ফন্ট সাইজ:
থিম:
বধূ কোন আলো লাগল চোখে ২

পর্ব 12

লেখক: ইসরাত ইতি

#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_১২
#ইসরাত_ইতি

পঙ্কজ শরণ লেন থেকে স্টেডিয়াম এরিয়া। এই যায়গাটা মুঈনের পরিচিত। স্টেডিয়ামের পাশের ভাটিয়ারা পুনর্বাসন কেন্দ্রের একটা ঘিঞ্জি বাড়িতে এক দরিদ্র মুয়াজ্জিনের ঔরশে জন্ম নিয়েছিলো এ থানার নতুন জাঁদরেল স্যার মুঈন ফরাজী। দুই হাজার বিশের করোনা মহামারী সেই সদ্য জন্ম নেয়া শিশুটির মা বাবাকে। শিশুটির বয়স তখন আড়াই মাস। স্থান হলো তার বৃদ্ধ নানা আর নানীর কাছে। নানা নানী শিশুটিকে আশ্রয় দিতে পেরেছিলেন বছর দুয়েক। বার্ধক্য জনিত রোগে দু'জনে গত হলে সেই শীর্ণকায় রুগ্ন শিশুটির ঠাঁই মেলে থানা রোডের এতিমখানায়।

সকাল ছয়টা আট মিনিট। মুঈনের বেলা অব্দি ঘুমানোর অভ্যাস নেই। সে বরাবর টাইম-টু-টাইম প্রকৃতির লোক। তবুও পোস্টিংয়ের এ কদিনে বেশ বেলা করে,ডিউটি টাইমের আগে আগে ওঠা হয়েছে। আজ উঠলো ঠিক সময়ে।

নেভি ব্লু আর হোয়াইট মিশেলে জগার্স এবং নির্মেদ দেহের সাথে লেপ্টে থাকা কালো টি-শার্ট। দশ হাজার স্টেপ কম্লিট হয়েছে মাত্র। মুঈন নিজের গন্তব্য পর্যন্ত পৌঁছে কিছুটা ঝুঁকে, হাঁটুতে দুই হাত রেখে হাপাচ্ছে। চওড়া কপালের নিলচে রগ দৃশ্যমান। শ্যামলা মুখটা লাল হয়ে উঠেছে। আজ দশহাজার স্টেপেই হাঁপিয়ে উঠেছে। শরীরে আর শক্তি অবশিষ্ট নেই।
এখন কিছু ফ্রি হ্যান্ড এক্সারসাইজ করেই কোয়ার্টারে ফিরে যাবে বলে ঠিক করলো সে। নার্সারি পার্কের লম্বা বেঞ্চটা থেকে তার জ্যাকেট টা তুলে হাতে নিয়ে এদিক ওদিক তাকায়। যায়গাটা এতক্ষণ শুনশান নিস্তব্ধ ছিলো,এখন লোকজন আসতে শুরু করেছে। বেশিরভাগই ষাটোর্ধ্ব জুটি,পায়ে পা মিলিয়ে ছুটছে। উদ্দেশ্য শরীর ঠিক রাখতে হবে তো, বয়স কালে হেলায় হেলায় যে ভুল করেছে,এখন নিয়মিত শরীর চর্চা করে সব পুষিয়ে নিতে হবে।

কিছুক্ষণ আশেপাশে অযথা তাকিয়ে থেকে মুঈন ফরাজী দেখতে পেলো সবাই জুটিতে জুটিতে এসেছে জগিং করতে। থানার জাঁদরেল অফিসার মুঈন ফরাজীর নিজের ওপর হাসি পেলো। এখানে আর তার থাকা উচিৎ হবে না। এটা সম্ভবত লাভ বার্ডদের জগিং এরিয়া। এখানে জাঁদরেল ব্যচেলর অফিসার মুঈন ফরাজীর কাজ কি? সে জ্যাকেট টা গাঁয়ে পরে নিয়ে লম্বা লম্বা পায়ে মেইন রোডে ওঠে। কোয়ার্টার থেকে এক কিলোমিটার দূরে অবস্থান করছে সে। আশেপাশে দু তিনটে ডিপার্টমেন্টাল স্টোর, কিন্তু সেগুলো এখনও খোলা হয়নি। তবে অদূরেই দু'টো টিনশেড টংয়ের দোকান।

মুঈনকে দেখে টংয়ের দোকানী ভীত চোখে তাকায়। গায়ের জ্যাকেটে পুলিশ লেখা। মুঈন বৃদ্ধ লোকটির আ'ত'ঙ্কি'ত মুখটা দেখে বিব্রত হয়, একটা অস্পষ্ট হাসি দেয় অভয় দেওয়ার প্রচেষ্টায়। গম্ভীর কন্ঠে খুবই নম্রস্বরে বলে,“একটা পানির বোতল দিন চাচা।”

বৃদ্ধ লোকটি পানির বোতল টা একটা পরিষ্কার তোয়ালে দিয়ে মুছে মুঈনের দিকে দিয়ে বলে,“আর কিছু?”

মুঈন মাথা নেড়ে বোতলটা নিয়ে তার টংয়ের দোকানের বেঞ্চিতে বসে। বৃদ্ধর পেছন থেকে তার স্ত্রী মুখ শাড়ির আঁচলে ঢেকে বারবার মুঈনকে দেখছে।

পুরো বোতল খালি করে মুঈন বৃদ্ধকে টাকা এবং একটা স্নিগ্ধ হাসি ফিরিয়ে দিয়ে দোকান থেকে বেরিয়ে আসে। কোয়ার্টারের রাস্তা না নিয়ে উল্টো পথে হাঁটতে থাকে সে। হাতে আরো অনেক সময় বাকি। কোয়ার্টারে এতো তাড়াতাড়ি ফিরে কি আর করবে ? পরিবার থাকলে একটা তা'ড়া থাকতো, ব্রেকফাস্ট টেবিলে সবাইকে নিয়ে খেতে বসতে হতো। ওসব তো নেই তার। তারচে আরো হাজার দুয়েক স্টেপ কম্লিট করা যাক।

ফোর লেনের আধুনিক রাস্তায় একপাশে একটা গোলাপী স্কুটি পার্ক করে রাখা। মুঈন দেখলো সেটিকে, এই মেয়েরাও! তাদের সবকিছু গোলাপী চাই! খুবই হাস্যকর লাগে এই ব্যাপারটা মুঈনের কাছে। মেইন রোড থেকে ঢাল বেয়ে নেমে বদ্ধভূমি পেরোলেই কালী মন্দির রোডের রাস্তা। এখানে মুঈন দুদিন আগে এসেছিলো একটা কেসের জন্য। যায়গাটা আপাতত রেস্ট্রিক্টেড। ডু নট এন্টার ফিতা দিয়ে ঘে'রা। সাধারণ মানুষ ঢুকতে পারবে না এখানে।

হেঁটে কিছুটা যেতেই মুঈনের পায়ের গতি স্থির হয়। সরাসরি তাকিয়ে আছে সামনের দিকে, ভ্রু কুঁচকে গেলেও পর পর কপালের রেখা বিলীন হয় তার। সে জ্যাকেটের পকেটে হাত ঢুকিয়ে তাকিয়ে থাকে নির্নিমেষ।

ইনশিরাহ জংলা ডোবা থেকে কুকুরের বাচ্চা দু'টোকে তুলতে গিয়ে নিজেই কাদাপানিতে মাখামাখি হয়ে গিয়েছে। কিন্তু তবুও হাল ছাড়েনি। মানুষগুলোর ওপর ঘৃনা হয় ইনশিরাহর যারা এই অবলা প্রানীগুলোকে বস্তাবন্দি করে ফেলে রেখে যায়। ঐ মানুষগুলো কেনো বোঝে না এরাও প্রানী। এরা আশরাফুল মাখলুকাত নয় বলে কি এদের জীবন তুচ্ছ ?

দু'টো কুকুর ছানাকে রেসকিউ করে ছেড়ে দেয় ইনশিরাহ। হাতের প্যাকেটে একটা রুটি অবশিষ্ট। দু'টো কুকুর এই একটা ক্ষুদ্রাকার রুটিতে হবে না। রুটি আজ যা কিনেছিলো তা নার্সারি পার্কের কুকুর গুলোকে দিয়ে এসেছে। দুমিনিট কিছু একটা ভেবে ইনশিরাহ হাতের ছোটো রুটিটা দুভাগ করতে থাকে।

“সমান ভাগ হয়নি।”
ইনশিরাহ চ'ম'কে উঠে ডানে তাকায়। মুঈন শান্ত চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে। ইনশিরাহ অবাক চোখে দেখছে তাকে। মুঈন চিরায়ত গম্ভীর কন্ঠে ইনশিরাহর চোখের দিকে তাকিয়ে বলে,“তোমার ডানহাতের টুকরোটা বড়।”

ইনশিরাহ ফ্যালফ্যাল করে কয়েক মূহুর্ত তাকিয়ে থেকে টুকরো দু'টো কুকুর ছানা দু'টোর দিকে ছুঁড়ে মা'রার আগে বলে,“হোয়াটেভার!”

_এটা রেস্ট্রিক্টেড এরিয়া!
রাশভারী কন্ঠে পুনরায় বললো মুঈন।

ইনশিরাহ চোখ বড় বড় করে মুঈনের দিকে তাকায়। সে তো জানে,ঢুকতে চায়নি এখানে। তবুও কুকুর ছানা দু'টোকে বাঁচানোর চক্করে ঢুকে পরেছে। এখন? এখন কি হবে! পুলিশের এই কর্মকর্তা নিশ্চয়ই সেদিনের মতো অনেক অনেক জ্ঞান দেবে ইনশিরাহকে!

মুঈন ইনশিরাহর দিকে তাকিয়ে বাঁকা হাসি হেসে কন্ঠে গাম্ভীর্য নিয়েই বলে,“এখানে দুদিন আগে একটা দূর্ঘটনা ঘটেছে। ফিতে দিয়ে পুরো এরিয়া আটকে দেওয়া। দুধরনের লোক ব্যতীত কোনো বুদ্ধিমান লোক ঢুকবে না এখানে। এক যে আহাম্মক,আর দুই যে আহাম্মক।”

ইনশিরাহ ঘুরে দাঁড়ায় মুঈনের দিকে। কথা খুঁজে পাচ্ছে না কোনো।

মুঈনের ঠোঁটে বক্র হাসির রেখা। হুট করে বলে উঠলো,“অবশ্য আরেক ধরনের লোক ঢুকতে পারে, যারা ক্রিমিনাল,এখানে তাদের অপকর্মের কোনো এভিডেন্স পরে আছে কিনা এটা দেখতে।”

ইনশিরাহ বেশ কিছুকাল চুপ করে থেকে বলে,“এখানে রোজ আসতাম মর্নিং ওয়াকে। আমি দেখেছি ফিতে দেওয়া। ঢুকতে চাইনি। দূর থেকে বস্তাবন্দি কুকুর ছানা দু'টোকে দেখে না ঢুকে থাকতে পারিনি। দু্ঃখিত।”

_দুঃখিত ফর হোয়্যাট?

_এইযে এখানে ঢোকার জন্য।

মুঈন টানটান হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে, তারপর বলে,“এক্সাইটমেন্টে গাড়ির স্পিড বাড়িয়ে বেপরোয়া গাড়ি চালানো অথবা ডু নট এন্টার জোনে ঢুকে পরা। দু'টোই ভীষণ বিপদজনক হতে পারে, তুমি জানো এখন তোমাকে থানায় নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা যায়, সন্দেহভাজন হিসেবে।”

ইনশিরাহ মুঈনের থেকে দৃষ্টি নামিয়ে সোজা হাঁটতে শুরু করে। একবারের জন্যও পিছু ফিরে তাকায় না। অদূরেই উঁচু ফোর লেনের রাস্তায় তার স্কুটির দিকে অগ্রসর হয়।

মুঈন স্থির হয়ে একই স্থানে দাঁড়ানো। কুকুর ছানা দু'টো তখন সেখানে খেলায় মেতেছে। তাদের দিকে একপলক তাকিয়ে মুঈন একপেশে হাসি হেসে বলে,“ভালোমানুষ বাপের বখে যাওয়া মেয়ের সেভিয়ার অবতার। দিস ইজ ইন্ট্রেস্টিং ঠু!”

★★★

নেপাল ট্যুর নিয়ে এমনিতেই ইনায়ার উত্তেজনার শেষ ছিলো না। এই শতাব্দীর সবচেয়ে আশ্চর্য ঘটনা ঘটেছে মির্জা বাড়িতে। ইনায়াকে ট্যুরে যেতে দিতে রাজি হয়েছে সবাই। গতকাল থেকে ইনায়া আনন্দে নাচছে। ওর নাচানাচি দেখে সবাই হাসছে।

আজ বিকেলে ইনায়া ইনশিরাহর সাথে বানিজ্য মেলায় এসেছে। দুমাস ব্যাপী মেলার আঠেরো দিন হয়ে গিয়েছে। ইনায়াকে একা একা আসতে দিতো না কেউ, ইনশিরাহ ছিলো বলে রক্ষে।
অবশ্য দুই দাদানের কেউ জানে না, বাড়ির মহিলা সংঘের থেকে পারমিশন নিয়ে এসেছে। আসার পরে তাদের সাথে জুটেছে ইনশিরাহর দুজন বান্ধবী।

ইনশিরাহর পিছু পিছু সাঈম ভুঁইয়া এসেছে মেলাতে। দু তিনবার চোখাচোখি হয়েছে দু'জনের। ইনশিরাহ মেসেজে সাফ বারণ করেছে মেলা প্রাঙ্গণে ঢ্যাং ঢ্যাং করে ইনশিরাহর সামনে চলে আসতে। এখানে ইহান মির্জা আর ইরফান মির্জার খবরি আছে তা ইনশিরাহ জানে। কিছু উল্টোপাল্টা টের পেলে তৃতীয় বিশ্ব যুদ্ধ লেগে যাবে নির্ঘাত।

ইহান আজ ব্যস্ত ছিলো সাংগঠনিক কাজ নিয়ে,দুপুরের লাঞ্চ এখনও করা হয়নি তার। ঘন্টা খানেকের জন্য দলীয় অফিসেই ঢুকেছিলো রেস্ট নিতে। কিন্তু ইহানের রেস্ট নেওয়া আর হলো না। দলের ছেলে সিফাত ফোন করে বললো ইনায়া আর ইনশিরাহকে বানিজ্য মেলায় দেখা গিয়েছে।

বানিজ্য মেলায় যাওয়া নিয়ে ইহানের আপত্তি নেই তবে এবারের বানিজ্যমেলার পৃষ্ঠপোষক সরকারি দল। লাবিবের দলের আনাগোনা মেলাতে। ইনশিরাহ আর ইনায়া যদি কোনোভাবে হেনস্থার শিকার হয় !
ইহান একমিনিটও বসলো না। আজ রাগ হলো বোনদের ওপর। তার থেকে পারমিশন না নেওয়ার কারনে। বাড়িতে ফোন করে আলো আর রিতুকে কথা শোনালো। তারপর ছুটলো বোনদের নিয়ে আসতে।

স্টল ঘুরে ঘুরে দেখছিলো ইনশিরাহ আর ইনায়া। নিজেদের মনে দুবোন আজ অনেকটা দিন পরে এতো উপভোগ করলো। যেটা ভালো লাগলো কিনলো,যেটা খেতে ইচ্ছে হলো খেলো। ডায়েটের ধার ধারলো না।

সবশেষে একটা আইসক্রিম পার্লারের সামনে এসে দাঁড়ালো দুজন। আনন্দ নিয়ে যখন আইসক্রিম খাচ্ছিলো তখন ওরা কেউ দেখলো না কিছু প্রতিহিংসা পরায়ণ দৃষ্টি ওদের ঘুরে ফিরে দেখছিলো। ইহান তাজওয়ার মির্জার বোন দু'টোকে চিন্তে অসুবিধা হয়নি কারো।

হাত নিশপিশ করছে ওদের হেনস্থা করতে,মুখ নিশপিশ করছে ওদের টিজ করতে। হাত দিয়ে ছোঁয়ার মতো সাহস নেই,তবে মুখতো চালানোই যায়। ছরিয়ে ছিটিয়ে থাকা জানোয়ারগুলোর মধ্যে থেকে দুজন ওদের দিকে এগিয়ে আসে, পাশ কাটিয়ে যাওয়ার সময় কুৎসিত করে একজন আরেকজনকে বললো,“আরে এটা ছেলে না মেয়ে?”

_কি জানি,প্যান্ট খুলে দেখতে হয়।

ইনশিরাহ আর ইনায়া চ'মকালো,একে অপরের দিকে তাকিয়ে রইলো। মুহূর্ত কাটতেই ইনশিরাহ ঘুরে দাঁড়িয়ে মন্তব্য কারীকে দেখতে চাইলো।
ভিড়ের মধ্যে বোঝার উপায় নেই কথাটা কে বলেছে। ইনশিরাহ শুধু খুজে চলেছে, একবার হাতে পেলে ধোলাই দিয়ে যাবে।

“ইশি।”

ইনশিরাহ চ'ম'কে ওঠে। ইহান গিয়ে ওদের পেছনে দাঁড়িয়েছে। ইনায়া ভীত চোখে দাদানকে দেখছে। এ আবার কোত্থেকে এলো! ইহান দু'জনকে দেখে বললো,“কি হয়েছে? এনি প্রবলেম?”

_দাদান একজন লোক টিজ করলো,আমি মুখটা দেখতে পারলাম না লোকটার।

ইনশিরাহ কথা শুনে ইহানের চোয়াল শক্ত হলো। দাঁতে দাঁত চেপে বললো,“কি বলেছে?”

ইনশিরাহ চোখ নামিয়ে নিলো, দাদানকে খুলে বলতে পারলো না। ইহান একটা গভীর নিঃশ্বাস ফেলে পাঞ্জাবির হাতা গুটিয়ে নিয়ে এগিয়ে গেলো সামনে। ইনশিরাহ আর ইনায়া থ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো।
দুমিনিট পরে কফি কালারের শার্ট পরিহিত সরকারি দলের ছাত্র সংগঠনের ক্রিড়া সম্পাদকের ছোটো ভাই নয়নের কলার ধরে একপ্রকার ঝুলিয়ে নিয়ে মাঠের মাঝখানে ফেললো ইহান।

ততক্ষণে বিরাট জটলা লেগে গিয়েছে। ইনশিরাহ আর ইনায়া একপাশে দাঁড়িয়ে আছে শুধু। ইহান ছেলেটার কলার ধরে মে'রেই চলেছে। ইস্পাতের মতো কঠিন হাতের ঘুষি পরছে মুখে। ওদের দলের দু'জন লোক ছাড়াতে এলে ইহানের অগ্নিদৃষ্টি দেখে পিছিয়ে গেলো তারা।

মেলা প্রাঙ্গণের গেট দিয়ে যখন ইহান ঢুকছিলো তখনই ইহান দেখেছে ছেলে দু'টো লোলুপ দৃষ্টিতে ইনশিরাহদের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। বাকিটা আর বুঝে নিতে অসুবিধা হয়নি ইহানের।

ছেলেটার কলার ধরে ইনায়া আর ইনশিরাহর সামনে এনে বললো,“সরি বল!”

“ভুল করছেন ইহান মির্জা। ওকে ছাড়ুন।”

কন্ঠস্বর পরিচিত,ইহান ছেলেটির কলার ধরে রেখেই ঘুরে তাকায়। বিরোধী দলের সভাপতি লাবিব দাঁড়িয়ে।

ইহান দাঁতে দাঁত চেপে লাবিবের সামনে ছেলেটাকে আরেকটা ঘুষি মেরে ইনশিরাহর সামনে নিয়ে বলে,“সরি বল! বল সরি।”

★★★

প্রনমিকে একপাশে দাড় করিয়ে মিস জেনি ডিজাইনার কুশন কভার গুলো দেখছিলো। আজ অনেকদিন পরে প্রনমিকে নিয়ে শপিংয়ে বেরিয়েছে সে। কতক্ষনই বা বাড়িতে বসে থাকতে ভালো লাগবে মেয়েটার। কিছু না-ই দেখতে পাক, মিস জেনি তো আছে। সব কিছু বলে যাচ্ছে সে।

প্রনমি কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললো,“আপু আসবে না? আপু তো বললো।”

_হ্যা আসবে তো মামনি। ওর রেস্তোরাঁ থেকে আসতে আধাঘণ্টা লেট হবে। তুমি বলো,আর কি নিতে চাচ্ছো?

_ভাইয়ার জন্য একটা নিউ শার্ট।

_ঠিকাছে। এখানের শপিং শেষ। চলো আমরা সেকেন্ড ফ্লোরে যাই,জেন্টস পয়েন্টে।

একটা শার্ট কিনে প্যাক করে দিতে বলে মিস জেনি প্রনমির দিকে ফিরে বললো,“প্রনমি! মাই বেবি! তুমি কিছুক্ষণ এখানে চুপ করে বসে থাকো। আমি দুমিনিট ঐ ওয়াশরুমে যাবো আর আসবো। অসুবিধা হলে সাথে সাথে বাটন টিপে আমাকে কল করে দেবে,ওকে?”

প্রনমি হেসে বলে,“ওকেহ। বসতে হবে না। আমি দাঁড়িয়ে আছি। আপনি যান।”

একপাশে প্রনমিকে দাড় করিয়ে রেখে মিস জেনি ওয়াশরুমে ঢুকে গেলো। প্রনমি দাঁড়িয়ে রইলো চুপচাপ,ভদ্রমেয়ের মতো।

ইরফান নিজের পছন্দের ব্র্যান্ডের শোরুমে ঢুকে হুডির কালেকশন দেখছিলো। একটাও পছন্দ হচ্ছিলো না। বেকার বেকার কিছু উল্টে পাল্টে দেখে রেখে দেয়। তার গাঁয়েও একটা হুডি আর একটা থ্রি-কোয়ার্টার প্যান্ট, পায়ে হোয়াইট কেডস্। স্পোর্টস ক্লাব থেকে টেনিস খেলে সোজা এখানে এসেছে সে।
আজ ইরফানের সাঙ্গপাঙ্গরা কেউ আসেনি সাথে,নিক্সন এসেছে শুধু। সে দূরেই নিজের জন্য শার্ট দেখছিলো।

হঠাৎ ইরফানের ফোনের রিংটোন বেজে ওঠে। রিসিভ করে কানে ধরতেই ওপাশ থেকে রাফি বলে,“দোস্ত তুই কই!”

_আছি মলে। কি হইছে?

_বানিজ্য মেলায় আয়। এখানে ক্যাচাল লাগছে!

_ক্যাচাল মানে?

_ইনশিরাহ আর ইনায়ারে বাট্টু লাবিবের লোক টিজ করছিলো সম্ভবত। ইহান ভাইয়া পিটাইছে। ওদের লোক আসছে,ইহান ভাইয়েরও লোক আসছে। তুই আয়। আমরাও আছি বাকিরা।

ইরফানের চোয়াল শক্ত হয়। খেকিয়ে ওঠে রাফির ওপর,“এই এই তোরা ঐ চুতিয়ারে চিৎ করে ধরে রাখ। এখনি পুলিশে খবর দিতে নিষেধ করা ভাইয়াকে। ওটাকে চিৎ করে ধরে রাখবি,আমি এসে সুদির ভাইয়ের জায়গা মতো কিক মা'রবো।”

প্রনমি ভ্রু কুঁচকে ফেললো। শব্দগুলো কোন পাশ থেকে আসছে? ছিঃ। মুখের কি ভাষা! এটা তো পাব্লিক প্লেস। অভদ্র কোথাকার।

জেন্টস পয়েন্টে ক্লিনিং চলছিলো। ক্লিনার লোকটা প্রনমিকে বললো,“ম্যাম একটু ওপাশে গিয়ে বসবেন। এখানটা ক্লিন করবো।”

প্রনমি “জি” বলে পাশে সরে যায়। ছড়ি মেলে হেঁটে দূরে যেতে নিলেই কারো গাঁয়ের সাথে ধাক্কা লাগে তার।

ইরফান ফোনে কথা বলতে বলতে ওপাশ থেকে আসছিলো। খেয়াল করেনি প্রনমিকে। ধাক্কা খেয়েই খেকিয়ে ওঠে,“শালা কানা নাকি!”

প্রনমি শিউরে ওঠে। এতো মনে হচ্ছে সেই গালিবাজ লোকটা ! ইরফান মাথা ঘুরিয়ে দেখতে পায় প্রনমিকে। কিছু মুহূর্ত প্রনমির চোখের দিকে তাকিয়ে থাকে, তারপর বাঁকা হেসে বলে,“ও তুমি লেডিস! তাহলে তো শা'লা হবে না।”

প্রনমি দাঁড়িয়ে আছে চুপচাপ। ইরফান প্রনমির পা থেকে মাথা পর্যন্ত দেখে বলে,“যাই হোক। তোমরা মেয়েরা তো নিজেদের ভুল স্বীকার করবে না। তাই আমিই সরি বললাম। সরি।”

ইরফান দেখছে মেয়েটা তার দিকে তাকাচ্ছে না। তার মাথার দিকে তাকিয়ে আছে। ইরফান নিজের মাথায় হাত দেয়। কিছু লেগে আছে নাকি।

প্রনমি বললো,“সরি ভাইয়া। ভুলটা আমারই। আমি রাস্তার মাঝখানে চলে এসেছি।”

নিক্সন এসে দাঁড়ায়। প্রনমি বলে,“ধাক্কা লেগে এখানে আশেপাশে আমার ছড়িটা আর ওয়াচটা ছিটকে পরেছে কোথাও। একটু তুলে দিলে উপকৃত হতাম।”

ইরফান হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে প্রনমির দিকে। মেয়েটা তবে অন্ধ ! দূরেই মেঝে থেকে প্রনমির ছরি আর ওয়াচ তুলে প্রনমির হাতে দিতে দিতে গম্ভীর কন্ঠে বলে,“বাপ মা কই তোমার? এখানে মেয়েকে মানুষের ল্যাং খেতে ফেলে রেখে গিয়েছে।”

ধ'ম'কের মতো কথা।

প্রনমির বিরক্ত লাগে। লোকটা কেমন উগ্র প্রকৃতির। কিন্তু সে মুখে বলে,“থ্যাংক ইউ।”

“প্রনমি বেবি।”
মিস জেনি ছুটে এসে ধরে প্রনমিকে। তারপর ইরফানের দিকে তাকিয়ে প্রনমিকে বলে,“কি হয়েছে মামনি?”

_কিছু না। চলুন।
মিস জেনিকে নিয়ে প্রনমি চলে যায়‌। কিছুটা দূরে যেতেই ফিসফিসিয়ে মিস জেনিকে প্রনমি বলে,“ঐ লোকটা অনেক ভয়ংকর দেখতে তাই না মিস জেনি?”

মিস জেনি অবাক হয়ে বলে,“না তো। এমন কথা বলছো কেনো? তোমাকে কিছু বলেছে নাকি?”

প্রনমি অস্ফুটে বললো,“না, কন্ঠ শুনে মনে হলো।”

ইরফান প্রনমিদের যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে আছে। নিক্সন বলে,“তাকিয়ে আছিস কেন? ভালো লেগেছে মেয়েটাকে? মেয়েটার চোখ দুটো সুন্দর।”

ইরফান মুখে বিরক্তি ভাব ফুটিয়ে বলে,“ ভালো লাগার মতো কি হয়েছে? ইরফানের এতো সহজে ভালো লাগে না। আর কিসের সুন্দর চোখ ? বিলাইয়ের মতো সাদা সাদা নীল নীল ঘোলাটে। দেখলেই রা'গ ওঠে‌ । ঐ প্রিতমেরও এমন চোখ।”

উলটো পথে হাটা ধরে ইরফান। নিক্সন পিছু পিছু। তাকিয়ে আছে বন্ধুর পিঠের দিকে। এই ছেলেটাকে বোঝা মুশকিল। তখন চোখ দেখে মনে হলো মুগ্ধ হয়ে দেখছে।

ইরফানের ফোনে কল আসে। সে কলটা রিসিভ করে বলতে থাকে,“হু খবরদার যেন ভাইয়া পুলিশ না ডাকে। আমি এসে আগে একটা কিক মারতে চাই সুদির ভাইকে।”

ফোন কে'টে এক্সিটের কাছে যেতে যেতে ইরফান নিক্সনকে বলে,“মেয়েটা সুন্দর আছে। ঐ যে, কি বলে না, মিষ্টি দেখতে। তবে দশে আট। চোখ দুইটা ঐ প্রিতম বিলাইয়ের মতো তাই দুই কা'টা।”

শপিং মল থেকে মেলা প্রাঙ্গণে পৌঁছাতে ইরফানের লেগেছে দশমিনিট।
ইহান আর লাবিব মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে লাবিব নিজে শাসন করার ভান করে উত্যক্তকারী ছেলেটাকে দু'টো চ'ড় থাপ্পড় মেরে ইনশিরাহ আর ইনায়ার কাছে মাফ চাইতে বলে।

ছেলেটা ইহানের মা'র খেয়ে বিধ্বস্ত প্রায়। নিজের দলের সভাপতির কাঁচুমাচু হাবভাব দেখে সে আরো ভয় পেলো। হাঁপাতে হাঁপাতে সরি বলে দিলো।

ঝামেলা মিটে গিয়েছে প্রায়, ইহান লাবিবের চোখে চোখ রেখে বোনদের নিয়ে বেরোবে ঠিক তখনই গেট থেকে ঢুকেই ইরফান একলাফে ওদের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়ে পরে। তারপর দম নিয়ে নয়নকে দেদারসে মারতে শুরু করে দেয়।
হাঁপিয়ে উঠলেও থামলো না সে।

ইহান ইরফানের বন্ধুদের চোখ দিয়ে ইশারা করতেই ওরা বহু কষ্টে ইরফানকে ছাড়িয়ে নিলো। ততক্ষণে নয়নের অবস্থা আরো বেগতিক।
ওদের ছেলেরা ইরফানের সামনে থেকে ওকে সরিয়ে নিয়ে গেলো।

লাবিব শান্ত চোখে তাকিয়ে আছে ওদের দিকে। এই শহরে ইহান তাজওয়ার মির্জার সাথে সরাসরি দ্বন্দে কখনো জড়ায়নি সে, পিছনে পিছনে বহুত লেগেছে। আজ এই প্রথম। যেহেতু ভুলটা ওর দলের ছেলেদের তাই চুপ করে আছে সে।

ইহান ইরফান দুই ভাই বোনদের নিয়ে মেলা প্রাঙ্গণ ত্যাগ করে গাড়িতে উঠলো।
ইনশিরাহ আর ইনায়া দু'জনে চুপচাপ। ইহান ড্রাইভ করতে করতে আড়চোখে ইরফানকে দেখে বললো,“শেষে এসে এতো ঝামেলা করতে কে বলেছে? বলেছিলাম না এসব থেকে একেবারে দূরে থাকবি?”

_তুমিও তো মারামারি করো তখন?

_আমার পেশাই এটা। তোর না ‌।

_আমার পেশা না,আমি রাজনীতি করি না। তোমার বোনদের বাজে কথা বলেছে দেখে তুমি মে'রেছো, আমি মে'রেছি আমার বোনদের বাজে কথা বলেছে দেখে। সিম্পল!

চলমান.....

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 12 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন