ফন্ট সাইজ:
থিম:
বধূ কোন আলো লাগল চোখে ২

পর্ব 4

লেখক: ইসরাত ইতি

#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_৪
#ইসরাত_ইতি

🚫কঠোর ভাবে প্রাপ্তমনস্কদের জন্য।

🚫শিক্ষা ও সাহিত্যের সাথে আমার এই কল্পিত ঘটনাগুলোর লিখিত শব্দগুলোর কোনো সম্পৃক্ততা নেই।

কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ 🚫

[ গল্পের প্রয়োজনে কিছু অশালীন ভাষা ব্যবহার করতে হয়। ক্ষমাপ্রার্থী ]

কম্পিউটারের মনিটর থেকে দৃষ্টি সরিয়ে ডেস্কের ওপর কম্পমান যন্ত্রটাকে মুঠোয় নিয়ে কলটা রিসিভ করে কানে ধরে। ওপাশ থেকে কান্নাভেজা নারীকন্ঠ ভেসে আসে,“প্রিতম।”

_হ্যা। আন্টি বলুন। আপনি কাঁদছেন কেন?

_প্রিতম, জামি কি তোমার বাড়িতে?

_না তো আন্টি। কেনো ও বাড়িতে যায়নি?

_না আসেনি। তোমার আংকেল কে তো চেনো প্রিতম,আমাকে অশ্রাব্য ভাষায় গালি দিচ্ছে,তোমার বন্ধু কি আমাকে কোনোদিন একটু শান্তি দেবে না?

মায়ের বয়সী ভদ্রমহিলার আকুতি শুনে প্রিতমের খারাপ লাগে,পর পর জামির ওপর বেশ রাগ হয় তার। ওটাকে আজ শিক্ষা দিতে হবে একটা। সে জামির মাকে আশ্বস্ত করে বলে,“আন্টি আমি ওকে খুজে নিয়ে এক ঘন্টায় বাড়ি ফিরছি। আপনি কাঁদবেন না।”

ফোন কে'টে সময় দেখে প্রিতম। রাত প্রায় পৌনে একটা। দেরী না করে প্রিতম টি-শার্ট পাল্টে একটা শার্ট গাঁয়ে চাপিয়ে নেয়। তারপর সোজা গিয়ে প্রেরণার ঘরের দরজায় নক করে।

প্রেরনা দরজা খুলে অবাক হয়ে বলে,“কিছু বলবি!”

_কি করছিলে আপু।

_এই তো আজকের হিসেবটা দেখছিলাম। কি হলো তোর?

_তোমার স্কুটারের চাবি টা দাও,আমার বাইকের একটু সার্ভিসিং করাতে হবে।

_এতো রাতে কই যাবি তুই?

_জামিকে খুঁজে ওর বাড়িতে দিয়ে আসতে,আন্টি কাঁদছে।

প্রেরনা দু'টো চাবি এনে ভাইয়ের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলে,“কলাপসিবল গেটের চাবিও নিয়ে যা,এতো রাতে দাড়োয়ান জেগে নেই।”

বোনকে ধন্যবাদ দেয় প্রিতম। দরজা লাগাতে লাগাতে প্রেরনা বলে,“ফোন নিয়েছিস সাথে?”

_হু.

_চেক করে বল।

_নিয়েছি তো আপু।

_কল দিলে দুবার রিং বাজার আগেই ধরবি। রাত বিরেতে আমি টেনশন করতে পারবো না। আই নিড রেস্ট ভাই!

_তুমি ঘুমিয়ে পরো আপু। টেনশন করো না তো।

“হু,তুই বললি আর আমারও দু'চোখে ঘুম এসে গেলো। যা,আপডেট জানাস।”

ফ্ল্যাটে দরজা বন্ধ করে দেয় প্রেরনা। আপুর কান্ড দেখে প্রিতম হাসতে হাসতে লিফটের কাছে যেতে থাকে। প্রিতমকে এখনও কিশোর প্রিতমের মতো ট্রিট করে সে। প্রনমির বয়স যখন পাঁচ বছর ছিলো, প্রিতমের ছিলো বারো আর প্রেরনার পনেরো, তখন তারা মা বাবাকে হারিয়েছিলো, প্রেরনা প্রিতমের থেকে মাত্র তিন বছরের বড় হয়েও সবসময় মায়ের মতো আগলে রেখেছে প্রিতম আর প্রনমিকে।

অন্ধ বোন আর ভাইকে নিয়ে অথৈ জলে পরেছিলো প্রেরনা। চার বছর ভীষণ কষ্টে প্রেরনা তাদের দুই ভাইবোনকে সামলেছে, তারা থাকতো ফুপির বাড়িতে। প্রেরনার যখন উনিশ বছর তখন শাওকাত ওয়াসীত নামের একজন ভদ্রলোক প্রেরনার ফুপির বাড়ির দিকে আত্মীয় আপুকে দেখে পছন্দ করে ফেললেন। তাদের ফুপির কাছে প্রস্তাব রাখলেন বিয়ের। শাওকাত ওয়াসীতের বয়স ছিলো তেত্রিশ। প্রায় দ্বিগুণ বয়সী ওয়াসীতকে প্রথমে প্রেরনা রিজেক্ট করলেও পরে ফুপি বুঝিয়ে শুনিয়ে বিয়েতে রাজি করালেন ‌। তবে প্রেরনা শর্ত দিয়েছিলো প্রেরনা আজীবন তার ভাই বোন দু'টোকে দেখবে,এ ব্যাপারে ওয়াসীত কখনো আপত্তি তুলতে পারবে না। ওয়াসীত মেনেও নিয়েছিলো। এক সময় বিয়েতে সম্মতি দিতে দোনামোনা করা প্রেরনা বিয়ের পর পাগলের মতো ভালোবেসে ফেললো শাওকাত ওয়াসীতকে। মানুষটাই ছিলেন ভালোবাসার মতো, চমৎকার একজন মানুষ ছিলেন শাওকাত ওয়াসীত। যে বিবাহিত জীবনের শুরু থেকে আগলে রেখেছিলেন তার সহধর্মিণী প্রেরনা এবং সেই সাথে প্রিতম,প্রনমিকে। প্রিতম প্রনমি দুলাভাই নয়,পেয়েছিলো তাদের একজন অভিভাবক। কিন্তু তিন ভাইবোনের কপালে সে সুখও বেশিদিন সয়নি। শুদ্ধ যখন প্রেরনার গর্ভে ছিলো তখন দুলাভাই মা'রা যায়। মা-বাবার পরে শাওকাত ওয়াসীত নামের চমৎকার একজন আপন মানুষ হারিয়ে ফেলে প্রেরনা,প্রিতম আর প্রনমি।

এসব ভাবতে ভাবতেই প্রিতম একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে,তার আপুর জীবনে কোনো সুখই স্থায়ী হয়ে থাকেনি,যেটা থেকেছে সেটা হলো একাকিত্ব, দীর্ঘশ্বাস আর স্ট্রা'গল।

প্রিতম চলে যাওয়ার পরে প্রেরনা ঘরে ঢুকে ল্যাপটপে হিসেবগুলো দেখতে দেখতে মাথা তুলে তাকায়। তার সামনে বসা সুদেহী, সুদর্শন,হাস্যোজ্জ্বল মানুষটি তার দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে আছে। প্রেরনা কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,“আপনি আমার হ্যালোসিনেশন শাওকাত ওয়াসীত। বিরক্ত করবেন না।”

মানুষটা যেন হাসলো প্রেরনার দিকে তাকিয়ে। প্রেরনা ঐ ভুবন ভোলানো হাসিতে ভুললো না। দু'চোখ বন্ধ করে গলার কাছে আসা কান্না নামের অনুভূতিকে পিষে ফেলে দু'চোখ মেলে দেখে শাওকাত ওয়াসীত নেই। সে ম্লান হেসে পুনরায় কাজে মন দেয়।

★★
“দ্য আওয়ার্স”
বড় নেমপ্লেটটাতে জ্বলজ্বল করছে ক্লাবের নামটা। ইশমাম মির্জার মেজাজ তু'ঙ্গে। শেষে এই নাইটক্লাবটার সামনে এসে তার গাড়ি খারাপ হতে হলো! অস্বস্তিতে পুরো মুখ ছেয়ে আছে তার। যুবক যুবতীরা ঢুকছে, আবার কেউ কেউ টলতে টলতে বে'রোচ্ছে। সরকারি দলের তোষামোদে এই ক্লাবটা টিকে আছে।

গাড়িটা ঠিক “দ্যা আওয়ার্সের” গেটের সামনে এসেই খারাপ হয়েছে। ইশমাম মির্জা তখন থেকে মেকানিকের জন্য অপেক্ষা করছে। এখানে দাঁড়িয়ে থাকতেও তার রুচিতে বাঁধছে। ইনশিরাহ আর ইনায়ার বয়সী মেয়েরা বন্ধুদের নিয়ে হৈ হৈ করতে করতে ক্লাবে ঢুকছে। এসব দৃশ্য দেখে ইশমামের ভীষণ খারাপ লাগে।

মেকানিককে কল করেছে দশমিনিট হলো, ইশমাম এবার বেশ বিব্রত হচ্ছে যুবক যুবতীদের দৃষ্টি দেখে। তারা কি ভাবছে ইশমামও এখানে এসেছে? অবশ্য এদের ভাবনা দিয়ে কি আসে যায়,তবে কোনো পরিচিত মুখের সামনে পরলে মুশকিল। বেসরকারি ইউনিভার্সিটির ইংরেজি প্রভাষক ইশমাম মির্জা নাইট ক্লাবের সামনে,এটা দেখলে কেচ্ছা কাহিনী রটে যেতেও সময় লাগবে না, এবং সেই কাহিনী যদি চলে যায় ডক্টর রুকাইয়া পরীর কানে তবে তো কথাই নেই।

পরীর কথা মনে পরতেই ইশমাম ফোন বের করে পরীকে ফোন লাগায়। ওপাশ থেকে ফোনটা রিসিভ করেই ঘুম ঘুম কন্ঠে পরী বলে ওঠে,“কোথায় আপনি! আড্ডা শেষ হয়নি আপনাদের?”

_হ্যা,বাড়িতেই আসছিলাম। হঠাৎ মাঝ রাস্তায় গাড়ি খারাপ হয়ে গিয়েছে। আমি এখন দ্য আওয়ার্সের সামনে।

পরী ধরফরিয়ে উঠে বসে, আ'তঙ্কিত হয়ে বলে,“গাড়ি খারাপ বলে নাইট ক্লাবে চলে যাবেন? কাকে নিয়ে? সুগার বেবি?”

ইশমাম জিভ কাটে, ধ'ম'কের সুরে বলে,“বাজে কথা বন্ধ করো। গাড়িটা এখানেই খারাপ হয়েছে। তো তুমি বাড়িতে ফিরেছো কখন?”

_আমিতো দশটায় শেষ তিনজন পেশেন্ট দেখে চলে এসেছি,ইহান নিয়ে এসেছে। এই কে কথা বলে আপনার পাশে,মেয়ের গলা!

ইশমাম বিরক্ত হয়ে বলে,“নাইট ক্লাবের সামনে দাঁড়িয়ে আমি। এখানে মেয়ের গলা শুনবে না তো কি গরুর হা'ম্বা শুনবে? রাখো ফোন,ফিরছি।”

ফোন কে'টে ইশমাম একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে। বুড়ো বয়সে গিন্নিরা এরকম সন্দেহবাতিক হয়ে যায় কেন আল্লাহ মালুম। এই বাড়ির বৌ গুলো ছেলেগুলোকে আঙুলে নাচাতে ওস্তাদ। সব কটা আলোকে দেখে দেখে শিখেছে এসব ‌। পূর্বপুরুষরা কেমন চ'ড় মেরে মেরে বৌ শাসাতো,আর এখন বৌকে মা'রা তো দূর উল্টে তারা মা'র খায়!

★★★
“ছেড়ে দে আমাকে! খেতে দে! খেতে প্রিতম!”
জড়ানো গলায় বলে,প্রিতমকে সরিয়ে দিয়ে জামি তার হাতের গ্লাসটাতে চুমুক বসায়। প্রিতম থা'বা মে'রে গ্লাসটা তুলে দূরে ছুঁড়ে মারে। তারপর জামির পাশে বসা সাফওয়ানকে বলে,“কখন এসেছে ও এখানে?”

সাফওয়ান কাঁধ নাচিয়ে বলে,“কি জানি। আমি খোজ লাগিয়ে এক ঘন্টা আগে পেলাম।”

জামি ট'লছে। প্রিতমের মাথায় রা'গ চেপে যায়। জামির চোয়াল চেপে ধরে, চেঁ'চি'য়ে উঠে বলে,“ লজ্জা করেনা তোর? আঙ্কেল আজও গিয়ে আন্টিকে গালিগালাজ করেছে তোর জন্য,আর তুই এখানে এসে মা'তলামি করছিস। লজ্জা করে না তোর?”

জামি প্রিতমের থেকে নিজের চোয়াল ছাড়িয়ে নেয়, চেঁ'চি'য়ে উঠে বলে,“কেনো ছেড়ে গেলো ও আমায়? আমি মোটা বলে? আমি মোটা বলে ও বাবার পছন্দে বিয়ে করবে? ওর বাপকে আমি খু'ন করে ফেলবো। খু'ন!”

প্রিতম বোঝে জামি ঠিক নেই। কিন্তু ওকে নিয়ে দ্রুত এই জ'ঘন্য স্থান থেকে বেরোতে হবে, সে সাফওয়ানকে বলে,“ওকে ধর। আমাদের বেরোতে হবে।”

দু'জনে জামিকে দুপাশ থেকে ধরে ধরে হাঁটছে,মাতাল জামি তখনও চেঁ'চি'য়ে যাচ্ছে,“শালা এই মেয়ের বাপগুলোকে আমি ছাড়বো না। ছাড়বো না আমি এই মেয়ের বাপ গুলোকে। এই প্রিতম আমি কোনো মেয়েকে বিয়ে করবো না,আমি একটা ছেলেকে বিয়ে করবো।”

জামির মাতলামি দেখে প্রিতম আর সাফওয়ান হে'সে ফেলে। জামি বলতে থাকে,“এই প্রিতম,আমি তোকে বিয়ে করবো ‌। তুই হবি বৌ আমি হবো স্বামী।”

সাফওয়ান হাসি থামাতে পারছে না। প্রিতম দাঁতে দাঁত চেপে বলে,“শা'লা চুপ কর! তোকে বাড়ি নিয়ে বোঝাচ্ছি।”

জামি বিড়বিড় করে বলতেই থাকে,“মেয়ের বাবাগুলোকে আমি ঘেন্না করি,মেয়েদের আমি ঘেন্না করি!”

“দ্য আওয়ার্সের” সামনে এসে দাঁড়াতেই জামির বমি পেয়ে যায়। প্রিতম সাফওয়ানকে বলে,“ওকে ধরে রাখ,আমি স্কুটার ঘুরিয়ে আসছি।”

প্রিতম চলে যেতেই জামি সাফওয়ানের থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে দুকদম সামনে এগোতেই হড়হড় করে বমি করে দেয়।

“এই ছেলে! হোয়াট আর ইউ ডুয়িং! ওহহ শিট!"

ইশমাম গাড়ির দরজা খুলে বেরিয়ে এসেই জামিকে ঠেলে সরিয়ে দেয়। জামি তার গাড়িতে বমি করেছে।

ইশমাম সেদিকে তাকিয়ে কপাল কুঁ'চ'কে জামিকে ধ'ম'কে ওঠে,“ওহহ শিট! এই ছেলে! কি করেছো তুমি!”

সাফওয়ান ছুটে এসে জামিকে ধরে। প্রিতম চেঁচামেচি শুনে স্কুটার রেখে ছুটে আসে। সে কিছুই বুঝতে পারছে না।

ইশমাম মির্জা জামির ওপর চেঁচাতে থাকে,“অপদার্থ কোথাকার! যা হজম হয়না তা খেতে যাও কেন ব্লা'ডি রাস্কেল!”

প্রিতম এগিয়ে যায়। ততক্ষণে বুঝতে পারে ঘটনা কি ঘটিয়েছে জামি। সে ইশমামের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বিনয়ের সাথে বলে,“সরি! সরি আঙ্কেল! ও বুঝতে পারেনি!”

ইশমাম রা'গে গজগজ করছে। আজকের দিনটাই জ'ঘন্য তার। সে বলতে থাকে,“তোমরা এই জেনারেশনের ছেলেদের চাপকে সিধে করে দেয়া উচিত। সব বখে যাওয়া।”

প্রিতমের কথাটা খুব আত্মসম্মানে লাগলেও সে প্রতিবাদ করে না, মুরব্বি মানুষ,বলতেই পারে। তাই সে চুপ থাকে।

কিন্তু ইশমাম জ্ঞান দেওয়ার মতো করে বলে,“এসব বেহাল্লপনা না করে ক্যারিয়ার বানাও। জীবনটা ফুর্তি করে কাটিয়ে দেওয়ার না ‌।”

প্রিতম স্পষ্ট ভাষায় জবাব দেয়,“আংকেল এখানে আমরা ফুর্তি করতে আসিনি। আপনার ভুল হচ্ছে।”

ইশমাম তাচ্ছিল্যর হাসি হেসে বলে,“নাইট ক্লাবে তবে কি নামাজ আদায় করতে এসেছো? তোমরা হচ্ছো সোনার বাংলার বোঝা!”

এবার প্রিতম নিজের ভদ্রতা বজায় রাখতে পারে না,কাঠ কাঠ বলে ওঠে,“আপনিও তো এখানে এসেছেন? এখানে বেহাল্লাদের সাথে আপনার কাজ কি! ফুর্তি করতে এসেছেন?”

ইশমাম মির্জা থতমত খেয়ে যায় তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলের বয়সী সুদর্শন যুবকের অপমানসূচক কথায়।

জামি বিরবির করে জড়ানো গলায় বলে ওঠে,“ঠিক বলেছিস..... আংকেল আপনার চেহারায় একটা সুগার ড্যাডি,সুগার ড্যাডি ভাব আছে! আপনি অনেক সুন্দর আঙ্কেল!”

ইশমাম দ্বিতীয় দফায় চ'ম'কে যায়। প্রিতম জামির মুখ চেপে ধরে শান্ত চোখে তাকিয়ে আছে। ইশমাম বলে ওঠে,“কতগুলো বাস্টার্ড!”

_ওয় হ্যালো! ভদ্রভাবে কথা বলুন আঙ্কেল। আমার বন্ধু আপনার গাড়ি নষ্ট করেছে,তার জন্য মাফ চেয়েছি,কিন্তু আপনি সেই তখন থেকে আমাদের অপমান করছেন। হ্যা আমরা সবাই এখানে ফুর্তি করতে এসেছি,তাতে আপনার অসুবিধা কি? বা'স্টার্ড কাদের বলছেন আপনি! আপনি নিজে ভালো হলে এখানে আসতেন?”

প্রিতম খুবই ঠাণ্ডা গলায় বলে কথাগুলো।

ইশমাম স্ত'ব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। জামি মাতালের মতো ইশমামকে বলে ওঠে,“সুন্দর আঙ্কেল,সুন্দর আঙ্কেল আপনার কি কোনো মেয়ে আছে?”

ইশমাম তেতে উঠে বলে,“তাতে তোমার কি ব্লাডি স্কাউন্ড্রেল!”

প্রিতম জামিকে ধরে বলে,“চল স্কুটারে বোস,আজ তোকে আমি খু'ন করবো। তোর জন্য এসব হয়েছে!”

জামি প্রিতমের কথায় পাত্তা না দিয়ে চেঁ'চি'য়ে ইশমামকে বলে,“সুন্দর আঙ্কেল আপনার যদি কোনো মেয়ে থাকে তাহলে আপনাকে “ফাক ইউ!”

প্রিতম মাতাল জামির মুখ চেপে ধরে সাথে সাথে। ইশমামের গা কাঁপছে রা'গে,তার ইচ্ছা করছে তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলে গুলোকে পি'স পি'স করতে।

জামি নিজের মুখ ছাড়িয়ে নিয়ে ডান হাতের মধ্যমা আঙ্গুল তুলে ইশমামকে আবারও বলে,“ফা'ক ইউ সুন্দর আঙ্কেল।”

প্রিতম আর কোনো কথা না বলে স্কুটার স্টার্ট দেয়,জামিকে মাঝখানে বসিয়ে সাফওয়ান পিছনে বসে জামির মুখ চেপে ধরে,জামি আবারও মুখ থেকে সাফওয়ানের হাত সরিয়ে ইশমামকে চেঁ'চি'য়ে বলে,“আমি মেয়েদের বাবাকে ঘেন্না করি।”

প্রিতম একটা গভীর নিঃশ্বাস ফেলে স্কুটার উড়িয়ে স্থান ত্যাগ করে।

ইশমাম রাগে হাত মুষ্টিবদ্ধ করে দাঁড়িয়ে আছে। এতো জ'ঘন্য ছেলেগুলোর বাবা মায়ের জন্য ইশমামের খুব আফসোস হচ্ছে!

★★★

“বড় দাদান। তুমি জানো আমি তোমাকে কতটা ভালবাসি। আর আমিও জানি তুমি আমাকে চেনো,খুব সহজে পড়ে ফেলো আমাকে। যা অন্যরা পারে না। আর এও জানি আমি যে তোমার জন্মদিনের কথা ভুলে গিয়েছিলাম তা তুমি সকালেই ধরতে পেরেছো। এজন্য অনেক সরি দাদান ঠিকাছে? আসলে আমার কোনো দোষ নেই দাদান,ঐ প্রফেসর বারির অ্যাসাইনমেন্টের চক্করে আমি দিন দুনিয়ার হুস খুইয়ে বসেছি! নেভার মাইন্ড!
ছোটো একটা জীবনে এমন ছোটো ছোটো ভুল হতে থাকবে ( এটা শাহরুখ খানের ডায়লোগ বড় দাদান,তুমি তো সিনেমা দেখো না।)

দাদান তোমার বার্থডে গিফট টা কেমন হয়েছে? দাদান সত্যি বলছি আমি খুব শিগগিরই চাই আমার বড় দাদানের জীবনে এমন মিষ্টি দেখতে একজন ভাবীমনি আসবে। ভালোবাসি দাদান,তোমাকে ভীষণ ভালোবাসি। আমাকে তুমি আজীবন আহ্লাদ করবে কেমন? আমি কখনোই তোমার কাছে বড় হতে চাই না!”

ইনায়া মির্জা।”

ইহান একবার তার এক হাতে ধরে রাখা চিরকুট টার দিকে তাকায় একবার তার অন্যহাতে ধরে রাখা পুতুলটার দিকে। পুতুলটা হচ্ছে একটা ডেমো। ইনায়ার ঠিক এমন দেখতেই একটা ভাবী চাই। চিরকুটে এটাই স্পষ্ট করে লেখা। ইহান পুতুল আর চিরকুট টা রেখে এবার ইনশিরাহর চিরকুট টা তুলে নেয়।

গোটা গোটা অক্ষরে চিরকুট টাতে লেখা,“দাদান ইউ নো না সবাই আমাকে বলে আমি আলো রানীর মেয়ে,হয়েছি মাম্মার মতো, হাত পা চলে খুব, মুখ চলে কিন্তু মুখে মধু নেই। এবং ইহা একটি অতীব সত্যি কথা। আমি মধু ঢেলে কথা বলতে পারি না দাদান, আমি ইনুর মতো কিউট করে কথা বলতেও পারি না, তোমার সাথে আহ্লাদ করতে পারি না,তবে তুমি জানো আমি তোমাকে কতটা ভালোবাসি। তুমি খুব ভালো থাকো দাদান,আমাদের নিয়ে। ভাবী চাই দাদান। অনেক তো হলো! খুব ফুপি ডাক শুনতে ইচ্ছে করছে দাদান।”

ইহান তাজওয়ার হেসে চিঠি দুটোকে প্রতি বছরের ন্যায় তুলে রাখে স্বযত্নে, বিড়বিড় করেই বলে ওঠে,“তোরা বড় হবি কবে!”

শুভ্র পাঞ্জাবিটা পালটে একটা টি-শার্ট গায়ে চাপিয়ে মুখ হাত ধুয়ে নেয়। তোয়ালে দিয়ে মুখ টা মুছতে মুছতে আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে নিজের প্রতিবিম্বের দিকে চেয়ে থাকে দীর্ঘক্ষণ, অতঃপর ধীরে ধীরে বলে ওঠে,“তুমি বুড়ো হয়ে যাচ্ছো ইহান তাজওয়ার মির্জা!”

★★★

দুপুরের রোদের তাপ টা অসহনীয় পর্যায়ে চলে গিয়েছে। শুভ্র পাঞ্জাবির বুকের কাছটা ভিজে জবজবে হয়ে গিয়েছে। এসির মধ্যেও হাসফাস অবস্থা। সূর্যের অত্যাচারে শহুরে জীবন অতিষ্ঠ। বিগত বহু বছর থেকে শীতকালের স্থায়িত্ব হয় মোটে পনেরো দিন। বাকিটা সময় গ্রীষ্মকাল। এ দেশে বর্ষাকাল বলে তো কিছুই নেই,আকাশের যখন ইচ্ছে করে তখন কাঁদে,ঋতু দেখে না।
রাস্তার একপাশে গাড়িটাকে পার্ক করে রেখে ইহান গাড়ি থেকে নেমে পরে। তারপর ফোন বের করে এদিক ওদিক তাকাতে তাকাতে ইনায়ার নাম্বার ডায়াল করে। ওপাশ থেকে ইনায়া কলটা রিসিভ করতেই গম্ভীর কন্ঠে বলে,“পার্লার টার নাম কি?”

ইনায়া উচ্ছ্বসিত কন্ঠে বলে,“এসে গিয়েছো দাদান। ওয়েট তুমি লিটল ফ্লাওয়ার কিন্ডারগার্ডেনের সামনেই তো তাইনা?”

_হু।

_ঠিকাছে,তুমি কষ্ট করে পাঁচ মিনিট দাঁড়াও। আমি আসছি।

ইহান ফোন কে'টে তার হাতের আইসক্রিমের দিকে তাকায়। অসহ্য গরমেও এই বরফ খন্ডটার প্রতি কোনো আগ্রহ পাচ্ছে না সে।

নাহিদ তার ভাইকে দেখে বলে ওঠে,“ভাই আশেপাশের মানুষ কিভাবে দেখছে দেখুন!”

ইহান বলে ওঠে,“কিভাবে দেখছে!”

_না মানে সবাই আপনাকে চেনে। ভাবছে ইহান তাজওয়ার মির্জা লেডিস পার্লারের নিচে কি করে!

ইহান নাহিদের কথা কানে নিলেও তার দৃষ্টি অন্যকিছুতে নিবদ্ধ হয় গিয়ে। দৃষ্টি স্থির রেখেই সে চোখ থেকে সানগ্লাস খুলে হাতে নিয়ে নেয়। তারপর নাহিদকে বলে,“উনি সেই ভদ্রমহিলা না?”

নাহিদ ইহানের দৃষ্টি অনুসরণ করে তাকাতেই বলে ওঠে,“হ্যা ঐ হুমকি ধামকি আপা?”

ইহান চোখ সরু করে নাহিদের দিকে তাকিয়ে বলে,“হুমকি ধামকি আপা মানে!”

_আরে হুমকি দেওয়া আপা! আরে ঐ বাবুর্চি আপা! ভাতের হোটেল!

ইহান নাহিদের দিকে থেকে দৃষ্টি সরিয়ে পুনরায় লিটল ফ্লাওয়ার কিন্ডারগার্ডেনের অপজিটে তাকায়! একদৃষ্টে তাকিয়েই থাকে!

গলাটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছে। এক্ষুনি পানি খাওয়া দরকার। হাতের ডানপাশে বিশ গজ দূরেই একটি ডিপার্টমেন্টাল স্টোর। কিন্তু তার দৃষ্টি স্কুলের গেটের দিকে। ছুটির ঘন্টা বাজার সাথে সাথে মৌমাছির মতো এক ঝাক বাচ্চা হুটোপুটি করে গেটের দিকে ছুটে আসছে। এখন এখান থেকে নড়া যাবে না। প্রবল উৎকণ্ঠা নিয়ে গেটের দিকে দৃষ্টি দিয়ে রেখেছে প্রেরনা। ভিড় ধীরে ধীরে কমতে শুরু করেছে।‌ এক্ষুনি হয়তো শুদ্ধ বের হবে। ওকে সবসময়ই বুঝিয়ে বলা হয় যাতে সে ছুটির ঘন্টা বাজার সাথে সাথেই দৌড় না লাগায়। ভিড়ের মধ্যে হোঁচট খেয়ে মুখ থুবড়ে পরে যাবে নয়তো। আজও স্কুলের বাস আসবে না,তাই প্রেরনা এসেছে শুদ্ধকে নিতে।

দুমিনিট পরই স্কুলের ব্যাগ কাঁধে নিয়ে বের হয় শুদ্ধ। গরমের তাপে লালচে আভা পরা ফর্সা,ছোট্টো মুখটাকে দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে প্রেরনা। শুদ্ধ মাম্মাকে দেখতে পেয়েই হাত নাড়িয়ে তাকে জোরে জোরে ডাকতে থাকে, তারপর প্রেরনার দিকে আসবে বলে পা ফেলে। রাস্তায় প্রচুর গাড়ির শব্দ।
প্রেরনা শুদ্ধকে চেঁচিয়ে বলতে থাকে,“বাবা আমি আসছি,তুমি ওখানেই দাঁড়িয়ে থাকো।”
একের পর এক গাড়ি ডানে বায়ে চলে যাচ্ছে। প্রেরনার সেদিকে কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই, সে এক পা সামনে বাড়ায়। তার উৎকণ্ঠা বাড়ছে,শুদ্ধকে দেখে মনে হচ্ছে এক্ষুনি মাম্মার কাছে ছুট লাগাবে। তাহলে সর্বনাশ!
শুদ্ধর দিকে ধ্যান রেখে তাড়াহুড়ো করে দুকদম সামনে দিতেই যাবে তখনই পেছন থেকে একটা বলশালী হাত তার হাত টেনে ধরে পেছন থেকে টান দেয়।
হুশ করে সামনে থেকে একটা ট্রাক চলে যায়। ট্রাক ড্রাইভার চেঁচিয়ে বলে,“পাগল নি? মইরবার এতো শখ!”

প্রেরনা ঘাবড়ে গিয়ে চোখ বন্ধ করে বড় বড় নিশ্বাস নিচ্ছে। সে কিছু বুঝতে পারছে না। সে কি একটু আগে ম'রতে বসেছিলো! নিজেকে সামলে নিতেই টের পায় একটা শক্ত হাত তার ডান হাতের কব্জি ধরে রেখেছ। মুহুর্ত কে'টে যায় চোখ খুলেই সামনে হাতের মালিককে আবিষ্কার করে প্রেরনা চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে থাকে।

ইহানের হাত থেকে এক ঝটকায় নিজের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে একলাফে পিছিয়ে যায় সে।
ইহান তাজওয়ার চ'মকায় কিছুটা। পরমুহূর্তেই রাশভারী গলায় বলে ওঠে,
“আর ইউ ম্যাড!”

গম্ভীর পুরুষালি কন্ঠস্বর প্রশ্নটি ছুড়তেই প্রেরনা সম্বিৎ ফিরে পায়। এটা কি হচ্ছিলো! সে কি ম'রতে বসেছিলো! হ্যা তাই তো! আরেকটু হলেই তো ঐ রডভর্তি দানবীয় ট্রাক টা তাকে এখানে পি'ষে দিয়ে চলে যেতো!

ভেতরটা কাঁপছে তার কিন্তু বাইরে থেকে দেখে বোঝার সাধ্যটি নেই কারো। সে তার থেকে পাঁচ কদম দূরত্বে পেটানো শরীরের, আকর্ষণীয় উচ্চতার শুভ্র পাঞ্জাবি পরে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটাকে দেখছে,শান্ত চোখে। লোকটা লম্বা ভীষণ। সেদিন পার্টি অফিসে চেয়ারে ঠেসে বসেছিলো বিধায় বোঝা যায়নি।

ইহান তাজওয়ার প্রেরনার এমন শীতল ভাব দেখে খানিকটা অবাক হয়, ভদ্রমহিলা কেমন ইস্পাতের মতো কঠিন আকার ধারণ করেছে।

সে তার গতানুগতিক গাম্ভীর্য বজায় রেখে কিছু বলতে যাবে তখনই প্রেরনা তাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই তাড়াহুড়ো বলে ওঠে,“ধন্যবাদ!”

ব্যস,এই একটা শব্দ উচ্চারণ করতে যেটুকু দেরি, চোখের পলকে সে রাস্তা পার হয় ওপাশে চলে গিয়েছে।

ইহানের ভ্রু-যুগল কুঁ'চ'কে আছে। কেমন অনুসন্ধানী দৃষ্টি দিয়ে আগন্তুক ভদ্রমহিলার চঞ্চল পদক্ষেপ দেখছে। লম্বা বিনুনি কোমরের কাছে কলমি লতার ন্যায় দোল খাচ্ছে। পরনে তার শাড়ি। ধূসর জমিন,কালো পাড়। কালো ব্লাউজের কনুই অবধি হাতা। ভদ্রমহিলা কি সবসময় শাড়ি পরে!

প্রেরনা ছুটে গিয়ে শুদ্ধকে আগলে নেয়। ব্যস্ত ভঙ্গিতে এদিক ওদিক দেখে একটা রিকশা দাড় করায়। তারপর ছেলেকে তুলে নিজেও উঠে বসে,পাশে বসিয়ে নেয় শুদ্ধকে।

ইহান তাজওয়ার তাকিয়ে আছে। পাশ থেকে নাহিদ বলে,“এটা সম্ভবত হুমকি ধামকি....থুরি রেস্তোরাঁ মালকিন আপার ছেলে। প্রায় দিন রেস্তোরাঁর ক্যাশ কাউন্টারে দেখি মায়ের সাথে বসে থাকে। শুদ্ধ না বিশুদ্ধ নাম সম্ভবত।

ইহান চোখ ফেরায় না, যেভাবে টানটান হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো সেভাবেই থাকে। প্রেরনা রিক্সার হুড তুলে দেয়, স্বল্পসময়ে রিকশা প্রস্থান করে।

“দাদান!”
ইনায়ার কন্ঠস্বর শুনে ইহান ফিরে তাকায় বোনের দিকে। ইনায়া চঞ্চল পায়ে এগিয়ে এসে হাঁপাতে হাঁপাতে বলে,“চলো আমার হয়ে গিয়েছে।”

চলমান....

[ আমি একটা জিনিস বুঝিনা,আপনারা কেনো প্রথম পরিচ্ছেদকে টেনে আনছেন? ওটা আলাদা গল্প এটাও আলাদা গল্প হবে। কখনোই মিলবে না। এটা পড়তে গেলেই প্রথম পরিচ্ছেদের কথা মনে করলে তো গল্পটা উপভোগই করতে পারবেন না। সামিন আলো এখন বুড়ো,এতে মন খারাপ করার কি আছে? আমি আপনি কি বুড়ো হবো না? ওদের কাহিনী তো প্রথম পরিচ্ছেদে শেষ করলাম,এখন নতুন প্রজন্মের কাহিনী দেখুন। হতে পারে সময়ের সাথে সাথে এরাও আপনাদের পছন্দের চরিত্র হয়ে গেলো । ]

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 4 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন