#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_১৬
#ইসরাত_ইতি
🚫কঠোর ভাবে প্রাপ্তমনস্কদের জন্য।
🚫শিক্ষা ও সাহিত্যের সাথে আমার এই কল্পিত ঘটনাগুলোর লিখিত শব্দগুলোর কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
জোমসোম মিউনিসিপ্যালিটি এরিয়া। পোখারা মেইন সিটির সর্বদক্ষিণের নতুন একটি মিউনিসিপ্যালিটি । নেপাল ট্যুরের দিনগুলিতে ইনায়া কিংবা বাকিদের পরিবার মেয়েগুলোকে মৈথির বাপের বাড়িতেই থাকার জন্য সমর্থন করেছে। একটা পরিবারের সাথে থাকলে মেয়েগুলো নিরাপদ এবং ডিসিপ্লিনড থাকবে বেশি। এটাই সবার ধারণা।
তাছাড়া মেইন সিটিতে সেভেনস্টার হোটেল গুলোতে ওরা এই নেপালকে কতটা উপভোগ করতো ঠিক জানা নেই। তবে এখানে নেপালের আসল সৌন্দর্য উপভোগ করা যাচ্ছে। পাহাড়ের খুব কাছ থেকে।
নেপাল ট্যুরে স্কেজিওল তাদের ঠিক করা,“প্রথম পাঁচ দিন মাউন্ট এভারেস্ট দর্শন, তারপর দেশের পাঁচটা শীর্ষ টুরিস্ট স্পট নাগরকোট , তিলিচি লেক,লুম্বিনি, ল্যাংট্যাক ভ্যালি ট্রেক, ভক্তপুর, পোখরা ফরেস্ট সবগুলো ঘুরবে তারা।
এখান থেকে পেছনে বিস্তৃর্ণ পর্বতমালা। রাতের চাঁদের আলোতে পাহাড় গুলোকে ভ্যানিলা কোওন আসক্রিমের মতো লাগছে। আওরঙ্গজেব প্যালেসের টেরেসে দাঁড়িয়ে এই অভূতপূর্ব দৃশ্য উপভোগ করতে করতে নেপালের ঐতিহ্যবাহী পিঠা খাচ্ছিলো ওরা।
মৈথির ডাকে ইনায়া ভেতরে চলে যায়। ইনায়ার ফোনে টুং টাং আওয়াজে নোটিফিকেশন এলো, ব্যাগ পৌঁছে গিয়েছে।
ডেলিভারি ম্যান চলে যেতেই ইনায়া ব্যাগটাকে টানতে টানতে দোতলায় উঠে রুমে ঢুকে আনবক্স করে ব্যাগটা। যখনই দেখলো ব্যাগের মেইন লক খোলা, সাথে সাথে ইনায়ার ভ্রু কুঞ্চিত হলো। কি সর্বনাশ! লক খোলা কেন!
সবাই কৌতুহলী হয়ে দেখছে। ইনায়া ব্যস্ত হাতে ব্যাগ খুলে তার জিনিসপত্র সব চেক করে একটা স্বস্তির ফেললো শুরুতে। কিন্তু পরমুহূর্তেই বিরক্তিতে তার মুখ তেঁতো হয়।
ভারি অ'সভ্য লোক তো ! এভাবে ব্যাগ হাতাহাতি করেছে! ব্যাগে হাত দিয়েছে!
মেইন লক খুলেছে অথচ মেসেজে বলেছে সাইডের জিপার খুলে ফটো দেখেছে শুধু!
নিজের ব্যাক্তিগত পোশাক গুলোর দিকে তাকিয়ে ইনায়ার রাগে দুঃখে নিজের মাথার চুল ছিঁড়তে ইচ্ছে হচ্ছে। সব দেখে নিয়েছে ঐ লোকটা।
না, দু'টো কথা ঐ লোককে শুনিয়ে দিতেই হয়।
ফোন হাতে নিয়ে ইনায়া প্রিতমকে টেক্সট করেছে,“আপনি আমার ব্যাগের ভেতরে হাত দিয়েছেন?”
মেসেজটা কেমন কেমন দৃষ্টিকটু লাগলো প্রিতমের কাছে। নিজের ব্যাগের কাটা'ছেঁড়া বেহাল দশা দেখে এমনিতেই মাথায় রা'গ চেপে ছিলো ভীষণ। ব্যাগ হাতে পেয়ে কিছুক্ষণ তব্দা খেয়ে বসে ছিলো।
সে রিপ্লাই করলো,“হাত দিয়েছি মানে? ওটা তো আমার ব্যাগ জেনে লক টা হ্যা'ক করেছি। আর ব্যাগের ভেতরে হাত দিয়েছি বলতে তুমি কি বুঝিয়েছো? আমি কিছু চুরি করেছি ?
তোমার মতো টুকরো টুকরো তো করিনি ব্যাগ। আচ্ছা এভাবে ত্যা'ড়া কথাই বলে সবসময় তোমার বাড়ির লোকেরা?”
ইনায়া নিজের পরিবারের খোঁটা শুনে ভদ্রতা ভুলে গেলো। মেসেজ টাইপ করতে ইচ্ছে করছে না,সে ভয়েস মেসেজ পাঠিয়ে দিলো,“আমার বাড়ির লোক টেনে কথা বলছেন আপনার সাহস তো কম না।”
ইনায়ার ভয়েস মেসেজ শুনে জামির চক্ষু চড়কগাছ। ক্ষুব্ধ কণ্ঠে প্রিতমকে বললো,“দেখলি অকৃতজ্ঞ মেয়ে একটা। দাড়া ,ওকে রিপ্লাই আমি করছি।”
জামিও ভয়েস মেসেজ পাঠায়,“তুমি একটা অকৃতজ্ঞ। ব্যাগ ফেরত পেয়ে উপকার ভুলে গিয়েছো?”
_ব্যাগ আপনারা ফেরত না দিলেও কিচ্ছু যায় আসতো না আমার।
_নিব্বি কোথাকার।
ইনায়া বুঝতে পারছে সে কিছুটা বাড়াবাড়ি কথা বলে ফেলেছে তবে সে থামলো না, নিব্বি কথাটা শুনে তার মাথা পুরো খারাপ হয়ে গেলো। নিজের রা'গ কে সংবরণ করার চেষ্টা করে সে বললো,“আমার দুর্ভাগ্য,এখানে আসার পর থেকে আপনাদের সাথে পালা পরছে আমার। আই হোওপ জীবনে যেন আর কখনো আপনাদের সাথে দেখা না হয়। ”
জামি ব্যঙ্গ করে পাল্টা ভয়েস মেসেজ পাঠালো,“হ্যা হ্যা,আর আমরা যেন প্রে করছি,প্লিজ আল্লাহ ঐ শাকচুন্নী মেয়েগুলোর সাথে যেনো আমাদের আবারও দেখা হয়,রোজ দেখা হয়। যত্তসব!"
ইনায়া একটা গভীর নিঃশ্বাস ফেললো। নাহ,এদের মতো ঝগড়ুটে লোকের সাথে আর তর্ক নয়। সে আর একটা কথা না বাড়িয়ে প্রিতমকে ব্ল'ক করে দিয়ে ঘুমাতে গেলো। বিপদ দূর হয়েছে,এদের নিয়ে আর ভাববে না ইনায়া। কাল সকাল থেকে শুধু আনন্দ আর আনন্দ।
ব্লক খেয়ে জামি প্রিতমের দিকে তাকিয়ে বলে,“এই ঐ নিব্বি ব্লক দিয়েছে রে তোকে।”
প্রিতম গা ছাড়া ভাব নিয়ে বলে,“সো হোয়্যাট?”
_সো হোয়্যাট মানে? ও কেন দেবে ব্লক? ব্লক তো দেবো আমরা। একটা নিব্বি,নেকু।
প্রিতম জামির হাত থেকে ফোনটা নিয়ে বললো,“ঘুমা এখন। ওদের কথা মাথা থেকে ঝেরে ফেল। কাল সকাল থেকে আমরা নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত থাকবো শুধু।”
★★★
নেপাল ট্যুর-দিনসংখ্যা এক।
জোমসোম মিউনিসিপ্যালিটি রোড এরিয়া।
মিসেস মৈথি ট্রেকিং এজেন্সিতে যোগাযোগ করেছে গতকাল রাতেই। তবে তাদের ট্যুরের প্ল্যানে কিঞ্চিত পরিবর্তন এসেছে গতকাল মধ্যরাতে। এভারেস্ট বেস ক্যাম্পের প্ল্যান টা পিছিয়েছে ট্যুরের শেষের দিকের কদিনে। তাপমাত্রা মাইনাস তিনে নেমেছে, বেশ বিপদজনক হবে।
ওরা সবাই মেনেও নিলো, অবশ্য যার যার ফ্যামিলি থেকে ধ'ম'ক খাওয়ার পরে।
গত রাতেই সবাই ডেস্টিনেশন চেঞ্জ করেছে। তারা সবাই মিলে ঠিক করলো নাগোরকোট যাবে আজ। ওখান থেকে একটার পর একটা টুরিস্ট প্লেস ঘুরবে। দিন সাতেকের আগে জোমসোম ফিরছে না আর।
যেই ভাবা সেই কাজ। সবাই রেডি হয়ে,ট্রাভেল ব্যাগ কাঁধে ঝুলিয়ে নিয়ে মিসেস মৈথির পরিচালনায় বেড়িয়ে পরলো। একটা ট্রাভেল এজেন্সি হলো তাদের সফর সঙ্গী।
হোটেল হিমালয়া ইন।
প্রিতমদের প্ল্যান ছিলো তারা পোখারাতেই একটা দিন থাকবে। তারপর বেরিয়ে পরবে ট্রেকিংয়ে। কিন্তু বিপত্তি ঘটলো তাতে। আবহাওয়া তাদের পরিকল্পনা ঘেটে দিয়েছে পুরোটা। পরিকল্পনা বদলে তারা চললো নাগরকোট ঘুরতে। মাথা থেকে গতকালকের ঝামেলা দূর করে ফুরফুরে মেজাজে চারবন্ধু বেড়িয়ে পরলো। নাগোরকোট ঘুরতে যাওয়াটা জামির প্ল্যান ছিলো। বাকিদের ছিলো অন্য প্ল্যান। কিন্তু জামির জেদের কাছে হার মানলো বাকি তিনজন।
★★★
নাগোরকোট পৌঁছে ইনায়ারা একটা হোমস্টেতে তিনটা রুম বুক করে উঠলো সবাই। “হোটেল মাইস্টিক মাউন্টেন ”। একেবারে গ্রামের দিকেই। জোমসোম থেকে এখানে পৌছাতে সাড়ে চার ঘন্টার মতো লেগেছে। নাগোরকোটের এই হোমস্টেটা ট্রাভেল এজেন্সির মালিকের।
মিসেস মৈথি অত্যন্ত দায়িত্বের সাথে বাচ্চা গুলোকে সামলে এসেছে। কিছুক্ষণ পরপর একেক জনের অভিভাবকের সাথে কথা বলে বাচ্চাদের নিরাপত্তার ব্যাপারে নিশ্চিন্ত তো করছেনই।
পাঁচটা মেয়ে,এদের মধ্যে সবথেকে রক্ষনশীল সম্ভবত মির্জা ফ্যামিলি। দিনে কমপক্ষে তিনজনের ফোনকল রিসিভ করতে হচ্ছে মিসেস মৈথিকে। তবে তিনি বিরক্ত হচ্ছেন না।
প্রিতমদের অবশ্য পৌঁছাতে বেশ রাত হলো। যে এজেন্সি তাদের সফরসঙ্গী ছিলো তাদের গাড়িটা মাঝ রাস্তায় খারাপ হয়। আরেকটা গাড়ি আসতে বেশ সময় নিয়েছিলো। নাগোরকোটে পৌঁছানোর আগেই ম্যাপ ঘেঁটে তারা এই গ্রামের সবথেকে বিলাসবহুল হোমস্টে “হোটেল মাইস্টিক মাউন্টেনে” দু'টো কামরা বুক ফেলেছিলো নিজেদের নামে।
নাগোরকোট হচ্ছে বিশ্বের সবথেকে উঁচু একটি গ্রাম। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে দুই হাজার ১৭৫ মিটার উঁচুতে এই গ্রামটি।
নাগোরকোটের সুউচ্চ হোটেলের বারান্দা থেকে এভারেস্টের ভিউ দেখে সকাল সকাল ইনায়ার মনটা ভালো হয়ে গেল।
এখানে তারা মোট দু রাত থাকার পরিকল্পনা নিয়ে এসেছিলো। আজ তাদের বিশেষ পরিকল্পনা আছে, এখানে তারা বাঞ্জি জাম্পিংয়ের অভিজ্ঞতা নেবে।
নাগোরকোটে গো বাঞ্জির শাখা দেখেই তারা শুরুতেই উচ্ছ্বসিত হয়ে পরেছিলো ভীষণ।
নাস্তা সেরে সকাল সকাল তাই বেড়িয়ে পরলো তারা নতুন এডভেঞ্চার করতে। তবে এসবের কথা ইনায়া জানালো না বাড়িতে।
মিসেস মৈথির বারণ শুনলোনা কেউ, নিজেরা নিজেরা টিকিট কেটে কর্তৃপক্ষের সাথে চললো জাম্পিং পয়েন্টে। মিসেস মৈথিকে সাথে নেয়নি জুনি। মেয়েদেরকে অল্পকিছু সময় নিজেদের মতো ছেড়ে দেয়া উচিত ভেবে মিসেস মৈথি যায়নি আর।
নাগোরকোটের অতি ছোটো পাহাড় মাউন্ট ধুমির শীর্ষ থেকে লাফিয়ে নিচের উঞ্জি লেকের ওপর উড়ে বেড়াবে তারা ।
ইনায়ার উচ্ছ্বাস যেন বাধ মানছে না। কিন্তু সে দমে গেলো যখন পাশ থেকে রিন্তু বললো,“এই স্বাস্থ্য নিয়ে পারবি?”
ইনায়া রিন্তুর দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে থাকলো। তারপর কঠিন গলায় বললো,“পারবো।”
ইনায়া বদ্ধপরিকর। ওরা কি ভাবে ওকে? ও আজ সবার আগে জাম্প দেবে। এজেন্সির লোক ইনায়াকে সুরক্ষা গুলো পড়িয়ে দিচ্ছিলো। যখন সব ঠিকঠাক তখন,টাওয়ারের প্রান্তে দাঁড়িয়ে দু'হাত পাখির মতো দুদিকে মেলে ধরে ইনায়া চোখ বন্ধ করে প্রস্তুতি নিচ্ছিলো জীবনের প্রথম রিস্কি এডভেঞ্চার করার, ঠিক তখনই সেখানে গো বাঞ্জির আরো একজন লোক এসে ওকে থামিয়ে দিলো।
ইনায়া কিছু বুঝলো না। জিজ্ঞেস করে জানতে পারলো লিস্ট অনুযায়ী ওদের পালা খানিক পরে। আরেকদল আগে টিকিট কেটেছে। একটু অপেক্ষা করতে হবে।
ইনায়ারা মানলো না,কারন অফিস থেকে তাদের এসব কিছুই বলেনি। রীতিমতো তর্ক শুরু করে দিয়েছে তরুণীর দল।
অথরিটি পরেছে বিপদে, দুদিকের চাপে তারা হিমশিম খাচ্ছে যখন তখন সেখানে উপস্থিত হলো প্রিতমেরা চার বন্ধু।
এভাবে,আবারও প্রিতমদের দেখতে পেয়ে ইনায়াদের চক্ষু চড়কগাছ গাছ। প্রিতমরাও হকচকায়। আবার ! আবার দেখা হলো এই ঝামেলা বাহিনীর সাথে!
দু'পক্ষের সবাই মুহুর্ত কাটিয়ে দেয় হতভম্ব ভাব কাটাতে। তারপর চেঁচিয়ে উঠে একদল আরেকদলকে উদ্দেশ্য করে বলে,“আপনারা!”
গো বাঞ্জির কর্তৃপক্ষ দু দলকে এভাবে চেঁচাতে দেখে ভড়কায়। বোকার মতো দাঁড়িয়ে আছে তারা।
সবার প্রথমে ইনায়া বলেই ফেললো,“আবার আপনারা!”
জামি এগিয়ে যায়, কন্ঠে গাম্ভীর্য নিয়ে বলে,“আবার তোমরা!”
রুশফি বলে,“কি ফাটা কপাল আমাদের ! বারবার আপনাদের সাথে দেখা হচ্ছে।”
জামি মুখ ভেঙিয়ে বললো,“হ্যা হ্যা আর আমাদের যেন সোনায় বাঁধানো কপাল, কি সৌভাগ্য বারবার তোমাদের সাথে দেখা হচ্ছে। ওয়াও!”
ইনায়া ওদের থামিয়ে বলে,“ছাড় তো ওনাদের। পায়ে পা লাগিয়ে ঝগড়া জানে শুধু।"
জামি পাল্টা ইনায়াকে ভেঙিয়ে বললো,“হ্যা আর তোমাদের মুখ দিয়ে যেন ঝরে মধু।”
_উফফফ অসহ্য!
_উফফফ অসহ্য!
ফুঁসছে ইনায়া, ফুঁসছে জামি।
প্রিতম জামিকে টেনে সরিয়ে আনলো।
_ইগনোর দেম জামি। আমরা আমাদের কাজ করি চল।
অথরিটির সাথে কথা বলতে এগিয়ে যায় প্রিতম আর ওর বন্ধুরা। ইনায়া আর ওর পাঁচ বান্ধবী চোখ বড়বড় করে দেখছিল। অথরিটির একজন লোক এসে ইনায়াকে বলে,“ম্যাম উই আর সরি। আগে ওনাদের পালা।”
ইনায়ার চোয়াল শক্ত হয়। অথরিটিকে ধ'ম'কে বলে,“টিকিটে আমাদের টাইম দেওয়া হয়েছে। এখন আমাদের সময়।”
প্রিতমও ঠান্ডা গলায় বলে,“আমাদেরও এখন সময়। এবং আমরাই আগে জাম্প দেবো। ”
_না আমাদের সময়,আমরা দেবো।
_বললাম না আমরা দেবো।
রীতিমতো তর্ক শুরু হয়েছে সেখানে। গো বাঞ্জির লোক তিনজন হতাশ হয়ে তাকিয়ে আছে। এদেরকে এখন কে থামাবে?
একজন খানিক সাহস নিয়ে এগিয়ে এসেছিল যদিও। কিছু বলার চান্স পেলো না। মুখের ওপর দু'পক্ষের সবাই চেঁচিয়ে উঠলো,“শাট আপ!!”
মিইয়ে গেলো লোক তিনজন। ঝগড়ায় কেউ কারো থেকে কম নয়। দু'পক্ষের লোকই সমানে মুখ চালিয়ে যাচ্ছে।
কিছুক্ষণ বাদে একজন বয়ঃজ্যেষ্ঠ লোক এসে ওদের থামিয়ে বললো,“একটা উপায় আছে । একটু শোনো তোমরা!”
লোকটা বয়ঃজ্যেষ্ঠ বিধায় এবার দু পক্ষের সবার ধ'ম'কের থেকে রেহাই পেলো।
প্রিতম কপাল কুঁচকে বললো,“কী?”
লোকটা বললো,“বলছিলাম একবারে তো চারজন করে জাম্প দিতে পারবেন তো যদি দু দলের দু'জন দু'জন করে ম্যানেজ করে নিতেন তাহলে ব্যাপারটা মিটে যেতো। ঝগড়া করে তো কোনো লাভ হয়না তাই না?”
দু পক্ষের সবাই মন দিয়ে শুনলো লোকটার কথা। আইডিয়াটা মন্দ নয়।
মনের ক্ষো'ভ মনে চে'পে রেখেই রাজি হলো সবাই। মেয়েদের দল থেকে ইনায়া রুশফি,আর ছেলেদের দল থেকে প্রিতম জামি প্রস্তুতি নিচ্ছিলো জাম্পের।
সুরক্ষা পরিধান করে লাফ দেওয়ার আগে ইনায়া মনে মনে সুরা পাঠ করে নেয়। তারপর দু'চোখ বন্ধ করে ঝাপিয়ে পরে স্বচ্ছ লেকের জলে।
হৃদপিন্ড সবেগে লাফাচ্ছে। মিনিট দুয়েক কে'টে গেলে দু'চোখ মেলে তাকিয়ে আবিষ্কার করলো নিজেকে শূন্যে। চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে থেকে কান ফাটানো বি'কট চিৎকারে পরিবেশ ভারি করে ফেললো ইনায়া। তবে ভয় পেয়ে নয়, এটা আনন্দ ও উত্তেজনার বহিঃপ্রকাশ।
জামি আর প্রিতম ততক্ষণে লাফ দিয়েছে। ইনায়ার চিৎকারে তালা লেগে গেলো তাদের কানে।
জামি রেগেমেগে বললো,“আস্তে চেচাও না!”
ইনায়া থামলো। ঘা'ড় বাঁকিয়ে জামিকে দেখলো। তারপর চেঁচিয়ে বললো,“আপনাদের কথায়? আপনারাও চেচান। কে বারন করেছে?”
_আমাদের অতো কৃমি নেই পেটে তোমাদের মতো।
_কি বললেন?
_যা শুনলে।
ক্যামেরায় ওদের ঝগড়াও রেকর্ড হচ্ছিলো। প্রিতম অবশ্য নিজের মতো সব উপভোগ করছিলো।
এদিকে মুভ দিতে দিতে আর ঝগড়া চালিয়ে নিতে নিতে ইনায়া এসে প্রিতমের গা'য়ে ধাক্কা খেলো হঠাৎ।
দু'জন দু'জনের দিকে তাকালো। চোখাচোখি হলো। এবং চোখ নামিয়ে নিয়ে কপাল কুঁচকে অন্যদিকে ঘুরে গেলো দু'জনেই।
বুঝলো না কেউই,এই মাত্র তারা নিজেদের ডেসটিনি থেকেই মুখ ঘুরিয়ে নিলো।
★★★
“গত এক দশকে নেপালের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ছিলো অস্থিতিশীল। দু'টো প্রধান কমিউনিস্ট পার্টির দা'ঙ্গার মাঝে সুযোগ নিচ্ছে কিছু উগ্রপন্থী সংগঠন। সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে জনগনকে ক্ষ্যাপাতে নিজেরাই গোপনে করছিলো জনগণের ক্ষতি সাধন।
এদের মূল হোতা গঙ্গোপ্পো। উগ্রপন্থী জঙ্গি সংগঠনের নেতা।
দুই হাজার তিরিশের পর থেকে নেপাল যখন ধীরে ধীরে একটা ধর্ম নিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে প্রকাশিত হচ্ছিল ঠিক তখনই নির্দিষ্ট সংখ্যক জনগনকে উস্কে দিতে ধর্মীয় দাঙ্গা তৈরি করতো এই দল।
মেট্রোরেলে বোম প্লান্টিং, দু দুবার প্রাইম মিনিস্টারের ওপর হামলা, হসপিটালে আগুন লাগিয়ে অসংখ্য নিরপরাধ মানুষের জান নিয়েছে এই উগ্রবাদীদল।
গঙ্গোপ্পো সুদূর সুরিনাম থেকে এসব কার্য পরিচালনা করতো। দুই হাজার আটচল্লিশে গঙ্গোপ্পোকে নেপাল সেনাবাহিনীর এক বিশেষ টিম সাউথ আমেরিকার গোয়েন্দা সংস্থা মিলে গ্রেপ্তার করে।
ছ'মাস কেস চলার পরে উনপঞ্চাশে গঙ্গোপ্পোর ফাঁসির রায় হয়। তবে এখনও কার্যকর হয়নি। এদিকে ঐ উগ্রবাদী সংগঠনের অন্যান্য কর্মীদের পাত্তা খুঁজে পাওয়া যায়নি, বিচ্ছিন্ন ভাবে ঘটিয়ে চলেছে তাদের অপরাধ। তাদের এখনও খুঁজছে নেপাল গোয়েন্দা সংস্থা। রাষ্ট্রীয় আদেশ অনুযায়ী খুঁজে পাওয়া মাত্র তাদের মৃত্যু কার্যকর করা হবে।”
“রিপাবলিক অব নেপাল ২৪” চ্যানেলে সুন্দরী খবরপাঠিকার ঠোঁটের দিকে তাকিয়ে প্রতিবেদন টা শুনে নিয়ে একটা কুৎসিত হাসি দেয় গাওফুন।
অন্ধকার ঘরে নিজের রক্ষিতার বুকের ওপর মাথা রেখে শুয়ে খবরটা দেখছিলো সে।
দরজার বাইরে তিনজন লোক এসে গাউফুনকে ডাকে। তার রক্ষিতা উঠে অগত্যা ছুটে যায় ওয়াশরুমের দিকে। গাউফুন নিজেদের গোপন আলোচনায় কাউকে এলাউ করে না।
সে উঠে বসে, নিজের কুশ্রী দানবাকৃতির উলঙ্গ শরীরটায় তোয়ালে জরিয়ে দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়।
তিনজন মাস্ক পরিহিত লোকের মধ্যে থেকে একজন বললো
“রেডম্যান অর্ডার দিয়ে দিয়েছে। অপারেশন নাগোরকোট।”
গাউফুন আবারও সেই কুৎসিত হাসি দিয়ে বলে,“তারপর?”
লোকটা আবারও বললো,“বিদেশি কুড়ি পঁচিশ জনকে চাই।”
★★★
সকাল সাতটা আটান্ন মিনিট। আধাঘণ্টায় জগিং শেষ করে শান্তিনীড়ের দিকে ছোটে ইনশিরাহর স্কুটি। আজ তাকে সকাল সকাল যেতে হবে ভার্সিটিতে। তাই এতো তা'ড়া!
পোর্চের সামনে স্কুটি দাড় করিয়ে তাড়াহুড়ো করে অন্দরমহলে ঢুকতেই থ'ম'কে দাঁড়িয়ে যায় ইনশিরাহ।
বাড়িতে শুধু আলো,ইহান আর ইরফান। বাকিরা সবাই একটু নিজেদের কাজে বেরিয়েছে। লিভিং রুমে আলো আর ইহান দাঁড়িয়ে। দুই জনই ইনশিরাহর দিকে শীতল চোখে তাকিয়ে আছে। ইনশিরাহ কিছুই বুঝতে পারলো না। সবাই এভাবে কি দেখছে তাকে! সে কি করেছে! সাঈমের সাথে লেকপার্কের কফিশপে কফি খেয়েছে তা কেউ ফোন করে বলে দিয়েছে নাকি !
সে বোকা বোকা মুখ করে দাঁড়িয়ে আছে। হঠাৎ তার নাকে একটা গন্ধ এসে লাগে। তীব্র পোড়া গন্ধ।
ইনশিরাহ আশেপাশে তাকিয়ে গম্ভীর হয়ে বলে,“হোয়্যাট্স গোয়িং অন!”
_কিচ্ছু হয়নি। এখন হবে। আর আজ আমি বড় মাকে আটকাবো না।
ইহানের রাশভারী জবাব। ইনশিরাহর দিকে তীক্ষ্ম দৃষ্টি ফেলে ইহান হেলেদুলে হেঁটে দোতলায় চলে যায়। ইনশিরাহ ঘুরে মাম্মার দিকে তাকাতেই আলো ছুটে এসে ইনশিরাহর চুলের মুঠি ধরে নিয়ে যায় কিচেনের কাছে।
ইনশিরাহর চোখ বড়বড় হয়ে গিয়েছে,মুখে হতভম্ব ভাব। একটা পাতিল পুড়ে গিয়েছে, আগুন লেগে ছিলো আরো বেশ কিছু জিনিস পত্রে। পুরে কয়লা হয়ে গিয়েছে সেসব। ইনশিরাহ আবারও মাম্মার দিকে তাকায়। আলো দাঁতে দাঁত চেপে বলে,“সকালে আমি তোকে বলেছিলাম দুধটা ফুটে গেলে চুলাটা অফ করে দিতে,বলিনি?”
ইনশিরাহর এতক্ষণে মনে পরে। মাম্মা তাকে বলেছিলো,সেও বলেছিলো সে কাজটা করবে,তবে বেমালুম ভুলে গিয়েছিলো। তাই এমন এক দূর্ঘটনা ঘটলো! ইনশিরাহ মাম্মাকে দেখে। আলো রাগে ফুঁসছে, ইনশিরাহর মনে হচ্ছে মাম্মা এক্ষুনি তার ওপর ঝাঁপিয়ে পরবে। সে পালাতেই নিচ্ছিলো,আলো খপ করে তার হাত ধরে আবারও তার চুল ধরে চেঁচাতে থাকে,“তুই শোধরাবি না তাই না? আজ কি হতো জবাব দে! জবাব দে। ”
_মাম্মা লাগছে!
আলো এদিক ওদিক তাকিয়ে কেবিনেটের ওপর থেকে একটা খুন্তি এনে দুম করে তার পঁচিশের মেয়ের পিঠে একটা লাগিয়ে দেয়।
তখনই সদর দরজা দিয়ে ঘরে ঢোকে সামিন,তার ঠিক পাশেই মুঈন দাঁড়িয়ে। আজ মুঈনকে সাথে করে নিয়ে এসেছে সে ব্রেকফাস্ট একসাথে করবে বলে।
ইনশিরাহ আঁতকে উঠতেই আলো আরো একটা খুন্তির বাড়ি মে'রে বলে,“উড়নচন্ডি মেয়ে কোথাকার। একটা কাজ জানে না!”
সামিন আলোকে ধ'ম'কে উঠে এগিয়ে যায়। আলো ঘুরে তাকাতেই থ'ম'কে যায়। মুঈন চোখ বড় বড় করে মায়ের হাতে ইনশিরাহকে মা'র খেতে দেখছিলো। তার দু'চোখে বিস্ময় এবং বেশ হাসি পেলো হঠাৎ।
আলো মুঈনকে দেখে ভীষণ লজ্জা পেয়ে এক হাত থেকে খুন্তি ফেলে দেয়। এক হাত মেয়ের চুলের মুঠি থেকে ছাড়িয়ে নেয়।
পরিস্থিতি থমথমে। আলো বিব্রত, এতো বড় মেয়ে মায়ের হাতে মার খাচ্ছে,এটা দেখে ছেলেটা কি না কি ভাবলো!
ইনশিরাহ কিছুই বলছে না। সে পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে, একবার পাপাকে দেখছে, একবার ঐ লোকটাকে। লোকটার মুখভঙ্গি গম্ভীর হলেও চোখ দিয়ে হাসছে যেন। নিশ্চয়ই খুব মজা পেয়েছে ইনশিরাহকে মা'র খেতে দেখে।
পাপার ওপর রাগ হলো হঠাৎ, সময়ে অসময়ে এভাবে বাইরের লোক নিয়ে আসতে হবে ঘরে? কে এই লোক!
সামিন আলোকে পুনরায় ধ'ম'কে ওঠে,“হয়েছেটা কি!”
আলো আমতা আমতা করে ঘটনা খুলে বলতেই সামিন আরো একটা লম্বা ধ'ম'ক দেয় আলোকে,“তো ওকেই বললে কেনো? আর কেউ ছিলো না?”
আলো জবাব দিলো না, জবাব দিয়ে কোনো লাভ নেই,শুধু শুধু মুঈনের সামনে পারিবারিক ঝগড়া হবে। তাই সে চুপ করে থাকে। মুঈনের দিকে তাকিয়ে হেসে এগিয়ে যায়,“বসো বাবা।”
সামিন বললো,“ও আর আমি ইয়ার্ডে যাচ্ছি। চা পাঠিয়ে দাও। আর আমার মেয়েকে কিছু বলবে না। খবরদার।”
মুঈনের সত্যি সত্যি খুব হাসি পাচ্ছে। আড়চোখে ইনশিরাহকে দেখলো, ব্লু-জিন্স, ঢিলেঢালা টি শার্টের ওপর ঢিলেঢালা স্ট্রাইপের শার্ট, বাটন খোলা। দাঁড়িয়ে আছে ছেলেদের মতো। মেয়েলি কোনো নমনীয়তা নেই। পুরো টমবয়। মুঈন মনে মনেই হেসে মনে মনে আওড়ায়,“সংস্কারী বাপের টমবয় কন্যা।”
সামিন মুঈনকে নিয়ে লিভিং রুমের বামদিকের দরজার কাছে যায়। মুঈন আবারও একবার ইনশিরাহর দিকে তাকায়, ইনশিরাহ কপাল কুঁ'চকে তাকিয়ে আছে তার দিকে। সে স্পষ্ট দেখছে লোকটা হাসছে দু'চোখ দিয়ে, তাকে এভাবে মার খেতে দেখে ভীষণ মজা পেয়েছে ঐ জাঁদরেল লোক।
সামিন আর মুঈন শান্তিনীড়ের ব্যাকইয়ার্ডে চলে যেতেই আলো মেয়ের দিকে তাকায়। কন্ঠস্বর পুরো পাল্টে সে আহ্লাদী হয়ে বলে,“যা মা, গোসল করে একটা ভালো সালোয়ার কামিজ পর। কি নোংরা হয়েছে গাঁয়ের জামাটা ইশশ!”
ইনশিরাহ ভড়কায়। মাম্মার দিকে চোখ বড়বড় করে তাকিয়ে আছে। এর আবার কি হলো!
আলো মেয়েকে ঠেলতে ঠেলতে সিঁড়ির দিকে পাঠিয়ে বলে,“যা বলছি!”
ইনশিরাহ কিছুই বুঝলো না তার মায়ের অস্বাভাবিক আচরণের কারণ টা কি। সিড়ি দিয়ে হেলে দুলে নামছিলো ইরফান। ইনশিরাহর দিকে তাকিয়ে বাঁকা হেসে বলে,“তোর মান ইজ্জত কিচ্ছু রইলো না ইশি। একজন এসপির সামনে মায়ের ঠ্যাঙ্গানি খাস। এসব হচ্ছে বড় ভাইকে সম্মান না করার ফল!”
ইনশিরাহ শীতল চোখে ইরফানের দিকে তাকিয়ে। ইরফান তার স্বভাব সুলভ বাঁকা হাসি হেসে ইনশিরাহর কপাল জোরে এক টোকা মেরে বলে,“তোর মানসম্মান এভাবেই সবার ঠ্যাঙ্গানি খেতে খেতে ধূলোয় মিশে যাক। আমিন।”
ইনশিরাহ দাঁড়ালো না। হন্তদন্ত হয়ে ঘরের দিকে ছোটে। মানসম্মান আজ ছিটেফোঁটাও যা ছিলো সব ধুলোয় মিশে গেলো। সামিনের ওপর খুব বিরক্তি লাগলো ইনশিরাহর। এভাবে রোজ রোজ ডেকে এনে বাইরের লোকটাকে জামাইআদর করার কি আছে? এতো পুলিশ-ফুলিশের সাথে খাতির রাখতেই বা হবে কেন! কেনো?
চলমান....
আমি এক বাচ্চার মা হয়েও এভাবে মাঝে মাঝে ঠ্যাঙ্গানি খাই আম্মুর।😟