সুনেহেরার অবস্থা পরীক্ষা করছেন, আর দরজার কাছে জড়ো হওয়া সভাসদদের মুখে আতঙ্ক ও ক্ষোভ। ফাইয়াজের চোখ প্রথমেই পড়ল সুনেহেরার ওপর। তার হাত ও বাহুর কিছু অংশ নীলচে হয়ে গেছে। মুখ ফ্যাকাশে। চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছেন, আর মাহাদি বারবার তাঁর নাম ধরে ডাকছেন। দৃশ্যটা দেখে ফাইয়াজের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।

"ওনার এই অবস্থা কীভাবে হলো?"

কেউ তার প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগেই এক সভাসদ সামনে এগিয়ে এলেন।

"সেটা তোমারই ভালো জানার কথা!"

"মানে?"

লোকটা আঙুল তুলে বললেন,

"দুধ তুমি এনেছিলে। সেই দুধ খেলার সময় ব্যবহার করা হয়েছে। আর তারপরই শাহজাদি সুনেহেরা অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। এখন আবার নির্দোষ সাজছ?"

ফাইয়াজের মুখ কঠিন হয়ে গেল।

"আমি দুধ এনেছি, এটা সত্যি। কিন্তু দুধে কিছু মেশানোর অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা! কী যা তা বলছেন আপনারা? এতদিন হলো মহলে আছি, আজ ওবদি কোনো অন্যায় করেছি কি?"

"তোমার অতীতও তো দেখতে হবে! তুমি একসময় ডাকাত ছিলে। কত মানুষের ক্ষতি করেছ, তার হিসাব আছে?"

"আমি আমার অতীত অস্বীকার করি না। আমি ভুল করেছি, তার শাস্তিও পেয়েছি। কিন্তু সেই অতীতের জন্য কি এখন আমার প্রতিটি ভালো কাজও মিথ্যা হয়ে যাবে?"

"কথার জাদু দেখিয়ে লাভ নেই!"

"কথার জাদু আমি দেখাচ্ছি না। আমি শুধু সত্যিটা বলছি!"

একজন প্রহরী সামনে এসে দাঁড়াল

"তুমি কি অস্বীকার করছ যে দুধ তুমি এনেছিলে?"

"না, অস্বীকার করছি না। আমি দুধ এনেছিলাম। কিন্তু আমি তাতে কিছু মেশাইনি। আমি জানতামই না যে এমন কিছু ঘটবে!"

সভাসদদের মধ্যে গুঞ্জন বেড়ে গেল।

"অপরাধীরা সবাই এভাবেই কথা বলে! ওকে এখনই বন্দি করা হোক! যতক্ষণ না সত্য বের হচ্ছে, ততক্ষণ ওকে শাস্তি দেওয়া উচিত!"

ফাইয়াজ এবার আর নিজেকে সামলাতে পারল না।

"আমি নির্দোষ! আল্লাহকে সাক্ষী রেখে বলছি, আমি শাহজাদী সুনেহেরার কোনো ক্ষতি করিনি। তিনি আমার কাছে সম্মানিত। তার বিয়ের দিনে এমন কিছু করার কথা আমি কল্পনাও করতে পারি না!"

মাহাদি মাথা তুলে তার দিকে তাকালেন। চোখে গভীর বেদনা, অসহায়তা,

"তুমি দুধ কোথা থেকে এনেছিলে?"

ফাইয়াজ সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল,

"রান্নাঘর থেকে। আমাকে বলা হয়েছিল, অনুষ্ঠানের জন্য দুধের পাত্রগুলো নিয়ে যেতে। আমি পাত্র নিয়ে এসেছি, তারপর নির্দিষ্ট জায়গায় রেখে দিয়েছি। এরপর কী হয়েছে, তা আমি জানি না।"

"পাত্র নিয়ে আসার পথে কেউ তোমার সঙ্গে ছিল?"

ফাইয়াজ কিছুক্ষণ ভেবে বলল,

"রান্নাঘরের দুজন কর্মচারী আমাকে দেখেছে। পথেও কয়েকজন প্রহরী ছিল। চাইলে তাদের জিজ্ঞেস করতে পারেন।"

সভাসদদের একজন বিদ্রূপ করে বললেন,

"এখন নিজের পক্ষে সাক্ষীও সাজিয়ে রেখেছ?"

ফাইয়াজ তীব্র দৃষ্টিতে তাঁর দিকে তাকাল।

"আপনি আমাকে অপছন্দ করতে পারেন। আমার অতীতের জন্য ঘৃণাও করতে পারেন। কিন্তু প্রমাণ ছাড়া আমাকে খুনি বলার অধিকার আপনার নেই!"

"মুখ সামলে কথা বলো!"পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠল। দুজন প্রহরী ফাইয়াজের বাহু ধরে ফেলল।

"মহারানির নির্দেশ না আসা পর্যন্ত তোমাকে আটক থাকতে হবে।"

সেই সময়ে শাখা এসে ফাইয়াজের দাঁড়াল ঢাল হয়ে

"চুপ!"

তার বজ্রকন্ঠে মুহূর্তেই ঘরের সব কথাবার্তা থেমে গেল। দরজার কাছে দাঁড়িয়ে আছে শাখা।

তার চোখে আগুনের মতো তীব্রতা। মুখে কোনো আতঙ্ক নেই, তবে সুনেহেরার অবস্থা দেখে তার চোয়াল শক্ত হয়ে আছে। দ্রুত ঘরের ভেতরে এগিয়ে এল। আগে সুনেহেরার দিকে তাকাল, তারপর মাহাদির কাছে গিয়ে পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করল।

"কী হয়েছে মণি মার?"

মাহাদি ভারী গলায় বললেন,

"খেলা শেষ হওয়ার কিছুক্ষণ পর থেকেই ওর শরীর খারাপ হতে শুরু করে। এখন শরীরের রং নীল হয়ে যাচ্ছে। চিকিৎসক পরীক্ষা করছেন, কিন্তু এখনো কিছু নিশ্চিতভাবে বলতে পারেননি।"

শাখা চিকিৎসকের দিকে তাকাল।

"আপনি কি বুঝতে পেরেছেন, এমন কেন হচ্ছে?"

চিকিৎসক গম্ভীর মুখে উত্তর দিলেন,

"এখনই নিশ্চিত করে কিছু বলা সম্ভব নয়। তাঁর শরীরের পরিবর্তন দ্রুত হচ্ছে। আরও পরীক্ষা দরকার। তাকে শান্ত রাখতে হবে, আর কোনো ওষুধ দেওয়ার আগে কারণ বোঝা জরুরি। আপাতত যা বুঝছি, বিষক্রিয়া "

শাখা মাথা নাড়ল। তারপর ফাইয়াজের দিকে তাকিয়ে দেখল, দুজন প্রহরী এখনো তার বাহু ধরে আছে। শাখার দৃষ্টি দেখেই তারা ফাইয়াজকে ছেড়ে দিল। একজন সভাসদ তৎক্ষণাৎ বলে উঠলেন,

"শাহজাদি সুনেহেরার অসুস্থতার পেছনে ওর হাত থাকার যথেষ্ট সন্দেহ আছে!"

শাখা তার দিকে ফিরল।

"কীসের ভিত্তিতে?"

"দুধ ও এনেছে!"

"দুধ নিয়ে আসা আর দুধে ক্ষতিকর কিছু মেশানো এক কথা নয়।"

নায়েব বিরক্ত হয়ে বললেন,

"তুমি কি ওর পক্ষ নিচ্ছ? ভুলে গেছ, সে একসময় ডাকাত ছিল?"

শাখার চোখ আরও কঠিন হয়ে উঠল।

"না, আমি তার অতীত ভুলিনি। আমি জানি সে কী ছিল। কিন্তু ফাইয়াজ তার অতীতের জন্য আজীবন অপরাধী হয়ে থাকবে এমন কোনো আইন নেই।"

"তাহলে তুমি বলতে চাইছ, ও নির্দোষ?"

"আমি বলছি, প্রমাণ ছাড়া কাউকে দোষী বলা যাবে না। দুধ কোথা থেকে এসেছে, কে প্রস্তুত করেছে, কারা পাত্রের কাছে গিয়েছে, কোথাও কোনো অস্বাভাবিকতা ঘটেছে কি না সবকিছু তদন্ত করুন। রান্নাঘরের কর্মচারীদের জিজ্ঞাসাবাদ করুন। পাত্র পরীক্ষা করুন। প্রত্যেকের বক্তব্য নিন। তারপর সিদ্ধান্তে আসুন।"

শাখা এবার ফাইয়াজের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।

প্রহরীরা তাকে সরিয়ে দিতে চাইলে শাখা হাত তুলে বাধা দিল।

"ওর গায়ে হাত দেবেন না।"

একজন প্রহরী ইতস্তত করে বলল,

"রাজকুমারী, আমাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে ওকে আটক করতে।"

"তাহলে নির্দেশদাতাকে বলবেন, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত আমি ফাইয়াজকে অপরাধী হিসেবে বন্দি করতে দেব না।"

ঘরে আবার গুঞ্জন শুরু হলো।

"তুমি কি রাজপরিবারের সবার বিরুদ্ধে দাঁড়াবে এই লোকটার জন্য?"

শাখা ধীরে মাথা তুলল।

"ফাইয়াজের জন্য নয়। ন্যায়বিচারের জন্য দাঁড়াচ্ছি।"

সে ফাইয়াজের দিকে ফিরল। ফাইয়াজ এতক্ষণ নিজেকে শক্ত করে রেখেছিল। কিন্তু শাখাকে নিজের সামনে দাঁড়াতে দেখে তার চোখে জমে থাকা কষ্ট আর অপমান যেন একসঙ্গে বেরিয়ে আসতে চাইল।

"শাখা, তুমি এখানে এসো না। সবাই তোমাকেও আমার সঙ্গে জড়িয়ে ফেলবে।"

শাখা তার কথায় বিচলিত হলো না।

"আমি ইতিমধ্যেই আপনার সাথে জড়িয়ে গেছি। যারা অভিযোগ করেছে, তাদের প্রমাণ দিতে হবে।"

ফাইয়াজের গলা ভারী হয়ে উঠল।

"আমি সত্যিই কিছু করিনি, শাখা। আমি এমন কিছু করতে পারি না!"

শাখা তার চোখের দিকে তাকিয়ে রইল।

"আমি জানি।"

শাখা সবার দিকে ফিরে দৃঢ় কণ্ঠে বলল,

" আমি ওকে বিশ্বাস করি। আমার ভালোবাসার ওপর আমার সম্পূর্ণ আস্থা আছে।"

ঘরের মধ্যে মুহূর্তেই নীরবতা নেমে এল। শাখা আবার বলল,

"আমি ফাইয়াজকে ভালোবাসি। তার অতীত জেনেই ভালোবাসি। তার ভুলগুলো জেনেই তার পাশে দাঁড়িয়েছি। সে নিজের জীবন বদলানোর চেষ্টা করছে, নিজের উপার্জনে ভবিষ্যৎ গড়তে চাইছে। আর আজ একটা ভয়ংকর ঘটনা ঘটেছে বলেই আমি তার সমস্ত পরিবর্তনকে মিথ্যা বলে মেনে নেব না।"

চোখে জল চিকচিক করলেও কণ্ঠ দুর্বল হলো না।

"আপনারা যদি প্রমাণ পান যে সে অপরাধ করেছে, আমি নিজেই তার মুখোমুখি দাঁড়াব। আমি ন্যায়বিচার থেকে তাকে আড়াল করব না। কিন্তু যদি সে নির্দোষ হয়, তাহলে আজ যারা তাকে অপমান করছেন, তাদের প্রত্যেককে আমি দেখে নেব।

কেউ উত্তর দিল না। শাখা আরও বলল,

"একজন মানুষের অতীত তার পরিচয়ের অংশ হতে পারে, কিন্তু সেটাই তার ভবিষ্যতের চূড়ান্ত রায় নয়।”

হেকিম দুধের পাত্র নিয়ে অন্দরে হাজির হলো।

“সকলের সন্দেহ একদম সত্যি। দুধে এই কাটা টা ফেলা ছিল। এটা ফুটতেই শাহজাদীর এই অবস্থা।”

“হ্যা কিন্তু দুধে কাঁটা টা যে ফাইয়াজই….”

“আমি দেখেছি শাহজাদী”

ভীড়ের মধ্যে থেকে একজন কমবয়সী দাসী চেচিয়ে উঠল। শাখা বিষ্ময় নিয়ে তাকাল তার দিকে

“তুমি দেখেছো?”

“ জি শাহজাদি, আমি ওনাকে সাপুড়ে তান্নুর কাছ থেকে এই বিষকাঁটা কিনতে দেখেছি”

ফাইয়াজ চোখ বড় বড় করে বলল

“কিন্তু সেটা তো আমাকে যুবরাজ ইয়ামিন সংগ্রহ করে নিয়ে দিতে বলেছিল”

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে 61 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন