ফন্ট সাইজ:
থিম:
বধূ কোন আলো লাগল চোখে ২

পর্ব 13

লেখক: ইসরাত ইতি

#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_১৩ [ সারপ্রাইজ পর্ব ]
#ইসরাত_ইতি

ভুঁইয়া ম্যানশনে সাগর ভুঁইয়ার ছোটো বোন আর বোন জামাই এসেছে বেড়াতে। সাগর ভুঁইয়ার ছোটো বোনের স্বামী মোস্তাফিজুর রহমানের বিভিন্ন ধরনের ব্যাবসা ছরিয়ে ছিটিয়ে আছে এ শহরে। ভুইয়াদের থেকেও কম নয় কিছুতে তারা। সেসব নিয়েই আলাপ চলছিলো।

সাঈম ইনশিরাহর সাথে চ্যাটিং করতে করতে ফুপাকে সালাম দিয়ে পাশ কাটিয়ে চলে যায়। সাঈমের ফুপু সিনথিয়া তার বড় ভাই সাগর ভুঁইয়াকে বলে ওঠে,“মতি গতি তো ঠিক সুবিধার না। বলছে সিরিয়াস না,আবার পুরো দিন মেয়েটাকে নিয়েই পরে থাকে। কিছু বলছেন না কেন ভাইয়া? মির্জা বাড়ির মেয়েকে বৌ করে আনায় খুব উৎসাহ দেখছি আপনার।”

সাগর ভুঁইয়া হাসে,বলে,“ক্ষতি কি!”

সিনথিয়া ক্ষুব্ধ কন্ঠে বলে,“ক্ষতি কি মানে? ছোটো ভাইয়ের মৃ'ত্যুর কথা ভুলে বসে আছেন দেখছি।”

সাগর ভুঁইয়া উচ্চশব্দে হেসে ওঠে। কিছুক্ষণ হেসে চুপ হয়ে যায়, তারপর বলে,“খারাপ কি বলতো? সামিনের মেয়ে এবাড়ির বৌ হয়ে আসবে। আমার বাড়ির বংশধর জন্ম দেবে, বান্দিগীরি করবে এ বাড়ির। আমি তো এতে খারাপ কিছু দেখছি না।”

★★★

সন্ধ্যা থেকে রাগে গজগজ করছে মির্জা বাড়ির বড় বৌ আলো। বানিজ্য মেলার ঘটনায় শহর গরম হয়ে গিয়েছে। কানে এসেছে তার। কিন্তু রাগটা তখন উঠেছে যখন সে ইনায়ার থেকে শুনলো ছেলেগুলো আসলে কি বলেছিলো।
শার্ট প্যান্ট পরে থাকলে অমন কথা তো পদে পদে শুনতেই হবে! একটু ভদ্র সভ্য হয়ে থাকলে কি হয়?

আলোকে শান্ত করতে সামিন ইনশিরাহর পক্ষ নিয়ে দু'টো কথা শোনাতে চেয়েছিলো তবে আলোর ধ'ম'কের কাছে টিকলো না সেসব।
সামিন চুপচাপ বসে আছে। আলো কিছুক্ষণ ঘরের ভেতর পায়চারি করে প্রেশারের ওষুধ খেয়ে বিছানায় বসে স্বামীর দিকে তাকায়। তারপর বলে,“একদিন আপনার ঐ গুণধর মেয়ের জন্য আমার কিছু একটা হয়ে যাবে মেয়র সাহেব,দেখবেন।”

সামিন এবার বিরক্তি নিয়ে তাকায় স্ত্রীর দিকে। বলে,“অতরিক্ত বলে ফেললে না? কি করেছে আমার মেয়ে?”

_কি করেছে বুঝছেন না?

_আলো এতে ইনশিরাহকে দুষছো কেনো? পোশাক নিয়ে এতো চিপ কথাবার্তা কিভাবে বলতে পারো তুমি? আর আমার মেয়ে কি পরে? কোনো দৃষ্টিকটু পোশাক পরেনা, ও যেসবে সাচ্ছন্দ্য বোধ করে সেগুলো পরে।

_এভাবেই লাই দিচ্ছেন।

_আলো লাই কোথায় হলো? আচ্ছা শার্ট প্যান্ট পরেছে বলেই ওকে বাজে মন্তব্য করাটা ফরজ হয়ে গেলো পুরুষদের জন্য? ওর যায়গাতে শাড়ি চুড়িদার বোরখা পরা মেয়েরা উত্যক্ত হয়না?

আলো চুপ করে থাকে, সামিন বলতে থাকে,“তুমি বললে লাই দিই! কেনো দেবো না বলো তো? আজ পর্যন্ত একটা অশোভন আচরণ করেছে মেয়ে, দেখেছো? মিসেস পুর্না, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোস্তাফিজুর রহমান, মিসেস শেলীর মেয়ে গুলো ইনশিরাহর বয়সী, ওরা কি করে জানো? লিভ টুগেদার করছে। বাবা মায়ের ইমোশনকে বুড়ো আংগুল দেখিয়ে। সেখানে আমার মেয়েকে নিয়ে আমার গর্ব হয়। যা করে, যেটুকু করে করুক। বিয়ে দিলে,সংসারী হলে,মা হলে শুধরে যাবে।”

_শোধরালেই ভালো।

_না শোধরালেই বা কি? তুমি শুধরেছো? আমি তো দিব্যি সংসার করলাম ছাব্বিশ বছর। আমার মতো কাউকে পেয়ে যাবে তোমার মেয়ে। যে তাকে তার মতো করেই গ্রহণ করবে।

আলো স্বামীর দিকে সরু চোখে তাকায়,বলে,“খুব কষ্ট হয়েছে এই ছাব্বিশ বছর তাই না?”

_হু খুব।
হেসে জবাব দেয় সামিন। আলো কিছুক্ষণ রাগী চোখে তাকিয়ে থেকে হেসে ফেলে। তারপর স্বামীর কাধে মাথা রেখে বলে,“চলেন বিয়ে দিই মেয়ের।”

_দেবো। ফাইনাল ইয়ার শেষ হোক।

_ছেলে? ছেলে কি আকাশ থেকে টপকাবে? একটা ভদ্র সভ্য সামিন ইয়াসার মির্জার ফটোকপি খুঁজতে হবে তো।

সামিন হেসে স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বলে,“খুজে তো রেখেছি।”

_মানে?
অবাক হয়ে আলো জানতে চায়।

_তুমি কি অবুঝ আছিয়া..বোঝোনি এখনও?

আলো কৌতুহলী এবং কিছুটা অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে স্বামীর দিকে।
সামিন বলে,“আন্দাজ করতে পারছো না?”

_মুঈন?
আলো আমতা আমতা করে বললো। সামিন হেসে বলে,“ইয়েস!”

খুশিতে,বিস্ময়ে আলোর চোখ দু'টো চক চক করে উঠলো। উচ্ছসিত কন্ঠে বললো,“বেশ হবে মেয়র সাহেব বেশ হবে। আমার এতো আনন্দ হচ্ছে। আমার মাথায় শুরুতে কেন এলো না। সত্যিই আপনার পছন্দের তারিফ করতেই হয়।”

সামিন হাসলো। আলো বললো,“ওকে দেখলেই আমার মন ভরে যায়। আমার মেয়েটার পাশে ওর থেকে ভালো আর কাউকে মানাবে না। ”

বাচ্চা বাচ্চা কন্ঠে আলো বললো। সামিন স্ত্রীর কান্ড দেখে হাসতে থাকে। হঠাৎ আলো চুপ হয়ে যায়, তারপর বলে,“কিন্তু কিভাবে?”

_যেভাবে বিয়ে হয় সেভাবে।

_এজন্য বুঝি মেয়েকে ওভাবে সাজিয়ে গুছিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন সেদিন? কিন্তু মেয়র সাহেব এভাবে মেয়ের অজান্তে ওকে দেখালেন, এটা তো অন্যায় করলেন আপনি।

সামিন মুখে চ বর্গীয় শব্দ করে বলে,“আরে ধুর। আমি কি মেয়ে দেখালাম নাকি? তোমার মেয়ের সাথে হুট করে মুঈনের বিয়ের কথা কিভাবে বলি? এটা সম্ভব? তাই দু'জন দু'জনকে দেখে যেনো ভালো একটা মনোভাব তৈরি হয় দু'জনের প্রতি তাই অমন করেছি। চেনা জানা বাড়ুক। প্রথম দিন যেভাবে দেখা হলো!”

শেষের কথাটা সামিন অস্পষ্ট করে বললো! আলো শুনলো না। শুনতে পেলে থানার কথা বলতে বাধ্য হতো সামিন।

আলো উঠে দাঁড়ালো। মেয়ের বিয়ের কথা,মেয়ের জন্য নির্বাচিত পাত্রের কথা শুনে আলোর ব্লাড প্রেশার নরমাল হয়ে গিয়েছে পুরো। বায়ান্ন বছর বয়সী অদ্রিতা আলো বাচ্চাদের মতো আহ্লাদী গলায় বলতে লাগলো,“আমার তর সইছে না। কবে মেয়েটার বিয়ে দেবো। আমি আর কিছু ভাবতে পারছি না মেয়র সাহেব। মুঈন, ইনশিরাহ,আমাদের চার পাঁচটা নাতি নাতনি। উফফ। আল্লাহ। এতো সুখ দেখে যেন ম'রতে পারি।”

★★★

আজ জুম্মাবার। ইশমাম মির্জা আজ ভাই আর ভাইপোদের সাথে নামাজ আদায় করতে পারলো না। সে গিয়েছিলো এক কলিগের সাথে সাক্ষাৎ করতে কাজীপাড়া রোডে। সেখানেই একটা মসজিদে নামাজ আদায় করেছে সে। খুতবা পাঠ শেষ হবার পরে আর এক মিনিটও বসলো না ইশমাম। তাকে আজ আরো কিছু কাজ শেষ করতে হবে। মেয়ে কাল ট্যুরে যাবে,সে ব্যাপারে একটু কথা বার্তা বলতে হবে। ট্যুরে যাওয়ার পারমিশন দিলেও অনেক চিন্তিত ইশমাম। কত আদরের মেয়ে,তার ওপর খানিকটা বোকা বোকা,ঠিক মায়ের মতো।

মসজিদের বাইরে পা রেখে জু'তো খুঁজছিলো ইশমাম। এতো লোকের জুতোর মধ্যে তার জু'তো কিভাবে খুঁজে পাবে সে। নিচু হয়ে যখন খুঁজতে লাগলো ঠিক তখন তার পাশে এসে দাঁড়ায় প্রিতম। ইশমাম মাথা তুলে তার পাশে থাকা লোকটার মুখদর্শন করতেই থমকায়। চমকায় প্রিতমও। দুজন দুজনের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। দু'জন দু'জনকে দেখছে। পরনে পাঞ্জাবি,মাথায় টুপি। আহা কি ভদ্র লাগছে দু'জনকে। অথচ এরা একে অপরকে দ্য আওয়ার্সের সামনে দেখেছে।

ইশমামের কপাল কুঁ'চ'কে যায়। জু'তো খুঁজে পেলে জু'তো জোড়ায় পা গলিয়ে নিতে নিতে বললো,“একই অঙ্গে কত রূপ!”

প্রিতম শুনলো। তার চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। সেও বিড়বিড় করে বললো,“সেইম টু ইউ!”

_তোমাদের হেদায়েত দিক আল্লাহ।

_আপনাকেও দিক। আপনি বড়। আপনাকে বেশি করে হেদায়েত দিক।

প্রিতমও পাল্টা জবাব দেয়। বড় হয়ে যদি বড়দের মতো আচরণ না করে তবে এমন উত্তরই পাবে।

ইশমাম একপলক সেই বেয়াদব ছেলেটার দিকে তাকিয়ে গটগট করে হেঁটে বেড়িয়ে যায়।

প্রিতম দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হাসে, বিড়বিড় করে বলে,“জামির সুন্দর আঙ্কেল আসলেই সুন্দর একটা নমুনা আঙ্কেল।”

★★★

দেয়ালে জয়নুল আবেদীনের একটি পেইন্টিং। শুদ্ধ চোখ বড় বড় করে সেটি দেখছে। পেইন্টিং টির অর্থ তার বোঝার কথা নয়। সে তার মাম্মাকে কপাল কুঁচকে বলে,
“মাম্মা দেখো,কি বাজে একেছে! কালার পেন্সিল দিয়ে আঁকেনি কেনো মাম্মা? ওদের কাছে কি কালার পেন্সিল নেই?”
প্রেরনা তার অবুঝ ছেলের কথায় হাসে। রিসিপসনিস্ট এসে তাদের উদ্দেশ্য বলে,"আপনি প্রেরনা আহসান?"
প্রেরনা মাথা নাড়ায়।
_আপনাকে স্যার ডাকছে।
প্রেরনা উঠে দাঁড়িয়ে শুদ্ধর হাত ধরে।

"আপনিই সেই প্রেরনা?"
একজন চল্লিশোর্ধ স্বাস্থ্যবান পুরুষ। মাথার সামনের অংশে কিছু চুল উঠতে শুরু করেছে। প্রশ্নটি করেই প্রেরনার দিকে অত্যন্ত কৌতুহলী দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সে।
প্রেরনা একটু নড়েচড়ে বসে। এই ভদ্রলোককে আংকেল ডাকবে নাকি ভাইয়া ডাকবে সেটা বুঝতে পারছে না।
সে মুখে বলে,"জি।"

লোকটি শুদ্ধর দিকে একটি খেলনা প্লেন এগিয়ে দিতে দিতে প্রেরনাকে উদ্দেশ্য করে বলে,
"কি করা হয়?"
_আমার একটা রেস্তোরাঁ আছে।
_বেশ । বেশ ভালো।
প্রেরনা বিব্রত বোধ করছে। তাকে এতো প্রশ্ন করা হচ্ছে কেনো সেটিই বুঝতে পারছে না।
_বলো এখন। তোমার ছেলের কোন আচরণে তোমার মনে হচ্ছে ও স্বাভাবিক নয়।

প্রেরনা শুদ্ধর দিকে তাকায়। শুদ্ধ প্লেন নিয়ে খেলছে।

_আমার ছেলে কখনো কোনো বাচ্চাদের সাথে মেশে না। ওর কোনো বন্ধু নেই। কেউ নিজে থেকে খেলতে আসলেও ও মিশতে চায়না। সবসময় বাচ্চাদের এরিয়ে চলে। ওর বয়স মাত্র ৫ বছর। এতটুকু বয়সেই কেমন চুপচাপ হয়ে থাকে। যেখানে বন্ধুদের সাথে হুটোপুটি করার কথা। অনেক অনেক দুষ্টুমি করার কথা।

লোকটি মন দিয়ে প্রেরনার কথা শোনে। তারপর শুদ্ধর দিকে তাকায়। ফরসা মুখ, চুল গুলো ঘন এবং সিল্কি। চোখ দুটো একেবারে মায়ের মতো। নীলচে বর্ণের চোখ,অতি রুপবান একটি শিশু।
লোকটি প্রেরনাকে বলে,"ওর বাবা মারা গিয়েছে কত বছর হয়েছে?"
প্রেরনা এমন অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্নে একটু বিরক্ত হলেও বলে,
"ও যখন আমার পেটে ছিলো। আমি যখন সাড়ে আট মাসের গর্ভবতী।"

লোকটি প্রেরনাকে একপলক দেখে। বয়স বড়জোর সাতাশ কিংবা আঠাশ। যখন বিধবা হয়েছিলো তখন বয়স বাইশ কি তেইশ ছিলো। এতো অল্প বয়সে বিধবা হয়েছে বলেই কি এতো কাঠিন্যতা মেয়েটির মুখে!

"মিসেস প্রেরনা।"
প্রেরনা আগ্রহী হয়ে ওঠে ডাক্তারের কথা শুনতে। ডাক্তার বলতে থাকে।
"সমস্যাটা তোমার ছেলের নয়। সমস্যাটির সুত্রপাত তোমার থেকেই হয়েছে। "
প্রেরনা অবাক হয়ে তাকায়। মেহেদী হাসান বলতে থাকে,
"তোমার স্বামীকে তুমি অনেক ভালোবাসতে। যার কারনে তার মৃত্যুটা তোমাকে বেশ নাড়িয়ে দিয়েছিল। তাই ছেলেকে জন্মের পর থেকেই আগলে আগলে রাখতে শুরু করলে। প্রিয়জন হারানোর ভয় তোমাকে জেকে ধরেছিলো। কিন্তু এতে করে তুমি শুদ্ধকে আর পাঁচটা বাচ্চাদের মতো ট্রিট করোনি। একসময় ওর মস্তিষ্কেও এটা ঢুকে গিয়েছে যে ও আলাদা। গোটা ব্যাপারটায় তোমার ভুমিকা অপরিসীম।"
প্রেরনা হাত মুঠি করে তাকিয়ে থাকে। কয়েক মুহূর্ত চুপ থেকে বলে,
"এখন কি করতে হবে?"
_কিছুই না। তুমি শুধু ওকে ওর স্বাধীনতা টুকু ছেড়ে দাও। ওকে একজন নরমাল বাচ্চার মতো ট্রিট করো। আগলে রাখতে চাইলে অবশ্যই রাখবে,তবে সেটা আড়াল থেকে।
_তার মানে বলতে চাইছেন ওর কোনো সমস্যা নেই?
_না। তুমি নিশ্চিন্তে বাড়িতে যাও। দেখেছো কিরকম খেলছে তোমার ছেলে? সবকিছু কিভাবে কৌতুহলী হয়ে দেখছে। ওকে দেখেই বোঝা যাচ্ছে খুবই বুদ্ধিমান বাচ্চা।
প্রেরনা একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়ে। ডাক্তার মেহেদী হাসানের দিকে তাকিয়ে বলে,"আমি প্রচন্ড ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম জানেন। তারপর একজন পরিচিতের কাছ থেকে আপনার অ্যাপয়েন্টমেন্ট যোগার করলাম।"

_তোমাকে এই অহেতুক ভয়টাকেই কাটিয়ে উঠতে হবে।
আশ্বস্ত করে ডাক্তার মেহেদী হাসান বললো প্রেরনাকে।

প্রেরনা মাথা নাড়ায় তার কথায়।

সকাল সকাল ছেলেকে নিয়ে বেড়িয়ে পরেছে আজ। সাইকিয়াট্রিস্ট মেহেদী হাসানের সাথে অ্যাপয়েনমেন্ট শেষ করে ফুরফুরে মেজাজে শুদ্ধকে নিয়ে প্রেরনা শিশু পার্কে যায়।

ছেলেকে রাইডে তুলে সে ক্যামেরা বন্দী করতে থাকে তাকে। সদা হাস্যোজ্জ্বল,প্রেরনাকে হাসিয়ে মাতিয়ে রাখা শাওকাত ওয়াসীতের গম্ভীর পুত্র শুদ্ধ ইবনে ওয়াসীত রাইডে চরে নির্লিপ্ত হয়েই বসে আছে। তার দৃষ্টি অদূরে। প্রেরনা ছেলের দৃষ্টি অনুসরণ করে তাকাতেই থ'ম'কে যায়। অদূরেই পার্কে বাচ্চারা তাদের বাবার সাথে রাইডে চড়েছে।

প্রেরনা ঘুরে ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে ছেলেকে কোলে তুলে নেয়। নরম গলায় বলে,“চলো বাড়িতে ফিরি। আজ মামাকে একটা লম্বা লিস্ট দিয়ে দেবো,মামা নেপাল থেকে শুদ্ধর জন্য অনেক অনেক গিফটস নিয়ে আসবে।”

প্রেরনাদের অ্যাপার্টমেন্টের বাইরে আজ একজন সবজি ওয়ালা এসেছে। তাজা তাজা সবজি দেখে প্রেরনার স্টেরিওটাইপ নারী মন চনমনে হয়ে উঠলো। অ্যাপার্টমেন্টের ভাবীদের দেখাদেখি সেও কিছু সবজি কিনলো। রীতিমতো সব্জি ওয়ালার সাথে দরদাম করে,বেছে বেছে তাজা দেখে কিনলো। ভাবীরা হাসে। তাদের মধ্যে একজন বলে,“যাই বলো প্রেরনা,তোমার তুলনা হয়না। বাজার সদাই করাতে একটা পুরুষকেও হার মানাও তুমি। তোমার ভাই তো রোজ দুবার তোমার প্রশংসা করে।”

প্রেরনা হেসে শুদ্ধর আঙ্গুল আকড়ে ধরে অ্যাপার্টমেন্টের দিকে এগিয়ে যায়। পুরোনো স্মৃতি নড়েচড়ে উঠলো তার। প্রেরনা ডুবে গেলো সেখানে।

“বাসর রাতের পরের দিন সকাল বেলা এক অতি অদ্ভুত লোকের ঠোঁটের ছোঁয়া কপালে মেখে ঘুম ভাঙলো প্রেরনার। ছোটো খাটো, আদুরে মেয়েটা খানিকটা চ'ম'কে উঠলেও স্বাভাবিক চোখে তাকিয়ে রইলো। তাকে নির্নিমেষ দেখতে থাকে একজোড়া মুগ্ধ চোখ। প্রেরনাকে কিছু বলার,বুঝে ওঠার সুযোগ না দিয়ে দুহাতে তাকে কোলে তুলে নেয় ব'লিষ্ঠ দেহী শাওকাত ওয়াসীত। লোকটার আচরণ পাগলাটে, অদ্ভুত। প্রেরনার একই সাথে ভালো লাগে,লজ্জা লাগে, ভয় হয়। তিনটা অনুভূতি কাজ করে তার।

কাল সারারাত লোকটা তাকে ঘুমাতে দেয়নি। জাগিয়ে রেখে তার পেশাগত জীবনের গল্প শুনিয়েছে। প্রেরনাও খুব আগ্রহ নিয়ে শুনেছে। কবুল বলার আগেও যে লোকটার প্রতি বিরক্তি ছিলো প্রেরনার,লোকটা বয়স্ক ছিলো বলে। সামান্য একটা রাত লোকটাকে জেনে ভালো লেগে গিয়েছে প্রেরনার। শেষ রাতে লোকটা ঘুমিয়ে গেলে প্রেরনা মুগ্ধ হয়েই দেখেছে মানুষটাকে।

শাওকাত প্রেরনাকে চুপচাপ তাকিয়ে থাকতে দেখে তার কপালে আবারও চু'মু খায়। প্রেরনা কেঁপে উঠে শাওকাতের পাঞ্জাবি খামচে ধরে। লোকটা ভীষণ অদ্ভুত,কাজ কর্মও অদ্ভুত।

কপাল থেকে ঠোঁট সরিয়ে প্রেরনাকে বললো,“চলো রেডি হও।”

সকাল ছয়টা বাজে তখন। প্রেরনা অবাক হয়ে বলে,“এখন ? কোথায়?”

_ঘুরতে।
শাওকাত হেসে জবাব দেয়।

প্রেরনা ভীষণ অবাক। এখন ঘোরার সময়? বিয়ে বাড়ি ভর্তি মেহমান। আর উনি এখন নতুন বৌ নিয়ে ঘুরতে বের হবে। এ কোন পাগলের পাল্লায় পরলো সে?

বিয়ে বাড়ি ভর্তি লোকজন গত রাতে নেচেকুদে ক্লান্ত হয়ে ঘুমাচ্ছিলো। প্রেরনা তখন স্বামীর আদেশে তৈরি হচ্ছে। শত আপত্তি তুলেও শাওকাতের জেদের কাছে টিকতে পারলো না প্রেরনা। লাল টকটকে শাড়ি, গলায় হাতে হালকা পাতলা সোনার গহনা পরেছে সে।
নতুন বাচ্চা বৌকে মুগ্ধ চোখে শুধু দেখেই যাচ্ছিলো শাওকাত। তারপর লাগেজ থেকে একডজন লাল কাচের চুড়ি বের করে পরিয়ে দেয় প্রেরনার হাতে।

অমন ইস্পাত কঠিন,লম্বা, ব'লিষ্ঠদেহী মানুষটার সামনে প্রেরনার নিজেকে নেহাত শিশু লাগছিলো।

শাওকাত পাঞ্জাবি পাল্টে একটা শার্ট পরে নিয়ে,ওয়ালেট আর জীপের চাবি নিয়ে প্রেরনার হাত ধরে বলে, চলো।

বাড়ি থেকে পা টিপে টিপে নিঃশব্দে বেড়িয়ে যায় শাওকাত-প্রেরনা। বাড়িতে কনে পক্ষ আর বর পক্ষের মানুষ তখন নাক ডেকে ঘুমাচ্ছে।

প্রেরনাকে নিয়ে শাওকাত সেদিন ঘুরতে গিয়েছিলো মাছ বাজার আর মাংস বাজারে। হ্যা। এটাই শাওকাত ওয়াসীত। ভীষণ অদ্ভুত। নতুন লাল টুকটুকে বৌকে নিয়ে গিয়েছে সকাল সকাল বাজার করতে।

প্রেরনা অবাক হয়ে শুধু স্বামীকেই দেখছে। শাওকাত হেসে বলে,“কি চ'ম'কে গেলে? আসলে বাজার টা করতে হবে। তোমাকে এনেছি ট্রেনিং দিতে। আজ একদিনেই তোমাকে ট্রেনিং দিয়ে পটু বানিয়ে দেবো। যখন আমি থাকবো না তখন তো এসব তোমাকেই করতে হবে।”

প্রেরনা নিজের অজান্তেই আঁতকে উঠেছিলো শাওকাতের ঐ কথাটায় । শাওকাত প্রেরনার হাবভাব দেখে নিজেও অপ্রস্তুত হয়ে পরেছিলো। নরম গলায় বললো,“মানে আমি কর্মক্ষেত্রে ফিরে গেলে তোমাকে একা একাই এসব করতে হবে প্রেরনা। তুমি একজন দেশ সেবকের বৌ।”

প্রেরনার দু'চোখ ঝাপসা হয়ে উঠেছে কথাগুলো ভাবতে ভাবতে। শরীরটা দুর্বল লাগছে ভীষণ। সে মনে মনে আওড়ায়,“অদ্ভুত লোক, স্বার্থপর লোক শাওকাত ওয়াসীত। ”

শুদ্ধ মাম্মার আঙ্গুল আকরে ধরে হাঁটছে। সে টেরও পায়নি তার মা নিশ্চুপ কাঁদছে।

শাড়ির আঁচলে চোখের পানি মুছে প্রেরনা লিফটের দিকে পা বাড়ায়।

লিফটে পা রাখতেই প্রেরনা নাক চোখ কুঁচকে ফেলে। রাদিফ হাসিহাসি মুখ করে তাকিয়ে আছে। প্রেরনা অন্যদিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে থাকে। রাদিফ শুদ্ধর সাথে কথা বলছে,আদর করছে তাকে। প্রেরনা নিশ্চুপ। লিফট আটতলায় থামতেই প্রেরনা ছেলেকে নিয়ে হন্তদন্ত হয়ে লিফট থেকে বেরিয়ে যায়। লিফটের দরজা বন্ধ হতেই রাদিফ পৈশাচিক হাসি হেসে দু'চোখ বন্ধ করে বিড়বিড় করে বলে,“উফফ পাগল করেই দেবে এই মহিলা।”

শুদ্ধ মামাকে অনেক লম্বা একটা লিস্ট ধরিয়ে দিয়েছে। প্রিতম জো হুকুম মেরে আকাহ বলে লিস্ট টা অতি সাবধানে ব্যাগে ভরে বোনের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। বোনের হাত দুটো মুঠি করে ধরে বলে,“তোমার কি লাগবে বলো।”

_আমার? একটা মাউন্ট নিয়ে আসিস নেপাল থেকে।
হেসে বলে প্রেরনা।

প্রিতম বলে,“আর?”

_ভাইয়ের বৌ লাগবে।

_নেপাল থেকে বৌ নিয়ে আসবো?

প্রেরনা হেসে বলে,“ডেস্টিনি যদি লিখে থাকে নেপাল থেকে বৌ আনবি তবে অবশ্যই আনবি। যেমন আমাদের বাবা মাকে এনেছিলো সুদূর রাশিয়া থেকে।”

প্রিতম হেসে বোনকে বলে,“দেখা যাক।”

★★★

ইনায়া,জুনি,নিধি,রিন্তু,রুশফি,সাইমা। এয়ারপোর্টে ছয় বান্ধবী ছয়জনকে ঘিরে ধরে কিচিরমিচির করছে। আনন্দ যেনো তাদের বাধ মানতে চায় না। অবশেষে তাদের নেপাল ট্যুর সাকসেসফুল হতে চললো।

ইনায়ার জন্য এয়ারপোর্টে এসেছে মির্জা বাড়ি থেকে ইশমাম মির্জা, ইহান, ইরফান এবং ইনশিরাহ।

জুনির মা মৈথি ইশমামের কাছে এসে হাসিমুখে বলে,“ভাই এতো চিন্তা করবেন না। ওটা আমার বাপের দেশ। একদম চিন্তা করবেন না। মনে করুন আপনার মেয়ে তার নানুবাড়িতেই বেড়াতে যাচ্ছে।”

_ভাবী বুঝতেই পারছেন। দয়া করে ওকে একটু চোখে চোখে রাখবেন।
ইশমাম নরম গলায় অনুরোধের সুরে বললো মৈথিকে। তার চিন্তা বেড়েই চলেছে।

সবাই যার যার টিকিট আর পাসপোর্ট নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ইনায়ার বান্ধবীরা আড়চোখে ইনায়ার দুজন দাদানকে দেখছে আর নিজেরা নিজেরা গসিপ করছে।

সিকিউরিটি চেকিংয়ের আগে ইনায়া আরো একবার ছুটে আসে তার দাদানদের কাছে। ইশমাম কপট রাগ দেখিয়ে বলে,“এখনি শুরু করেছো অবাধ্যতা। এভাবে হুরমুর করে এলে কেনো।”

ইনায়া হাঁপাতে হাঁপাতে পাপাকে জরিয়ে ধরে বলে,“থ্যাংক ইউ দিতে।”

ইশমাম হাসে। মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। পাশ থেকে ইরফান বলে,“শোন পাখা নিয়ে বেশি ফরফর করবি না, আর পাহাড় চড়ার কথা তো মাথাতেই আনবি না। মনে রাখবি তোর ওজন।”

ইনায়া মেজো দাদানের দিকে রাগী চোখে তাকায়। ইহান বোনের মাথায় হাত বুলিয়ে বলে,“যা বুড়ি। হ্যাভ আ সেইফ জার্নি!”

ইনশিরাহ পাশ থেকে বলে ওঠে,“আর আমার ক্যামেরাটার যেনো কিচ্ছুটি না হয় খবরদার।”

ইনায়া হেসে মাথা নাড়ায়।

তারপর সবাইকে টাটা দিয়ে চলে যায় ভেতরে।

সবাই কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে গাড়ি নিয়ে এয়ারপোর্ট ছাড়ে। ইহান তাজওয়ারের বিএমডব্লিউ যখন এয়ারপোর্টকে ছাড়িয়ে আসছিলো তখনই প্রিতম, সাফওয়ান আর জামিদের ক্যাব এয়ারপোর্টের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়।

কেনো? ঐ যে ওপরে প্রেরনা বললো,ডেস্টিনি। সবই ডেস্টিনির খেলা। এখন দেখা যাক এই গল্পে ডেস্টিনি কি কি খেল দেখায় !

চলমান......

#কিছু প্রশ্ন এবং উত্তর।

১। এটা কি রাজনৈতিক গল্প?
উত্তর: জি না। এটা লাভনৈতিক গল্প।

২। একে আনেন না, তাকে আনেন না কেনো ?
উত্তর: যখন যার সময় হবে সে মঞ্চে এসে ডায়লোগ মারবে। চিল।

৩। গল্প স্লো কেনো?
_ Because Slow and steady wins the race 😁

৩। লেখিকার কি মাথা খারাপ?
উত্তর: ধারনার থেকেও খারাপ।

৪। পেজের নাম চেঞ্জ করেন।
উত্তর: করবো দুমাস পরে।

কমেন্ট করবেন। কমেন্ট পড়তে ভালো লাগে। আত্মতৃপ্তি পাই। অবশ্যই ভালো কমেন্ট করবেন‌। গালিগালাজ আমি ফ্যামিলি থেকে প্রচুর খাই।

কমেন্ট করো রে অলসের দল!!!!!!!!!

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 13 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন