ফন্ট সাইজ:
থিম:
বধূ কোন আলো লাগল চোখে ২

পর্ব 15

লেখক: ইসরাত ইতি

#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_১৫
#ইসরাত_ইতি

[ ১ম অংশ ]

🚫কঠোর ভাবে প্রাপ্তমনস্কদের জন্য।

🚫শিক্ষা ও সাহিত্যের সাথে আমার এই কল্পিত ঘটনাগুলোর লিখিত শব্দগুলোর কোনো সম্পৃক্ততা নেই।

আলোকে ভীষণ উত্তেজিত লাগছে। ভীষণ বলতে ভীষণ। হাতে একটি টিফিন ক্যারিয়ার তার। তাতে রয়েছে বাহারি খাবার,ক্ষীর। একটা সাদা কালো মিশেলের টাঙ্গাইল শাড়ি গাঁয়ে তার, দাঁড়িয়ে আছে স্বামীর পাশে।
বারবার ঘড়িতে সময় দেখছে সামিন। আলো এদিক ওদিক দৃষ্টি দিয়ে বলে,“ও এখনও আসছে না কেন বলুন তো মেয়র সাহেব।”

_আসবে। নয়টায় ডিউটি শেষ হওয়ার কথা।

আলো ইতস্তত করে বলে,“এভাবে,এতো রাতে। ছেলেটা বিরক্ত হবে না তো!”

_কে মুঈন? আশ্চর্য কথা বলো।

আলো চুপ হয়ে যায়। সে আর সামিন এসেছে মুঈনের কটেজে। পরিকল্পিত নয় ব্যাপারটা। হুট করে সামিন প্রস্তাব রাখলো,“চলো ছেলেটাকে দেখে আসি।”

কটেজের গেটে মুঈনের জীপ এসে থামে রাত ঠিক ন'টা পাঁচে। তাকে নামিয়ে দিয়ে জীপ চলে যায়। গেটের সামনে সামিনের গাড়ি, কটেজের দরজার সামনে আউটডোর লাইটিংয়ে সামিন আর আলোকে দাড়িয়ে দেখতে পেয়ে মুঈন অবাক হয়। লম্বা লম্বা পা ফেলে এগিয়ে যায় সে।

সামিন আর আলো হাসে। মুঈনের চেহারায় ক্লান্তি ভাব স্পষ্ট। এগিয়ে এসে বিনয়ী সুরে বলে,“সামিন বাবা আপনারা!”

_হ্যা। ডিনারের দাওয়াত দিয়েছিলে আগামী পরশু। তোমার আন্টি বললো চলো আজই যাই।

মুঈন ক্লান্তি মাখা মুখে একটা স্নিগ্ধ হাসি উপহার দিয়ে কি-কার্ড দিয়ে দরজা খুলে সামিন আলোকে বলে,“আসুন ভেতরে আসুন। এতক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলেন। আমি দুঃখিত।”

_আরে না না। এতক্ষণ নয়। এই হবে পাঁচ মিনিট।
আলো আর সামিন মুঈনের পিছু পিছু ঘরে ঢোকে। মুঈন দরজার পাশের সুইচগুলো টিপে দিতেই পুরো ঘর আলোকিত হয়ে যায়।

আলো চারপাশে তাকিয়ে দেখে। পুলিশ কর্মকর্তাদের জন্য বরাদ্দকৃত কটেজগুলো তেমন আহামরি নয়। তিনটা বেডরুম,একটা কিচেন, একটা ড্রয়িং কাম ডাইনিং,আর তিনটে ওয়াশরুম। ছোটোখাটো এই ঘরটি খুব গোছালো। আলো এক নজরে যা বুঝলো। ব্যাচেলর ছেলেদের ঘর মনেই হয়না।

মুঈন সোফাসেট দেখিয়ে আলো সামিনকে বলে,“প্লিজ বসুন না। আমি একটু ফ্রেশ হয়ে আসছি।”

সামিন আর আলো মাথা নে'ড়ে বসে। মুঈন নিজের রুমে ঢুকে যায়। জলদি জলদি ইউনিফর্ম খুলে,ফ্রেশ হয়ে,একটা ট্রাউজার আর পোলো টি শার্ট গাঁয়ে চাপিয়ে বেরোয়। ভীষণ চিন্তিত লাগছে এ থানার জাঁদরেল স্যার মুঈন ফরাজীকে। আজ বুয়া আসেনি। রান্না হয়নি। আলো সামিন আসবে সে তো জানতোই না। ডিনারের দাওয়াত ছিলো আগামী পরশু। এখন কি খেতে দেবে সামিন বাবা আর মিষ্টি আন্টিকে? ডিনারে বাইরে থেকে খাবার আনিয়ে খাওয়াবে?

উঁকি দিয়ে দেখতে পায় সামিন বাবা আর মিষ্টি আন্টি নিজেদের মধ্যে কথা বলছে। ত্রস্তপায়ে হেঁটে মুঈন কিচেনে ঢোকে। অনলাইনে তিনটা আইটেম সে অর্ডার করেছে। বাকিটা নিজে করে নেবে। ফ্রিজ খুলে দেখলো মাটন আর বিফ পরিমাণ মতোই আছে।
মুঈন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বিফের প্যাকেট টা পানিতে ভিজিয়ে রেখে অন্যান্য রন্ধন প্রণালী খুজে খুজে বের করে লোয়ার কেবিনেটের ওপর রাখে ।

আলো এদিক ওদিক তাকিয়ে সামিনকে ফিসফিসিয়ে বলে,“কত গোছালো ছেলেটা। আপনার মেয়ের মতো নয়।”

সামিন হেসে বলে,“গোছালো দেখেই তো অগোছালো মেয়ের জন্য ঠিক করেছি। মেয়ের স্বামীর ঘর পছন্দ হয়েছে?”

_খুউউব।
আলো হেসে বলে।

সামিন কয়েক সেকেন্ড পর বলে,“ঝিলবাড়িতে যে অ্যাপার্টমেন্টের কাজ চলছে ওটা মেয়ে জামাইকে তাদের বিয়েতে দেবো। বিয়ের পর ওখানে থাকবে দুটিতে।”

আলো বাধ সেধে বলে,“জামাই যেখানে রাখবে মেয়েকে, মেয়ে সেখানে থাকবে। আল্লাহ দু'জনকে ভালো রাখলেই হলো।”

মুঈনকে আসতে দেখে দু'জনে কথা থামিয়ে জড়োসড়ো হয়ে বসে। মুঈন এসে সামিনের পাশে বসতে বসতে বলে,“আর কেউ আসলো না কেনো? ইনভিটেশন তো সবার ছিলো।”

_ওরা ইনভিটেশনের দিনই আসবে, আগামীকাল। আমরা দু'বার এলাম। ক্ষতি কি?

মুঈন হেসে মাথা নাড়ে শুধু। বুঝিয়ে দেয় কোনো ক্ষতি নেই। আলো মুগ্ধ চোখে মুঈনকে দেখে শুধু। সুদর্শন একজন পুরুষ। ইনশিরাহকে ছোটোবেলাতে আলো গল্প শোনাতো,“একদিন এক রাজার কুমার এসে তোমাকে নিয়ে যাবে আমাদের কাছ থেকে।”
সেই রাজকুমারদের মতো সুদর্শন ছেলেটা। ইনশিরাহর গাঁয়ের রংটা যদিও চাঁপা আলোর মতো, তবুও দুজনকে রাজযোটক লাগবে।

কিছুক্ষণ আলাপ করে মুঈন উঠে দাঁড়ায়, কলিং বেল বাজছে। ডেলিভারি ম্যান খাবার দিয়ে গিয়েছে।

আলো অবাক হয়ে বলে,“এসব কি!”

মুঈন লজ্জিত হয়ে বলে,“আন্টি আজ বুয়া আসেনি। মাফ করবেন। বাইরে থেকে খাবার আনাতে হলো। ক্ষমা চাইছি।”

আলো খানিকটা উঁচু গলায় বলে,“এমাহ! একদম না। আমি সবকিছু নিয়ে এসেছি। কিচ্ছু প্রয়োজন নেই আর।”

মুঈন দৃষ্টি ঘুরিয়ে আলোর পাশে রাখা টিফিন ক্যারিয়ার দেখে। তাঁরপর বলে,“আমার বাড়িতে এসেছেন। আমার আপ্যায়ন গ্রহণ করতে হবে।”

মুঈন হাতের খাবারের পার্সেল টা ডাইনিংয়ে রেখে কেবিনেট থেকে কিচেন এপ্রোন বের করে পরে নেয়। একটা আইটেম রেডি করবে সে।

আলো আর সামিনের মুখ হা হয়ে যায়। এ থানার জাঁদরেল স্যার মুঈন ফরাজীর ব'লিষ্ঠ দেহে কিচেন এপ্রোন। আন্তর্জাতিক মানের হ্যান্ডসাম শেফ লাগছে তাকে।
সামিন বললো,“কি করতে চলেছো?”

মুঈন হেসে জবাব দেয়,“আমার অতিথিদের জন্য বিশেষ একটা আইটেম রান্না।”

কিচেন থেকে বসার ঘরের মাঝে কোনো দেয়াল নেই। মুঈন চপিং বোর্ডে দ্রুত হাত চালাচ্ছে। অত্যন্ত সুনিপুণ ভাবে ক্যাপসিকাম, পেঁয়াজ,পনির স্লাইস করছে সে ।

আলো-সামিন চোখ বড়বড় করে তাদের মেয়ের জন্য পছন্দ করা পাত্রের গুণ দেখছে। একই সাথে অবাক এবং মুগ্ধ দুই জোড়া চোখ।

স্বামীকে কনুই দিয়ে গুঁতো মেরে আলো ফিসফিস করে বললো,“মাশাল্লাহ।”

সামিন হাসে নিশ্চুপ। মুঈন বিফে মশলা মাখাচ্ছিলো। আলো উঠে দাঁড়ায়। মুঈন তার দিকে তাকিয়ে বললো,“উহহ আন্টি। একদম আসবেন না। আপনি বসুন।”

আলো বসে। সামিন কিছুক্ষণ উ'শ'খু'শ করে বললো,“রান্না জানো?”

_এইতোহ।
নিচুস্বরে জবাব মুঈনের। সামিন বাবা আর মিষ্টি আন্টি যে অবাক হয়েছে তা দেখে সে হাসে, বলে,“সামিন বাবা এতিমখানায় হুজুরের সাথে আমাদের প্রত্যেককে সপ্তাহে দুদিন রাঁধতে হতো। ভুলে গেলেন?”

_হ্যা তাইতো।

মুঈন একটা তুর্কিশ আইটেম তৈরি করবে। সে মেরিনেট করা বিফটাকে আগুনে ঝলসাতে দিয়ে সামিন আলোর দিকে তাকিয়ে বলে,“অনার্সে একটা রেস্তোরাঁয় দু বছর কাজ করেছি।”

আলো শুধু মুগ্ধ চোখে দেখছে ছেলেটাকে। সুদর্শন,লম্বা,বডি ফিটনেস নজরকাড়া,বিনয়ী,গুণী,ভদ্র, ডিসিপ্লিনড। সব কিছুর সংমিশ্রণ। তার মেয়ের কত সৌভাগ্য হবে সে ভেবেই কুল পাচ্ছে না।

সামিন মুঈনকে বললো,“কি কি রাঁধতে জানো?”

আলো স্বামীকে খোঁচা মেরে ফিসফিসিয়ে বলে,“এতো প্রশ্ন করছেন কেন? ছেলেটা বিব্রত হচ্ছে না? আপনি কি নিজের ছেলের জন্য মেয়ে দেখতে এসেছেন নাকি?”

সামিনও ফিসফিসিয়ে বলে,“আরে জেনে নিচ্ছি কি কি রাঁধতে পারে কারন আমার অকর্মার ঢেকি মেয়ে তো কিছুই পারে না। ওকেই তো সব করতে হবে!”

খ্যাক করে হেসে ফেলে সামিন কথাটা বলে। আলো শাড়ির আঁচলে মুখ চেপে হাসে।

মুঈন দূর থেকে আড়চোখে তাদের দেখে বলে,“কিছু বলছেন আমায় সামিন বাবা?”

_হু? না না। কিছু না। এই এতো কিছু করতে হবে না। আমি আর তোমার আন্টি কিই বা খাই।

কথা কথায় রান্না প্রায় সম্পন্ন হয়েছে। মুঈন গা থেকে এপ্রোন খুলে ফেলে,টেবিল টাকে সুন্দর মতোন সেট করে আলো সামিনের দিকে তাকিয়ে বলে,“আসুন।”

আলো-সামিন চেয়ারে বসতেই মুঈন তাদের প্লেটে সার্ভ করে দিয়ে নিজেও একটা চেয়ার টেনে বসে।

রাতে সে বিশেষ কিছুই খায়না,তবে আজ মেহমানদের সাথে খাচ্ছে।

মুঈনের তৈরিকৃত পদটা মুখে দিতেই আলো সামিন একে অপরের মুখের দিকে তাকায়। তারপর মুচকি হেসে খাবারটা চিবুতে থাকে।

মুঈন খাচ্ছে চুপচাপ। হুট করে সামিন বলে ওঠে,“বিয়ের কথা ভাবছো না কেন?”

বিষম খেয়ে ওঠে আলো,চোখ বড় বড় করে স্বামীর দিকে তাকায়। এখানেই মেয়ের কথা বলবে নাকি লোকটা!

মুঈন আলোর দিকে এক গ্লাস পানি এগিয়ে দিয়ে সামিনের দিকে তাকায়। তারপর চোখ নামিয়ে চুপচাপ খেতে থাকে। এ থানার জাঁদরেল সুপারিনটেনডেন্ট লজ্জা পেয়েছে বোঝাই যাচ্ছে।

সামিন আলোর দিকে তাকিয়ে আবারও মুঈনকে বলে ওঠে,“মেয়ে দেখবো?”

মুঈন খেতে থাকে,কয়েক মুহূর্তের জন্য হাত থেমে যায় তার। আলো আর সামিন তাকিয়ে আছে উত্তরের অপেক্ষায়। মুঈন সামিনকে বেশি অপেক্ষা না করিয়ে অত্যন্ত নিচুগলায় বললো,“আপনাদের ইচ্ছা সামিন বাবা।”

সামিন আলো একে অপরের মুখের দিকে তাকিয়ে সন্তুষ্টির হাসি হাসলো। আর কোনও কথা বাড়ালো না।

খাওয়া হয়ে যেতেই মুঈন এটো প্লেট গুলো তুলে নিয়ে সিঙ্কে রাখলো। আলো উঠে দাঁড়ায়,“বাবা বাকিটা আমি করে দিচ্ছি। তুমি তোমার সামিন বাবার সাথে গল্প করো তো।”

জোর করে মুঈনকে ঠেলে পাঠিয়ে দেয় আলো।

রাত এগারোটা অবধি তিনজনে গল্প করলো। এবার আলো সামিনের ওঠার পালা।
মুঈন বললো,“কাল আসবেন প্লিজ।”

আলো হেসে মাথা নাড়ায়। মুঈনকে বলে,“টিফিন বক্স গুলোতে তোমার জন্য রেঁধে নিয়ে আসা খাবার আছে, ক্ষীর আছে। ফ্রিজে তুলে রেখেছি। খেও।”

মুঈন মাথা নাড়ায়। ‌আলো সামিনকে গেট পর্যন্ত এগিয়ে দেয়। গাড়ি স্টার্ট করে সামিন আলো চলে যাওয়ার পরেও মুঈন টান টান হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে গেটের কাছে। মানুষ দু'টোর কিছুক্ষণের উপস্থিতি হঠাৎ করে মুঈনের মা বাবার কথা মনে করিয়ে দিয়েছে। মা বাবাকে মুঈন দেখেনি। কোনো ছবি নেই তাদের। খালি মস্তিস্কে মা বাবার কথা মনে পড়তেই মা বাবার স্থানে সামিন আলোর মুখটা ভেসে উঠলো। এমন হয়, ছোটো থেকে একটা পরিবারের জন্য,একটু স্নেহের জন্য হেদিয়ে মরা জাঁদরেল মুঈন ফরাজী এখানেই দুর্বল হয়ে যায়, ভীষণ দুর্বল।

ঘরে ঢুকে দরজা লক করে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে। তারপর সোজা হেটে ফ্রিজের কাছে চলে যায় মুঈন। ফ্রিজ থেকে ক্ষিরের বাটিটা বের করে রুমে ঢুকে বিছানায় আয়েশ করে বসে। বাটি থেকে মঁ মঁ করছে ক্ষিরের সুঘ্রাণ। মুঈন প্রান ভরে সুঘ্রাণ নেয়। সে ক্ষিরের ঘ্রানের সাথে টের পাচ্ছে একটা পরিবারের স্নেহ,যা মুঈনের আজীবন কাঙ্ক্ষিত।

এক বসাতেই ক্ষিরটা চেটেপুটে খেয়ে ফেলে স্বাস্থ্য সচেতন মুঈন ফরাজী। তারপর উঠে তার পরিবার বিহীন রোবটিক লাইফের রুটিন অনুযায়ী টিভি অন করে কিছুক্ষণ দেশের হালচাল দেখে। চ্যানেল পরিবর্তন করে একটা মিউজিক চ্যানেলে দেয়। এখানে বহু পুরনো হিরো হিরোইন শাহরুখ এবং ঐশ্বরিয়ার “হাম কো হামিছে চুরালো,দিল মে কাহি তুম ছুপালো ” গানটা চলছিলো। মুঈন কয়েক পলক তাকিয়ে থেকে স্মিত হেসে চ্যানেল চেঞ্জ করে দেয়। এতো রোমান্টিক গান দেখা উচিত নয় একজন পুলিশ কর্মকর্তার। তার দেখা উচিৎ “ক্রাইম অ্যান্ড কেস টক শো”।

★★★

প্রিতম হতভম্ব হয়ে বসে আছে। এটা কি হলো! ব্যাগটা তো তারই। চোখের ধাঁধা নয়তো?

চশমাটা চোখে লাগিয়ে আবারও একবার লাগেজ খুলে দেখে সে, এবং পুনরায় লাগেজ বন্ধ করে জামির দিকে তাকায়। জামি মিউজিকের তালে তালে দুলছিলো, অদ্ভুত অঙ্গভঙ্গি। প্রিতমের দিকে ঘুরতেই কান থেকে নয়েজ ক্যান্সেলিং হেডফোন সরিয়ে বলে,“কি রে ! তব্দা খেয়ে আছিস কেন? হোয়্যাট হ্যাপেন্ড!”

প্রিতম লাগজের ওপর হাত রেখে বসে ছিলো। জামি দৃষ্টি নামিয়ে ব্যাগের দিকে তাকিয়ে বলে,“ব্যাগ নিয়ে আবার কি হলো! খুলতে তো পেরেছিলি।”

প্রিতম চুপচাপ। জামি এগিয়ে যায়,“কই দেখি! আমাকে দেখতে দে। ব্যাগে কি সমস্যা!”

_এই না‌ । ব্যাগে কিছু নেই যা।
জামিকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে প্রিতম লাগেজ আটকে বসে থাকে। জামি চোখ ছোটো ছোটো করে সন্দেহের চোখে তাকিয়ে গমগম করে বলে,“কি ব্যাপার বলতো! কি লুকাচ্ছিস? ব্যাগে কি?”

_কিছু না।

_আমাকে দেখতে দে।

প্রিতম জামিকে ঠেলে সরিয়ে বলে,“দেখতে হবে না। একটা প্রবলেম হয়েছে।”

_কি?

_ব্যাগটা আমার না। সাম হাউ এক্সচেঞ্জ হয়ে গিয়েছে ব্যাগটা!

জামি তাজ্জব বনে যায়। উঁচু গলায় বলে,“হোয়্যাট!”

★★★

জোমসোম মিউনিসিপ্যালিটি অফিস সংলগ্ন মুসলিম কমিউনিটিদের পাড়া। শহরে হাতেগোনা মুসলিমদের আবাসিক এরিয়া।

প্লেন জার্নির পরে কোনো প্রকার বিশ্রাম না নিয়ে আরো আধাঘণ্টার জার্নিতেই সবাই তখন বিধ্বস্ত প্রায়। ক্যাবেই ঘুমিয়ে পরেছে মেয়ে গুলো। মিসেস মৈথি ঘুমায়নি।

খুবই দায়িত্বের সাথে মেয়েগুলোকে পাহাড়া দিচ্ছেন। নিজের বাপের দেশের চিরচেনা এলাকায় ঢোকার সাথে সাথে মনে এক অদ্ভুত প্রশান্তি এসে ভর করলো তার। চোখ দু'টো ভিজে উঠলো আবেগে। এতক্ষণ কিছুই হয়নি,তবে এখন ছটফটানি বেড়ে চলেছে তার। কখন বাবার গায়ে ঝাঁপিয়ে পরবে, মায়ের গায়ের গন্ধ নেবে।

মুসলিম কলোনীর মাথায় ক্যাব থামে। বিশাল আয়তনের এরিয়া জুরে কলোনী। মাঝখানে তিন লেনের আধুনিক রাস্তা। দুপাশে সারি সারি ডুপ্লেক্স দোতলা বাড়ি। মিসেস মৈথিদের বাড়ির নাম্বার R-13,আওরঙ্গজেব প্যালেস।

মিসেস মৈথি একে একে সবাইকে ডেকে তোলে। মেয়েরা ঘুম ঘুম চোখে আশেপাশে তাকাচ্ছে। বিস্ময়সূচক কন্ঠে বলে,“পৌছে গিয়েছি আন্টি?”

_হ্যারে বাবা। নাম। বাড়িতে গিয়ে ঘুমাবি সবাই।

মেয়েগুলো সাথে সাথে ক্যাব থেকে লাফিয়ে লাফিয়ে নামে। ধরে ধরে সবার ব্যগ পত্র নামিয়ে নেয়। মিসেস মৈথি নেপালী ভাষায় ক্যাবের ড্রাইভারকে ধন্যবাদ জানায়।

ইনায়া আশেপাশে তাকাচ্ছে। তার মাম্মা পাপা আর বাড়ির সবার কথা ভীষণ মনে পরছে। হ্যান্ড ব্যাগ থেকে ফোনটা বের করে বাড়িতে ফোন লাগায় সে।

কলটা রিসিভ হতেই মনে হলো ওপাশ থেকে ফোনের ওপর হামলে পরলো বাড়ির সবাই। কখন পৌঁছালো। কি খেলো, কি করলো,একে একে অগণিত প্রশ্ন ছুঁড়তে লাগলো ক্লান্তিহীন ভাবে।

ইনায়া বিরক্ত হয়না, হেসে ফেলে। এটাই তো তার পরিবার। যে পরিবারের গল্প শুনিয়ে শুনিয়ে সবাইকে তাক লাগিয়ে দেয় ইনায়া।

খুবই ঠাণ্ডা মাথায় সবার সব প্রশ্নের উত্তর গুলো দিলো এক এক করে।

লাগেজ নিয়ে মুসলিম কলোনীর এরিয়ায় পা রাখে বাকিদের অনুসরণ করে।

কলিং বেল টিপে মিসেস মৈথি দাঁড়িয়ে আছে। বাপের বাড়ির কাউকে জানায়নি তাদের ফ্লাইট কখন। সারপ্রাইজ দেওয়ার জন্য জানানো হয়নি।
দরজা খুলে দেয় একজন সত্তরোর্ধ্ব ধবধবে ফর্সা দেখতে বৃদ্ধ লোক। দরজা খুলে সে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে মৈথির দিকে। মৈথি হাঁসি হাঁসি মুখে বাবার দিকে তাকিয়ে। লোকটার নাম মাশরার আওরঙ্গজেব। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে সে উঁচু গলায় নেপালী ভাষায় কাউকে ডাকতে থাকে অনবরত।

মৈথি বাবাকে জরিয়ে ধরে কান্না জুড়ে দেয়। মাশরার আওরঙ্গজেবও কাঁদছে। বয়সের ভারে নুয়ে পরা বৃদ্ধ লোকটা মেয়েকে দেখে আবেগে আপ্লুত হয়ে পরেছে। ভেতর থেকে এক বৃদ্ধা বেরিয়ে আসে। তিনি মৈথির মা মিনালি। মা'কে জরিয়ে ধরে মৈথি কাঁদতে কাঁদতে মুর্ছা যাওয়ার মতো অবস্থায়। প্রায় দু'বছর পরে মাকে ছুঁতে পারছে সে।

একটা পরিবারের হৃদয়স্পর্শী মুহুর্তকে সামনে দাঁড়িয়ে দেখছে ইনায়া আর তার পাঁচ বান্ধবী। তাদেরও চোখ ভিজে উঠছে। দৃশ্যটা তাদের মা বাবাকে মনে করিয়ে দিচ্ছে বারবার।

নেপালী মানুষগুলো বরাবর অতিথিপরায়ণ এবং বিনয়ী। জুনির থেকে সবাই শুনে এসেছে,কিন্তু আজ সবাই নিজের চোখেই দেখতে পাচ্ছে। মৈথির বাবা মা মাত্র কিছু সময়ের মধ্যেই ইনায়াদের নিজের নাতনির মতো ট্রিট করছেন।

সবাই বাড়িতে একঘন্টার মধ্যেই বেশ মানিয়ে নিয়েছে নিজেদের। একটা হোম সুইট হোম ফিল হচ্ছে। ডুপ্লেক্স এই বিশালাকার বাড়িটাতে মৈথির বাবা মা দুজনই থাকেন। মৈথির বড় ভাই
সরকারি কর্মকর্তা,পরিবার নিয়ে কাটমুন্ডুতে থাকেন। বাড়িতে দুজন মাত্র মানুষ, তাই ইনায়াদের বেশি খুশি লাগছে।

ইতিমধ্যে সবাই হৈ হুল্লোড় শুরু করে দিয়েছে। মৈথির বাবা মা ভীষণ খুশি। কি করবেন,কি না করবেন হিমশিম খাচ্ছে দুজন।

ইনায়ারা সবাই মিলে পুরো বাড়িটাকে মাতিয়ে ফেলেছে। এখন অবধি একজনও ফ্রেশ হয়নি, বাইরের জামা ছাড়েনি। গল্প জুড়ে দিয়েছে আওরঙ্গজেব ও মিনালির সাথে। দু'জনেই ভাঙা ভাঙা ইংলিশে ইনায়াদের সাথে গল্প করছে।

মৈথি সবাইকে বলে বলে ড্রেস চেঞ্জ করাতে পাঠিয়েছে।
ইনায়াদের জন্য দোতলার তিনটা রুম ঠিক করা। ইনায়া রুশফি, রিন্তু নিধি, জুনি এবং সাইমা। তিন ভাগে ভাগ হয়ে তিনটা কামরা দখল করেছে।

নেপালীদের বাড়ির ডিজাইন কিছুটা চায়নাদের মতো। ঘরের ভেতরে সর্বোত্র সাবেকি সৌখিনতার ছোঁয়া। কাঠের ইন্টেরিয়র ডিজাইন নজরকাড়া।

রুমে ঢুকে ইনায়া হাত পা ছড়িয়ে শুয়ে পরে। বাড়ি থেকে একটার পর একটা মেসেজ আসছে।
রিপ্লাই করতে করতে ক্লান্ত, গ্রুপে ছোটো করে তাই,“ঘুমাবো” লিখে দেয়।

বাইরে থেকে মিসেস মৈথি সবাইকে আওয়াজ দেন যাতে ফ্রেশ হয়ে দ্রুত সবাই খাবার ঘরে যায়।

ইনায়া উঠে বসে। খাবার কথা শুনেই তার ভীষণ খিদে পেয়ে গেলো। রুশফি ইতিমধ্যে ফ্রেশ হয়ে নিয়েছে।

ইনায়া উঠে তাড়া লাগায়। লাগেজের রিমোট কন্ট্রোলার টা কাঁধের ব্যাগ থেকে বের করে পাসওয়ার্ড দিতেই দেখলো কাজ করছে না। বিরক্তি লাগছে ইনায়ার।

পরপর অনেকবার ব্যর্থ হওয়াতে তার ধৈর্য্যের বাধ ভেঙ্গে যায়। মুখে বিরক্তির শব্দ উচ্চারণ করে হতাশ হয়ে রুশফির দিকে তাকায়। রুশফি চিন্তিত ভঙ্গিতে এগিয়ে যায়।

“কি হলো?”

_পাসওয়ার্ড ভুলিনি। ঠিকটাই দিয়েছি। ব্যাগটা খুলছে না।

দীর্ঘসময় দুই বান্ধবী বসে গবেষণা করেও কোন কুল কিনারা পেলো না। ওদিকে মিসেস মৈথি ডেকেই চলেছেন।

রুশফি হাল ছেড়ে দিয়ে বলে,“তুই আন্টির একটা ড্রেস নিয়ে আপাতত পর। তুই তো হেলদি। আমাদের কারো ড্রেস তো তোর লাগবে না। পরে আবার দেখা যাবে।”

ইনায়া বিব্রত হয়ে বলে,“না আরেকটু চেষ্টা করি।”

কোনো চেষ্টাই কাজ হয়না। ক্ষুধার্ত পেটে, যন্ত্রনায় ইনায়া চোখে সর্ষে ফুল দেখছে। মেজাজের খেই হারিয়ে ব্যাগটাকে তিন চারটা গালিও দিলো।

জুনি,রিন্তু নিধি ওদের ঘরে ঢুকলো। জুনি বিরক্তি নিয়ে বললো,“খিদে পায়নি নাকি ইনু। ফাস্ট! আর কতো সময় লাগাবি....এ কিরে! তুই তো ফ্রেশ হোস নি এখনও।”

ইনায়ার ব্যাগের কথা জানতে পেরে সবাই বেশ কিছুক্ষণ গালে হাত দিয়ে বসে রইলো। জুনি বললো,“তো এখন রাখ না। আপাতত মাম্মার থেকে ড্রেস নিয়ে পর। মাম্মা আর তুই হেলদি দু'জনেই। মাম্মার ড্রেস এটে যাবে তোর গাঁয়ে।”

বারবার “হেলদি হেলদি” শব্দটা শুনে ইনায়া বিরক্ত,রাগ চেপে গেলো মাথায়। সে কপাল কুঁচকে, চেহারায় বিরক্তির রেখা ফুটিয়েই বললো,“না আমি আন্টির থেকেও মোটা। আমি আমার ড্রেসই পরবো। প্রয়োজনে ব্যাগটাকে কে'টে ফেলবো।”

_ব্যাগটাকে কাটবি মানে? এতো সুন্দর ব্যাগটাকে কাটবি?
এটা তো রেয়ার এডিশন ছিলো লোট্টোর। আর পাবি এমন? মেকানিক ডেকে খুলে নেবো। এখন বাদ দে।

ইনায়া ওদের কারো কথা শুনলোই না। মিসেস মৈথির সাহায্য নিয়ে স্ক্রু ড্রাইভার এনে লকটাকে প্রথমে খোলে,পুরো নস্ট করে। তারপর ব্যাগটার একপাশ কেটে ফেলে। তাকে ভীষণ উত্তেজিত লাগছে কাজটি করার সময়।

যেন তেন ভাবে ব্যাগটাকে খুলতে পেরে ইনায়ার মুখে বিজয়ীর হাসি। ব্যস্ত হাতে ওপরের অংশটা তুলে তাকাতেই সেই হাসি মিলিয়ে যায়। কিছুক্ষণ ফ্যালফ্যাল করে ব্যাগের দিকে তাকিয়ে থেকে ইনায়া বলে ওঠে,“এসব কিইইইইই!!!”

চলমান....

[ ২য় অংশের লিংক কমেন্টে ]#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_১৫
#ইসরাত_ইতি

[ ২য় অংশ ]
১ম অংশের লিংক কমেন্টে।

প্রিতম ট্রলি ব্যাগটার পাশে চুপচাপ বসে আছে। জামি রুমের এ মাথা থেকে ও মাথা পায়চারি করছিলো। আচমকা থেমে গিয়ে প্রিতমের দিকে তাকিয়ে বললো,“পুরো ঘটনাটা আবারও প্রসেস কর তো ব্রেইনে।”

প্রিতম মাথা তুলে তাকায় জামির দিকে। দরাজ গলায় বলতে শুরু করলো,"আমি ওয়াশরুম করিডোরে ব্যাগেজ রেখে ছুটে তোর কাছে গিয়েছি। ‌যখন ঝামেলা শেষ হলো। এসে তুলে নিয়েছি। ব্যস। এটুকুই।"

_ওখানে আরো অনেকের ব্যাগেজ ছিলো?

এইবার পুরো ঘটনাটা প্রিতমের ব্রেইনে বেস ভালো করে প্রসেস হয়। অঘটন টা কিভাবে ঘটেছে তা নিয়ে আর কোনো সংশয় নেই তার।

বিরক্তিতে কপাল কুঁচকে জামির দিকে তাকিয়ে বলে,“এখন কি করবো বুঝতে পারছি না। কার ব্যাগ,তাকে কিভাবে খুজবো? আর শেষে আমার ব্যাগটার সাথেই মিলে যেতে হলো!”

জামি গুরুগম্ভীর স্বরে বলল,“হুম। মেয়েদের ব্যাগ বললি। কিভাবে বুঝলি? আচ্ছা ভেতরে কি কি আছে?”

প্রিতম সরু চোখে জামির দিকে তাকিয়ে বলে,“তা দিয়ে তোর কাজ?”

_আরে মেয়েটাকে খুঁজে বের করতে হবে না? ইনফরমেশন যোগার কর।

_তাই বলে এভাবে অন্যের ব্যাগ হাতাবো?

_তো আর কি?

_আমি পারবো না।

জামি বিছানায় বসে পরে। ব্যাগটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলে,“আচ্ছা ওপরের জিপারটা খোল!”

_এটা? কেনো?

_এখানে কোনো কাগজপত্র থাকতে পারে। যদি মিলে যায়। ধর কোনো কার্ড বা টিকিটস।

প্রিতম ভাবুক দৃষ্টিতে ব্যাগের দিকে তাকায়। জামি বলতে থাকে,“তোর ব্যাগের প্রয়োজন না থাকতে পারে বাট হতেই তো পারে এই ব্যাগের মধ্যে মেয়েটার অনেক ইম্পর্ট্যান্ট কিছু আছে। তাকে তার ব্যাগটা ফিরিয়ে দিতে হেল্প কর।”

প্রিতম জামির দিকে চোখ সরু করে তাকিয়ে বলে,“এতো ভালো চিন্তাভাবনা কি করে আসছে তোর মাথায়!”

_এর পেছনে একটা কারন আছে।
গা ছাড়া ভাব নিয়ে বললো জামি।

_কি কারণ?

_দেখ ব্যাগ টা একটা মেয়ের। এই সুযোগে তুই একটা মেয়ের কাছে হিরো হয়ে যাবি। আরে সিনেমায় এমন হয় তো।

প্রিতম মৃদু হেসে বলে,“ব্যাগ ফিরিয়ে দিয়ে হিরো?”

_আরে আগে দেখ না। কথা বারাস না।

প্রিতম ই'তস্তত ভঙ্গিতে পার্শ্ব পকেটের জিপার খুলে দেয়। সেখানে কিছু কাগজের নাগাল পায় তার হাত। তুলে এনে চোখের সামনে ধরতেই দেখে একটা বিউটি ম্যাগাজিন।

_পাশের টাতে দেখ!

প্রিতম পাশের জিপারটা খুলে ভেতর থেকে একটা পাতলা বই জাতীয় বস্তু তুলে আনে। একটা মিনি সাইজের নোটবুক। জামির দিকে তাকিয়ে বলে,“এভাবে অন্যের জিনিসপত্র ঘাঁটাঘাঁটি করা উচিত হচ্ছে?”

জামি মুখ বিকৃত করে বলে,“অ্যাহহহ ন্যাকা নিব্বা কোথাকার। হু পাপ হবে। দে আমাকে দে। আমি পাপ করি।”

থাবা মে'রে জামি নোটবুক টা নিয়ে প্রথম দু পাতা উল্টে বলে,“ছ্যাহহ! এই বিশ্রী হাতের লেখা কার! কোড়া পাখির ঠ্যাং।........কি লেখা পড়ে দেখি তো.....“ ইটস্ ইনায়া...নাম তো সুনা হোগা!”

জামি থামলো,প্রিতমের দিকে তাকিয়ে বললো,“আসলেই নামটা কেমন শুনেছি মনে হচ্ছে। আচ্ছা ভেতরে দেখি।”

নোটবুকের ভেতরে বিশেষ কোনো তথ্য পাওয়া গেলো না। সবকিছুই কিছু এলোমেলো কথাবার্তা। আমার ফ্যামিলি এই,আমার ফ্যামিলি সেই। আমি আমার ফ্যামিলিকে ভালোবাসি। আমি আমার ফ্যামিলির সবচেয়ে আদরের। ইত্যাদি ইত্যাদি।
জামি পড়ছে আর হাসছে। প্রিতমের দিকে তাকিয়ে বলে,“ভাই এটা মনে হচ্ছে একটা নিব্বির ডায়ারি।”

প্রিতমও হাসলো। জামি তাড়া দিয়ে বললো,“এবার পাশের জিপারটা খোল,হ্যা ঐ একেবারে লেফটের টা।”

প্রিতম জিপার খুলে হাত ঢুকিয়ে দিতেই একটা ফটো হাতে এসে লাগে। জামির দিকে তাকিয়ে বলে,“মনে হচ্ছে ফটো!”

_বের কর। দেখি মেয়ে সুন্দরী কি না। তোর পাশে মানাবে কিনা।

প্রিতম চ বর্গীয় শব্দ করে এক টানে ফটো টা বের করে আনে। জামি থাবা মে'রে ফটোটা কে'ড়ে নিয়ে মুখের সামনে ধরতেই চোয়াল ঝুলে যায় তার। প্রিতম ভ্রু কুঞ্চিত করে জামির হাত থেকে ফটোটা নিয়ে দেখে।

মুহূর্ত কাটে। জামি আর প্রিতম একে অপরের দিকে তাকিয়ে আছে। অকস্মাৎ জামি বিস্ময়সূচক কন্ঠে বলে উঠলো,“চার নমুনা?”

ফটোটা মির্জা বাড়ির চার ছেলেমেয়ের। ইনায়া, ইনশিরাহ,ইরফান আর ইহান। চিনতে একটু অসুবিধা হয়নি কারো।

প্রিতম হাত থেকে ফটোটা ব্যাগের ওপর রেখে টান টান হয়ে বিছানায় শুয়ে পরে। জামি বললো,“ব্যাগ টা ঐ নিব্বির। তখন করিডোরে তো ওদের সৈন্য সামন্তদের ব্যাগই ছিলো। ”

প্রিতম সিলিংয়ের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,“এটাই বাকি ছিলো!”

★★★

ইনায়া তব্দা মে'রে বসে আছে। ওর বান্ধবীরা সবাই গালে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মিসেস মৈথি ইনায়াকে জিজ্ঞাসাবাদের পরে বুঝতে সক্ষম হয়েছে দূর্ঘটনাটা ঠিক কোথায় এবং কখন ঘটেছিলো।

ইনায়া কাঁচুমাচু মুখ করে বলে,“এখন কি হবে আন্টি? আমার ব্যাগ। আপুর ক্যামেরা। দাদানের ট্যাব। ওরা আমাকে মে'রেই ফেলবে!”

মিসেস মৈথি খানিক ভাবলো, তারপর বললো,“এটা তো নিজের গাফিলতিতে হয়েছে। এখন দেখি ব্যাগের মালিকের কোনো তথ্য পাওয়া যায় কি না! সরো দেখি।”

ইনায়া সরে বসলো,মিসেস মৈথি বসে ব্যাগের জিনিসপত্র ওলটপালট করতে থাকে। ছেলেদের পোশাক, প্রয়োজনীয় টয়লেট্রিজ। আরো যা যা লাগে আর কি। কোনো বিশেষ কিছুই পাওয়া গেলো না। কোনো কাগজপত্র,কোনো কার্ড বা বিল। কিচ্ছুটিই না।

ইনায়া কাঁচুমাচু মুখ করে বলে,“বাদ দিন আন্টি। আমার ব্যাগ তো গেলো!”

★★★

“এবার মনে পরেছে। ঐ নিব্বির নাম ইনায়া মির্জা।”

_সেটা আমি বুঝতে পেরেছি। এখন কি করবো?

দুই বন্ধু একে অপরের দিকে তাকিয়ে আছে। জামি বললো,“ও ইরফান মির্জার বোন। ”

_তা তো আমিও জানি। নতুন কিছু বল।

_ওকে হেল্প করার দরকার নেই।

_এই দামী ক্যামেরা,এই ট্যাব!

_ভাগারে ফেলে দেবো।

প্রিতম জামির দিকে তাকিয়ে আছে। জামি বললো,“এভাবে তাকিয়ে আছিস কেনো? শত্রুর বোনকে হেল্প করে হিরো সাজতে চাস?”

_বিষয়টা ঠিক তা না। আমার ব্যাগটাও তো ফেরত পেতে হবে। আর তাছাড়া অন্যকারো সম্পদ আমাদের নষ্ট করার কোনো অধিকার নেই। এগুলো ফিরিয়ে দিতেই হবে।

জামি কিছুক্ষণ পায়চারি করে বিছানার ওপর বসে, কন্ঠস্বর গম্ভীর করে বললো,“তোর কথা শুনে আমার তো বিবেক জেগে উঠলো। কি করা যায় বলতো।”

প্রিতম ব্যাগটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলে,“ইরফান মির্জার বোন। সোস্যাল মিডিয়া সাইটে ওকে ট্র্যাক করা নাথিং হার্ড। লেট মি থিংক!”

কথাটা বলে প্রিতম ল্যাপটপ নিয়ে বসে। ইরফান মির্জার সোস্যাল সাইটের অ্যাকাউন্টস ছানবিন করে ফ্যামিলি মেম্বারদের খুঁজে বের করতে মাত্র পাঁচ মিনিট লেগেছে প্রিতমের। মুখে বিজয়ী হাসি। ইনায়ার অ্যাকাউন্টস তার চোখের সামনে। প্রোফাইলে একজন স্বাস্থ্যবতী,মিষ্টি দেখতে,জামির কথায় নিব্বি মেয়ের ছবি।

জামি প্রিতমের পাশে বসে তার কাঁধ জরিয়ে বললো,“এখন? মেসেজ করে বলে দিবি?”

কি বোর্ডে আঙুল চলছে প্রিতমের। অস্ফুটে বের হলো,“হু।”

শুভ আর সাফওয়ান এসে ওদের রুমের দরজায় নক করে। জামি উঠে দরজা খুলে দিতেই সাফওয়ান তাড়া দিয়ে বলে,“ফ্রেশ হোস নি? মাউন্ট ঘুরবো না? আজ তো উজি ফেস্টিভ্যাল শুরু হবে সন্ধ্যা দেখে।”

প্রিতম ওদের কথার পাত্তা না দিয়ে কি-বোর্ডে হাত চালায়। জামি দুজনকে পুরো ঘটনাটা খুলে বলে। শুভ আর সাফওয়ানের হতভম্ব ভাব। এখন তবে উপায় !

প্রিতম ইনায়ার অ্যাকাউন্টে একটা মেসেজ পাঠিয়ে চুপচাপ বসে থাকে। তার খুব অদ্ভুত কারনে নার্ভাস লাগছে বেশ। কেমন একটা সিনেম্যাটিক ব্যাপার হয়ে গেলো। এর পরে কি হবে? কি হবে?

★★★

ইনায়া কপালে হাত দিয়ে বসে আছে। মিসেস মৈথির বাবা বলেছে পুলিশের সাহায্য নেবে। কিন্তু এ তো অনেক ঝামেলার এবং অসম্ভব একটা কাজ। ব্যাগ ফিরে পাওয়ার আশা খুবই ক্ষীণ ইনায়ার মনে হয়। ইনায়ার ভীষণ খারাপ লাগছে, তার মনে আছে ঐ ক্যামেরাটা মেজো বাবা আপুকে যখন অ্যাবরোড থেকে এনে দিয়েছিলো, আপু কত খুশি হয়েছিলো। তারপর ইনায়ার সব ড্রেস, নোটবুক। ইনায়ার লিপস্টিকটার জন্যও তার খারাপ লাগছে। সব ছিলো তার শখের।

মিসেস মৈথি এর মাঝে ইনায়াকে অল্প খাইয়ে দিয়ে গেলো। ইনায়া মন খারাপ করে নিচে যায়নি খেতে। কিছুক্ষণ বসে থেকে সে ফোনটা তুলে হাতে নেয়। আপু আর দাদানকে জানানো উচিত। দাদান যদি একটা সলিউশন বের করে দেয়।

ইনশিরাহকে কল দিলে ইনশিরাহ ধরলো না। ইনায়া ইহানকে কল দেয়। ইহান ফোনটা রিসিভ করতেই ইনায়া ডেকে ওঠে,“দাদান।”

_জি। কি হয়েছে ইনু?

_দাদান একটা অঘটন ঘটেছে।

ইহানের থেকে গম্ভীর স্বরে জবাব আসে,“হোয়্যাট!”

_দাদান আমার ব্যাগটা কারো সাথে পাল্টে গিয়েছে হয়তো।

_মানে, তো এয়ারলাইন্স অথরিটিকে জানাবি না?

_দাদান এটা ব্যাগ হাতে পাওয়ার পরে ঘটেছে। রেস্তোরাঁ থেকে ব্যাগবদল হয়েছে আমি নিশ্চিত।

ইহান চুপ। ইনায়া ভীত স্বরে বলে,“কি করবো দাদান?”

_নিয়ারেস্ট পুলিশ স্টেশনে যোগাযোগ করে রাখতে হবে। মৈথি আন্টি কোথায়। ওনাকে দে ফোনটা।

মৈথি ইহানের সাথে কথা শেষে ইনায়ার হাতে ফোনটা তুলে দিয়ে বলে,“আরে পেয়ে যাবে ব্যাগ। এতো দুশ্চিন্তা করো না।”

ইনায়া হাসিখুশি হবার চেষ্টায় । ফোনটা হাতে নিয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে স্ক্রিনে। দু'টো নির্দিষ্ট সোস্যাল মিডিয়া অ্যাকাউন্টে নোটিফিকেশন এসেছে । আননোন অ্যাকাউন্ট থেকে মেসেজ। ইনায়া লটকানো মুখ নিয়ে ইগনোর করতে চেয়েও করলো না। কি মনে করে মেসেজ টা দেখতে চাইলো।

“আমি প্রিতম,আই থিংক ইউ নো মি। সম্ভবত তোমার ব্যাগটা আমি পেয়েছি। যদি ফেরত পেতে চাও তো যোগাযোগ করতে হবে আমার সাথে।”

মনে হলো ইনায়ার আশেপাশে এই শতাব্দীর মাঝারি ভূমিকম্পটা হলো । ফোনটাকে পাশে রেখে দুহাতে চোখ ডলে আবারও ফোনটা হাতে নিয়ে দেখলো। না,বাক্য,শব্দ,দাড়ি,কমা সবই ঠিক। এটা কি?

ইনায়া একটা ঢোক গিলে আননোন অ্যাকাউন্টটাতে হুমরি খেয়ে পরে। স্পেশাল প্রফেশনাল অ্যাকাউন্ট। প্রিতম আহসান। ডিসপ্লে পিকচার হিসেবে আছে ঐ লোকটার ফরমাল স্যুট পরা একটা হাস্যোজ্জ্বল ছবি। মোটা কালো ফ্রেমের চশমার নিচে নীল দু'টো চোখ।

ইনায়া এদিক ওদিক তাকায়। কেউ নেই। কাকে জানাবে বিষয়টা। উঠে দাঁড়ায় সে। ছুটে চলে যায় মৈথি আন্টির কাছে।

মৈথি মেসেজটা দেখে বললো,“ব্যস! সব প্রবলেম সলভ হয়েছে। যোগাযোগ করো। ওদের লোকেশন জানো।”

_কিন্তু আন্টি!

_কি হলো?

_আন্টি ওনার ব্যাগটা সম্ভবত আমার কাছে। ওনার ব্যাগটা যে আমি নষ্ট করে ফেললাম?

মৈথি কিছু একটা চিন্তা করে বললো, “ক্ষতিপূরণ দিয়ে দেবে। আগে যোগাযোগ তো করো। তোমার জিনিস পত্র!”

ইনায়ার থেকেও ওর পাঁচ বান্ধবীকে বেশি উৎসুক মনে হচ্ছে। সবাই ইনায়ার ফোন নিয়ে কাড়াকাড়ি শুরু করে দিয়েছে।

রুশফি চেঁচিয়ে ওঠে,“বিষয়টা বেশ ফিল্মি। ব্যাগ অদলবদল হয়েছে। এরপর কি হবে? সিমকার্ডের এগারো সংখ্যার বিনিময়। মন বিনিময়। বিয়ের রেজিস্ট্রি পেপারে সই বিনিময়।”

আর ভাবতে বা বলতে পারলো না রুশফি, চেঁ'চি'য়ে উঠে বললো,“আমায় ডিল করতে দে।”

একটা সাধারণ ঘটনা নিয়ে এতো দূর চিন্তা করে ফেললো সবাই। ইনায়া তাজ্জব বনে বান্ধবীদের দিকে তাকিয়ে আছে।

তারপর রেগেমেগে ফোনটা ওদের থেকে কে'ড়ে নিয়ে বলে,“আমার ব্যাপার। আমি ডিল করি। তোরা তোদের নষ্ট চিন্তাভাবনা নিয়ে দূরে সর।”

প্রিতমের মেসেজের রিপ্লাই হিসেবে সে লিখে দেয়,“ওটা আমার ব্যাগ কিভাবে বুঝতে পারলেন?”

প্রিতম এটাই মনে মনে ভাবছিলো,এখন কি জবাব দেবে সে? ব্যাগে হাত দিয়েছে সেটা বলে দেবে! তাহলে তো আরো কথা শুনিয়ে দেবে ইরফান মির্জার ঐ রগচটা বোন। মনে সাহস জুগিয়ে সত্যিটা স্বীকার করে নেয় প্রিতম,বলে,“আসলে আমার নিজের ব্যাগ মনে করেই আমি সাইডের জিপারটা খুলে তোমার নোটবুক আর ফটো দেখতে পাই। অনুমান করে সব ঘটনা মনে করার চেষ্টা করলাম। আমাদের সবার ব্যাগ ওয়াশরুমের বাইরে করিডোরে ছিলো আই থিংক। বাই দ্য ওয়ে,যদি ভুল না হই তবে আমার ব্যাগটাও নিশ্চয়ই তোমার কাছে। একই ব্যাগ।”

ইনায়ার মুখ অস্বস্তিতে ছেয়ে যায়। লোকটাকে কিভাবে বলবে লোকটার ব্যাগ কেটে টুকরো টুকরো করেছে ইনায়া। এমনিতেই দাদানের শত্রু, ব্যাগের এই হাল দেখলে নিশ্চয়ই কথা শুনিয়ে শুনিয়ে ইনায়াকে শেষ করে দেবে। মৈথি আন্টির কাছে সাজেশন চায় ইনায়া । মৈথি বললো,“এখনি বলে দাও।”

ইনায়া বলে,“না না আন্টি, দুষ্টু লোক। যদি আমার ব্যাগ ফেরত না দেয়?”

_আচ্ছা তবে জিজ্ঞেস করো ব্যাগটা কিভাবে একচেঞ্জ করা যাবে। ওদের লোকেশন জানো।

ইনায়া মেসেজ পাঠায়,“জি। আপনার ব্যাগটা আমার কাছে সম্ভবত। এখন বলুন। কিভাবে একচেঞ্জ করবো।”

_লোকেশন বলো তোমাদের।

ইনায়া মৈথির দিকে তাকিয়ে বলে,“আন্টি লোকেশন চাইছে!”

_তো দেবে, বলো সোমজোম মিউনিসিপ্যালিটি এরিয়া,এরিয়া কোড-০৬৩।

ইনায়া অ্যাড্রেস দিতেই প্রিতম লিখে দেয়,“আমার অ্যাড্রেস , হোটেল হিমালায়া ইন, পোখারা মেইন সিটি,গ্রিন পার্ক এরিয়া। ফাস্টমুভ নেপালে তোমার অ্যাড্রেসে ব্যাগটা চলে যাবে। ”

ইনায়া তাকিয়ে থাকে মেসেজের দিকে। এতোটা বিনয়ী লাগছে যে লোকটাকে। বেশ অবাক ইনায়া।

প্রিতম রিপ্লাই না পেয়ে আবার মেসেজ করলো,“আর আমার ব্যাগ?”

ইনায়া একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কাটা'ছেঁড়া ব্যাগটার দিকে তাকায়, তারপর মেসেজে বলে,“পেয়ে যাবেন।”

চলমান.....

কাহিনী এভাবেই আগাবে,এক জুটির কাহিনী শেষে আরেক জুটি। এক পর্বে চার জুটি কখনোই আসবে না। অধৈর্য পাঠকদের আমার আর কিছু বলার নেই। আ'ম টায়ার্ড।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 15 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন