ফন্ট সাইজ:
থিম:
বধূ কোন আলো লাগল চোখে ২

পর্ব 18

লেখক: ইসরাত ইতি

#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_১৮
#ইসরাত_ইতি

🚫কঠোর ভাবে প্রাপ্তমনস্কদের জন্য।

🚫শিক্ষা ও সাহিত্যের সাথে আমার এই কল্পিত ঘটনাগুলোর লিখিত শব্দগুলোর কোনো সম্পৃক্ততা নেই।

“ও তোর পিছু নিচ্ছে নাকি তুই ওর পিছু নিচ্ছিস?”

প্রিতম জামির দিকে তাকিয়ে আছে। হাত খোলা থাকলে এক ঘু'ষিতে ওর চেহারাটাই ‘প্রশ্নবোধক চিহ্ন’ বানিয়ে দিতো, ভাবছে প্রিতম।

মেয়েগুলো সব ইনিয়ে বিনিয়ে কাঁদছে। সবথেকে বিশ্রী শোনাচ্ছে ইরফান মির্জার বোনের কান্নার আওয়াজ। প্রিতমের হাত খোলা হলে প্রথমেই এই মেয়েটার মুখ থেকে টেপ সরিয়ে দেবে, যাতে ভালো করে কাঁদতে পারে।

অদ্ভুত সব চিন্তাভাবনা আসছে প্রিতমের। মস্তিষ্ক অচল হয়ে গেলে যা হয় আরকি। শেষ কখন শরীর খাদ্য গ্রহণ করেছিলো?
সবার মুখের দিকে তাকায় সে। সবাই তাকিয়ে আছে তার দিকে। একে অপরের চেহারা দেখাদেখি করা ছাড়া আর কিই বা করার আছে।

জামি একটু পরপর বিরক্তিতে মুখ দিয়ে চ বর্গীয় শব্দ করছে, তাকাচ্ছে মেয়েগুলোর দিকে। ওদের নাকি কান্নার যন্ত্রনায় জামির সুরা পাঠ ভুল হচ্ছে।
তেরো জন বন্দির মধ্যে ইনায়াসহ পাঁচজন মেয়ে। বাকিরা পুরুষ, জামি এবং প্রিতম বাদে বাকিরা মধ্যবয়সী।

সময় গড়ায়। একেকজন নিজেদের মৃত্যুর আ'তঙ্ক নিয়ে নিশ্চুপ দীর্ঘশ্বাস ফেলছিলো। তখন চলে যাওয়ার পরে ঐ টেরোরিস্ট গুলো আর একটিবারের জন্যও আসেনি এ ঘরে। ওরা ওদের কোথায় রেখেছে তা বুঝতে পারছে না প্রিতম। এখান থেকে কিভাবে বেরোবে, বা বেরোলেও আদৌও জান বাঁচিয়ে ফিরতে পারবে কিনা, তার সাথের এই মানুষগুলোকে কিভাবে সাহায্য করবে এসব ভেবেই মাথা ছিঁ'ড়ে যাচ্ছে প্রিতমের। এতগুলো অসহায় মানুষকে ফেলে আগে নিজের জান বাঁচিয়ে পালাবে এমন কাপুরুষ প্রিতম নয়।

আপুর কথা মনে পরছে প্রিতমের। বেচারী এসব জানতে পারলে কি করবে? আদৌও ঠিক থাকতে পারবে? আপুকে সামলানোর জন্য একজন শক্তপোক্ত মানুষও তো নেই।
হুট করে শাওকাত ওয়াসীতের কথা মনে পড়লো প্রিতমের। দুলাভাই সবসময় একটা কথা বলতো,“প্রিতম বিপদ হচ্ছে একটা পাজেল বোর্ড। বুদ্ধি দিয়ে সলভ করতে হয়। গাঁয়ের শক্তি সেখানে আংশিক ভূমিকা রাখে। মা'ইন্ড ইট।”

প্রিতম চাইছে না এই বিপদের কাছে কাবু হতে। তাকে ঠান্ডা মাথায় ভাবতে হবে। হাত পা ছেড়ে বসে থাকাটা নেহাত বোকামি। চেষ্টা তাকে করতেই হবে।

দরজার নব ঘোরার শব্দ হয়। মেয়েগুলো কান্না থামিয়ে জড়োসড়ো হয়ে বসে। আতঙ্কে বারবার ঢোক গিলছে মেয়ে গুলো। ওরা যদি উল্টোপাল্টা কিছু করে!
অসহায়ের মতো একজন আরেকজনকে দেখছে তারা। তিনজন লোক দু'টো বিশালাকার বাক্স নিয়ে ঘরে ঢোকে।

এই তিনজন নতুন। সম্ভবত এখানে পালা করে থাকছে এরা। লোক তিনজন ঢুকে বক্স গুলোকে ওদের সামনে ফেলে রেখে। সবাইকে দেখে তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে, মেয়েগুলোকে তাড়িয়ে তাড়িয়ে দেখছে, চোখ দিয়ে গিলে খাচ্ছে যেন।

ইনায়া গুটিয়ে যায়। বুকের ওপর স্কার্ফ নেই তার। লোকগুলো সেখানে দৃষ্টি দিচ্ছে বারবার। চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পরছে ইনায়ার। তার মন বলছে,খুব খারাপ কিছু হতে চলেছে তার সাথে,যা মৃত্যুর থেকেও ভয়াবহ।
মাম্মা,পাপা,বাড়ির সবার চেহারা চোখের সামনে ভেসে উঠছে ইনায়ার।

তিনজন জ*ঙ্গির মধ্যে থেকে একজন ওদের সবার দিকে তাকিয়ে বলে,“এখন চুপচাপ খেয়ে নেবে সবাই। অন্য কোনো প্রশ্ন নয়।”

জামি তখন বলে উঠলো,“আমার একটা প্রশ্ন আছে...”

লোকটা জামির দিকে অগ্নিদৃষ্টিতে তাকালো। জামি দমে যায়,কয়েক মুহূর্ত চুপ থাকতে পারে যদিও, আবারও বলে ওঠে,“হাত খুলে না দিলে আমরা খাবো কি করে!”

লোকটা হেসেছে সম্ভবত। মাস্ক পরিহিত থাকায় ঠিক বোঝা গেলো না। জামির কথার জবাব না দিয়ে বাকি দু'জনকে চোখ দিয়ে ইশারা করতেই ওরা একজন গিয়ে মধ্যে বয়সী এক পুরুষের হাত খুলে দেয়, এবং একটা মেয়ের হাত খুলে দেয়। তারপর বলে,“ওরা দুজন তোমাদের খাইয়ে দেবে। নিজেদের এতো বুদ্ধিমান ভাবার দরকার নেই।”

জামি সাথে সাথে বলে উঠলো,“আর ওয়াশরুম পেলে? তখনও ওরা দুজন হেল্প করবে?”

লোক গুলো বেশ বিরক্ত বোঝাই যাচ্ছে। প্রিতমের ইচ্ছে করছে জামি নামের এই রেডিওটার সুইচ টিপে অফ করে দিতে।

একজন জঙ্গি বললো,“তুমি অনেক ভুগিয়েছো আমাদের! তোমাকে তুল আনতে আমাদের দুজন লোকের ঘাম ছু'টে গিয়েছে। তারা তোমার প্রতি ক্ষুব্ধ। বেশি কথা বললে তোমাকে স্পেশাল কেয়ারে নিয়ে যাওয়া হবে।”

জামি একটা ঢোক গিললো। প্রিতম আড়চোখে ইনায়াকে একপলক দেখলো, তারপর লোকটাকে বললো,“দেখুন। আমরা আপনাদের সাথে কোঅপারেট করছি। আপনারা প্লিজ ওই মেয়েটার মুখ থেকে ওটা সরিয়ে দিন। ওকে একটু পানি খেতে দিন।”

লোক তিনজন ইনায়ার দিকে তাকালো,আবারও সেই লোলুপ দৃষ্টি। ইনায়া চোখ বন্ধ করে ফেলে। তার গা ঘিন ঘিন করছে।

একজন এগিয়ে এসে ইনায়ার মুখ থেকে টেপটা একটানে সরিয়ে ফেলতেই ইনায়া একটা লম্বা শ্বাস ফেললো। হাঁপাতে হাঁপাতে বললো,“পানি।”

লোকটা ওকে পানি খেতে দিয়ে আরো একবার ইনায়ার বুকের দিকে দৃষ্টি দিলো। মেয়েগুলোর মধ্যে সবথেকে কমবয়সী,সতেজ দেখতে ইনায়া, পৈশাচিকতা সুড়সুড়ি দিচ্ছে পিশাচগুলোর মনে।

যে দু'জনের হাত খুলে দেয়া হয়েছিলো, দুজন জঙ্গি ওদের দুজনের মাথায় বন্দুক ঠেকিয়ে বললো,“এখানে বোতলে দুধ আর ডিম রাখা আছে। আগে নিজেরা খাবে, তারপর এক এক করে বাকিদের খাইয়ে দেবে।”

জামি হতাশ হলো। ভীষণ ভীষণ হতাশ হলো। মাত্র এক বোতল দুধ আর একটা ডিম? থার্ডক্লাস গরীব টেরোরিস্টের দল।
কিন্তু মুখে কিছুই বললো না। চুপচাপ উদাস চোখে তাকিয়ে রইলো বাক্সটার দিকে।

মধ্যবয়সী পুরুষ লোকটি ছেলেদের আর মেয়েটা সব মেয়েদের খাইয়ে দিলো। জামির মন ভরলো না অতটুকু খাবারে। কিন্তু সে নিজেকে সান্ত্বনা দিয়ে রাখলো।

ইনায়া দু'চোখ বন্ধ করে দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে হাপাচ্ছে। এই দুধ না খাওয়ার জন্য কত লুকোচুরি খেলেছে মেজো মায়ের সাথে। ডিম খাবে না তাই কত জানালা দিয়ে টুপ করে ফেলে দিয়েছে, কত কত খাবার নষ্ট করেছে। আর আজ!

লোক তিনজন চলে গেলো। ওরা পরে রইলো চুপচাপ। ইনায়ার কান্না থেমেছে এখন। কতক্ষনই বা কাঁদতে পারে একটানা!

শরীরে খানিকটা খাদ্য ঢোকায় সবাই একটু টনটনে হলো, কিন্তু চুপচাপ শূন্যে তাকিয়ে থাকা ছাড়া তাদের আর উপায় কি?

বাইরে লোকগুলো পায়চারি করে। ওরা কতজন প্রিতম বুঝতে পারছে না। এখান থেকে বেরোনোর একটা চেষ্টা করলে কতটুকু সফল হবে নাকি হিতে বিপরীত হবে তা নিয়ে প্রিতম সন্দিহান।

জামি কিছুক্ষণ চুপ করে বসেছিলো, এখন আবারও মোড়াতে শুরু করেছে। প্রিতম কপাল কুঁ'চ'কে ওর দিকে তাকায়।
জামি মুখটাকে কাঁচুমাচু করে রেখে বললো,“পেটের কাছটা চুলকাচ্ছে। একটু পা দিয়ে চুলকে দিবি?”

★★★

ইশমাম আজ বাড়িতেই। ছুটির দিন তার। পরী চেম্বারে তিনঘন্টা সময় দিয়ে বাড়িতে চলে এসেছে।

গোটা বাড়ির অন্তর্জাল সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে ইনশিরাহ, নিউজ চ্যানেল সবকটা ব্লকড।

ইশমাম আর পরীকে দোতলার লাইব্রেরীতে হাসিখুশি দেখে বেশিক্ষণ দাড়িয়ে থাকতে পারেনি সেখানে। সেই যে ঘরে ঢুকেছে আর ঘর থেকে বেরোয়নি ইনশিরাহ। বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে আছে, একপাশে তার ফোনটা লাগাতার বেজে চলেছে।
ইনশিরাহ এবার ফোনটা হাতে নিলো । চোখ মুছলো হাতের পিঠ দিয়ে। তারপর ফোনটা কেটে দিলো সে।

ওপাশের ব্যক্তির চোখে মুখে ক্ষো'ভ ফুটে উঠলো। বিষাক্ত নিঃশ্বাসের সাথে একটা বাক্য বেরোলো,“এই ভাবের জন্যেই তো আরো ভুগবে তুমি!”

বাড়ির পরিবেশ থমথমে। ভেতরে ভেতরে সবাই ভেঙেচুরে শেষ হয়ে যাচ্ছে, তবুও আহাজারি করতে পারছে না কেউ। এসব জানতে পারলে পরীকে আর সামলানো যাবে না। রিতু নামাজে দাঁড়িয়েছে।

আলো বেরিয়েছে বাড়ি থেকে, সামিনের সাথে কথা বলতে হবে। সামিন ইলহাম কেউই বাড়িতে ফেরেনি। দু'জনেই অফিসে নিউজ চ্যানেলের সামনে বসে আছে, অপেক্ষার প্রহর গুনছে।

আলোকে অফিসে দেখে সামিন ধ'ম'কে উঠলো,“তুমি এখানে কেন এসেছো? বাড়িতে থাকতে বললাম তো, ইশমাম আর পরীর কাছে।”

_ফোন দিলে ধরছেন না, কারো সাথে যোগাযোগ করতে পারছি না, কিভাবে নিশ্চিন্তে বসে থাকবো আমি?

গলাটা কাঁপছে আলোর। একটা ঢোক গিলে বললো,“ইহান ইরফান কোনো খবর জানিয়েছে? কোনো খবর এসেছে ওদের থেকে?”

_না, আসেনি।
উদাস গলায় বললো সামিন।

“নেপাল টাইমস” নিউজ চ্যানেলে লাইভ টেলিকাস্ট হচ্ছে পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং সেনাপ্রধানের বক্তব্য। তাদের সাথে রয়েছে বাংলাদেশ এবং বাকি বন্দিদের দেশের রাষ্ট্রদূত।

দেশের সবকটা সরকারি বেসরকারি নিউজ চ্যানেলে বারবার একই নিউজ,“নেপালে জঙ্গিবাহিনীর কবলে তেরোজন টুরিস্ট। তাদের মধ্যে তিনজন বাংলাদেশি, দু'জন বুলগেরিয়ান, পাঁচ জন কানাডিয়ান এবং তিনজন ভারতীয়।”

স্ক্রিনে বন্দিদের ছবি এবং তথ্য একের পর এক দেখানো হচ্ছে। ইনায়ার ছবিটা টিভির স্ক্রিনে দেখা মাত্রই ডুকরে কেঁদে উঠলো আলো। সামিন বললো,“শান্ত হও। প্লিজ। কিচ্ছু হবে না ওর।”

আলো শান্ত হতে পারছে না। বাড়ির সবথেকে আদরের মেয়েটা আজ কোন হালে আছে কে জানে। ওরা কেমন রেখেছে মেয়েটাকে !

ইলহামের ফোন বেজে উঠলো হঠাৎ। ইনশিরাহর নাম্বার থেকে ফোন এসেছে । ফোনটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে রিতুর আওয়াজ। কান্নায় ভেঙে পরেছে সে। ইলহাম উদ্বিগ্নতার সহিত চেঁচিয়ে বললো,“কি হয়েছে বলো!”

_পরীকে হসপিটালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

_হোয়্যাট!
চেঁচিয়ে বললো ইলহাম।

রিতু কাঁদতে কাঁদতে ঠিক বলতেও পারছিলো না, ইলহাম যতটুকু বুঝলো,ইনায়ার খবর জানতে পেরে আজ ছুটে এসেছিলো ইনশিরাহর মামারা। ইনশিরাহ দোতলায় ছিলো,ও পেলো না সুযোগ তাদের আটকাবার। বাড়িতে ঢুকেই আজান আয়াত মুখোমুখি হলো পরী আর ইশমামের। ওরা ইশমামের কাছেই জানতে চাইলো ইনায়ার খবর।

পরীকে নিউলাইফ কেয়ার হসপিটালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। প্রাথমিক ধারণা হার্ট অ্যাটাক হয়েছে পরীর। অ্যাম্বুলেন্সে স্ত্রীর হাত ধরে বসে আছে ইশমাম। নিজের মেয়ের এতো বড় দূর্ঘটনার কথা শুনে পাথর বনে গিয়েছে সে। পাশ থেকে ছোটো বাবাকে আকরে ধরে রেখেছে ইনশিরাহ।
অ্যাম্বুলেন্স ছুটে চলেছে হসপিটালের দিকে। আজান আয়াতও আছে তাদের সাথে। বাড়িতে রয়ে গিয়েছে রিতু। সে জায়নামাজে দাঁড়িয়েছে।

★★★

জামি প্রিতমের ধ'ম'ক খেয়ে দীর্ঘসময় চুপ করে বসে আছে। বাইরে থেকে এতক্ষণ অনেকের পায়চারির আওয়াজ আসছিলো। এখন পুরোপুরি নিস্তব্ধ সবকিছু।

প্রিতম এদিক ওদিক তাকালো। ইনায়া ক্লান্ত দু'চোখ বন্ধ করে রেখেছে। বুলগেরিয়ান একজন তরুণী প্রিতমকে উদ্দেশ্য করে বললো,“ওরা তো কিছুই বলছে না।”

_আমাদের কেন কিছু বলবে? আমরা তো গুটি। ওরা কথা বলবে সরকারের সাথে।

দীর্ঘশ্বাস ফেললো সবাই। জামি পুনরায় শরীর মোচরামুচরি করতে শুরু করলো, প্রিতম ওর দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকাতেই জামি কাঁচুমাচু মুখ করে বললো,“একটু দয়া কর ভাই! চুলকে দে।”

প্রিতম তপ্ত শ্বাস ফেলে জামির পেটে চুলকে দিলো পা দিয়ে। ইনায়া ওদের দেখছিলো। জামি ইনায়ার দিকে তাকিয়ে বললো,“কি দেখছো? বেস্ট ফ্রেন্ড আমার। তোমার বন্ধুদের মতো নয়। বিস্ফোরণের সময় আমাকে একা ফেলে পালায়নি। আমাকে ফেলে পালালে তোমার বন্ধুদের মতো সেইফ থাকতো আজ। আই লাভ মাই বেস্টফ্রেন্ড। আর তোমার ওগুলো সব চুন্নী। এখান থেকে জানে বেঁচে বেরোতে পারলে প্রথমেই গিয়ে ওদের চ'ড়াবে। না পারলে আমাকে সাথে নিও। তোমার দু'টো বান্ধবীর ওপর আমার খুব রাগ!”

_থামবি তুই!
আবারও ধমকালো প্রিতম! ইনায়া চোখ সরিয়ে নিলো।

প্রিতম জামির পেটের কাছটা চুলকে দিয়ে,পা গুটিয়ে নিয়ে সোজা হয়ে বসলো। তারপর কিছুক্ষণ জামির মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলো। অকস্মাৎ এক পরিকল্পনা তার মাথায় চলে এলো। প্রিতম বাঁকা হেসে জামিকে বললো,“অবশ্যই বেরোতে পারবো। তুই ঘুরে বস।”

_ঘুরে বসবো মানে? তোকেও চুলকে দিতে হবে?

_ঘুরে বস।
বিরক্তি নিয়ে বলে দরজার দিকে সজাগ দৃষ্টি দিলো প্রিতম। নিস্তব্ধতা ছেয়ে আছে বাইরে। প্রিতম সাহস পেলো। অন্যান্য বন্দিদেরকে বললো একটু আড়াল দিয়ে বসতে তাদের। ওরা সবাই আদেশ পালন করলো প্রিতমের।

প্রিতম জামিকে বললো,“ওরা হিংস্র,তবে বোকা। তুই চেষ্টা কর আমার পেছনের ব্যাগ থেকে ফ্রন্ট জিপার টা খোলার। ফাস্ট।”

জামি বুঝতে পারলো প্রিতমের পরিকল্পনা। সে প্রিতমের পিঠের দিকে পিঠ দিয়ে বসে বহু কষ্টে জিপার লকটা আঙুলের নাগাল পেলো।
ইনায়া সব দেখছিলো। ওরা কি করতে চলেছে কিছুই বুঝতে না পেরে শুধু বললো,“ওরা চালাকি করতে বারণ করেছে প্রিতম আহসান। আপনি কি মনে করেন এসব করে ওদের ঐ আগ্নেয়াস্ত্র থেকে পার পেয়ে যাবেন। উল্টো ওরা ক্ষে'পে গেলে সবাই মা'রা পরবো।”

প্রিতম বাঁকা হাসলো, বললো,“আর তুমি কি মনে করো নেপাল সরকার তেরোজন টুরিস্টের সামান্য জানের বিনিময়ে গঙ্গোপ্পোকে ছাড়বে? যাকে ধরতে আমেরিকাকে দিতে হয়েছে মিলিয়ন মিলিয়ন অর্থ। ওরা ভান করবে শুধু। তাই নিজেদের চেষ্টা নিজেদের করতে হবে। আমি আমার বোনদের কাছে ফেরত যেতে চাই।”

“পেয়েছি!”
জামি চাপা স্বরে চেঁ'চি'য়ে উঠলো। প্রিতম একটা গভীর নিঃশ্বাস ফেলে বললো,“দড়িটা কেটে ফেল। ফাস্ট।”

জামি তাই করলো। বাকিরা সতর্ক দৃষ্টি মেলে দরজার দিকে তাকিয়ে রইলো।
আধাঘণ্টা লেগেছে জামির। আঙ্গুল ব্যাথা করছে তার,নাইফটাকে দু আঙ্গুলের ভাজে রেখে আন্দাজে চালিয়েছে দড়ির ওপরে। প্রিতমের হাতও সামান্য কাটলো।

হাতের বাঁধন যখন মুক্ত হলো প্রিতম তড়াক করে লাফিয়ে উঠে বাকিদের হাতের বাঁধন খুলে দেয়।

সর্বশেষে ইনায়ার পেছনে এসে বসলো প্রিতম। ইনায়া শুধু ঘাড় ঘুরিয়ে ওকে দেখলো। নীলমণির চোখদুটোর সাথে চোখাচোখি হলো ওর। চোখ নামিয়ে নিল ইনায়া।
হাত দু'টো মুক্ত হলো ইনায়ার। ঠিক তখনই বাইরে থেকে দুজন লোকের কন্ঠস্বর ভেসে এলো।

★★★

তরাই, হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থিত জলাভূমি, তৃণভূমি, সাভানা ও অরণ্যময় বলয় অঞ্চল। এটি হিমালয় পর্বতমালার দক্ষিণে এবং গাঙ্গেয় সমভূমির উত্তরে অবস্থিত। অঞ্চলটি পশ্চিমে যমুনা নদী ধরে ভারতের হিমাচল প্রদেশ, হরিয়ানা, উত্তরাখণ্ড থেকে পূর্বে উত্তরপ্রদেশ ও বিহার পর্যন্ত বিস্তৃত। পূর্বাঞ্চলে ব্রহ্মপুত্র নদীর অববাহিকায় পশ্চিমবঙ্গ, বাংলাদেশ, ভুটান ও আসামে এ অঞ্চলটির কিয়দংশ ডুয়ার্স নামে পরিচিত।
নেপালের সীমান্তে জনমানবহীন এই গভীর অরণ্যে গাউফুন টিম ছোটো একটি পরিত্যক্ত খামার বাড়িতে এনে রেখেছে ওদের। যার হদিস পেলেও খুব সহজে এদের রেসকিউ করা অসম্ভব। এই অরণ্য এক মরীচিকা। একটা ভুলভুলাইয়া।

গাউফুন এবং রেডম্যান আপাতত এই স্থানে নেই। ওরা ব্যস্ত ওদের পরবর্তী পরিকল্পনা বাস্তবায়নে। তিনজনকে পাহাড়াদার রেখে বাকিরা গিয়েছে লোকালয়ে। চোখ কান খোলা রাখতে হবে তাদের।

পোখারা আন্তর্জাতিক এয়ারপোর্টে পা রাখলো দুই ভাই। সভ্য শান্ত দুজন তাগড়া জোয়ান ছেলেকে দেখলে বোঝার উপায় নেই এদের মধ্যে নিজেদের আদরের বোনকে হারানোর আতঙ্ক ঠিক কতখানি জেঁকে বসেছে। তারা এয়ারপোর্ট থেকে গাড়ি নিয়ে সোজা চললো নাগোরকোট আর্মি ক্যাম্পে। গোটা জার্নিতে দুজন চুপ করে ছিলো। গাড়ি যখন নাগোরকোটের উদ্দেশ্যে ছুট লাগালো তখন ইরফান নীরবতা ভেঙে বললো,“এরপর কি দাদান!’

ইরফানের কন্ঠে তার স্বভাবের উগ্রতা আজ নেই। ওমন তাগড়া,রগচটা ছেলেটির গলা কাঁপছে।

ইহান ভাইয়ের দিকে একপলক তাকালো, কিন্তু কিছুই বললো না। ইরফান বলতে লাগলো,“একবার হাতের কাছে পাই দাদান! ওকে আমি...”
আর কিছু বললো না ইরফান।

ইনায়ার হাসিখুশি মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠলো দুই ভাইয়ের, দু'জনে দুদিকে ফিরে গাড়ির জানালার দিকে দৃষ্টি দিয়ে থাকলো।

★★★

ডঃ রুকাইয়া পরীকে কার্ডিওলজি বিভাগের স্পেশাল কেয়ার ইউনিটে রাখা হয়েছে। অবস্থা স্থিতিশীল।
কার্ডিওলজি বিভাগের ওয়েটিং রুমে মির্জা বাড়ির সদস্যরা।

ইশমাম মির্জা কাঁদছে। বাচ্চাদের মতো কাঁদছে। ইনশিরাহ তখনও ছোটোবাবাকে আগলে ধরে রেখেছে।

হসপিটালে পৌঁছেই ইশমাম নেপাল যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো। সামিন আটকে দিয়েছে তাকে। ওখানে যাওয়ার মতো মানসিক শক্তি ইশমামের নেই। পরীরও এখন তাকে দরকার।

বাড়ির সবাই পাথরের মূর্তির মতো বসে আছে। ওয়েটিং রুমের টিভি স্ক্রিনে দুপুরের সংবাদ পুনঃপ্রচার হচ্ছে। সর্বশেষ আপডেট, গাউফুন টিম থেকে চিঠি এসেছে, শর্ত গঙ্গোপ্পোর মুক্তি।

ইশমাম মির্জা মেয়ের শোকে কাঁদতে কাঁদতে মুর্ছা প্রায়। কাঁদছে ইনশিরাহও।

এস.পি. মুঈন ফরাজী ডিউটি শেষ করেই ছুটে এসেছে হসপিটালে। এ শহরে মির্জা ফ্যামিলির সাথে তার সম্পর্কের নাম আপাতত একে অপরের “শুভাকাঙ্ক্ষী”

মির্জা পরিবারের শুভাকাঙ্ক্ষী মুঈন ফরাজী ইউনিফর্ম পরেই এসেছে এখানে। সে ওয়েটিং রুমের এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে। সহানুভূতি মাখা দৃষ্টিতে দেখছে সবাইকে। ঘুরেফিরে দু'চোখ গিয়ে ইনশিরাহতে স্থির হয়। যে কিনা কাঁদছে, ছোটো বাচ্চার মতো। যেমন আগে কাঁদতো, মুঈনের তখন তাকে পুতুল লাগতো।

চলমান.......

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 18 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন