কেটে গেছে একটা মাস। সাহাবাদ রাজপ্রাসাদ আজ যেন রূপকথার কোনো রাজ্যে পরিণত হয়েছে। প্রাসাদের প্রবেশদ্বার থেকে শুরু করে অন্দরমহলের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত সাজসজ্জার আভিজাত্যে চোখ ফেরানো দায়। সাদা পাথরের স্তম্ভে জড়িয়ে দেওয়া হয়েছে গাঢ় লাল ও সোনালি রঙের রেশমি কাপড়। স্তম্ভের মাথায় ঝুলছে কাচের তৈরি নকশাদার প্রদীপ, আর তার ভেতরে জ্বলতে থাকা মৃদু আলো পুরো প্রাঙ্গণকে সোনালি আভায় ভরিয়ে তুলেছে। প্রাসাদের বিশাল উঠোনে সাদা ও লাল গোলাপের পাপড়ি ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। মাঝখানের ফোয়ারাটিকে ঘিরে সাজানো হয়েছে রজনীগন্ধা, জুঁই ও সাদা গোলাপের মালা। পানির ওপর ভাসছে কয়েকটি ছোট প্রদীপ। বাতাসে আতরের মৃদু সুবাস, ফুলের গন্ধ আর মানুষের আনন্দমিশ্রিত কণ্ঠস্বর একাকার হয়ে আছে।
দরবারকক্ষের প্রবেশপথে সূক্ষ্ম কারুকার্যখচিত সোনালি তোরণ বসানো হয়েছে। তোরণের দুই পাশে দাঁড়িয়ে আছে রাজকীয় পোশাকে সজ্জিত প্রহরীরা। ভেতরের বিশাল হলঘরের ছাদ থেকে নেমে এসেছে স্ফটিকের ঝাড়বাতি। আলো পড়ে তার প্রতিটি কাচের টুকরোয় বিচিত্র রঙের ঝিলিক তৈরি হচ্ছে। হলঘরের এক পাশে অতিথিদের বসার ব্যবস্থা। অন্য পাশে পর্দা দিয়ে পৃথক করা হয়েছে নারীদের আসর। মাঝখানে রাখা হয়েছে বিবাহের আনুষ্ঠানিকতার জন্য সাজানো আসন। আসনটির পেছনে সাদা রেশমের পর্দার ওপর লাল গোলাপের নকশা, আর দুই পাশে রুপালি পাত্রে সাজানো তাজা ফুল।
আজ সাহাবাদের দুই শাহজাদি জান্নাত ও শাখার বিয়ে। একই দিনে, একই প্রাসাদে, দুই ভিন্ন স্বপ্নের পূর্ণতা আজ। অন্দরমহলের পূর্ব দিকের কক্ষে বসে আছে জান্নাত। তার পরনে গাঢ় লাল রেশমের রাজকীয় বিয়ের পোশাক। পোশাকের জমিনজুড়ে সোনালি সুতোয় ফুটিয়ে তোলা হয়েছে সূক্ষ্ম লতাপাতার নকশা। হাতার প্রান্তে মুক্তার কাজ, আর ওড়নার চারদিকে সোনালি জরির কারুকাজ। মাথার ওপর আলতো করে টেনে দেওয়া ওড়নাটি তার কপালের দুই পাশ ছুঁয়ে কাঁধ বেয়ে নেমে এসেছে। গলায় পরানো হয়েছে জমিদার পরিবারের ঐতিহ্যবাহী সোনার হার। কানে ঝুলছে মুক্তা ও পান্নার দুল। হাতে সোনালি চুড়ির সঙ্গে লাল পাথর বসানো বালা। কপালে ছোট্ট একটা টিকলি। কোনো ভারী অলংকার নেই। তার স্বাভাবিক সৌন্দর্যের সঙ্গে মানানসই করে সাজানো হয়েছে তাকে। জান্নাতের পাশে বসে মেহেরুন্নেসা নূর বারবার চোখ মুছছে। মায়ের চোখের পানি দেখে জান্নাতও চোখের পানি আটকাতে পারে না। মেহেরুন্নেসা মেয়ের কান্না দেখে বলে
“কী হলো, আম্মাজান?”
জান্নাত মায়ের হাত ধরে ফেলল।
“তোমাকে ছেড়ে কতদূরে চলে যাচ্ছি আম্মা”
“অ্যাই বোকা মেয়ে। নতুন সংসার, নতুন মানুষ, নতুন দায়িত্ব সবকিছুর মধ্যে আমাদের কথা মনেই পড়বে না দেখবি”
মেহেরুন্নেসা নূর মেয়ের কপালে চুমু দিলেন। তাঁর চোখের কোণে জল জমে উঠল।
“আল্লাহ তোকে সুখী করুন, মা। তোর স্বামী যেন তোকে সম্মান করে, আর তুইও যেন তার জীবনের শান্তি হয়ে উঠিস।”
জান্নাত মায়ের বুকে মুখ লুকিয়ে ফেলল।
“আমার জন্য দোয়া রাখো আম্মা।”
“সব সময়।”
কক্ষের দরজার কাছে দাঁড়িয়ে থাকা সুনেহেরা দৃশ্যটি দেখে এগিয়ে এলল। তাঁর পরনে সবুজ রেশমি পোশাক, গলায় সোনার হার। জান্নাতের থুতনি আলতো করে তুলে বললেন,
“এই যে আমার রাজকন্যা, এত কান্নাকাটি করলে কিন্তু সাজ নষ্ট হয়ে যাবে!”
জান্নাত চোখ মুছে হেসে ফেলল।
“মণি মা, তুমিও শুরু করলে?”
“আজকের দিনটা হাসিমুখে কাটাও। তোমার বাবা যদি তোমাকে এভাবে কাঁদতে দেখেন, তাহলে বরকে ফিরিয়ে দেওয়ার কথা ভাববেন!”
কথাটা শুনে মেহেরুন্নেসাও হেসে উঠলেন।
কিন্তু হাসির আড়ালেও তার বুকের ভেতর জমে উঠছে বিদায়ের কষ্ট।
অন্যদিকে প্রাসাদের অপর দিকের কক্ষে শাখা প্রস্তুত হচ্ছিল। তার পরনে মেরুন রঙের রাজকীয় পোশাক। পোশাকের ওপর সোনালি সুতোয় তৈরি হয়েছে সূক্ষ্ম নকশা, তবে জান্নাতের পোশাকের মতো ভারী নয়। শাখার স্বভাবের সঙ্গে মিল রেখে সাজটি রাখা হয়েছে আভিজাত্যপূর্ণ, চলাফেরার উপযোগী। বলা যায় না এ মেয়ে বিয়ে ছেড়ে না যুদ্ধ করতে লেগে পরে। মাথার ওপর ওড়না, কানে সোনার দুল, গলায় সরু হার আর হাতে কয়েকটি বালা। তার দীর্ঘ চুল সুন্দর করে গুছিয়ে বাঁধা হয়েছে। মুখে মৃদু প্রসাধন, চোখে কাজল। যুদ্ধক্ষেত্রে তলোয়ার হাতে যে নারীকে সবাই দেখেছে, আজ সে বউ সেজেছে।
এক পরিচারিকা তার ওড়নার প্রান্ত ঠিক করে দিতে দিতে বলল,
“শাহজাদি, আজ আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে কোনো চিত্রকর রাজকীয় ছবির জন্য আপনাকে এঁকেছেন।”
শাখা ভ্রু তুলে তাকাল।
“তুমি কি আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করছ?”
“আল্লাহর কসম, না, শাহজাদি! আপনি আজ সত্যিই অপরূপা।”
শাখা ঠোঁটের কোণে হাসি লুকিয়ে বলল,
“তাহলে আশা করি, বর মহাশয়েরও চোখে পড়বে।”
সুনেহেরা হেসে উঠল।
“চোখে পড়বে না মানে? ফাইয়াজ তো তোমাকে দেখে কথা বলার ভাষাই হারিয়ে ফেলবে!”
শাখা এবার লজ্জা পেয়ে চোখ নামিয়ে নিল। সুনেহেরা তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিল।
“অনেক লড়াই করেছ, শাখা। এবার নিজের জন্যও একটু সুখ বেছে নাও। সংসার মানে তোমার স্বপ্ন ছেড়ে দেওয়া নয়। তবে ফাইয়াজ তোমার স্বপ্নের পথে তোমার হাত ধরে হাঁটবে। একজন মানুষকে তুমি শুধরে নিয়েছো। এই তোমার জীবনের সবচে বড় প্রাপ্তি।”
“আমি সেটাই চাই।”
“সুখী হ মা। তোর পিতা নেওয়াজে আবিদ ছিলেন একজন সৎ মানুষ। তুই ও তারই মতন হ”
শাখা মাথা নাড়ল। তার মনে পড়ল নাসিরাবাদের পশ্চিম বারান্দা, ফাইয়াজের সঙ্গে ছোট্ট একটি বাড়ির স্বপ্ন, জানালার পাশে গোলাপগাছ আর দিনের শেষে দুজনের একসঙ্গে ফিরে আসার কল্পনা। সেই ছোট্ট চুম্বনটাও মনে পড়ল। আজ সেই স্বপ্নের প্রথম দরজাটি খুলতে চলেছে।
*****
বিকেলের আলো প্রাসাদের উঁচু জানালা দিয়ে হলঘরে এসে পড়ল, অতিথিদের আসন প্রায় পূর্ণ। সাহাবাদ ও আশপাশের রাজ্য থেকে আগত অভিজাত ব্যক্তিরা উপস্থিত হয়েছেন। তবে আয়োজনের জাঁকজমকের মধ্যেও বিবাহের মূল আনুষ্ঠানিকতায় কোনো অপ্রয়োজনীয়তা রাখা হয়নি। বাইজিদ শাহ সাদা ও সোনালি রঙের রাজকীয় পোশাকে দরবারকক্ষে প্রবেশ করলেন। কাঁধে লাল চাদর, মাথায় পাগড়ি। মুখে শাসকের গাম্ভীর্য থাকলেও চোখল আবেগ। মাহাদি ইকরাম তাঁর পাশে এসে দাঁড়ালেন।
“শাহজাদা, আপনাকে বেশ ভালো দেখাচ্ছে”
বাইজিদ শাহ মৃদু হাসলেন।
“আজ বুঝলাম মাহাদি। মেয়েকে নিজের হাত থেকে বিদায় দেওয়ার জন্য মনকে প্রস্তুত করা কতটা কঠিন।”
মাহাদি তার কাঁধে হাত রাখলেন।
“মেয়েরা জন্মায়ই দূরে যাবার জন্য।”
বাইজিদ শাহ উত্তর দিলেন না। তাঁর দৃষ্টি চলে গেল হলঘরের প্রবেশপথের দিকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ইয়ামিন ও ফাইয়াজকে নিয়ে আসা হলো।
ইয়ামিনের পরনে সাদা রেশমি শেরওয়ানি, তার ওপর হালকা সোনালি কাজ করা লম্বা বাহারি পোশাক। কোমরে সরু অলংকৃত তলোয়ার, মাথায় সাদা পাগড়ি। পোশাকের আভিজাত্যের চেয়ে তার মুখের গাম্ভীর্যই বেশি চোখে পড়ছিল। জীবনের বহু কঠিন পথ পেরিয়ে আজ সে একটি নতুন দায়িত্ব গ্রহণ করতে এসেছে।
ফাইয়াজের পোশাক ছিল গাঢ় কালো ও মেরুনের মিশ্রণে তৈরি পোশাক। কাঁধে মেরুন চাদর, বুকে সূক্ষ্ম সোনালি নকশা। তার চোখের গভীরে লুকানো উত্তেজনা বোঝা যাচ্ছিল। দুজনকে পৃথক আসনে বসানো হলো। বিবাহের জন্য উপস্থিত ছিলেন একজন সম্মানিত কাজি। ইসলামি শরিয়াহ অনুযায়ী বিবাহের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার জন্য সাক্ষীরা নির্ধারিত স্থানে বসলেন। উভয় কনের সম্মতি নিশ্চিত করা হলো। মোহরানা নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে আগে থেকেই আলোচনা সম্পন্ন ছিল। কাজি প্রথমে ইয়ামিনের কাছে জান্নাতের সঙ্গে বিবাহের প্রস্তাব পেশ করলেন।
“ইয়ামিন, আপনি কি নির্ধারিত মোহরানার বিনিময়ে জমিদার বাইজিদ শাহ। এর জেষ্ঠ কন্যাকে বিবাহ করতে সম্মত?”
ইয়ামিন স্পষ্ট করে বলল
“জি, আমি সম্মত।”
সাক্ষীদের উপস্থিতিতে ইজাব-কবুল সম্পন্ন হলো। কনের সম্মতি নিশ্চিত হওয়ার পর কাজি বিবাহ সম্পন্ন হওয়ার ঘোষণা দিলেন।
হলঘরের এক পাশে অপেক্ষমাণ নারীদের মধ্যে মৃদু আনন্দের সাড়া উঠল। মেহেরুন্নেসা নূর চোখ মুছলেন। বাইজিদ শাহ চোখ বন্ধ করে এক মুহূর্তের জন্য আল্লাহর কাছে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলেন। এরপর একই নিয়মে ফাইয়াজ ও শাখার বিবাহের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হলো।
কাজি ফাইয়াজের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন,
“ফাইয়াজ, আপনি কি নির্ধারিত মোহরানার বিনিময়ে নেওয়াজে আবিদ এর একমাত্র কন্যা শাখা নেওয়াজের সম্মতিতে তাঁর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে রাজি?”
ফাইয়াজ দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
“জি, আমি রাজি।”
সাক্ষীদের উপস্থিতিতে ইজাব-কবুল সম্পন্ন হলো। শাখার সম্মতিও নিশ্চিত হওয়ার পর কাজি তাঁদের বিবাহ সম্পন্ন হওয়ার ঘোষণা দিলেন।
কাজি নবদম্পতিদের জন্য দোয়া করলেন। উপস্থিত সবাইও তাঁদের সুখী জীবনের জন্য দোয়া করলেন। আনুষ্ঠানিকতা শেষে বাইজিদ শাহ উঠে দাঁড়ালেন।
“আজ আমার দুই কন্যা নতুন জীবনের পথে পা রাখল। আমি আল্লাহর কাছে দোয়া করি, তাঁদের সংসারে যেন ভালোবাসা, সম্মান, ধৈর্য ও শান্তি থাকে। তারা যেন একে অপরের জন্য রহমত হয়ে ওঠে, আর তাদের ঘর যেন কখনো অন্যায়ের আশ্রয় না হয়।”
মেহেরুন্নেসা নূর স্বামীর পাশে দাঁড়ালেন। তাঁর চোখে জল, কিন্তু মুখে প্রশান্তির হাসি।
বিবাহের আনুষ্ঠানিকতা শেষে নবদম্পতিদের জন্য নির্ধারিত কক্ষে যাওয়ার আগে শাখা কিছুক্ষণের জন্য ফাইয়াজের পাশে দাঁড়ানোর সুযোগ পেল।
চারপাশে অতিথিদের আনাগোনা। দূরে পরিচারকেরা খাবারের ব্যবস্থা করছে, আর হলঘরের অন্য প্রান্তে আত্মীয়স্বজন নবদম্পতিদের অভিনন্দন জানাচ্ছেন। ফাইয়াজ একটু ঝুঁকে শাখার কানে কানে বলল,
“একটা খবর আছে।”
শাখা তার দিকে তাকাল।
“কী খবর?”
“মণি মাকল যারা বিষ দিয়েছিল, তাদের ভবলীলা সাঙ্গ করে দিয়েছি”
শাখা চোখ পাকিয়ে তাকালো
“ভালো হন জনাব। এখন কিন্তু আৃার স্বামী আপনি”
ফাইয়াজ মৃদু হাসল।
“এবার পুরোনো দুঃস্বপ্ন নিয়ে পড়ে থাকার দিন শেষ, শাখা। এবার চুটিয়ে সংসার করার পালা।”
শাখা তার দিকে তাকিয়ে রইল। ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠলেও চোখে লজ্জার আভা ছড়িয়ে পড়ল।
“আহারে, আপনি যে খুব সংসারী মানুষ হয়ে উঠেছেন, তা তো দেখছি!”
ফাইয়াজ হেসে বলল,
“তোমার সঙ্গে সংসার করতে হলে সংসারী হতেই হবে। তবে একটা শর্ত আছে।”
“কী শর্ত?”
“আমাদের বাড়ির বাগানে গোলাপ লাগানোর দায়িত্ব তোমার। আমি কাজ থেকে ফিরে পানি দেব।”
শাখা হেসে ফেলল।
“আর যদি গোলাপ না ফোটে?”
“সবাই আমাদলর দেখছে”
শাখা চারদিকে তাকিয়ে থেকে মৃদু স্বরে বলল,
“তাহলে আমাদের বাড়িটা সত্যিই হবে।”
ফাইয়াজের মুখের হাসি কোমল হয়ে এল।
“হবে। আর সেই বাড়িতে তোমার স্বপ্নের জন্য যতটা জায়গা দরকার, তার সবটুকু আমি করব”
রাত নামার আগেই বিবাহের আসর আবারও অতিথিদের কোলাহলে ভরে উঠল। বাইজিদ শাহ কিছুক্ষণের জন্য সবার কাছ থেকে সরে এসে প্রাসাদের পুরোনো বারান্দায় দাঁড়ালেন। এই বারান্দা থেকেই তিনি একদিন প্রথম জান্নাতকে কোলে নিয়েছিলেন। সেদিনের কথা মনে পড়তেই তার চোখের সামনে ভেসে উঠল বহু বছরের পুরোনো এক দৃশ্য। জান্নাতের জন্মের পর তাকে প্রথমবার কোলে নিয়েছিল সুমেহেরা, তারপর বাইজিদ। ছোট্ট শিশুটি চোখ মেলে চারপাশ দেখছিল। তার ক্ষুদ্র হাতের আঙুলগুলো বাইজিদ শাহের আঙুল আকড়ে ধরেছিল। সেই ছোট্ট মুঠোয় যেন তিনি নিজের সমস্ত পৃথিবী খুঁজে পেয়েছিলেন। ছোট্ট জান্নাত দৌড়ে এসে তাঁর কোলে উঠত। মনে হত সব সুখ এখানেই নিহিত। আর আজ? আজ সেই মেয়েই নিজের সংসারে চলে যাচ্ছে। বাইজিদ শাহ বারান্দার রেলিংয়ে হাত রাখলেন। তাঁর চোখ ঝাপসা হয়ে এল। পেছন থেকে মেহেরুন্নেসার কণ্ঠ ভেসে এল,
“এখানে একা দাঁড়িয়ে আছেন কেন?”
বাইজিদ শাহ চোখ মুছে স্ত্রীর দিকে তাকালেন।
“জান্নাতের কথা মনে পড়ছিল।”
মেহেরুন্নেসা তার পাশে এসে দাঁড়ালেন।
“আমারও।”
“বাইজিদ শাহ দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
“আমি ভেবেছিলাম, ওকে বিদায় দেওয়ার সময় নিজেকে শক্ত রাখব। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, আমার ছোট্ট মেয়েটা যেন এক মুহূর্তেই বড় হয়ে গেল।”
মেহেরুন্নেসা তার হাত ধরল।
“মেয়েরা বড় হয়, শাহজাদা। কিন্তু বাবার কাছে তারা ছোটই থেকে যায়।”
বাইজিদ শাহ স্ত্রীর হাত শক্ত করে ধরলেন।
“ইয়ামিনকে আমি বিশ্বাস করেছি। ওর মধ্যে দায়িত্ববোধ আছে। তবু মনে হচ্ছে, জান্নাতকে আমার কাছ থেকে অনেক দূরে পাঠিয়ে দিচ্ছি।”
“দূরত্ব বাড়বে, কিন্তু সম্পর্ক কমবে না। জান্নাত আপনার মেয়ে ছিল, আছে, থাকবে। আর শাখাও তো আমাদের ছেড়ে যাচ্ছে না; সে নাসিরাবাদে নিজের স্বপ্ন গড়বে।”
বাইজিদ শাহ ধীরে মাথা নাড়লেন।
“আল্লাহ যেন ওদের সুখী রাখেন।”
“আমিন।”
“বাবা মা ছাড়া বড় হওয়া আমার শাখা টা যেন অনেক বেশি সুখী হয় মেহের। ওর মধ্যে আমি আমার রত্নাকে দেখতে পাই”
সাহাবাদ রাজপ্রাসাদের প্রধান ফটকের সামনে দুটি পৃথক যাত্রার আয়োজন করা হয়েছে। আমিরাবাদের উদ্দেশে রওনা হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল জান্নাত ও ইয়ামিন। অন্যদিকে নাসিরাবাদের পথে যাত্রার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিল শাখা ও ফাইয়াজ। জান্নাতের গাড়িটি সাদা ও লাল ফুল দিয়ে সাজানো হয়েছে। জানালার পাশে বসে সে শেষবারের মতো প্রাসাদের দিকে তাকাল। যে উঠোনে তার শৈশব কেটেছে, যে বারান্দায় বাবার হাত ধরে হাঁটতে শিখেছে, যে বাগানে সাহারার সঙ্গে অসংখ্য বিকেল কাটিয়েছে সবকিছু আজ যেন অন্য রকম লাগছে। ইয়ামিন তার পাশে এসে দাঁড়াল।
“মন খারাপ?”
জান্নাত চোখ ফিরিয়ে তার দিকে তাকাল।
“বাবা-মাকে ছেড়ে যেতে কষ্ট হচ্ছে।”
ইয়ামিন নরম কণ্ঠে বলল,
“যখন ইচ্ছে হবে, আমরা সাহাবাদে আসব। তাছাড়া সারা কে তো পাচ্ছই সব সময়। জান্নাত মৃদু হাসল।
“আপনি কথা দিলেন?”
“কথা দিলাম।”
শাখা প্রাসাদের সিঁড়ির কাছে দাঁড়িয়ে মেহেরুন্নেসার সঙ্গে কথা বলছিল। তার চোখেও বিদায়ের বিষাদ, তবুও বকবক করে যাচ্ছে এই করবে সেই করবে। খাবার, দাওয়াই এ যেন সময় ঠিক থাকে। কোনো সমস্যা হলে যেন খবর পাঠায়।
মেহেরুন্নেসা মেয়েকে বুকে টেনে নিলেন।
“এত কেন ভাবছিস মা? তুই নিজের খেয়াল রাখিস। আর প্রতি সপ্তাহে এসে দেখা করবি বড় মায়ের সাথে। মনে থাকবে?”
“হু!”
কান্নায় শাখার গলা জড়িয়ে আসে। প্রাসাদের ফটকের সামনে দাঁড়িয়ে বাইজিদ শাহ অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইলেন। যতক্ষণ পর্যন্ত গাড়ি দুটি দৃষ্টির বাইরে চলে গেল, ততক্ষণ তাঁর পা যেন মাটি ছেড়ে নড়তে চাইল না। মেহেরুন্নেসা এসে তার পাশে দাঁড়াল।
“চলুন, শাহজাদা। ওরা নতুন জীবনের পথে যাচ্ছে।”
বাইজিদ শাহ স্ত্রীর দিকে তাকালেন।
“হ্যাঁ। আমাদের ছোট্ট মেয়েরা আজ বড় হয়ে গেছে।”
দুটি কন্যা চলে গেছে দুটি নতুন ঠিকানায়। পেছনে রয়ে গেছে শৈশবের স্মৃতি, বাবা-মায়ের দোয়া আর একটি প্রাসাদের নীরব অপেক্ষা। রক্তমুকুটের সুখের অধ্যায় শুরু।