#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_১১
#ইসরাত_ইতি
[ ১ম অংশ ]
আলো তিতিবিরক্ত হয় মেয়ের এমন কান্ডে, টিস্যু বক্স নিয়ে মুঈনের কাছে গিয়ে তার হাতে টিস্যু বক্স তুলে দেয়। মুঈন সবাইকে আশ্বস্ত করে বলে,“ব্যস্ত হবেন না। ইটস ওকে।”
ইনশিরাহ কাঁচুমাচু মুখে দাঁড়িয়ে আছে। রোস্টের টুকরোটা তো সে প্লেটেই তুলে দিতে যাচ্ছিলো,ওভাবে ওটা ছিটকে ঐ লোকের গাঁয়ে পরলো কিভাবে !
মুঈন ফরাজী নিজেকে পরিষ্কার করে নিতে নিতে আড়চোখে ইনশিরাহর দিকে তাকায়। ইনশিরাহ লটকানো মুখটা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সোজা হয়ে, একপলক মাম্মার দিকে তাকায় সে। আলো চোখ পাকিয়ে মেয়েকে ইশারা করতেই ইনশিরাহ তাড়াহুড়ো করে মুঈনকে রোবটিক ভঙ্গিতে বলে,“দুঃখিত।”
মুঈন গম্ভীর কন্ঠে জবাব দেয়,“ইটস ওকে। নাথিং সিরিয়াস!”
ইনশিরাহ সেদিনের মুঈন আর আজকের মুঈনকে দেখে রীতিমত অবাক। থানার জাঁদরেল বড় স্যারকে আজ খুবই বিনয়ী লাগছে,কন্ঠে কি কোমলতা। আহা! যেন মধু ঝরছে!
নিজেকে পরিষ্কার করে নিয়ে মুঈন খেতে বসে। বাকিটা আলো করে দেয়। ইনশিরাহ কিছুক্ষণ বোকার মতো সেখানে দাঁড়িয়ে থেকে হেঁ'টে দোতলায় চলে যায়।
ব্যাবসার কিছু “হাবিজাবি” কাগজপত্র ঘাঁটাঘাঁটি করে ইরফান উঠে দাঁড়ায়। এসব তার কাছে “হাবিজাবিই” লাগছে। সবার মন রাখতে অফিস জয়েন করেছে তবে মন থেকে তার বাউন্ডুলে ভাবটা যায়নি। গা ছাড়া ভাব কাজের বেলায়। কাকে বোঝাবে সে তার কষ্ট! সে এখনও বাচ্চা ছেলে! ছাব্বিশ বছর কি এসব করার সময়? এসময় টা প্রেম-টেম করে জীবন নষ্ট শেষ করে দেওয়ার সময়। অবশ্য প্রেম ইরফানের হয়নি আজ অবধি। কেনো হয়নি ইরফান জানে না। একটাকে একটু ভালো লেগেছিলো,সে তো পাত্তাই দিলো না,দেখলেই কাপাকাপি, কান্নাকাটি শুরু করে দিতো। যেন ইরফান খলনায়ক। ওড়না টেনে ধরেছে তার। যত্তসব ন্যাকামি। এইসব ন্যাকা মেয়েরা একটু সুন্দরী হয়ে মনে করে ইরফান মির্জা ওদের রিজেকশন সইতে না পেরে দেবদাস হয়ে যাবে।
ইরফান বাঁকা হাসি হাসে। খোজ নিয়ে জেনেছে রিপ্পির বিয়ে ঠিক হয়েছে এক পেটমোটা সরকারি চাকরিজীবীর সাথে। বেশ হয়েছে,ঐসব ন্যাকা মেয়েদের অমন কাকুদের সাথেই সংসার হোক। যত্তসব!
ইরফানের মুখভঙ্গি হঠাৎ গম্ভীর হয়ে যায়। মেয়েটা কত কিউট ছিলো, কত নম্র-ভদ্র। ইরফানের জীবনে এমন একটা মেয়ে আসলে পুতুলের মতো সাজিয়ে রাখতো শোকেসে। দিনে দু তিনবার নামিয়ে চুমু টুমু খেয়ে আবার সাজিয়ে রাখতো যত্নে। বুঝলো না গাঁধী।
ইরফান হুট করে গালি দেয় রিপ্পিকে,“হারামজাদির কপাল খারাপ,আসল হীরে চিনলো না। এখন যা ঐ পেটমোটা কাকুর ভুঁড়িতে তবলা বাজা গিয়ে। যত্তসব।”
“আমি বাউন্ডুলে ঘুড়ি,যে আমাকে বাসবে ভালো তার আকাশেই উড়ি।”
গান ধরেছে ইরফান। মির্জা বাড়ির বখাটে,অভদ্র ছেলেটির এক আর একমাত্র গুণ। তার গানের গলা চমৎকার।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের শরীরটাকে নে'ড়ে চেড়ে ইরফান ঘর থেকে বেরোয়। তার তেষ্টা পেয়েছে। কফি খাবে সে। ইনশিরাহর ঘরের সামনে এসে দাঁড়াতেই তার পা থেমে যায়। ইনশিরাহর ফোনটা সেই তখন থেকে বেজে যাচ্ছে। এখন আবার রিং হচ্ছে। ঘরের দরজা খোলা। এতো পাগলের মতো কে ফোন দিচ্ছে ! কৌতুহলী হয়ে ইরফান ইনশিরাহকে ডাকে। ঘরের ভেতরে কেউ নেই। বিছানার ওপর ফোনটা বেজেই যাচ্ছে। ইরফান হাত বাড়িয়ে ফোনটা তুলতেই দেখে নাম্বারটা হাইড করা। এক পলক দেখার সাথে সাথে পেছন ইনশিরাহ ছো মেরে নিজের ফোনটা ইরফানের থেকে কে'ড়ে নিয়ে রাগী দৃষ্টিতে তাকায় ইরফানের দিকে, কর্কশ কন্ঠে বলে,“এভাবে আমার ফোন ধরেছিস কেন? অভদ্র!”
ইরফান সন্দেহের দৃষ্টিতে বোনের দিকে তাকিয়ে বলে,“তুই প্রেম করছিস?”
_কিসব যা তা বলছিস।
থতমত খেয়ে ইনশিরাহ বললো।
ইরফান ক্ষ্যাপা কন্ঠে বলে,“হাইড করা নাম্বারটা কার? বল?”
_যার থাকুক। তুই আমার ফোন ধরলি কোন সাহসে সেটা বল।
ইরফান গা ছাড়া ভাব নিয়ে ইনশিরাহর বিছানায় বসে বলে,“তুই প্রেম করছিস?”
_করলেও বা। তোর কি?
_আমার কি? বেশ তো কর। প্রেম টেম করে একটা ছ্যাকা খা। তারপর আমি সারাদিন গাইবো, “কাকে যেন ভালোবেসে আঘাত পেয়ে যে শেষে পাগলা গারদে আছে রমা রায়।”
ইনশিরাহ কপাল কুঁ'চ'কে ইরফানের দিকে তাকিয়ে বলে,“তুই বের হ!”
_প্রেম করছিস?
_তোর কি?
_আমার কিছুই না। তবে বিশ্বাস হয়না, তোর সাথে কে প্রেম করবে? তোকে তো সবাই আমার ছোটোভাই ভাবে। আর তুই সালোয়ার কামিজ পরেছিস কেন? দেখতে এসেছে তোকে?
_এই যা তো।
তেঁতে ওঠে ইনশিরাহ।
ইরফানের চোয়াল শক্ত হয়ে যায়, সে উঠে দাড়িয়ে পুনরায় ক্ষ্যাপা কন্ঠে বলে,“এসব লুকোচুরি করে পার পাবি না। উল্টোপাল্টা কিছু করলে বড় বাবা আর দাদানের কানে নেবো না। আমিই কল্লা ধরে একটা আ'ছাড় মারবো! মাথায় রাখিস।”
_এই আগে তুই নিজেকে শোধরা। যা এখান থেকে। মেজাজ খারাপ করিস না। এতো বড় ভাই সাজতে হবে না। দাদান আছে আমাকে শাসন করার জন্য।
ঠেলতে ঠেলতে ইরফানকে ঘর থেকে বের করে দরজা লাগিয়ে দেয় ইনশিরাহ।
★★★
ইনায়ার পাঁচ বান্ধবী এসেছিলো আরো একটি গুরুত্বপূর্ণ কাজে, আর সেটা হলো এ বাড়ির বড়দের ইনায়ার ট্যুরে যাওয়ার ব্যাপারে রাজি করাতে। সন্ধ্যা নাগাদ সবাই মিলে অপেক্ষা করেছে সামিন ইয়াসার আর ইশমাম মির্জার মুখোমুখি হবার। সবাই বদ্ধপরিকর হয়ে এসেছে আজ পারমিশন নিয়েই ছাড়বে। কিন্তু না। না ইশমাম মির্জা আর না সামিন ইয়াসার , কেউ পারমিশন দিলো না।
সবাই মনক্ষুণ্ণ হয়ে বাড়িতে ফিরে গিয়েছে। ইনায়া সেই সন্ধ্যা থেকে ঘরের দরজা বন্ধ করে রেখেছে। কারো সাথে কথা বলছে না।
পরী সন্ধ্যা নাগাদ চেম্বার থেকে ফিরেই মেয়ের ওপর গজগজ করছে রাগে। এরমাঝে রিতু গিয়ে অনেক বুঝিয়ে সুজিয়ে ইনায়াকে খাবার টেবিলে এনে বসিয়েছে।
খাবার টেবিলে আজ ইনায়ার কোনো টু শব্দটি নেই। নীরব নিস্তব্ধ পরিবেশ,শুধু চামচের টুং টাং আওয়াজ। ইনশিরাহ,ইরফান আর ইহান কেউ নেই আজ ডিনার টেবিলে। আছে বাড়ির বড়রা, ইনায়া আর তার মন খারাপ।
সামিন ইয়াসার স্বভাব সুলভ খেতে খেতে ইনায়ার মুখের দিকে তাকিয়ে থেমে যায়। তারপর ইনায়াকে উদ্দেশ্য করে বলে,“ছোটো আম্মা!”
ইনায়া ভাতের প্লেটে হাত দিয়ে বসেই ছিলো। না বড় বাবার দিকে তাকায়, না সাড়া দেয়।
মেয়ের বেয়াদবি দেখে পরীর গা রা'গে কাঁপছে।
সামিন পুনরায় বলতে থাকে,“দেশের মধ্যে হলেও চিন্তাভাবনা করে দেখতাম সবাই ছোটো আম্মা,কিন্তু নেপাল? একটু বেশি আশা করে ফেললেন না?”
কথাটা বলে সামিন থামতে পারলো না,তার আগেই বিকট শব্দে ঝনঝন আওয়াজ হয়।
সবাই হতভম্ব হয়ে খাওয়া রেখে মাথা তুলে তাকায়। ইনায়ার প্লেট টা মেঝেতে টুকরো টুকরো হয়ে পরে আছে। ইনায়া জীবনে এই প্রথম এমন দুঃসাহস দেখিয়েছে। সবাই হতবাক হয়ে ওর দিকেই তাকিয়ে আছে।
কারো মুখে কোনো কথা নেই। সামিন শান্ত চোখে ইনায়াকে দেখছে। তখনই ইনায়া চেঁ'চি'য়ে ওঠে,“বেশি আশা করে ফেললাম? না বড় বাবা! আমাকে তো তোমরা কখনো আশা করতেই দাওনি, সবকিছু তার আগে আমার সামনে এনে হাজির করেছো। যেগুলোর আমার প্রয়োজন নেই সেগুলোও। আর যা আমি চাই,তার কোনো দাম নেই তোমাদের কাছে। বন্ধুরা হাসে আমার ওপর বড় বাবা। আমি ব্রয়লার মুরগি,ফার্মের মুরগী,আমি ভুটকি, আমি চালের গুদাম। এই শব্দ গুলোই আমার জীবনে আছে। না আছে কোনো ট্যুর, না আছে কোনো স্বাধীনতা। কই গতবছর আপুও তো একা একা বন্ধুদের সাথে মালদ্বীপ গেলো। তখন তো কেউ তেমন আপত্তি তোলোনি, যত আপত্তি আমার বেলায় ?”
ইনায়া কেঁ'দে ফেলে,তার খুব অসহ্য লাগছে। কাঁদতে কাঁদতে বলে,“বন্ধুদের সাথে ট্যুরে যাওয়া তো দূরে থাক, সামান্য বন্ধুদের বাড়িতে যেতে হলেও আমাকে কত জিজ্ঞাসাবাদের সম্মুখীন হতে হয়। আমার কাজ কি শুধুই ভালো মার্কস এনেই তোমাদের হাতে দেওয়া? এছাড়া কিছু চাওয়ার থাকতে পারে না? ইটস 2050 বড় বাবা! আমার নিজের জীবনের কি স্বাধীনতা তোমরা দিয়েছো? দেখেছো আমি সব চুপচাপ মেনে নিই তাই সবসময় সব সিদ্ধান্ত গছিয়ে দিয়েছো আমার ওপর। তোমাদের পছন্দের সাবজেক্ট নিয়ে পড়ছি। আমার বন্ধু নির্বাচনের স্বাধীনতা টুকুও আমাকে দাওনি বড় বাবা। সোস্যাল স্ট্যাটাস দেখে বন্ধুত্ব করিয়ে দিয়েছো আমার।”
ইশমাম মেয়ের দিকে তাকায়, শান্ত স্বরে বলে,“বড় রা তোমার ভালোর জন্যই এতো কনসার্ন দেখায় ইনু...”
ইনায়া উঠে দাঁড়ায়। ইশমাম ততক্ষণে চেঁ'চি'য়ে ওঠে,“বেশি বাড়াবাড়ি হয়ে গিয়েছে ইনায়া চুপচাপ খেতে বসো।”
ইনায়া পাপার কথা শুনলোই না। হন্তদন্ত হয়ে হেঁটে দোতলায় চলে যায়। পরী ততক্ষণে ছুটে গিয়ে রান্নাঘর থেকে খুন্তি নিয়ে আসে।
আলো আর রিতু হতভম্ব হয়ে তাকে আটকে দিয়ে বলে,“করছো কি!”
_ছাড়ো তোমরা আমায়। কত বড় সাহস ওর , ও ওর বড় বাবার সামনে প্লেট ভা'ঙে। ঐ সব ফালতু মেয়েদের সাথে মিশে মিশে ন'ষ্ট হয়ে গিয়েছে..!
নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে পরী দোতলায় উঠতে থাকে, রিতু আর ইলহাম মির্জা ওপরে ওঠে পরীকে আটকাতে।
ঘরে ঢুকে ইনায়া বিছানার ওপর উপুড় হয়ে শুয়ে পরে, এতক্ষণ উঁচু গলায় কথাগুলো বলে সে হাঁপিয়ে উঠেছে। এদিকে পরী ওকে শিক্ষা দিতে খুন্তি হাতে ইনায়ার ঘরের মধ্যে পা রাখতেই যাবে তখনই রিতু পেছন থেকে তার হাত টেনে ধরে বলে,“একদম গাঁয়ে হাত তুলবি না ওর। ও অনেক বড় হয়েছে পরী।”
ইনায়া ধরফরিয়ে উঠে বসে। মাম্মা তাকে মা'রতে এসেছে! সে চোখ বড়বড় করে দরজার দিকে তাকিয়ে আছে।
পরী রিতুর থেকে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করতে করতে বলে,“ছাড়ো। লাই দিয়ে দিয়ে মাথায় তুলেছো ওকে তোমরা । ওর কত বড় দুঃসাহস ও ওর বড় বাবার সামনে প্লেট ভা'ঙে। ওকে আজ আমি..”
_ভুলেও তুই ওকে মারবি না। সর এখান থেকে।
_ভাবী যাও তো। আমার মেয়ে,আমাকে বুঝতে দাও। সঠিক সময়ে সঠিক শিক্ষা দিতে হয়।
_পরী যা বলছি।
_তুমি যাও। আমার মেয়ে,আমাকে বুঝতে দাও।
রিতু চ'ম'কে ওঠে, আহত গলায় বলে,“তোর মেয়ে?”
_হ্যা আমার মেয়ে।
ইলহাম এক টানে পরীকে দরজা থেকে সরিয়ে দিয়ে চোখ পাকিয়ে তাকায় তার দিকে। পরী কিছুটা অবাক হয়। রিতু ভেজা চোখে পরীর দিকে তাকিয়ে আছে।
রিতু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজের কান্না আটকে বলে,“বাহহ! এখন তোর মেয়ে হয়ে গেলো? তোর মেয়ে? আর যখন তুই আর তোর বড় যা চাকরি করতিস, ইনশিরাহ আর ইনায়াকে আমি পেলে পুষে বড় করেছি, এই কোলে পটি করেছে, পরিষ্কার করেছি। এক হাতে ভাত খেয়েছি,আরেক হাতে ওদের সামলেছি। তখন তো ওরা তোদের মেয়ে ছিলো না পরী। আমারও মেয়ে ছিলো। আর আজ বড় হয়ে গেলো বলে তোর মেয়ে? তুই বুঝবি?”
সামিন, ইশমাম আর আলো রিতুর চেঁচামেচিতে ওপরে ছুটে আসে।
পরী বোকার মতো তার মেজো জা'য়ের দিকে তাকিয়ে। একটা সিনক্রিয়েট হবে নির্ঘাত। রিতু বলতে থাকে,“তোর বড় জাও আজকাল তার মেয়েকে শাসন করছে খুব, আমি বাধা দিতে গেলেই বলছে ইনশিরাহ নাকি তার মেয়ে। কই আমি তো কখনো বলি না ইহান আর ইরফান আমার ছেলে। বলি না তো।”
কেঁ'দে ফেলে রিতু। পরী এগিয়ে এসে মেজো জা'য়ের হাত ধরে বলে,“ভাবী আমি ওভাবে বলিনি।”
ইলহাম ধ'ম'কে ওঠে পরীকে,“তুই কিভাবে বলেছিস তা খুব বুঝতে পেরেছি। ছেলেমেয়ে ভাগ করছিস?”
তারপর ইশমামের দিকে তাকিয়ে ইলহাম বলে,“এই তোর বৌ ছেলে মেয়ে ভাগ করছে। তা তুই বসে আছিস কেন। চল বাড়িটাই ভাগাভাগি করি। চল।”
সামিন আর আলো একে অপরের দিকে তাকিয়ে আছে বোকার মতো। কি থেকে কি হয়ে গেলো!
ইশমাম পরীর দিকে তাকিয়ে ধ'ম'কের সুরে বলে,“এসব কেনো বলেছো ভাবীকে। অন্যভাবে বলা যেতো না?”
পরী অসহায়ের মতো রিতুর দিকে তাকায়। সে মহা মুশকিলে পরেছে। এখন কি করবে ! রিতু কান্না থামিয়ে একটা দম নিয়ে পরীকে ধাক্কা দিয়ে ইনায়ার ঘরে ঢুকিয়ে দিতে দিতে বলে,“যা। তোর মেয়ে না? শাসন কর। যা।”
পরী রিতুর হাত দু'টো ধরে বলে,“ও ভাবী! আমি অমন ভাবে বলি নি ভাবী!”
_না বলবি না কেনো? অবশ্যই বলবি। তুই ইনায়াকে জন্ম দিয়েছিস,তোর মেয়ে। তোর বড় জা ইনশিরাহকে জন্ম দিয়েছে, ইনশিরাহ তার মেয়ে। আমার কি? বুকে আগলে বড় করলেই বুঝি আমার হলো ওরা?
আলো হেসে ফেলে, মেজো জা'য়ের মাথায় হাত বুলিয়ে বলে,“ওরে কি রা'গ!”
রিতু বড় জায়ের দিকে তাকিয়ে বলে,“রাগ? না ভাবি। মির্জা বাড়ির অর্ধশিক্ষিত মেজো বৌয়ের রাগ আছে নাকি? রাগ,তেজ এসব তো থাকবে এ বাড়ির বড় বৌ আর ছোটো বৌয়ের। যারা শিক্ষিত, চাকুরীজীবী। আমার কেন রা'গ থাকবে?”
ইরফান আর ইনশিরাহ চেঁচামেচির শব্দে যার যার ঘর থেকে বেরিয়ে আসে।
ইরফানকে বেশ বিরক্ত দেখাচ্ছে। সবার মুখের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে,“সিরিয়ালের শুটিং চলছে নাকি এখানে? আমিও কাস্ট? আমার ডায়লোগ কি?”
ইনশিরাহ পাশ থেকে বিরক্তি নিয়ে বলে,“স্টপ ইট!”
সামিন এতক্ষণে সবার মুখের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে,“সবার বলা হয়েছে? এবার আমি কিছু বলি?”
সবাই চুপ হয়ে যায়। সামিন রিতুর দিকে তাকিয়ে বলে,“কান্না থামাও,তুমি এবার পরীকে কষ্ট দিচ্ছো।”
রিতু ভাসুরের কথায় চুপ হয়ে যায়। তখনই কলিং বেল বে'জে ওঠে। সবাইকে যার যার ঘরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়ে সামিন আর আলো নিচে নেমে আসে,দরজা খুলে দেখতে পায় দরজার বাইরে ইনায়ার বান্ধবী রুশফি আর জুনির বাবা মা দাঁড়িয়ে। সাথে রুশফি আর জুনিও এসেছে।
চলমান....
[ ২য় অংশের লিংক কমেন্টে ]#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_১১
#ইসরাত_ইতি
[ ২য় অংশ ]
১ম অংশের লিংক কমেন্ট বক্সে পেয়ে যাবেন।
“এক বাড়িতে ডাকাতি হয়েছে। প্রতিবেশীর বাড়িতে অনুসন্ধানের কাজে গেছেন গোয়েন্দা।
গোয়েন্দা : গত রাতে পাশের বাসা থেকে আপনারা কোনো শব্দ শুনতে পেয়েছেন?
প্রতিবেশী : নাহ! গোলাগুলি, চিৎকার আর ওদের কুকুরটার চেঁচামেচির যন্ত্রণায় কিছু শোনাই যাচ্ছিল না!”
“এক ভদ্রলোকের পাঁচ ছেলে l বড় ছেলের নাম ভাঙ্গা, মেজো ছেলের নাম বাসি, সেজো ছেলের নাম পচা, তার পরেরটার নাম মুতে এবং ছোট টার নাম পাংচার। একদিন ওদের বাড়িতে এক অতিথি এলেন।
তো ভদ্রলোক তাকে বললেন,“আপনি এসেছেন ! বসেন বসেন, ভাঙ্গা চেয়ারটা নিয়ে আয় !
অতিথি::- না না আমি বসবো না !
ভদ্রলোক : আচ্ছা, না বসুন, ভাত খাবেনতো ! বাসি ভাত নিয়ে আয়।
অতিথি::- না না just খেয়ে এসেছি। খাবোনা।
ভদ্রলোক::- কিছুই খাবেন না, তা হয় না। পচা দই নিয়ে আয়।
অতিথি::- না না দই খেলে আমার ঠাণ্ডা লেগে যায়। প্লিজ আমি খাবো না।
ভদ্রলোক::- তা কি হয়? কিছু না হোক অন্তত এক গ্লাস জল তো খান। ওরে মুতে জল দে।
অতিথি::- আপনি থামুন মশাই!!!
ভদ্রলোক::- ইশ, আপনি কিছুই খেলেন না, ভালো লাগছে না আমার।
অতিথি::- আমি চললাম, পরে আসবো।
ভদ্রলোক::- আপনি হেঁটে এসেছেন। আপনাকে কিন্তু আমি হেঁটে যেতে দেবো না। পাংচার সাইকেলটা নিয়ে আয়।
প্রনমি হাসছে তো হাসছেই। জামি সন্তুষ্টি নিয়ে প্রনমির দিকে তাকায়। পাশ থেকে সাফওয়ান বিরক্ত হয়ে বলে,“তুই আর তোর জোকস্। ভাই মিশফা তোর সাথে ব্রেকআপ করে খুব ভালো করেছে।”
জামি লটকানো মুখ নিয়ে বলে,“তোকে কে শুনতে বললো? আমি তো প্রনমিকে শোনাচ্ছি। দেখ ও হাসছে।”
প্রনমি হাসি থামিয়ে জামিকে বলে,“জামি ভাইয়া। কিন্তু গত সপ্তাহেও জোকস্ দু'টো শুনিয়েছিলেন আমাকে।”
জামি বললো,“তাই নাকি? কি বলো! তাহলে এভাবে হাসলে কেন যেন এই প্রথম শুনলে এগুলো?”
প্রনমি বলে,“না হাসলে আপনার খারাপ লাগতো। আপনার সদ্য ব্রেক আপ হয়েছে, ভাইয়া বললো।”
সাফওয়ান হে'সে ফেলে। জামি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,“সবাই মজা ওড়াচ্ছো। ওড়াও! যত খুশি ওড়াও।”
_না না জামি ভাইয়া,আমি মজা ওড়াইনি।
প্রনমি সাফাই দিচ্ছে।
ডাইনিং টেবিলের ছয়টা চেয়ার আজ দখল হয়ে গিয়েছে। প্রিতমের তিন বন্ধু জামি, সাফওয়ান,শুভ আজ প্রেরনার তরফ থেকে ডিনারের ইনভিটেশন পেয়েছে।
প্রেরনা সবাইকে খাবার পরিবেশন করে দিতে দিতে জামিকে বলে,“জামি। খাও তো। ওরা মজা ওড়ালেই বা কি? থোড়ি ওসবে কিছু হয় ? অমন মিশফার থেকে ভালো কেউ আসবে আমাদের জামির লাইফে।”
_আপু আপনিই আমাকে খুব বোঝেন। আর কেউ বোঝেনা। জানেন আমি প্রিতমকে কত হিংসা করি, ওর আপনার মতো একটা বড় বোন আছে বলে। আমার তো নেই। মম আর ড্যাড তো আমাকেই আগে আনলো দুনিয়াতে তারপর ফুলস্টপ দিয়ে দিলো, পুরো টা সময় নিজেরা ঝগড়া করেই কুল পায়না পরিবার পরিকল্পনা করবে কখন!”
প্রেরনা শাড়ির আঁচল মুখে চে'পে নিশ্চুপ হাসে। প্রিতম জামিকে পাশ থেকে খোঁচা মেরে বলে,“মুখে একটু লাগাম টান না!”
জামি বলে,“ব্রোকেন ফ্যামিলির ছেলে আমি আপু। বাবা মায়ের ডিভোর্স হয়নি। তবুও ব্রোকেন ফ্যামিলিই বলা চলে। রোজ রোজ মম ড্যাডের মধ্যে ঝামেলা দেখে দেখে ডিপ্রেসড হয়ে ডিপ্রেশন কমাতে খাওয়া শুরু করলাম। আজ এই হাল। গার্লফ্রেন্ড টেকে না। ড্যাডের প্রচুর টাকা ছাড়া আমার লাইফে কিছু নেই। জোকারি করে সবাইকে বিনোদন দিই। আচ্ছা আমি কি বেশী কথা বলি আপু?”
_মোটেই না।
_আপনি আমার বড় বোন হলে লাইফে আর কিছু চাইতাম না।
প্রেরনা বলে,“জামি আমি তোমারও বড় আপু। ঠিক আছে?”
_এই কথাটা তিনবার বলুন।
প্রেরনা অবাক হয়ে হেসে বলে,“আচ্ছা ঠিক আছে। আমি তোমারও বড় আপু, তোমারও বড় আপু, তোমারও বড় আপু।”
_ঠিক আছে। আপনি যখন আমার বড় আপু তাহলে এবার আমার কথাটা রাখতেই হবে। প্রিতমের ট্যুরের সব খরচ আমি দেবো।
প্রেরনা ম্লান হেসে জামির প্লেটে কাবাব তুলে দিয়ে বলে,“এটা হয়না জামি। তুমি কেন দেবে? আমার ভাই জীবনে এই প্রথম একটু শখ করেছে। ও নিজে ইনকাম করছে। ও কেন নেবে? ”
_তার মানে আপনি পারমিশন দিয়ে দিলেন ওকে? ট্যুরে যাওয়ার জন্য?
প্রেরনা হেসে বলে,“হু। আর একবছর ব্যাচলের আছো। যাও ঘুরে এসো বন্ধুরা মিলে। সামনের বছর না হয় সস্ত্রীক যাবে।”
প্রিতম,জামি,শুভ, সাফওয়ান একে অপরের দিকে উচ্ছ্বসিত হয়ে তাকায়। জামি তড়াক করে লাফিয়ে উঠে একটা চেয়ার টেনে প্রেরনাকে বলে,“বসুন আপু।”
প্রেরনা বসতে বসতে বলল,“কেন?”
শুভ প্রেরনাকে খাবার সার্ভ করে দেয়।
সাফওয়ান বলে,“আপনি কত ভালো আপু। ইউ ডিজার্ভ আ কুইন ট্রিটমেন্ট।”
প্রেরনা হাসছে, বলে,“তোমরা সবাই পাগল!”
জামি বলে,“তাহলে এই খুশিতে আরেকটা জোকস্ হয়ে যাক?
শোনো সবাই হয়েছে কি, “দুই পাগলের মধ্যে ঝগড়া শুরু হয়েছে আকাশের সূর্য নিয়ে। এক পাগল বলল, ‘ওটা আগুনের গোলা!’ আরেক পাগল বলল, ‘না, ওটা চাঁদ!’ তাদের ঝগড়া শেষ পর্যন্ত মারামারিতে গিয়ে ঠেকল। এমন সময় সেখানে এক পথচারী এসে হাজির হল। দুই পাগলই পথচারীকে জিজ্ঞেস করল, ‘আচ্ছা বল তো, ওটা কি আগুনের গোলা, না আকাশের চাঁদ?’”
পথচারী কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বললো,“আমি তো এই পাড়ায় থাকি না তাই ঠিক বলতে পারবো নি।”
★★★
বসার ঘরের সোফা দখল করে আছে জুনি এবং রুশফির বাবা মা, জুনির বাবা ইঞ্জিনিয়ার জুনায়েদ আহমেদ এবং রুশফির বাবা ডক্টর আহসান। তারা এসেছে মির্জা বাড়ির লোকদের রাজি করাতে।
মুখোমুখি সোফায় বসে আছে সামিন ইয়াসার মির্জা এবং ইশমাম মির্জা, আলো আর পরী মেহমানদের জন্য কিছু নাস্তা তৈরি করতে গিয়েছে। ওনারা এই প্রথম এসেছে বাড়িতে।
“তো ভাই, টেনশনের কিছুই নেই বুঝলেন। জুনির মাও সাথে যাবে। বছর খানেক হলো বাপের দেশে ঘুরতে যায় না। ও বাচ্চাদের গাইড করবে। আপনাদের টেনশনের প্রয়োজন নেই। আরে এখনই তো এক্সপ্লোর করার সময়। ওরা এখন ঘুরবে না তো কখন ঘুরবে?”
সামিন আর ইশমাম একে অপরের দিকে তাকায়। তারপর দূরে শুকনো মুখে মাথা নিচু করে বসে থাকা ইনায়ার দিকে তাকায়।
মির্জা বাড়ির সবাইকে দোনামোনা করতে দেখে জুনির বাবা জুনায়েদ বলে,“আপনারা না চাইলে তো আর জোর করতে পারবো না তবে ইনায়া মামনির পাঁচ বান্ধবীর খুব খারাপ কাটবে এই ট্যুর টা।”
আলো আর পরী চা নিয়ে এসে সবাইকে দেয়। সামিন আর ইশমাম শুনতে থাকে জুনায়েদ আর তার স্ত্রীর গল্প। জুনায়েদের স্ত্রী মৈথি একজন নেপালি। তাদের ভালোবাসার বিয়ে। চা খেতে খেতে সবার সাথে আরো বেশ কিছুক্ষণ আড্ডা দিয়ে তারা চলে যায়। চলে যাওয়ার আগে ইশমামকে আরো একবার অনুরোধ করে যায় জুনি আর রুশফির বাবা।
মেহমান বাড়ি থেকে বেরোতেই সবাই, বাড়ির সব বড়রা ইনায়ার দিকে তাকায়।
ইনায়া মাথা না তুলেই প্রত্যেককে শুকনো গলায় বলে,“আমার যাওয়ার ইচ্ছা নেই। আর মাম্মা এবং মেজো মা,আ'ম রিকোয়েস্টিং ইউ অল, এভাবে বিশ্রী ঝগড়া করো না আমার কোনো ইস্যু নিয়ে। আমি যেতে চাই না কোথাও।”
কথাগুলো শেষ করে ইনায়া ওপরে চলে যায় ধীরপায়ে হেটে।
বাড়ির সবাই একে অপরের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে।
★★★
এস.পি. মুঈন ফরাজী নির্বিকার চিত্তে তার সামনে সমুচা চিবোতে থাকা মতিউর রহমানকে দেখছে। মতিউর রহমান স্বভাব সুলভ এক একটা হালকা কৌতুক মেরে সবাইকে হাসানোর চেষ্টা করছে।
পোস্টিং এর পরে কিছু ফর্মালিটিজের পেপার সংগ্রহের জন্য মুঈন ফরাজীকে এখানে আসতে হয়ে। আইজিপি মতিউর রহমান
মুঈনকে তার সামনে রাখা সমুচার প্রিচ দেখিয়ে বলে,“টেইক ইয়াং ম্যান।”
মুঈন ফরাজী সৌজন্য হাসি হেসে বলে,“নো স্যার থ্যাংক ইউ।”
_আরে খাও ইয়াং ম্যান। তোমরা আজকালকার ছেলেরা এতো স্বাস্থ্য সচেতন। কিন্তু লাভ কি? ঐ করে শুধু হাতের মাশল ফুলিয়েছো। আমার এই বয়সের শক্তির ধারেকাছেও নেই তোমরা। এই মোটা পেট নিয়ে অনায়াসেই ধরাশায়ী করে ফেলতে পারি।
মুঈন সিনিয়রের কথায় স্মিত হাসে। মতিউর রহমান হাহা করে হাসছে,স্বভাবে তিনি যেমন ঘুষখোর,তেমন হাসিখুশি একজন মানুষ।
হাসতে হাসতেই হঠাৎ সিরিয়াস হয়ে বলে,“শুনলাম কদিনেই ডিপার্টমেন্ট কাঁপিয়ে ফেলেছো। গোপন সূত্রে খবর পেলাম।”
মুঈন ফরাজী মুচকি হেসে বলে,“আমি শুধু আমার ডিউটি করছি স্যার।”
_হু। ডিউটি টাইমের বেশিও থাকছো অফিসে শুনেছি।
মুঈন গম্ভীর কন্ঠে বলে,“ডিউটি টাইম বলে কথা নেই। কনস্টেবল কিংবা পুলিশ সুপার বলেও কোনও কথা নেই। পুলিশ আইন ও সংবিধান অনুযায়ী ইমার্জেন্সি সার্ভিস হিসেবে যখন যার প্রয়োজন, তার ডিউটিতে থাকা বাধ্যতামূলক। এখানে মানবিকতা কিংবা অমানবিকতা বলে কোনও শব্দ নেই। পুলিশের আইন অনুযায়ী, পুলিশ সদস্যরা ২৪ ঘণ্টা অন ডিউটিতে থাকবেন। আইনেই পুলিশ বাহিনীকে ‘ইমার্জেন্সি সার্ভিস’ হিসেবে ঘোষণা করা আছে।”
পেট মোটা আইজিপি মতিউর রহমান আবারও তার স্বভাব সুলভ সে কুৎসিত হাসি হেসে বলে,“অল্প বয়স,বিয়ে করো নি ! পরিবার নেই। তাই এমন কথা বলছো ইয়াং ম্যান। একবার নিজের জীবনের সাথে কাউকে জরিয়ে দেখো,এসব ডিউটি, কর্তব্য তখন খুব তেতো লাগবে। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলছি।”
মুঈন হেসে বলে,“দেখা যাক।”
_তা বিয়ে করছো না কেনো?
_এখনও চিন্তা ভাবনা নেই। দেখি সামনে,আল্লাহ যখন চাইবেন। এসব তো তার হাতে।
_হ্যা ভেবে চিন্তেই বাছ বিচার করেই করো ইয়াং ম্যান। সুদর্শন, সুপুরুষ তুমি। আমার ভায়রা ভাই সচিব জানোতো ,তার একটা মেয়ে আছে, ডাক্তারি পরছে। চাইলে কথা বলতে পারি। জানিও।
মুঈন হ্যা বা না তে উত্তর না দিয়ে শুধু হাসে। প্রিচে থাকা অবশিষ্ট সমুচা টা চিবুতে চিবুতে মতিউর রহমান বলে,“শোনো,একটা উপকারী পরামর্শ দিই তোমাকে। যে এরিয়ায় তোমার পোস্টিং হয়েছে, ওটা খুব একটা সুবিধার না। একটু বুঝে শুনে চলবে কেমন? তোমাকে দেখলেই মনে হয় তুমি আমার মতো ঘুষ টুষ খেতে পারবা না, তবুও দেশের অবস্থা তো জানো, একটু তালে-মিলে চলবে বুঝলে? ঐ পুকুরে রুই কাতলা না, ঐ পুকুরে আছে ইল। সাহসী হয়ে ধরতে গেলেই বিপদ।”
মুঈন ফিচেল হেসে বলে,“আপনার কথা মাথায় রাখবো স্যার। আজ উঠি।”
হ্যা যাও,“আর যেটা বললাম। বিয়ে করতে চাইলে বলবা, সচিবের মেয়ে এনে দেবো। একজন সুযোগ্য পুলিশ কর্মকর্তা তুমি। ভাগ্য সুপ্রসন্ন হলে আমার এই চেয়ারে বসবে দ্রুত,নাহলে একটু দেড়িই লাগবে,তবে বসবে তো! যার তার ঘর থেকে মেয়ে আনবে না।”
_আমি কিন্তু ঐ স্তর থেকেই উঠে এসেছি স্যার।
মুঈন কথাটা বলে সৌজন্য হেসে আইজিপি মতিউর রহমানের সাথে করমর্দন করে তার হেড কোয়ার্টার থেকে বেরিয়ে পরে। হেড কোয়ার্টারের গেটের বাইরে দুজন কনস্টেবল পুলিশ জিপ নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো।
জীপ ছুটে চলে হাইওয়ে ধরে। কনস্টেবল দু'জন আড়চোখে তাদের নতুন এস.পি. স্যারকে দেখছে।
জানালা দিয়ে বাইরের দিকে দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে আছে একত্রিশ বছর বছরের মেধাবী, আত্মপ্রত্যয়ী, জাঁদরেল অফিসার মুঈন ফরাজী।
কানে বাজছে আইজিপি স্যারের বলা কথাটা,“পরিবার নেই তাই এমন কথা বলছো ইয়াং ম্যান।”
পরিবার! এই পরিবার কেমন হয়? মুঈন ফরাজী জানে না। এই পরিবার কখনো মুঈন ফরাজীর জীবনে ছিলো না। একদিন হবে সম্ভবত। হলে কেমন হবে? আচ্ছা পরিবার কেমন হয়? একজন সঙ্গী, দু'টো বাচ্চা, এলোমেলো ঘর, গুছিয়ে দেওয়ার জন্য নরম দু'টো হাত। মুঈনের কখনো পরিবার হলে কেমন হবে?
মুঈন ভাবতে ভাবতে হাসে, হয়তোবা খুব ভালো হবে। তার জীবনে না পাওয়া সবকিছু জমিয়ে সে হয়তোবা, হয়তোবা চমৎকার একটা পরিবার তৈরি করতে পারবে। একজন সঙ্গী,দু তিনটে বাচ্চা। ভালোবাসা আর অনেক অনেক আদর। এমন বুঝি পরিবারের সংজ্ঞা? মুঈন ফরাজী ঠিক জানে না, বিকজ মুঈন ফরাজী নেভার হ্যাড আ ফ্যামলি!
তবে অবশ্যই হবে। এই জাঁদরেল ,তেজী, গম্ভীর মুঈনকে দেখে কেউ ভাবতে পারবে না,তবে এই জাঁদরেল অফিসারেরও ইচ্ছা সে চমৎকার পরিবার গড়বে। চমৎকার!
গাড়িতে যেতে যেতে হাইওয়ের পাশে বড় শপিং মলটা চোখে পরে মুঈনের। কোনো এক কালে এই মলটাতে সে একটা দোকানে কাজ করতো। তখন উচ্চমাধ্যমিকে পরে সে। এই শহরের বিভিন্ন স্থান তার স্মৃতিকে খুঁচিয়ে দেয়। কতশত স্মৃতি, পরিশ্রম আর পরিশ্রমের স্মৃতি।
কোয়ার্টারের সামনে জীপ পৌছাতেই জীপের ড্রাইভার বলে,“স্যার কোয়ার্টারে ঢুকবেন?”
মুঈন ফরাজীর ঘোর কাটে। ড্রাইভারের দিকে তাকিয়ে বলে,“হু? না। থানা রোডের এতিমখানায় চলো। কিছুক্ষণ সময় কাটাবো ওদের সাথে।”
চলমান......