#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_৬
#ইসরাত_ইতি
[ ১ম অংশ। ]
প্রেরণা রাস্তায় পরে থাকা স্কুটি তুলে ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বলে,“আয়।”
প্রিতম মাথা ঘুরিয়ে ইহান তাজওয়ারের গাড়িতে বসে থাকা ইরফানের দিকে এক পলক তাকিয়ে স্কুটারের দিকে এগিয়ে যায়।
তখনই ডি.সি. অফিস রোডে একটা গোলাপী স্কুটি এসে থামে। ইনশিরাহ বড় দাদানের একটা ফোনকল পেয়ে ফটোগ্রাফি, বয়ফ্রেন্ড সব ফেলে ছুটতে ছুটতে এসেছে। কিছু কি হয়েছে! কোনো বিপদ হলো কি না! দাদান তো এভাবে ডাকে না! উদ্বিগ্নতায় ট্রাফিককে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে উড়ে উড়ে এসে কালী মন্দির রোডে ল্যান্ড করেছে। স্কুটি থামিয়ে হেলমেট সরিয়ে আশেপাশে তাকিয়ে সে হতবাক! এখানে কি হকি ম্যাচ চলছে নাকি! ইনশিরাহ জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তার বড় দাদানের দিকে তাকায়, তাকায় ইনায়ার দিকে।
ইহান শান্তস্বরে বোনকে বলে,“ইনুকে নিয়ে বাড়িতে যা।”
_এখানে কি হয়েছে দাদান।
_ওকে নিয়ে বাড়িতে যা।
বলেই ইহান ইনায়ার দিকে তাকায়। ইনায়া সুরসুর করে বোনের স্কুটির কাছে চলে যায়।
ইহান তাজওয়ার নিজের গাড়িতে উঠে গাড়ি স্টার্ট দেয়। প্রেরনাও স্কুটি স্টার্ট দেয়,প্রিতম বোনের পেছনে বসে। একে একে তীব্র আওয়াজ তুলে আঠেরো টা বাইক স্টার্ট হয়। গন্তব্য তাদের ইহান তাজওয়ার মির্জার পার্টি অফিস!
★★★
দোতলা এপার্টমেন্টের পুরোটা জুড়ে ইহান তাজওয়ার মির্জার দলীয় অফিস। প্রধান দালানের সামনে অনেকটা খোলা যায়গা,এখানেই সবসময় দলীয় আলাপ আলোচনা করা হয়। তবে আজ সবাই পার্টি অফিসের ভেতরের মিলনায়তন রুমে জড়ো হয়েছে।
ইহান একটা চেয়ারে মুখভঙ্গি স্বাভাবিক করে বসে আছে। তার সামনেই দু সাড়ির চেয়ার সাজানো, ডান দিকের সাড়িতে বসে আছে প্রিতমের বন্ধু বান্ধব আর বাম দিকের সাড়িতে বসে আছে ইরফান মির্জার বন্ধু বান্ধব।
ইহানের দলের ছেলেরা সবার হকিস্টিক বাজেয়াপ্ত করে ইহানের সামনেই রেখেছে। তার দৃষ্টি সেগুলোর দিকে। খানিক বাদে সে চোখ তুলে একপলক প্রেরণাকে দেখে, প্রেরনা তার ভাইয়ের ক্ষতস্থানে নিউস্ট্রিপ ব্যন্ড লাগিয়ে দিচ্ছে। চোখ ঘুরিয়ে সে ইরফানের দিকে তাকায়। ইরফানের বন্ধু তাহিরা আর নিক্সন তার ফার্স্টএইড করে দিচ্ছে।
অন্যরা সবাই চুপচাপ,টু শব্দটিও নেই। এবং কিছুটা ভীতসন্ত্রস্ত,এটা ইহান তাজওয়ার মির্জার তল্লাট। মানুষটা যতটা সভ্য শান্ত ততটাই ক্ষ্যা'পাটে তা সবার জানা। কোনো গাইগুই করা যাবে না।
মুহুর্ত কে'টে যায়। ইহান গলা খাঁকারি দিয়ে সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করে নড়েচড়ে বসে। সবাই তার দেখাদেখি নড়েচড়ে বসে।
ইরফান গা ছাড়া ভঙ্গিতে চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আছে শুধু। ইহান ইরফানের বন্ধু নিক্সনের দিকে তাকিয়ে বলে,“এবার বল! ঝামেলাটা কেনো হচ্ছে?”
প্রেরণা তীক্ষ্ম দৃষ্টি দিয়ে ইহান তাজওয়ারের দিকে তাকিয়ে আছে।
নিক্সন নামের ছেলেটা একপলক ইরফান আর প্রিতমের দিকে তাকিয়ে ইহানকে বলে,“একটা মেয়ে!”
_একটা মেয়ে কি?
কান ঝাঝিয়ে দেয়া গম্ভীর স্বর ইহানের।
_ঝামেলাটা একটা মেয়েকে নিয়ে হচ্ছে।
_খুলে বল।
_রিপ্পি নামের একটি মেয়েকে ইরফান পছন্দ করে। প্রিতমও পছন্দ করে।
প্রেরণা সাথে সাথে প্রিতমের মুখের দিকে তাকায়। প্রিতম মাথা নিচু করে বসে আছে।
ইহান তাজওয়ার বলতে থাকে,“তারপর?”
_তারপর কি! এটা নিয়েই ঝামেলা হচ্ছে।
_আচ্ছা বোস।
ইহান ঘুরে প্রিতমের এক বন্ধুর দিকে তাকিয়ে বলে,“তোমার নাম?”
_আমার নাম শুভ।
_হ্যা শুভ বলো,এই মাত্র নিক্সন যা বললো এটাই কি কারন নাকি অন্য কোনো কারণ আছে!
_আমার জানামতে এটাই ভাইয়া। এছাড়াও স্পোর্টস ক্লাবের সভাপতি হওয়া নিয়েও ফাইট হয়েছিলো বেশ কয়েকবার,তবে এটাই মূল কারণ সম্ভবত ।
_ও.কেহ।
প্রেরনা তাকিয়েই আছে ইহানের দিকে। লোকটা কি করতে চলেছে সে বুঝতে পারছে না।
ইহান প্রিতম আর ইরফানের বন্ধুদের উদ্দেশ্য করে বলে,“তোমাদের দু পক্ষের ভাষ্যমতে তোমাদের বন্ধু রিপ্পি নামের মেয়েটাকে পছন্দ করে। তা রিপ্পি মেয়েটা কাকে পছন্দ করে? ইরফান অর প্রিতম?”
সবাই চুপ,এই প্রশ্নের উত্তর তো তাদের জানা নেই। ইহান ঠোঁটে এক চিলতে বাঁকা হাসি ফুটিয়ে বলতে থাকে,“মেয়েটাকে এখানে ডাকো। আধাঘণ্টার মধ্যে।”
প্রেরণা সাথে সাথে বলে ওঠে,“এতে মেয়েটাকে হেনস্থা করা হবে।”
_যথেষ্ঠ সম্মান এবং বিনয়ের সাথে তাকে আনা হবে।
প্রেরনা বলে,‘তারপর কি করবেন এনে?’
_খুব সিম্পল। রিপ্পি মেয়েটা এদের দুজনের মধ্যে যাকে পছন্দ করে তার সাথে আজ বিয়ে দেবো, এখানেই,কাজী ডেকে। অন্যজন সে বিয়ের সাক্ষী হয়ে সাইন করে মিষ্টি খেয়ে বাড়িতে চলে যাবে। ঝামেলা এখানেই শেষ হবে। এর পর এসব নিয়ে কখনো ঝামেলা হবে না!
প্রেরনা হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে। ইহান তাজওয়ার চোখ সরিয়ে নিয়ে নিক্সনের দিকে তাকিয়ে রাশভারী গলায় বলে,“কল হার!”
★★★
ছোটোখাটো,সুশ্রী,দেখতে ভারি মিষ্টি একটা মেয়ে। এককথায় রূপবতী,আকর্ষণীয়া। ডার্ক মেরুন রঙের থ্রিপিস পরিহিত, ওড়নাটা খুবই মার্জিত ভাবে মাথায় জরিয়ে আছে। বেশভূষা বেশ ভদ্র, সবমিলিয়ে মেয়েটিকে বেশ ভদ্র মনে হচ্ছে। তবে চেহারায় ভয়ের ছাপ স্পষ্ট। মেয়েটি ধীরপায়ে হেঁটে কক্ষে প্রবেশ করেই ইহান তাজওয়ার মির্জাকে বিনয়ের সহিত সালাম দেয়।
সবার দৃষ্টি তার দিকে। প্রিতম আর ইরফান দু'জনেই একপলক রিপ্পির দিকে তাকিয়ে চোখ নামিয়ে চুপচাপ বসে আছে।
ইহান তাজওয়ার সালামের জবাব বলে,“বসো।”
দলের একজন ছেলে রিপ্পিকে চেয়ার দেখিয়ে দিতেই রিপ্পি জড়োসড়ো হয়ে বসে। সে মাথা ঘুরিয়ে একপলক ইরফান আর প্রিতমকে দেখে চোখ নামিয়ে বসে থাকে।
ইহান তাজওয়ার রিপ্পির দিকে তাকিয়ে স্বভাব সুলভ গম্ভীর স্বরে বলে,“বাড়ি কোথায় তোমাদের?”
_কাঞ্চনরোডে ভাইয়া।
_এখানকার স্থানীয়?
_জি ভাইয়া।
_ওহহ,আচ্ছা । তো রিপ্পি ঘাবড়ানোর কিছু নেই,এখানে তোমাকে শুধুমাত্র দু তিনটে প্রশ্ন করবো বলে ডেকেছি। বি ইইজি!
রিপ্পি চুপচাপ মাথা নাড়ে। ইহান তাজওয়ার বলতে থাকে,“ঐ যে তোমার সামনে দুজন বসে আছে, ইরফান মির্জা এবং প্রিতম আহসান। এই দুজন ভদ্রলোককে ব্যক্তিগত ভাবে তুমি চেনো?”
রিপ্পি চোখ তুলে আবারও দু'জনকে দেখে নিয়ে নিচুগলায় বলে,“চিনি ভাইয়া।”
_কিভাবে চেনো?
_একই কলেজ থেকে গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট করেছি যে, ক্লাসমেট। অবশ্য তিনজনের আলাদা ডিপার্টমেন্ট।
_আচ্ছা। তো এখন তোমাকে আমি সরাসরি একটা প্রশ্ন করি। এদের মধ্যে কেউ তোমাকে প্রেমের প্রস্তাব দিয়েছে কখনও?
_দুজনেই ভাইয়া।
মিনমিন করে রিপ্পি বলে।
_আচ্ছা বুঝলাম,তো এবার বলো,এদের মধ্যে কাউকে তোমার পছন্দ? ভালোলাগে কাউকে তোমার? কাউকে ভালোবাসো?
রিপ্পি ঘা'ব'ড়ে যায়,কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমেছে। সে কাঁপা কাঁপা গলায় বলে,“কি বলছেন ভাইয়া। আমি ওদের পছন্দ করিনা। আমি কারো বাগদত্তা। গত পরশু আমার বাগদান হয়েছে। দুমাস পরে বিয়ে।”
ইহান তাজওয়ারের দৃষ্টি চলে যায় রিপ্পির হাতের দিকে, অনামিকায় সত্যিই একটা হীরের আংটি, ঝকমক করছে।
কক্ষের সবাই রিপ্পির দিকে তাকিয়ে আছে। ইরফান আর প্রিতম দু'জনেই মাথা তুলে রিপ্পির মুখের দিকে তাকায়। দু'জনেই অবাক, হতবাক,হতাশ!
ইহান তাজওয়ারের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি, নির্নিমেষ চাহনি। সে রিপ্পিকে বলতে থাকে,“অভিনন্দন। আসলে এই প্রশ্নটা করার জন্যই তোমাকে ডাকা। হয়েছে কি, ওদের মধ্যে একটা কনফিউশন তৈরি হয়েছিল,সেটা দূর করলাম। এনি ওয়ে,কি নাম বললে? রিপ্পি! শোনো ভবিষ্যতে কখনো যদি এই দুজনের মধ্যে কেউ তোমাকে বিরক্ত করার চেষ্টা করে তাহলে নির্দ্বিধায় আমাকে জানাবে। আমার অফিসের নাম্বার টা নিয়ে যাও।”
রিপ্পি মাথা নাড়ায়। তারপর ইহান তাজওয়ারের কাছ থেকে অনুমতি নিয়ে একপলক প্রিতম আর ইরফানের দিকে তাকিয়ে বেড়িয়ে যায়।
ইহান তাজওয়ারের পার্টি অফিসের মিলনায়তন কক্ষে সবাই চুপচাপ। প্রেরণা নিজের ভাইয়ের দিকে সেই কখন থেকে তাকিয়ে আছে । ইরফান আর প্রিতম একই ভাবে মাথা নিচু করে বসে ছিলো। তারপর ইহান তাজওয়ারের রাশভারী কন্ঠস্বরে চোখ তুলে তাকায়।
ওদের দুজনের দিকে দৃষ্টি স্থির রেখে ইহান বলতে থাকে,“এই বিষয়ে সবকিছু এখানেই শেষ হবে। এরপর তোমাদের মধ্যে কেউ ঐ মেয়েটার ইস্যু টেনে এনে ঝামেলা করবে না। মেয়েটা কারো বাগদত্তা,আশা করি বিষয়টা ক্লিয়ার দু'জনের কাছে।”
_সেটা আপনার ভাই বুঝলেই হলো। ঝামেলা তো সে আগে শুরু করে।
কাঠ কাঠ বলে ওঠে প্রেরণা।
ইহান তাজওয়ার তার দিকে তাকায়, প্রেরনার কথার জবাবে কিছু বলে না,তবে ইরফানের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে,“ইরফান এখন প্রিতমকে সরি বল।”
কক্ষের সবাই ইহানের এমন আদেশে চ'মকালেও চ'মকায়নি ইরফান। সে জানতো তার বড় ভাই তাকে দিয়ে সরি বলিয়ে ছাড়বে। এমন অভিজ্ঞতা তার জীবনে বহুবার হয়েছে। ঘা'ড় ধরে তাকে দিয়েই সরি বলিয়েছে তার বড় ভাই আর বাপ চাচারা! সরি বলা তার কাছে ডালভাত।
কক্ষের সবাই আরেকবার অবাক হয় যখন ইরফান কোনো গাইগুই না করেই প্রিতমের দিকে তাকিয়ে বলে,"সরি!"
প্রিতম তাকিয়ে আছে শান্ত চোখে,সে ইরফানের চোখের ভাষা পড়ে ফেলেছে, ঐ চোখের ধারালো চাউনী তাকে বুঝিয়ে দিচ্ছে,"সামনে আবারও দেখা হবে! তৈরি থাকিস!"
সে বললো,"ইটস্ ওকে।"
প্রেরনা এতক্ষণ সব দেখছিলো। ইহান তাজওয়ার মির্জার নিরপেক্ষ আচরণ তার কাছে বেশ ভালো লেগেছে। সে নিজের ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বলে,"প্রিতম তুইও সরি বল!"
প্রিতম বোনের দিকে তাকায়। ইহানও দেখতে থাকে কাঠিন্যতায় ভরা সাতাশ আঠাশের ছিমছাম গড়নের ভদ্রমহিলাকে। প্রেরনা তার দিকে তাকিয়ে বলে,"ভুল আমার ভাইয়েরও ছিলো। আর আমিও আমার ভাইকে যথাযথ শিক্ষা দিয়েছি যে ভুল করলে ক্ষ'মা চাইতে হয়।"
"প্রিতম সরি বল।"
বোনের কাছ থেকে দ্বিতীয় বারের মতো আদেশ পেয়ে প্রিতম ইরফানের দিকে তাকিয়ে বলে,"সরি!"
ইরফান প্রিতমের দৃষ্টি দেখে ফিচেল হাসে। কেননা মুখে সরি ফুটলেও ঐ দৃষ্টি তাকে বুঝিয়েই দিচ্ছে,"এতো তাড়াতাড়ি সব শেষ হবার নয়!"
সে গা ছাড়া ভাব দেখিয়ে শুকনো গলায় বলে,"ইটস্ ওকে!"
ইহান তাজওয়ার এবার সবাইকে, ইরফান-প্রিতম গ্যাংয়ের সবাইকে উদ্দেশ্য করে বলে,"এবার সবাই বাড়িতে যাও। বন্ধুকে সবসময়ে ভালো পরামর্শ দিয়ে সাহায্য করতে হয়, তোমাদের মতো হকিস্টিক নিয়ে বন্ধুর হয়ে গুন্ডামি করতে হয়না। এর পরে এই দু'জনের হয়ে কুরুক্ষেত্রে অংশ নেওয়ার আগে মনে রেখো, আমি এ শহরে আছি।"
সবাই লজ্জিত হয়ে বসে আছে মাথা নিচু করে। তাদের সামনে টানটান হয়ে দাঁড়িয়ে ভাষণ দেওয়ার মতো কথা বলতে থাকা,শুভ্র পাঞ্জাবি পরে হাতা গুটিয়ে রাখা,লম্বা চওড়া মানুষটার ব্যাক-গ্রাউন্ড হিস্ট্রি এদের মধ্যে কারো অজানা নয়।
চলমান....
[ ২য় অংশ পোস্ট করা হয়েছে। লিংক কমেন্ট বক্সে 👇]#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_৬
#ইসরাত_ইতি
[ ২য় অংশ ]
[ ১ম অংশের লিংক কমেন্টে]
“আপু ...এই আপু! দাঁড়াও না। আমার কথা তো শোনো!”
প্রেরনার পিছু পিছু লম্বা লম্বা পা ফেলে প্রিতম আসছে, বোনকে কৈফিয়ত দিচ্ছে সে।
ফ্ল্যাটে ঢুকে প্রেরনা লিভিং রুমের সোফায় ধপ করে বসে পরে। রাগে তার গা কাঁপছে। প্রিতম গিয়ে বোনের সামনে,মেঝেতে হাঁটু গেড়ে বসে।
বোনের হাত দু'টো মুঠি করে ধরে বলতে থাকে,"আপু..এমন করছো কেনো? তোমার কথা মতো সরি বলে তো এলাম!"
_ঐ মেয়েটা? ওকে তুই বিরক্ত করতিস! হাহ! আমার ভাই মেয়েদের বিরক্ত করে! এটাও আমার শুনতে হবে!
প্রিতম মুখে চ বর্গীয় শব্দ করে বলে,"আপু ওকে পছন্দ করতাম! বিরক্ত নয়। বিরক্ত তো ইরফান করতো। ওর আচরণ দেখেছো কেমন? কতটা উগ্র! "
_হু। দেখলাম, সামিন ইয়াসার মির্জার কথা যা শুনেছি তাতে তাদের বাড়ির ছেলের এমন আচরণ সত্যিই দুঃখজনক। তবে ইহান তাজওয়ার মির্জার নামে যা শুনেছি সব সত্যিই মনে হচ্ছে। লোকটা নিরপেক্ষ বিচার করে।
_হু। তার ওপর সামনে ইলেকশন ল'ড়বে বলে অল্প স্বল্প শোনা যাচ্ছে। তার আগে জনগণের কাছে একটা পজিটিভ ইম্প্রেশন ছড়িয়ে দিতে চাচ্ছে।
প্রেরনা ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বলে,"সে যাই হোক। আমাদের তাতে কি। আমাদের এতো কিছু দিয়ে কাজ কি! তবে ভাই,আমি যেন কখনও না শুনি তুই ঐ ছেলের সাথে আবার ঝামেলায় জরিয়েছিস! কথা দে! ওদের সাথে আমরা পারবো? আমাদের মাথার ওপর কে আছে! কেউ নেই!"
প্রিতম হাসে,বলে,"তুমি চিন্তা করো না। আর কখনও এমন কিছু শুনবে না।"
মাম্মা আর মামার গলার আওয়াজ পেয়ে শুদ্ধ লিভিং রুমে উঁকি দেয়। প্রেরনার চোখে পড়তেই সে ছেলেকে হাত বাড়িয়ে ডাকে। শুদ্ধ গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে যায় মাম্মার কাছে,আদর নিতে। সারাদিন পরে মায়ের কোল পেয়ে সে লুফে নেয় উষ্ণতা।
প্রিতম বোন আর ভাগ্নের দিকে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে আছে। প্রেরনা চুমু দিয়ে ভিজিয়ে দিচ্ছে ছেলের গাল।
মা ছেলেকে বিরক্ত না করে প্রিতম উঠে দাঁড়ায়। নিজের রুমে যেতে যেতে আড়চোখে আরো একবার প্রেরনার দিকে তাকায় সে। শুদ্ধ আরেকটু বড় হলেই আপুর বিয়ে দেবে প্রিতম,মনে মনে এই সিদ্ধান্ত সে বহু আগে নিয়ে রেখেছে। জীবন এভাবে চলতে পারে না। কখনোই পারে না, সবচেয়ে বড় কথা প্রিতম কখনোই তার মা বাবার থেকেও বেশি আপুর নিঃসঙ্গ জীবন দেখতে পারবে না। এমন কাউকে প্রিতম খুজে বের করবে যে হবে তার আপুর উপযুক্ত, শুদ্ধর উপযুক্ত। শাওকাত ওয়াসীতের বিকল্প নয়, কিংবা প্রতিদ্বন্দীও নয় কিন্তু আগলে রাখবে ঠিক শাওকাত ওয়াসীতের মতোই। প্রিতমের বিশ্বাস, পৃথিবীর কোথাও না কোথাও কেউ না কেউ তো অবশ্যই আছে।
★★★
প্রকৃতিকে দু'চোখ ভরে কখনো দেখতে না পারলেও প্রনমি আর পাঁচটা স্বাভাবিক মানুষের মতোই প্রকৃতির স্বাদ নিতে চায়। ছুঁয়ে দেখতে চায় প্রকৃতিকে। সান্নিধ্যে থাকতে চায় প্রকৃতির। খোলা হাওয়া তাকে ছুঁয়ে যাবে, শিরশির করে উঠবে তার কায়া। এই অনুভূতি প্রনমির বড্ড প্রিয়। সে সবসময় উতলা থাকে প্রকৃতির সাথে মিশে যেতে। তার জন্য প্রনমির কাছে এই এপার্টমেন্টের টেরেস টা একেবারেই উপযুক্ত স্থান। মন চাইলেই মিস জেনিকে নিয়ে চলে আসে সে।
এই অ্যাপার্টমেন্টের টেরেস টা চমৎকার,প্রনমি শুনেছে। সে এখানে আসলেই বিভিন্ন ধরনের ফুলের গন্ধ পায়। মন ভরে যায় প্রনমির। একটা সুইমিং পুলও আছে। প্রনমি পুলের পাশে ইয়োগা ম্যাট বিছিয়ে ইয়োগা করে, এতে তাকে সহায়তা করে মিস জেনি।
পরন্ত বিকেলে প্রনমি একাই বসে আছে পুলের ধারে। মিস জেনি কিছুসময়ের জন্য আটতলায় গিয়েছে, ওয়াশরুম যাবে তাই।
প্রনমির মনে হলো আশেপাশে কেউ নেই,তাই বিড়বিড় করে গাইতে শুরু করলো,
“ফাগুন, হাওয়ায় হাওয়ায় করেছি যে দান--
তোমার হাওয়ায় হাওয়ায় করেছি যে দান--
আমার আপনহারা প্রাণ আমার বাঁধন-ছেড়া প্রাণ.....”
“বাহ! চমৎকার গান গাও তো তুমি!”
মোটামুটি পরিচিত পুরুষালি কন্ঠস্বর পেয়েই প্রনমি হকচকিয়ে ওঠে। গুটিয়ে গিয়ে নিজের ওড়না সামলে নিতে ব্যস্ত।
রাদিফ হাতের সিগারেটটা ফেলে পা দিয়ে পি'ষে দেয়। তার লোলুপ দৃষ্টি প্রনমির বুকের কাছে নিবদ্ধ। মেয়েটা তার কন্ঠস্বর শুনে কেমন গুটিয়ে গিয়েছে, জড়োসড়ো হয়ে বসে আছে। এই ব্যাপারটাও রাদিফ খুব উপভোগ করে। নমনীয়,ভীত মেয়েদের স্বাদ অন্যরকম!
রাদিফ বলে ওঠে,"আমি রাদিফ!"
_জি ভাইয়া। বুঝতে পেরেছি।
প্রনমির ভীষণ অস্বস্তি হচ্ছে। সে যখনই ছাদে আসে তখনই এই লোকটা কোথা থেকে উদয় হয় কে জানে!
রাদিফ বাঁকা হাসি হেসে বলে,"খুব মিষ্টি তোমার গলা। তোমার মতোই!"
প্রনমি হাসার চেষ্টা করে।
"প্রনমি!"
প্রেরনা এসে ছাদের দরজার কাছে দাঁড়ায়। প্রনমি ইয়োগা ম্যাটের ওপর রাখা স্টিক টা হাতরে তুলে নিয়ে উঠে দাঁড়ায়।
রাদিফকে দেখে প্রেরনার বিরক্ত লাগে ভীষণ। সে এসে প্রনমির হাত ধরে বলে,"আয় আর এখানে থাকতে হবে না। বেলা পরে গেছে।"
_তুমি এলে কখন। মিস জেনি কোথায়?
_মিস জেনিকে শুদ্ধ আটকে দিয়েছে গেমস খেলবে। চল।
রাদিফকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে প্রেরনা বোনকে নিয়ে ছাদের দরজার দিকে এগিয়ে যায়। পেছনে দাঁড়িয়ে রাদিফ বাঁকা হাসি হাসে। তারপর একটা সিগারেট ধরিয়ে পুলের এক সাইডে বসে। কন্টাক্ট লিস্ট থেকে তার প্রেমিকা নাম্বার চারকে ফোন লাগায়, সদ্য ইন্টার ফার্স্ট ইয়ারে উঠেছে মেয়েটা, পটানো খুব একটা কঠিন ছিলো না। অবশ্য এই বয়সী মেয়েরা রাদিফের মতো সুদর্শন,যার গাড়ি আছে,তার কাছে ধরা দিতে সময় নেয়না। তবে প্রেরনা সম্ভবত নেবে, ভদ্রমহিলা একটু রক্ষনশীল মানসিকতার বোঝাই যায়। এই মহিলাকে রাদিফ খুব একটা বুঝতে পারছে না, একটা ধাঁধার মতো, তাই খুব সাবধানে পা ফেলতে হবে। অবশ্য যা হবে তা মিউচুয়ালি হোক রাদিফ এটাই চায়,জোর জবরদস্তি রাদিফের পছন্দ নয়।
★★★
গাড়ি থেকে নেমে ইরফান সোজা হেঁটে দোতলায় চলে যায়। ইহান গাড়ি পার্ক করে নামে। ইরফানের বাইকটা পার্টি অফিসেই রেখে এসেছে। পুরো রাস্তায় ইহান তাজওয়ার চুপচাপ ছিলো,আজকের ঐ ঘটনা নিয়ে দুই ভাইয়ের এখনও আলাদা করে কথা হয়নি।
ঘরে ঢুকে দেখে তার পাপা আর দুই চাচা নিচতলার লিভিং রুমে বসে চা খাচ্ছে। সাথে এই বাড়ির তিন কর্ত্রীও আছে। এই ছয়জনকে এভাবে দেখলে ইহানের মনে হয় ইহান এই শতাব্দীর সবথেকে ভাগ্যবান কেউ! যে যৌথ ফ্যামিলি নামে একটা চমৎকার পরিবেশে বড় হয়েছে। এর পেছনে সামিন ইয়াসার মির্জা এবং তার সহধর্মিণী আলোর অবদান অনস্বীকার্য। বরাবর বেঁধে রেখেছে এই পরিবারকে।
ইহানকে দেখে ইশমাম মির্জা বলে ওঠে,"কি হয়েছে? দু'জন এভাবে ফিরলি কেন? ইরফান কি করেছে?"
_তেমন কিছুই না, সাধারণ একটা ঝামেলা। মিটে গিয়েছে, ডোন্ট প্যানিক।
কথাটা বলে ইহান সিড়ি বেয়ে সোজা দোতলায় চলে যায়। রিতু আবারও ব্যস্ত হাতে ফোন বের করে তার স্বামী, ভাসুর আর দেবরের সামনে রাখে। তারা এতক্ষণ ইহান তাজওয়ারের জন্য পছন্দ করা পাত্রীর ব্যাপারে আলাপ করছিলো।
দোতলায় উঠে ইহান সোজা গিয়ে ইরফানের ঘরের দরজায় টোকা দেয়।
ইরফান দরজা খুলে ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বরফ ঠাণ্ডা গলায় বলে,"সরি বলে এসেছি। তোমার ইমেজ বাঁচিয়েছি। আর কি করবো?"
ইহান ভাইয়ের পা থেকে মাথা অবধি দেখে বলে ওঠে,"হাতে পায়ে বড় হলেও ঠিক বড়ো হোসনি। ফারদার যদি আমার কানে আসে এমন কিছু, তাহলে কিন্তু আর তোকে বোঝাতে আসবো না। একেবারে চিটাগাং পাঠিয়ে দেবো। বন্দরের বিজনেস টা দেখবি। আর হ্যা। সামনের মাস থেকে অফিসে বসবিই! এটা সবসময় মাথায় রেখে চলবি। আর কখনও যেনো ঐ ছেলে রিলেটেড কোনো ঝামেলায় তোকে না দেখি। মাইন্ড ইট!"
ভাইকে কথাটা বলে ইহান চলে যায় নিজের ঘরে, ইরফান কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বাকা হাসি হেসে মনে মনে আওড়ায়,"এই তো সবে শুরু! ঐ প্রিতমের কি অবস্থা করি দেখো!"
★★★
শহরের শেষ প্রান্তে ফিশ মার্কেট টা। এখানে প্রেরনার সপ্তাহে চারদিন যাতায়াত। অবশ্য এই কাজটা অন্য কাউকে দিয়ে করানো যায়,তবে প্রেরনার কাছে অন্যদের কাজ পছন্দ নয়। তারা কেউ প্রেরনার মতো দেখেশুনে বাজারসদাই করতে পারে না। রেস্তোরাঁর জন্য দেখে শুনে তাজা মাছ কিনতে হয়,ভোক্তাদের স্বার্থটাই প্রেরনা আগে দেখে।
আজ বন্দরে তিনটা বিশালদেহী জেলে ট্রলার এসেছে, নৌকা ভর্তি টাটকা তাজা ইলিশ। সকাল সকাল প্রেরনাকে এখানকার মহাজন কল করেছে,এসে দেখে শুনে যেনো নিয়ে যায়। লোকটা প্রেরনাকে গত তিনবছর ধরে দেখছে। ব্যবসায়িক সম্পর্কের বাইরেও একটা পিতৃসুলভ স্নেহ কাজ করে তার বিধবা,আত্মমর্যাদাসম্পন্ন মেয়েটির প্রতি।
লোকজন ট্রলার থেকে কর্ক তুলছে আড়তে, সেখান থেকে বাছাই এবং প্রক্রিয়াজাত হয়ে মাছ গুলো ফিশমার্কেটে রাখা হবে,চলে যাবে টাউনের সব সুপার মার্কেট গুলোতে।
প্রেরনা আড়তে ঢুকেই মাছ দেখার সুযোগ পেয়ে গেলো। এই আড়তে পুরুষদের পাশাপাশি মহিলারাও চাকুরী করে। অত্যন্ত পরিচ্ছন্ন একটি আড়ত।
প্রেরনা বারবার হাই তুলছে,রাতে ঠিকঠাক ভাবে ঘুম হয়নি তাই।
মহাজনকে দেখিয়ে দিচ্ছে কোন কোন মাছটা সে নিতে চাচ্ছে রেস্তোরাঁর জন্য। ঠিক সেসময়ে তার পাশ ঘেঁষে এসে দাঁড়ায় গাজী কিচেনের মালিক মহসিন আহমেদ। আড়চোখে প্রেরনাকে একপলক দেখে আড়তের মহাজন নেসারউদ্দিনের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে,"চ্যাহ! আরে ধূর মহাজন। আপনি আমার অর্ডার করা মাছ গুলো না দিয়ে কি করতেছেন!"
প্রেরনার বিরক্ত লাগে খুব, প্রেরনা এই লোকটাকে সহ্য করতে পারে না, ব্যবসায়িক জীবনে প্রেরনার শত্রু, প্রতিদ্বন্দ্বি। তার ওপর লোকটা উদ্ভট, চা'ড়াল, অ'স'ভ্য প্রকৃতির।
নেসারউদ্দিন বলে ওঠে,"আগে আম্মাজানের মাছ গুলো দিয়ে নিই। কতবড় রেস্টুরেন্ট! মেলা টাকার অর্ডার। একটু টাইম লাগবে!"
_কত বড় রেস্টুরেন্ট? শহরে কি আর কারো রেস্টুরেন্ট নাই নাকি! ঐ তো খালি একটু ভুগিচুগি ডেকোরেশন আর কিছু মেয়েছেলে বেপর্দা হয়ে পুরুষ লোককে খাবার বে'ড়ে খাওয়ায়। এতেই বড় রেস্টুরেন্ট হয়ে গেলো?
কথাটা নিতান্তই অপমান জনক, প্রেরনার ইচ্ছে করলো এই লোকটার টুটি চেপে ধরতে,কিন্তু ধরলো না। সে শ্লেষের হাসি হেসে বলে,"একটু লাগাম টেনে কথা বললে ভালো হয়না আঙ্কেল!"
এই কথাটিতে দ্বিগুণ চটে যায় মহসিন। সে বরাবর প্রেরনাকে হিংসা করে এসেছে, শহরের কেন্দ্রবিন্দুতে একেবারে পজিশন নিয়ে হোটেল খুলেছে, ব্যবসায়িক বুদ্ধি খুবই ধারালো মেয়েটার। ঐ রেস্তোরাঁর জন্য তার গাজী কিচেন লাভের মুখ দেখে না। আজ প্রেরনার কথাটিতে সে দপ করে জ্বলে উঠলো, চিবিয়ে চিবিয়ে বলে উঠলো,"কিয়ামত অতি সন্নিকটে!"
ইহান তাজওয়ার বেশ বিব্রত ভঙ্গিতে সবার সালামের উত্তর দিচ্ছে। তার সালামের উত্তর দেওয়া নিয়ে কোনো অসুবিধা নেই তবে লোকজন তাকে যেভাবে সমীহ করে সালাম দিচ্ছে তার আদৌও যোগ্য ইহান তাজওয়ার মির্জা? সে তো মোদ্দাকথা একজন গু'ন্ডা, হ্যা খাস বাংলাতে তাকে গুন্ডাই বলে। টুকটাক মানুষের উপকার করে, এই যা!
ফিশ মার্কেটের অভ্যন্তরে ইহান তাজওয়ারকে নিয়ে বেশ বড় সড়ো জটলা। সে এগিয়ে যাচ্ছে। ইদানিং একটা সিন্ডিকেটের কবলে পড়েছে মার্কেটটা। এখানকার মহাজন শ্রেনীর কয়েকজন লোকের অনুরোধে ইহান তাজওয়ার এসেছে একটা সুরাহা করবার জন্য।
জেলার পুলিশ প্রশাসন আপাতত অকেজো,এরা এই ভঙ্গুর সরকারের অধীনে থানায় বসে নাকের অভ্যন্তরীণ লোম ছে'ড়ে আর চা গিলতে থাকে। আর ক্ষমতাসীন দলের কথা বাদই থাকলো,ওরা মোটা অংকের টাকা ছাড়া কোনো সালিশ করে না।
ইহানকে দেখে চেয়ার এগিয়ে দেয় এক মুরব্বি শ্রেনীর লোক। সে যারপরনাই বিরক্ত হয়। চেয়ারটাতে ঐ মুরব্বিকে বসতে বলে নিজেই নিজের জন্য একটা চেয়ার টেনে বসে। সবার দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে,"বলুন! কিভাবে সাহায্য করতে পারি আপনাদের!"
ভেতরের আড়তে তখন চেঁচামেচি শুরু হয়ে গিয়েছে। ইহানের মনোযোগ আটকে দেয় চেঁচামেচি,সে একজন মহাজনকে বলে,"কি হয়েছে? ওখানে কিসের ঝামেলা!"
_ওখানে একটা লাফরা হয়েছে। দুই রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ীর মাঝে। ব্যাপার না। রোজ চলে এমন!
_লাফরা?
ভ্রু কুঞ্চিত ইহান তাজওয়ারের।
_হু, স্বাদে-আহ্লাদে বনাম গাজী কিচেন!
“আরেকবার বলুন!”
নির্লিপ্ত হয়ে তাকিয়ে আছে হাজী মহসিনের দিকে প্রেরনা।
হাজী মহসিন হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে আজ,অনেক দিনের ক্রোধ আর সংযমে রইলো না তার। চেঁচিয়ে ওঠে বলে,"গতর দেখিয়ে কাস্টমারের দৃষ্টি আকর্ষণ করো, এজন্য ব্যাবসায় এগিয়ে আছো। কিছু বুঝি না তাইনা? সব সুন্দরী বিধবাদের চাকুরী দিয়েছো।”
প্রেরনা দু'চোখ বন্ধ করে একটা গভীর নিঃশ্বাস ছাড়ে। যথাসাধ্য চেষ্টা করছে সে নিজেকে আটকাতে, মুরব্বি শ্রেনীর মানুষের গায়ে হাত তুলতে ইচ্ছে করছে না সকাল সকাল। সে খুবই দৃঢ় ভাবে বলে,"আপনি জানেন এই মাত্র যে কথাটা বললেন তার জন্য আমি আপনার নামে মানহানির মামলা করতে পারি!"
_হ্যা, নারী হবার সুবিধা ভোগ করবা না? এই দেশটা তো গেছে, পরপর দুই নারী ক্ষমতায় আসার পর দেশটা রসাতলে গিয়েছে, দেশটাকে ধ্বংস করছে ছাড়ছে,আর তোমাদের মতো মেয়েরা পুরুষের সাথে প্রতিযোগীতা শুরু করছে।
প্রেরনা নিজেকে শান্ত করে খুবই ভদ্রভাবে বলে,"ঐ বিতর্কে আপনার সাথে যেতে চাইনা। এই দেশটা ধ্বংস করার পেছনে আপনার মতো ক্যাপিটালিস্টদের অবদান কম নয়। আর আপনার নিজের ব্যাবসা প্রতিষ্ঠান ধ্বংসের পেছনে আপনার মতো বুদ্ধিহীন সজারুর অবদান কম নয়। এই যে রেস্তোরাঁয় লিখে রেখেছেন “এখানে শুধু ভর্তা ভাজি দিয়ে ভাত পরিবেশন করা হয়না” এর জন্য আপনার কাস্টমার নেই। আপনার খুব ক্ষোভ আমার প্রতি তাইনা ? শুনুন আপনার ব্যাবসার ক্ষতির কারণ আমার কিংবা আমার কর্মচারী মহিলাদের গতর নয়, বরং আপনার গু লেভেলের বিজনেস স্ট্রাটেজি!"
এটুকু বলে প্রেরনা থামে। তারপর বলে,"মুরব্বি বলে এরিয়ে গেলাম,বয়স হলে মানুষ বুদ্ধি হারায় জানি, ভবিষ্যতে কোনো বাজে এবং অশোভন কথাবার্তা বললে জিভ কেটে রেস্তোরাঁর সামনে সাজিয়ে রাখবো আঙ্কেল।"
সবাই হা তাকিয়ে আছে প্রেরনার দিকে। প্রেরনা ফুঁসছে।
ইহান তাজওয়ার চুপচাপ দাঁড়িয়ে প্রেরনার কথা শুনছিলো। তার পাশে তার দলের ছেলেরা। প্রেরনা তাদের কাউকেই খেয়াল করেনি তখনও।
মহসিনের মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে গিয়েছে। প্রেরনা একটু দম নিয়ে বলতে থাকে,"আর এই গতরের কথা বললেন না? আফসোস, আপনারা পুরুষরা এই গতর ছাড়া কখনও কিছু ভাবতেই পারেন না।"
প্রেরনা ঘুরে মহাজনের দিকে তাকিয়ে বলে,"আঙ্কেল! মাছগুলো ভ্যানে তুলে দিন। আর বিলটা টেক্সট করে পাঠিয়ে দেবেন। আমি আসছি, আজ বারে রবিবার, রেস্তোরাঁ জমজমাট থাকবে বুঝলেন। এখানে দাঁড়িয়ে থেকে পা টা টনটন করছে,গতরটা সুস্থ রাখতে হবে তো! এই গতরের কত মহিমা আঙ্কেল!"
আড়তের মহিলা কর্মীরা ফিক করে হেসে ওঠে। যা মহসিনের কাটা ঘায়ে নুনের মতো কাজ করে।
ইহান তাজওয়ার তাকিয়ে আছে,তার সামনেই কয়েকগজ দূরে দাঁড়িয়ে থাকা মলিন বেশভূষায় ছোটোখাটো,সাধারণ দেখতে ভদ্রমহিলার দিকে। প্রেরনা উল্টোদিকে ফিরে কথা বলছিলো। তার লম্বা বেনী কোমর ছুঁয়েছে। প্রেরনার কথা বলার তালে তালে বেনীও দুলছে।
ইহানের পাশ থেকে অন্তর বলে ওঠে,"ভাই কি কথা জানে হুমকি ধামকি আপা!"
ইহান তাকাতেই অন্তর নিজেকে শুধরে নিয়ে বলে,"সরি, ভদ্রমহিলা!"
প্রেরনা মহসিনের মুখে ঝামা ঘষে ঘুরে দাঁড়াতেই ইহান তাজওয়ার মির্জাকে দেখতে পেয়ে থেমে যায়। অত্যল্পকাল দুজনের চোখাচোখি হয়। তারপর প্রেরনা পাশ কাটিয়ে চলে যায়।
ইহান দাঁড়িয়ে। হঠাৎ-ই একপেশে হাসি ফুটে উঠলো তার ঠোঁটের কোণে, মুহূর্ত কাটবার আগে তা মিলিয়েও গেলো। অন্তর বিড়বিড় করতে থাকে,"কি রাগ!"
ইহান স্মিত হেসে মনে মনে আওড়ায়,"আসলেই! কি রাগ!"
চলমান....
[ অনেক বড় একটা পর্ব দিলাম। কমেন্ট চাই কমেন্ট।]