ফন্ট সাইজ:
থিম:
বধূ কোন আলো লাগল চোখে ২

পর্ব 17

লেখক: ইসরাত ইতি

#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ ইসরাত ইতি ]
#পর্ব_১৭
#ইসরাত_ইতি

🚫কঠোর ভাবে প্রাপ্তমনস্কদের জন্য।

🚫শিক্ষা ও সাহিত্যের সাথে আমার এই কল্পিত ঘটনাগুলোর লিখিত শব্দগুলোর কোনো সম্পৃক্ততা নেই।

নাগোরকোট-দিনসংখ্যা ২

গতকাল দিনটা ইনায়া আর ছয় বান্ধবীদের খুব একটা যে ভালো কাটেনি তা বলাই বাহুল্য। প্রিতম গ্যাংয়ের সাথে দু দফায় ঝামেলার পরে যখন দেখলো উভয়ই একই হোমস্টেতে উঠেছে তখন ষোলোকলা পূর্ণ হলো।
এ নিয়ে দু পক্ষেরই আক্ষেপের শেষ নেই। উঠতে বসতে দেখা হচ্ছে। চোখে চোখে ত'র্ক হচ্ছে।

আজ সারাদিন ইনায়ারা নাগোরকোটের বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান, রাজবাড়ী, স্বর্ণমন্দির পরিদর্শন করেছে। সাথে করেছে গণেশা হিমাল লেকে নৌকা ভ্রমণ।
দুধারে সুউচ্চ পাহাড়, মাঝখানে সরু লেক। প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের লীলাভূমি।

মিসেস মৈথি ওদের গাইড করতে করতে খুব ক্লান্ত আজ। নেতিয়ে পরেছে খুব। যথেষ্ট বয়স হয়েছে,সেই সাথে সুগার ফল করে সন্ধ্যা থেকে নিজের রুমেই ছিলো সে। বাকিরা সবাই এক রুমে। পরিকল্পনা চলছে তাদের মধ্যে। নতুন পরিকল্পনা। নতুন এডভেঞ্চারের।

জানালা থেকে হাড় হিম করা ঠান্ডা বাতাস ঢুকছিলো ঘরের ঢেতর। জামি জানালা বন্ধ করে দিয়ে প্রিতমের দিকে তাকিয়ে বলে,“জ্যাকেট নিতে হবে সাথে।”

ল্যাপটপে কিছু কাজ করছিলো প্রিতম। বললো,“হু।”

কোণের একটা ডিভানে বসে প্রেমিকার সাথে চ্যাটিং করতে করতে শুভ বললো,“আমরা কটা নাগাদ বের হবো?”

_আরে সবুর কর। ফেস্টিভ্যাল শুরু হবে রাত দশটার পরে।

সাফওয়ান দুপুর থেকে ওয়াশরুমে ছুটছে। তার পেটে খানিক গোলমাল হয়েছে। তবুও সে বাকি তিনজনকে বলছে সে যাবেই। একটা এডভেঞ্চারও মিস করা যাবে না।

চারজন ভীষণ উত্তেজিত। বিছানার ওপর ট্রাভেল ব্যাগে ঢুকিয়ে নিয়েছে তাদের প্রয়োজনীয় সব কিছু। আজ নাগোরকোটে বিশাল ফেস্টিভ্যাল শুরু হয়েছে। সেখান থেকে তারা যাবে উত্তরের নুম্বুর মাউন্টেনে। সুরক্ষিত এরিয়া, একমাত্র যেখানে পর্যটকেরা ক্যাম্পিং করতে যায়।

ব্যাগের ভেতরে ঢুকিয়ে নিয়েছে ক্যাম্পিংয়ের সব প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। তাবু, স্লিপিং ব্যাগ,লাইট, পাওয়ার ব্যাংক।
ক্যাম্পিংয়ের সময় আর যেসব জিনিস ক্যাম্পিংয়ের স্থানভেদে সঙ্গে রাখা দরকার যেমন তোয়ালে, ব্যাক্তিগত ঔষধ, লাইটার, মশা নিরোধক ক্রিম, খাবার স্যালাইন, টুথপেস্ট, ব্রাশ, টিস্যু পেপার, সুইস আর্মি নাইফ, ছুড়ি, দড়ি,কাপ নুডলস, সবকিছু ভাগাভাগি করে ঠেসেঠুসে ওরা সাথে নিয়েছে।
পরিশেষে নিজেদের গায়ে চাপিয়েছে জ্যাকেট, যা শীত বাইরে!

হোমস্টের রিসিপসনিস্ট কে ইনফর্ম করে ওরা রাত নটা নাগাদ বেরিয়ে পরলো।

“রিমলাল” ফেস্টিভ্যাল। এখানকার আদিবাসীদের গত বহু বছর ধরে পালন করে আসা একটি ফেস্টিভ্যাল।
নাগোরকোটের একটি সংখ্যালঘু আদিবাসী সম্প্রদায়ের রাজা ছিলেন পমনলাল এবং তার রানী রিম্বুন।
রানী রিম্বুনকে ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন তিনি। প্রতি বছর তাদের বিবাহবার্ষিকীতে গ্রামে উৎসব পালন হয়। লোকে তার নাম দিয়েছে “রিমলাল।”

উত্তরের দু'টো গ্রামে আজ সারারাত ধরে চলবে এ উৎসব। এ রাতে এই গ্রামের উঠতি বয়সী পুরুষ নারী তাদের ঐতিহ্যবাহী গান নাচের পালায় অংশ নিয়ে সবার মনোরঞ্জন করে।

পর্যটক দল বেধে দেখতে যায়, এবং অংশ নেয় এই ফেস্টিভ্যালে।

ইনায়ার ছয় বান্ধবী ছিলো অনেক বেশি এক্সাইটেড। তবে ফেস্টিভ্যালটা রাত দশটার পরে শুরু হয় বিধায় মিসেস মৈথি কোনো ভাবেই সমর্থন করেনি ওদের। ওরা জেদ করলে উল্টো সবার বাড়ির লোককে ফোন করে ওদের ধ'ম'ক শুনিয়েছে।

কিন্তু দমাতে পারেনি কারও ইচ্ছাশক্তি। গোপন পরিকল্পনা প্রস্তুত। মিসেস মৈথির ঘুমিয়ে যাওয়ার অপেক্ষায় সবাই। অপেক্ষা দীর্ঘ হয়নি। ক্লান্তির কারনে মিসেস মৈথি দশটার মাঝেই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে যায়।

সবাই তখন ব্যস্ত ভঙ্গিতে প্রস্তুত হতে থাকে। নিজেদের স্বাভাবিক পোশাকের ওপর শীতের পোশাক চড়িয়ে,হালকা মেকআপ নিয়ে পার্স আর মোবাইল ফোন গুছিয়ে নেয়। জুনি মৈথির রুম টা বাইরে থেকে লক করে দেয়। বেশি সময় তারা থাকবে না। ঘন্টাদুয়েক আদিবাসীদের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান দেখে,ছবি তুলে চলে আসবে ব্যস।

★★★

নাগোরকোটের আঁকাবাঁকা উঁচুনিচু নিস্তব্ধ রাস্তা ধরে এগিয়ে চলেছে জীপ। এগিয়ে চলেছে তাদের রচিত নিকৃষ্ট পরিকল্পনা বাস্তবায়নে।

পরিকল্পনার মূল হোতা রেডম্যান স্বয়ং জীপের পেছনে অলস ভঙ্গিতে বসে আছে। তার পাশে গাউফুন। যে কিনা একটু পর পর রাস্তায় থুথু ছুঁড়ে মারছে।
এদের এই দলটাকে দেখে মনে হচ্ছে এরা ট্রাভেলার্স। পরেছে ভদ্র সভ্য পোশাক। যেন পাহাড়ে উঠে জোৎস্না স্নান করতে নেমেছে। গান শুনতে শুনতে এগিয়ে চলেছে গন্তব্যের দিকে।
অথচ মস্তিষ্কে এদের ভয়ংকর ক্ষুরধার পরিকল্পনা। জীপের পেছনের সিটের নিচে আগ্নেয়াস্ত্রগুলি গুছিয়ে রাখা তাদের।

হোটেল মাইস্টিক মাউন্টেন থেকে উত্তরের মহালাঙ্গু গ্রামে প্রিতমরা পায়ে হেঁটে পৌঁছালো।

ইতিমধ্যে ফেস্টিভ্যাল শুরু হয়ে গিয়েছে। দলে দলে যোগ দিয়েছে দেশি বিদেশি পর্যটক।
একটা বিশাল এরিয়া জুরে নাচ গানের আসর। আদিবাসীরা সেজেছে তাদের ঐতিহ্যবাহী সাজে। পর্যটকেরা তাদের সাথে ছবি তুলতে ব্যস্ত। ছাড়লো না জামিও। একজন অল্পবয়সী আদিবাসী পুরুষ নৃত্যশিল্পীকে বগলদাবা করে ধরে এনে দশ বারোটা ছবি তুলেছে। সবার সাথে খুবই সাবলীল ভাবে মিশে গেলো এই দলটি। অবশ্য এতে জামির অবদান অনস্বীকার্য।

ইনায়ারা ছয় বান্ধবী পৌঁছেছে প্রিতমদের পৌঁছানোর খানিক পরে। নাচ গান তখন শুরু হয়ে গিয়েছে। ছয় বান্ধবী তাদের পার্স থেকে ব্যস্ত হাতে যার যার আইফোন বের করে ভিডিও রেকর্ডিং চালু করে দেয়।

আদিবাসীদের নাচ গান আর বিনোদনে মুখরিত মহালাঙ্গু পাড়া। পর্যটক এবং স্থানীয় দর্শকদের হাত তালিতে উৎসব যেন আরো রঙিন হয়ে উঠেছে।

রাজা পমনলাল আর রানী রিম্বুন কেউই জীবিত নেই। তাদের উত্তরসূরীরা নিজেদের আসনে বসে পর্যটকদের অভিবাদন জানাচ্ছে।

আয়োজন করা হয়েছে হরেক রকম খাবার আর পানীয়ের। রঙখেলারও বিশেষ আয়োজন হচ্ছে।

প্রিতম বা ইনায়া, দু'পক্ষের কেউই ভিড়ের মাঝে কাউকে দেখে ওঠেনি তখনো। যদি দেখতো তবে আজকের আনন্দেও ভাটা পরতো তাদের বরাবরের ন্যায়।

রাত তখন বারোটার কাছাকাছি। ইনায়া বারবার ঘড়ি দেখছিলো। ওদের সবার সাথে পাল্লা দিয়ে “সাহসী সাহসী” ভাব দেখালেও সে অনেক ভীতু। এটা একটা গ্রামাঞ্চল, তার ওপর মৈথি আন্টিকে না বলে,কোনো প্রকার সুরক্ষা ছাড়াই এখানে এতো রাতে চলে আসাটা রোমাঞ্চকর বটে,তবে বিপদজনকও।

পর্যটকরা ধীরে ধীরে ফাঁকা করে যাচ্ছে মহল্লা,ইনায়া দেখছে। ওদের পাঁচজনকে যথেষ্ট খোচালেও ওরা কোনো তাড়া দেখালো না। মগ্ন হয়ে উপভোগ করছে নৃত্যানুষ্ঠান।

ইনায়া অগত্যা কিছুক্ষণ বসে রইলো। তারপর ফিসফিসিয়ে রুশফিকে বললো,“ওয়াশ রুম যাবো।”

_তো যা না।

_ভয় করছে।

_ন্যাকামি করিস না তো। ঐ সাইডেই ওয়াশরুম। কিছু হবে না।

ইনায়া আর কথা বাড়ালো না, এমনিতেও সে বেশি আহ্লাদীপনা,ন্যাকামি করে এটা তাকে বারবার শুনতে হয় তার ভীতু স্বভাবের জন্য।
কথা না বাড়িয়ে সে উঠে দাঁড়ালো। তারপর চলে গেলো ওয়াশরুমের দিকে।

পুরুষ ও নারীদের জন্য আলাদা আলাদা ওয়াশরুম। ওয়াশরুমের সামনে সিরিয়াল দেখে বিরক্তি ফুটে উঠলো তার গোটা মুখে। লম্বা একটা লাইন। প্রত্যেকের বড্ড তাড়া। এদের কাছে রিকোয়েস্ট করলে কোনো লাভ হবে বলে মনে হয়না। ঠায় দাঁড়িয়ে থাকলো ইনায়া।
যখন তার পালা এলো, হুরমুর করে ঢুকে পড়লো ওয়াশরুমে। গলায় পেঁচানো স্কার্ফ টা নাকে চেপে ধরলো। ওয়াশরুম টা বেশ অপরিচ্ছন্ন তাই।

সময় গড়াতে থাকলো। বাইরে থেকে ভেসে আসছিলো আদিবাসীদের গানের সুর। হঠাৎ বিকট শব্দে সব কিছু স্তব্ধ হয়ে যেতেই শিউরে ওঠে ইনায়া। জলদি জলদি নিজেকে সামলে নিয়ে উঠে দাঁড়ায়।
বাইরে ভীষণ আওয়াজ হচ্ছে। মনে হচ্ছে গুলির শব্দ। ইনায়ার গোটা শরীর কাঁপুনি দিয়ে উঠলো। চেঁচামেচির আওয়াজ শুরু হলো হঠাৎ।
দু্র্গন্ধময় অন্ধকার ওয়াশরুমে দাঁড়িয়ে কাঁপছে সে। কি করবে এখন! বেড়িয়ে দেখবে?
কাঁপা কাঁপা হাতে ইনায়া ওয়াশরুমের লক টা খুলে বাইরে পা রাখতেই তার গোটা দুনিয়া কেঁপে উঠলো যেন।

বারো-তেরোজন লম্বা লম্বা লোক মহল্লা প্রাঙ্গণে পায়চারি করছে। তাদের হাতে আগ্নেয়াস্ত্র। শরীরে তাদের কালো রঙের উর্দি জাতীয় পোশাক, মুখে প্লাস্টিকের মাস্ক। লোকজন ছোটাছুটি করছে। সবার জীবন বাঁচানোর তাড়া।

ইনায়া কাঁপছে। অসহায়ের মতো আশে পাশে তাকাচ্ছে সে। ওরা কোথায়। সে কি একা! এখন কি হবে! এই লোকগুলো কারা! এদের হাতে অস্ত্র কেন!
অসংখ্য প্রশ্ন একই সাথে জটলা পাকালো ওর মস্তিস্কে। উত্তর পাবার আগেই চোখের সামনে দেখলো ঐ তেরো জন উর্দিধারী লোকের মধ্যে একজনের ছোড়া গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে গেলো এক বৃদ্ধ।

দুহাতে মুখ চেপে ধরলো ইনায়া। তবে চেঁচালো না, চেঁচানোর সুযোগও পেলো না। লুটিয়ে পরলো মাটিতে।

★★★

এটা একটা লম্বা সময়ের ঘুম ছিলো? নাকি সে কোনো টাইমলুপে আটকে গিয়েছিলো?
বুঝতে পারছে না প্রিতম। চোখ মেলে চাইলো সে। তার অবস্থান সম্পর্কে সে দ্বিধায় ভুগছে। তার কোথায় থাকার কথা ছিলো? তারা তো নেপাল ঘুরতে এসেছিলো ! তারপর এয়ারপোর্ট, রেস্তোরাঁ ওয়ান্স আপন আ টাইম, একটা মেয়ের ব্যাগ, পাহাড় দিয়ে লাফিয়ে বাঞ্জি জাম্পিং, আদিবাসীদের নৃত্য। বিভিন্ন দৃশ্য এলোমেলো ভাবে তার মস্তিষ্কে চাপ সৃষ্টি করছে। প্রিতম আর কিছু ভাবলো না। দু'চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইলো। আবছা অন্ধকারে সে পরে আছে শক্ত মেঝেতে।
কব্জিতে ব্যাথা অনুভব করছে, হাত বাঁধা তার। নড়েচড়ে উঠলো প্রিতম। কপালের কাছটাতে তীব্র ব্যাথা অনুভব করছে। একই সাথে কনুইয়ের ভাঁজে চিনচিনে ব্যাথা, ইনজেকশন লাগালে যেমন অনুভূত হয় ঠিক সেরকম।
হাতদুটো বেশ শক্ত করে বেঁধে রাখা। কাঁধে একটা ব্যাগ জাতীয় কোনো বোঝা তার। কাত হয়ে পরে আছে সে।

আধো অন্ধকারে আশেপাশের কোনো দৃশ্য স্পষ্ট নয়। শুধু কিছুক্ষণ পর পর অস্পষ্ট “কুইকুই” আওয়াজ হচ্ছে।

প্রিতমের মস্তিষ্ক সজাগ হয়। মনে পরছে তার। তারা ছিলো রিমলাল ফেস্টিভ্যালে। নাচ গান চলছিলো। তাদের ওখান থেকে ক্যাম্পিংয়ের উদ্দেশ্যে রওনা দেওয়ার কথা ছিলো।

জামির খিদে পেলো হঠাৎ,প্রিতম তাকে নিয়ে খাবারের স্টল গুলোর কাছে যাচ্ছিলো, তখনই একটা ব্লাস্ট হয় আশেপাশে কোথাও। লোকজন বিভ্রান্ত হয়ে ছুটছিলো, পনেরো ষোলোজনের একটা দল এসে বেছে বেছে কয়েকজনকে আটকে ফেললো। হাতে ছিলো আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র।
জামি আর সে খাবারের স্টলের কাছ থেকে দূরে সরে গিয়ে সাফওয়ানদের খুঁজতে লাগলো, জামি দৌড়াতে না পেরে হোঁচট খেয়ে পরে গেলো। প্রিতম তাকে তুলতে গিয়েছিলো ঠিক তখনই পেছন থেকে মাথায় তীব্র আ'ঘাত লাগে তার।

কি হয়েছে, কেনো হয়েছে এতো কিছু খতিয়ে দেখলো না প্রিতম। সে বিপদে পরেছে। ঘোর বিপদে পরেছে, এতটুকু বুঝতে কষ্ট হলো না।

জামি, সাফওয়ান, শুভ। ওরা কোথায়! ওরা ঠিক আছে তো!

অন্যপাশে কাত হয়ে শুতে চাইলো প্রিতম। লাভ হলো না,যারা ওর হাত দু'টো বেঁধেছে তারা কাঁধ থেকে ওর ব্যাগটা পর্যন্ত সরিয়ে নেয়নি। বেশ শক্ত করে বেঁধে ফেলেছে।

আচ্ছা জামি তো ওর সাথে ছিলো,জামি কি এখনও তার সাথে আছে? অন্ধকারে কিছুই বোঝার উপায় নেই। প্রিতম যন্ত্রণা দাঁতে দাঁত চেপে সহ্য করে দুর্বল ভারি আওয়াজে ডাকলো,“জামি?”

জামি কোনো জবাব দিলো না। শুধু অন্ধকার এই ঘরটির এক কোণ থেকে ভেসে আসলো অস্ফুট আওয়াজ,“কুই কুই।”

★★★

নেপালি সময় ভোর চারটা আঠেরো মিনিট।

উত্তাল নাগোরকোট। ইতিমধ্যে সেনাবাহিনীর দু'টো বিশেষ টিম এসে পৌঁছেছে সেখানে। মহালাঙ্গুতে পেতেছে শক্ত ঘাঁটি। চলছে খোঁজ।

তিনজনকে হত্যা,তেরোজন টুরিস্ট মিসিং। বন্দি বানিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে তাদের। ছানবিন চলছে পুরো শহর জুড়ে। ছয় ঘণ্টা পেরিয়ে গিয়েছে ইতিমধ্যে। পুরো দেশ সরব হয়ে উঠেছে এই ঘটনায়।

রুশফি,রিন্তু,নিধি,সাইমা,জুনি কাঁদছে। কাঁদছে মিসেস মৈথি। ইনায়াকেও বন্দি করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ব্লাস্টের পরেই ওরা পাঁচজন একই সাথে নিজেদের বাঁচিয়ে নিয়ে পালাতে সক্ষম হয়েছিলো। ইনায়ার কথা কারো মাথাতেই ছিলো না। এখন? কি হবে এখন?
কাঁদতে কাঁদতে মুর্ছা যাচ্ছে ওরা মহালাঙ্গুতে আর্মি চেকপয়েন্টের পাশে দাঁড়িয়ে। যে তেরজন ট্যুরিস্টকে হস্টেজ বানিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে তাদের সাথের মানুষগুলো ভেঙে পরেছে খুব। বিভিন্ন প্রদেশ থেকে ছুটে আসছে সাংবাদিক, দুই হাজার পঞ্চাশে এই টুরিস্ট হস্টেজ ইস্যুটা সম্ভবত আরেকটি আন্তর্জাতিক ইস্যু হতে চলেছে।

শুভ আর সাফওয়ান পরে আছে জড়বস্তুর মতো, দুই বন্ধু মিসিং। জামি এবং প্রিতম কারোরই কোনো খোঁজ তারা পায়নি ব্লাস্টের পরে। ধারণা করা হচ্ছে ঐ তেরোজনের মধ্যে তাদের দুই প্রান প্রিয় বন্ধুও রয়েছে। কি করবে কিছুই বুঝতে পারছে না সাফওয়ান এবং শুভ। জামির মা আর প্রিতমের বোনদের কি জবাব দেবে তারা?

★★★

কিছুক্ষণ পরপর “কুইকুই” আওয়াজ টা হচ্ছে। প্রিতম আবারও ডাকে,“জামি শুনতে পাচ্ছিস?”

“কুইকুই”
শব্দটা আবার হলো। কারো মুখ বেঁধে রাখা হয়েছে। দুমিনিট নিস্তব্ধতা ঘিরে থাকে বদ্ধ এই ঘরে, তারপর একাধিক ব্যক্তির বুটের আওয়াজ বাইরে । অচেনা কোনো ভাষাতে অস্পষ্ট কিছু আলাপ শেষে তিন থেকে চারজন এদিকেই ছুটে এলো মনে হলো।

প্রিতম চুপচাপ পরে থাকে। হঠাৎ ঘরের বাতি জ্বলে ওঠে। দীর্ঘসময় পরে আচমকা ছুটে আসা আলোর ঝলকানিতে চোখ খিচে যায় প্রিতমের। নিজেকে ধাতস্থ করে প্রিতম চোখ মেলে তাকায়।

তার ওপর ঝুঁকে ছিলো তিনজোড়া চোখ। তিনজন ব্যক্তির মুখ ঢাকা মাস্কের নিচে। চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখছিলো প্রিতমকে। প্রিতম কয়েক মূহুর্ত ওদের দিকে তাকিয়ে থেকে আশেপাশে তাকাতেই শিউরে ওঠে।

জামি ওর পায়ের কাছেই পরে আছে। হাত পা বেঁধে রেখেছে ওরা জামির। ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা আরো বন্দি। তাকে নিয়ে দশবারোজন তো হবেই। প্রিতমের মুখ দিয়ে কোনো কথা বেরোচ্ছে না। ঘাড় ঘুরিয়ে সে ডানে তাকাতেই একটা ধাক্কার মতো খায়।

একজোড়া নিকষ কালো,টলটলে চোখ তার দিকে তাকিয়ে আছে। হাত পা বেঁধে যাকে দেয়ালে ঠেস দিয়ে বসিয়ে রাখা হয়েছে।

এতক্ষণ এই ব্যক্তিই তবে “কুঁইকুঁই” আওয়াজ করছিলো। কেননা বাকিরা সবাই অচেতন।

চোখ দু'টো প্রিতমের অল্পস্বল্প পরিচিত। দুদিন হলো ঐ চোখের সাথে তার পরিচয় হয়েছে। অযাচিত ভাবে, বারবার সামনে এসেছে। চোখ দু'টোর মালিক ইরফান মির্জার ছোটো বোন। জামির মতে যে নিব্বি।

প্রিতমের দিকে তাকিয়ে আছে ইনায়া। মুখে স্কচ টেপ লাগিয়ে রেখেছে তার। দম বন্ধ হয়ে আসছে তার, চোখ বেয়ে পানি পরছে।
প্রিতম ইনায়ার থেকে চোখ সরিয়ে লোকগুলোর দিকে তাকালো। প্রত্যেকের সাথে আধুনিক অস্ত্রসস্ত্র। প্রিতম জিভ দিয়ে নিজের ঠোঁট ভিজিয়ে নিয়ে লোক তিনজনকে স্পষ্ট ইংরেজিতে বললো,“কি চাও তোমরা? কারা তোমরা?”

লোক তিনজন একে অপরের দিকে তাকালো, ওদের মধ্যে থেকে একজন প্রিতমের দিকে তাকিয়ে ইংরেজীতেই বরফ ঠাণ্ডা গলায় জবাব দিলো,“আমরা? আমরা শান্তির দূত। আর সত্যি বলতে তোমাদের কাছ থেকে আমরা কিছুই চাই না, চাই এই রাষ্ট্রের থেকে। চাপ নিও না। বিশ্রাম করো।”

প্রিতম বুঝলো না কিছুই। আবারও ঘাড় ঘুরিয়ে ইনায়াকে দেখলো। মেয়েটা কেমন নিস্তেজ হয়ে পরে আছে, নিশ্চুপ চোখের জল ফেলছে।

লোক তিনজনের মধ্যে থেকে দুজন চলে যায়। দাঁড়িয়ে থাকে একজন। প্রিতম নড়েচড়ে উঠতে চাইলে ওর দিকে পিস্তল তাক করে লোকটা বললো,“বিশ্রাম নিতে বলা হয়েছে।”

_চাচ্ছো কি তোমরা?
দুর্বল কন্ঠে প্রিতম বললো।

_গঙ্গোপ্পোকে।

প্রিতম খানিকটা হতভম্ব হয়ে তাকায় লোকটার দিকে। কয়েক পল তাকিয়ে থেকে বলে,“গঙ্গোপ্পো?”

_হু। কথা কম।

_তোমরা কারা? গাউফুন টিম? টেররিস্ট?

লোকটা খানিক হাসলো, তারপর বললো,“তোমাকে দেখেই বুদ্ধিমান কেউ মনে হয়েছে। ভিনদেশী হয়ে গাউফুনের টিমকে আন্দাজ করে নিলে,অনেক কিছুরই খোজ রাখো দেখছি। শোনো তবে তোমাকে আরেকটা ইনফরমেশন দিই, বেশি প্রশ্ন গাউফুনের পছন্দ না।”

শেষের কথাটা দৃঢ় ভাবে বলে লোকটা। তারপর চলে যায় ঘর থেকে।

বাইরে আরো অনেক লোকের অস্তিত্ব বিদ্যমান, কানে আসছে প্রিতমের। সে আবারও ঘাড় ঘুরিয়ে ইনায়াকে দেখলো। একই ভাবে ইনায়া তাকিয়ে আছে তার দিকে। কাঁদছে সে।

প্রিতম একটা গভীর নিঃশ্বাস ফেলে। ইনায়ার দিকে তাকিয়ে বলে,“এটা তোমার আমার জীবনের বিগেস্ট এডভেঞ্চার হতে চলেছে শত্রুর বোন। যার পরিনতি সম্ভবত মৃত্যু।”

চলমান....

প্রিয় পাঠকেরা, এই গল্পটা খুবই সাধারণ একটি গল্প। চার ভাইবোনের জীবনসঙ্গী খুঁজে পাওয়ার গল্প, চারজন নারীর বধূ হওয়ার গল্প।
এটা কোনো থ্রিলার না। কোনো সাসপেন্স বা টুইস্টও নেই। আপনাদের চ'ম'কে দেবে না। এটা সাধারণ ভাবে এগোবে। আপনাদের কতটুকু খুশি করতে পারছি ঠিক জানি না, তবে দয়াকরে এতো আশা রাখবেন না গল্পটা নিয়ে। খুবই খুবই খুবই সাধারণ প্লট।

মতামত জানাবেন।#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_১৭ [ বর্ধিতাংশ ]
#ইসরাত_ইতি

[ পর্ব ১৭ বর্ধিতাংশ ]

মিসেস মৈথি কাঁদতে কাঁদতে অসুস্থ প্রায়। এ কান্না গ্লানির, অপরাধবোধের। কি জবাব দেবে মির্জা পরিবারকে? অভিভাবক হিসেবে সে ব্যর্থ প্রমানিত হয়েছে, তার গাফিলতির জন্য একটা মেয়ের প্রাণ সংশয়ে আজ।
সে কিছু ভাবতে পারছে না আর। শরীর তার অবশ প্রায়। নিজের মেয়েকে মারধোর, গালিগালাজ করার পরে যথেষ্ট অসুস্থ হয়ে পরেছে সে। এতো চাপ শরীর নিতে পারেনি।
আর্মি চেকপয়েন্টে একটা চেয়ারে গা এলিয়ে দিয়ে পরে আছে সে।
ইতিমধ্যে সেখানে এসে পৌঁছেছে মৈথির বাবা, মৈথির ভাই।
মৈথি কোনো সান্ত্বনা খুঁজে পাচ্ছে না,অন্যের সন্তান হারানোর দায় আজীবন তাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাবে।

মাম্মার চ'ড় খেয়ে জুনি এককোণে নিরব হয়ে পরে আছে। ওরা পাঁচজনই বুঝতে পেরেছে ওদের ভুল, তবে লাভ কি? এখন তো কোনো লাভ নেই।
হাঁটু মুড়ে বসে কাঁদছে বাকিরা। মেয়েটার কিছু হলে তারাই হবে দোষী।

মাশরার আওরঙ্গজেব মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। মৈথি অস্ফুটে বললো,“কি করবো বাবা? এখন আমি কি করবো?”

মৈথির ভাই মুহজীদ এগিয়ে এলো, পেশায় তিনিও একজন পুলিশ কর্মকর্তা, কাটমুন্ডু ব্রাঞ্চ। মৈথিকে বললো,“জানিয়ে দাও,তাদের জানা উচিত। মনকে শক্ত করো।”

মৈথি পারছে না মনকে শক্ত করতে। সে শূন্যে তাকিয়ে আছে। আজীবনের তরে অপরাধী হয়ে গেলো সে তবে।

দেশের উপরমহল গরম হয়ে উঠেছে। ইতিমধ্যে নাগোরকোট থেকে লাইভ টেলিকাস্ট হচ্ছে নিউজ। তিনটা স্পেশাল টিম খোঁজে নেমেছে ওদের। তবে যে বেশ দেরি হয়ে গিয়েছে। চতুর এবং হিংস্র গাউফুন টিম। টেরোরিস্টদের উদ্দেশ্য সবার কাছে পরিষ্কার। এখন তারা অপেক্ষায় আছে গাউফুন টিম থেকে আসা চিঠির। পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সাথে কথা হয়েছে সাংবাদিকদের। তার মন্তব্য, পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এখন শুধু ওদের খোঁজ চলুক।

★★★

নেপালের এই উত্তাল আবহাওয়া তখনও টের পায়নি মির্জা পরিবার। গতরাতে ইনায়ার সাথে যখন ভিডিও কলে কথা হয়েছিলো বাড়ির সবার,তখন তারা বিন্দুমাত্রও টের পায়নি ইনায়া বান্ধবীদের সাথে মিলে তাদের সাথে মিথ্যাচার করেছে।

হাসিমুখে ইনায়াকে “গুড নাইট” জানিয়ে নিশ্চিন্ত মনে ঘুমোতে গিয়েছে সবাই।

এখন সময় সকাল আটটা।
ব্রেকফাস্ট টেবিলে মির্জা পরিবারের ছোট-বড় সবাই। কথা হচ্ছিলো ইনায়াকেই নিয়ে। পরী মেয়েকে কল করতে চাইলে বাঁধ সাধে ইশমাম,বলে,“মেয়েটা কাল রাতে বললো মাথা ব্যাথা করছে,ঘুমাবে। এখন তো মাত্র আটটা বেজেছে। কল করো না ‌। আরো পরে।”

পরী আর করলো না ফোন। ব্রেকফাস্ট সেরে ইহান শুভ্র পাঞ্জাবির হাতা গুটিয়ে নিতে নিতে বাড়ির পার্কিং হাউজের দিকে যাচ্ছিলো। গত রাতে ঘুম হয়নি ঠিকভাবে, খানিকটা বিধ্বস্তই লাগছে তাকে। গাড়ির কাছে গিয়ে ইহান দেখলো সে চাবি আনেনি গাড়ির। ঘুরে দাঁড়াতেই হঠাৎ তার ফোন বেজে উঠলো, মিসেস মৈথির ফোনকল। ইহানের ভ্রু কুঞ্চিত হয়। সকাল সকাল আন্টির ফোন কেন! আবার কি উল্টোপাল্টা আবদার করছে ইনায়া। বড় বাবা আর ছোটো বাবা ওর ইমোশনাল ব্ল্যাকমেলিংয়ে গলে গিয়ে ট্যুরে যাওয়ার অনুমতি দিয়ে ঝামেলায় ফেলেছে ইহানকে। ওখানে গিয়ে উড়ছে বেশ, ধমকাতে হবে আচ্ছা মতো।

★★★

ইনায়া একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে প্রিতমের দিকে। প্রিতমের বলা শেষ কথাটা “যার পরিনতি সম্ভবত মৃত্যু।” শুনে ইনায়ার কান্না থেমেছে।

খুব কাছ থেকে মৃত্যুর গন্ধ নিচ্ছে সে, ওদের হাতের ঐ আগ্নেয়াস্ত্র গুলি, এখানে থাকা প্রত্যেকের ভয়াবহ মৃত্যুদুত। একটা বুলেটে ইনায়াসহ এখানের সবাই শেষ, আর কি দেখতে পাবে উন্মুক্ত ধরনীকে?

এজন্য বুঝি ইনায়া সেদিন এতোটা উগ্রতা দেখিয়েছে বড় বাবার সাথে? ওকে মৃত্যু টানছিলো। বেশ হয়েছে। আক্ষেপ নেই ইনায়ার। সবার সাথে বেয়াদবি করার ফল পাচ্ছে সে।
কিন্তু পরক্ষণেই কান্না পেয়ে গেলো, সামান্য বেয়াদবির শ্বাস্তি মৃত্যু?

প্রিতম ইনায়ার থেকে চোখ সরিয়ে নেয়। মেয়েটাকে দেখেই মনে হচ্ছে মনে মনে মেয়েটা শেষ,এভাবে সরাসরি মৃত্যুর কথাটা বলা উচিত হয়নি।

তারা যে রুমে আটক,সেখানের জানালার ফাঁক দিয়ে ভোরের আলো ভেতরে ঢুকছে। এখন আর রুমটা অন্ধকার নয়। বেশ আলো আছে।

প্রিতম ঘাড় ঘুরিয়ে একে একে রুমের সবার দিকে তাকায়। এদের সে চেনেনা, নিশ্চয়ই তার মতো কোনো ট্যুরিস্ট। জেগে উঠেছে সবাই। হাত বাঁধা অবস্থাতেই নড়েচড়ে উঠে বসেছে, ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে প্রিতমের দিকে।

হঠাৎ নাক ডাকার আওয়াজ হয়। বিকট, অদ্ভুত, কুৎসিত শব্দে আ'ত'ঙ্কি'ত,ভীত বন্দীরা চ'ম'কে ওঠে। চমকায় ইনায়া। প্রিতম শুধু স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বসে আছে।

জামি নাক ডাকছে। এখন অবধি সে টের পায়নি তার সাথে কি হয়েছে। যে ইনজেকশনটা ওকে পুশ করা হয়েছিলো তাতে লম্বা ঘুম হয়েছে তার।

জামির নাক ডাকার শব্দ জোরালো হয়। সবাই এবার বেশ বিরক্ত,এমনিতেই জান নিয়ে টানাটানি তার ওপর এই শব্দদূষণ, মৃত্যুর আগে শেষবারের মতো মনোযোগ দিয়ে যার যার সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনাও করতে পারছে না তারা।

প্রিতম সবার অভিব্যক্তি বুঝলো। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে পায়ের কাছে শুয়ে থাকা জামিকে খুঁচিয়ে বললো,“জামি ওঠ।”

জামি অস্ফুটে কি যেনো বলে আবারও তন্দ্রায় তলিয়ে গেলো। প্রিতম দাঁতে দাঁত চেপে পা দিয়ে জামির পেটে সুরসুরির মতো দিতেই জামির ঘুম ভাঙলো হাসতে হাসতে। ঘুম ঘুম চোখে বললো,“জালাচ্ছিস কেনো, মিশফাকে স্বপ্নে দেখলাম। ওর স্বামী ওকে গুলি করেছে।”

_গুলি খাবো একটু পর আমরা, চোখ মেলে তাকা ইডিয়ট।

★★★

ইহান শান্ত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রইলো কিছুক্ষণ। শরীরটা ভীষণ দুর্বল লাগছে ব'লিষ্ঠদেহী ঐ মানুষটার। একটা দম নিয়ে সে হন্তদন্ত হয়ে ঘরের দিকে ছুটলো, হঠাৎ আবার ফিরে আসাতে আলো,রিতু,পরী বেশ অবাক হলো। ইহান ওদের সামনে দাঁড়ালো না, সোজা দোতলায় চলে গেলো।

ইরফান নিজের ঘরেই ছিলো,দাদানকে নিজের ঘরে দেখে অবাক চোখে তাকালো। ইহান সরাসরি ওর সামনে গিয়ে বললো,“পাসপোর্ট বের কর। দু'টো টিকিট কাট। আমরা নেপাল যাচ্ছি।”

ইরফান ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে, গা ছাড়া ভাব নিয়ে বললো,“নেপাল কোন দুঃখে? ট্যুর? তবে চলো সুইজারল্যান্ড যাই।”

ইহান ভাইয়ের দিকে শান্ত চোখে তাকিয়ে আছে,অত্যন্ত ধীরে সে বললো,“ইনায়াকে পাওয়া যাচ্ছে না ইরফান । ফাস্ট। আমাদের সময় নেই।”

ইরফান বোকার মতো তাকিয়ে আছে দাদানের দিকে। তার মনে হলো হঠাৎ কেউ তার গায়ে তীর ছুঁড়লো। একপাশে হেলে পরেছে যেন।

ইহান অত্যন্ত স্বাভাবিক, উঁচু গলায় ডাকতে থাকে ইনশিরাহকে। ইনশিরাহ ছুটে আসে। সে ভীষণ অবাক হলো দাদান এভাবে ডাকাতে। ইহান ঘরের দরজা ভেজিয়ে দিয়ে বলে,“
যা বলছি কোনো রিয়াক্ট না করে চুপচাপ শুনবি। ইনুকে পাওয়া যাচ্ছে না। আমি আর ইরফান নেপাল যাচ্ছি। এখানের সব দায়িত্ব তোর। ছোটো বাবা আর ছোটো মা যাতে টের না পায় কিছু,ভুলিয়ে রাখবি তাদের। সব নিউজ চ্যানেল ব্লক করে রাখ। সব ধরনের নেটওয়ার্ক কানেকশন কিছু সময়ের জন্য অফ করে রাখ। পাপা আর বড় বাবাকে আমি বলবো। মাম্মা আর বড় মাকে তুই সুযোগ বুঝে বলে দিস। এখন ওনাদের ইমোশনাল সিন সহ্য হবে না আমার।”

ইনশিরাহ তাকিয়ে আছে দাদানের দিকে, তারপর তাকায় ইরফানের দিকে।
ইরফানকে কেমন উদ্ভ্রান্ত লাগছে, পাসপোর্ট বের করে অনলাইনে টিকিট কাটছে। সবকিছু করছে রোবটের মতো। লাফিয়ে লাফিয়ে তার শার্ট গায়ে চাপিয়ে ইহানকে বলে,“চলো। ফাস্ট।”

ইনশিরাহ শুধু ওদেরই দেখছে। ইহান তার বোনের দিকে তাকিয়ে বলে,“লুক ইশি। জানি কাজটা খুব টাফ হবে তোর জন্য। বাট করতেই হবে তোর। কিচ্ছু হবে না আমাদের ইনুর।”

কেঁপে উঠে মুখ চে'পে ধরলো ইনশিরাহ, বি'কট চিৎকার গোঙানির মতো শোনালো ওর। ইহান বোনের দিকে সহানুভূতির দৃষ্টি দিয়ে তাকায়। ইরফান চেঁ'চি'য়ে ওঠে ইহানের ওপর,“প্লিজ চলো দাদান ও সামলে নেবে। প্লিজ!”

★★★

জামি তড়াক করে চোখ মেলে তাকালো। দুমিনিটের মতো আশেপাশে তাকিয়ে যখন কিছুই বুঝলো না তখন প্রিতম বললো,“আমাদের কিডন্যাপ করা হয়েছে।”

জামি বড় বড় নিশ্বাস নিচ্ছে। এতক্ষণে সব তার মনে পরেছে। হাঁপাতে হাঁপাতে আশেপাশে তাকায় সে, সব অপরিচিত মুখ। ঘুরেফিরে চোখের দৃষ্টি ইনায়ার দিকে যেতেই জামি আঁতকে উঠলো ভীষণ,অতটা চ'মকায়নি সে কিডন্যাপ হবার খবর শুনেও।

মুখ হা হয়ে গেলো ওর, বললো,“এখানেও তুমি?”

ইনায়া তাকিয়ে আছে। চোখের দৃষ্টি ঘোলাটে তার। মুখ এভাবে দীর্ঘসময় ধরে বন্ধ। পানির তেষ্টা পেয়েছে ভীষণ।

প্রিতম চুপচাপ বসে আছে। হঠাৎ একজন বন্দি বলে উঠলো,“ওরা কারা যারা আমাদের আটকেছে?”

প্রিতম মেঝের দিকেই দৃষ্টি দিয়ে বললো ,“গঙ্গোপ্পোর লোক!”

_গঙ্গোপ্পো? সুরিনামের গঙ্গোপ্পো?

_হু।

_কিন্তু তার তো ফাঁসির রায় হয়েছে।

_ওরা গঙ্গোপ্পোর লোক। আমাদের সবাইকে হস্টেজ বানিয়েছে।

লোকগুলোর মুখ হা হয়ে গেলো। মৃত্যুর ভয়ে তারা এমনিতেই অস্তির। তার ওপর এই টেরোরিস্টদের নাম!

একজন কান্নামিশ্রিত কন্ঠে বললো,“কিন্তু আমাদের কেনো কিডন্যাপ করলো? আমরা তো বিদেশী!”

প্রিতম বিরক্ত হয়ে বললো,“বোকা আপনি? বুঝতে পারছেন না? এটা এখন আন্তর্জাতিক ইস্যু হয়ে দাঁড়াবে। আমাদের দেশগুলো থেকে নেপাল সরকারকে চাপ দেওয়া হবে। আমাদের জানের বিনিময়ে গঙ্গোপ্পোর মুক্তি।”

কথা বাড়ালো না আর প্রিতম, একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো শুধু। বোন দু'টোর মায়াবী মুখগুলো চোখের সামনে ভেসে উঠছে বারবার।

তখনই কানে ভেসে এলো ইনায়ার,“কুইকুই” আওয়াজ।

ওরা সবাই ইনায়ার দিকে তাকালো। ইনায়া কাঁদছে।

প্রিতম সহানুভূতি মাখা চোখে ওর দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে চোখ সরিয়ে নেয়। জামি চোখে মুখে বিরক্তি ভাব ফুটিয়ে বলে,“তুমি কি করছিলে ঐখানে অত রাতে? নিশ্চয়ই ফরফর করে উড়তে বেরিয়েছিলে।”

প্রিতম জামির দিকে রাগী চোখে তাকালো। জামি থামলো না, বলতে লাগলো,“আর তোমার মুখে কি হলো? ওরা আমাদের মুখে তো স্কচ টেপ মারেনি। নিশ্চয়ই ফটর ফটর করছিলে বেশি?”

_জামি স্টপ!
প্রিতম ধ'ম'কে ওঠে। জামি দমে যায়। ইনায়া নিশ্চুপ কেঁদেই যাচ্ছে। বন্দিদের মধ্যে থাকা বাকি বিদেশি মেয়ে গুলোও কাঁদছে।

জামি কিছুক্ষণ উ'শ'খু'শ করে প্রিতমকে ফিসফিসিয়ে বলে,“ও তোর পিছু নিচ্ছে না তুই ওর পিছু নিচ্ছিস?”

চলমান.......

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 17 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন