সাহাবাদের মহলে আতঙ্ক কাটেনি। বিয়ের আনন্দে যে প্রাসাদ কিছুক্ষণ আগেও মুখর ছিল, সেই প্রাসাদেই ভরে উঠেছে কান্না, উদ্বেগ আর চাপা ফিসফাস। অন্তঃপুরের শয্যাকক্ষে সুনেহেরা শুয়ে আছে। তার হাত ও বাহুর নীলচে দাগ আরও স্পষ্ট হয়ে উঠঋে ক্রমশ। মাহাদি শয্যার পাশে বসে তাঁর হাত ধরে আছে। বারবার স্ত্রীর মুখের দিকে তাকাচ্ছে, যেন চোখের আড়াল হলেই তাঁকে হারিয়ে ফেলবে।
জান্নাত শয্যার অন্য পাশে দাঁড়িয়ে। চোখের পানি মুছে মুছে সে মণি মায়ের মুখের দিকে তাকাচ্ছে। শাখা দরজার কাছে দাঁড়িয়ে চিকিৎসকের নির্দেশের অপেক্ষা করছে। মেহেরুন্নেসা একবার মেয়েদের দিকে তাকাচ্ছেন, আরেকবার সুনেহেরার দিকে। রাজকীয় হেকিম দীর্ঘক্ষণ ধরে সুনেহেরার নাড়ি পরীক্ষা করলেন। এরপর তাঁর বাহুর নীলচে দাগগুলো পর্যবেক্ষণ করে পরিচারিকাকে কয়েকটি প্রশ্ন করলেন। দুধের পাত্র কোথায় রাখা হয়েছিল, সুনেহেরা কখন অসুস্থ বোধ করেছিলেন, তার আগে কী খেয়েছিলেন সবকিছু জানার চেষ্টা করলেন তিনি।
মাহাদি আর অপেক্ষা করতে পারলেন না।
"হেকিম সাহেব, আপনি কি বুঝতে পারছেন?"
হেকিম মুখ তুলে তাকালেন। তাঁর চেহারায় উদ্বেগ থাকলেও কণ্ঠে পেশাগত দৃঢ়তা।
"শাহজাদির সুনেহেরার শরীরে বিষক্রিয়ার লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। তবে প্রথমে যে আশঙ্কা করেছিলাম, এটি তা নয়।"
শাখা দ্রুত এগিয়ে এল।
"কী বলতে চাইছেন আপনি?"
হেকিম সুনেহেরার বাহুর দিকে ইঙ্গিত করলেন।
"কোনো জঙ্গলি কাঁটা ফুটে এই বিষক্রিয়া হয়েছে বলে মনে হচ্ছে না। তাঁর শরীরে কাঁটার আঘাতের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কোনো চিহ্নও পাইনি। লক্ষণগুলো অন্য কিছুর দিকে ইঙ্গিত করছে।"
জান্নাতের বুক কেঁপে উঠল।
"তাহলে মণি মায়ের শরীরে বিষ ঢুকল কীভাবে?"
হেকিম একটু থামলেন। তারপর বললেন,
"আমার ধারণা, একধরনের সাপের বিষ তাঁর শরীরে প্রবেশ করেছে। তবে বিষের উৎস সম্পর্কে নিশ্চিত হতে আরও পরীক্ষা করতে হবে।"
মাহাদি স্ত্রীর হাতটা আরও শক্ত করে ধরলে।
"সাপের বিষ! কিন্তু তাঁকে তো কেউ সাপে কাটেনি!"
"সেটাই আমাকে ভাবাচ্ছে। শরীরে সাপের কামড়ের পরিচিত কোনো চিহ্ন নেই। আমার সন্দেহ, বিষটি অন্য কোনো মাধ্যমে তাঁর শরীরে প্রবেশ করানো হয়েছে।"
মেহেরুন্নেসার মুখ কঠিন হয়ে উঠল।
"আপনি কি বলতে চাইছেন, কেউ ইচ্ছা করে তাঁকে বিষ দিয়েছে?"
