ফন্ট সাইজ:
থিম:
বধূ কোন আলো লাগল চোখে ২

পর্ব 19

লেখক: ইসরাত ইতি

#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_১৯
#ইসরাত_ইতি

🚫কঠোর ভাবে প্রাপ্তমনস্কদের জন্য।

🚫শিক্ষা ও সাহিত্যের সাথে আমার এই কল্পিত ঘটনাগুলোর লিখিত শব্দগুলোর কোনো সম্পৃক্ততা নেই।

একটি পার্সব্যাগের ভেতরে প্রয়োজনীয় সকল কার্ডস, কাগজপত্র এবং অতি দরকারি ডকুমেন্টস গুলো ঢুকিয়ে নেয় প্রেরনা। কাজটি করার সময় সে টের পেলো তার হাত কাঁপছে। কিন্তু পাত্তা দিলো না। সবকিছু ঢুকিয়ে নিয়ে পুনরায় ভালো করে দেখেও নিলো সে।বিছানার ওপর পরে থাকা মুঠোফোনটা যান্ত্রিক আওয়াজ করে প্রেরনার মনোযোগ সেদিকে টানে।

ফোনটা রিসিভ হয়। লাউড স্পিকার চালু করে ফোনটা বিছানাতেই রেখে প্রেরনা ব্যস্ত হয়ে পরে তার কাজে। দ্রুত দ্রুত সব গুছিয়ে নিচ্ছে নিজের। তিনটে শাড়ি, শীতের শাল, ওষুধ ইত্যাদি ইত্যাদি। ফোনের অপর প্রান্ত থেকে ম্যানেজার সাব্বির কোমল কন্ঠে জানতে চাইলো,“ম্যাম। আপনি ঠিক আছেন?”

প্রেরনা তার লম্বা চুলে ব্যস্ত ভঙ্গিতে বিনুনি করে নিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়েই জবাব দেয়,“সাব্বির বেশি কথা বলতে পারবো না ভাই। সবকিছু একটু সামলিও কেমন? আর অযথা আমাকে কেউ ফোনকল করবে না। আমি নিজেই সকলকে জানাবো। আমি চললাম, আমার এগারোটায় ফ্লাইট।”

_ম্যাম। আপনি একা ?
সাব্বির আমতা আমতা করে জানতে চায়।

প্রেরনা তপ্ত শ্বাস ফেললো। কন্ঠস্বর স্বাভাবিক রেখেই বললো,“আমি একাই সাব্বির!”

ফোন কে'টে ব্যাগপত্র হাতে নিলো প্রেরনা। শরীরটা ভেঙেচুরে যাচ্ছে অথচ তাকে দেখলে কারো এতটুকু অনুধাবনের সুযোগ নেই এই রমনী কতটা ভীতসন্ত্রস্ত, ঘা'ব'ড়ে আছে।

দ্রুত পায়ে বাইরে এলো সে। বসার ঘরে এই এপার্টমেন্টের মহিলারা এসেছে, প্রতিবেশী হিসেবে সহমর্মিতা প্রকাশের উদ্দেশ্যে। প্রেরনার ফুপি মুবিনা শুদ্ধকে কোলে নিয়ে শান্ত করার জন্য নানা ধরণের মন ভোলানো কথা বলছে।

প্রনমির রুম থেকে ক্ষীণ স্বরে কান্নার আওয়াজ ভেসে আসছে এদিকটায়। প্রেরনা সেদিকে পাত্তা না দিয়ে মিস জেনিকে বললো,“ওষুধ টাইমলি খাওয়াবেন। শুদ্ধর স্কুলে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। ভালো থাকবেন। দ্রুত ফিরবো ইনশাআল্লাহ!”

মিস জেনি ঠোঁট চেপে কান্না আটকে রেখে শুধু ঘা'ড় কাত করলো। প্রেরনা ফুপির কাছে গিয়ে তার কোল থেকে শুদ্ধকে টেনে নিজের কোলে তুললো । দু'গালে চুমু এঁকে দিয়ে নম্র স্বরে বললো,“মামা আর গিফটস নিয়ে ফিরবো। আর কি লাগবে?”

শুদ্ধ কান্না থামিয়ে চোখের পানি মুছে শুধু ডানে বায়ে মাথা ঝাকালো। তার আর কিছু লাগবে না।

কয়েক পল ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে প্রেরনা ঘুরে দাঁড়ালো। ঐ দেবশিশুর মতো মুখের দিকে বেশিক্ষণ তাকাতে পারে না প্রেরনা। এতটুকু একটা ছেলে। মাম্মাকে ছাড়া ঘুমাতে পারে না মোটেই। তবে এখন থেকে পারতে হবে। ধীরে ধীরে সব শিখুক। শক্ত হোক।

প্রতিবেশী আন্টি,ভাবী সম্পর্কের ব্যক্তিগুলো প্রেরনাকে বিদায় জানাতে এপার্টমেন্টের গেট পর্যন্ত এলো। একটা ক্যাব সেখানে আগেই দাঁড়িয়ে ছিলো। প্রেরনা উঠে সিটে হেলান দিয়ে বসলো। দু'চোখ বন্ধ তার, প্রার্থনা করছে এই লম্বা জার্নির মাঝে যাতে তার প্যানিক অ্যা'টাক না হয়। ওষুধ তো আগেই খেয়ে নিয়েছে।

প্রার্থনা শেষে চোখের কোণ ভিজে উঠলো প্রেরনার। টিস্যু পেপার দিয়ে চেপে চেপে মুছে নিলো অশ্রু। গাড়ি এয়ারপোর্টের দিকে ছুটছে তার আপন গতিতে। হঠাৎ পাশে কারো অস্তিত্ব টের পেলো প্রেরনা। শাওকাত ওয়াসীত বসে আছে। নির্নিমেষ দৃষ্টি মেলে দেখছে প্রেরনাকে। প্রেরনা যেন শুনতে পেলো শাওকাত ওয়াসীত বললো,“বাহ! স্বামীর শার্ট খামচে ধরে চোখ বন্ধ করে রাস্তা পার হওয়া প্রেরনা, এইতো বেশ একা একা ভিনদেশে যাচ্ছো ভীতু মেয়ে!”

প্রেরনা তার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে মাথা ঘুরিয়ে নিলো জানালায়। রাস্তায় কোন জ্যাম নেই অত রাতে। সাঁইসাঁই করে ছুটছে গাড়ি।

★★★

নিজের জংলিছাপা সবুজ জিপ থেকে নেমে দাঁড়ালো মেজর সুমেধ বড়াল।
টানটান হয়ে কিয়ৎক্ষন দাঁড়িয়ে থেকে পা বাড়ালো নাগোরকোটের টেম্পোরারি আর্মি ক্যাম্পের দিকে। তিনপাশে তিনটা বিশালাকার টেন্ট। একটাতে চলছে অনুসন্ধানের প্রক্রিয়া। তিনজন স্যাটেলাইট অপারেটর মনোযোগের সহিত তাদের কার্য পরিচালনা করছে। অপর দুটি টেন্টে রয়েছে ইমার্জেন্সি সৈনিক এবং অবশিষ্ট একটি টেন্ট দখল করে অপেক্ষার প্রহর গুনছে হস্টেজদের স্বজন।

সুমেধ বড়াল হেডকোয়ার্টার থেকে জরুরি আলাপ শেষে ফিরেছে মাত্র। তাকে যথেষ্ট চিন্তিত দেখাচ্ছে। কম্পিউটারের স্ক্রিনে দৃষ্টি তার। টেন্টের পর্দা সরিয়ে নিচু হয়ে ভেতরে প্রবেশ করলো একজন সৈনিক। সেলুট ঠুকে সে তার মেজরকে বললো,“মেজর! দু'জন লোক এসেছে।”

_ওনাদের বলো অপেক্ষা করতে।

_মেজর! আপনার সাথে কথা বলতে চান ওনারা। হেডকোয়ার্টার থেকে পারমিশন এনেছেন।

সুমেধ বড়াল অবাক হলো। হাস্কি স্বরে বলে উঠলো,“উনাদের পরিচয়?”

সৈনিক একটা কার্ড ধরিয়ে দিলো মেজর সুমেধের হাতে। কার্ডটা দেখে মেজর সুমেধ কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো নির্নিমেষ। অতঃপর সৈনিককে অর্ডার করলো,“আসতে দাও।”

মেজর সুমেধ তার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ব'লিষ্ঠদেহী পুরুষটির পানে অত্যল্পকাল দৃষ্টি স্থির রেখে চেয়ে রইলো। তার মুখে কোনো কথা নেই। কিছুক্ষণের জন্য সে অতীতে ডুবে গেলো, যু'দ্ধের ময়দান, ব'লিষ্ঠদেহে জংলি ছাপা ইউনিফর্ম, হাতে আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র, সহযোদ্ধার প্রতি সহানুভূতি, শত্রুপক্ষের দিকে ছোড়া গুলি, ক্ষুরধার প্রতিটা স্টেপ,বজ্রকণ্ঠে সৈনিকদের কম্যান্ড দেয়া। কিছুক্ষণ চোখের সামনে সেগুলোই ভেসে উঠছিলো একের পর এক।

ইহান তাকিয়ে আছে সুমেধের দিকে। গভীর দৃষ্টি তার। সুমেধ হাসলো। ডান হাত বাড়িয়ে দিলো ইহানের দিকে,বললো“বেশভুষা আপনাকে চিনতে দিচ্ছে না তাজওয়ার।”

ইহান তার মনের ছটফটানি দমিয়ে রাখার খানিক প্রয়াস করলো, তবে লাভ হলো না। তপ্ত শ্বাস ফেলে বললো, “ইনায়া মির্জা আমার বোন সুমেধ!”

হতবাক হলো সুমেধ। সৈনিকের পাথুরে দৃষ্টিতে কোমলতা ফুটে উঠলো। ঘুরে দাড়ালো স্যাটেলাইট অপারেটরদের দিকে। ইহান ইরফানও তাকালো সেদিকে। সুমেধ বললো,“খোজ চলছে। চেষ্টা আর অপেক্ষা ছাড়া কোনো উপায় নেই তাজওয়ার।”

ইরফান একটা চেয়ারে বসে পরলো,উদ্ভ্রান্তের মতো। বিধ্বস্ত প্রায়। ইহান টানটান দাঁড়িয়ে। তার দিকে ঘুরে তাকালো সুমেধ, নিজের কন্ঠে অস্বাভাবিক কোমলতা ঢেলে বললো,“পৃথিবী গোল তাজওয়ার।”

ইহান অস্থির হৃদয় নিয়েই ঠোঁটে হাসি ফোটানোর ব্যর্থ চেষ্টা করে বললো,“আমার স্যার কি বলতেন মনে নেই? পৃথিবী যুদ্ধক্ষেত্র, চলতে ফিরতে সহযোদ্ধাদের দেখা হবেই।”

গভীর নিঃশ্বাস ফেললো সুমেধ। ইহানের দিকে তাকিয়ে আফসোসের সহিত বললো,“মেজর শরীফ! তাকে মাঝে মাঝেই মনে পরে আমার। ভুলতে পারি না লোকটাকে।”
কন্ঠে সৈনিকের ধার নেই সুমেধের। ইহান তাকিয়ে রইলো শুধু।

ইরফান অস্থির হয়ে উঠেছে বোনের চিন্তায়, উঠে দাঁড়িয়ে সুমেধকে বললো,“কেন ট্রেস করা যাচ্ছে না?”

সুমেধ ওর দিকে তাকিয়ে বললো,
_নট দ্যট ইজি। আমাদের যদি উদ্দেশ্য কেবল গাউফুন টিমকে ধরা হতো তাহলে ধরে ফেলতাম। আমাদের তেরোজনকে বাঁচাতে হবে। অপেক্ষা ছাড়া উপায় নেই। একটা সিগন্যালের অপেক্ষা।

★★★

তড়াই থেকে ছয় কিলোমিটার উত্তরে বিশাখি নামের গ্রাম। আধুনিকতার ছিটেফোঁটাও পৌঁছায়নি এখন অবধি। লোকালয় হিংস্র,বর্বর । গাউফুন আর সহকারী “রেডম্যান” এখানেই অবস্থানরত। এই লোকালয়ে তাদের বাস ২০৪৭ থেকে। জনসম্মুখে যারা মুদি ব্যবসায়ী হিসেবে পরিচিত। ব্যবসায়িক দালানের নিচে রয়েছে তাদের পাতাল ঘর। আধুনিক প্রযুক্তি এবং আগ্নেয়াস্ত্র ঠাসা ঘরটি। এখান থেকেই পরিচালনা হয় তাদের রাষ্ট্রবিরোধী কাজ।

তড়াইয়ের জঙ্গলে যেখানে হস্টেজদের রাখা হয়েছে ,সেখানে আপাতত তিনজন রয়েছে। বাকিরা সবাই লোকালয়ে।

ঐ তিনজন বন্দিদের কক্ষের বাইরে বসে যার যার স্থানে বসে দীর্ঘসময় ধরে ঝিমুচ্ছিলো। খু'নি হাতগুলো নিশপিশ করছে তাদের। মেয়েগুলোর সৌন্দর্যে পুরুষ মনের হিংস্র বর্বর দিকটা উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে। সন্ন্যাসীর মতো জীবন তাদের, বছরান্তে কটা নারীসঙ্গ পায়! এমন মোক্ষম সুযোগ হাতছাড়া করতে ইচ্ছে করছে না। তিনজন এই নিয়ে গোপন বৈঠক করেছিলো তবে গাউফুন কড়া নিষেধাজ্ঞা দিয়ে দিয়েছে। আপাতত মাছিমারা ছাড়া কাজ নেই।

দীর্ঘসময় ধরে বন্দিশালা নিরব নিস্তব্ধ দেখে ওরা তিনজন কৌতুহলী হয়ে ভেতরে ঢুকলো। বন্দিরা সবাই দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে ঘুমাচ্ছে। তিনজন বাঁকা হাসলো একে অপরের দিকে তাকিয়ে। তখনই ওদের মধ্যে একজনের ফোন বেজে উঠল।

লম্বামতো কৃষ্ণবর্ণের লোকটি টিম লিডার রেডম্যানের সাথে কথোপকথন শেষ করে আরেকজনের দিকে তাকিয়ে বলে,“তোকে আর আমাকে বেরোতে হবে।”

_কোথায়?

_পাতালঘরে, সিস্টেম কাজ করছে না। ইটস ইমার্জেন্সি। মুংরী এদিকটা দেখবে।

ওরা দুজন চলে যেতেই মুংরী নামের বেঁটেখাটো রিভলবারধারী লোকটা রিভলবার তাক করে আবারও ঘরের মধ্যে পা রাখলো। হস্টেজরা সবাই তখন হাত বাঁধা অবস্থাতে ঘুমাচ্ছিলো দেয়ালে ঠেস দিয়ে বসে।

প্রিতমরা সজাগ মস্তিস্কে শুনছিলো এতক্ষণ সবকিছু । একদফা পরিকল্পনা হয়েছে তাদের মাঝে। সময়ের ওপর নিচ হলে পরিকল্পনা তো যাবেই সাথে যাবে নিজেদের প্রানপাখি, সময়ের আগেই।

বেঁটেখাটো লোকটা সবার মুখের দিকে এক পলক দৃষ্টি দিয়ে ঘুরে দাঁড়াতেই জামি হাই তুলতে তুলতে ঘুম ভেঙে যাওয়ার ভান ধরে বলে উঠলো,“এক্সকিউজ মি!”

লোকটার পা স্থির হলো। ঘুরে তাকালো জামির দিকে। জামি চোখ মুখ খিচিয়ে বললো,“ওয়াশরুম।”

_চুপচাপ ওখানে বসে থাকো।
কড়া করে বললো লোকটা।

জামি প্রতিবাদ জানিয়ে বললো,“দেখুন। আমার এখানে ওয়াশরুম করে দিতে কোনো অসুবিধা নেই, তবে বাকিদের আছে, এবং আপনাদেরও অসুবিধা হবে...আর এটা এটা এটা খুবই জরুরি।”

শেষের কথাগুলো খুব কাতর করে বললো জামি। বেঁটেখাটো রিভলবারধারী কিছুক্ষণ কিছু একটা ভেবে বললো,“চলো।”

বাঁধা হাত খুলে দেওয়া হয় জামির। মোটাতাজা শরীর দুলিয়ে দুলিয়ে তাদের কক্ষসংলগ্ন ওয়াশরুমের ভেতর ঢোকে। পেছন থেকে তার মাথার দিকে রিভলভার তাক করে রেখেছিলো জঙ্গি সদস্য।

প্রিতম তড়াক করে লাফিয়ে উঠলো। ঠোঁটে তাঁর বাঁকা হাসি। ইনায়া সহ বাকিদের গলা শুকিয়ে কাঠ হবার যোগার। একটু এদিক সেদিক হলেই সব্বাই শেষ।

প্রিতম তার পরিকল্পনা মোতাবেক এগিয়ে গেলো। বেঁটেখাটো লোকটা তখন সতর্ক দৃষ্টিতে ওয়াশরুমের দিকে তাকিয়ে। রিভলভার ওয়াশরুমের দরজার দিকে তাক করে রাখা। প্রিতমের উপস্থিতি তখনও টের পায়নি সে। মুহূর্ত গড়ানোর আগেই মাথায় প্রকট বারি পরে তার। হাত থেকে ছিটকে পড়ে রিভলভার।
এপাশে দাঁড়ানো দুজন কানাডিয়ান মধ্যবয়সী লোক দ্রুত এগিয়ে যায়। প্রিতমের চোখে মুখে তখন হিংস্রতা ভর করেছে। এক লাথিতে লোকটার পাঁজর ভেঙে যাওয়ার যোগাড় হলো। মুখ থুবড়ে পরলো মেঝেতে। প্রিতম চাঁপা স্বরে চেঁ'চি'য়ে উঠলো,“জামি আয়।”

কানাডিয়ান লোকদের মধ্যে তাগড়া দেখতে মধ্যবয়সী লোকটি বুদ্ধি করে তুলে নিলো রিভলভার।

জামি এসে ক্ষ্যাপা বাঘের মতো থাবা বসালো আহত জঙ্গি সদস্যের মুখে। প্রিতম গিয়ে চেপে ধরলো লোকটার মুখ।

ঘটনাগুলো এতো দ্রুত হচ্ছিলো যে মেয়ে গুলো মুখ চেপে ধরে তাকিয়ে রইলো, নিঃশ্বাস বন্ধ করে। যেনো চোখের সামনে কোনো অ্যাকশনধর্মী সিনেমার দৃশ্যের শুটিং চলছে। এতটা নিখুঁত ছিলো প্রিতম-জামির প্রতিটা পাঞ্চ।

বেঁটেখাটো লোকটার মুখ বাঁধতে ইনায়া নিজের স্কার্ফ এগিয়ে দেয়। প্রিতম ওর দিকে তাকিয়ে কাপড়টা নিয়ে দ্রুত দ্রুত লোকটার মুখ বাঁধে। দড়ি দিয়ে হাত পা বেঁধে ফেলে রাখলো ওয়াশরুমে। জামি হাপাচ্ছিলো। কিছু মুহূর্তে নিজেকে ধাতস্থ করে বেঁটেখাটো জঙ্গি সদস্যের পশ্চাতদেশে লাথি বসায় সবেগে!

কোকিয়ে ওঠে লোকটা।

প্রিতম তখন ছুটে এলো ঐ কক্ষটিতে। ওর পিছু পিছু দৌড়ে এলো সববাই। মেঝে থেকে প্রিতম নিজের কাধ ব্যাগটা উঠিয়ে চাঁপা স্বরে চেঁ'চি'য়ে সবাইকে উদ্দেশ্য করে বললো,“সময় নেই। ফাস্ট! কেউ এসে পরার আগেই। সবাই আমার পিছু পিছু আসবে। এক কদম বেশি ফেলবে না।”

জামি হাপাচ্ছিলো, বেটে লোকটাকে শরীরের সবটুকু শক্তি ব্যয় করে “লাথি” মে'রেছে। হাঁপাতে হাঁপাতেই বললো,“ব্যগটাকে নিচ্ছিস কেন। কত ভারি!”

_তা পরে বুঝতে পারবি। ফাস্ট।
দাঁত খিচিয়ে জবাব দেয় প্রিতম।

লাইন ধরে এগিয়ে চললো তেরোজন। সম্পূর্ণ অচেনা, অজানা একটি যায়গা,একটা ভুলভুলাইয়া। কোথা থেকে বেরোবে সে ব্যাপারে ধারণা নেই বিন্দুমাত্রও। প্রিতম হিমশিম খাচ্ছিলো। পেছন থেকে ইনায়া বললো,“ডান দিকে। ডান দিকে সিঁড়ি।”

প্রিতম অবাক দৃষ্টি দিলো ইনায়ার দিকে, ইনায়া জবাব দিলো,“যখন ধরে এনেছিলো। তখন আমার তখন জ্ঞান ছিলো। চেঁচাচ্ছিলাম বলেই তো মুখে স্কচটেপ মে'রে রেখেছিলো।”

প্রিতম আর এক সেকেন্ডও অপেক্ষা করলো না, ছুট লাগালো ডানে। বাকিরা ওর পিছুপিছু সিঁড়ি বেয়ে নামছে। এ দালানের নিচ তলা অন্ধকার। বাতি শুধু দোতলাতেই জ্বলছিলো। ওরা হাতরে হাতরে ইনায়ার বর্ননা মোতাবেক এগিয়ে চলছিলো। পুরো দালান নিস্তব্ধ। রুদ্ধশ্বাসে এগিয়ে গিয়ে বাইরে পা রাখতেই প্রত্যেকে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো।
নিকষ কালো অন্ধকার রাত নয়। চাঁদের আলো আছে বেশ। তবে গা ছমছমে পরিবেশ। ওরা ঠিক কোথায় কেউ জানে না। তেরোজনের নিঃশ্বাস প্রশ্বাসের আওয়াজ আসছিলো শুধু। একজন বুলগেরিয়ান তরুণী প্রিতমকে বললো,“আমরা এগোবো কিভাবে?”

ঠিক তখনই বাঁধলো বিপত্তি। বিকট আওয়াজে ছুটে আসছে গাউফুনদের জীপ। জীপের হেডলাইটের আলোর ঝলকানিতে কেঁ'পে উঠলো তেরোজন। প্রিতম চেঁচিয়ে বাকিদের বললো,“ফলো মি!”

যে দুজন সন্ধ্যা নাগাদ চলে গিয়েছিলো তারা ছিলো এই টিমের টেকনোলজি এক্সপার্ট। নিজেদের অপারেটিং রুমের সিস্টেম ঠিক করার জন্য তাদের ডেকে নিয়েছিলো গাউফুন। বেঁটেখাটো যে লোকটাকে এখানে পাহাড়াদার হিসেবে রেখে গিয়েছিলো তার সাথে যোগাযোগ করতে না পেরেই সন্দেহ জাগে গাউফুনের মনে। দ্রুতবেগে দলবল নিয়ে ছুটে আসে ওদের পাতালঘর থেকে।

প্রিতমেরা সবাই একদল হয়ে ছুটছে। গাউফুন টিম জীপ থেকে লাফিয়ে নেমে লাগাতার গুলি ছুড়তে থাকে ওদের লক্ষ্য করে। জীপ সামনে এগোবে না আর, তাই তাঁরাও ছুটতে থাকে প্রিতমদের অনুসরণ করে।

★★★

নিউলাইফ কেয়ার হসপিটাল, রাত দশটা তেরো মিনিট।
কার্ডিওলজি বিভাগের গোটা ওয়েটিং রুমে ছেয়ে আছে নিস্তব্ধতা। ডঃ পরীর অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়েছিলো বটে শুরুতে। কিন্তু কিছুক্ষণ আগে অবস্থার অবনতি ঘটেছে।
ইশমাম মির্জা ছুটে গিয়েছেন মসজিদে, রবের কাছে পানাহ চাওয়া ব্যতীত আর কি করার আছে তার?
সামিন আর ইলহাম বসে আছে পাথরের মূর্তির মতো, তাদের দৃষ্টি ওয়েটিং রুমের নব্বই ইঞ্চির এলসিডি মনিটরে। স্ক্রিনে বারবার দেখানো হচ্ছিল হস্টেজদের ছবি এবং পরিচয়। একটু অন্ধস্নেহের কারণে আজ নিজেদের মেয়েটাকে এতোবড় বিপদে ঠেলে দিলো তারা! অস্থিরতায় শ্বাসরুদ্ধ হয়ে যাচ্ছে বারবার। একটা ফুলের টোকা লাগতে দেওয়া হয়নি মেয়েটার গাঁয়ে কখনো। আজ সে মেয়ের বিপদে,অনিশ্চিয়তায় রাত্রি ফুরাচ্ছে না কারো।

বাকিরা সবাই নিশ্চুপ চোখের জল ফেলছিলো। আজান আয়াত আলোর পাশেই বসে। দু'জন দীর্ঘসময় নিরব থেকে বোনের দিকে তাকায়। আজান মৃদু স্বরে বলে ওঠে,“আপু জানতাম না আমরা পরী ভাবী জানেন না। আমরা তোমাকে সারপ্রাইজ দিতে চলে এসেছি হুট করে।”

আলো শুধু তাকালো ভাইয়ের দিকে। কিন্তু কিছু বললো না। শাড়ির আঁচল চোখে চেপে ধরে পানি মুছলো চোখের।

ইনশিরাহ তার মেজো মায়ের কাঁধে মাথা রেখে ফুঁপিয়ে কাঁদছিলো। তখন থেকে তার ফোন বেজে চলেছে। বিশেষ পাত্তা দেয়নি শুরুতে। লাগাতার বেজেই চলছিলো ফোনটা, ইনশিরাহ শেষমেশ উঠলো ফোন হাতে নিয়ে। সাঈমের ফোনকল। একটা গভীর নিঃশ্বাস ফেলে ইনশিরাহ একটা কোণে গিয়ে দাঁড়ালো। কান্নার বেগে তার হাত কাপছিলো, কাঁপা কাঁপা হাতে ফোনটা রিসিভ করতেই সাঈমের আওয়াজ, খানিকটা ক'র্কশ শোনালো ইনশিরাহর কাছে, এক হাতে চোখের পানি মুছে কন্ঠস্বর স্বাভাবিক রেখে ইনশিরাহ জবাব দিলো,“তোমার কি ধারণা আছে আদৌও আমি কিসের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি। এখন তোমার কাছে প্রেমময় আলাপ জরুরি হয়ে উঠেছে! সাঈম!”

থতমত খেলো সাঈম। ইনশিরাহ তপ্ত শ্বাস ফেলে বলতে লাগলো,“ছোটোমার অবস্থা ভালো নেই। ওপাশ থেকে দাদানরা কোনো জবাব দেয়নি। বুঝতে পারছো আমরা কিভাবে আছি?”

নিজের কথার সুর পাল্টে ফেললো সাঈম। শান্ত ভঙ্গিতে বললো,“আই ক্যান আন্ডারস্ট্যান্ড ইশি। টেক ইয়র টাইম।”

ফোন কেটে ইনশিরাহ জানালার কাছটাতেই দাঁড়িয়ে রইলো।

রুমের একপার্শ্বে দাঁড়ানো মুঈন ফরাজী। ঘুরেফিরে দেখছিলো সবাইকে। ইউনিফর্ম পাল্টে সিভিল পোশাকে উপস্থিত হয়েছে এখানে, সাথে নিয়ে এসেছে এবাড়ির সবার জন্য খাবার। অর্ডার করেছিলো অনলাইনে। এদের দেখেই মনে হয়েছিলো দীর্ঘসময় মুখে কিছু পরেনি কারো। সবার বয়স বেড়েছে। এদের সাথে একজন শক্তপোক্ত,দৃঢ় চিত্তের মানুষ নেই। ঘা'ড় ঘুরিয়ে জানালার কাছে দাঁড়ানো ইনশিরাহর দিকে তাকায় মুঈন। যাকে মুঈন ভুল ভেবেছিলো,খানিক স্ট্রং ভেবেছিলো। কিন্তু না, শিশু বেলার মতোই ছিঁচকাদুনে রয়ে গিয়েছে। আগের সেই মিষ্টি আন্টির কোনো বৈশিষ্ট্য নেই এর মাঝে।

কিয়ৎক্ষন তাকে দেখে মুঈন খাবারের প্যাকেট হাতে নিয়ে এগিয়ে যায় সামিনের কাছে। চোখের ওপর হাতের পিঠ রেখে বসেছিলো সে। মুঈন পাশে বসে মৃদু স্বরে ডাকে,“সামিন বাবা।”

চোখের ওপর থেকে হাত সরিয়ে সামিন তাকিয়ে রইলো মুঈনের দিকে। মুঈন একটা খাবারের প্যাকেট তার হাতে পরম যত্নে তুলে দিয়ে বললো,“প্লিজ!”

ছেলেটার অনুনয় সামিন ফেরাতে পারলো না। এ থানার জাঁদরেল অফিসারের অপেশাদার রূপটা দেখে সামিন আর তার পরিবার ব্যথিত হৃদয় নিয়েও সন্তুষ্টির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল তার দিকে। যাক, কেউ তো আছে! বৃদ্ধ হলে শিশু হয়ে যায় মানুষ, এসময়ে মানুষের ভেতরকার বহু সত্তার মাঝ থেকে একটা সত্তা শিশুদের মতো সহানুভূতি চায়। তারা পাচ্ছে, একটা বাইরের ছেলে, একটা এতিম ছেলের কাছ থেকে।

খাবারের একটা প্যাকেট হাতে মুঈন উঠে দাঁড়ায়। ধীরপায়ে এগিয়ে যায় জানালার কাছে দাঁড়ানো ইনশিরাহর দিকে। কারো পায়ের অস্তিত্ব টের পেয়ে ইনশিরাহ ঘুরে দাঁড়ায়। ভেজা দু'টো চোখ,অথচ অনমনীয় দৃষ্টি। সরাসরি তাকিয়ে আছে মুঈনের দিকে।

মুঈনের পা থেমে যায়। দু'জনের মাঝে তিন থেকে চার গজের দূরত্ব। আর এগোয় না মুঈন। ইনশিরাহর দৃষ্টি নামে মুঈনের হাতের প্যাকেটে। মুঈন টের পাচ্ছে তার খানিক অস্বস্তি হচ্ছে। এমনটা ইদানিং প্রায়ই হয়। যখনই এই বড়লোকের অতি আহ্লাদী রাজকুমারীর মুখোমুখি হতে হয়।

মুঈন ফরাজীর জীবনে কখনও কোনো মেয়ে আসেনি, এমনকি একটা মেয়ে বন্ধুও কখনো ছিলো না তার। বন্ধুমহল থাকার মতো পারিবারিক, আর্থিক অবস্থা তার ছিলো না যে। মেয়ে মানুষ তার কাছে অস্বস্তির হবে স্বাভাবিক, তবে এই যে এই বড়লোকের “বিগড়ানো টাইপ” মেয়েটি সামনে আসলে তার অস্বস্তি হয়,এটা তার কাছে স্বাভাবিক মনে হয় না। এই অনুভূতির ব্যখ্যা নেই, এই অনুভূতি “কেমন কেমন।”
এমন না যে মুঈনের মেয়েটিকে ভালো লেগেছে। ভালোলাগার মতো বিশেষ কিছুই নেই মেয়েটির মাঝে,তবে অপছন্দ করার মতো অনেক কিছুই আছে। মেয়েটি পুরোপুরি মুঈনের বিপরীত। ঐ যে কথায় আছে না,“নট মাই টাইপ।” তবুও হৃদয়ে এই অস্বাভাবিক আলোড়নের হেতু খুঁজে পায় না সে। শুধু টের পায় এই দোলাচল একত্রিশ বছরে কোনো নারীকে দেখে হয়নি। কেনো হয় এখন? তাও এই টমবয়কে দেখে! অদ্ভুত। ভারী অদ্ভুত!

ইনশিরাহ চুপচাপ তার হাতের প্যাকেটের দিকেই তাকিয়ে ছিলো। মুঈন তার স্বভাবের গাম্ভীর্য বজায় রেখে আদেশের সুরেই বললো,“খেয়ে নাও। ইহানের সাথে কথা হয়েছে আমার। হেডকোয়ার্টার থেকে অপারেশনের উদ্দেশ্য নেমেছে নেপালি গোয়েন্দা সংস্থা।”

এগিয়ে ধরলো খাবারের প্যাকেটটা মুঈন। ইনশিরাহ ভদ্রতার সহিত নিয়ে নিলো। লোকটাকে দেখে অবাক হয় সে, যথেষ্ট অমায়িক কিন্তু তার বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায় সবসময়। আজ হয়নি। আজ কৃতজ্ঞতার সহিত মাথা নুইয়ে চলে গেলো মুঈনের সামনে থেকে ইনশিরাহ। পাপার পাশে বসে পারলো। দুচামচ খেলোও খাবার টা।

মুঈন ঘা'ড় ঘুরিয়ে আরো একবার দেখলো ওকে। পরপর নিজের ওপর বিরক্তি ধরে গেলো তার। সামিন বাবার মেয়ে। এভাবে কেনো দেখবে সে? কত বিশ্বাস করে বারবার তাকে নিজের পরিবারের মাঝে টেনে নেয় সামিন বাবা ‌। এভাবে সামিন বাবার বিশ্বাস ভাঙা হবে! অবচেতন মনে কোনো অনুভূতি আসলেও তাকে শাসানোর যথেষ্ট ক্ষমতা মুঈন ফরাজীর আছে। মেয়েটি চাঁদ, সে বামুন। এটা একটা ধ্রুব সত্য।

মনে মনে আওরালো,“সি ইজ নট ইয়র টাইপ মুঈন! এটা সম্ভবত ইনফ্যাচুয়েশন! ইগনোর হার!”

চলমান......

[ টেরোরিস্টদের হাতে পরলে কি হয় তা আমরা হলি আর্টিজেনের ঘটনায় জেনেছি। এটা যেহেতু গল্প তাই ওরা টেরোরিস্টের মাথায় বারি মেরে পালালো। গল্পে বাস্তবতা লিখতে আসিনি। বিনোদিত হোন শুধু।

গল্প আবার কবে পাবেন জানি না। তবে কাল পাচ্ছেন না। ক্ষমা করবেন। ]

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 19 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন