ফন্ট সাইজ:
থিম:
বধূ কোন আলো লাগল চোখে ২

পর্ব 5

লেখক: ইসরাত ইতি

#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_৫
#ইসরাত_ইতি

কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ 🚫

হঠাৎ করেই আকাশটা রং পাল্টে ফেললো। আকাশের দিকে তাকালেই মনে হচ্ছে এ শহরে এক্ষুনি ঝাঁপিয়ে পরবে, না না, এক্ষুনি নয়, আকাশটা দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগছে।

টানা দু তিন দিন কাঠ ফাটা গরম ছিলো। ইনশিরাহর অপটু মস্তিস্কের আন্দাজ এবং ওয়েদার ট্র্যাকারের হিসেব মতে আজ বৃষ্টি হবার কথা ছিলো‌। আন্দাজ মিলে গিয়েছে। ইনশিরাহ নিজের ট্রাভেল ব্যাগ কাঁধ থেকে নামিয়ে পাশের একটা উঁচু ঢিবির ওপর রাখে। তারপর সেখান থেকে হলদে রেইনকোট বের করে পরে নেয়। মনে মনে আকাশকে ধন্যবাদ জানায় তার প্রতি সদয় হওয়ার জন্য। এমন একটা আবহাওয়ার দরকার ছিলো ইনশিরাহর।

রেইনকোট চাপিয়ে তার শখের ক্যামেরাটা সে হাতে তুলে নেয়। এটা মেজো বাবা তার গত জন্মদিনে গিফট করেছিলো। ক্যামেরার লেন্স চেক করে একবার আশেপাশেও চোখ বুলিয়ে নেয়। যায়গাটা বেশ শুনশান। অবশ্য দুই একজন আসা যাওয়া করছে হাইওয়ে থেকে। গাড়ি চলাচল তো করছেই, ইনশিরাহর গোলাপী রঙের স্কুটি টা এক পাশে পার্ক করে রাখা। সে আজ এখানে এসেছে ছবি তুলতে। কিছু নতুন এবং ইউনিক ওয়াইল্ড লাইফ ফটো তুলে সে তার ফটোগ্রাফির গুরু আলবার্ট সিঞ্জকে পাঠাবে,আফ্রিকাতে। এখন তার পরবর্তী পদক্ষেপ হচ্ছে গামবুট পরে হাইওয়ের পাশ ঘেঁষা বিস্তৃর্ণ খোলা মাঠে নেমে ব্যঙের খোঁজ করা।

ইনশিরাহ হাসে। তাকে নির্ঘাত মানুষ পাগল ভাববে। অবশ্য ইনশিরাহর তাতে কিছুই যায় আসেনা। সে ঝাঁসি কি রানী মাতা রানী অদ্রিতা আলোর কন্যা।

নিজেকে সম্পূর্ণ সুরক্ষিত করে ক্যামেরা হাতে উঁচু রাস্তার ঢাল বেয়ে নামার জন্য পা বাড়ানোর আগেই সেখানে উপস্থিত হয় তার পরিচিত কালো মার্সিডিজ টা।

ইনশিরাহ একটুও অবাক হয়নি। সে তাকিয়ে আছে। রেইনকোটের টুপি তুলে রেখেছে মাথায়।

সাঈম গাড়ি থেকে নেমে এগিয়ে আসে। তার ঠোঁট জুড়ে প্রশ্বস্ত হাসি। সুগঠিত শরীরটায় হালকা গোলাপি রঙের ফরমাল শার্ট,টাই বেশ মানিয়েছে। ইনশিরাহ দেখে বলে ওঠে,“প্রযুক্তির সদ্ব্যবহার করো তুমি!”

সাঈম হাসে। ইনশিরাহ বলে,“চোরের মতো ট্র্যাক করে পিছু নেওয়াটা কোনো প্রেমিকের বৈশিষ্ট্য নয়।”

_যাক মানলে আমি তোমার প্রেমিক! আমি ভেবেছি আমি মূলার তরকারি! তোমার আশেপাশে থাকলেই বিরক্ত লাগে বলে কপাল কুঁ'চ'কে রাখো!

ইনশিরাহ মেকি হেসে বলে,“ঠু ফানি! এলে কেন?”

_ব্যঙ খুঁজতে! তোমার সাথে।

_অফিসের ফরমাল পোশাকে মানিয়েছে! সভ্য লাগছে বেশ।

_অ'সভ্য ছিলাম কখনো?

_আলবত! বাবার শত্রু সামিন ইয়াসার মির্জার কন্যাকে মাধ্যমিক থেকে লাইন মে'রেছো। নির্লজ্জের মতো!

কথাটা শেষ হতে না হতেই দু'টো ব'লিষ্ঠ হাতে ইনশিরাহর কাঁধ চে'পে ধরে নিজের কাছে নেয় সাঈম।
ইনশিরাহ চোখ পাকিয়ে তাকায়। চোখ মুখ কঠিন হয়ে গিয়েছে তার। সাঈম হাত সরিয়ে নিয়ে বলে,“ওহ সরি!”

তারপর ঘোর লাগা কন্ঠে বলে ওঠে,“আপনি অ'স'ভ্যতামির সংঙ্গা ভুলে গিয়েছেন ইনশিরাহ বিনতে সামিন। গত ছয় বছর ধরে যা করেছি সেগুলো আমার অ'স'ভ্যতামি নয়, আমার ধৈর্য্য। আর এই ধৈর্যের বাধ ভেঙে যেটা করে ফেলবো সেটা অ'স'ভ্যতামি ‌।”

সাঈমের মদ্যক দৃষ্টি থেকে চোখ সরিয়ে ইনশিরাহ অস্ফুট স্বরে বলে,“কি করবে!”

_বাবার শত্রু সামিন ইয়াসার মির্জার আদরের কন্যাকে তুলে নিয়ে বিয়ে করবো। ঝড় উঠবে শহরে, দু পক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া হবে। আইনের লোক হিমশিম খেয়ে যাবে তাঁদের সামলাতে।

বৃষ্টি নামতে শুরু করেনি তখনও। সিঁদুর রঙা আকাশটা আশ্চর্য রকমের সুন্দর ঠেকলো ইনশিরাহর কাছে। ইনশিরাহ হেসে ক্যামেরায় ঐ দৃশ্যটাকে বন্দী করতে করতে সাঈমের কথার জবাবে বলে,“দেখা যাক!”

★★★

কাঁধের ওপর নরম দুটো হাতের অস্তিত্ব টের পেয়ে আবেশে দু'চোখ বন্ধ করে ফেলে সামিন ইয়াসার মির্জা। রিক্লাইনার চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে সে পলিটিক্যাল ম্যাগাজিন পড়ছিলো।
ধীরে ধীরে হাত দুটো তার মাথায় উঠে চুলের মধ্যে বিচরণ করছে,চুল টেনে দিচ্ছে অত্যন্ত শৈল্পিক কৌশলে।

“মেয়ে ফিরেছে?”

স্ত্রীর উদ্দেশ্যে ধিমি আওয়াজে বলে সে। আলো মাথা থেকে হাত সরিয়ে গিয়ে স্বামীর মুখোমুখি বসে, কপট রাগ দেখিয়ে বলে,“দু দন্ড বাড়িতে থাকে আপনার মেয়ে? আজ এখানে ফটোগ্রাফি করতে যাচ্ছে তো কাল সেখানে। ও কি একটু বুঝবে না ও একটা মেয়ে? কিছু সীমাবদ্ধতা তো মেনে তো চলা উচিৎ। আপনারা তিন ভাই লাই দিয়ে দিয়ে একেবারে ন'ষ্ট করেছেন!”

সামিন স্ত্রীর কথায় হাসে। বলে,“খারাপ কোথায়? ফটোগ্রাফি কি খারাপ? মেয়ে বলে কি শখ থাকবে না? তুমি কি চাইতে মেয়ে ডাক্তার অথবা ইঞ্জিনিয়ার হোক? আমি ওসব চাইনা। আমি চাই মেয়ে ভালো থাকুক।”

_না আমি সেটা চাইনি। তবে অন্য কোনো শখকে বেছে নিতে পারতো। এই যে ফটোগ্রাফির নাম করে খালে বিলে ঘুরে বেড়ায়,ছেলেদের মতো। এগুলো কেমন দেখায় বলুন তো। গ্রাজুয়েশন শেষ হতে আর বছর খানেক লাগবে, তারপর ওর মেজো বাবার সাথে বিজনেস দেখবে। তা না করে বাউন্ডুলে হয়ে ঘুরে বেড়ায়। ইরফান আর ইনশিরাহ এমন হলো কেনো? কই আমার ইহান আর ইনায়া তো এমন নয়। যা বলি তাই করে।

সামিন হেসে বলে,“সবাই ভদ্র হলে চলবে? দেখবে এই দু'টোর কপালে এমন জীবনসঙ্গী জুটবে, একেবারে সিধে হয়ে যাবে। তুমি এতো চাপ নিও না। আচ্ছা প্রেশারের ওষুধ নিয়েছিলে তোমার?”

আলো মাথা নাড়ে। স্বামীর দিকে তাকিয়ে মুখ হাসি হাসি করে অস্ফুটে বলে,“ছাব্বিশ বছরে কতকিছু বদলেছে। আমরা বদলেছি। আপনি পলিটিক্স ছেড়েছেন। দল ক্ষমতা হারিয়েছে,পুনরায় ক্ষমতা পেয়ে আবারও হারিয়েছে। ছেলেমেয়েরা বড় হয়ে গিয়েছে। এই বাড়ির ডিজাইন বদলেছে। যে জিনিসটা কখনো পাল্টায়নি সেটা হচ্ছে ক্ষুদ্র আছিয়ার প্রতি তার মেয়র সাহেবের যত্ন। আপনি এতো ভালো না হলেও পারতেন।”

সামিন স্ত্রীর কথার জবাব না দিয়ে তার হাত দুটো টেনে নেয়। দৃষ্টি তার হাতের দিকে রেখে বলে,“আরেকটা জিনিস বদলায় নি। তোমার এই হাত দু'টো আগের মতোই নরম।”

আলো হাসে। সামিন ইয়াসার বলতে থাকে,“এই চুড়ি দু'টো কেমন কালচে লাগছে। পলিশ করাও না কেনো!”

_করাবো। এইবার পলিশ করে এই চুড়ি জোড়ায় যা স্বর্ণ ঘাটতি পরবে, নতুন করে গড়ে তুলেই রাখবো। আর হাতে রাখবো না।

সামিন স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে বলে,“কেনো?”

_ইহানের বৌ আনবো। এখন তো এই চুড়ির ওপর এই প্রজন্মের বড় ছেলের বৌয়ের অধিকার তাইনা?

সামিন ইয়াসার মির্জা মাথা নাড়ায়। স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বলে,“সময় কত দ্রুত আমাদের এখানে এনে দাড় করিয়েছে আছিয়া।”

_হু। মেয়েটা চব্বিশ পেরিয়ে পঁচিশে পা দেবে। ওকেও তো স্বামীর বাড়িতে পাঠাতে হবে। আল্লাহ জানে আমার মেয়েটার জুটি কার সাথে উনি লিখেছেন। আমার খুব ভয় লাগে মেয়র সাহেব। ও অতটা বাস্তব বাদী হয়নি। কেনো হয়নি জানি না, শুধু চাই মেয়েটা খুব ভালো থাকুক। মেয়েটা যতোই অগোছালো হোক না কেন আমার মেয়েতো কখনো কারো ক্ষতি করেনি তাই না। দিনশেষে এটুকুই জানি আমার মেয়েটা অবুঝ।

সামিন স্ত্রীর মাথায় হাত বুলিয়ে বলে,“কেমন জামাই চাও মেয়ের জন্য?”

_আপনার মতো, অবিকল আপনার মতো।

সামিন স্মিত হেসে স্ত্রীর হাত দুটো ধরে বলে,“পেয়ে যাবে।”

★★★

এই মুহূর্তে ইনায়া বুদ্ধি আটছে কি করে মেজো দাদানের হাত থেকে রেহাই পাওয়া যায়, নয়তো বন্ধুদের সাথে করা আজকের দিনের প্ল্যান পুরোপুরি ভেস্তে যাবে।

বাইক টা জ্যামে আটকা পরেছে মিনিট বিশেক হলো। সামনে লাল পিঁপড়ার সাড়ির মতো গাড়ি গুলো লম্বা লাইনে আটকে আছে। অনবরত হর্ন বাজিয়েই যাচ্ছে এই সেঞ্চুরির ব্যস্তবাবুরা। ইরফান মির্জা নির্লিপ্ত হয়ে বসে আছে,অধৈর্যশীল ইরফান মির্জার ধৈর্য দেখে ইনায়া অবাক। এতো শান্ত হয়ে বসে আছে কিভাবে! এতক্ষণে তো বাংলাদেশের ট্রাফিক পুলিশের গুষ্টি উদ্ধার করে হয়ে যাওয়ার কথা!

ইনায়া বুকে অনেক খানি সাহস জড়ো করে কাঁচুমাচু মুখ করে বলে ওঠে,“মেজো দাদান!”

“হু।”

ইরফানের একশব্দে ইনায়া আবারও একটা ঢোক গিলে নেয়। পর পর বলে,“এখানে নেমে পরি আমি? অপজিটে গিয়ে একটা ক্যাব নিয়ে নেবো দাদান, তোমার কষ্ট করতে হবে না!”

ইরফান কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে ওঠে,“আমিও দেখতে চাই তোর বন্ধু গুলো কারা,যাদের সাথে তুই কম্বাইন্ড স্টাডি করবি বলে কেঁদে কেঁটে বড় মায়ের কাছ থেকে পারমিশন এনেছিস। একটু পরিচয় করিয়ে দিবি না? আমার একটুও কষ্ট হচ্ছে না,তুই এতো চাপ নিস না!”

ইনায়ার গলা শুকিয়ে যায়। দাদান যদি একবার টের পায় কম্বাইন্ড স্টাডি মিথ্যা কথা তারা আসলে কনসার্ট দেখতে যাবে তাহলে আজ ইনায়ার খেল খতম! কেউ রক্ষা করতে পারবে না আজকে!

ইনায়ার এখন মেজাজ খারাপ হচ্ছে। কেন যে মেজো দাদানের সামনে পরলো!
এখন ইনায়া দুইটা কাজ করতে পারে এক বাইক থেকে নেমে পালানো,অথবা দুই প্ল্যান ক্যানসেল করে দাদানকে বুঝিয়ে সুজিয়ে বাড়িতে ফিরে যাওয়া যাতে ঘুনাক্ষরেও ইনায়াদের প্ল্যানের কথা দাদান টের না পায় ‌।
এক নাম্বার অপশন টা করা যাবে না,তাই ইনায়া মিনমিন করে ইরফানকে বলে,“দাদান....”

_হু।

_দাদান,আমার শরীরটা হঠাৎ করে খুব খারাপ লাগছে। চলো বাড়িতে ফিরে যাই।

_সে কিরে! কম্বাইন্ড স্টাডি করবি না তোর বান্ধবীদের সাথে? কত কষ্টে বড় মায়ের থেকে পারমিশন নিলি।

_না, ভীষণ জ্বর জ্বর লাগছে। চলো ফিরে যাই আজ থাক।

ইরফান এদিক ওদিক তাকিয়ে বলে,“ওকেহ! তোর মর্জি! আমি তবে বাইক ঘুরিয়ে নিই!”

ইনায়া বুকে পাথর চাপা দিয়ে বলে,“হু!”

★★★

পৌঢ় বুক মার্কেট থেকে কাজীপাড়া রোড, বাইকে করে গেলে মোট আঠেরো মিনিটের রাস্তা। বাসে খুব বড় জোর মিনিট ত্রিশেক লাগে। অর্ধেকের বেশি রাস্তা অতিক্রম করার পরে প্রেরনা স্কুটারে ব্রেক ক'ষে। পেছন থেকে প্রিতম বলে ওঠে,“এনি প্রবলেম আপু!”

_আরে আমি সম্ভবত ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে একটা বই ফেলে এসেছি,ঐ যে যেটা পরে প্যাক করা হয়েছিলো।

_কি বলছো! চেক করে দেখো আগে।

প্রেরনা চেক করে দেখে তার ধারণা সত্যি! প্রিতম অভয় দিয়ে বলে,“প্রবলেম নেই। বিকেলে আমি এনে দেবো। তুমি চলো। শুদ্ধ আর প্রনমি অপেক্ষা করছে!”

_তুই কিভাবে আনবি! তোর না কাজ আছে! দাড়া বেশি তো সময় লাগবে না!

_আচ্ছা ঠিকাছে, তুমি নামো। আমাকে ড্রাইভ করতে দাও। তাড়াহুড়ো করে একটা অঘটন ঘটাবে।

প্রেরনা হেসে ভাইয়ের সাথে জায়গা অদলবদল করে নেয়। প্রিতম স্কুটার স্টার্ট করতে করতে বলে,“হাই ওয়েতে জ্যাম আজ। লেকপার্কে রবি কিরণের সমাবেশ। আমি হসপিটাল রোড নিই বরং।”

_চল।

প্রিতম ছুট লাগায় স্কুটার। একটানে নিউটাউন রোড থেকে ডিসি অফিসের সামনে গিয়ে ডানে মোড় ঘুরতেই বিপরীত পাশ থেকে ক্ষিপ্র গতিতে ছুটতে ছুটতে আসা একটা বাইকের সাথে মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়।

কিছু বুঝে ওঠার সময় নেয়নি কোনো পক্ষই। যতক্ষনে তারা বুঝতে পেরেছে ততক্ষণে তারা নিজেদের আবিষ্কার করলো নিচে।
প্রেরনা উঠে বসে তার শাড়ি ঠিক করতে ব্যস্ত। শাড়িটা গায়ে ভালো করে জরিয়ে নেয়। প্রিতম উঠে বোনকে টেনে তোলে।

অন্য বাইকে থাকা আরোহী দু'জন উঠে দাঁড়ায়। হাত পা ছিলে গিয়েছে সম্ভবত। প্রেরনা হেলমেট খুলে তাদের দিকে এগিয়ে যায়, উৎকণ্ঠা নিয়ে বলে,“আর ইউ ওকে গাইজ!”

ইনায়া হেলমেট খুলে প্রেরনার দিকে তাকিয়ে বলে,"“ফাইন! আপনি ঠিক আছেন? কিছু হয়নি তো!”

প্রেরনা মাথা নাড়ায়। প্রিতম মাথা থেকে হেলমেট খুলে তাকিয়ে আছে সামনের দিকে। হেলমেটের ওপর থেকে ইরফানের চোখের দিকে সে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। ইরফান ধীরে ধীরে হেলমেট সরাতেই প্রিতমের চোয়াল শক্ত হয়ে যায়। ইরফান হাত মুষ্টিবদ্ধ করে টান টান দাঁড়িয়ে আছে। দুজন দুজনের দিকে এমন ভাবে তাকিয়ে আছে যেন এক্ষুনি নে'কড়ের মতো ঝাঁপিয়ে পরবে।

প্রেরনা আর ইনায়া একবার নিজেদের ভাইকে দেখতে থাকে, আরেকবার অপরপাশের ব্যক্তিকে দেখতে থাকে।

ইনায়া প্রিতমকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে। দেখছে প্রেরনাকেও। দু'জনের নীল চোখ! এতটা নীল চোখের বাঙালি সে কখনো দেখেনি!

মুহুর্ত কে'টে যায়। রাগে কাঁপতে কাঁপতে ইরফান হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলার অবস্থায়। ফোঁস শব্দে একটা গভীর নিঃশ্বাস ফেলে সে দাঁতে দাঁত চেপে প্রিতমকে বলে,“তোর সবসময় আমার রাস্তায় আসার খুব শখ তাইনা!”

কথাটা মাটিতে পরার আগেই প্রিতম জবাব ফিরিয়ে দেয়,“আমিও তো বলতে পারি, সবসময় তুই আমার রাস্তায় আসিস!”

ইরফান শার্টের হাতা গোটাতে গোটাতে এগিয়ে আসে। প্রিতম হাত মুষ্টিবদ্ধ করে টান টান দাঁড়িয়ে।

প্রেরনা বা ইনায়া কেউই বুঝতে পারছে না কি হতে যাচ্ছে! তাদের বোঝার কথাও না!

চোখের পলকেই ইরফান অতর্কিতে প্রিতমের কলার ধরে। প্রিতমও পাল্টা কলার ধরে ইরফানের।

ইনায়া বিকট চিৎকার দিয়ে মুখ চেপে ধরে। প্রেরনা ছুটে গিয়ে ভাইকে পেছন থেকে জাপ্টে ধরে ছাড়ানোর চেষ্টা করে।

ইরফানই প্রথম প্রিতমের নাক বরাবর একটা ঘুষি বসিয়ে দেয়,পাল্টা আঘাত প্রিতমও ফিরিয়ে দেয়।

দু'জনে ক্ষ্যাপা নেকড়ে হয়ে উঠেছে। কপালের দুপাশের রগ দৃশ্যমান। শুধু ফোঁস ফোঁস আওয়াজ বের হচ্ছে।

প্রেরনা টানছে প্রিতমকে,ইনায়া ছুটে এসে টানছে ইরফানকে। কেউ পেরে উঠছে না। আশেপাশে লোকজন নেই বললেই চলে। চেঁচিয়ে কোনো লাভ হবে কিনা সন্দেহ।

ইতিমধ্যে আঘাতে আঘাতে দু'জনেই রক্তাক্ত। ইরফান আরেকটা ঘুষি নিয়ে তে'ড়ে এসে চেঁ'চি'য়ে বলে,“বাস্টার্ড!”

প্রেরনা মাঝখানে চলে যায়। তার চোখ থেকে আগুন ঝরছে। ইরফান থেমে যায়। প্রেরনা চেঁ'চি'য়ে উঠে বলে,“বাস্টার্ড কাকে বলছো অভদ্র ছেলে!”

ইরফান প্রেরনাকে দেখে,প্রেরনার উচ্চতা, শারীরিক গঠন দেখে সে ভেবেছে তার ছোট হবে হয়তো। পাল্টা চেঁচিয়ে বলে,“এই মেয়ে! মাঝখান থেকে সরে যাও বলছি!”

প্রিতম বোনকে ঠেলে মাঝখান থেকে সরিয়ে দিয়ে বজ্রপাতের ন্যায় বলে ওঠে,“আমার আপুকে উল্টো পাল্টা বললে খুব খারাপ হয়ে যাবে স্কাউন্ড্রেল!”

ইরফান তাচ্ছিল্যর হাসি হাসে। প্রেরনার দিকে তাকিয়ে ব্যঙ্গ করে বলে,“ওহহ আপু! ওহহ বড় আপু! তো শ্রদ্ধেয়া আপু! আপনি প্লিজ পাশে দাঁড়ান।‌ আপনার সোনা ভাইয়ের মুখের অবকাঠামো চেঞ্জ করতে দিন!”

প্রিতম তে'ড়ে যায়,“খুব দম তোর না? খুব দম! আয়, আয় তাহলে দেখি কে কার থোবরা পাল্টে দেয়।”

দু'জনে পুনরায় দুজনের ওপর ঝাঁপিয়ে পরে। একবার প্রিতম ওয়ালের সাথে ইরফানকে ঠেকিয়ে ঘুষি মেরে বলে,“পাতি গুন্ডা কোথাকার! বহুত ভদ্র থেকেছি আমি! আজ তোকে বোঝাবো!”

পরমুহূর্তেই চাল পাল্টে যায়,ইরফান প্রিতমকে দেয়ালে ঠেকিয়ে ঘুষি মেরে বলে,“আমি পাতি গুন্ডা? নে তাহলে!..."

প্রেরনা আর ইনায়া গাঁয়ের সমস্ত শক্তি প্রয়োগ করে দু'জনকে কোনোমতে ছাড়ায়।

প্রেরনা চেঁচাতে থাকে,“আমি পুলিশ ডাকবো! স্টপ! দু'জনেই থামো।”

কে শোনে কার কথা,কিং কোবরার মতো ফুঁসছে দু'জন।

ইনায়া কোনো উপায়ান্তর না পেয়ে শিগগিরই ফোন লাগায় বড় দাদানের নাম্বারে।
এদিকে প্রেরনা ভাইকে ধাক্কা মেরে দূরে সরিয়ে দিয়ে মাঝখানে দাড়িয়ে যায়।
ইরফান একদলা থুথু রাস্তায় ছুঁড়ে ফেলে হিংস্র দৃষ্টিতে দেখে প্রিতম কে। আজ প্রিতমও যেন হিংস্র হয়ে উঠেছে।

পকেট থেকে ফোন বের করে ইরফান কারো নাম্বার ডায়াল করে ওপাসের ব্যক্তিকে বলে ওঠে,“যত জন পারিস চলে আয় কালী মন্দির রোডে!”

প্রিতম চোখ মুখ খিচিয়ে নিজের ফোন বের করে ফোন লাগায় জামির নাম্বারে,
“কালী মন্দির রোডে আয়। সবকটা আয়!”

★★★

গরমের ভয়ংকর দাপটে অস্থির দুপুর। ইনায়ার মাথার রগ দু'টো লাফালাফি করছে। ইরফানের পেছনে দাঁড়িয়ে আছে সে, কিন্তু সে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দাদানের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকা লম্বা, সুদর্শন,সুদেহী আর অদ্ভুত নীলচে চোখের ক্ষ্যাপাটে মানুষটার দিকে। তার ধারণা ছিলো এই শহরে তার মেজো দাদানই একমাত্র তারকাটা লোক,তবে সামনে রক্তাক্ত মুখ নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটাকে দেখে বুঝতে পারছে সেও কোনো অংশে কম না। ইনায়ার এবার ভয় বাড়ছে। বড় দাদান কেনো আসছে না! আজ যদি এখানে কুরুক্ষেত্র হয় তখন! তার মেজো দাদানকে যদি ঐ লোকটা খুব মা'রে!

তার ঘোর কাটে প্রেরনার কন্ঠস্বর শুনে। প্রেরনা প্রিতমকে ধ'ম'কে স্কুটার স্টার্ট করতে বলছে, প্রিতমের বন্ধু বান্ধবদের ধ'ম'কে চলে যেতে বলছে।

ইতিমধ্যে ঐ স্থানে পৌঁছে গিয়েছে প্রিতম আহসান আর ইরফান মির্জা উভয়ের ডজনখানেক বন্ধু বান্ধব। কারো কারো হাতে হকিস্টিক। সবাই যু'দ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে যেনো। আজ এখানে খেলা হবে।

প্রিতম বোনের কথায় ভ্রুক্ষেপ না করে বলে,“আপু তুমি যাও। আমি একটু বোঝাপড়া করে আসছি।”

ইরফান ইনায়াকে উদ্দেশ্য করে বলে,“যা এখান থেকে। আমি আসছি!”

ঠিক সেসময়ে ইহান তাজওয়ার মির্জার নীল রঙের বিএমডব্লিউটা এসে থামে সেখানে।

সবাই সেদিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করে। দরজা খুলে বেরিয়ে আসে শুভ্র পাঞ্জাবি পরিহিত ইহান তাজওয়ার, সানগ্লাস টা চোখ থেকে খুলে ফেলে সে সবার দিকে একপলক তাকায়।

ইনায়া ছুটে গিয়ে বড় ভাইয়ের পেছনে দাঁড়ায়।

রাস্তায় দুপাশে নয়টা নয়টা করে মোট আঠেরোটা বাইক। বিশ থেকে ত্রিশজন লোক। ইরফানের বাইক আর প্রেরনার স্কুটি সেভাবেই পরে আছে।

ইহান সবার দিকে একপলক দৃষ্টি দিয়ে প্রিতম আর ইরফানের রক্তাক্ত মুখমন্ডল দেখে।

সবাই কিছুটা থ' হয়ে গিয়েছে ইহান তাজওয়ার মির্জাকে দেখে। ইরফান তাকিয়ে আছে তার ভাইয়ের দিকে।

প্রেরনা ইহানকে দেখে এগিয়ে আসে, গম্ভীর কন্ঠে বলে ওঠে,“শুরুটা আপনার ভাই করেছে!”

ইহান একপলক প্রেরনার দিকে তাকিয়ে সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলে,“আমার পার্টি অফিসে চলো সবাই! এখানে দাঁড়ানো প্রত্যেককে বলা হলো!”

প্রেরনা প্রশ্ন তোলে,“কেনো?”

ইহান ঘুরে প্রেরনার দিকে তাকিয়ে বরফ ঠাণ্ডা গলায় বলে,“বিষয়টা থানা অবধি গেলে আপনার এবং আমার দু'জনের ভাইকেই একটু ভুগতে হবে। ঝামেলা যেহেতু একটা হচ্ছে,এর শেষ দরকার। এখন আপনি ঠিক করুন,আপনি কম্প্লেইন করতে চাচ্ছেন নাকি কম্প্রোমাইজ!”

প্রেরনা একপলক প্রিতমের দিকে তাকায়। কয়েক মূহুর্ত চুপ করে থেকে বলে,“কম্প্রোমাইজ!”

ইহান প্রেরনার দিক থেকে চোখ সরিয়ে হকি স্টিক হাতে দাঁড়িয়ে থাকা ইরফান আর প্রিতমের উভয়ের বন্ধুদের উদ্দেশ্য করে বলে,“কোনো দাদা গিরি না। আপনাদের প্রত্যেককে অত্যন্ত সম্মানের সহিত আপনাদের মূল্যবান অস্ত্র ফেলে দিয়ে আমার পার্টি অফিসে আসার আমন্ত্রণ রইলো‌‌।”

কথাটা বলে ইহান ইরফানের দিকে তাকায়। তারপর ঠান্ডা গলায় বলে,“গাড়িতে গিয়ে বোস! তিন সেকেন্ডের মধ্যে।”

ইরফান প্রিতমের দিকে তাকিয়ে একদলা থুথু মাটিতে ফেলে গাড়িতে গিয়ে উঠে বসে। ভাইয়ের কথার অবাধ্য হওয়ার সাহস পাচ্ছে না আপাতত।

চলমান......

[ শুধু ইহান প্রেরনাই কেনো,অন্যদের কেনো আনি না। ভাই কাহিনীর একটা ধারাবাহিকতা আছে। সময় মতো ওদের কাহিনীও বেশি করে আনা হবে। তখন ইহান প্রেরনা থাকবে না।
আর ইনশিরাহর চরিত্রটা অনেকের পছন্দ হচ্ছে না জানি। কিন্তু গল্পের এই নায়িকা চরিত্রটাই সবথেকে বেশি স্কেচ হবে আমার হাতে। মানে ইনশিরাহ আর ইরফান চরিত্র দুটিকে নিয়ে আমার ক্যারেক্টর ডেভেলপমেন্টের এক্সপেরিমেন্ট করার ইচ্ছা। আলো ধুমধাম থাপ্রা থাপ্রি করতো বলে তার মেয়েও করবে এমনটা ভাবা নেই আমার। আমি কাহিনী আগাচ্ছি, ওকে সাজাবো বলে। সামিন কন্যা ইনশিরাহ আলো হবে না, গল্পটা বধূদের নিয়ে, ওকে বধূই বানাবো। ]

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 5 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন