#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_৯
#ইসরাত_ইতি
[ ১ম অংশ ]
থানার গোল টেবিলে তিনজন তরুণী, নিঃসন্দেহে তিনজন রূপবতী তরুণী বসে আছে। কনস্টেবল থেকে শুরু করে ডিউটিরত ঊর্ধ্বতন অফিসাররা চোখ গোল গোল করে তরুনীদের দেখছে। এদের মধ্যে এই থানার পুরনো কর্মকর্তা কর্মচারীরা থাকলে ইনশিরাহকে চিনে নিতো। কিন্তু এই শিফটের অফিসার এবং কনস্টেবলগুলো নতুন, ইনশিরাহকে চিনতে পারেনি।
ইনশিরাহ হুডির টুপি তুলে মাথা সহ চোখ পর্যন্ত ঢেকে বসে আছে। কোনো প্রকার নড়চড় নেই। রাগে,জিদে দাঁত দিয়ে ঠোঁট কামড়ে বসে থাকলেও উৎকণ্ঠা,ভয়ে সে রীতিমতো জড়োসড়ো হয়ে গিয়েছে।
মানহা আর তুনা কপালে হাত দিয়ে ঝিমুচ্ছে। ওদের মধ্যে মানহা খানিক ভীতু প্রকৃতির। কান্না পাচ্ছে তার, কিন্তু ইনশিরাহর ভয়ে কাঁদছে না।
থানার কিছু অল্পবয়সী কনস্টেবল থানা প্রাঙ্গণেই চা খেতে খেতে বারে বারে ইনশিরাহদের দেখছে আর চাপা স্বরে হাসছে। অ'দম্য কৌতুহল তাদের চোখে, দেখতে শুনতে ভালো ঘরের, বড়লোকের মেয়েগুলোকে এস.পি স্যার নিজে ধরে এনেছেন, নিশ্চয়ই কোনো বড় কেস হবে হয়তো। নিশ্চয়ই মা'দকের কেস হবে।
এই কেসের দু'জন ইনচার্জ কনস্টেবলকে পাশ কাটিয়ে যেতে দেখে আরেকজন কনস্টেবল জানতে চায়,“এই কেস কি রে? এরা কারা?”
_আরে হাইওয়েতে পাগলের মতো গাড়ি চালাচ্ছিলো। বুনো ফরিংয়ের মতো উড়ছিল। এস.পি স্যার আই.জি.পি স্যারের হেডকোয়ার্টার থেকে ফিরছিলো, তখন স্যার নিজে আটকালো, পরে খতিয়ে দেখলো এর ড্রাইভিং লাইসেন্সই সাথে নেই।
_মদ খেয়েছে নাকি?
_না,টেস্টে তো দেখা যাচ্ছে খায়নি। তবে এদের ছাড়া পেতে অনেক হ্যাপা পোহাতে হবে, এস.পি স্যারকে ভীষণ রাগিয়ে দিয়েছে। মুখে মুখে তর্ক করেছে। ঐ যে লম্বা মতো শার্ট প্যান্ট পরা মেয়েটা! ও স্যারকে কি বলেছে জানেন? বলেছে,“আপনি আমার বাবাকে চেনেন?”
_তারপর?
_তারপর আর কি, আমাদের জাঁদরেল স্যার এক ধ'ম'ক দিতেই চারশো চল্লিশ ভোল্টের ঝটকা খাওয়ার মতো কেঁপে উঠে সেই যে কচ্ছপের মতো কল্লা লুকিয়েছে টুপির ভেতরে এখনও মাথা তুলে তাকায়নি।
_যাই বলেন,নতুন স্যার ভীষণ জাঁদরেল। আঠেরো ঘন্টা হলো এই থানায় পা দিয়েছে আর তাতেই। দুপুরে ওসি স্যার তার অফিস থেকে বাত্তি ইন্দুরের মতো মুখ করে বের হয়েছে। নিশ্চয়ই কড়া ধ'মক খেয়েছে।
বাকি কথা শেষ করতে পারলো না কেউই। গেট থেকে একটা নীল রঙের গাড়ি থানা প্রাঙ্গণে এসে থামে। গাড়ি থেকে নেমে পরে শুভ্র পাঞ্জাবি এবং কটি পরিহিত স্বয়ং সামিন ইয়াসার মির্জা এবং ইহান তাজওয়ার মির্জা।
চাচা-ভাতিজা হন্তদন্ত হয়ে এফআইআর ডেস্কে গিয়ে জানতে চায় ইনশিরাহ নামের মেয়েটির কথা। সামিন ইয়াসার মির্জা পলিটিক্স ছেড়েছেন বহু বছর হয়েছে ঠিকই কিন্তু এই শহরে তাকে সমীহ করে চলে সবাই,যারা ঐ মুখটা চেনে। শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তিত্ব হিসেবে সামিন ইয়াসার মির্জা আজও সমাদ্রিত!
কনস্টেবল দু'জন এগিয়ে এসে সালাম দিতেই সামিন সালামের জবাব দিয়ে বলে,“ইনশিরাহ। তাকে কোথায় রাখা হয়েছে?”
পেছন থেকে একজন এসে জবাব দেয়,“ইনশিরাহ? কিন্তু সে তো...।”
সামিন ঘুরে তাকায় কনস্টেবলের দিকে। ইহান কনস্টেবলকে বলে ওঠে,“ইনশিরাহ সামিন ইয়াসার মির্জার মেয়ে। তাকে কোথায় রাখা হয়েছে?”
হতভম্ব হয়ে যায় দাঁড়িয়ে থাকা কনস্টেবল গুলো। মেয়েটা সামিন ইয়াসার মির্জার মেয়ে! এস.পি. স্যার একটাবারের জন্য মেয়েটার বাপের নাম শুনলোই না মেয়েটার থেকে । এতো বিরাট কে'লো হয়ে গেলো!
একজন কনস্টেবল নিজের হতভম্ব ভাব কাটিয়ে এগিয়ে এসে বলে,
_গোল টেবিল চত্বরে। আসুন আমার সাথে।
পুরনো দালানের কনস্টেবলরা একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করছে। তাদের চোখে মুখে বিস্ময় ভাব। শেষমেশ সামিন ইয়াসার মির্জার কন্যাকে ধ'রে আনা হলো থানায়?
★★★
ডেস্কের ওপরে নেম প্লেটটাতে মেটালের গোটা গোটা হরফে লেখা “মুঈন ফরাজী”।
একত্রিশ বছরের তাগড়া একজন পুরুষ। ঊনষাট তম বিসিএসয়ে উর্ত্তীণ দৃঢ় আত্মপ্রত্যয়ী,চৌকস একজন দেশ সেবক। স্বল্পদিনের পেশাগত জীবনে বরাবর নিজেকে উপযুক্ত প্রমাণ করে এসেছে। তুখোড় মেধাবী, বুদ্ধিদীপ্ত,তরুণ এবং গুরুগম্ভীর এই নতুন এস.পি স্যারকে অধীনস্থ কর্মকর্তারা প্রথম দর্শনেই মেপে ফেলেছে এই ডিপার্টমেন্টের একজন জাঁদরেল কর্মকর্তা হিসেবে। থানায় পা রাখার তিন ঘন্টার মাথায় যে লোক পুরনো কেস হাতে নিয়ে সাংবাদিকদের সাথে প্রেস ব্রিফিং করে এবং রাতে হাতে করে আসামী নিয়ে আসে থানায় তাকে নিঃসন্দেহে জাঁ'দরেল তকমা দেওয়া যায়।
পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের মূল ভবনে, তার কেবিনের সামনে এসে কনস্টেবল বদরুল দাঁড়িয়ে ডাকে,“স্যার!”
মুঈন ফরাজী কিছু ফাইল ঘাঁটাঘাঁটি করছিলো। তীক্ষ্ম, বুদ্ধিদীপ্ত দুটি চোখে কালো মোটা ফ্রেমের রিডিং চশমা। চুলে ট্রিম ছাট দেওয়া, গায়ে ব্রাউন কালারের একটা জ্যাকেটের নিচে কালো রঙের টিশার্টে আড়াল হয়ে আছে তার সুগঠিত,সুঠাম শরীর।
হাতের ফাইলটা থেকে মুখ তুলে বদরুলের দিকে তাকিয়ে সে গম্ভীর কন্ঠে বলে,“আসুন।”
বদরুল কেবিনে ঢুকতেই মুঈন ফরাজী বলে,“এখন কোয়ার্টারে ফিরবো আমি। ওসি সাহেবকে বলুন মেয়েগুলোকে সেইফলি পরিবারের লোকের কাছে হ্যান্ডওভার করতে। পরিবারের লোক এসেছে? এদের ব্যাকগ্রাউন্ড কি?”
ফাইল দেখতে দেখতে গা ছাড়া ভাব নিয়েই প্রশ্নটি করে মুঈন। যেন উত্তর শুনতে তার কোনো আগ্রহ নেই। ঐ হবে হয়তো কোনো শিল্পপতির মেয়ে।
বদরুল মাথা নে'ড়ে বলে,“সবকটাই ভদ্র ফ্যামিলির, ক্লিন ব্যাকগ্রাউন্ড। স্যার মানহা নামের মেয়েটির বাবা মা ডাক্তার, তুনা নামের মেয়েটি গার্মেন্টস মালিকের মেয়ে,আর স্যার ইনশিরাহ নামের মেয়েটি যে গাড়ি ড্রাইভ করছিলো তার বাবা এই আসনের সাবেক একজন সাংসদ ছিলেন,সামিন ইয়াসার মির্জা...”
আচমকা মাথা তুলে বদরুলের দিকে তাকায় মুঈন। স্যারের এমন চাহনি দেখে বদরুল মিইয়ে যায়। সে কি কিছু উল্টোপাল্টা বললো?
মুঈনের ভ্রু কুঞ্চিত,চোখে মুখে খানিকটা বিস্ময় এসে জড়ো হয়েছে। অবাক হওয়ার ভঙ্গিমাতেই বলে,“সামিন ইয়াসার মির্জার মেয়ে?”
_জি স্যার। আপনিও চেনেন তাকে? বড়ো ভালো লোক,এসেছে সে মেয়েকে নিতে....
হাতের ফাইলটা ধপ করে বন্ধ করে ডেস্কের ওপর রেখে মুঈন ত্রস্ত পায়ে হেটে কেবিন থেকে বেরিয়ে যায়।
কনস্টেবল বদরুল ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছে। এস.পি. স্যারের আবার কি হলো !
★★★
ইনশিরাহ পাপাকে দেখেই লাফিয়ে উঠে পাপার গায়ে একপ্রকার আছড়ে পরে। সামিন মেয়েকে আগলে নিয়ে মিহি স্বরে বলে,“ডোন্ট প্যানিক আম্মা...নাউ টেল মি হোয়্যাট হ্যাপেনড!”
ইনশিরাহ মাথা তুলে পাপার দিকে তাকিয়ে আমতা আমতা করতে থাকে,“পাপা আমি হাইওয়েতে....! ঐ লোকটা...আমি আসলে...!”
_খুলে বল ইশি।
গম্ভীর সুরে আদেশ ইহানের। ইনশিরাহ দাদানের দিকে ভীত চোখে তাকিয়ে বলে,“দাদান আমি আসলে...!”
সম্পূর্ণ কথাটা খুলে বলার আগেই কামরার দরজায় মুঈন ফরাজী এসে স্থির হয়। পাঁচ ফুট এগারোর শরীরের, আত্মবিশ্বাসী দু'টো চোখে কৌতুহল এবং খানিকটা বিস্ময় নিয়ে একবার সামিন ইয়াসার মির্জা আর একবার উজ্জ্বল শ্যামবর্ণের ছিমছাম গড়নের মেয়েটিকে দেখে।
এতক্ষণে মুঈন ফরাজী ইনশিরাহকে ভালো করে খেয়াল করে, মেয়েটির পরনে পুরুষালি বেশভূষা, তবুও মুখ থেকে নারী সুলভ স্নিগ্ধতা ঢাকা পরেনি একবারও। মুঈন শান্ত চোখে তাকিয়ে আছে। এই কি সেই? সেই ছোট্ট পুতুল!
ইনশিরাহ একবার গলা খাঁকারি দিয়ে অনেকটা সাহস নিয়ে পাপাকে সত্যিটা বলতে যাবে তখনই দরজার কাছে টান টান হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মুঈন ফরাজী গম্ভীর কিন্তু নম্রস্বরে ডেকে ওঠে,“সামিন বাবা!”
সামিন ঘুরে তাকায়। মুঈনকে চোখে দেখেই তার চোখ দুটো জ্বলজ্বল করে ওঠে, ঠোঁট প্রশস্ত হয় হাসিতে।
ইনশিরাহ মুঈনকে দেখতে পেয়ে ইহানের পেছনে আড়াল হয়ে দাঁড়ায়। ঐ জাঁদরেল লোকটার সামনে পরতে আর ইচ্ছে করছে না তার।
ইহান মুঈনের দিকে এগিয়ে গিয়ে হাসি দিয়ে হাত মেলায় মুঈনের সাথে। সামিন তখনও দাড়িয়ে মুঈনের পা থেকে মাথা অবধি দেখছে। মুঈন এগিয়ে এসে সামিনের সাথে কোলাকুলি করে। সামিন হেসে মুঈনের পিঠে চা'পড় মেরে বলে,“এভাবে দেখা হবে ভাবিনি। কেমন আছো বাবা?”
মুঈন একবার সামিন আরেকবার ইনশিরাহর দিকে তাকিয়ে অস্ফুটে বলে,“আলহামদুলিল্লাহ সামিন বাবা। আপনি...”
_আল্লাহ ভালো রেখেছেন বাবা।
ইহান পাশ থেকে বলে,“একটা প্রবলেম হয়েছে আসলে, ও ইনশিরাহ। ওকে একটু আগে....”
_আই নো, আমিই নিয়ে এসেছি থানায়।
ইহানকে পুরো কথাটা বলতে না দিয়ে মুঈন বললো। সামিন আর ইহান বিস্মিত। রীতিমতো হতবাক হলেও স্বাভাবিক ভাবে দাড়িয়ে থাকে দুজনেই,ইহান ঘা'ড় ঘুরিয়ে বোনকে দেখে। ইনশিরাহ,তুনা আর মানহা অন্যদিকে ঘুরে দাঁড়িয়েছে সাথে সাথে।
মুঈন দরাজ গলায় বলতে থাকে,“ড্রাইভিং লাইসেন্স ছাড়া গাড়ি নিয়ে হাইওয়েতে উঠেছে এবং ট্রাফিক রুলস ভে'ঙেছে।”
সামিন ইয়াসার নিজের কন্যার দিকে তাকায়। মুঈন আরেকবার ইনশিরাহর দিকে তাকিয়ে সামিনকে গম্ভীর স্বরে বলে,“ইজ শি ইয়র ড'টার সামিন বাবা?”
সামিন ইয়াসার মাথা নাড়ায়। মুঈন ইনশিরাহকে দেখে। চওড়া কপাল, আত্মবিশ্বাসী চেহারার জাঁদরেল,কর্তব্যপরায়ণ অফিসারের মুখভঙ্গি অদ্ভুত , ভীষণ অপ্রস্তুত হয়ে পরেছে। অত্যল্পকাল পরেই নিজের স্বভাবে ফিরে আসে, গাম্ভীর্য ফেরে মুখে।
সামিন মুঈনের কাঁধে একটা হাত রেখে বলে,“অপ্রস্তুত হচ্ছো কেনো? আমার মেয়ে জানলে তুমি তোমার দায়িত্ব পালন করতে না? তুমি উচিত কাজ করেছো বাবা।”
মুঈন স্মিত হাসে। ইনশিরাহ ভাইয়ের পেছন থেকে কচ্ছপের মতো মাথা বের করে সব দেখছে। ঐ জাঁদরেল অফিসারের সাথে পাপার এতো ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক কিভাবে, তা সে জানে না। এখন অবধি দাঁতে দাঁত চেপে আছে সে। কানের কাছে বাজছে ঐ লোকটার সে ভূমিকম্পের ন্যায় ধ'ম'ক।
“আমি তোমার বাবাকে চিনতে চাই না! বাট তুমি আমাকে চিনে রাখতে পারো। আ'ম মুঈন ফরাজী। ভদ্রভাবে ভ্যানে ওঠো। নয়তো লেডি কনস্টেবলরা টেনে হিচরে ওঠাবে! অ্যান্ড তোমার বাপের নাম এসে তোমাকে অত ইজিলি আমার হাত থেকে ছাড়িয়ে নিতে পারবে না!”
ইনশিরাহর চোখ মুখ কঠিন হয়ে যায় দৃশ্যটা মনে পরতেই। হাত মুষ্টিবদ্ধ করে দাঁড়িয়ে আছে সে। তার দৃষ্টি সামনের দিকে,দেখতে পাচ্ছে পাপা আর দাদান ঐ লোকটার সাথে হেসে হেসে কথা বলছে!
মানহাকে তার মাম্মা পাপার হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। তুনা আর ইনশিরাহ অপরাধীর ন্যায় দেয়ালে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তারা এখন পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে , মুঈনের কেবিনে।
একজন কনস্টেবল এস.পির কামরায় ঢুকে মুঈনকে বলে,“স্যার ডোপ টেস্ট রিপোর্ট নে'গেটিভ।”
মুঈন এক পলক সামিন আর ইহানের দিকে তাকিয়ে কনস্টেবলকে বলে,“যার রিপোর্ট তার হাতে দিন।”
কনস্টেবল হঠাৎ দাঁত বের করে নিশ্চুপ হেসে ইনশিরাহর হাতে রিপোর্টটা দিয়ে যায়। ইনশিরাহ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে রিপোর্টটার দিকে।
মুঈন ফরাজী তার ট্রিম কাট চুলে,ঘাড়ের কাছে হাত বুলিয়ে সামিনের দিকে তাকায়,এবার তাকে বিনয়ী লাগছে। ইহান তাজওয়ার পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে বলে ওঠে,“ক'টা নাগাদ এলে?”
_সকাল নয়টা!
_তোমার ব্রিফিং দেখলাম। খুব সুন্দর করে সাংবাদিকদের সামলেছো। হলুদ সাংবাদিকতার মুখে জু'তো পরলো।
মুঈন একপলক ইনশিরাহর দিকে তাকায়, ইনশিরাহ কপাল কুঁ'চকে তার দিকেই তাকিয়ে ছিলো, হঠাৎ মুঈনের দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিললে সে মাথা নিচু করে ফেলে।
সামিন মুঈনকে বলে,“তোমার আন্টি দুপুরেই আমাকে বলেছিলো তোমাকে ধরে নিয়ে যেতে।”
মুঈন বিনয়ে হাসে, কিছু বলতে যাবে তখনই একজন কনস্টেবল পাঁচ কাপ চা নিয়ে ভেতরে ঢোকে। তিনটা কাপ মুঈন ফরাজী, সামিন ইয়াসার মির্জা এবং ইহান তাজওয়ার মির্জার হাতে দিয়ে অবশিষ্ট দু'টো কাপ নিয়ে বোকার মতো দাঁড়িয়ে থাকে কনস্টেবল। মুঈন ফরাজী ইনশিরাহর দিকে না তাকিয়েই কনস্টেবলকে বলে,“ওনাদের দিন।”
ইনশিরাহ দাঁতে দাঁত চেপে দাঁড়িয়ে থাকে। তখন আজেবাজে যা নয় তাই বলে বাড়াবাড়ি রকমের ধমকাধমকি করে এখন চা খাওয়াবে! আশ্চর্য লোক তো!
কনস্টেবল পুনরায় দাঁত বের করে ইনশিরাহর দিকে চায়ের কাপ হাতে এগিয়ে যেতেই ইনশিরাহ নিচু কিন্তু গম্ভীর কন্ঠে বলে,“নো থ্যাংকস!”
মুঈন ফরাজীর ঠোঁটের কোণে এক চিলতে সুক্ষ্ম হাসির রেখা ফুটে উঠেই মিলিয়ে যায়,সে চুপচাপ চায়ে চুমুক দিয়ে ইহান তাজওয়ারের সাথে আলাপ করতে থাকে, ইনশিরাহ দাঁড়িয়ে থাকে ল্যাম্পোস্টের মতো,হাতে তার দলিল,সে মদ খেয়ে গাড়ি চালাচ্ছিলো না,তার প্রমাণ।
দীর্ঘ আলাপ শেষে সামিন আর ইহান উঠে দাঁড়ায়। পুনরায় করমর্দন করে ইনশিরাহকে নিয়ে কেবিন থেকে বেরিয়ে যায় তারা। যাওয়ার আগে ইনশিরাহ অহেতুক এক পলক দৃষ্টি দেয় মুঈন ফরাজীর দিকে। মুঈনের মুখভঙ্গি গম্ভীর, দৃষ্টি শান্ত। সোজা হয়ে বসে আছে।
ইনশিরাহ তার বাবা ভাইয়ের সাথে বেরিয়ে যেতেই মুঈন দরজার দিকে বেশ কিছু মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে টেবিলের ওপর থেকে একটা ফাইল তুলে নেয়। দৃষ্টি হাতের লাল রঙের ফাইলটাতে থাকলেও আনমনে হেসে সে দরাজ গলায় বিড়বিড় করে আওড়ায়,“ভালো মানুষ বাপের বখে যাওয়া কন্যা! ইন্ট্রেস্টিং!”
চলমান....
[ ২য় অংশের লিংক কমেন্টে ]#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_৯
#ইসরাত_ইতি
[ ২য় অংশ ]
১ম অংশের লিংক কমেন্টে।
থানা রোড থেকে বেরিয়ে গাড়ি হাইওয়ে ধরে এগিয়ে যাচ্ছে। পুরো রাস্তায় তুনা এবং ইনশিরাহ চুপচাপ ছিলো। তুনাকে তাদের বাড়িতে ড্রপ করে দিয়ে গাড়ি পুনরায় স্টার্ট করে ইহান। সামিন এতক্ষণে মেয়ের মুখের দিকে তাকায়। ইনশিরাহ তখন থেকেই বোকার মতো ডোপ টেস্টের রিপোর্টটার দিকে তাকিয়ে আছে। এই ক'ঘন্টায় তার ওপর দিয়ে কি গেলো কিছুই বুঝতে পারছে না। শুধু কানের কাজ কাছে বাজছে,কেউ ক'র্কশ স্বরে কনস্টেবল দু'টোকে বলছে,“ডোপ টেস্টের রিপোর্ট পজিটিভ পেলে চার্জ লাগিয়ে একেবারে চৌদ্দ শিকের ওপাশে ঢুকিয়ে দেবে।”
ডোপ টেস্টের রিপোর্ট পজিটিভ আসবে কেন? ইনশিরাহ কি এতো বখে যাওয়া মেয়ে! সে মদ খায়? ঐ লোকটা এমন ভাবে বলছিলো! ইনশিরাহর আচরণে কি মনে হয়েছে ইনশিরাহ ড্রাংক! ইনশিরাহর কথা শুনে মাতাল মনে হয়েছে?
তো বখাটে ছেলেদের মতো পিছু নিলে তো অমন ক'টু কথা তো শুনবেই। ঐ লোকটার দোষ নেই? সিভিল পোশাকে আসামী ধরে। আনপ্রফেশনাল ফা'লতু লোক। ইনশিরাহর জীবনে এতটা অপমানিত কখনো হয়নি সে। মাতা রানী অদ্রিতা আলো,ওয়াইফ অব সামিন ইয়াসার মির্জা যখন চপ্পল উঠিয়ে মা'রে তখনও ইনশিরাহ এতোটা অপমানিত বোধ করে না। আজ ঐ কনস্টেবল গুলো কেমন দাঁত বের করে হাসছিলো।
“আম্মা!”
ইনশিরাহর ঘোর কাটে ইয়াসার মির্জার ডাকে। পাপার দিকে একপলক তাকিয়ে ইনশিরাহ মাথা নিচু করে ফেলে। ড্রাইভ করতে করতে ফ্রন্ট মিররে বাবা মেয়ের দিকে তাকিয়ে ইহান ম্লান হাসে।
সামিন কন্ঠস্বর স্বাভাবিক রেখে বলতে থাকে,“আম্মা! আপনাকে তো কম্বাইন্ড স্টাডি করার জন্য তুনাদের বাড়িতে যাওয়ার পারমিশন দেওয়া হয়েছিলো। আপনি হাইওয়েতে কি করছিলেন আম্মা?”
ইনশিরাহ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলে,“পাপা! আর হবে না!”
ইহান মৃদু স্বরে হেসে ফেলে। হাসে সামিনও। ইনশিরাহ একবার পাপা আর একবার ভাইয়ের দিকে অবাক হয়ে তাকায়। সামিন হাসি থামিয়ে বলে,“আর হবে না? এই কথাটা এই যাবত কতবার বললেন আম্মা?”
ইনশিরাহ দমে যায়। এরপর তার আর কিছু বলার থাকে না। সে মেনে নিলো সে অপরাধী, আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ রইলো না আর।
সামিন মেয়েকে বলতে থাকে,“পড়াশোনায় মন নেই আম্মা আপনার? অসুবিধা নেই, স্বামীর বাড়িতে পাঠিয়ে দেবো।”
_পাপা!!
ইনশিরাহ তেঁতে ওঠে। ইহান গম্ভীর কন্ঠে বলে,“আওয়াজ নিচে ইশি। কখনও একটা ধ'ম'ক দিইনা তো তোকে তাই ভাবছিস যা খুশি করবি। ইরফানের সাথে কাল থেকে অফিসে বসবি। পাশাপাশি ঠেলেঠুলে গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট করলেই হবে। এনাফ হয়েছে!”
ইনশিরাহ মুখ ভার করে বসে থাকে। সামিন মেয়েকে এক হাতে কাছে টেনে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলে,“আচ্ছা পাঠাবো না স্বামীর ঘরে। আপনার স্বামীকেই আমাদের বাড়িতে আনবো ঠিক আছে আম্মা?”
ইনশিরাহ হেসে ফেলে। হাসে ইহানও, ড্রাইভ করতে করতে আফসোস করার ভঙ্গিতে বলে,“বড় বাবা ওরা এতো দ্রুত বড় হচ্ছে কেনো? আমরা ওদের শশুর বাড়ী পাঠিয়ে কিভাবে থাকবো!”
ইনশিরাহ মাথা নিচু করে ফেলে। সামিন মেয়ের মুখের দিকে তাকায়, বেড়িয়ে যায় একটা দীর্ঘশ্বাস। সবসময় নিজের শ্বশুর শ্রদ্ধেয় মরহুম আতাউর আলমের নিজের কন্যার প্রতি ইমোশন নিয়ে সময়ে সময়ে মজা ওড়ানো সামিন ইয়াসার মির্জার হয়তো সময় হয়ে এসেছে হাড়ে হাড়ে টের পাওয়ার,মেয়ে সন্তানের পিতা হলে কেমন লাগে। দেখতে দেখতে পঁচিশে পা দিয়েছে মেয়েটা, আর কতদিন! আর তো মাত্র অল্প কিছুদিন,নয়তো তারও একটু বেশিদিন, আজীবন তো পারবে না মেয়েকে কাছে রাখতে। এতো আদরের মেয়েকে তুলে দিতে হবে অন্যকারো হাতে!
প্রসঙ্গ পাল্টে সামিন মেয়েকে বলে,“এস.পি. বেশি বকাবকি করেছে?”
ইনশিরাহ মাথা নাড়ে।
_কি বলেছে? কি বলে বকেছে?
_সো কলড পাপা কি পরী।
ইহান হাসে। সামিনও হেসে বলে,“কিন্তু এটা তো সত্যি কথা। তুমি তো তোমার পাপার পরীই। এটা তো গালি না।”
_এটা গালি পাপা! তুমি বুঝবে না।
ইনশিরাহ কাঠকাঠ বলে জানালায় দৃষ্টি দিয়ে থাকে।
গাড়ি হাইওয়ে থেকে আবাসিক এরিয়ায় ঢুকে পরে। ইনশিরাহ পাপার কাঁধে মাথা রেখে ধিমি আওয়াজে বলে,“পাপা!”
_জি আম্মা!
_পাপা, মাম্মা জানে?
_নাহ,বড় মা জানে না। তুই অসুস্থ বলে বুঝ দিয়ে আমি আর বড় বাবা এসেছি। বাড়ি ফিরে চুপচাপ ঘরে ঢুকে দরজা লাগিয়ে ঘুমিয়ে পড়বি।
ভারিক্কি ভাব ইহানের স্বরে।
ইনশিরাহ হাই তুলতে তুলতে বলে,“তুমি খুব ভালো দাদান। পৃথিবীর সবথেকে ভালো দাদান । পৃথিবীর সবথেকে সুন্দর
মনের মেয়ে যেন তোমার বৌ হয়।”
ইহান বোনের কথায় কোনো পাত্তা না দিয়ে গাড়ি শান্তিনীড়ের গেটের ভেতরে ঢোকায়। সামিন মেয়ের কথার জবাবে বলে,“সেটাই, পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর মনের মানুষ গুলোই যেন আমার ছেলে মেয়ে গুলোর জীবনে আসে।”
ইহান গাড়ি থামিয়ে সামিনের দিকে তাকায়,বলে,“যেমন তুমি এসেছিলে বড় মা'র জীবনে, জোর করে?”
_হ্যা, তুইও মানিস আমি ভালো মনের মানুষ। শুধু তোর বড় মা'ই স্বীকার করতে চায়না কখনও।
ইনশিরাহ হাই তুলতে তুলতে বলে,“বাদ দাও তো মাম্মার কথা। মাম্মা একটু বেশিই বোঝে। একটু বেশিই বাড়াবাড়ি করে।”
সামিন হেসে বলে,“ঠিকই বলেছেন আম্মা, আপনার মাম্মা একটু বেশিই বোঝে,বেশিই বাড়াবাড়ি করে। কিন্তু তার ঐ বেশি বোঝার, বাড়াবাড়ি করার কারনেই সে আপনার মাম্মা। ভুলে যাবেন না।”
ইনশিরাহ হেসে একটা গভীর নিঃশ্বাস ফেলে বিড়বিড় করে বলে,“থ্যাংকস আল্লাহ মাম্মাকে বেশি বোঝার,বেশি বাড়াবাড়ি করার তৌফিক দেওয়ার জন্য। মাম্মার পরিবর্তে অন্য কোনো মহিলা আমার মাম্মা হলে ঠিক জমতো না।”
সামিন ইয়াসার হেসে ফেলে মেয়ের কথা শুনে। ইহান তাজওয়ার বোনের কান ধরে বলে,“চল বুড়ি। ইনায়ার থেকে কম দস্যি নোস তুই!”
★★★
স্পোর্টস ক্লাবে প্রিতম আজ অনেকদিন পরে পা রাখলো। কর্মজীবনে ব্যস্ততা বাড়তেই আর আসা হয়না এদিকটায়। প্রেসিডেন্ট হিসেবে যতটুকু দায়িত্ব ততটুকু পালন করে। লোকে ফার্স্ট বেঞ্চার মেধাবী ছাত্র প্রিতম আহসানকে পড়ুয়া, নিরীহ,ঠান্ডা মানুষ হিসেবে জেনে এসেছে ছোটো থেকে। আদতেও তাই। প্রিতম মনে প্রানে একজন জেন্টেলম্যান যতক্ষন পর্যন্ত কেউ তাকে রাগিয়ে না দেয়। এই শহরে প্রিতমের কে'টেছে আট বছর। চার বছর হলো প্রেরনাদের নিয়ে এসেছে। এখানে নিজেকে বেশ খাপ খাইয়ে নিয়েছিলো প্রিতম, শুধু ইরফান মির্জা নামের বড়লোকের ব'খে যাওয়া একটা ঘাড় বাঁকা ছেলে ব্যতীত প্রিতমের লাইফে কোনো প্র'বলেম নেই।
তবে প্রচলিত কথায় আছে প্রবলেমের মতো একটা প্রবলেম থাকলেই যথেষ্ট। ইরফান হচ্ছে সে ধরনের প্রবলেম। কোথা থেকে হুট হাট চলে এসে প্রিতমের সাথে লাগে! ঠিক যেমন এই স্পোর্টস ক্লাবে হঠাৎ দেখা দু'জনের। অবশ্য নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে নিজেদের নিজেদের গ্যাংয়ের সাথে আলাপ চারিতায় ব্যস্ত তারা। এক কি দু'বার চোখাচোখি হলেও বিশেষ পাত্তা দেয়নি কেউই। দু'জনে দুজনের বড় ভাই আর বড় বোনের শাসন আমলে নিয়েছে তা বোঝাই যাচ্ছে।
ভলিবল কোর্টে প্রিতম যখন ম্যাচ শুরুর আগে দলকে ইন্সট্রাকশন দিচ্ছিলো ঠিক তখনই ইরফানদের কোর্ট থেকে একটা বল এসে প্রিতমের গা'য়ে পরে।
বলটা ধরে ফেলে প্রিতম, চেষ্টা করে নিজেকে যথাসাধ্য শান্ত রাখতে। সে আর কোনো ঝামেলা বাধাবে না। ঘুরে তাকায় ইরফানদের দিকে।
ইরফান মির্জা তার দিকেই তাকানো,তার ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের হাসি।
প্রিতম বরফ ঠাণ্ডা গলায় বলে,“হোয়্যাট? শোন,তোর সাথে আমার কোনো লেনা দেনা নেই! লিভ মি অ্যালোওন! রিপ্পির ব্যাপারটা তো মিটেই গিয়েছে। এখন আবার কি সমস্যা তোর? এই স্পোর্টস ক্লাব তাইতো? ও.কেহ যা, আমি আমার প্রেসিডেন্টের পদ থেকে অব্যাহতি নিয়ে নিলাম। আজ থেকে তুই এই ক্লাবের প্রেসিডেন্ট!”
ইরফান তাকিয়ে আছে,তার কোনো ভাবান্তর নেই। প্রিতম দাঁতে দাঁত চেপে বলে,“তবুও বলছি লিভ মি অ্যালোওন! আমার তোর মতো বড়লোক বাপ চাচা নেই আর না আছে পাওয়ারফুল বড় ভাই। তুই কেন আমার পেছনে পরে আছিস?”
প্রিতমকে থামিয়ে জামি বলে ওঠে,“এই প্লিজ ছাড় তো ওকে চল আমরা টুর্নামেন্ট শুরু করি।”
_সেটাই, ওকে নিয়ে আমার মাথাব্যাথাও নেই! বড়লোকের জিদ্দি ছেলে।
প্রিতম তার দলের কাছে ফিরে যায়। ইরফান টান টান হয়ে তখনও দাড়িয়ে। তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে প্রিতমকে দেখছে। তার গ্যাংয়ের নিক্সন বলে ওঠে,“কি কথা বাপরে! সবসময় সব স্থানে তোকে হারিয়ে বলে তোর সাথে আমার কোনো লেনা-দেনা নেই!”
ইরফান এবার একটা পৈশাচিক হাসি দেয়। তারপর বলে,“ওর আমার সাথে লেনা দেনা নেই, কিন্তু আমার তো ওর সাথে লেনা দেনা আছে।”
★★★
তেইশ বছর আগে রেডিও স্টেশন রোডে ইহান তাজওয়ার মির্জা যখন তার বড় বাবার সাথে ঘুরতে বের হতো তখনও যায়গাটা এরকমই শুনশান থাকতো। আজও ঠিক সেরকম রাস্তাটা। এতো বছরে সবকিছু পাল্টেছে, সরকার পাল্টেছে, শাসন পালটেছে, গোটা দেশটাই পাল্টেছে। পাল্টায়নি শুধু এতো বড় শহরের এই রাস্তাটা। ইহানের বিএমডব্লিউ এই রাস্তা দিয়ে যখনই যায় তখনই ছোটোবেলার কথাগুলো মনে পরে ইহানের। মাম্মা পাপার থেকে ইহান বড় বাবার কোলঘেঁষা ছিলো বেশি, বড় বাবার সাথে কত সময় কে'টেছে এই রাস্তায়। তাকে নিয়ে বড় বাবা ঘুরতো। শহরের পশ্চিম থেকে ত্রিশ কিলোমিটার প্রশত্ব এই রাস্তাটা চলে গিয়েছে সোজা এয়ারপোর্টের দিকে।
অন্তর তখন থেকে তার ভাইকে একটা কথা বলার চেষ্টা করছে। কথাটা পেটে আসছে কিন্তু মুখে আসছে না। বেমালুম ভুলে গিয়েছে। ইদানিং পার্টির কাজের চাপে এমনটা হচ্ছে। ইহান আড়চোখে একপলক অন্তরের দিকে তাকিয়ে গুরুগম্ভীর স্বরে বলে,“সমস্যা কি?”
_সেটাই ভাই! সমস্যা কি সেটাই বুঝতে পারছি না। আপনাকে একটা ইম্পর্ট্যান্ট কথা বলতে চাই,কিন্তু মনে করতে পারছি না।
_আচ্ছা যখন মনে পরবে তখন বলিস।
_ভাই মনে পরছে! তোশা আপু আজ আমাকে টেক্সট করেছে।
অকস্মাৎ গাড়ির ব্রেক ক'ষে ইহান। অন্তর হকচকায়। ইহানের দিকে তাকিয়ে দেখতে পায়,বড় বড় নিঃশ্বাস নিয়ে স্টিয়ারিংয়ের দিকে দৃষ্টিপাত করে রেখেছে সে। ঐ পাথর কঠিন মানুষটা হঠাৎ যেন আরো কঠিন হয়ে গিয়েছে। অন্তর একটা ফাঁকা ঢোক গিলে বলে,“ভাই!”
_ব্লক হার।
চোয়াল শক্ত হয়ে গিয়েছে ইহানে। অন্তর বলে,“দিয়েছি ভাই! তখনই দিয়েছি। বললো আপনাকে একটাবার সরি বলতে চায়, আপনার ফ্যামিলির কারো সাথে যোগাযোগ করা পসিবল হচ্ছে না তাই আমাকে....”
ইহান হাত দিয়ে ইশারা করে চুপ করিয়ে দেয়। চওড়া কপালের পেশি টনটন করছে। এই বিষয়ে আর একটাও কথা শোনার জন্য সে ইচ্ছুক নয়। আশেপাশে তাকিয়ে কন্ঠস্বর স্বাভাবিক করে বলে,“চল বাড়ি ফেরা যাক।”
গাড়ি ঘুরিয়ে নেয় শহরের দিকে। প্রায় সাত কিলোমিটার দূরে চলে গিয়েছিলো আজ। কিছুক্ষণ পরেই আবারও গাড়ির ব্রেক হুট করে কষে দেয় সে। অন্তর ইহানের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে বলে,“কি হলো ভাই!”
ইহানের দৃষ্টি গাড়ির লুকিং মিররে। অন্তর ইহানের দৃষ্টি অনুসরণ করে ঘা'ড় ঘুরিয়ে পেছনে তাকাতেই বলে ওঠে,“আরিব্বাস! এ তো হুমকি ধামকি আপা! এখানে কি কাম এর!”
প্রেরনার ধৈর্য্য শক্তি দারুন। সে সহজে মেজাজ হারায় না। কিন্তু আজ ভীষণ উত্তেজিত লাগছে তাকে। রাত বারোটা প্রায়,এই শুনশান এলাকায় এসেই স্কুটিটা খারাপ হতে হলো। আজ গিয়েছিলো রেস্তোরাঁ ম্যানেজার সাব্বিরের অসুস্থ বৌকে দেখতে। সেখান থেকে ফিরতেই এতো রাত! এদিকে ফোনের চার্জ শেষ। উবার ডেকে প্রিতমকে ফোন করার আগেই ফোনটা সুইচস্টপড। নিশ্চয়ই ওরা সবাই টেনশন করছে। মেজাজ পুরোপুরি হারিয়ে স্কুটি ধরে একটা ঝাঁকুনি দেয় সে।
ইহান লুকিং মিররে তার দিকেই তাকিয়ে। অন্তর কিছু বলতে যাবে তখনই গম্ভীর স্বরে বলে,“ওনাকে গিয়ে জিজ্ঞেস করো সমস্যা কোথায়।”
_ক্ষে'পেছেন ভাই? অযাচিত ভাবে হেল্প করতে গেলে সন্দেহ নিয়ে তাকিয়ে চৌদ্দটা প্রশ্ন করে কথা শুনিয়ে দেবে।
_এই এলাকা মহিলাদের জন্য সেফ না, আশেপাশে তিন কিলোমিটারে কোন বসতি নেই, পুলিশ চেকপোস্ট নেই। যা গিয়ে দেখ। শুধু জানতে চাইবি কোনো হেল্প লাগবে কিনা।
_ভাই থা'প্পড় মারবে,আপনি যান।
ইহান তাজওয়ার শান্ত চোখে অন্তরের দিকে তাকাতেই অন্তর ঢোক গিলে বলে,“যাচ্ছি।”
গাড়ি থেকে নেমে দুই গালে হাত চেপে অন্তর এগিয়ে যায়। যেন ঐ ভদ্রমহিলা থা'প্পড় না মা'রতে পারে।
একটা নীল রঙের গাড়ি এসে কিছুটা সামনেই থেমেছে, প্রেরনা দেখেছে কিন্তু বিশেষ পাত্তা দেয়নি! কিন্তু যখনই দেখেছে গাড়ি থেকে একটা ছেলে নেমে তার দিকেই এগিয়ে আসছে তখনই সে সতর্ক হয়ে টান টান হয়ে দাঁড়ায়। পার্স থেকে একটা ছোট চাইনিজ নাইফ বের করে আঁচলের নিচে হাত লুকায়। উল্টাপাল্টা কিছু করতে এলেই এক পোঁচ মারবে।
অন্তর প্রেরনার কাছে এগিয়ে আসতেই প্রেরনা ক'র্কশ গলায় বলে,“কি চাই?”
_আপনার কি কোন হেল্প লাগবে?
_তাতে আপনার কি?
ধ'ম'কে ওঠে প্রেরনা। অন্তর ঘা'বড়ে বলে,“না মানে,ভাই পাঠিয়েছে। যায়গাটা ভালো না।”
_কোন ভাই? কোথাকার ভাই?
_ইহান তাজওয়ার মির্জা।
আমতা আমতা করে বললো অন্তর।
প্রেরনা একটু দ'মে যায়। ঘাড় ঘুরিয়ে গাড়িটার দিকে তাকায়। এজন্যই গাড়িটা চেনা চেনা লাগছিলো। অন্তর বিনয়ের সাথে বলতে থাকে,“হেল্প লাগবে আপা?”
প্রেরনা মাথা ঝাঁকিয়ে বলে,“না,ক্যাব বুক করেছি। আসছে। পথে! থ্যাংক ইউ আপনাদের।”
_ওহ ওকে।
অন্তর গাড়ির দিকে ফিরে যায়। প্রেরনা বিরক্ত হয়ে আশেপাশে তাকায়। এখনও ক্যাব টা আসছে না কেনো। মেজাজের খেই হারিয়ে হারিয়ে স্কুটিতে একটা লা'থি মারে সে।
ইহান লুকিং মিররে প্রেরনার কান্ড দেখতে থাকে। অন্তর এসে গাড়িতে বসে বলে,“গাড়ি স্টার্ট করেন ভাই, ওনার ক্যাব আসতেছে।”
ইহান গাড়ি স্টার্ট করতে করতে আরো একবার মিররে তাকায়। প্রেরনা দ্বিতীয় দফায় লাথি বসায় তার সাধের স্কুটিতে। ইহান সেদিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলে ওঠে,“বেচারা স্কুটি!”
চলমান....