#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_২০
#ইসরাত_ইতি
🚫কঠোর ভাবে প্রাপ্তমনস্কদের জন্য।
🚫শিক্ষা ও সাহিত্যের সাথে আমার এই কল্পিত ঘটনাগুলোর লিখিত শব্দগুলোর কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
রুদ্ধশ্বাসে ছুটছিলো ওরা, কারো পেছনে ফিরে দেখার সাহস নেই, অবকাশ নেই। প্রাণ বাঁচাতে প্রাণ হাতে নিয়ে দৌড়াচ্ছে সবাই, একযোগে। পায়ে পা মিলিয়ে। অন্ধকারে শুধু শুনতে পাচ্ছে ফাঁকা গুলির আওয়াজ। অথচ একটু এদিক ওদিক হলেই টেরোরিস্টদের আন্দাজের ওপর ভিত্তি করে ছোড়া গুলিও তাদের ছাতি ভেদ করে যেতে পারে,এই ভয়ংকর কথাটাও মাথাতে আনছে না কেউ। ছুটছে তো ছুটছেই। আখেরি চেষ্টা নিজেকে বাঁচানোর,দম থাকা পর্যন্ত ল'ড়া উচিত!
সবার প্রথমে ছিলো প্রিতম, এবং সবার শেষে ইনায়া। অনেকটা দূরে চলে এসেছে তারা ইতিমধ্যে, পুরোটাই ঘন জঙ্গল। হাঁটু পরিমান আগাছা আর কাঁটাগাছ মারিয়ে ছোটা মুশকিল তবুও ছুটছে তারা। পোশাক ভেদ করে চামড়া ছিলে গিয়েছে প্রত্যেকেরই। গুলির ধুন্ধুমার,প্রকট শব্দ কমেনি। বোঝাই যাচ্ছে হস্টেজদের দিকে ধাবিত হচ্ছে তারা,পিছু নিচ্ছে। ওরা এতো এতো সহজেই পিছু হটার মানুষ নয়।
ইনায়া এতক্ষণ দৌড়ে অনেকটা হাঁপিয়ে উঠেছে। সবার পেছনে পরেছে সে, অনেকটা পেছনে, এই আধো অন্ধকারে একটু দৃষ্টি এলোমেলো সরালেই ওদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পরবে ইনায়া, সেটি নিশ্চিত। বন্ধুদের থেকে “ফার্মের মুরগী” খেতাবপ্রাপ্ত ইনায়া মির্জা আজ নিজের রেকর্ড ভেঙে প্রায় এক কিলোমিটার দৌড়েছে। তাও পাঁচ ফিট তিন উচ্চতার সত্তর কেজির ভারী স্বাস্থ্য নিয়ে। তবে আর যে সে পারছে না, তার দ্বারা হচ্ছে না, প্রাণশক্তি ক্ষয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে।
আচমকা কি হলো,পায়ের সাথে বুনো কন্টকযুক্ত আগাছা মারিয়ে পেঁচিয়ে গেলো ইনায়া, সেকেন্ডের মধ্যে মুখ থুবড়ে পরলো মেয়েটা। বাকিরা তখন ওর থেকে অনেকটা দূরে চলে গিয়েছে। চোখে কিছু আর দেখতে পাচ্ছে না সে। কোকিয়ে উঠে বিকট চিৎকার দিয়ে উঠলো,“মাম্মা!”
প্রিতমের পা থেমে গেলো,কান সজাগ তার। মাথা ঘুরিয়ে পেছনে তাকালো একবার। বাকিরা কেউ থামেনি ,ছুটছে অবিরত। জামি কিছুটা এগিয়ে গিয়ে আবারও ফিরে এসে চাঁপা স্বরে বলে,“কি হলো! দৌড়া প্রিতম।”
প্রিতম ঘন ঘন শ্বাস নিচ্ছে, আধো অন্ধকারে ডানে বায়ে তাকিয়ে বললো,“ইনায়া মির্জা?”
_ও তো আছে! চল দৌড়া।
_না নেই,ও চেঁচালো। আমি শুনলাম। ও কোথাও পরে গিয়েছে সম্ভবত।
বলেই প্রিতম উল্টোদিকে ছুট লাগায়। জামি ওকে পেছন থেকে টেনে ধরে বললো,“পাগল তুই? ওদিকে যাচ্ছিস! মা'রা পরবি!”
প্রিতম দম নিলো,“মেয়েটা প্রনমির বয়সী। খুবই নাজুক। তুই যা। আমি ওকে নিয়ে আসছি। যা। কাঁধ থেকে ব্যাগ নামাবি না।”
বলেই প্রিতম পা বাড়ালো উল্টোপথে। জামি গেলো না। সেও তার প্রিয়বন্ধুকে অনুসরণ করে ছুটলো উল্টোদিকে, বিপদের কাছে।
বাকি হস্টেজরা ততক্ষণে চলে গিয়েছে সামনে। ওরা দুই বন্ধু লাফাতে লাফাতে কিছুটা পিছিয়ে এসেই দেখলো ঘন আগাছার মধ্যে মুখ থুবড়ে পরে আছে ধনীর দুলালী,জামির ভাষায় নিব্বি ইনায়া। গাঁয়ে কাঁটা বিঁধেছে বেশ। কাতরাচ্ছে যন্ত্রনায়। মাম্মা পাপাকে ডাকছে ব্যথাতুর কন্ঠে।
প্রিতম এগিয়ে এসে হাঁটু ভে'ঙে বসলো। কোনো কিছু চিন্তা না করেই ইনায়ার একটা হাত ধরে এক টানে উঠিয়ে বসিয়ে তপ্ত শ্বাস ফেলে বললো,“চলো। মাম্মা পাপাকে ডাকতে গিয়ে টেরোরিস্টদের ওয়েলকাম করছো। চলো ওঠো।”
ইনায়া উঠতে পারছে না। এতো ব্যথা শরীরে, দাঁতে দাঁত চেপেও সহ্য করতে পারছে না সে। ওদিকে গুলির আওয়াজ ধেয়ে আসছে ক্রমে ক্রমে। ক্ষীণ আলো ঝলকানিও দেখা যাচ্ছে।
প্রিতম খানিকটা জেদ দেখিয়েই ইনায়ার হাত ধরে টানতে টানতে বলে,“লুক! যদি ভেবে থাকো সিনেমার হিরোদের মতো তোমায় কোলে নিয়ে ছুটবো কিংবা এখানে ঐ টেরোরিস্টদের সাথে ফাইট করে তোমাকে সেইভ করে নিয়ে যাবো তাহলে ভুল ভাবছো। উঠলে ওঠো,নাহলে আমি চললাম।”
ইনায়া কাঁপতে কাঁপতে উঠে দাঁড়ালো। ঠিক সেই সময়ে একটা গুলি ওদের কিছুটা কাছ ঘেঁষেই একটা ইউক্যালিপটাস গাছে গিয়ে বিধলো।
জামি নিজের মুখ চেপে ধরলো তৎক্ষণাৎ। ইনায়া বিকট চিৎকার দেওয়ার আগেই প্রিতম ওর মুখ চেপে ধরে জামিকে বললো,“ডানে ছোট। ফাস্ট!”
জামি ছুট লাগালো ডান দিকে। প্রিতম ইনায়ার মুখ চেপে ধরেই টেনে হিচরে এগিয়ে যাচ্ছে জামির পিছু পিছু। ওরা তিনজন বাকি দশজনের থেকে পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন। কোথায় চলেছে সে খবর নেই কারো কাছে।
গাউফুন টিম সামনে এগিয়ে গিয়েছে,ওরা টের পেলো তিনজনই। পা থামালো না কেউ, ইনায়া ততক্ষণে নিজের মুখ ছাড়িয়ে নিয়েছে প্রিতমের হাত থেকে। যন্ত্রনা পি'ষে প্রিতম আর জামির পায়ে পা মিলিয়ে ছুটছে। কিছুক্ষণ পরপর বলছে,“আমি পারছি না!”
প্রিতম তখন বলছে,“টেরোরিস্ট ছাড়াও এখানে জংলি জন্তু আছে। তোমাকে পেলে ওদের একমাসের আহারের ব্যবস্থা হয়ে যাবে। চুপচাপ দৌড়াও।”
★★★
নাগোরকোট টেম্পোরারি আর্মি ক্যাম্প থেকে সিগন্যাল পাওয়া মাত্রই বেরিয়ে পরেছে স্পেশাল ফোর্স। মেজর সুমেধ বড়ালের কম্যান্ডে ট্যাংক বহর নিয়ে তারা প্রস্তুত। তড়াই পুলিশ স্টেশনে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করার নোটিশ পাঠিয়েছে ইতিমধ্যে।
স্যাটেলাইট অপারেটিং টেন্ট থেকে ইহান ইরফান,দুই ভাই ত্রস্ত পায়ে বেড়িয়ে আসে।
সুমেধ বড়াল সৈনিকদের কম্যান্ড দিচ্ছিলেন ততক্ষণে। ইহান গিয়ে দাঁড়ায় সেখানে। সুমেধ ওদের সাথে কথা শেষ করে ইহানের কাছে এসে বলে,“আ'ম সরি তাজওয়ার। আপনার রিকোয়েস্ট আমি রাখতে পারবো না। আপনি ভুলে যাচ্ছেন আপনি কে ছিলেন, এমন বোকা বোকা আবদার আপনার মুখে মানায় না অন্তত। ”
ইহান এলোমেলো দৃষ্টিতে চারপাশ দেখে বললো,“না আমি ভুলিনি। আমি শুধু রিকোয়েস্ট করছি প্লিজ!”
সুমেধ ম্লান হেসে বললো,“আপনারা আপনাদের বোনকে অসম্ভব ভালোবাসেন। তাই বলে আপনাদের লাইফ রিস্কে ফেলতে পারেন না।”
ইহান অস্থির হলো, দাঁতে দাঁত চেপে বললো,“ওহ কাম অন! এই হাত অস্ত্র চালাতে ভোলেনি সুমেধ।”
সুমেধ দ্বিতীয় দফায় হেসে বললো,“অস্ত্র চালাতে ভোলেননি তবে নিজে স্বেচ্ছায় অস্ত্র চালানোর পেশা ছেড়ে দিয়েছেন এটাও ভুলে যাবেন না তাজওয়ার। এখন আপনার কোনো অধিকার নেই। আপনি আমাদের সময় নষ্ট করছেন তাজওয়ার, এখানে অপেক্ষা করুন।”
ইহান একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে সুমেধের দিকে। একজন সৈনিক পাশে এসে দাঁড়িয়েছে সুমেধের। সে ইহানের দিকেই দৃষ্টি স্থির রেখে সৈনিককে বললো,“হস্টেজদের লিস্ট?”
সৈনিক লিস্ট তুলে দেন সুমেধের হাতে। সুমেধ লিস্টে আবারও একবার চোখ বুলিয়ে ইহানকে বললো,“তিনজন বাংলাদেশী। বাকি দু'জনকে চেনেন? জামি রহমান এবং প্রিতম আহসান!”
নাম দুটো সুমেধের মুখে উচ্চারিত হতেই চ'মকালো ইরফান। ত্রস্ত পায়ে এগিয়ে গিয়ে সুমেধের হাত থেকে লিস্ট টা নিয়ে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ। ইহানও দেখলো ছবি দু'টো। দুই ভাই দু'জন দু'জনের দিকে তাকিয়ে আছে। মাঝখান দিয়ে সুমেধ বললো,“এখানে অপেক্ষা করুন। আপনাদের ইমোশনকে বুঝতে পারছি। তবে কিছুই করার নেই!”
ইহান একটা লম্বা শ্বাস ছেড়ে আবারও বললো,“অন্তত তড়াই অবধি যেতে পারি?”
সুমেধ মাথা নাড়ালো, পেশাদারের মতোই কাঠ কাঠ জবাব দিলো,“ আপনাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা আমাদের দায়িত্ব। আপনারা এখানেই থাকবেন, অন্যসবার মতো। সুরক্ষিত।”
★★★
কিছু সময়ের জন্যে দু'চোখে তন্দ্রা ভাব এসে গিয়েছিলো। এতোটা ক্লান্ত প্রেরণার কখনও অনুভূত হয়নি। শরীর ছেড়ে দিয়েছে যেন। পাশের সিটে একজন ভদ্রমহিলা বসেছেন। তিনিও ঘুমাচ্ছিলেন। হঠাৎ একটি বাচ্চাকন্ঠের খিল খিল হাসিতে প্রেরনার তন্দ্রা ভাব কেটে যায়। সে ঘাড় ঘুরিয়ে ডানপাশে তাকায়। শুদ্ধর বয়সী একটি বাচ্চা ছেলে হাসছে, পাশে সম্ভবত তার বাবা মা।
এক দৃষ্টে কিয়ৎক্ষন একটি সুখী পরিবারের চিত্র দেখে প্রেরনা দৃষ্টি সরিয়ে নেয়। এতো সুন্দর একটি দৃশ্যে তার নজর লাগুক তা প্রেরনা চায়না।
লম্বা সময়ের ক্লান্তিময় জার্নি শেষে, সকল “এয়ারলাইন্স ফর্মালিটিজ” চুকিয়ে প্রেরনা এয়ারপোর্ট ছাড়লো। একটা দীর্ঘ শ্বাস ফেলে দ্রুত পায়ে হাঁটতে হাঁটতে বেরিয়ে এয়ারপোর্টের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা ক্যাবগুলোর দিকে এগোলো। ক্যাব ড্রাইভারকে বিশেষ কিছুই বলতে হয়নি তার, শুধু বলেছে,“নাগোরকোট টেম্পোরারি আর্মি ক্যাম্প।”
গুলির শব্দগুলো ক্রমে ক্রমে অস্পষ্ট হয়ে আসছে। ওরা বুঝতে পেরেছে ওরা নিরাপদ দূরত্বে চলে এসেছে। তবে বাকিদের অবস্থা অনুধাবন করতে পারছে প্রিতম। তাদের ওই ক্ষ্যাপা টেরোরিস্টদের হাতে ধরা পরার সম্ভাবনা পঞ্চাশ শতাংশ। প্রিতম প্রার্থনা করছে এমন কিছু না হোক!
ওরা যেদিকে ছুটে আসছিলো সেদিকে বনাঞ্চল খুবই কম। পাহাড়ের পাদদেশ ঘেঁষে ওরা ছুটে চলেছে অজানায়।
গুলির শব্দ যখন একেবারেই শোনা যাচ্ছিলো না তখন প্রিতম পায়ের গতি কমিয়ে দিলো। হাঁফ ধরে গিয়েছে তার। একটু বিশ্রামের খুবই দরকার এখন । ওকে থেমে যেতে দেখে জামি আর ইনায়াও থামলো। প্রিতম হাঁপাতে হাঁপাতে বললো,“আপাতত সেইফ। তবে এভাবে আর ছোটা যাবে না অন্ধকারে। এই অরণ্য এক ভুলভুলাইয়া। দেখা গেলো ঘুরতে ঘুরতে আমরা এখানেই চলে আসবো। আমাদের আজ রাতটা একটু সেইফ থেকে কাল ভোরে পথ খুঁজতে হবে। যদি ভুল না হই লোকালয় খুজে পেতে বেশি বেগ পেতে হবে না!”
_কিন্তু কোথায় থাকবো?
অবাক হয়ে শুধালো জামি।
প্রিতম আশেপাশে তাকালো। তারপর দম ফেলে বললো,“ঐ পাহাড়ে ওঠ।”
ইনায়া এতক্ষণ চুপ করে ছিলো। পাহাড়ের কথা শুনে আঁতকে ওঠার মতো করে বললো,“পাহাড়!”
প্রিতম গম্ভীর গলায় বলে,“হু। কজ এখানে জঙ্গলে জন্তু ঘুরঘুর করে, ওখানটা সম্ভবত কিছুটা সেফ। তার ওপর পাহাড়ের উচ্চতায় দাঁড়িয়ে থেকে লোকালয় সম্পর্কে কিছুটা ধারণা পাওয়া যাবে।”
ওরা দুজন প্রিতমের যুক্তি মেনে নিলো সহজেই। এমনিতেও দু'জনের মস্তিস্ক কাজ খুব কম করছে ক্লান্তিতে।
প্রিতমের পিছু পিছু এগিয়ে গেলো দুজন। কিন্তু বাঁধলো বিপত্তি। ইনায়া পাহাড়ের খুব কাছে এসে দাঁড়িয়ে পরলো। প্রিতম ঘুরে তাকায়। মেয়েটা হাঁপাতে হাঁপাতে বলে ওঠে,“আমি পারবো না। আর সত্যিই পারবো না।”
জামির বিরক্তি ধরে যাচ্ছে। এমনিতেই শত্রুর বোন হয়েও যথেষ্ট সহযোগিতা পেয়েছে।
প্রিতম তখন অবধি একটুও বিরক্ত হয়নি। প্রেরনা আহসানের ভাই কিনা। তার যে খুব ধৈর্য্য। ঠান্ডা গলায় বলল,“কেন পারবে না?”
_পা চলছে না আমার! আর হাইকিং করিনি কখনো। তার ওপর সুরক্ষা নেই সাথে!
প্রিতম চুপচাপ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে হুট করেই বলে উঠলো,“সুরক্ষা লাগবে না। আমার হাত শক্ত করে ধরে রাখো।”
কথাটা বলে প্রিতম নিজেই থতমত খেলো। ইনায়া আবছা চাঁদের আলোয় প্রিতমের দিকে কয়েক মুহূর্ত চোখ ছোটো ছোটো করে তাকিয়ে থেকে বলে,“আমি আপনার হাত ধরতে পারবো না।”
প্রিতম এবার ঠিকই বিরক্তিতে কপাল কুচকালো। মেয়েটি এমন ভাবে তার অফার ফিরিয়ে দিয়েছে যেন প্রিতম তার সাথে ফ্লার্ট করেছে! খুবই ইঙ্গিতপূর্ণ ছিলো ইনায়ার না বোধক উত্তর। প্রিতমের খুব কঠিন কিছু বলতে ইচ্ছে হলেও বললো না, হঠাৎ খুব মায়া লাগলো তার মেয়েটির প্রতি। কেনো লাগলো সে জানে না। তপ্ত শ্বাস ফেলে প্রিতম ইনায়ার দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে কোমল কন্ঠে বলে ওঠে,“লুক! তোমাকে এখানে ফেলে রেখে আমরা যেতে পারছি না কারন বিবেক নামের বস্তু খুলির ভেতর বাসা বেঁধে আছে। আর এই হাতটা। ধরে নাও এই হাতটা তোমার মায়ের!”
ইনায়া চ'মকালো, থমকালো। চেয়ে রইলো প্রিতমের দিকে। প্রিতমের বলা কথাটা ছিলো তার কাছে সাক্ষাৎ সম্মোহনের মন্ত্র। সে সম্মোহিত হয়েই চেয়ে আছে।
প্রিতম আবারও বললো,“এছাড়া আমার আর কিছুই বলার নেই। বাকিটা তোমার বিবেচনা ইনায়া মির্জা।”
ইনায়া কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ধীরে ধীরে তার কাঁপা হাতটা বাড়িয়ে দিলো প্রিতমের দিকে। প্রিতম ম্লান হেসে হাতটা খুব শক্ত করে ধরে এগিয়ে চললো। অতি সাবধানী কদমে এগিয়ে চললো ওরা। ধীরে ধীরে উঠতে লাগলো নাম না জানা এই খুদে মাউন্টের চুড়ায়। পাহাড় অত খাঁড়া নয়। হাঁটতে মোটেও বেগ পেতে হচ্ছে না প্রিতমের, জামির। আর ইনায়ার? ইনায়ার তো মনে হচ্ছে কেউ তাকে শূন্যে ভাসিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। সে সম্মোহিত হয়েই চেয়ে রইলো তার দাদানের শত্রুর দিকে।
এখন নিশ্চিন্ত। মোটামুটি একটা উচ্চতায় পৌঁছে তার তাদের যাত্রা থামিয়ে দিলো। মনে হচ্ছে চাঁদটা এখান থেকে খুব কাছে। ফকফকা পরিষ্কার চারপাশটা। জোৎস্নার আলোয় আলোকিত হয়ে উঠেছে পাহাড়ের কোল।
এইবার ধপ করে বসে পরলো জামি। জিভ বের করে হাঁপিয়ে যাচ্ছিলো, কন্ঠস্বর চিকন করে বলে,“শা'লা এ যাত্রায় বেঁচে ফিরলে আর কোনো পাপ করবো না পাক্কা। একেবারে ভালো হয়ে যাবো। আর পাপার কার্ড চুরি করবো না।”
ইনায়া ততক্ষণে প্রিতমের থেকে হাত ছাড়িয়ে নিয়ে দূরে সরে দাঁড়ায়। প্রিতম ঘাড় ঘুরিয়ে ইনায়াকে দেখতেই চ'ম'কে ওঠে কিছুটা। কাঁটা গাছের সঙ্গে ফেঁসে ইনায়ার কুর্তি ছিঁড়ে গিয়েছে পিঠের কাছে অনেকটা জায়গা জুড়ে। ফরসা পিঠ চাঁদের আলোয় পুরোটা দৃশ্যমান। প্রিতম চোখ সরিয়ে নিয়ে দ্রুত দ্রুত কাঁধ ব্যাগটাকে নামালো। তারপর নিজের জ্যাকেট খুলে ইনায়াকে ডাকলো,“শোনো!”
ইনায়া ঘুরে তাকায়। প্রিতম বলে,“এই জ্যাকেট টা গাঁয়ে চাপিয়ে নাও।”
ইনায়া সর্বোচ্চ দুমিনিট সময় নিলো বুঝতে। ছো মেরে প্রিতমের হাত থেকে জ্যাকেট নিয়ে নেয়। শরীর তার কাঁপছে। তিরতির করে।
অস্বস্তি কাটিয়ে প্রিতমও বসে পরলো জামির কাছে। জামি একটা বড় শ্বাস ছেড়ে বললো,“শা'লা মশা খুব!”
_ব্যাগে ক্রিম আছে। মেখে নে।
জামির চোখ দুটো জ্বলজ্বল করে উঠলো। উচ্ছ্বসিত কন্ঠে বললো,“তুই ব্যাগ টা নিতে বলে তো বেশ করেছিলি। তোর উপস্থিত বুদ্ধির তারিফ করতেই হয়।”
জামির কথা শুনে আড়চোখে ইনায়া প্রিতমের দিকে তাকালো। প্রিতম মৃদু হেসে জামির কথার জবাব না দিয়ে নিজের ব্যাগের জিপার খুললো। তল্লাশি চালিয়ে তার ব্যাগ থেকে বেরোলো, একটা স্লিপিং ব্যাগ, একটা লাইটার, চাকু, এক আড়াইশো মিলিলিটারের পানির বোতল, আর দু'টো চকলেট।
জামিও নিজের ব্যাগ খুললো, তার ব্যাগে ছিলো একটা স্লিপিং ব্যাগ, একটা পানির বোতল, মশার ক্রিম, আর একটা পাওয়ার ব্যাংক।
প্রিতম তার পানির বোতলটা ইনায়ার দিকে এগিয়ে দিলো। ইনায়া কোনোরকম সংকোচ ছাড়াই নিলো। তবে পানি খেলো সামান্য।
পানি খেয়ে লম্বা শ্বাস ফেলে ইনায়াও ধপ করে বসে পরলো, ওদের থেকে দূরত্ব বজায় রেখে।
জামি ইনায়াকে বলে,“আচ্ছা বলো তো তুমি কেন অত রাতে ধেই ধেই করে ঐ ফেস্টিভ্যালে গিয়েছিলে? তোমার তো সাহস কম না!”
ধ'ম'কের মতো করে বললো জামি। ইনায়া কপট রাগ দেখিয়ে জামিকে বললো,“দেখুন! কথায় কথায় এভাবে আমাকে শাসন করবেন না অযথা। আমি আমার ফ্যামিলি থেকে যথেষ্ট শাসন পাই!”
_হ্যা,এই তো শাসনের নমুনা।
জামি বিড়বিড় করে বলে। ইনায়া এবার পাত্তা দিলো না, অন্যদিকে ফিরে বসে রইলো । ক্লান্ত খুব সে,তর্ক করার শক্তি নেই।
পিনপতন নীরবতা ওদের মাঝে, নিবিড় নিস্তব্ধ পাহাড়ের কোলে নাম না জানা পোকামাকড়ের কীর্ত্তন শোনা যাচ্ছিল।
নীরবতা ভেঙে প্রিতম হাতের চকোলেট থেকে একটি চকোলেট ইনায়ার দিকে এগিয়ে দিলো। কোমল কন্ঠে বলল,“নাও।”
ইনায়া কিছুক্ষণ চকোলেট টার দিকে দৃষ্টি নামিয়ে রেখে বললো,“দরকার নেই। ধন্যবাদ।”
প্রিতমও খেলো না। দু'টো চকলেটই জামিকে দিয়ে বললো,“তুই খা!”
জামি কিছুক্ষণ উ'শ'খু'শ করে চকলেট দু'টো নিলো। যদিও ওর খিদে পেয়েছে, তবুও খেলো না। ব্যাগের ভেতর রেখে বললো,“থাকুক। অতি জরুরী প্রয়োজনে কাজে লাগবে।”
তিনজন পুনরায় চুপচাপ হয়ে গেলো। আকাশের চাঁদটার দিকে তাকিয়ে ইনায়া গভীর নিঃশ্বাস ফেলে বারেবারে, দু'চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পরতেই সন্তর্পনে মুছেও নেয় তা।
প্রিতম ওকে উদ্দেশ্য করে বলতে লাগলো,“আচ্ছা একটা কথা বলো, তুমি এমন কেন? না মানে তোমাকে দেখলে মনে হয় না তুমি ঐ ইরফান মির্জার বোন।”
ইনায়া প্রিতমের দিকে তাকালো, ধরা গলায় বলল “কেন?”
_না, ইরফান যেরকম,তুমি তার বিপরীত। অথচ তোমার হওয়া উচিত ছিলো তোমার দাদানের মতো মার'কাটারি।
_আমার দাদান মার'কাটারি নয়।
কন্ঠে দৃঢ়তা এনে বললো ইনায়া।
জামি আর প্রিতম দু'জনেই উচ্চস্বরে হেসে উঠলো যেন তারা একটি মজার কৌতুক শুনলো। হাসছে তো হাসছেই। বিরক্ত হলো ইনায়া,তবে বিরক্তি চেপে রেখে বলে,“সত্যি বলছি। দাদান একটু রাগী শুধু। আপনাদের ধারণার মতো মার'কাটারি নয়।”
হাসি থামালো দু'জনেই। জামি গমগম করে বললো,“শোনো তোমাকে একটা সাজেশন দেই তোমার দাদানের ব্যাপারে। এখান থেকে বেঁচে ফিরলে সকাল বিকাল দুবার বরফ কুচি মাথায় ঢালবে ওর। এবং কখনো ওকে বিয়ে করাবে না।”
ইনায়া অবাক হওয়ার ভান করে বললো,“কেন কেন?”
_কেন আবার? রাগের মাথায় বৌ মা'রবে ও আর পুরো পরিবার শুদ্ধ জেলে পচবে তোমরা। আল্লাহ জানে কোন মেয়েটির জীবন নষ্ট হবে। সেই বোনটির জন্য সমবেদনা জানাই। লঙ্কারাজ তোমার দাদান।
ইনায়া আহত গলায় জামিকে শুধালো,“আপনি আমার দাদানকে রাবণের সাথে তুলনা দিলেন?”
দাত কপাটি বের করে জামি হাসতে লাগলো। ইনায়া চুপ করে রইলো। জামি আর প্রিতমের কথা তার একটুও ভালো লাগছে না তবুও যে লোকগুলো তাকে এতো সাহায্য করলো তাদের সাথে তর্ক করারও ধৃষ্টতা নেই তার। তাই অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে রইলো সে।
প্রিতম বুঝলো ইনায়ার মন খারাপ হলো, কিছুক্ষণ চুপ থেকে সে বললো,“মন খারাপ করো না। তবে তোমার দাদানের একটা ভালো দিক অবশ্যই আছে। বলবো?”
ইনায়া তাকায় প্রিতমের দিকে, অস্ফুটে বলে,“কি?”
প্রিতম গম্ভীর কণ্ঠে বলে,“কি আবার? সে অনেক ভালো মারা'মারি করতে পারে। ”
আবারও পেট চেপে ধরে হাসিতে ফেটে পরলো জামি। হাসছে প্রিতমও। ইরফান মির্জার বোনকে একা পেয়ে দুই বন্ধু একটু শোধ তুলছে তাকে ক্ষে'পিয়ে। ইনায়া অবশ্য এইবার কোনো প্রতিবাদ করলো না। প্রিতম আর জামির হাসি দেখে তার হঠাৎ খুব স্বস্তি হচ্ছে।
লোক দু'টো ভালো। উহু! শুধু ভালো নয়। অসম্ভব ভালো। এতো স্নিগ্ধ,নির্মল কিশোর সুলভ হাসি দেখে ইনায়ার এটাই মনে হচ্ছে।
★★★
অস্থিরতায় মূহুর্ত কাটছিলো না দুই ভাইয়ের। নিজেকে সবথেকে অসহায় এবং ব্যর্থ মনে হওয়ার মুহূর্ত এটি। উৎকণ্ঠা মস্তিস্কে দামামা বাজিয়ে চলেছে অবিরত। অথচ দু'জনের হাত পা বাঁধা। টেন্টের মধ্যে অস্থির পায়চারি আর বাড়ির লোকের ফোনকল ইগনোর করে বেশ কয় ঘন্টা কাটিয়ে দিয়েছে। বিশ মিনিট অন্তর অন্তর করছে লাইভ চেক।
এখন অবধি কোনো আপডেট পাওয়া যায়নি। ইরফানের শান্তভাব আর বজায় থাকেনি, অস্থির হয়ে উঠেছে ক্রমে ক্রমে! দু'হাতে মাথার চুল খামচে ধরে বড় বড় নিশ্বাস ফেলছিলো।
ইহান তার ছোটো ভাইয়ের দিকে রইলো দীর্ঘসময়। তখনই বাইরে শোরগোলের আওয়াজ হলো।
ইহান ইরফান একে অপরের দিকে তাকিয়ে ছুটে বাইরে বেরোলো।
গোটা ক্যাম্পে বারোজন সেনা। তারা জটলা পাকিয়ে কারো সাথে তর্ক করছে। অস্পষ্ট কথোপকথন।
ইহান এগিয়ে গেলো, কদম বাড়াতেই কানে পৌঁছালো এক স্বল্পপরিচিত নারীকন্ঠ। যে কন্ঠে সবসময় থাকে দৃঢ়তা।
ভিড় ঠেলে এগিয়ে গেলো ইহান। তার পেছন পেছন ইরফান। কন্ঠস্বরের সাথে এই অবয়বও তার স্বল্প পরিচিত। ছোটো খাটো শরীরে একটা সাদামাটা শাড়ি, কোমরের কাছে কলমি লতার ন্যায় দুলতে থাকা লালচে কালো চুলের লম্বা বিনুনি।
ইহান আরো দু কদম এগিয়ে গিয়ে রাশভারী গলায় বলল,“এক্সকিউজ মি!”
প্রেরনা সেনাদের সাথে তর্ক থামিয়ে ঘুরে দাঁড়ায় ইহানের দিকে। তার শরীর তিরতির করে কাঁপছে। কাঠিন্যতা ছেয়ে থাকা মুখে, ভেজা ভেজা নীল দু'টো চোখে তাকিয়ে থাকে শুধু ইহানের মুখের দিকে।
চলমান....
[ গল্পটা প্রায় একশো পর্বের কাছাকাছি হবে বলে প্রাথমিক ভাবে ধারণা করছি। এখন যদি চান এক পর্বে সব কাহিনী লিখে দিই তাহলে তো 🙂
যাদের ধৈর্য্যে কুলাচ্ছে না তারা পঁচিশ সালে পড়ে নিয়েন। নয়তো বাসায় আসেন, চা খেতে খেতে সব বলে দেবো।]