আমিরাবাদ মহলের পরিবেশ শান্ত ভীষণ। বিকেলের রোদ এসে পড়েছে মেঝের কারুকার্যখচিত গালিচায়। বাগানে মালি গোলাপগাছের শুকনো ডাল ছাঁটছে। মহলের ভেতরে পরিচারকদের আনাগোনা, প্রহরীদের হাঁটাচলা। কিন্তু প্রধান বৈঠককক্ষের ভেতরে কয়েক মুহূর্ত পরেই যে ঝড় উঠতে চলেছে, তার আঁচ কারও ছিল না। জানালার পাশে বসে ছিলেন আয়েশা বেগম। স্বামীর মৃত্যুর পর থেকে তাঁর মুখে যে বিষণ্নতা স্থায়ী হয়ে আছে, তা পুরোপুরি কাটেনি। তবু ছেলের পাশে দাঁড়িয়ে তাকে নতুন করে জীবন গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতে হচ্ছে। একটু দূরে বসে মেহরাব কিছু কাগজপত্র দেখছিল। তার ভিতর আগের মত চঞ্চলতা নেই, তবে সাহারার সঙ্গে সম্পর্কের বরফ গলতে শুরু করায় চোখেমুখে কিছুটা স্বস্তি ফিরেছে।
কক্ষের দরজায় হঠাৎ আলীরাজকে দেখা গেল।
সাধারণত সে ঘরে ঢোকার আগেই নিজের উপস্থিতি জানান দেয়। কিন্তু আজ সে চুপচাপ এসে দাঁড়াল দরজার কাছে। মুখের গাম্ভীর্য দেখে মেহরাব কাগজ থেকে চোখ তুলল।
“কী হয়েছে, মামা? মুখটা ওমন লাগছে কেন? দুঃসংবাদ দিও না দয়া করে! আর নিতে পারব না কিন্তু”
আলীরাজ এগিয়ে এসে আয়েশা বেগমের সামনে দাঁড়াল।
“আপা, তোমার সঙ্গে আমার জরুরি কথা আছে।”
আয়েশা বেগম ভ্রু কুঁচকে তাকালেন। ভাইয়ের মুখে এমন গাম্ভীর্য সচরাচর দেখেন না তিনি।
“কী হয়েছে, আলীরাজ? কোনো সমস্যা? শরীর টরীর খারাও করল?”
“সমস্যা কি না, সেটা তুমি বলবে। তবে সিদ্ধান্তটা আমি নিয়ে ফেলেছি।”
মেহরাব কাগজপত্র সরিয়ে রাখল। এবার তারও কৌতূহল হলো। আয়েশা বেগম বললেন,
“কী সিদ্ধান্ত?”
আলীরাজ গভীর শ্বাস নিল। কোনো ভূমিকা ছাড়াই বলল,
“আমি বিয়ে করতে চাই।”
কথাটা শোনামাত্র মেহরাবের হাত থেকে কাগজের কয়কেটা পাতা মেঝেতে পড়ে গেল। আয়েশা বেগম প্রথমে ভাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন, যেন কথাটার অর্থ বুঝতে তাঁর একটু সময় লাগছে। তারপর তিনি ধীরে বললেন,
“কী বললে?”
“আমি বিয়ে করতে চাই, আপা।”
“কাকে?”
এবার আলীরাজের চোখেমুখে এমন দৃঢ়তা দেখে মেহরাবের মনে অজানা আশঙ্কা জাগল। তার আশঙ্কাকে আরও ভয়াবহ রুপ দিতে আলীরাজ বলল
“তারাময়ীকে।”
আয়েশা বেগমের মুখের রং বদলে গেল।
“কী!”
তাঁর কণ্ঠ এতটাই তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল যে দরজার বাইরে দাঁড়ানো প্রহরীও চমকে ভেতরের দিকে তাকাল। মেহরাব কয়েক মুহূর্ত নির্বাক থাকার পর উঠে দাঁড়াল।
“মামা, তুমি তারাময়ীর কথা বলছ?”
“হ্যাঁ।”
“সেই তারাময়ী, যাকে নিয়ে এত কাণ্ড ঘটেছে? যে তোমাকে বনের পুকুরে টেনে নিয়ে গিয়েছিল হ’ত্যা করতে?”
“তোর স্মৃতিশক্তি ভালো, মেহরাব। হ্যাঁ, সেই তারাময়ী।”
আলীরাজের শান্ত উত্তর শুনে মেহরাবের বিস্ময় আরও বেড়ে গেল। আয়েশা বেগম এবার আসন ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন।
“তোমার মাথা ঠিক আছে তো, আলীরাজ? তুমি জানো, মেয়েটা কী ধরনের অপরাধের সঙ্গে জড়িত? তার পরিচয়, উদ্দেশ্য কিছুই তো আমরা পুরোপুরি জানি না! সে তোমাকে বিপদের মধ্যে ফেলেছে। তারপরও তুমি তাকে বিয়ে করতে চাও?”
“আমি জানি, আপা।”
“না, তুমি জানো না! জানলে এমন কথা মুখে আনতে পারতে না।”
আলীরাজ এবার বোনের চোখের দিকে তাকাল।
“আমি এটাও জানি, সে যা করেছে, তার জবাবদিহি তাকে করতে হবে। কিন্তু তার অপরাধের বিচার আর আমার মনের সিদ্ধান্ত, দুটোকে এক করে দেখো না।”
“মনের সিদ্ধান্ত!”
আয়েশা বেগমের কণ্ঠে অবিশ্বাস।
“একজন অপরাধীর প্রতি দুর্বলতা তৈরি হয়েছে বলে তাকে বিয়ে করে ফেলবে? তুমি কি ভেবেছ, বিয়ে করলেই তার সব অপরাধ মুছে যাবে?”
“আমি কখনো বলিনি, তার অপরাধ মুছে যাবে।”
“তাহলে?”
“তাহলে আমি চাই, সে নিজের অপরাধের জবাব দিক। বিচার হোক। আর…..”
আয়েশা বেগম ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তাঁর চোখে রাগের সঙ্গে ভয়ও কাজ করছে। ভাইয়ের জীবনে কোনো অজানা বিপদ আবার ফিরে আসুক, তা তিনি চান না।
“তুমি কি বুঝতে পারছ, কী চাইছ? মেয়েটি যদি তোমাকে ব্যবহার করে? যদি তোমার এই দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে পালিয়ে যায়? যদি তার পেছনে আরও বড় কোনো ষড়যন্ত্র থাকে?”
আলীরাজের মুখ এবার কিছুটা কঠিন হলো।
“তাহলে সেই সত্যের মুখোমুখি আমিই হব। কিন্তু ভয়ের কারণে নিজের সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারটুকু হারাতে চাই না।”
“তুমি নিজের সিদ্ধান্ত নাও, তাতে আমার আপত্তি নেই। কিন্তু এই সিদ্ধান্তে আমি কখনো সম্মতি দিতে পারব না।”
কথাটা বলে আয়েশা বেগম মুখ ফিরিয়ে নিলেন।
এতক্ষণ চুপ করে থাকা মেহরাব এবার এগিয়ে এল। সে মামার সামনে দাঁড়িয়ে বলল,
“দেখো, আমি তোমাকে আটকাতে চাই না। কিন্তু তোমার কাছে একটা প্রশ্ন আছে। তুমি কি বুঝে তারাময়ীকে বিশ্বাস করো?”
আলীরাজ উত্তর দিল না। তার মনে পড়ল সেই অন্ধকার জঙ্গল, আবছা ভেসে আসা নারীকণ্ঠ, পুকুরের কালো জল আর জ্ঞান হারানোর আগের মুহূর্তগুলো। তারাময়ীর চোখ তাকে ভীষণ ভাবপ আকৃষ্ট করেছে। সেই নারীকে সে এখনো পুরোপুরি বুঝতে পারেনি।
“আমি নিজেও তাকে পুরোপুরি বিশ্বাস করি না”
মেহরাব বিস্মিত হলো।
“তাহলে বিয়ে করতে চাও কেন?”
“ভালোবাসি তাই”
মেহরাব দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
“তোমার যুক্তির সঙ্গে তর্ক করা কঠিন। কিন্তু তোমার এই সিদ্ধান্তের পরিণতি যে কত দূর পর্যন্ত গড়াতে পারে, সেটা ভেবো।”
আলীরাজ মৃদু মাথা নাড়ল।
“ভেবেই বলছি।”
সাহারা ভেতরে প্রবেশ করল। মেহরাবের মুখের দিকে তাকাল, তারপর আয়েশা বেগমের উদ্বিগ্ন চেহারা দেখে বুঝতে পারল, বড় কোনো ঘটনা ঘটেছে।
“কী হয়েছে?”
মেহরাব তার দিকে তাকিয়ে বলল,
“তোমার মামাবাবু বিয়ে করতে চান।”
সাহারার মুখে স্বাভাবিক কৌতূহল ফুটে উঠল।
“বেশ তো। বিয়ে করতে চাইলে সমস্যা কোথায়?”
আলীরাজ তার দিকে তাকিয়ে বলল,
“সমস্যা হলো, পাত্রীকে তোমরা কেউ পছন্দ করবে না।”
সাহারা এবার পুরোপুরি মনোযোগী হলো।
“সে কি? কে তিনি?”
আলীরাজের উত্তর শুনে তার মুখের অভিব্যক্তি বদলে গেল।
“তারাময়ী!”
সাহারা হাতে থাকা শরবতের পাত্র নামিয়ে রেখে আলীরাজের সামনে গিয়ে দাঁড়াল
“মামাবাবু, আপনি তো জানেন, তারাময়ী একজন খুনী? সে অপরাধী। তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে তান্ত্রিকদলের লোক। যারা নিরীহ মানুষের ক্ষতি করে এসেছে এতকাল। সে আপনাকেও বিপদের মধ্যে ফেলেছে। আপনি কীভাবে তার সঙ্গে নিজের ভবিষ্যৎ জড়ানোর কথা ভাবছেন?”
আলীরাজের চোখে বিরক্তি আর ক্লান্তি ফুটে উঠল।
“তুমি যা বলছ, তার সবটাই আমি জানি, সারা।”
“জানেন বলেই তো আরও সাবধান হওয়া উচিত! কাউকে ভালো লাগতেই পারে, কিন্তু তার মানে এই নয় যে তার সব অন্ধকার দিক উপেক্ষা করে তাকে জীবনের সঙ্গী করে নিতে হবে।”
“আমি তার অন্ধকার দিক উপেক্ষা করছি না।”
“তাহলে কী করছেন?”
“তার সত্যটা জানতে চাইছি।”
সাহারা চিন্তিত ভঙ্গিতে বলল
“আমি চাই না, আপনি আবার কোনো বিপদে পড়ুন। তারাময়ী যদি সত্যিই অনুতপ্ত হয়, যদি নিজের অপরাধের দায় স্বীকার করে এবং বদলাতে চায়, তবে সেটা সময়ের সঙ্গে প্রমাণিত হোক। কিন্তু তার আগে বিয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া কি ঠিক হবে?”
আলীরাজ কিছুক্ষণ সাহারার দিকে তাকিয়ে রইল।
“তোমাদের কারও কাছেই আমি আজই বিয়ের অনুমতি চাইতে আসিনি। আমি শুধু আমার সিদ্ধান্তটা জানাতে এসেছি। তারাময়ীকে বিয়ে করতে চাই, এটাই সত্য। আর তার অপরাধের বিচার হবে কি না, সেটা তো আর আমার ইচ্ছায় বদলাবে না। তোমরা তার অপরাধ বিচার করো, শাস্তি দাও। তবে আমি ওই অপরাধীকেই ভালোবাসি”
আয়েশা বেগম তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ভাইয়ের দিকে তাকালেন।
“তুমি যদি এই পথেই এগোতে চাও, তবে অন্তত আমার একটা কথা মনে রেখো। আবেগের বশে এমন কিছু কোরো না, যার মাশুল তোমাকে সারাজীবন দিতে হয়।”
আলীরাজ মাথা নত করল। কিন্তু তার দৃঢ়তা দেখে বোঝা গেল, সিদ্ধান্ত থেকে তাকে সরানো সহজ হবে না। মেহরাব আর সাহারা একবার পরস্পরের দিকে তাকাল। দুজনের চোখেই একই প্রশ্ন তারাময়ীর সঙ্গে আলীরাজের এই অপ্রত্যাশিত সম্পর্ক শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে?
রাত নামছে সন্ধ্যা পেরিয়ে। অন্দরমহল নিস্তব্ধ। আলীরাজের ঘোষণার রেশ তখনো কাটেনি। কেউ বিষয়টিকে নিছক আবেগ বলে উড়িয়ে দিতে পারছিল না, আবার তার সিদ্ধান্ত মেনে নিতেও পারছিল না। মেহরাব নিজের কক্ষের বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল। আকাশে বড় করে চাঁদ উঠেছে। দূরের মিনারের মাথায় পাখিরা ফিরছে আপন নীড়ে। পেছন থেকে পায়ের শব্দ শুনে সে ঘুরে তাকাল।
“ভাইজান? এসো”
ইয়ামিনেরও মুখটা ভাড়। দেখে মনে হচ্ছে সেও কোনো আতঙ্কের সংবাদ দেবে। মেহরাব ভ্রু তুলে বলল,
“কী ব্যাপার? তোমার মুখ দেখে মনে হচ্ছে তুমিও কোনো রাজ্য উল্টে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে এসেছ!”
ইয়ামিন হালকা হাসল।
“রাজ্য উল্টে দেওয়ার ইচ্ছা নেই। তবে ইচ্ছে একটা আছে”
“কী ইচ্ছে? শুনি তবে”
ইয়ামিন কিছুক্ষণ নীরব থেকে বলল,
“আমি জান্নাতকে বিয়ে করতে চাই।”
মেহরাবের মুখের হাসি মিলিয়ে গেল। সে কয়েক মুহূর্ত ইয়ামিনের দিকে তাকিয়ে থেকে ফের হো হো হেসে উঠল।
“আচ্ছাআআআআ, তাহলে কাহিনী এটাই?”
ইয়ামিনের মুখে মৃদু লজ্জা ফুটে উঠল।
“তুই হাসছিস কেন?”
“হাসব না তো কী করব? তুমি এত বড় বড় কথা বলতে পারো অথচ জান্নাতের বাবার কাছে বিয়ের প্রস্তাব পাঠানোর কথা ভেবেই তোমার মুখের অবস্থা দেখার মতো হবে!”
“সেই জন্যই তো তোর কাছে এসেছি। সাহাবাদে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পাঠাতে হবে। বাইজিদ শাহের অনুমতি ছাড়া আমি জান্নাতকে বিয়ে করার কথা ভাবতেও পারব না। এ ভাই, মেহু, অ্যাই মেহু। দেখ না বিষয়টা লক্ষীটি। তোরই তো শ্বশুর”
মেহরাবের হাসি এবার কিছুটা স্তিমিত হলো। সে ইয়ামিনের মুখের দিকে তাকিয়ে বলল,
“তুমি তো জানো, বাইজিদ শাহ শুধু একজন বাবা নন, তিনি একজন শাসকও। তোমার অতীত, তোমার শিক্ষা, তোমার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সবকিছুই তিনি জানতে চাইবেন।”
“জানি।”
“আর জান্নাতকে তিনি কতটা ভালোবাসেন, সেটা তোমার অজানা নয়।”
“সেটাও জানি।”
“তাহলে প্রস্তুত থেকো। তিনি প্রশ্ন করলে কোনো কিছু লুকাবে না।”
ইয়ামিন দৃঢ়ভাবে মাথা নাড়ল।
“জান্নাতের কাছে যেমন সত্য লুকাতে চাই না, তার বাবার কাছেও লুকাব না।”
মেহরাব এগিয়ে এসে তার কাঁধে হাত রাখল।
“তাহলে যাও। আমার পক্ষ থেকে তোমার জন্য শুভকামনা রইল। তবে একটা কথা জান্নাতের দজ্জাল বোনকে আগে বলো যাও।”
ইয়ামিন হেসে বলল,
“আমার বোনকে আমি তোকে বলার আগেই বলেছি”
“বাহহহ, আমাকে কেউ দাম টাম দেয় নাকি?”
দুজনের হাসিতে বারান্দা মুখরিত।
পরদিন সকালে মহলের ছোট বৈঠককক্ষে রাজপরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। আয়েশা বেগম, মেহরাব, সাহারা এবং আলীরাজ সেখানে ছিলেন। আগের দিনের ঘটনায় আয়েশা বেগমের মন এখনো ভারী। আলীরাজও নিজের সিদ্ধান্ত নিয়ে অনড়, যদিও বোনের উদ্বেগকে সে একেবারে অগ্রাহ্য করেনি। আলোচনা চলছিল রাজ্যের প্রশাসনিক কাজ নিয়ে। ঠিক তখনই ইয়ামিন কক্ষে প্রবেশ করল। মেহরাব তাকে দেখে বলল,
“এসো, ভাইজান। তোমার জন্যই যেন সবাই অপেক্ষা করছিল!”
ইয়ামিন তার কথার জবাব না দিয়ে প্রথমে আয়েশা বেগমকে সম্মান জানাল। তারপর মেহরাবের দিকে তাকিয়ে বলল,
“সবার সামনে একটা কথা জানাতে চাই।”
সাহারা চুপচাপ তার মুখের দিকে তাকাল। ইয়ামিন বলল,
“আমি সাহাবাদের বড় শাহজাদি জান্নাতকে বিয়ে করতে চাই। তার প্রতি আমার অনুভূতি সাময়িক নয়। আমি তাকে সম্মান করি, তার পাশে থাকতে চাই। তাই গোপনে কিছু না করে আনুষ্ঠানিকভাবে বাইজিদ শাহের কাছে প্রস্তাব পাঠাতে চাই।”
আয়েশা বেগম বিস্ময়ে তাকিয়ে রইলেন। আলীরাজের মুখেও অবাক হওয়ার ছাপ। মেহরাব কথাটা আগে থেকেই জানত, তবু প্রকাশ্যে শুনে তার চোখে আনন্দের ঝিলিক দেখা গেল।
“বাহহ ভাইজান, তোমরা তো দেখছি সত্যিই একের পর এক চমক দিয়ে যাচ্ছ!”
ইয়ামিন শান্ত কণ্ঠে বলল,
“এটা চমক দেওয়ার জন্য করছি না, মেহরাব। আমি জান্নাতকে আমার জীবনের অংশ করতে চাই। এতে তার বাবার সম্মতি আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ।”
আয়েশা বেগম বললেন,
“তুমি কি সব ভেবে সিদ্ধান্ত নিয়েছ?”
“জি, আম্মা”
আলীরাজ পাশে দাঁড়িয়ে মৃদু হেসে বলল, “আজকাল দেখছি, সবাই বিয়ের কথা ভাবছে। আমার ভাগ্নে, আমার পরিচিত মানুষ সবাই সংসারী হয়ে উঠতে চাইছে। শুধু আমার ভাগ্যটাই যে কোন দিকে গড়ায়, তা আল্লাহই জানেন!”
মেহরাব সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল,
“মামা, তুমি তো গতকালই তোমার ভাগ্য নির্ধারণ করে ফেলেছ। অন্যদের ভাগ্য নিয়ে ভেবে তোমার কাজ নেই বুঝলে!”
সবাই টুকটাক কথা বললেও শুধু সাহারা চুপ করে ছিল। মেহরাব সেটা লক্ষ করে জিজ্ঞেস করল,
“সারা, তুমি এমন চুপ করে আছ কেন? ভাইজানের কথা শুনে তোমার অবাক লাগছে না?”
সাহারা মৃদু হাসল।
“না, যুবরাজ। আমি আগেই কিছুটা আঁচ করেছিলাম।”
ইয়ামিন এবার সত্যিই অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল।
মেহরাব হেসে বলল,
“তাহলে আমাদের সবার আগে সারা-ই খবরটা জেনে বসে ছিল!”
সাহারা মাথা নাড়ল।
“জানতাম না। শুধু অনুমান করেছিলাম। আর আজ ভাইজান নিজেই বলে দিল।”
আয়েশা বেগম এবার ইয়ামিনের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“তাহলে আর দেরি করার দরকার নেই। সাহাবাদে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পাঠানো হোক। তবে মনে রেখো, বাইজিদ শাহ’র সব প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য প্রস্তুত থেকো।”
ইয়ামিন সম্মান জানিয়ে মাথা নত করল।
“আমি প্রস্তুত, আম্মা।”
মেহরাব তার দিকে তাকিয়ে বলল,
“তাহলে এবার আমরা ভাই ভাই থেকে ভায়রাভাই হবো”
******
সাহাবাদের জমিদার প্রাসাদের দরবারকক্ষে বেশ ব্যস্ততা। বাইজিদ শাহ সিংহাসনসদৃশ উঁচু আসনে বসে রাজ্যের কয়েকটি নথি দেখছিলেন। পাশে ছিলেন মেহেরুন্নেসা। দরবারের এক পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন মাহাদি ইকরাম, আর একটু দূরে শাখা ও ফাইয়াজ নাসিরাবাদের পুনর্গঠনের কিছু হিসাব নিয়ে আলোচনা করছিল। এমন সময় আমিরাবাদ থেকে আগত দূত দরবারে প্রবেশের অনুমতি চাইল।
অনুমতি পেয়ে সে সামনে এসে কুর্নিশ করল।
“সাহাবাদের মহামান্য শাসক, আমিরাবাদের পক্ষ থেকে আপনার জন্য একটি আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব নিয়ে এসেছি।”
বাইজিদ শাহ নথি থেকে চোখ তুলে তাকালেন।
“বলুন।”
দূত বিনীত কণ্ঠে জানাল,
“আমিরাবাদের যুবরাজ ইয়ামিন সাহাবাদের রাজকন্যা জান্নাতের প্রতি তাঁর বিবাহের ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন। তিনি আপনার সম্মতি ও আশীর্বাদ প্রার্থনা করছেন। তার পক্ষ থেকে এই প্রস্তাব আনুষ্ঠানিকভাবে পেশ করা হলো।”
কথাটা শোনামাত্র দরবারে মৃদু গুঞ্জন উঠল।
মেহেরুন্নেসার চোখে বিস্ময়ের সঙ্গে আনন্দের আভা দেখা দিল। তার মেয়ের জীবনে এমন একটি সিদ্ধান্তের মুহূর্ত আসবে, তা তিনি ভেবেছিলেন, কিন্তু ইয়ামিনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব এত দ্রুত আসবে, সেটা হয়তো ভাবেননি। মুয়াজ যেটা করেছে তারপর মেহেরুন্নেসা মেয়ের বিয়ে নিয়ে ভীষণ আশাহত হয়েছিল। শাখা ফাইয়াজের দিকে একবার তাকাল। ফাইয়াজের মুখেও বিস্ময়।
বাইজিদ শাহ দূতের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“আমরা প্রস্তাব পেয়েছি। তবে বিবাহের সিদ্ধান্ত আমরা সময় নিয়ে জানাতে চাই। ইয়ামিনের সম্পর্কে আমরা জানতে চাই।
দূত মাথা নত করল।
“মহামান্য, তাঁর শিক্ষার বিবরণ, দায়িত্ব পালনের নথি এবং তাঁর কাজের সাক্ষ্য নিয়ে আমরা প্রস্তুত আছি। ইয়ামিন নিজেও আপনার সামনে উপস্থিত হয়ে সব প্রশ্নের উত্তর দিতে চান।”
বাইজিদ শাহের দৃষ্টি কিছুটা গভীর হলো।
“তাহলে তাকে আসতে বলুন। আমি নিজেই তাঁর সঙ্গে কথা বলতে চাই।”
দূত সম্মতি জানিয়ে চলে গেল। মেহেরুন্নেসা স্বামীর দিকে তাকিয়ে মৃদু স্বরে বললেন,
“জান্নাতের মুখে ইয়ামিনের কথা শুনেছি। মেয়েটা তাকে বিশ্বাস করে। তবে আপনার সিদ্ধান্তই শেষ কথা।”
বাইজিদ শাহ স্ত্রীর দিকে তাকালেন।
“আমি জান্নাতের পছন্দকে অবহেলা করব না, মেহের। কিন্তু একজন বাবা হিসেবে তার ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার দায়িত্বও আমার।”
মেহেরুন্নেসা মাথা নাড়লেন।
“আমি শুধু চাই, আমাদের মেয়েটা ভালো থাকুক।”
“আমিও তাই চাই।”