"সেই সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না, মহারানি।"
শাখা একবার মাহাদির দিকে তাকাল। তার চোখে অসহায়তা, যা দেখে শাখার নিজের বুকও ভারী হয়ে উঠল। মাহাদি কাঁপা গলায় বললেন,
"যে-ই করে থাকুক, তাকে খুঁজে বের করুন। কিন্তু আগে আমার স্ত্রীকে বাঁচান। আমার আর কিছু চাই না।"
হেকিম মাথা নাড়লেন।
"আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। তবে বিষক্রিয়া রোধের ওষুধ দেওয়ার আগে বিষটি কীভাবে শরীরে প্রবেশ করেছে, সে সম্পর্কে কিছুটা নিশ্চিত হওয়া দরকার।"
জান্নাত হঠাৎ দুধের পাত্রগুলোর কথা মনে করে বলল,
"মণি মা তো দুধের মধ্যে আংটি খোঁজার খেলা শেষ হওয়ার পর অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। তাহলে দুধেই কিছু মেশানো ছিল? আর যদি দুধে মেশানো থাকে তাতে মাহাদি মামাও হাত ডুবিয়েছে। কই ওনার তো কিছুই হচ্ছে না। হেকিম উত্তর দেওয়ার আগেই পাশ থেকে একজন পরিচারক জানাল,
"পাত্রগুলো পরীক্ষা করার জন্য আলাদা করে রাখা হয়েছে। তবে এখনো কিছু নিশ্চিত হওয়া যায়নি।"
হেকিম বললেন,
"দুধ পরীক্ষা করা হোক। পাশাপাশি সুনেহেরার খাবার ও পানীয়ের বিষয়টিও খতিয়ে দেখতে হবে। শুধু একটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করলে চলবে না।"
শাখা মাথা নাড়ল।
"কেউ যেন কোনো প্রমাণ নষ্ট করতে না পারে। রান্নাঘর, পানীয় পরিবহনের পথ আর অতিথিদের চলাচলের জায়গায় যারা দায়িত্বে ছিল, তাদের সবার বক্তব্য নিতে হবে।"
মেহেরুন্নেসা প্রহরীদের নির্দেশ দিলেন, যাতে কোনো সন্দেহভাজন ব্যক্তি মহল ছেড়ে যেতে না পারে। কিন্তু তখনো কেউ জানত না, এই ষড়যন্ত্রের সূত্র তাদের কোথায় নিয়ে যাবে।
হেকিমের কথা শুনে জান্নাতের মনে হঠাৎ গতকালের দৃশ্য টা ভেসে উঠল। বিকেলের দিকে সে বাগানে ফুল তুলতে গিয়েছিল। সেখানেই দেখা হয়েছিল সেই দীর্ঘদেহী অপরিচিত যুবকের সঙ্গে। লোকটি নিজেকে নাসিরাবাদের শাহজাদা বলে পরিচয় দিয়েছিল। তার আচরণে ছিল অদ্ভুত আত্মবিশ্বাস। কথাবার্তার একপর্যায়ে সে জান্নাতের হাত ধরেছিল, আর জান্নাত বিরক্ত হয়ে তার হাত ছাড়িয়ে নিয়েছিল। কিন্তু তখন তার হাতে থাকা একটি বিষয় জান্নাতের চোখে পড়েছিল। একটি সাপের উল্কি। যুবকের হাতের কবজির কিছুটা ওপরে আঁকা ছিল প্যাঁচানো সাপের নকশা। তখন বিষয়টিকে তেমন গুরুত্ব দেয়নি জান্নাত। ভেবেছিল, হয়তো তার ব্যক্তিগত কোনো প্রতীক।
কিন্তু এখন হেকিমের মুখে সাপের বিষের কথা শুনে দৃশ্যটি স্পষ্ট হয়ে উঠল। জান্নাতের চোখ বিস্ফারিত হয়ে গেল।
"একটু দাঁড়াও!"
ঘরের সবাই তার দিকে ফিরে তাকাল। শাখা দ্রুত জিজ্ঞেস করল,
"কী হয়েছে, আপা?"
"গতকাল যে লোকটা নিজেকে নাসিরাবাদের শাহজাদা বলে পরিচয় দিয়েছিল, তার হাতে সাপের উল্কি ছিল!"
শাখা ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
"সাপের উল্কি?"
"হ্যাঁ। আমি নিজের চোখে দেখেছি। তার কবজির একটু ওপরে সাপের মতো একটা নকশা ছিল।"
মেহেরুন্নেসা এবার এগিয়ে এলেন।
"তুমি কি মনে করছ, সুনেহেরার এই ঘটনার সঙ্গে লোকটির কোনো সম্পর্ক আছে?"
জান্নাত দৃঢ়ভাবে উত্তর দিল,
"আমি নিশ্চিত নই। কিন্তু হেকিম যখন বলছেন, মণি মায়ের শরীরে সাপের বিষ প্রবেশ করেছে, তখন ওই উল্কির কথা মনে পড়া স্বাভাবিক। লোকটা নিজেকে নাসিরাবাদের শাহজাদা বলেছিল। কিন্তু সে সত্যিই শাহজাদা কি না, সেটাও তো আমরা যাচাই করিনি!"
শাখার চোখে চিন্তার ছায়া ঘনীভূত হলো।
"লোকটা মহলে এসেছিল, অথচ তার পরিচয়ের কোনো প্রমাণ আমরা চাইনি।"
জান্নাত মাথা নাড়ল।
"আর একটা কথা আছে। গতকাল আমি তাকে নায়েবের সঙ্গে কথা বলতে দেখেছিলাম।"
কথাটা শুনে মেহেরুন্নেসা তৎক্ষণাৎ প্রহরীর দিকে ফিরলেন।
"নায়েবকে এখনই ডেকে পাঠাও। আর গতকাল যে ব্যক্তি নাসিরাবাদের শাহজাদা পরিচয়ে এসেছিল, তাকে খুঁজে বের করো। তার পরিচয় যাচাই না হওয়া পর্যন্ত কেউ তাকে মহলের বাইরে যেতে দেবে না।"
প্রহরী কুর্নিশ করে বেরিয়ে গেল। মাহাদি তখনো সুনেহেরার পাশে। তিনি উদ্বিগ্ন চোখে জান্নাতের দিকে তাকালেন।
"তোমরা যা বলছ, তাতে মনে হচ্ছে কেউ পরিকল্পনা করেই মহলে প্রবেশ করেছে।"
শাখা উত্তর দিল,
"সেটাই এখন আমাদের খুঁজে বের করতে হবে। কিন্তু অনুমানের ভিত্তিতে কাউকে অপরাধী বলা যাবে না। লোকটিকে খুঁজে বের করতে হবে, তার পরিচয় যাচাই করতে হবে, তারপর প্রমাণ মিলিয়ে দেখতে হবে।"
মাহাদি মাথা নাড়লেন।
"আমি সুনেহেরাকে ছেড়ে কোথাও যাব না। তোমরা তদন্তের দায়িত্ব নাও।"
শাখা তাঁর দিকে তাকিয়ে বলল,
"তুমি মণি মায়ের পাশে থাকো মামা। আমরা বাকি বিষয়গুলো দেখছি।"
কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রহরীরা নায়েবকে মহলের প্রধান সভাকক্ষে নিয়ে এল। নায়েবের মুখে উদ্বেগের ছাপ থাকলেও সে নিজেকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছিল। কক্ষের মাঝখানে দাঁড়িয়ে সে মেহেরুন্নেসা, শাখা ও জান্নাতকে কুর্নিশ করল।
"মহারানি, আমাকে ডেকেছেন?"
মেহেরুন্নেসা সরাসরি প্রশ্ন করলেন,
"গতকাল নাসিরাবাদের শাহজাদা পরিচয়ে যে ব্যক্তি মহলে এসেছিল, তার সঙ্গে তোমাকে কথা বলতে দেখা গেছে। তোমাদের মধ্যে কী কথা হয়েছিল?"
নায়েব এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। তারপর মাথা নিচু করে বলল,
"তিনি নাসিরাবাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছু কথা বলছিলেন, মহারানি। আমি শুধু তাঁর পরিচয় জানতে চেয়েছিলাম। তিনি নিজেকে শাহজাদা বলেছেন।"
"নিজেকে শাহজাদা বললেই কেউ শাহজাদা হয়ে যায় না। তাঁর কাছে পরিচয়ের কোনো প্রমাণ ছিল?"
নায়েবের কপালে ঘাম জমল।
"না, শাহজাদী। তবে তাঁর কথাবার্তা আর পোশাক দেখে…."
শাখা তাকে থামিয়ে দিল।
"পোশাক দেখে রাজপরিবারের পরিচয় নির্ধারণ করা যায় না। তুমি কি জানো, তাঁর হাতে সাপের উল্কি ছিল?"
নায়েব এবার স্পষ্টতই বিচলিত হয়ে পড়ল।
"আমি... আমি খেয়াল করিনি।"
জান্নাত এক পা এগিয়ে এল।
"তাহলে তুমি কী খেয়াল করেছিলে? লোকটা তোমার সঙ্গে একান্তে কথা বলছিল কেন?"
নায়েব এবার মুখ খুলতে গিয়েও থেমে গেল। তার দৃষ্টি একবার দরজার দিকে চলে গেল। শাখার চোখ এড়াল না ব্যাপারটা।
"তুমি কি কোথাও যাওয়ার কথা ভাবছ?"
"না, রাজকুমারী!"
"তাহলে আমাদের প্রশ্নের উত্তর দাও।"
ঠিক তখনই সভাকক্ষের অন্য দরজা দিয়ে ফাইয়াজকে নিয়ে দুই প্রহরী প্রবেশ করল। সুনেহেরার বিষক্রিয়ার ঘটনায় তাকে এখনো সন্দেহের তালিকায় রাখা হয়েছে। তবে শাখার নির্দেশে তাকে অপরাধী হিসেবে শাস্তি দেওয়া হয়নি; তদন্তের জন্য তার বক্তব্যও নেওয়া হচ্ছিল।
ফাইয়াজকে দেখামাত্র নায়েবের মুখের রং বদলে গেল। ফাইয়াজও তাকে চিনে ফেলল। এক মুহূর্তের জন্য তার চোখে অবিশ্বাস ফুটে উঠল। তারপর সে তীক্ষ্ণ কণ্ঠে বলে উঠল,
"তুই!"
শাখা সঙ্গে সঙ্গে তার দিকে ফিরল।
"আপনি একে চেনেন?"
ফাইয়াজ নায়েবের দিকে আঙুল তুলল।
"এ তো হারুণ ওয়াসেমের দলের লোক! আমি একে আগেও দেখেছি। হারুণ ওয়াসেমের লোকজনের সঙ্গে এর যোগাযোগ ছিল!"
কথাটা শুনে নায়েবের মুখের অবশিষ্ট রংটুকুও মিলিয়ে গেল। মেহেরুন্নেসার কণ্ঠ কঠোর হয়ে উঠল।
"তুমি হারুণ ওয়াসেমের দলের লোক? এতদিন মহলে থেকে আমাদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছ?"
নায়েব কাঁপা গলায় বলল,
"না, মহারানি! এ মিথ্যা কথা বলছে!"
ফাইয়াজ এক পা এগিয়ে এল।
"আমি তোমাকে ভুল করতে পারি না। হারুণ ওয়াসেমের লোকদের সঙ্গে তোমাকে দেখেছি। তুমি শুধু তার দলের লোক নও, তুমি তাদের হয়ে খবরও বহন করতে!"
নায়েব হঠাৎ ঘুরে দরজার দিকে ছুটল।
"ধরো ওকে!"
শাখার নির্দেশে প্রহরীরা তার পিছু নিল। নায়েব করিডর পেরিয়ে বাইরের উঠানের দিকে দৌড়ে গেল। সামনে দাঁড়ানো দুজন প্রহরী তাকে থামাতে গেলে সে একজনকে ধাক্কা দিয়ে পাশ কাটানোর চেষ্টা করল। কিন্তু উঠানের শেষ প্রান্তে পৌঁছানোর আগেই আরেকদল প্রহরী তার পথ আটকে দিল।
নায়েব পেছনে ফিরতেই ফাইয়াজকে এগিয়ে আসতে দেখল। মুখে তখন আতঙ্ক।
"আমাকে ছেড়ে দাও! আমি কিছু করিনি!"
ফাইয়াজ ঠান্ডা গলায় বলল,
"তাহলে পালাচ্ছ কেন? নির্দোষ হলে প্রশ্নের উত্তর দিতে ভয় পাওয়ার কথা নয়।"
নায়েব কোনো উত্তর দিতে পারল না। প্রহরীরা তার দুই হাত ধরে ফেলল এবং তাকে আবার সভাকক্ষে নিয়ে এল। মেহেরুন্নেসা নির্দেশ দিলেন,
"নায়েবকে নিরাপদে বন্দি করো। তার কক্ষ, এবং ব্যক্তিগত সামগ্রী পরীক্ষা করা হবে"
প্রহরীরা নায়েবকে নিয়ে যাওয়ার সময় সে পেছন ফিরে চিৎকার করে উঠল,
"আমাকে ফাঁসানো হচ্ছে! আমি কিছু করিনি!"
শাখা তার দিকে তাকিয়ে বলল,
"তদন্তে সত্য প্রমাণিত হবে। কিন্তু পালানোর চেষ্টা করে তুমি নিজের সন্দেহ আরও বাড়িয়েছ।"
চিকিৎসক আসতেই সুনেহেরা কে চিকিৎসা কক্ষে নিয়ে যাওয়া হলো। সাপের বিষের প্রতিষেধক দেওয়ার পর তার অবস্থা উন্নতি হচ্ছে।
*****
পরদিন সকালে সাহাবাদের মহলে রাতের আতঙ্ক কিছুটা স্তিমিত হয়েছে। সুনেহেরা এখনো চিকিৎসকের পর্যবেক্ষণে, তবে তাঁর অবস্থা আগের চেয়ে স্থিতিশীল। মাহাদি প্রায় সারারাত তার পাশে ছিলেন। ভোরের দিকে হেকিমের নির্দেশে তাঁকে সামান্য বিশ্রাম নিতে পাঠানো হলেও তিনি বারবার শয্যাকক্ষের খবর নিচ্ছিলেন। শাখা অবশ্য সকাল হতেই নাসিরাবাদের উদ্দেশে রওনা হওয়ার প্রস্তুতি নিল।
নাসিরাবাদের পুরোনো রাজপ্রাসাদের সংস্কারকাজ সম্পন্ন হয়েছে। দীর্ঘদিনের পরিত্যক্ত প্রাসাদটি আবার বাসযোগ্য হয়ে উঠেছে। দেয়ালের ফাটল মেরামত করা হয়েছে, ভাঙা বারান্দা নতুন করে তৈরি হয়েছে, সভাকক্ষের ছাদ মজবুত করা হয়েছে। প্রাসাদের ভেতরের উঠান, অতিথিশালা ও প্রশাসনিক কক্ষও ব্যবহারের উপযোগী।
কিন্তু শাখা জানে, শুধু প্রাসাদ সংস্কার করলেই একটি নগর পুনর্জীবিত হয় না। নগরের দোকানপাট, বসতবাড়ি, বাজার, রাস্তা, পানির ব্যবস্থা সবকিছু আবার গড়ে তুলতে হবে। বহু বছর ধরে পরিত্যক্ত ঘরবাড়ি মেরামত করতে হবে। যেসব পরিবার ফিরে আসতে চায়, তাদের নিরাপদে বসবাসের ব্যবস্থা করতে হবে।
প্রাসাদের প্রধান ফটকের সামনে ফাইয়াজ অপেক্ষা করছিল। শাখা ঘোড়ায় ওঠার আগে তার দিকে তাকাল।
"আপনি আজ আমার সঙ্গে যাবেন?"
ফাইয়াজ মাথা নাড়ল।
"যদি তোমার আপত্তি না থাকে।"
শাখা ভ্রু তুলল।
"আমার আপত্তি থাকবে কেন?"
ফাইয়াজ মৃদু হাসল।
"গত রাতের ঘটনার পর তুমি হয়তো ভাববে, আমার এখানে থাকা উচিত। আবার তোমার বাড়ির লোকজন তাদের হবু জামাইকে সন্দেহ করবে"
শাখা তার কাছে এগিয়ে এল।
"আপনার বিরুদ্ধে এমন বাজে একটা অভিযোগ উঠেছে বলে আপনি নিজের কাজ-কদম বন্ধ করে দেবেন?
"উহুম উহুম, আমি প্রস্তুত।"
শাখা ঘোড়ায় উঠতে উঠতে বলল,
"তাহলে চলুন । নাসিরাবাদের কাজ আমাদের অপেক্ষা করছে।"
দুজন প্রহরীসহ ছোট একটি দল তাদের সঙ্গে রওনা হলো।
নাসিরাবাদে পৌঁছাতে পৌঁছাতে সূর্য বেশ ওপরে উঠে গেছে। প্রাসাদের প্রধান ফটক পেরিয়ে শাখা ঘোড়া থেকে নামল। চারদিকে কর্মব্যস্ততা।
প্রাসাদের সামনে দাঁড়িয়ে শাখা কিছুক্ষণ চারপাশ দেখল। একসময় এই নগর ছিল সমৃদ্ধ। এখানে ছিল কারিগরদের পাড়া, কাপড়ের বাজার, মসলা বিক্রির দোকান, ঘোড়ার আস্তাবল, ছোট ছোট বিদ্যালয় এবং ভ্রমণকারীদের জন্য সরাইখানা। তারপর যুদ্ধ, লুটপাট ও দীর্ঘ অবহেলায় সবকিছু ভেঙে পড়ে। শাখা বলল,
"প্রাসাদটা আবার দাঁড়িয়েছে। কিন্তু এই নগরকে সত্যিকার অর্থে ফিরিয়ে আনতে হলে মানুষের ঘরগুলো আগে ঠিক করতে হবে।"
ফাইয়াজ তার পাশে এসে দাঁড়াল।
"বাজারের পূর্ব দিকের বাড়িগুলো আগে মেরামত করা যায়। সেখানকার কয়েকটি কাঠামো এখনো ভালো আছে। সেগুলো সংস্কার করলে মানুষ দ্রুত ফিরে আসতে পারবে।"
শাখা তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল।
"আপনি আগেই সব দেখে রেখেছেন?"
"গতবার যখন এসেছিলাম, তখন কিছু নথি দেখেছিলাম। কাজ শুরু করার আগে আবার দেখতে হবে। কারও জমি বা বাড়ি ভুল করে অন্যের নামে তুলে দিলে পুরো উদ্যোগের ওপর মানুষের আস্থা নষ্ট হবে।"
শাখা সন্তুষ্টির সঙ্গে মাথা নাড়ল।
"ঠিক বলেছেন। প্রতিটি বাড়ির পুরোনো মালিকানা যাচাই করতে হবে। যাদের কোনো নথি নেই, তাদের বক্তব্য ও প্রতিবেশীদের সাক্ষ্য নিতে হবে। কোনো পরিবারকে জোর করে উচ্ছেদ করা যাবে না।"
একজন কর্মচারী এগিয়ে এসে কুর্নিশ করল।
"রাজকুমারী, উত্তর দিকের বাজারের মাপ নেওয়া শেষ হয়েছে। তবে বেশ কয়েকটি দোকানের মালিকানা নিয়ে বিরোধ আছে।"
শাখা বলল,
"সেগুলো আলাদা করে নথিভুক্ত করো। যাচাই শেষ না হওয়া পর্যন্ত কোনো দোকান বরাদ্দ দেবে না। আর রাস্তা সংস্কারের সময় যেন বসতবাড়ির প্রবেশপথ বন্ধ না হয়।"
"জ্বি, রাজকুমারী।"
কর্মচারী চলে গেলে ফাইয়াজ বলল,
"তুমি চাইলে আজ শুধু প্রাসাদের বাকি অংশগুলো দেখে নিতে পারো। নগরের কাজের জন্য আলাদা দল রাখা হয়েছে।"
শাখা মাথা নাড়ল।
"প্রাসাদটা আরেকবার ঘুরে দেখতে চাই। এতদিন শুধু কাজের জন্য এসেছি। আজ দেখতে চাই, এই জায়গাটা আমাদের ভবিষ্যতের অংশ হতে পারে কি না।"
ফাইয়াজ তার দিকে তাকাল।
"আমাদের ভবিষ্যৎ?"
শাখা একটু থেমে হেসে ফেলল।
"হ্যাঁ, আমাদের। আর শোনো, আমি তোমাকপ তুমি বলতে চাই”
ফাইয়াজের মুখে লাজুক হাসি ফুটল।
"যেমনটা আপনার ইচ্ছে শাহজাদি"
শাখা হেসে বলল,
"সেটা একটা ছোট বাড়িতে কতগুলো জানালা থাকলে ভালো হয়।"
ফাইয়াজ এবার তার দিকে একটু গভীরভাবে তাকাল।
"আমাদের বাড়ির কথা ভাবছ?"
শাখা কোনো উত্তর না দিয়ে প্রাসাদের ভেতরের পথ ধরে হাঁটতে শুরু করল।
"চলো। তোমাকে একটা জায়গা দেখাব।"
প্রাসাদের পশ্চিম দিকের বারান্দাটা তুলনামূলক নিরিবিলি। সেখান থেকে নিচের বাগান দেখা যায়। দূরে নগরের পুরোনো বাড়িগুলোর সারি, তারও পেছনে পাহাড়ের অস্পষ্ট রেখা। শাখা বারান্দার একপাশে গিয়ে দাঁড়াল। বাতাসে তার পোশাকের প্রান্ত দুলছে। ফাইয়াজ কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইল। শাখা ধীরে বলল,
"আমি ছোটবেলায় ভাবতাম, একদিন নিজের একটা রাজ্য গড়ব। এমন একটা জায়গা, যেখানে মানুষ শুধু রাজপরিবারের ভয়ে নয়, নিজেদের নিরাপত্তার জন্য নিয়ম মেনে চলবে। যেখানে কোনো শিশুকে খাবারের জন্য কাঁদতে হবে না, কোনো পরিবারকে অন্যায়ের ভয়ে ঘর ছেড়ে পালাতে হবে না।"
ফাইয়াজ মনোযোগ দিয়ে শুনছিল।
"তুমি সেই স্বপ্নের দিকে এগোচ্ছ।"
"হ্যাঁ। কিন্তু এখন বুঝতে পারি, রাজ্য গড়া আর সংসার গড়া দুটোই দায়িত্বের কাজ। একটার জন্য আরেকটাকে বিসর্জন দিতে চাই না।"
সে ধীরে ফাইয়াজের দিকে ফিরল।
"আমি চাই, আমার পাশে এমন একজন থাকুক, যে আমার কাজকে বুঝবে। শুধু আমার পরিচয়ের জন্য নয়, আমাকে মানুষ হিসেবে ভালোবাসবে।"
ফাইয়াজের চোখে আবেগ জমল।
"তুমি জানো, আমি কখনো তোমার রাজমুকুটের দিকে তাকিয়ে তোমাকে ভালোবাসিনি। আমি জানি, তুমি একদিন নাসিরাবাদের দায়িত্ব নেবে। তোমার সামনে কত কাজ, কত সিদ্ধান্ত, কত শত্রু আসবে। আমি তোমার ঢাল হয়ে থাকব।”
শাখা নীরবে তাকিয়ে রইল। ফাইয়াজ ধীরে বলল,
"তুমি চাইলে আমার সঙ্গে তর্ক করতে পারবে, রাগ করে কথা বলা বন্ধ করে দিতে পারবে, আবার কিছুক্ষণ পর নিজেই এসে বলবে চলো, একসঙ্গে খাই। যেখানে তোমাকে নিয়ে আমার কোনো ভয় থাকবে না, আর তোমারও মনে হবে না যে তোমাকে সবসময় শক্ত থাকতে হবে।"
শাখার চোখ ভিজে উঠল।
"তুমি জানো, আমি কখনো কখনো খুব ক্লান্ত হয়ে পড়ি। সবাই আমার কাছে সিদ্ধান্ত আশা করে। আমি কী চাই, সেটা জিজ্ঞেস করার সময় কারও থাকে না।"
ফাইয়াজ তার কাছে এগিয়ে এল।
"আমি আছি তো।"
শাখা মৃদু হাসল।
"তাহলে শোনো, আমি একটা বাড়ি চাই। খুব বড় নয়। বাড়ির সামনে ছোট বাগান থাকবে। সেখানে কয়েকটা গোলাপগাছ লাগাব। আর বাড়িতে অনেকগুলো জানালা থাকবে। সকালে আলো ঢুকবে। বিকেলে তুমি কাজ থেকে ফিরলে আমি বারান্দায় বসে থাকব।"
ফাইয়াজ শাখার একদম কাছে গেল
"আমি তোমার পাশে থাকতে চাই, শাখা। শুধু আজ নয়, তোমার জীবনের প্রতিটি ঋতুতে থাকতে চাই।"
শাখা আর নিজেকে সংযত রাখতে পারল না। সে এক পা এগিয়ে এসে ফাইয়াজের বুকের কাছে মাথা রাখল। ফাইয়াজ কিছুক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে রইল। তারপর ধীরে তার কাঁধে হাত রাখল।
"তুমিও কি সত্যিই আমাকে নিয়ে এমন একটা জীবন চাও?"
শাখা মুখ তুলে তাকাল।
"হ্যাঁ, ফাইয়াজ। আমি চাই।"
"তাহলে আমাকে আর কখনো নিজের অতীতের কারণে তোমার কাছ থেকে দূরে সরে যেতে বলবে না।"
শাখা তার হাত আরও শক্ত করে ধরল।
"তুমিও কখনো ভাববে না যে তোমার অতীতের জন্য তুমি আমার ভালোবাসার অযোগ্য। তুমি যদি ভুল করো, আমি তোমাকে শুধরে নেব। কিন্তু শুধু অতীতের ভয়ে তোমাকে হারাতে চাই না।"
ফাইয়াজের চোখে জমে থাকা আবেগ আর লুকোনো গেল না।
"আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি, শাখা।"
শাখা মৃদু স্বরে উত্তর দিল,
"আমিও তোমাকে ভালোবাসি।"
সে একটু থামল, তারপর নিজেই ফাইয়াজের আরও কাছে এগিয়ে এল। ফাইয়াজ তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। দুজনের চোখে চোখ পড়তেই শাখা ধীরে চোখ বুজল। ফাইয়াজ তার সম্মতি বুঝে নরমভাবে তার ঠোঁটে চুমু খেল। শাখাও তার ঠোঁটে নিজের ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল।
চুমুটা আহামরি দীর্ঘ ছিল না, তবু তাদের কাছে যেন বহুদিনের অপেক্ষার পর পাওয়া একটুকরো নিশ্চিন্ত আশ্রয়। আলাদা হয়ে শাখা লজ্জায় মুখ ফিরিয়ে নিল। ফাইয়াজ মৃদু হেসে বলল,
"এবার কি আমাদের বাড়ির পরিকল্পনা শুরু করা যায়?"
শাখা তার বাহুতে হালকা চাপড় দিল।
"তুমি একেবারে অসভ্য হয়ে যাচ্ছো!"
"তবু ভালোবাসো।"
"সেটাই তো আমার সবচেয়ে বড় সমস্যা।"
ফাইয়াজ গলা খাকারি দিয়ে বলল
“আরেকটা চুমু খাব?”