সাহাবাদের মহলে সকাল থেকেই ব্যস্ততা। সুনেহেরার শরীর এখন আগের চেয়ে ভালো। হেকিমের দেওয়া ওষুধে বিষক্রিয়া অনেকটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে, তবে তাঁকে এখনো বিশ্রামে রাখা হয়েছে। মাহাদি এক মুহূর্তের জন্যও স্ত্রীর কাছ থেকে দূরে যেতে চাইছেন না।
এদিকে নায়েবকে বন্দি করে জিজ্ঞাসাবাদ চলছে। গতকাল নাসিরাবাদের শাহজাদা পরিচয়ে আসা যুবকটিকেও খুঁজে বের করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এখনো তার কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। সকালের দিকে বাইজিদ শাহের ব্যক্তিগত কক্ষে একটি চিঠি পৌঁছাল। চিঠির ওপর পরিচিত সিলমোহর। বাইজিদ চিঠিটি খুলে পড়লেন। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই তাঁর মুখের অভিব্যক্তি বদলে গেল।
চিঠি পড়া শেষ করে তিনি প্রহরীকে ডাকলেন।
"ইয়ামিনকে খবর পাঠাও। সে যেখানে থাকুক, তাকে আজই সাহাবাদে আসতে হবে।"
প্রহরী কুর্নিশ করে চলে গেল। বাইজিদ চিঠিটি আবার ভাঁজ করে টেবিলের ওপর রাখলেন। বণিকদের চিঠি। কিন্তু পরিবারের এমন ঘোর অসময়ে সে আলাদা করে বহিরাগত চাচ্ছে না। তার মনে একের পর এক প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। ফাইয়াজের কাছ থেকে বিষাক্ত কাঁটা সংগ্রহ করানোর বিষয়টি তিনি আগেই শুনেছেন। সেই কাঁটা সংগ্রহের পেছনে ইয়ামিনের নির্দেশ ছিল কি না, তা নিশ্চিত হওয়া দরকার। কারণ ফাইয়াজকে এত বিশ্বাস করা যাবে না।
গত কয়েক দিনের ঘটনাগুলো এমনিতেই স্বাভাবিক নেই। হারুণ ওয়াসেমের ষড়যন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের আবার মহলের আশপাশে দেখা যাচ্ছে। তার ওপর সুনেহেরার বিষক্রিয়া, নায়েবের পালানোর চেষ্টা এবং নাসিরাবাদের শাহজাদা পরিচয়ে আসা রহস্যময় যুবক, সবকিছু মিলিয়ে বাইজিদ আর কোনো বিষয় হালকাভাবে নিতে রাজি নন। তিনি জানালার বাইরে তাকিয়ে গম্ভীর কণ্ঠে বললেন,
"এবার সত্যিটা জানা দরকার। যে-ই হোক, কাউকে ছাড় দেওয়া যাবে না।"
দুপুরের দিকে সাহাবাদের প্রধান ফটকের সামনে ঘোড়ার খুরের শব্দ শোনা গেল। প্রহরীরা ফটক খুলে দিতেই ইয়ামিন ঘোড়া থেকে নেমে লাগামটি একজন সৈন্যের হাতে তুলে দিল। তার মুখে স্বাভাবিক গাম্ভীর্য। তবে মহলের পরিবেশ দেখে সে বুঝতে পারল, কোনো সাধারণ কারণে তাকে ডাকা হয়নি। একজন প্রহরী এগিয়ে এসে বলল,
"যুবরাজ, শাহ আপনাকে সভাকক্ষে যেতে বলেছেন।"
ইয়ামিন ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
"জ্বি। সকালেই চিঠি পাঠানো হয়েছিল। কি হয়েছে বলো তো"
“যান, গেলেই বুঝতে পারবেন”
ইয়ামিন আর কোনো প্রশ্ন না করে সভাকক্ষের দিকে এগিয়ে গেল। সেখানে প্রবেশ করতেই দেখতে পেল বাইজিদ শাহ আসনে বসে আছেন। তার ডান পাশে মেহেরুন্নেসা। কিছুটা দূরে শাখা ও জান্নাত দাঁড়িয়ে। ফাইয়াজও সেখানে উপস্থিত। তার মুখে চিন্তার ছাপ। ইয়ামিন সবার দিকে তাকিয়ে কুর্নিশ করল।
"জমিদার সাহেব, আমাকে ডেকেছেন?"
বাইজিদ সরাসরি প্রশ্ন করলেন,
"তুমি কি ফাইয়াজকে দিয়ে বিষাক্ত কাঁটা সংগ্রহ করিয়েছিলে?"
প্রশ্নটা শুনে ইয়ামিনের মুখে বিস্ময় ফুটে উঠল। সে একবার ফাইয়াজের দিকে তাকাল, তারপর বাইজিদের দিকে।
"জ্বি, আমি তাকে দিয়ে কাঁটা সংগ্রহ করিয়েছিলাম। কিন্তু কেন এই প্রশ্ন করছেন হঠাৎ?"
বাইজিদের কণ্ঠ আরও কঠোর হলো।
"কারণ সুনেহেরার শরীরে বিষক্রিয়া হয়েছে। হেকিমের ধারণা, সাপের বিষ কোনো মাধ্যমে তাঁর শরীরে প্রবেশ করানো হয়েছে। তার আগে ফাইয়াজের বিষাক্ত কাঁটা সংগ্রহের বিষয়টিও সামনে এসেছে। তাই তোমাকে জিজ্ঞাসা করা হচ্ছে।"
ইয়ামিন কিছুক্ষণ নীরব রইল। তারপর বলল,
"আমি কাঁটা সংগ্রহ করিয়েছিলাম, এটা সত্যি। কিন্তু শাহজাদি সুনেহেরার অসুস্থতার সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই।"
শাখা এবার কথা বলল।
"তাহলে কী কারণে কাঁটা সংগ্রহ করিয়েছিলেন?"
ইয়ামিন উত্তর দিল,
"বাঘ শিকারের জন্য। পাহাড়ের পাদদেশে কয়েকটি গ্রামে বাঘের আনাগোনা বেড়েছে। গবাদিপশু হারিয়ে যাচ্ছে, আর দুজন রাখালও আহত হয়েছে। বাঘটিকে ধরার পরিকল্পনা ছিল আমাদের। সেই কাজে কী কী প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে, তার হিসাবও আমার কাছে আছে।"
বাইজিদ সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকালেন।
"তুমি কি বুঝতে পারছ, এমন সময়ে বিষাক্ত কাঁটা সংগ্রহের কথা শুনলে কেন সন্দেহ তৈরি হবে?"
"বুঝতে পারছি, জনাব। তাই আমি আমার বক্তব্যের প্রমাণ দিতে পারি।"
ইয়ামিন কোমরের পাশের চামড়ার থলি থেকে কয়েকটি ভাঁজ করা কাগজ বের করল। কাগজগুলো সভাকক্ষের টেবিলে রেখে বলল,
"এগুলো পাহাড়ের গ্রামপ্রধানদের প্রতিবেদন। এখানে বাঘের আক্রমণের দিন, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের নাম এবং প্রহরীদের পাঠানো বার্তা রয়েছে। আর এই নথিতে শিকারি দলের প্রস্তুতির খসরা আছে। কাঁটা সংগ্রহের দায়িত্ব কেন দেওয়া হয়েছিল, সেটাও লেখা আছে।"
বাইজিদ কাগজগুলো তুলে দেখতে লাগলেন। শাখা এগিয়ে এসে কয়েকটি নথি পরীক্ষা করল। ফাইয়াজও নিজের বক্তব্যের সঙ্গে মিলিয়ে দেখার জন্য এগিয়ে এল। ইয়ামিন আরও বলল,
"কাঁটাগুলো সংগ্রহ করা হয়েছিল শিকারের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে। সেগুলো কোথায় রাখা হয়েছিল, কারা বহন করেছিল, সবকিছুর হিসাব আছে। প্রয়োজনে পাহাড়ের প্রহরী ও গ্রামপ্রধানদের ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারেন।"
শাখা নথিগুলো একবার দেখে বাইজিদের দিকে তাকাল।
"প্রতিবেদনগুলো সত্যি হলে আপাতত কাঁটা সংগ্রহের বিষয়টিকে মণি মার বিষক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত করার কারণ নেই। তবে এগুলো যাচাই করা উচিত।"
বাইজিদ মাথা নাড়লেন।
"অবশ্যই যাচাই করা হবে।"
ইয়ামিন শান্ত গলায় বলল,
"আমি চাই না, আমার কারণে নির্দোষ কেউ সন্দেহের মুখে পড়ুক। ফাইয়াজকে আমি যে কাজ দিয়েছিলাম, তার দায়িত্ব আমার। কিন্তু শাহজাদি সুনেহেরার ক্ষতির সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই।"
ফাইয়াজ এতক্ষণ চুপ করে ছিল। এবার সে বলল,
"আমি কাঁটা সংগ্রহ করেছি, কারণ যুবরাজ ইয়ামিন আমাকে সেই কাজের দায়িত্ব দিয়েছিল। কিন্তু শাহজাদি সুনেহেরার অসুস্থতার সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। আমি শুরু থেকেই সেই কথা বলছি।"
বাইজিদ ফাইয়াজের দিকে তাকালেন।
"তোমার বক্তব্যও তদন্তে বিবেচনা করা হবে। আপাতত তোমাকে নিয়ে আর কোনো সিদ্ধান্ত দেওয়া হচ্ছে না। তুমি যেতে পারো"
শাখা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। অন্তত এই মুহূর্তে ফাইয়াজের বিরুদ্ধে সন্দেহের একটি সূত্রের ব্যাখ্যা পাওয়া গেছে। তবে নায়েব এবং সাপের উল্কি আঁকা যুবকের রহস্য এখনো অমীমাংসিত।
ইয়ামিন সভাকক্ষ থেকে বের হওয়ার আগে জান্নাতের দিকে তাকাল। জান্নাত এতক্ষণ একটিও কথা বলেনি। তার চোখে অদ্ভুত এক গাম্ভীর্য। ইয়ামিন বুঝতে পারল, জান্নাতের সঙ্গে তার কথা বলা দরকার।
সভাকক্ষ থেকে বেরিয়ে ইয়ামিন করিডর পেরিয়ে বাগানের দিকে এগিয়ে গেল। কিছুক্ষণ পর জান্নাতও সেখানে এল। বাগানের একপাশে পুরোনো ঝরনার কাছে কয়েকটি গোলাপগাছ। দুপুরের আলো পাতার ফাঁক দিয়ে মাটিতে পড়েছে। দূরে পরিচারিকারা ফুলের গাছের পরিচর্যা করছে। সামনে ছোট টেবিলের ওপর কয়েকটি ফুল রাখা। সে ফুলগুলো আলাদা করে একটি পাত্রে সাজাচ্ছিল, কিন্তু মনটা কাজে ছিল না।
মণি মায়ের অসুস্থতা, নাসিরাবাদের সেই অচেনা যুবক আর মহলের ভেতরের ষড়যন্ত্র সবকিছু মিলিয়ে তার মাথায় অনেক প্রশ্ন ঘুরছে। এমন সময় পেছন থেকে পরিচিত কণ্ঠ ভেসে এল,
"এত মন দিয়ে কী দেখছ?"
জান্নাত চমকে পেছনে তাকাল। ইয়ামিন দাঁড়িয়ে আছে। তাকে দেখে জান্নাতের মুখে অনিচ্ছা সত্ত্বেও হাসি ফুটে উঠল।
"আপনি কখন এলেন?"
ইয়ামিন তার কাছে এগিয়ে এসে বলল,
"এই তো কিছুক্ষণ আগে। তোমার বাবার সঙ্গে দেখা করতে হয়েছিল।"
জান্নাত ফুলের পাত্রটা পাশে সরিয়ে রাখল।
"আব্বা কি আপনাকে কোনো কারণে ডেকেছেন?"
"কিছু প্রশ্ন ছিল। সেগুলোর উত্তর দিয়েছি।"
জান্নাত আর কিছু জিজ্ঞাসা করল না। ইয়ামিনও তাকে তদন্তের সব কথা তখনই বলতে চাইল না। কিছুক্ষণ তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। জান্নাত ভ্রু কুঁচকে বলল,
"কী হয়েছে? এভাবে তাকিয়ে আছেন কেন?"
ইয়ামিন মৃদু হেসে বলল,
"তোমাকে দেখছি। অনেক দিন ধরে একটা কথা বলব ভাবছি, কিন্তু বলা হয়ে উঠছে না।"
জান্নাতের বুকের ভেতর কেমন যেন লাগল।
"কী কথা?"
ইয়ামিন তার পাশের আসনে বসল।
"এখানে বসে বললে হবে না। আমার সঙ্গে একটু বাগানের ভেতরে হাঁটবে?"
জান্নাত চোখ নামিয়ে বলল,
"কেন? এখানে বললে কি সমস্যা?"
"সমস্যা না ঠিক তোমার সঙ্গে একটু নিরিবিলিতে সময় কাটাতে চাই।"
জান্নাতের গাল লাল হয়ে উঠল। সে ফুলের পাত্রটা ঠিক করতে করতে বলল,
"চলুন।"
দুজন পাশাপাশি বাগানের পথ ধরে হাঁটতে শুরু করল। দুপাশে গোলাপ আর বেলি ফুলের গাছ। বাতাসে ফুলের মিষ্টি গন্ধ। দূরে পরিচারকেরা বাগানের কাজ করছে, তবে এই দিকটায় লোকজনের আনাগোনা কম। ইয়ামিন কিছুক্ষণ নীরব থেকে বলল,
"জান্নাত, আমি আর তোমাকে ছাড়া থাকতে পারছি না।"
জান্নাতের পা থেমে গেল।
"ইয়ে মানে…?"
ইয়ামিন তার দিকে ফিরল।
"সত্যি। এতদিন নিজেকে বুঝিয়েছি, তোমার কাছাকাছি থাকলেই যথেষ্ট। তোমাকে দূর থেকে দেখলেও আমার চলবে। কিন্তু এখন বুঝতে পারছি, সেটা আমার পক্ষে আর সম্ভব নয়।"
জান্নাত চুপ করে রইল। ইয়ামিন আবার বলল,
"আমি তোমার সঙ্গে একটা জীবন চাই। এমন একটা জীবন, যেখানে দিনের শেষে তোমার কাছে ফিরে আসতে পারব। তোমার সঙ্গে নিজের সুখ-দুঃখ ভাগ করে নিতে পারব। তোমার রাগ, অভিমান, হাসি সবকিছুর অংশ হতে চাই। জান্নাত আমি তোমাকে নিজের কাছে চাই”
জান্নাতের চোখে লজ্জা
"আপনি আমাকে আগে তো কখনো বলেননি।"
ইয়ামিন মৃদু হেসে বলল,
"ধরে নাও আগে সাহস হয়নি"
কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর জান্নাতের চোখের দিকে তাকাল ইয়ামিন
"আমি তোমাকে আমার বউ করে নিতে চাই, জান্নাত।"
জান্নাতের গাল লাল হয়ে উঠল। সে দ্রুত অন্যদিকে তাকিয়ে ফেলল।
"আপনি... আপনি এসব কথা বলতে বাগানের মধ্যে নিয়ে এসেছেন?"
ইয়ামিন হেসে বলল,
"তাহলে কোথায় বলব? যুদ্ধের ময়দানে?"
জান্নাত তার বাহুতে হালকা চাপড় দিল।বচোখে লজ্জা, ঠোঁটে মৃদু হাসি।
"আপনি আমার বাবার কাছে প্রস্তাব রাখুন।"
ইয়ামিনের মুখের হাসি আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
"তার মানে তুমি রাজি?"
জান্নাত চোখ নামিয়ে বলল,
"আমি তো বলেছি, আব্বার কাছে প্রস্তাব রাখতে। এত কথা কেন বলছেন?"
ইয়ামিন হেসে ফেলল।
"ঠিক আছে। আমি আনুষ্ঠানিকভাবেই আসব। তোমার বাবার সামনে দাঁড়িয়ে তোমার হাত চাইব। তোমার পরিবারের সম্মান রেখেই তোমাকে নিজের জীবনে আনতে চাই।"
জান্নাত এবার ধীরে তার দিকে তাকাল।
"সত্যি আসবেন তো?"
ইয়ামিন গম্ভীর হয়ে বলল,
"কথা দিলাম। এবার আর শুধু তোমাকে দূর থেকে দেখে ফিরে যাব না। তোমার বাবার কাছ থেকে তোমাকে নিয়ে তবেই যাব।"
জান্নাত মৃদু স্বরে বলল,
"আমি অপেক্ষা করব।"
ইয়ামিন তার হাতটা ধরতে গিয়েও থামল। জান্নাত নিজেই হাত বাড়িয়ে দিলে সে আলতো করে তার হাত ধরল। কিছুক্ষণ দুজন নীরবে দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর জান্নাত বলল,
"চলুন, এবার মহলে ফিরি। কেউ দেখে ফেললে আবার কত প্রশ্ন করবে!"
ইয়ামিন মৃদু হেসে বলল,
"প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার অভ্যাস তো তোমার আমার দুজনেরই আছে।"
জান্নাত তার দিকে তাকিয়ে বলল,
"আপনি আগে আমার বাবার প্রশ্নগুলোর উত্তর ঠিকমতো দিন। তারপর আমার সঙ্গে কথা বলতে আসবেন। হুহহ আসছে"
ইয়ামিন হাসতে হাসতে তার সঙ্গে হাঁটতে শুরু করল।
"যেমন আদেশ, ভবিষ্যৎ বেগম সাহেবা!"
“যুবরাজ!"
"আচ্ছা, আর বলছি না!"
কিন্তু তার হাসি থামল না। জান্নাতও নিজের হাসি লুকাতে পারল না।
হারুণ ওয়াসেমের মৃত্যুর পর থেকে মেহরাবের জীবনে যেন সবকিছু এলোমেলো হয়ে গেছে। নানান বর্বরতা তাকে ভেতর থেকে ক্ষতবিক্ষত করেছে। তার ওপর সাহারার সঙ্গে সেই দিনের ঝগড়া। সাহারা তার বাবার অন্যায়ের বিচার চেয়েছিল। মেহরাব সেই কথা সহ্য করতে পারেনি। রাগের মাথায় সাহারাকে চড় মেরেছিল, আর সাহারাও তাকে পাল্টা চড় মেরে দিল। তারপর থেকে দুজনের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়েছে।
সাহারা নিজের কক্ষে বসে ছিল। জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকলেও তার মন অন্য কোথাও। মেহরাবের প্রতি রাগ এখনো আছে। রাগের আড়ালে জমে আছে কষ্টও। দরজায় মৃদু শব্দ হলো।
"ভেতরে আসব?"
সাহারা কণ্ঠটা চিনতে পারল।
"আসুন, যুবরাজ।"
মেহরাব দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করল। তার মুখে ক্লান্তি, চোখে অনিদ্রার ছাপ। কিছুক্ষণ সে সাহারার দিকে তাকিয়ে রইল, তারপর দরজার কাছেই দাঁড়িয়ে বলল,
"তোমার সঙ্গে কথা বলতে এসেছি, সারা।"
সাহারা তার দিকে তাকাল।
"হাহহ, বলুন কী কথা বলবেন?"
মেহরাব ধীরে তার কাছে এগিয়ে এল।
"সেদিন আমি যা করেছি, তার কোনো অজুহাত আমার কাছে নেই। আমি রাগ করেছিলাম, বাবার বিরুদ্ধে কোনো কথা শুনতে পারিনি আমি সারা। কিন্তু তাই বলে তোমার গায়ে হাত তোলার অধিকার আমার ছিল না।”
সাহারা চুপ করে রইল। মেহরাব আবার বলল,
"তুমি আমাকে পাল্টা চড় মেরেছিলে বলে আমি তোমার ওপর রাগ করেছিলাম। অথচ এখন বুঝতে পারছি, আমার আচরণের জন্য তোমার কাছে ক্ষমা চাওয়াটাই উচিত ছিল।"
সাহারার চোখে জল চিকচিক করল।
"আপনি আমার গায়ে হাত তুলেঋেন বলে আমার কোনো অভিযোগ নেই যুবরাজ। কিন্তু আপনি এমন ভাবে কথা বলছেন যেন আমি আপনার শত্রু।"
মেহরাব মাথা নিচু করল।
"আমি জানি। তখন নিজের কষ্ট ছাড়া আর কিছু দেখতে পাইনি। বাবাকে হারিয়েছি তো, তার বিরুদ্ধে এত অভিযোগ শুনেছি কিছুই মেনে নিতে পারছিলাম না।"
সাহারা ধীরে বলল,
"আমি আপনার বাবাকে ঘৃণা করতে চাইনি। আমি শুধু চেয়েছিলাম, সত্যিটা সামনে আসুক। মেহরাব তার দিকে তাকাল।
"তুমি ঠিক বলেছিলে, সারা। আমি তখন সেটা বুঝতে চাইনি।"
সাহারা চোখ মুছল।
"আপনি কি সত্যিই এখন সেটা বিশ্বাস করেন?"
"আমি এখনো সবকিছু মেনে নিতে পারিনি। বাবার বিরুদ্ধে প্রতিটি অভিযোগ সত্যি কি না, সেটা জানতে চাই। কিন্তু আমি আর সত্যের মুখোমুখি হওয়া থেকে পালাতে চাই না।"
সাহারা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তারপর ধীরে বলল,
"আমি আপনার পাশে থাকতে চাই, যুবরাজ। কিন্তু আপনার অন্যায়ের পাশে দাঁড়াতে পারব না।"
মেহরাব তার সামনে এসে দাঁড়াল।
"আমি তোমার কাছে সেটাই চাই না। আমি চাই, তুমি আমার পাশে থেকে আমাকে ভুল হলে বুঝিয়ে দেবে।"
সাহারার চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ল।
"আপনি আমাকে খুব কষ্ট দিয়েছেন।"
মেহরাবের গলাও ভারী হয়ে উঠল।
"জানি পাখি। আমাকে ক্ষমা করতে তোমার সময় লাগলেও আমি অপেক্ষা করব। আমি আর তোমার কাছ থেকে দূরে থাকতে চাই না।"
সাহারা কিছুক্ষণ তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ধীরে উঠে দাঁড়াল।
"আমি কিন্তু সেদিনের কথা ভুলিনি হু”
মেহরাব মাথা নাড়ল। সাহারা এক পা এগিয়ে এসে বলল,
"কিন্তু আমি এটাও চাই না, আমরা সারাজীবন এই অভিমান নিয়ে থাকি।"
মেহরাবের চোখে আশার আলো ফুটল।
"তাহলে কি আমাকে আরেকটা সুযোগ দেবে, সারা?"
সাহারা সরাসরি উত্তর দিল না। বরং ধীরে তার কাছে এগিয়ে এসে মাথাটা মেহরাবের বুকে রাখল। মেহরাব কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে রইল। তারপর সাবধানে তাকে জড়িয়ে ধরল। সাহারা চোখ বন্ধ করল। এতদিনের জমে থাকা অভিমান এক মুহূর্তে মুছে যায়নি, কিন্তু মেহরাবের এই অনুতপ্ত স্বীকারোক্তি তার মনের জমাট কষ্টটুকু একটু হলেও নরম করে দিল। মেহরাব নিচু গলায় বলল,
"আমি তোমাকে হারাতে চাই না।"
সাহারা তার বুকে মুখ রেখেই উত্তর দিল,
"তাহলে আমাকে আর কখনো এমনভাবে আঘাত করবেন না, যুবরাজ। প্রিয় জনের সামান্য আঘাতও পাহাড়সম”
দুপুরের দিকে প্রাসাদের ব্যস্ততা থেকে কিছুটা দূরে যাওয়ার প্রস্তাব দিল মেহরাব।
"সারা, আমার সঙ্গে একটু বাইরে যাবে?"
সাহারা তার দিকে তাকাল।
"কোথায়?"
"জঙ্গলের ভেতরে একটা জলাশয় আছে। ছোটবেলায় সেখানে গিয়েছিলাম। জায়গাটা নিরিবিলি। কিছুক্ষণ সেখানে বসে থাকতে চাই।"
সাহারা একটু ভেবে রাজি হলো। প্রয়োজনীয় নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে তারা প্রাসাদ থেকে বেরিয়ে গেল। কিছু দূর যাওয়ার পর ঘন গাছপালার মধ্যে দিয়ে সরু পথ ধরে এগোতে হলো। চারপাশে পাখির ডাক, পাতার মর্মর শব্দ আর দূরের ঝরনার আওয়াজ। একসময় গাছের ফাঁক দিয়ে জলাশয়টা দেখা গেল। স্বচ্ছ পানির চারপাশে উঁচু গাছ। রোদের আলো পাতার ফাঁক দিয়ে পানির ওপর পড়ছে। জায়গাটা শান্ত, যেন প্রাসাদের সমস্ত কোলাহল থেকে বহু দূরে।
সাহারা চারদিকে তাকিয়ে মুগ্ধ হয়ে বলল,
"জায়গাটা এত সুন্দর!"
মেহরাব তার পাশে এসে দাঁড়াল।
"তোমার ভালো লেগেছে?"
"হ্যাঁ। এখানে এলে মনে হয়, পৃথিবীর সব ঝামেলা কিছুক্ষণের জন্য ভুলে থাকা যায়।"
মেহরাব মৃদু হাসল।
"সেই জন্যই তোমাকে এখানে এনেছি।"
দুজন জলাশয়ের ধারের একটি পাথরের ওপর বসল। কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর মেহরাব সাহারার হাত ধরল।
"সারা, আমি চাই আমাদের মধ্যে আর কোনো কথা জমে না থাকুক। তোমার মনে যা আছে, আমাকে বলবে। আমি শুনব।"
সাহারা তার দিকে তাকাল।
"আপনিও আপনার কষ্টের কথা বলবেন। সবকিছু একা নিজের মধ্যে আটকে রাখবেন না।"
মেহরাব মাথা নাড়ল। কিছুক্ষণ পর তারা জলাশয়ের ধারে নেমে হাত-মুখ ধুল। ক্লান্তি আর দীর্ঘদিনের মানসিক চাপের মধ্যে ঠান্ডা পানির স্পর্শে দুজনেরই ভালো লাগল। সাহারা পানিতে হাত ডুবিয়ে মেহরাবের দিকে ছিটিয়ে দিল। মেহরাব অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল।
"এটা কী করলে?"
সাহারা হেসে বলল,
"আপনাকে একটু সতেজ করলাম, যুবরাজ!"
মেহরাবও পাল্টা পানির ছিটা দিল। সাহারা চমকে উঠে হেসে ফেলল।
"যুবরাজ!"
"তুমিই তো শুরু করেছ, এবার নাও!"
দুজনের হাসি জলাশয়ের শান্ত পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ল। দীর্ঘদিন পর সাহারাকে এমন প্রাণখোলা হাসতে দেখে মেহরাবের মুখেও স্বস্তির ছাপ ফুটে উঠল। কিছুক্ষণ পর সাহারা পানির ধারের পাথরে বসে পড়ল। মেহরাব তার পাশে এসে বসল। দুজনের কাঁধ পাশাপাশি ছুঁয়ে রইল। মেহরাব ধীরে তাকে নিজের কাছে টেনে নিল। সাহারা তার কাঁধে মাথা রাখল। জলাশয়ের ওপর বাতাস বয়ে গাছের পাতাগুলো মৃদু শব্দ করল। সাহারা নিচু গলায় বলল,
"এমন সময়গুলো যদি আমাদের জীবনে আরও বেশি থাকত!"
মেহরাব তার কপালের কাছে মুখ নামিয়ে বলল,
"আমরা চাইলে এমন সময় তৈরি করতেই পারি”
সাহারা তার হাতটা নিজের দুই হাতের মধ্যে নিল।
"শুনুন ভদ্রলোক, আমি আপনার কাছ থেকে নিখুঁত মানুষ হওয়ার প্রতিশ্রুতি চাই না। শুধু চাই, ভুল করলে সেটা স্বীকার করবেন।"
মেহরাব তার দিকে তাকিয়ে বলল,
"আমি সেই চেষ্টাই করব পাখি"
সাহারা তার কাঁধে মাথা রাখল। মেহরাব তাকে জড়িয়ে ধরে কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। তাদের মধ্যে জমে থাকা দূরত্বটা ধীরে ধীরে কমে আসছিল। কিছুক্ষণ পরেই তারা প্রাসাদে ফিরে এল। নিজেদের কক্ষে পৌঁছে দুজনই পোশাক বদলানোর প্রস্তুতি নিল। সাহারা পর্দা টেনে নিজের জন্য আলাদা জায়গা করে নিল, আর মেহরাব পাশের অংশে পোশাক বদলে নিল। এরপর দুজন আবার একই কক্ষে ফিরে এল।
সাহারা জানালার পাশে দাঁড়িয়ে চুল গুছিয়ে নিচ্ছিল। মেহরাব তার কাছে এসে থামল।
"সারা?"
"হু, যুবরাজ।"
"সোনাপাখি, আজকের দিনটা আমার খুব দরকার ছিল।"
সাহারা তার দিকে ফিরে তাকাল।
"আমারও।"
সে ধীরে সাহারাকে নিজের কাছে টেনে নিল। সাহারা তার বুকে মাথা রাখল। কিছুক্ষণ পর মুখ তুলে তার দিকে তাকাতেই মেহরাব আলতো করে তার কপালে চুমু খেল। সাহারা চোখ বন্ধ করে তার বুকে আরও একটু কাছে সরে এল। বাইরে সন্ধ্যা নেমে আসছিল। তারা নিজেদের অভিমান, কষ্ট আর ভালোবাসা ভুলে করে নতুন করে সম্পর্ক গড়ার সিদ্ধান্ত নিল