#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_১০
#ইসরাত_ইতি
কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ 🚫
আজকে ইনায়া মির্জাকে একটু কর্মঠ মেয়ে মনে হচ্ছে। বাড়িতে তার বান্ধবীরা এলো তাই চেষ্টা করছে নিজের হাতে সবটা করার। মির্জা বাড়ির মেয়ে হিসেবে ইনায়া কাজে কম্মে ইনশিরাহর থেকে চালু এবং আগ্রহী। খানিকটা স্বাস্থ্যবতী হওয়াতে অল্পতেই হাঁপিয়ে ওঠে এই যা।
ইনশিরাহর দৌড় চা-কফি পর্যন্ত হলেও ইনায়া শখের বসে এটা ওটা রাঁধতে গিয়ে বেশ ভালো দক্ষতা অর্জন করেছে।
বান্ধবীদের জন্য ডেজার্ট আইটেম তৈরি করছিলো ইনায়া। আজ বাড়িতে ইনায়ার পাঁচ বান্ধবী এসেছে, মধ্যাহ্ন ভোজের ঝামেলা চুকিয়ে সবাই দোতলায় উঠেছে।
ইনায়া কিচেনে ব্যস্ত তার “স্পেশাল আইটেম” নিয়ে। রান্নাঘরে আলো ঢুকে বারবার বলেছে সে করে দেবে কিন্তু ইনায়া রাজি হয়নি।
দুপুর তখন দু'টো । ইনশিরাহ হাই তুলতে তুলতে কিচেনে আসে। সারারাত না ঘুমিয়ে পড়াশোনা করে সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত ঘুমিয়েছে সে। ফ্রিজ থেকে একটা গ্রিন অ্যাপেল বের করে কামড় বসিয়ে লোয়ার কিচেন কেবিনেটের ওপরে উঠে বসে।
আলো নিজের মেয়ের দিকে তাকিয়ে বলে,“ছোটো বোনের থেকে শেখ। কত কাজ জানে। তোর লজ্জা করে না এসব দেখলে?”
_লজ্জা? মাম্মা লজ্জা কেন হবে? কাজ জেনে এই মোটি ক'টা মেডেল পেলো বলো তো?
ইনায়া আপুর দিকে রাগী চোখে তাকায়। ইনশিরাহ হেসে বোনের গাল টেনে দিয়ে বলে,“আমার অ্যাংরি বার্ড!”
আলো ইনশিরাহর হাত থেকে আপেলটা কে'ড়ে নিয়ে ধুয়ে দিয়ে বিরক্তির সহিত বলে,“ধুয়ে খা না মা! তোকে নিয়ে আমি কোথায় যাবো!”
_আপাতত আমার রুমে। মাথা টিপে দেবে আমার। চলো। মাথা ছিঁড়ে যাচ্ছে যেন মাম্মা।
ইনায়া অবাক হবার ভান করে বোনকে বলে,“এই আপু! কোথায় যাচ্ছিস। ওরা সবাই এলো তুই নিজের মতো থাকবি?”
_নিজের মতো থাকবো না তো কি করবো? তোর বান্ধবীরা কি আমার সাথে আড্ডা দিতে এসেছে। ওরা তো আসে অন্য কারনে।
গা ছাড়া ভাব নিয়ে বললো ইনশিরাহ।
রিতু তখন রান্নাঘরে ঢোকে। আলো ইনশিরাহর কথায় বলে,“ওরা অন্য কারনে আসে মানে?”
ইনশিরাহ আপেল চিবুতে চিবুতে বলে,“যে বাড়িতে দু দুটো সুদর্শন ছেলে আছে সে বাড়িতে আমার আর ইনুর বান্ধবীদের আনাগোনা একটু বেশিই হবে তাই নয়কি মাম্মা!”
আলো হাসে মেয়ের কথায়। ইনায়া আশেপাশে তাকিয়ে বলে,“আস্তে বলো না। আর মোটেই না, ওরা আমাকে দেখতে এসেছে। অমন কিছু নয়।”
_হ তোকে বলছে! তুই বেশি জানিস! যা গিয়ে দেখ সবকটা বড় দাদানকে এক ঝলক দেখার জন্য কিরকম মরিয়া। ইঁচড়ে পাকার দল।
_আহ ইনশিরাহ,এভাবে বলবি না।
মায়ের কথায় ইনশিরাহ চুপ হয়ে যায়। রিতু ইনশিরাহর দিকে তাকিয়ে বলে,“মেয়েগুলো আমার ছেলেদের দেখার জন্য আসে?”
_হু মেজো মা। যাও গিয়ে দেখো কোনটা পছন্দ হয়, মোট পাঁচ জন এসেছে। ওদের মধ্যে থেকে ফটাফট দুজনকে পছন্দ করে ফেলো।
ইনায়া তার আপুর কথায় বিরক্ত হয়, কপাল কুঁচকে তাকিয়ে আছে। ইনশিরাহ বোনকে বলে,“বিশ্বাস হয়না তো? যা গিয়ে দেখ দাদানকে চোখ দিয়ে গিলে খাচ্ছে সবকটা। যা।”
ইনায়া মুখে চ বর্গীয় শব্দ করে ডেজার্টের ট্রে নিয়ে দোতলায় উঠতে থাকে।
ইনশিরাহ হাসছে। আলো মেয়ের মুখের দিকে তাকায়, মাথায় হাত বুলিয়ে বলে,“কি অবস্থা করেছিস নিজের। তুই এতো অগোছালো ! একটু পরিপাটি হয়ে থাকলে কি হয় তোর? একটু ক্রিম লাগাতে পারিস তো, মুখটা তো একটু ফেইসওয়াশ দিয়ে ধোঁয়া যায়! সবসময় ছেলেদের মতো হাবভাব। যা তেলের বোতল নিয়ে আয়। চুল গুলো ঝাউবন হয়ে গিয়েছে।”
★★★
শান্তিনীড়ের পুরনো দালানের সাথে সংযুক্ত নতুন একতলা ভবনের ছাদে বিশাল বড় সুইমিং পুল। ইহানের যখন চৌদ্দ বছর বয়স, ইরফানের আট, ইনশিরাহর সাত আর ইনায়াও খুব ছোটো তখন সামিন এই সুইমিং পুলটা করেছিলেন ছেলেমেয়েদের জন্য। পুরনো ভবনের দোতলার লিভিং রুম সংলগ্ন পুরাতন বারান্দা দিয়েই নতুন দালানের টেরেসের প্রবেশপথ।
আজ ছুটির দিন । ইহান তাজওয়ার সকাল থেকে বাড়িতে। অবশ্য বাড়িতে সে নিজের মতোই থাকতে পছন্দ করে। সব ছুটির দিনগুলোর দুপুর কাটে তার সুইমিং করে। পুল সাইডের একটা টেবিল থেকে ওয়াচ টা তুলে সময় দেখে ইহান। দুপুর দুইটা পনেরো মিনিট। একঘণ্টা সুইমিং করার পরিকল্পনা তার। ওয়াচ টা রেখে টেবিলের ওপর থেকে ডাবের পানির গ্লাসটা তুলে চুমুক বসায় ইহান। গ্লাসটা খালি করে টেবিলে রেখে কিছু ফ্রি হ্যান্ড এক্সারসাইজ করতে থাকে সে।
পুরনো দালানের দোতলার বারান্দার দরজার আড়াল থেকে পাঁচ জোড়া চোখ উৎসুক নজরে দেখছিলো ইহান তাজওয়ার মির্জাকে। ইহানের প্রত্যেকটা স্টেপে একটা করে হার্টবিট মিস করে ফেলছে তরুণীর দল। নিধি নামের মেয়েটা বুকে হাত চেপে ধরে রুশফির কাঁধে মাথা এলিয়ে দিয়ে অস্ফুটে বললো,“ভাই আমাকে ধর। আমি পরে যাবো।”
পাঁচ জোড়া চোখে বিস্ময়। কাছ থেকে লোকটাকে এভাবে দেখেনি কখনও। সবসময় পাঞ্জাবি অথবা শার্টে দেখেছে। আজ টি-শার্ট আর থ্রি কোয়ার্টার প্যান্টে অমন ইস্পাতের মতো দৃঢ়,লম্বা পুরুষটি তাদের দৃষ্টি আটকে রেখেছে নিজের দিকে। এক অদম্য কৌতুহল তাদের চোখে মুখে লোকটাকে নিয়ে।
ফ্রি হ্যান্ড এক্সারসাইজ শেষে ইহান পুলে নামার প্রস্তুতি নেয়। গায়ের ধূসর রঙের টি-শার্ট টা খোলার নিমিত্তে পেটের দিক থেকে কিছুটা ওপরে তুলতেই দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা তরুনীদের মুখ হা হয়ে যায়। তখনই পেছন থেকে ইনায়া হতভম্ব হয়ে বলে,“তোরা এখানে।”
পাঁচজন তরুণী হকচকিয়ে যায়। রুশফি দরজার পর্দা সহ কেঁ'পে উঠে হুরমুর করে নিচে পরে যায়,তার গায়ের সাথে এলিয়ে থাকা নিধি পরে তার গায়ের ওপর। তৎক্ষণাৎ রুশফি আর্তনাদ করে উঠতেই ইহান ঘুরে দাঁড়ায়।
টি-শার্ট টা কেবল সে খুলতেই নিচ্ছিলো, থেমে গিয়ে বারান্দার দরজার দিকে ঘুরে তাকাতেই সে হতভম্ব হয়ে নিজের পেট ঢেকে ফেলে।
ইনায়ার পাঁচ বান্ধবী অপ্রস্তুত হয়ে কাঁচুমাচু মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে। ইনায়া চোখ সরু করে সবাইকে দেখছে। তার মানে আপু যা বলেছে সব সত্যি। সব কটা তার বড় দাদানের দিকে কুনজর দেয়।
ইহান চোখ বড় বড় করে বাচ্চা বাচ্চা মেয়ে গুলোকে দেখছে। কিছু মুহূর্ত পরে রাশভারী কন্ঠে গমগম করে ওঠে,“কি সমস্যা বাচ্চারা?”
কথাটা ধ'ম'কের মতো লাগলো তাদের কাছে। পাঁচ জন শুধু মাথা নেড়ে বুঝিয়ে দেয়,কিছু না।
★★★
ইনশিরাহ মাকে জাপটে ধরে দাঁড়িয়ে আছে। আলো মিছিমিছি বিরক্ত হবার ভান করে বলে,“ছাড় না মা। হাতে অনেক কাজ।”
_তো এই মাত্র বললে কেনো মাথায় তেল দিয়ে দিতে চাও?
_তখন কাজ ছিলো না, যা এখন। পড়তে বস।
অলস দুপুর। ইনশিরাহ মাকে জড়িয়ে ধরেই তার মেজো মায়ের সাথে কিচেনেই টুকটাক কথাবার্তা বলছিলো। হঠাৎ করে কলিং বেল বেজে উঠতেই আলো বলে,“যা তোর পাপা এলো বুঝি। যা গিয়ে দরজা খুলে দে।”
ইনশিরাহ এগিয়ে যেতেই আলো তেঁতে উঠে বলে,“এই গাঁয়ে ওড়না কই তোর? ওরনা জরিয়ে নে।”
ইনশিরাহ যেনো মায়ের কথা শুনলোই না। গাঁয়ে একটা ওভারসাইজ পুরনো টি-শার্ট, যাতে বেশ কয়েকটা ফুটো হয়েছে, ইনশিরাহ বাড়িতে এসব পরে আরাম পায়। জামা যত পুরনো, আরাম তত বেশি।
টি-শার্টের সাথে একটা অ্যাংরি বার্ডের কার্টুন আঁকা ঢোলা ট্রাউজার পরিহিত,মাথার চুল গুলো এলোমেলো। সকাল থেকে চিরুনি বসায়নি চুলে এমন মনে হচ্ছে। চোখের নিচে কালি। মাথা চুলকাতে চুলকাতে আর হাই তুলতে তুলতে গিয়ে সদর দরজা খুলে দিয়েই বলে “হাই পাপাআআআআ..।”
ইনশিরাহর মুখ হা হয়ে গিয়েছে। সামিন মেয়েকে দেখে হকচকায়। ইনশিরাহ মুখ হা করেই একপলক পাপাকে দেখে আর একপলক পাপার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটাকে দেখে। কিছু মুহূর্ত তিনজন তিনজনের দিকে বোকার মতো তাকিয়ে থাকে। তারপর ইনশিরাহ দৃষ্টি ঘুরিয়ে নিজের দিকে তাকাতেই এক লাফে তিন পা পিছিয়ে যায়।
মুঈন ফরাজী ততক্ষণে দৃষ্টি নামিয়ে নিয়েছে। সামিন তার কন্যার “পাগলী বেশ” দেখে ভীষণ হতাশ। না একটু রূপচর্চা করবে না একটু পরিপাটি হয়ে থাকবে।
ইনশিরাহ আবারও মাথা তুলে মুঈন ফরাজীর দিকে তাকিয়ে চোখ মুখ কঠিন করে ফেলে।
সামিন নিচুগলায় মেয়েকে বলে,“আম্মা যায়গা দিন,আমার ভেতরে ঢুকবো।”
বাবার কথায় ইনশিরাহ এক লাফে লবি থেকে সরে দেয়ালের পাশে দাঁড়ায়। সামিন মুঈনের দিকে তাকিয়ে বলে,“এসো বাবা।”
মুঈন ফরাজী চুপচাপ মাথা নিচু করে সামিন ইয়াসার মির্জার পিছু পিছু অন্দরমহলে প্রবেশ করতেই ইনশিরাহ নিজের দিকে আবারও তাকায়। তার লজ্জায় মাটির সাথে মিশে যেতে ইচ্ছে করছে।
কিছুক্ষণ থ হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে এক দৌড়ে সিঁড়ি বেয়ে সে দোতলায় চলে যায়।
★★★
ইনায়ার পাঁচ বান্ধবী ইহানের কঠিন দৃষ্টি থেকে সরে দাঁড়ানোর জন্য ছটফট করছে। লোকটা যতটা সুদর্শন ততটাই ক'ড়া শুনেছে তারা।
ইনায়া সবাইকে তা'ড়া দিয়ে বলে,“এখানে কি করছিস? আয় রুমে আয়,আমি ডেজার্ট নিয়ে এসেছি।”
পাঁচ জন চুপচাপ লজ্জিত ভঙ্গিতে হেঁটে ইনায়ার ঘরের দিকে যেতে নেয়।
ইহান গিয়ে ধাপ করে বারান্দার দরজা আটকে দেয়, তারপর টি-শার্ট খুলে পুলে নামে।
“আমার মা বলেছিলো খোকা তুই প্রেম করিস না,
ভালো ছেলেদের কপালে ভালো মেয়ে জোটে না।”
হেড়ে গলায় গাইছিলো ইরফান মির্জা। নিজে নিজেই অদ্ভুত একটা সুরে লাইন দু'টো বারবার রিপিট করছে। পুরুষালি ক'র্কশ কন্ঠস্বরে দোতলার ছাদের সিঁড়ির কাছটা ভারি হয়ে উঠেছে।
ধুপধাপ আওয়াজ হচ্ছে সিঁড়িতে। গানটা গাইতে গাইতে ছাদ থেকে দোতলায় নেমেছে ইরফান মির্জা। সিঁড়ির নিচের ধাপে পা রাখতেই সে মুখোমুখি হয় ইনায়ার পাঁচ বান্ধবীর।
এবার তাদের মুখ আরো বড়ো হা হয়ে যায়। ইরফানের অবস্থা আরো বেহাল। সে শুধুমাত্র একটা ব্রাউন রঙের থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট পরে আছে। দুহাত প্যান্টের পকেটে ঢুকিয়ে রেখেছে। শরীরে আর একটা সুতোও নেই।
সবাই থম মে'রে দাঁড়িয়ে আছে। ইনায়া প্রচন্ড বিরক্ত হয়ে পেছন থেকে তার বান্ধবীদের বলে,“এই তোরা রুমে ঢুকবি?”
দ্বিতীয় বারের মতো লজ্জিত হয়ে সবাই ইনায়ার রুমে ঢোকে।
ইরফান কপাল কুঁচকে তাকিয়ে আছে সেদিকে। ইনায়া নিচু স্বরে, দাঁতে দাঁত চেপে মেজো দাদানকে বলে,“দাদান, প্লিজ এক ঘন্টা একটু নিজের রুমে ঢুকে দরজা বন্ধ করে বসে থাকতে পারবে?”
ইরফান গম্ভীর কন্ঠে বলে,“কেন? তোর কথায়?”
ইনায়া ভীত হয়ে বলে,“আচ্ছা রুমে ঢুকে বসে থাকতে হবে না। আলমারিতে অনেক গুলো টি-শার্ট আছে একটা বের করে পরো। প্লিজ!”
কথাটা বলে ইনায়া ঘরে ঢুকে পরে। ইরফান নিজের দিকে তাকায়, এতক্ষণে সে বুঝতে পারলো ঐ মেয়েগুলো ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে ছিলো কেনো। সে বাঁকা হেসে বিড়বিড় করে বলে,“ইচড়ে পাকার দল।”
তারপর আবারও গান গাইতে গাইতে হেলে দুলে নিজের রুমের দিকে যায়,“আমার মা বলেছিলো খোকা তুই প্রেম করিস না,
ভালো ছেলেদের কপালে ভালো মেয়ে জোটে না।”
★★★
আলো স্বামীর ডাকে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে আসে । এসে স্বামীর সামনে দাঁড়াতেই অবাক হয়ে যায়। সামিনের পাশে সুদেহী,সুন্দর চোখের পুরুষটিকে দেখে স্বামীর দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকায়। সামিন হেসে বলে,“চিনতে পারলে না?”
আলো অস্ফুটে বলে,“মুঈন...”
মুঈন বিনয়ী হেসে সালাম দিয়ে বলে,“কেমন আছেন মিষ্টি আন্টি?”
আলো এগিয়ে এসে হাত উঠিয়ে মুঈনের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে,“চিনতেই পারছি না বাবা। এতোটা বদলেছো তুমি। এতটা!”
ইনশিরাহ দোতলায় উঠে নিজের ঘরে ঢুকে চুপচাপ বসেছিলো। তারপর মাথা তুলে আয়নায় নিজেকে দেখে, তার নিজেকে নিজের কাছে একেবারে সদরঘাটের জমিলা পাগলীর মতো লাগছে। আজ প্রেস্টিজ বলে কিছুই থাকলো না।
তাতে কি! ঐ লোকটা তাকে পাগল ভাবলেই বা কি। একটা বাইরের লোক!
এসব ভেবেই নিজেকে সান্ত্বনা দিয়েছে ইনশিরাহ।
ইনায়া আপুর রুমের দরজায় দাঁড়িয়ে বলে,“আপু।”
_হু বল।
_ওরা এসেছে তো। আসো না। গল্প করবে।
ইনশিরাহ বোনের কথায় উঠে দাঁড়ায়, তারপর ইনায়ার পিছু পিছু তার ঘরে যায়।
ইনায়ার পাঁচ বান্ধবী ইনশিরাহ আর ইনায়ার সাথে আড্ডা জমিয়েছে বেশ। সবার খুব কৌতুহল ইনশিরাহদের বাড়ির মানুষগুলো নিয়ে। ওরা একান্নবর্তী পরিবার কিনা। যা এই যুগে বিরল।
ইনশিরাহ আর ইনায়া সবার বিবরণ দিয়ে যাচ্ছিলো। এ বাড়ির কোন সদস্য কেমন প্রকৃতির,ইত্যাদি আরো অনেক কিছু ।
কথায় কথায় নিধি কৌতুহলী হয়ে বলে ওঠে,“তোমাদের বড় দাদান কি নির্বাচন লড়বে? সেদিন আমার ড্যাড বললো।”
_শিয়র না,তবে ধরা যায়।
ইনশিরাহ উত্তর দেয়।
ইহানকে নিয়ে তাদের কৌতুহলের শেষ নেই, খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সব জেনে নিচ্ছে ইহানের ব্যাপারে। হুট করেই সাইমা বলে ওঠে,“তোমাদের বড় দাদান এতো হ.....”
কথাটা সম্পূর্ণ করতে পারলো না সাইমা, ইনশিরাহ আর ইনায়ার সরু চোখে কঠিন দৃষ্টি দেখে সে মিইয়ে যায়। কথা ঘুরিয়ে বলে,“না মানে বড় দাদান ভীষণ হট মেজাজী তাই না।”
ইনশিরাহ পুরোটাই বুঝতে পেরেছে। সে হাসি চেপে রেখে গম্ভীর হয়ে বলে,“হু। খুব খুব খুব রা'গী। ধারে কাছেও ঘেষবে না খবরদার। দাদানের কথায় কথায় মানুষ তুলে আ'ছাড় মারার অভ্যাস।”
নিধি একটা ঢোক গিলে বলে,“তা কেনো!”
_দাদান আর্মিতে ছিলো জানো না? ঐ হাতে কত লোককে ঠুশঠাশ মে'রেছে। তাই অভ্যাস হয়ে গিয়েছে।
রুশফি দাঁত বের করে বলে,“আপু মাইন্ড করো না। ওনাকে দেখলে আমার কেনো জানি একটা গান মনে পরে যায়। ঐযে,“সোলজার সোলজার মিঠি বাতে বোল কার,দিলকো উড়া লেগায়া।”
ইনশিরাহ রুশফির দিকে তাকিয়ে বলে,“ও আচ্ছা তাই? কিন্তু আমার বড় দাদানের মুখ থেকে মিঠা কথা বেরই হয়না।”
রিন্তু অনেকটা সাহস সঞ্চয় করে ইনশিরাহকে বলে,“আচ্ছা ওনার কোনো গার্লফ্রেন্ড নেই আপু?”
_দাদানের? নাহ নেই। দাদান তো বিয়ে করবে। বাড়ি থেকে মেয়ে দেখছে দাদানের জন্য।
সবাই আরো বেশি কৌতুহলী হয়ে উঠছে। সাইমা বলে ওঠে,“কেমন মেয়ে পছন্দ তোমার দাদানের আপু?”
ইনশিরাহ তেরছা নজরে সাইমাকে দেখে নিয়ে বলে,“দাদানের পছন্দ? আমরা তো চব্বিশ পঁচিশ বছর বয়সী মোটামুটি মধ্যবিত্ত পরিবারের শিক্ষিত মেয়ে খুঁজছি। ”
রিন্তু অবাক হয়ে বলে,“কেন? এই বয়সীই কেনো? এর থেকে কমবয়সী হলে অসুবিধা কোথায়?”
_অসুবিধা আছে। দাদানের কাছে এর থেকে ছোটো মেয়েদের বাচ্চা মনে হয়। সে বাচ্চার সাথে সংসার করতে আগ্রহী নয়।
ইনায়া এতক্ষণ বোন আর বান্ধবীদের কথা মনোযোগ দিয়ে শুনছিলো। সে সাফ বুঝতে পেরেছে আপু তার বান্ধবীদের জ্বালাতে চাইছে।
রিন্তু সহ বাকি মেয়েদের মন টা হঠাৎ খারাপ হয়ে গেলো মনে হচ্ছে। আফসোস হচ্ছে তাদের। ইশ তাদের বয়সটা আরেকটু বেশি অথবা ইহান তাজওয়ারের বয়সটা আরেকটু কম হলে কি বেশি ক্ষতি হয়ে যেতো?
রুশফি হঠাৎ বলে ওঠে,“আর তোমার মেজো দাদানেরও কি অল্পবয়সী মেয়েতে এলার্জি আছে আপু?”
ইনশিরাহ হাসি চেপে রেখে গম্ভীর কন্ঠে বলে,“না। না। এলার্জি কেন থাকবে। ওর তো পাঁচটা গার্লফ্রেন্ডই তোমাদের বয়সী।”
ইনায়া পেট চেপে নিশ্চুপ হাসতে থাকে বোনের কথায়। পাঁচ বান্ধবী বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যায়। রুশফি হতভম্ব ভাব নিয়েই বলে,“ওনার গার্লফ্রেন্ড আছে, তাও পাঁচটা?”
ইনশিরাহ গম্ভীর মুখে মাথা নাড়ায়। দ্বিতীয় দফায় সবার হৃদয় ভেঙে যায়।
ইনশিরাহ সবার দিকে ডেজার্টের বাটি এগিয়ে দিতে দিতে বলে,“সে কি! খাচ্ছো না কেন। খাও!”
তখনই সামিন ইয়াসার ইনায়ার ঘরের বাইরে দাঁড়িয়ে নম্রস্বরে ডাকে,“আম্মা।”
ইনশিরাহ উঠে দাঁড়ায়, ঘরের বাইরে এসে বলে,“কিছু বলবে পাপা?”
_আম্মা চলেন আপনাকে একটু নিচে যেতে হবে।
_নিচে ? কেনো পাপা?
অবাক হয়ে বলে ইনশিরাহ।
_বাড়িতে মেহমান এসেছে। তাকে একটু আপ্যায়ন করতে হবে না?
_কিন্তু পাপা আমি?
_হ্যা তুমি। ছোটো কাজ আম্মা। করবে আর চলে আসবে। তোমার মেজো মায়ের হাত পুড়েছে,সে তো পারবে না। জোনাকি আজ আসেনি। তোমার মাম্মা একা একা কদিক সামলাবে?
ইনশিরাহর কাজ করতে অসুবিধা নেই তবে সে যারপরনাই অবাক,তার পাপা তাকে কখনো কোনো কাজে বলেনি। আজ কি হলো! সে মাথা নে'ড়ে অস্ফুটে বলে,“চলো যাচ্ছি।”
সামিন নিজের মেয়ের মাথা থেকে পা পর্যন্ত দেখে বলে,“এভাবে যাবে মা? এই বেশে?”
ইনশিরাহ দ্বিতীয় বারের মতো অবাক হয়ে বলে,“তখন তো তোমার মেহমান এই বেশেই আমাকে দেখলো। তাতে কি?”
সামিন হেসে বলে,“তখন দেখেছে বলে এখনও যেতে হবে আম্মা?”
ইনশিরাহ খানিকটা বিরক্ত হয়ে কাঠকাঠ বলে,“তুমি আমার ড্রেস নিয়ে কেন পরেছো পাপা? এমন ভাবে বলছো যেনো আমাকে পাত্রপক্ষ দেখতে এসেছে।”
সামিন ইয়াসার থতমত খেয়ে যায় মেয়ের কথায়, নিচু স্বরে বলে,“এমন কিছু না আম্মা। কি বলো তো, বাইরের একজন মানুষ এসে দেখলো আমাদের বাড়িতে একজন দরবেশ ঘুরছে। এখন তাকে কিভাবে বিশ্বাস করাই এই দরবেশ আমার আদরের মেয়ে। এবং আমি তাকে প্রচুর ড্রেস কিনে দিই তবুও এই পাগল মেয়েটা ফুটো ছেড়া জামা পরে থাকে।”
বাবার কথায় ইনশিরাহ লজ্জিত হয়ে হাসে। সামিন মেয়ের দিকে তাকিয়ে বলে,“ভদ্র দেখে একটা সালোয়ার কামিজ পরে চুলটা আঁচড়ে আসেন আম্মা। যান।”
পাপা চলে যেতেই ইনশিরাহ নিজের ঘরে ঢোকে। আলমারি ভর্তি তার সালোয়ার কামিজ,যা সে কখনো ছুঁয়েও দেখে না। সেখান থেকে একটা নীল সাদার কম্বিনেশনে সালোয়ার কামিজ পরে চুলটা আঁচড়ে ক্লাচার দিয়ে আটকে ওড়নাটা ভদ্রভাবে গাঁয়ে জরিয়ে নেয়,বুকের ওপর আড়াআড়ি করে দেয় ওড়নাটা। তারপর হাতের ফোনটা বিছানার ওপর রেখে নিচতলায় যায়।
নিচতলায় গিয়ে ইনশিরাহ দেখতে পায় মুঈনকে বসিয়ে আলো আর রিতু গল্প করছে।
যাই হোক, ইনশিরাহর কাজ করতে অসুবিধা নেই। এমনিতেও বাড়ির কোনো কাজে সে হাত লাগায় না। সে এগিয়ে যেতেই আলো ইনশিরাহকে বলে,“এই এদিকে আয়। এই লোককে চিনতে পারলি?”
ইনশিরাহ একটা ঢোক গিলে নেয়। চিনতে পারবে না? এই লোক তো সেই খরুসটা। ইনশিরাহর কানের কাছে এখনও বাজছে সেই ধ'ম'ক,“সো কলড পাপা কি পরী,আই ডোন্ট ওয়ানা নো ইয়র পাপা'স নেম!”
একে,এই দৈত্যের মতো ধারালো কন্ঠের মালিককে কিভাবে ভুলবে ইনশিরাহ। সেদিনের কথা মনে পরতেই ইনশিরাহর মনে অন্য আ'তঙ্ক এসে বাসা বেঁধেছে। এই লোক মাম্মাকে বলে দেয়নি তো সেদিনের কথা! তাহলে আজ ইনশিরাহর হচ্ছে!
আলো আবারও বলে,“আমিও বোকা। তুই তো চিনতে পারবি না। তুই তখন একেবারে পুঁচকু ছিলি।”
ইনশিরাহ মাম্মার কথা বুঝতে পারছে না কিছু। তার কি এই লোককে চেনার কথা? কিভাবে?
মুঈন এবার ইনশিরাহর দিকে একপলক তাকায়। রীতিমতো বেশভূষা পাল্টে ভদ্র হয়েছে দেখে তার খানিক হাসি পায়। কিন্তু সে মুখভঙ্গি স্বভাব সুলভ গম্ভীর রেখেই বসে থাকে। আলো ব্যস্ত হয়ে পরে মুঈনের সাথে আলাপ জু'রে দিতে।
ইনশিরাহ নিচু স্বরে বলে,“মাম্মা টেবিল সেট করবো?”
_হ্যা হ্যা। কর। তোর পাপা,ইহান আর মুঈন খাবে,একটু পর ওর বেরোতে হবে।
ইনশিরাহ আড়চোখে মুঈনকে দেখে ভাবার চেষ্টা করে, কে এই লোক। ওয়াল কেবিনেট থেকে ডিজাইনার ডিনারসেট নামিয়ে টেবিল সেট করে সে। রিতু উঠে এক হাতে রান্নাঘর থেকে বাটিতে খাবার নিয়ে এসে টেবিলে রাখতেই ইনশিরাহ তার মেজো মাকে নিচুগলায় বলে,“আচ্ছা মেজো মা? কে এই লোক?”
রিতু বলে,“তুই চিনতে পারিস নি। চেনার কথাও না। ও থানা রোডের এতিম খানার একজন সদস্য ছিলো। তুই খুব ছোট থাকতে তোকে তোর দাদানদের সাথে নিয়ে প্রায় যেতো ভাইয়া ভাবী। পনেরো বছর পর্যন্ত ওখানেই ছিলো ছেলেটা। ছেলেটা ছোটো থেকেই তুখোড় মেধাবী। একা একা টিউশনি করে, পড়াশোনা করে বছর চারেক আগে চাকুরী হলো। ভীষণ ভালো একটা ছেলে। ভাইয়ার কাছে ওর কথা কত শুনেছি।”
ইনশিরাহ মাথা ঘুরিয়ে মুঈনকে দেখে। লোকটা এতিম! তাই বুঝি পাপা এতো স্নেহ করে। ইনশিরাহর খানিকটা খারাপ লাগে, সেদিন মনে মনে লোকটার মা বাবা জরিয়ে কতো নেগেটিভ কমেন্ট করলো তাই। সে মনে মনেই আল্লাহর কাছে ক্ষ'মা চেয়ে নেয়।
লিভিং রুমের সোফায় বসে সামিন হো হো করে হাসছে মুঈনের সাথে।
আলো উঠে এসে ইনশিরাহকে বলে,“যা গিয়ে ইহানকে ডেকে আন। ও এখনও খায়নি। যা।”
ইহানকে ডাকতে হয়না, সুইমিং সেরে ফ্রেশ হয়ে পাঞ্জাবি পাজামা পরে নিচে নেমে আসে। মুঈন উঠে দাঁড়িয়ে করমর্দন করে ইহানের সাথে।
সামিন উঠে তাদের খাবার টেবিলে খেতে বসার জন্য নির্দেশ দেয়।
তারপর ইনশিরাহর দিকে তাকিয়ে নম্রস্বরে বলে,“আম্মা খাবারটা পরিবেশন করে দিন।”
ইনশিরাহ আরো অবাক হয়। আজ পাপা এমন করছে কেন। মাম্মা তো এখানেই দাঁড়িয়ে। সে দিক।
চেয়ার টেনে বসে সামিন মুঈনের সাথে আলাপে ব্যস্ত হয়ে পরে। ইহান তাজওয়ার বোনের দিকে চোখ গরম করে তাকাতেই তেই ইনশিরাহ সচল হয়। দ্রুত গিয়ে বাটি হাতে নিয়ে ইহান ,আর সামিনের প্লেটে রোস্ট তুলে দিয়ে ঘুরে মুঈনের পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। মুঈন কথা বলতে বলতে একপলক ইনশিরাহর দিকে তাকিয়ে চোখ নামিয়ে নেয়। ইনশিরাহ জড়তার সাথে সার্ভিং চামচ দিয়ে চিকেন রোস্টের পিস তুলে নেয়। প্লেটে রাখতে গিয়ে দেখলো লেগপিস টা কোনোভাবে চিমটায় আটকে গিয়েছে,প্লেটে পরছে না। ইনশিরাহ বিরক্ত হয়ে হালকা ঝাকি দিতেই লেগপিস টা ছিটকে মুঈনের গাঁয়ে পরে যায়।
ঘটনাটি ঘটতে সময় নিয়েছে বড়জোর পাঁচ সেকেন্ড। ইউনিফর্ম পরিহিত মুঈন ফরাজী তরাক করে লাফিয়ে ওঠে। ইনশিরাহ একপলক মুঈনের মুখের দিকে আর একপলক তার ইউনিফর্মের দিকে তাকিয়ে তার পাপা আর ভাইয়ের দিকে তাকায়। দু'জনেই তার দিকে শীতল চোখে তাকিয়ে আছে। যেন দৃষ্টি দিয়ে ইনশিরাহকে বলতে চাইছে,“অপদার্থ”
চলমান.....
#কিছু_বকবক
★
প্রিয় এবং অপ্রিয় পাঠকের দল, করন জোহরের সাথে সেদিন কথা হলো বুঝলেন। সে আমাকে বললো, ইতি তোমার গল্প সুপার ডুপার হচ্ছে। কারো কথায় কান দিও না, এভাবেই স্ক্রিপ্ট সাজিয়ে যাও। আমি পরের বছর এটা দিয়ে বলিউডে সিনেমা বানাবো, নামও ঠিক করে ফেলেছি, সিনেমার নাম হবে,“দিল ওয়ালে উসকি দুলহানিয়া জরুর লে যায়েঙ্গে।”
★
আগামী দুদিন ছুটি পাঠকেরা। তবে এনার্জি পেলে গল্প দিয়ে দিতেও পারি। ঠিক নেই আমার। জীবন যেখানে অনিশ্চিত সেখানে আমি কিভাবে নিশ্চিত হয়ে সব বলি।
★
কাহিনী ঢিমাতালে এগোচ্ছে, কে কার নায়ক তা কেন ক্লিয়ার করছি না,প্রেম কাহিনী কেন আগাচ্ছি না। হুমম,লাখ টাকার প্রশ্ন। আর দুয়েক পর্বের মধ্যে একদফার প্রেম কাহিনী টানতে থাকবো।
★
আচ্ছা নায়কদের সৌন্দর্য আর বডির বর্ননা কি বেশি হয়ে যাচ্ছে? কি করবো বলুন তো,গল্পে কাহিনী নাই তো। ঐ দিয়েই তো সিনেমা চলবে।
★
ভালো থাকবেন,আমাকে ভালোবাসবেন। আমি বড় ভালোবাসার কাঙাল।