ফন্ট সাইজ:
থিম:
বধূ কোন আলো লাগল চোখে ২

পর্ব 3

লেখক: ইসরাত ইতি

#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_৩ [ সারপ্রাইজ পর্ব ]
#ইসরাত_ইতি

🚫কঠোর ভাবে প্রাপ্তমনস্কদের জন্য।

🚫শিক্ষা ও সাহিত্যের সাথে আমার এই কল্পিত ঘটনাগুলোর লিখিত শব্দগুলোর কোনো সম্পৃক্ততা নেই।

কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ 🚫

ভেতরের মিটিং রুম থেকে দলের ছেলেরা উঁকি দিয়ে দেখার চেষ্টা করছে। কোন মেয়ে এসেছে এই সময়ে ভাইয়ের কাছে !

অফিসে ঢুকে প্রেরণা সরাসরি ইহান তাজওয়ারের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। না তার চিনতে ভুল হয়নি,সরাসরি না দেখলেও লোকটাকে সামাজিক গনমাধ্যমে প্রতিদিন দেখে।

ইহান তাজওয়ার কিছুটা অবাক চোখেই তাকিয়ে আছে। একটা জিনিস তার খুব অদ্ভুত লাগছে। তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ভদ্রমহিলার চোখের মণি সমুদ্রনীল। এতক্ষণ মনিটরে খেয়াল করেনি। কোনো বাঙালি মেয়ের এমন সমুদ্রের মতো নীল চোখ ইহান তাজওয়ার এর আগে দেখেনি।

শুরুতেই প্রেরণা বিনয়ের সহিত সালাম দেয় ইহানকে।

ইহান তাজওয়ার দ্বিতীয় দফায় স্বাভাবিক দৃষ্টি দিয়ে প্রেরনাকে দেখে নিরেট,ভারী স্বরে বলে ওঠে,“ওয়ালাইকুমুস সালাম। বসুন।”

প্রেরনা তার ডানপাশে রাখা চেয়ারটা টেনে বসে। সরাসরি তাকায় ইহান তাজওয়ারের চোখের দিকে। কয়েক মুহূর্ত পলক ফেলে প্রেরনাকে বেশ ভালো করে পর্যবেক্ষন করে নেয় ইহান। খুব সম্ভবত মেয়েটি বয়সচোরা,তাই সঠিক বয়স ইহান অনুমান করতে পারছে না। হতে পারে চব্বিশ কি ছাব্বিশ আবার এও হতে পারে উনত্রিশ কি ত্রিশ!

“আপনার পরিচয়?”
ভারী স্বর জিজ্ঞেস করে প্রেরণাকে।

_আমি প্রেরণা। প্রেরণা আহসান। কাজীপাড়া রোডে থাকি।

_হ্যা , তো বলুন আপনাকে কিভাবে সাহায্য করতে পারি!

_আমি এসেছি বিচার নিয়ে।
অবিচল তাকিয়ে আছে প্রেরণা।

_বিচার?
ইহান তাজওয়ার ভ্রু-কুঞ্চিত করে।

প্রেরনা অচপল কন্ঠে বলতে থাকে,“জি!”

_কার নামে?

_আপনার ভাই ইরফান মির্জার নামে।
শান্ত স্বরে বলে ওঠে প্রেরণা।

ইহান তাজওয়ার মির্জা খানিকটা চ'মকায়। কিন্তু তার মুখভঙ্গি স্বাভাবিক। প্রেরণা নামের ভদ্রমহিলা তার চোখের দিকেই তাকিয়ে আছে। তার দৃষ্টি শান্ত, অনমনীয়!

★★★

অবশিষ্ট দু'টো পেইনকিলার পাতা থেকেই খসিয়ে নিয়ে পাতাটাকে বিনে ছুঁ'ড়ে মারে ইরফান।
হাত বাড়িয়ে ওয়াটার বোতল উঠিয়ে পেইন কিলার দুটো খেয়ে নেয়। রাতে বিশেষ অনুভব করেনি ব্যাথাটা,এসেই ঘুমিয়ে পরেছে। কিন্তু এখন ব্যথাটা বেশ বেড়েছে। আয়নার সামনে গিয়ে নিজের মুখটাকে দেখতে থাকে ইরফান মির্জা। মুহুর্তেই মাথায় র'ক্ত উঠে যায়। এরপর ঐ প্রিতমকে সামনে পেলে মে'রেই দেবে। একটুও ভাববে না সে।
স্বভাবে মোটেও স্থির নয় মির্জা বাড়ির ছোটো ছেলে এই ইরফান মির্জা, শরীরে আঘাত নিয়েও অস্থির হয়ে পায়চারি করছে যেনো অদৃশ্য কোন বস্তুর সাথে শ্যাডো বক্সিং করে যাচ্ছে!

“ইরফান ওপেন দ্যা ডোর!”
আলো দরজায় টোকা দেয়। ইরফান নাক থেকে হাত সরিয়ে তার উন্মুক্ত শরীর ঢাকতে একটা টাওয়েল তুলে কাঁধে ঝুলিয়ে নেয়। সে শুধুমাত্র একটা থ্রি-কোয়ার্টার প্যান্ট পরে আছে।

একটা টিস্যু পেপার দিয়ে নাক চেপে ধরে গিয়ে দরজা খুলে দেয়।
দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে আলো এবং রিতু। আলোর হাতে একটা ফার্স্ট এইড বক্স।
সে শান্ত চোখে ইরফানকে দেখে, পরপর বলে ওঠে,“নাক থেকে হাত সরাও!”

ইরফান বাধ্য ছেলের মতো নাক থেকে হাত টা সরিয়ে নেয়। আলো আর রিতু ঘরের ভেতরে ঢোকে। ইরফানকে একটা চেয়ার টেনে বসার নির্দেশ দিয়ে আলো ফার্স্ট এইড বক্স খুলতে খুলতে বলতে থাকে,“ছাব্বিশ বছরের একজন পুরুষ তুমি। তোমার এই বয়সে তোমার পাপা এক বাচ্চার বাবা ছিলো, বিজনেস সামলেছে। ইরফান তোমার মনে হয় না তোমার এখন বড় হওয়া উচিত?”

ইরফান বড়মায়ের কথায় কোন জবাব দেয়না। শুধু বসে আছে চুপচাপ। ব'লিষ্ঠ হাত দু'টো মুষ্টিবদ্ধ করা। আলো বলতে থাকে,“সমস্যা কি ঐ ছেলেটির সাথে তোমার? পরিষ্কার করে বলো তো!”

মেডিসিনে তুলো ভিজিয়ে ক্ষ'তস্থানে চেপে ধরতে ইহান মৃদু আর্তনাদ করে ওঠে, পরক্ষনেই যন্ত্রনাটুকু গিলে নেয়, দাঁতে দাঁত চেপে।

হুমায়রা রিতু জা'য়ের পেছনে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে। আলো ওয়ান টাইম ব্যান্ডেজ ইরফানের মুখমণ্ডলের বিভিন্ন স্থানে লাগিয়ে দিয়ে বলতে থাকে,“তোমার বড় বাবা তোমাকে অ্যাংগার ম্যানেজমেন্ট ক্লাবের মেম্বার বানিয়ে দেবেন। নিজেকে শুধরে নাও। লাইফলেস হয়ে থেকো না।”

ইরফান চেয়ারে ঠেসেই বসে থাকে। বড় মায়ের কড়া কথা সে হজম করে নেয়। কখনও বেয়াদবি করে না বড় মায়ের সাথে।

ঘরের বাইরে থেকে উঁকি দিচ্ছিলো ইনশিরাহ আর ইনায়া। আলো আর রিতু বেরিয়ে যায়।

ইনশিরাহ আর ইনায়া দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ইরফানের ফুখের দিকে তাকিয়ে থাকে।

ইরফান দুবোনকে দেখে মুখে চ বর্গীয় শব্দ করে বলে,“তোরাও জ্ঞান দিবি? আয় দিয়ে যা?”

ইনশিরাহ ঘরের বাইরে দাঁড়িয়েই বলতে থাকে,“তুই নাক ফাটিয়ে আসিস কেনো দুদিন পর পর। এমনিতেই তো তুই কালোমানিক! তারপর চেহারার এই দশা হলে কেউ দেবে তোকে মেয়ে?”

ইনায়া বোনের কথায় হাসি চে'পে রাখে,আর যাই হোক মেজো দাদানের সামনে হাসা যাবে না!

ইরফান ইনশিরাহকে বলে,“আমি কালো? তুই কি? তোর গায়ের রং খুব ভালো? আর বাই দ্য ওয়ে,তুই আমাকে তুই তোকারি করিস কেন! তোর থেকে আমি দেড় বছরের বড়।"

ইনশিরাহ মুখ বেঁকিয়ে ভেংচি কেটে বলে,“তোর থেকে বেশি ম্যাচুরিটি আছে আমার মধ্যে। আর তুই, এই তোর জামা নেই? এতো ব্র্যান্ড দেখে কিনিস সবসময়, এমন থাকিস কেন? তোর দানবের মতো বডি দেখতে ইচ্ছুক নয় বাড়ির আয়ারা। প্লিজ শরীর ঢেকে ডাইনিংয়ে যাস। আর এই বডি দিয়ে কি করবি? মেয়েরা বডি দেখে পটে নারে আজকাল। সেন্স অব হিউমার দেখে ‌। ওটা তোর নেই। মাথা ভর্তি টগবগ করছে শুধু মেজাজ।”

ইনায়া এইবার হেসে ফেলে।

_চল যা! গেট লস্ট।
ইরফান ধ'ম'কে ওঠে ইনশিরাহকে। ইনশিরাহ গায়ে না মেখে চলে যায়। ইরফান ইনায়ার দিকে অগ্নিদৃষ্টি দিতেই ইনায়া ফাটা বেলুনের মতো চুপসে যায়। ইরফান ধ'ম'ক দিয়ে বলে,“এদিকে আয়!”

_কেন দাদান!

_তোকে একটা চ'ড় মারবো,হাত নিশপিশ করছে।
বরফ ঠাণ্ডা গলায় বলে ইরফান।

ইনায়া আঁতকে উঠে দুই গাল চেপে ধরে একটা ঢোক গিলে ছুটে ইরফানের ঘর থেকে বেরিয়ে যায়।

বোনের বোকা বোকা আচরণে ইরফান কিছুক্ষণ হেসে নেয়। পুনরায় তার চোখ মুখ কঠিন হয়ে যায়। মাথায় একটাই কথা ঘুরপাক খাচ্ছে,“ঐ প্রিতমের একটা ব্যবস্থা করতেই হবে!”

★★★

“আমার ভাইয়ের নামে নালিশ?”
খানিকটা অবাক হয়েই ইহান প্রশ্নটি করে প্রেরণাকে। ভেতরের মিটিং রুম থেকে দলের ছেলেরা এসে দাঁড়ায়। তারাও রীতিমতো অবাক।

প্রেরণা জবাব দেয়,“জি!”

ইহান তাজওয়ার নড়চড়ে বসে। মেয়েটির কথা বলার ধরন কাঠ কাঠ, অথচ কন্ঠ সুমিষ্ট ভীষণ।

প্রেরনা বলতে থাকে,“আপনার ভাই ইরফান মির্জা আমার ভাইয়ের গায়ে হাত তুলেছে। এবং বিষয়টা এই প্রথম ঘটেছে তেমন নয়। এর আগেও অনেকবার হয়েছে।”

ইহান তাজওয়ার চুপ করে শুনছিলো প্রেরনার কথা, প্রেরনা থেমে যেতেই ইহান তাজওয়ার বলে ওঠে,“আপনার ভাই? সে কোথায়?”

_আমার ভাই প্রিতম! আপনার ভাইয়ের কাছে জিজ্ঞেস করলেই বলে দেবে। তাকে আনিনি। বিষয়টা আপনার নজরে দিয়ে গেলাম। ভাইকে বোঝাবেন। যদিও আমার ভাই পাল্টা আঘাত করেছে, কিন্তু সেটা আত্মরক্ষার জন্য। আমি আমার ভাইয়ের আইন হাতে তুলে নেওয়াকে সমর্থন করছি না। আপনি আপনার ভাইকে সামলে রাখুন,এবার থানাপুলিশ করিনি কারন থানাপুলিশ করে আদৌও কোনো লাভ হবে বলে আমি মনে করছি না। কিন্তু পরের বার এমন হলে বিষয়টা হয়তো আপনার ভাইয়ের জন্য ভালো হবে না।

কথাগুলো খুবই ঠাণ্ডা মাথায়, ধীরে ধীরে শেষ করে প্রেরনা। ইহান তাজওয়ার বিস্ময়ে বাক হারিয়ে স্থির দৃষ্টিতে তার সামনে বসে থাকা ছোটোখাটো দেখতে ভদ্রমহিলার দিকে তাকিয়ে আছে।

দলের ছেলেগুলোর চোয়াল ঝুলে যায়। হা হয়ে সবাই একবার ইহান তাজওয়ার এবং প্রেরনার দিকে তাকায়।

প্রেরনা দম নিয়ে পুনরায় বলে,“আসছি। আসসালামুয়ালাইকুম।”

ইহান তাজওয়ার কোন জবাব না দিয়ে মাথা নে'ড়ে সালাম গ্রহণ করে। প্রেরনা তার অফিসের দরজার বাইরে পা রাখতেই দলের সাধারণ সম্পাদক আপন বলে ওঠে,“ভাই! এ তো ঠান্ডা মাথায় হুমকি দিয়ে গেলো! সিরিয়াসলি এটা হুমকি ছিলো?”

ইহান তাজওয়ারের দৃষ্টি টেবিলের ওপর রাখা মনিটরে নিবদ্ধ। প্রেরনা স্কুটার স্টার্ট করে চলে যেতেই সে নাহিদকে বলে ওঠে,“ভদ্রমহিলার হাসবেন্ড কি করেন? ডিটেইলস দে!”

নাহিদ ঘা'ড় চুলকে বলে,“হাসবেন্ড? ভাই যতদূর জানি উনি বিধবা।”

ইহান তাজওয়ার নাহিদের মুখের দিকে তাকায়। অস্ফুটে বলে ওঠে,“বিধবা!”

দলের সহ সাধারণ সম্পাদক মাহিন বলে ওঠে,“চিনি আমি ওনাকে। ওনার রেস্তোরাঁয় আসা যাওয়া লেগে থাকে আমার। খুব জেদী আর একরোখা ভদ্রমহিলা। মেয়ে লোকের এতো তেজ থাকতে হয়না।”

ইহান তাজওয়ার মাহিনের দিকে তাকিয়ে বলে,“এটা ভুল কথা। তেজ জেদ শুধু মেয়েদের না, কারো থাকা উচিৎ নয় যদি সেটা খারাপ হয়। আর যদি ভালো হয়,তবে থাকতে হয়। মেয়েদেরও তেজ জেদ দু'টোই থাকতে হয়!”

★★★

“রিতু তুমি কিচেনে যাও। বাড়ির রান্নার তদারকি করো। আমি ওদিকটা দেখছি,খাসি গুলো লিস্ট অনুযায়ী এতিমখানা গুলোতে পাঠিয়ে দিই।”

আলো রিতুকে তাড়া দেয়। হুমায়রা রিতু অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে হাঁটছিলো। বড় জায়ের কথায় হুশে ফিরে জবাব দেয়,“হু। কি বললে ভাবী?”

আলো মেজো জা'য়ের দিকে তাকিয়ে বলে,“কি ভাবছিস এতো!”

_ছোটো ছেলেটা এমন হলো কেন? ও কি শোধরাবে না? এতো রাগ, মেজাজ হলে চলে? আমার ইহান তো এমন নয়!

আলো হাসে, তারপর বলে,“এমন বলো না। ছেলেটা বদরাগী হলেও লক্ষি আমার!”

_তুমি তো ওর বাপ চাচাদের মতো সবসময় ওকে লাই দাও।

আলো হেসে বলে,“চলো তাহলে এক কাজ করি। ইহানকে রেখে ওকে বিয়ে করিয়ে দিই। বৌ আসলে যদি সে শোধরাতে পারে।”

রিতু মুখ অন্ধকার করে বলে,“হু। আমার মতো কোনো হুমায়রা রিতুকে পাও কি না দেখো গরীব ঘরের। তার জীবনটা তেজপাতা বানিয়ে দেবে তোমার এই গুণধর লক্ষি ছেলে।”

_এভাবে বলছো কেন! ইরফান একজন চমৎকার হাজবেন্ড হবে দেখো,ওর বাবা চাচাদের মতো। আগে ইহানের বিয়েটা দেই। তারপরই ওর জন্য মেয়ে দেখা শুরু করবো।

হুমায়রা রিতু বিড়বিড় করে বলে,“হু দেখা যাক কি হয়।”

_টেনশন করো না রিতু। একটু শুধু মেজাজী ছেলেটা। এর বেশি বাড়াবাড়ি কিছুই হবে না।

★★★

“স্বাদে-আহ্লাদে”

শহরের অত্যন্ত প্রসিদ্ধ একটি রেস্তোরাঁ। শহরের মাঝামাঝি অবস্থানে অবস্থিত এই রেস্তোরাঁটি অন্যান্য রেস্তোরাঁ গুলোর তুলনায় ব্যপক জনপ্রিয়।
এছাড়াও শহরের ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলো কাছাকাছি হওয়ায় এখানেই কাস্টমার ভিড় জমায় বেশি। “স্বাদে আহ্লাদের” আশেপাশে রয়েছে দায়রা আদালত, ডি'সি অফিস, এবং বিভিন্ন সরকারি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান,কর্মজীবীরা তাদের ব্যস্তজীবনে দুপুরের খাবারের জন্য এই রেস্তোরাঁকে চোখ বুজে ভরসা করে।

স্বাদে আহ্লাদে থেকেই জেলার বয়েজ স্কুল,গার্লস স্কুল এবং অন্যান্য সরকারি প্রতিষ্ঠান গুলো তাদের টিফিন অর্ডার দিয়ে থাকে।
এই সেবা প্রতিষ্ঠানে মোট তেরো জন শেফ এবং আঠাশ জন কর্মচারী কাজ করে।
চার বছর আগে প্রেরণা আহসান নামের ভদ্রমহিলা নিজস্ব অর্থায়নে রেস্তোরাঁর দালানটি ভাড়া নেয়,সেই থেকেই বেশ রমরমা চলছে এই রেস্তোরাঁ। প্রতিদিন দুপুরের মিল এবং বিকেল এবং সন্ধ্যার নাস্তা তৈরি করে স্বাদে-আহ্লাদে।

আইনজীবী থেকে শুরু করে বিভিন্ন শ্রেনীর কর্মজীবী মানুষ এখানেই ছু'টে আসে। আজ বারে রবিবার। আজ ব্যস্ততা একটু বেশিই থাকবে।

প্রেরনা স্বাদে-আহ্লাদের সামনে স্কুটার দাড় করিয়ে ত্রস্ত পায়ে ছুটে যায় ভেতরে। বেলা এগারোটা বেজে গিয়েছে, বারোটা থেকে মিল টাইম শুরু হয়, একঘন্টায় সে সর্বোচ্চ এক পদের ইন্সট্রাকশন দিতে পারবে।

হন্তদন্ত বিশালাকার কিচেনে ঢুকে তার কেবিনেট খুলে কিচেন এপ্রোন গাঁয়ে চাপিয়ে, নেটক্যাপ পরে নেয় প্রেরণা। হাতে গ্লাভস পরতে পরতে তার সহকারী শেফ আফ্রাকে বলে,"সরষে রেডি?"

_ইয়েস ম্যাম, আড়াইশো গ্রাম।

প্রেরনা বিরক্ত হয়,চ বর্গীয় শব্দ করে বলে,“হোয়্যাট ইজ দিস আফ্রা! তোমাকে বারবার বলেছি পাঁচশ গ্রামের কথা। আচ্ছা এখন অবধি উপকরণের পরিমান সম্পর্কে কোনো ধারণা নিতে পারলে না! এভাবে চলে? যাও আরো আড়াইশো গ্রাম রেডি করে ফেলো। আর দুভাগ করে একভাগ মাছ এটাতে মেরিনেট করো। আর সাব্বিরকে ডাকো,আজ ফিশমার্কেট থেকে যে মাছগুলো পাঠালাম রেস্তোরাঁয় তার লিস্ট নিয়ে আমার কাছে আসতে বলো। অর্ডারি রিপোর্ট গুলোও চাই।

আফ্রা মাথা নে'ড়ে চলে যায়।

প্রেরনা ঘুরে ঘুরে সব চেক করে চিকেনের পাতিলের কাছে যেতেই ঘা'ড় ঘুরিয়ে একজন শেফকে বলে,“চিকেন কে করেছে?”

শেফ সারা ঘাড় চুলকে বলে ওঠে,“আমি ম্যাম।”

_হলুদের গুঁড়াটা ঠিকঠাক দিতে পারোনি। তরকারীর রং আসেনি।

সারা লজ্জিত ভঙ্গিতে হাসে ‌। এমন সময় সাব্বির এসে কিচেনের দরজায় দাঁড়িয়ে বলে,“ম্যাম আসবো।”

“হু এসো। বলো। বিল কতো হয়েছে?”

_ম্যাম সাড়ে চার হাজার।

_ওকে। লিস্ট টা ক্যাশ কাউন্টারে রাখো আমি দেখবো। স্কুলের টিফিন পাঠিয়েছো?

_ইয়েস ম্যাম। তবে আজ একটু প্রবলেম হয়েছিলো।

_কি?

_গার্লস স্কুল থেকে সিঙাড়ার অর্ডার ছিলো আর বয়েজ স্কুল থেকে পেটিসের। ওলোটপালোট করে পাঠিয়ে দিয়েছিলাম। পরে অবশ্য ম্যানেজ করেছি।

প্রেরনা বিরক্ত ভঙ্গিতে বলে,“তোমাদের দিয়ে যদি একটা কাজও ঠিকঠাক হয়! আমি যেদিকে যাবো না সেদিকেই গোলমাল বাধাবে। আচ্ছা যাও,আমি আসছি।”

সাব্বির চলে যায়। প্রেরনা ঘ'ড়িতে সময় দেখে,বেলা সাড়ে এগারোটা বেজে গিয়েছে। শুদ্ধর স্কুল ছুটির সময় হয়ে গিয়েছে।

সে তড়িঘড়ি করে হাত থেকে গ্লাভস খুলে ভ্যানিটি ব্যাগ থেকে ফোনটা বের করে প্রিতমের ফোনে ফোন লাগায়।

ওপাশ থেকে প্রিতম ফোনটা রিসিভ করেই বলে ওঠে,“হ্যা আপু বলো। সব ঠিকঠাক?”

_হু। আচ্ছা তুই কি করছিস?

_লোগো তৈরি করছিলাম। হাতে কিছু কাজ আছে। কেনো আপু?

_শোন,শুদ্ধর ক্লাস টিচার টেক্সট পাঠিয়েছে,আজ বাস দিতে আসবে না। একটু প্রবলেম হয়েছে , তুই গিয়ে একটু নিয়ে আয় না।

_ঠিকাছে আপু, টেনশন করো না। এক্ষুনি যাচ্ছি আমি।

কল কে'টে প্রিতম কম্পিউটারের সামনে থেকে উঠে দাঁড়ায়‌। পেশায় আপাতত সে একজন ফ্রিল্যান্সার। খুবই পরিশ্রমী এবং মেধাবী।

সাদা রঙের টি-শার্টের ওপর একটা ব্লু শার্ট চাপিয়ে ,চশমা টা পরিষ্কার করে চোখে লাগিয়ে ওয়ালেট নিয়ে সে লিভিং রুমে যায়। লিভিং রুমের ডিভানে বসে মিস জেনি প্রনমিকে নোভেল পড়ে শোনাচ্ছিলো। প্রিতমকে দেখেই মিস জেনি বলে ওঠে,“কোথাও বেরোচ্ছো?”

_হ্যা,শুদ্ধকে আনতে যাচ্ছি। আজ বাস আসবে না। দরজাটা লক করে দিন মিস জেনি।

প্রিতম বেরিয়ে যেতেই মিস জেনি এসে প্রনমির কাছে বসে, তারপর বলে,“তোমার ভাইয়া প্রিতম বেশ সুদর্শন প্রনমি। ওর এখন বিয়ে করা উচিত।”

প্রনমি হেসে বলে,“ঠিক বলেছেন মিস জেনি। বড় আপুও সেদিন বলেছিলো আমাকে।”

_তুমি কেমন মেয়েকে চাও ভাইয়ের বৌ হিসেবে প্রনমি?

প্রনমি কিছুক্ষণ ভাবে, তারপর বলে,“যে আমার ভাইয়াকে আমার মতো ভালোবাসবে, আনকন্ডিশনালি। আর কোনো গুণ চাইনা আমার ভাবীর মধ্যে।”

মিস জেনি প্রনমির মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলে,“তুমিও এমন কাউকে পাবে যে তোমাকে আনকন্ডিশনালি ভালোবাসবে প্রনমি। মিলিয়ে নিও।”

প্রনমির ফরসা গাল দুটো মুহুর্তেই লজ্জায় লাল হয়ে যায়,সে বলে ওঠে,“যাহ! এমন কথা বলবেন না মিস জেনি!”

_আরে আরে বোকা মেয়ে! রাগ করছো কেন? আচ্ছা তোমার বয়স কতো?

_১৮ বছর।

_তোমার বিয়ের বয়স হয়েছে প্রনমি। বিয়ে তো একদিন না একদিন করতেই হবে।

_আমার মতো অন্ধকে কে বিয়ে করবে?

_অবশ্যই কেউ করবে প্রনমি। পৃথিবীতে অবশ্যই কেউ না কেউ আছে যার কাছে তোমার শারীরিক ত্রুটি ছাপিয়ে তুমি হবে তার জীবনে পাওয়া অনেক দামী কেউ।

কলিং বেল হঠাৎ বেজে ওঠে। মিস জেনি গিয়ে দরজা খুলে দিতেই দেখে বাইরে এপার্টমেন্টের মালকিনের ছেলে রাদিফ দাঁড়িয়ে।

মিস জেনি কিছু বলতে যাবে তখনই রাদিফ বলে ওঠে,“গোল মরিচ নিতে পাঠিয়েছে আম্মু।”

বলেই হাতের কৌটো জেনির দিকে এগিয়ে দেয়। এটা সম্পূর্ণই মিথ্যে কথা। রাদিফ এসেছিলো প্রেরনাকে দেখতে।

জেনি হাসিমুখে কৌটাটা নিয়ে বলে,“এক্ষুনি দিচ্ছি।”

কথাটা বলে জেনি কিচেনে চলে যায়। রাদিফ ভেতরে ঢোকে। আশেপাশে তাকিয়ে দেখে প্রনমি ডিভানে চুপচাপ বসে আছে। রাদিফের উপস্থিতি সে টের পায়নি। রাদিফ দাঁড়িয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে প্রনমিকে দেখতে থাকে। এই অন্ধটাও ভীষণ সুন্দর। এরা দুই বোন কেউ কারো থেকে কোনো অংশে কম সুন্দরী না। তবে প্রেরনা আপুর মধ্যে একটা ব্যাপার আছে! দেখলেই রাদিফের মাথা খারাপ হয়ে যায়, রাদিফের তেজী মহিলাদের ঝাঁঝ একটু বেশিই ভালো লাগে! প্রেরনার মধ্যে কিছু একটা আছে যা রাদিফকে ভীষণ টানে! তবে এই অন্ধটাও খারাপ না, অন্যরকম স্বাদের মনে হচ্ছে! এটাকেও ভীষণ ছুঁতে ইচ্ছে করে রাদিফের। বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের নারীকে ছুঁয়ে দেখা রাদিফের খুব শখ! প্রেরনাকে হাসিল করে এটাকেও টেস্ট করে দেখবে রাদিফ!

★★★

আধাঘণ্টা লেকচার শোনানোর পরে প্রফেসর বারি ইনায়ার মুখের ওপর অ্যাসাইনমেন্টের কাগজ গুলো ছুড়ে মেরে চলে যায়। ইনায়া হাত মুষ্টিবদ্ধ করে দাঁড়িয়ে থাকে। তার ভেতরটা রাগে জ্বলে যাচ্ছে, ইচ্ছে করছে প্রফেসর বারির বেল মাথাটা ইউনিভার্সিটির মাঠে নিয়ে গিয়ে সবার সামনে ফাটিয়ে দিতে।

ইনায়া মনে মনে সেই দৃশ্য কল্পনা করে হেসে ওঠে। এটা ইনায়ার একটা অভ্যাস। কারো প্রতি মেজাজ দেখিয়ে তাকে সামনাসামনি কিছু বলতে না পরলে সেগুলো কল্পনাতে পুষিয়ে নেয় ইনায়া। দারুন উপভোগ করে সে।

ইনায়াকে মিটিমিটি হাসতে দেখে তার ক্লোজফ্রেন্ড রুশফি বলে ওঠে,“কিরে! এক্ষুনি মনে হলো তুই প্রফেসর বারির ধ'ম'কে কেঁদে ফেলবি, এখন হাসছিস!”

ইনায়া মাছি তাড়ানোর মতো হাত নে'ড়ে বলে,“ও তুই বুঝবি না। আমি এমনই। আমি হুট করে কাঁদি,হুট করে হাসি,হুট করে রাগি।”

_আচ্ছা বাদ দে শোন। ট্যুরের বিষয়ে বাড়িতে কথা বলেছিলি?

ইনায়ার মুখে অন্ধকার নেমে আসে। তার গোলগাল লটকানো মুখটা নিয়ে মিনমিন করে বলে ওঠে,"এখনও না।"

রুশফি মুখে চ বর্গীয় শব্দ করে বলে,"তুই এতো ঢেরশ কেন? তোর বয়স বিশ বছর হয়ে গিয়েছে।"

_তুই তো জানিস রুশফি আমার পরিবার কেমন, পাপা-মাম্মা, বড় বাবা,বড় মা,মেজো বাবা,মেজো মা,দাদানরা,আপু খুবই স্ট্রিক্ট, এই বিষয়ে কেউ পারমিশন দেবে না।

_হ্যা সেটা তুই আগেভাগে জেনে বসে আছিস! গত ছয় মাসে আমরা তিনবার ট্যুর দিলাম আর তুই,ফ্যামিলি ছাড়া কোথাও যাসনা। তুই কি দুধের শিশু এখনও? সবাই কত অ্যাডভেঞ্চার করে,তুই ঘরে বসে থাক।

ইনায়ার মনটাই খারাপ হয়ে গেলো। এটা সত্যি ইনায়ারও একটু স্বাধীন হয়ে উড়তে ইচ্ছে করে অন্যান্য বন্ধুদের মতো। কিন্তু বাড়ির সবাই!

রুশফি ইনায়ার গালে হাত রেখে বলতে থাকে,"অত কিছু শুনতে চাই না। তুই এবার আমাদের সাথে যাচ্ছিস। ব্যাস! এখন পারমিশন কিভাবে নিবি সেটা তোর ব্যাপার! তুই বুঝে নে।"

★★★

বড় ভাইকে দেখে ইরফান নিজের ঘরের ভেতর পা রাখতেই যাচ্ছিলো তখনই পেছন থেকে ডাক আসে,"এই দাড়া!"

ইরফান দাঁড়িয়ে যায়। ভাইয়ের চোখে সে পরে গিয়েছে। পালাবার পথ নেই।

ইহান লম্বা পা ফেলে ইরফানের মুখোমুখি এসে দাঁড়ায়। ইরফান ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে মুখ হাসি হাসি করে বলে ওঠে,"শুভ জন্মদিন দাদান।"

_গতকাল রাতেই উইশ করেছিস।

ইরফান বলে,"ওহ তাইতো। কিছু বলবে?"

_প্রিতম কে?
ঠান্ডা গলায় জানতে চায় ইহান। ইরফানের ভ্রু কুঁচকে যায়, দাদান ঐ রাস্কেলটার নাম কোথায় শুনলো!

_কি হলো বল প্রিতম কে!

_কেউ না! চিনি না।

_চিনিস না অথচ মারা'মারি করিস।

ইরফান দাদানের দিকে তাকিয়ে আছে। ইহান ভাইয়ের চোখে চোখ রেখে অত্যন্ত ঠান্ডা গলায় বলে,"গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট করেছিস,এখন তোর উচিত পাপার কাধে কাধ মিলিয়ে বিজনেস দেখা। অফিসে বসা। অথচ রাস্তায় গুন্ডামি করে বেরাস। বড় বাবার রেপুটেশন ন'ষ্ট করে ছাড়বি। সামনের মাস থেকে তুই আর ইনশিরাহ পাপার সাথে অফিসে যাবি। বাড়ির ব্যাবসা সামলাবি। দু'জনেই উচ্ছন্নে যাচ্ছিস।

দেয়ালের আড়াল থেকে বড় দাদানের কথা শুনছিলো ইনশিরাহ। শেষের কথাটায় তার ভীষণ মন খারাপ হয়। দাদানের মতে সে উচ্ছন্নে যাচ্ছে? নিজের পছন্দে ফটোগ্রাফি শখটাকে বেছে নিয়েছে সেটাকে উচ্ছন্নে যাওয়া বলে? দাদান আর্মিতে ছিলো নিজের ইচ্ছায়,সেখান থেকে ফিরে এসে পলিটিক্স জয়েন করেছে নিজের ইচ্ছায়। তাহলে ইনশিরাহ ফটোগ্রাফার হলে দোষ কোথায়! নাকি দাদান ইনশিরাহ আর সাঈমের কথা জেনে ফেলেছে! না না,সেরকম হলে তো মির্জা বাড়ির পাঁচ মির্জা সামিন ইয়াসার, ইলহাম মির্জা, ইশমাম মির্জা,ইহান তাজওয়ার মির্জা, ইরফান মির্জা এতক্ষনে ইনশিরাহকে কে'টে টুকরো টুকরো করে পাশের ডি'সি অফিসের লেকে ফেলে দিয়ে আসতো!

"ইশি!"
দাদানের ডাকে চ'ম'কে ওঠে ইনশিরাহ। ইহান গম্ভীর কন্ঠে বলে,"আড়ি পাতছিস তুই!"

_আড়ি পাতবো কেনো দাদান! আমি এখানে দাড়িয়ে আছি।

_আচ্ছা ঠিকাছে। শুনে তো ফেলেছিস। দু'জনে কথাটা ভালো করে মাথায় ঢুকিয়ে নাও। সামনের মাস থেকে মির্জা এন্টারপ্রাইজের অফিসে বসবে দুজন। কোনো গাইগুই না।

কথাটা ইহান ইরফানের চোখের দিকে তাকিয়ে বলে। তারপর ব'লিষ্ঠ শরীরে হেলেদুলে নিজের ঘরের দিকে যায়।

বারান্দায় দাঁড়িয়ে দু'জনকে দেখছিলো অদ্রিতা আলো আর রিতু। আলো মুখ হাসি হাসি করে রিতুকে বলে,"দেখেছো, একেবারেই সামিন ইয়াসার মির্জার মতো শাসন!"

রিতু মাথা নাড়ায়, অস্ফুট স্বরে বলে,"হ্যা সামিন ইয়াসার মির্জাই। এখন একটা অদ্রিতা আলো এনে দাও।"

চলমান.....

নোট 🚫

নিন সারপ্রাইজ পর্ব দিলাম।

আর হ্যা, এই গল্পে কেউ মেইন নায়ক নায়িকা না। নায়ক নায়িকার সংজ্ঞা আমি জানি না,তবে গল্পে একাধিক জুটি থাকবে,ধীরে ধীরে সবার কাহিনী আগাবে। এক পর্বে সব দেখিয়ে দেওয়াটা তো পসিবল না তাইনা?
ধৈর্য্য ধরতে হবে, সামিন ইয়াসার মির্জার মতো ধৈর্য্য।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 3 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন