ফন্ট সাইজ:
থিম:
বধূ কোন আলো লাগল চোখে ২

পর্ব 21

লেখক: ইসরাত ইতি

#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_২১
#ইসরাত_ইতি

🚫কঠোর ভাবে প্রাপ্তমনস্কদের জন্য।

🚫শিক্ষা ও সাহিত্যের সাথে আমার এই কল্পিত ঘটনাগুলোর লিখিত শব্দগুলোর কোনো সম্পৃক্ততা নেই।

তিনজন দীর্ঘসময়ের নীরবতায় আচ্ছন্ন হয়ে ছিলো। দূরে কোথাও থেকে কোনো জংলি জন্তুর হাড় হিম করা মৃদু আওয়াজ ভেসে আসছে। আওয়াজ টা বেশ দূর থেকেই আসছে, খুব কাছাকাছি নয়।

ইনায়ার নিঃশ্বাস ঘন হলো আ'তঙ্কে। এমনিতেই বেশ জড়োসড়ো হয়ে বসেছিলো চুপচাপ, “উউউ” ধ্বনি কানে যেতেই প্রিতমদের দিকে কিছুটা এগিয়ে বসলো। কিন্তু ওদের দিকে তাকালো না।

প্রিতম বিষয়টি ধরতে পেরে ফিচেল হাসলো। অত্যল্পকাল বসে থেকে উঠে দাঁড়ায় সে। রাত যত গভীর হচ্ছে চাঁদের আলো ততটা প্রখর হচ্ছে। যেন চাঁদ আজ এই তিন বান্দার সাথ দিতে চাচ্ছে।

প্রিতম উঠে দাঁড়িয়ে এদিকে ওদিকে চারিদিকে তাকিয়ে নিচু হয়ে ঝুঁকে তুলে নিলো তার আধুনিক স্লিপিং ব্যাগটা। জামি হা করে প্রিতমের কাণ্ড দেখছিলো। প্রিতম আজ দুদিন ধরে করে কেমন হিরো হয়ে উঠছে।

ইনায়া মাথা ঘুরিয়ে প্রিতমের মুখের দিকে তাকায়। প্রিতম আমতা আমতা করে বলল,“রাত জাগার কোনো মানে নেই। এই ব্যাগটা নাও। ঘুমিয়ে পরো।”

জামি মুখটা আরো বৃহৎ আকারের হা করে ফেললো, বিড়বিড় করে আওরালো,“ওরে! এতো পুরাই নটাঙ্কি! ডাল মে কুছ তো কালা হে!”

ইনায়া কিছুক্ষণ প্রিতমের হাতের দিকে তাকিয়ে থেকে ব্যাগটা নিলো। কি অদ্ভুত একটা পরিস্থিতি। অথচ কতটা সাদরে এই পরিস্থিতিকে গ্রহণ করতে হচ্ছে ইনায়ার। সে ম্লান হেসে বললো,“আপনি?”

_আমার এটার প্রয়োজন নেই কজ আমি ঘুমাবো না।

জামি ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে ছিলো। প্রিতম ওর দিকে তাকিয়ে বললো,“ঘুমা। আমি জেগেই আছি!”

ইনায়া না ঘুমালেও ব্যগটা বিছিয়ে চুপচাপ গুটিসুটি মে'রে বসে থাকে।

প্রিতম উঠে কিছুটা দূরে একটা গাছের সাথে পিঠ ঠেকিয়ে ডান পায়ের হাঁটু ভেঙে বসলো। দু'চোখ বন্ধ করে চুপচাপ বসে রইলো।

তবে জামির ব্যাপারটাই আলাদা। স্লিপিং ব্যাগে ঢোকার সাথে সাথে ঘুমে চোখ ফেটে যাওয়ার উপক্রম। বড়জোর দশ থেকে পনেরো মিনিট সময় নিলো ঘুমের রাজ্যে তলিয়ে যেতে। এবং তার থেকেও দুমিনিট কম সময় নিলো গভীর ঘুমের মাঝে নাক ডেকে উঠতে।

পাহাড়ের কোলে, পিনপতন নিস্তব্ধতার মাঝে জামির নাক ডাকার শব্দ বেশ ভয়ংকর শোনা যাচ্ছে। ধীরে ধীরে গুমোট হয়ে উঠছে পরিবেশ। প্রিতমের কোনো ভাবান্তর না হলেও ইনায়া দুই কান চেপে ধরে বসে রইলো। এছাড়া আর কিইবা করার আছে তার?

সময় গড়ায়,রাতের গভীরতা বাড়ে। সময়ের সঠিক ধারণা নেই তাদের কারো কাছে। মনে হচ্ছে এ রাত একটু বেশিই দীর্ঘ অথবা এ রাতের শেষ নেই।
ইনায়া টের পেলো একটা কিছু তার পেটের মধ্যে পাক খেয়ে উপরে উঠছে বারবার। সম্ভবত তার খিদে পেয়েছে। এতো দীর্ঘ সময় না খেয়ে কখনোই থাকেনি সে। খিদের চোটে পেটে চিনচিনে ব্যথা হচ্ছে রীতিমতো। একটা দীর্ঘশ্বাসের সাথে ইনায়া সেই যন্ত্রণা টুকুও বের করে দেয়। বন্ধ দু চোখের দৃশ্যপটে ভেসে ওঠে মেজো মায়ের মুখটা। প্লেট নিয়ে ইনায়ার পিছু পিছু দৌড়াচ্ছে রিতু। ইনায়া খাবে না বলে তাল বাহানা করছে।
দু'চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পরে ইনায়ার, নিজেকে আর ধরে রাখতে পারলো না। হুহু করে ফুঁপিয়ে উঠলো নিস্তব্ধ রাতের নীরবতা ভেঙে।

প্রিতম দু'চোখ মেলে তাকায়। ইনায়ার কান্নার বেগে তার শরীরটাও কাঁপছে। অত্যল্পকাল সেদিকে দৃষ্টি স্থির রেখে ফোঁস শব্দে একটা বড় শ্বাস ছাড়লো প্রিতম। উঠে দাঁড়িয়ে এগিয়ে গিয়ে ইনায়ার মুখোমুখি বসে সে। হাঁটুতে মাথা ঠেকিয়ে কাঁদছিলো ইনায়া। প্রিতম ডাকতেই চুপ হয়ে যায়।

_কি হলো?
নরম গলায় শুধোয় প্রিতম। ইনায়া দুহাতের পিঠ দিয়ে চোখের পানি মুছলো। প্রিতম আবারও বলে উঠলো,“খিদে পেয়েছে?”

ইনায়া কিচ্ছুটি বললো না তবে উপর-নিচ মাথা ঝাঁকায়। প্রিতম বললো,“তো চকোলেট টা খেলে না কেনো? পানিটাও খেলে সামান্য।”

কান্নারা পুনরায় দলা পাকায় কন্ঠনালীতে। ইনায়া মাথা ঘুরিয়ে নেয়। একে কিভাবে বলবে ইনায়া কেন খাচ্ছে না ! কিছু খেলে ওয়াশরুম চেপে বসলে তখন? ওরা পুরুষ মানুষ। ওদের তো সুবিধে আছে। কিন্তু তখন ইনায়া কি করবে? এমনিতেই যথেষ্ট ইমেজ নষ্ট হয়েছে ইনায়ার। আর না। আর এই অপরিচিত পুরুষ দু'টোর সামনে নিজেকে হাসির খোরাক বানাতে পারবে না সে।

প্রিতম ইনায়াকে নিশ্চুপ কাঁদতে দেখে আর কথা বাড়ায় না। চুপ হয়ে যায়, তখনই ইনায়া কান্নামিশ্রিত কন্ঠে বলে ওঠে,“একটা কাজ করবেন প্রিতম?”

_বলো।

_আমি যদি শেষ পর্যন্ত ম'রে যাই তাহলে প্লিজ আমার পরিবারের কাছে বলবেন আমি খুব সরি তাদের সাথে মিথ্যাচার করার জন্যে। আর আমি সবাইকে খুব ভালোবাসি।

নাক টানছে ইনায়া। প্রিতম ড্যাবড্যাব করে কয়েক পল তাকিয়ে রইল ওর দিকে। কি জানি হঠাৎ করে তার হাসিও পেলো, তবে সে হাসলো না। মেয়েটা ঘা'ব'ড়ে আছে। শুধু গম্ভীর কন্ঠে বললো,“ওয় হ্যালো! আমরা কোনো প্রশান্ত মহাসাগরের আইল্যান্ডে আসিনি। এটা সম্ভবত নেপালের কোনো সীমান্ত। ঠিক বেঁচে ফিরবো। এতো চোখের পানি খরচ করার মতো কিছু হয়নি।”

একটু থেমে প্রিতম আবারও বললো,“আমার একটা কাজ করবে?”

_কি?
অবাক হয়ে জানতে চায় ইনায়া।

_আমি যদি ম'রে যাই তাহলে আমার পরিবারের কাছে বলবে আমিও তাদের খুব ভালোবাসি।

ম্লান হাসলো ইনায়া। প্রিতমও হেসে বলে,“এতো প্যানিক হয়ো না। মরলে সম্ভবত তিনজনই মরবো। আর বাঁচলে তিনজন একসাথে।”

ইনায়া হঠাৎ হঠাৎ চমকে ওঠে প্রিতমের এমন কথায়। লোকটা কত ডিসেন্ট, অথচ সে কি না কি ভেবেছে।
পরিবেশ টা স্বাভাবিক হলো। ইনায়া কিছুক্ষণ ইতস্তত করে বলে,“থ্যাংকস!”

_মোস্ট ওয়েলকাম।

দুমিনিট চুপ থেকে ইনায়া আবারও বললো,“থ্যাংকস,”

_হু। বললে তো একবার।

_এটা অন্য কারনে।

ইনায়ার কথায় ভ্রু-যুগল গুটিয়ে এলো প্রিতমের,বললো,“কি কারন?”

কিছুটা সময় নিলো ইনায়া, নিচুস্বরে বললো,“ পাপা, বড় বাবা, মেজো বাবা আর দাদানদের ছাড়া অন্য কোনো পুরুষের পাশে নিজেকে কখনও এতোটা সেইফ মনে হয়নি।”

প্রিতম চোখ সরিয়ে নেয় ইনায়ার থেকে। ইনায়া বলতে থাকে,“দাদানের সাথে আপনার কি নিয়ে এতো শত্রুতা বলেন তো?”

প্রিতম হাসলো,বললো,“ভার্সিটি লাইফের শুরু থেকে। সে নানা কাহিনী, বিস্তৃত ইতিহাস। তিক্ততা বাড়তে বাড়তে এ পর্যন্ত এসেছে। শেষ ঝগড়া হয়েছিলো একটা মেয়ে নিয়ে। দু'জনেই মেয়েটাকে পছন্দ করতাম।”

চ'মকালো ইনায়া। প্রিতম স্বাভাবিক ভাবেই বলতে থাকে,“আমি যথাসম্ভব চেষ্টা করি ঝামেলা এড়িয়ে চলার। তোমার দাদান থাকতে দেয় না। পুরো তারকাটা একটা ছেলে। ওকে মানসিক ডাক্তার দেখাবে।”

ইনায়া তপ্ত শ্বাস ফেলে বললো,“আপনারা এভাবে বলেন, অথচ আমার কাছে আমার মেজো দাদান বেস্ট। শুধু তার রাগ বেশি এই যা।”

_ আমিও আমার বোনেদের কাছে বেস্ট। সব ভাই-ই তার বোনের কাছে বেস্ট। একমাত্র অন্য একটি মেয়ে বলতে পারবে পুরুষটি কেমন।

_কি জানি। অতকিছু জানি না।

আড়চোখে প্রিতম তাকায় ইনায়ার দিকে। গলা খাঁকারি দিয়ে বলে,“তোমরা কাজিন তাই না?”

ইনায়া কিছুটা সময় চুপ থেকে বলে,“হু। বাবা মা সবার আলাদা তবে আমরা ভাই-বোন। কাজিন-ফাজিন বুঝিনা।”

প্রিতম পাল্টা জবাব না দেয়াতে ইনায়া জানতে চায়,“আচ্ছা একটা কথা জিজ্ঞেস করি?”

_করো।

_আপনার চোখ দুটো এতোটা নীল কি করে? মানে নরমাল বাঙালিদের মতো মনে হয়না আপনাকে।

প্রিতম একপলক ইনায়াকে দেখে জবাব দিলো,“আমার মা ছিলেন রাশিয়ান।”

_ছিলেন?
খানিকটা অবাক ইনায়া। প্রিতম স্বাভাবিক ভাবেই জবাব দেয়,“হু। ছিলেন। আমার মা বাবা কেউই জীবিত নেই। শুধু দুটো বোন আছে আমার। বড় আপু আর ছোটো বোন।”

ইনায়ার ভীষণ খারাপ লাগলো হঠাৎ তার সামনে বসে থাকা লম্বা সুদর্শন লোকটির জন্য। ঠিক যতটা খারাপ তার লেগেছে,ততটাই কৌতুহলী হয়ে ওঠে সে প্রিতমের ব্যাপারে। হুট করে বলে ওঠে,“আপনার পরিবারের কথা বলুন। মানে রাশিয়া থেকে আমাদের শহর!”

প্রিতম স্মিত হেসে বলে,“পরিবার? পরিবার বলতে,ঐ যে বললাম। দু'টো বোন আছে। বড় আপুর নাম প্রেরনা,ছোটো বোন প্রনমি। সে তোমার বয়সী। আমার বাবা মা আমরা খুব ছোটো থাকতেই মারা যান।
বাবা ছিলেন একজন বিজনেসম্যান। মা ছিলেন একজন রাশিয়ান স্টেজ সিঙ্গার । তাদের ভালোবাসার বিয়ে। মা মুসলিম হয়ে বাবাকে বিয়ে করেন। কিন্তু দাদী এই বিয়ে কখনোই মানেনি। বাবাও আর মা'কে কিংবা আমাদের দেশে নিয়ে যাননি। আমরা বেড়ে উঠতে থাকলাম সুদূর মস্কোতে,সবকিছু ঠিকঠাক ছিলো। হঠাৎ বাবা খুব বড় একটা লস খায় বিজনেসে। শেয়ার হোল্ডারদের ক্ষতিপূরণ,ব্যাংক লোন দিতে গিয়ে দেওলিয়া প্রায়। পথে বসলাম সবাই। আমাদের স্থান হলো একটা মস্কোর একটা বস্তিতে ‌। কাছেই একটা লোকাল স্কুলে ভর্তি করানো হলো আপু আর আমাকে। হঠাৎ একদিন আমরা স্কুল থেকে ফিরে দেখলাম বাবা মা'রা গিয়েছেন। সুই'সাই'ড ছিলো, কপালে রিভলভার ঠেকিয়ে নিজেকে শেষ করেছে বাবা। মা বাবার এমন মৃ'ত্যু মেনে নিতে পারলো না, সেও চলে গেলো বাবার মৃত্যুর পঁচিশ দিনের মাথায়। আমি তখন বারো বছর বয়সী,বড় আপু পনেরো আর প্রনমি পাঁচ। ঐ অবস্থায় আমরা তিন ভাইবোন অথৈ সাগরে ভাসতে লাগলাম। ধর্মান্তরিত হওয়ার কারনে আমার মাকে কিংবা আমাদের পরিচয় দেয়নি আমার নানা বাড়ির লোক। আমরা তিনভাইবোন কিছুদিন একটা আশ্রমে পরে থাকলাম। ঠিক সে সময় দেশে আমার দাদী পুত্রশোক কাটিয়ে খোঁজ লাগায় আমাদের। একটা দ্বাতব্য সংস্থ্যা আমাদের এদেশে আসার ব্যবস্থা করে দিলো। আমরা বাংলাদেশে এলাম। দাদীর আশ্রয়ে বছর খানেক থাকতে পেরেছিলাম। দাদীও মা'রা যান। অতঃপর আমাদের স্থান হয় আমার ছোটো ফুপির বাড়িতে। ওখানে থেকে তিন ভাইবোন পড়াশোনা করতে লাগলাম। ফুপার অবস্থা অতটা ভালো ছিলো না, আপু তাই খরচ চালানোর জন্য পার্লারে টুকটাক কাজ করতে শুরু করে। এভাবে যাযাবরের মতো বাঁচতে লাগলাম তিনভাইবোন। হঠাৎ একদিন আমার ছোটো বোনটা,যে কিনা ছয় বছর বয়সী ছিলো। সে একটা দূর্ঘটনায় তার দৃষ্টিশক্তি চিরতরে হারিয়ে ফেলে। আমার এক দুঃসম্পর্কের চাচা ওকে সম্ভবত রে'প করার চেষ্টা করেছিলো। নিজেকে বাঁচিয়ে দৌড়াতে গিয়ে উঁচু সিঁড়ি থেকে পরে যায় প্রনমি। আজীবনের জন্য দৃষ্টি প্রতিবন্ধী ট্যাগ লেগে যায় ওর নামের পাশে...”

এতটুকু বলে প্রিতম থেমে গেলো। ইনায়ার দু'চোখে তখন পানি জমেছে লোকটার কথা শুনে। বুকটা ভারি হয়ে উঠেছে। একবার চাইলো লোকটাকে বলবে,“থাক আর কিছু শুনতে চাইছি না। ”

কিন্তু সে বললো না, তার ভীষণ জানতে ইচ্ছে করলো ঐ মানুষটার কথা। প্রিতম বলতে থাকলো,“দাদীর গয়না বেঁচে চিকিৎসা করিয়েও প্রনমিকে ঠিক করতে পারিনি, কখনো ঠিক হবেও না। বড় আপু পড়াশোনা ছেড়ে দিলো পুরোপুরি। পার্লারে কাজ করতো আর আমাদের পড়াতো। উনিশ বছর বয়সেই যথেষ্ট দায়িত্বশীল মেয়ে হয়ে উঠেছিলো আপু।
হঠাৎ একদিন,এক পারিবারিক অনুষ্ঠানে আপুকে দেখে ফেলে আমার ফুপির বাড়ির দিকের এক আত্মীয়। লোকটার নাম শাওকাত ওয়াসীত। প্রথম দেখাতেই আপুকে পছন্দ করে আমাদের ব্যাপারে খোঁজখবর নেয়। ঠিক দু'দিন পরেই ফুপির কাছে বিয়ের প্রস্তাব পাঠায় সে। তিনিও ছিলেন আমাদের মতো এতিম। পেশায় একজন আর্মি মেজর ছিলেন।
প্রস্তাব পেয়ে আপু নাকচ করলো, দুলাভাইয়ের বয়সটা একটু বেশি ছিলো আপুর থেকে। পরে ফুপি অনেক বুঝিয়ে আপুকে রাজি করালেন।
বিয়েটা হলো, আমরা পেলাম একজন অভিভাবক। আপু পাগলের মত ভালোবেসে ফেললো তার স্বামীকে। দুলাভাই আমাদের দুই ভাইবোনের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিলো পুরোটা। ঐ দূর্ঘটনার পরে প্রনমির মনস্তাত্ত্বিক অনেক জটিলতা দেখা দিয়েছিলো। তার নিয়মিত চিকিৎসা থেকে শুরু করে আমার পড়াশোনা। সব কিছু ভাইয়া দেখতো। আপুকেও আবার ভর্তি করিয়ে গ্রাজুয়েশন কমপ্লিট করালেন। বিয়ের চারবছরের মাথায় যখন আপু সাড়ে আট মাসের গর্ভবতী,তখন খবর এলো দুলাভাই মা'রা গিয়েছেন। একটা মিশন চলাকালীন সময়ে। ”

ছলোছলো চোখে ইনায়া শুনছিলো প্রিতমের কথাগুলো, ধরা গলায় বললো,“আর তারপর?”

_তারপর আর কি? আমাদের অবস্থা হলো জসীম উদ্দিনের সেই কবর কবিতাটার ঐ লাইনটার মতো বুঝলে? “যেখানে যাহারে জরায়ে ধরেছি সেই চলে গেছে ছাড়ি।”

একটু দম নিলো প্রিতম, বলতে লাগলো,“শুদ্ধ,আপুর ছেলেটা জন্মালো। আপু সরকার থেকে অনেক টাকা পেলো, দুলাভাইয়ের সেভিংস তো ছিলোই। আমি তখন তোমাদের শহরে থাকতাম, পড়াশোনার কারণে। টুকটাক টিউশনিও করাতে শুরু করলাম কারণ তখন আপুর কাছে হাত পাততে বাঁধতো খুব। আপু প্রনমি,শুদ্ধ আর মিস জেনিকে নিয়ে দুলাভাইয়ের বাড়িতে থাকতো,মিস জেনি ছিলেন আমাদের ছোটোবেলার গভর্নেস। আপুর বিয়ের পর একদিন মস্কো থেকে এলেন আমাদের খোঁজে। সেই থেকে আমাদের সাথেই আছে এদেশে।
আমাদের এক ফুপাতো দুলাভাই ছিলেন, বড় ফুপার মেয়ে জামাই।সে টুকটাক আপুর সুবিধা অসুবিধা দেখতেন। বিষয়টা আমার সেই বোনের পছন্দ হয়নি। আপুও যথাসম্ভব সেই দুলাভাইকে এড়িয়ে যেতেন। শেষমেশ আপুকে একদিন খুব অপবাদ দিলো ঐ বোনটি। সেই থেকে আপুর ডিপ্রেশন শুরু হলো। তার ওপর আমাদের সেই দূরসম্পর্কের চাচাও জেল থেকে ছাড়া পেলো। সব মিলিয়ে আপুর কাছে ঐ শহরটা বিষাক্ত লাগতে শুরু করলো। আমি আপুকে এখানে,এই শহরে নিয়ে এলাম। দুলাভাইয়ের সেই বাড়িটা বিক্রি করে আপু একটা ফ্ল্যাট কিনলো। আর ভাইয়ার সব সেভিংস দিয়ে শুরু করলো বিজনেস। আল্লাহ আপুকে বিপদ দিলেও কখনও থামিয়ে রাখেনি জানো। যথেষ্ট সফল সে হয়েছে। আমরাও খুব ভালো আছি। আমিও সফল বলতে গেলে, টুক টাক ফ্রিল্যান্সিং করে দারুণ যাচ্ছে দিন। আর প্রনমি! ওকেও আগলে রাখার জন্য আমি আর আপু আছি বর্তমানে। এইতোহ, এই হচ্ছে আমার পরিবারের গল্প। এভাবে তোমাদের শহরে এলাম!”

থামলো প্রিতম, তাকালো ইনায়ার দিকে। ইনায়া চোখ সরিয়ে নিয়েছে ততক্ষণে। তার চোখ দুটি যে ভেজা। একটা লম্বা শ্বাস ফেলে গলা ঠিক করে বললো,“সরি!”

প্রিতম ম্লান হাসলো। বললো,“সরি কেনো?”

_এভাবে খুঁচিয়ে জানতে চাইলাম সব। আর, আর আমার আপুর জন্য খুব খারাপ লাগছে। তাকে আমি দেখেছি সম্ভবত। ভীষণ সুন্দরী। চোখ ধাঁধিয়ে যায়।

প্রিতম মুচকি হাসলো। পরিবেশটা কেমন গুমোট হয়ে গিয়েছে। নিজেকে ধাতস্থ করে ইনায়ার দিকে তাকিয়ে বললো,“তোমার পরিবার নিয়ে কিছু বলো। সব তো আমারটাই শুনে নিলে।”

মৃদু হেসে ইনায়া বললো,“আমার পরিবার? আমার পরিবার নিয়ে আর কি বলবো। নিঃসন্দেহে একটা একান্নবর্তী সুখী পরিবার। আমি সবার খুব আদরের।”

_তা বুঝতে পেরেছি।

ইনায়া মুচকি হাসে। প্রিতম বলে,“আচ্ছা তুমি রাজি কিভাবে করালে তোমার ফ্যামিলিকে? এতো দূর আসতে দিলো এতো আদরের মেয়েকে? ইহান আর ইরফান মির্জার আহ্লাদী বোনকে।”

ইনায়া লজ্জিত ভঙ্গিতে বলে,“না। প্রথমে রাজি ছিলো না। পরে ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল করলাম বড়দের।”

_অন্যায় করেছো।

_হু,জানি তো। তবে আমি কি করতাম ? আমি যাস্ট হাঁপিয়ে উঠেছিলাম একঘেয়েমির জীবনে। ঘরকুনো ব্যঙ ছিলাম। সবাই আমাকে কি ডাকে জানেন, ব্রয়লার মুরগি।

প্রিতম চকিতে ফিরে চায় ইনায়ার দিকে। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলে,“এভাবে বলে?”

_হু।

_তুমি একটু মোটা, এটা কোনো খুঁত নয়। এটা তোমার স্বকীয়তা। তাই এভাবে আর কখনও অন্যের কথায় প্রভাবিত হয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেবে না।

ইনায়া মাথা নিচু করে মুচকি হাসে। মোটা হওয়াটা খুঁত-ই। সেজন্যই তো ইনায়া কখনও লাইফে একটা লাভ কনফেশন পায়নি,না কেউ কখনও তাকে প্রপোজ করেছে। অথচ ওর সব বান্ধবীরা রোজ দুটো করে পায়। অবশ্য এ নিয়ে ইনায়া থোড়াই কেয়ার করে। সে তো নিজের ক্যারিয়ার নিয়ে ভাবে সবসময়।

প্রিতম ইনায়ার অন্যমনস্কতা দেখে তুড়ি বাজালো। ইনায়ার ঘোর কেটে যায়। প্রিতম বলে,“কিছু সময় ঘুমাও। সকাল হতে দেড়ি নেই সম্ভবত। আমাদের বেরিয়ে পরতে হবে।”

তখুনি হাই তুলতে তুলতে ঘুম ভে'ঙ্গে উঠে বসে জামি, বিরক্তি মাখা কন্ঠে প্রিতমকে বলে,“ভাই তোদের প্রবলেম কি? ঠিকমতো ঘুমোতেও দিবি না? তোদের থেকে তো ঐ টেরোরিস্ট গুলো ভালো।”

ইনায়া আর প্রিতম দু'জন হাসলো। জামি চোখ মেলে ওদের দিকে তাকিয়ে থাকে। প্রিতম বলে,“ও কাঁদছিলো। তাই ভাবলাম গল্প করি। তুই ও আয়!”

জামি প্রিতমের আচরণে বারংবার অবাক হচ্ছে। মেয়েটাকে নিয়ে আদিখ্যেতার শেষ নেই। এই প্রিতমের মনে নিশ্চই কিছু চলছে,ভাবলো জামি।

এক ঝটকায় সব মনে হওয়া ধারণাকে ঘা'ড় ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে জামি উঠে দাঁড়িয়ে ইনায়ার পাশে গিয়ে বসলো, নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখেই। নরম গলায় বলল,“কাদছিলে? দেখো মেয়ে। ভয় পেয়ো না। আমরা খারাপ লোক নই। নিজেরা সেইফলি এখান থেকে বেরোতে পারলে তোমাকেও সাথে করে নিয়ে যাবো।”

ইনায়া জবাবে শুধু হাসে। প্রচুর মশা এই পাহাড়ে। জামি দুবার মুখে চ বর্গীয় শব্দ করে বলে,“এই বা'লের মশা গুলোকে কি করি বলতো!”

মুখ চেপে হাসছে ইনায়া। জামি বললো,“হাসছো কেন? গালি দিলাম বলে? তোমার মেজো দাদানের থেকে কম গালাগাল দেই আমি!”

_আপনি আবার আমার মেজো দাদানকে নিয়ে পরলেন?

ব্যস আবার ঝগড়া শুরু। প্রিতম ওদের কান্ড দেখে হেসে আসেপাশে তাকিয়ে কিছু শুকনো ডালপালা তুলে জরো করে। ইনায়া আর জামি ঝগড়া থামিয়ে প্রিতমের দিকে তাকায়। প্রিতম একটা বড় শুকনো ডাল মাঝখান থেকে ভেঙে নিচে সাজিয়ে রেখে বলে,“আগুন জ্বালাবো। মশা চলে যাবে।”

ইনায়া তাকিয়ে দেখছে প্রিতমকে। একটু মনোযোগ দিয়েই দেখছে। লোকটা ভীষণ সুদর্শন, রবার্ট প্যাটিনসনের মতো দেখতে। ভেবে ইনায়া মুচকি হাসে। জামি আড়চোখে ইনায়াকে একপলক দেখে তার দৃষ্টি অনুসরণ করে প্রিতমের দিকে তাকায়। বিষয়টা সে ধরতে পেরেছে। ইনায়ার দিকে কিছুটা চে'পে বসলো জামি। ফিসফিসিয়ে ইনায়াকে বললো,“এই মেয়ে। তুমি আমার বন্ধুকে এভাবে দেখবে না। তোমাকে আমার ভাবী হিসেবে পছন্দ হয়নি।”

ইনায়া চকিতে ফিরে জামির দিকে তাকায়। জামির কথায় তার রাগ হওয়ার কথা ছিলো। কিন্তু হলো না। পর পর লজ্জা পায় কোনো অজানা কারনে। আড়চোখে আরও একপলক প্রিতমের দিকে তাকায় সে,জামির নিষেধ অমান্য করে।

★★★

প্রেরনা ঠাঁয় দাঁড়িয়ে। ইহান ইরফান দু'জনেই এগিয়ে যায়। সেনাদের মধ্যে থেকে একজন,যে খুব সম্ভবত সেকেন্ড লেফটেন্যান্ট। সে প্রেরনাকে উদ্দেশ্য করে বললো,“মিস শান্ত হোন। আপনি ব্যাপারটাকে জটিল করছেন।”

প্রেরনা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে, লোকটার দিকে তাকিয়ে বলে,“জটিল? আপনারা হস্টেজদের ফ্যামিলিকে ইনফর্ম করারও প্রয়োজন বোধ না করেই মিশনে নেমেছেন। কিছু বলছেনও না। জবাবদিহিতা চাইলাম বলে জটিল করে ফেললাম?”

গলা কাঁপছে প্রেরনার। আর্মি ক্যাম্পে অবস্থানরত বাদ বাকি সাধারণ জনতা বেরিয়ে আসে । ইহান আর ইরফান গিয়ে শুধু দেখছে প্রেরনাকে,তাদের বুঝতে বাকি নেই প্রেরনা কেন এসেছে এখানে।

প্রেরনা তাদের দুই ভাইকে দেখে ভীষণ অবাক হলেও বিশেষ পাত্তা না দিয়ে সেনা গুলোর দিকে একটার পর একটা প্রশ্ন ছুঁড়ে দিচ্ছে। ঠিক তখনই স্যাটেলাইট অপারেটিং টেন্ট থেকে একজন সেনা ছুটতে ছুটতে এসে সেকেন্ড লেফটেন্যান্টের পাশে এসে দাঁড়ায়, উঁচু গলায় বলে,“স্যার আপডেট! তড়াইয়ের হিশাম জঙ্গলে কাঞ্চি হ্রদের পাশে চারজন হস্টেজদের ডে'ড বডি পাওয়া গিয়েছে। বাকি ছয়জন জঙ্গিদের গুলিতে আহত। সাতাশ মিনিটের যুদ্ধের পরিসমাপ্তি। গাউফুন টিমের দুজন অ্যারেস্ট হয়েছে।”

প্রেরনা,ইহান, ইরফান তিনজনই বোকার মতো, একদৃষ্টে ইনফরমারের দিকে তাকিয়ে আছে। আশেপাশের প্রকৃতি গুমোট হয়ে উঠেছে। স্বজনদের আহাজারিতে শ্বাসরুদ্ধকর অবস্থা। শুধু নিশ্চুপ হয়ে রইলো ওরা তিনজন।

এবার পুরো কথাটা শেষ করলো লোকটা,“স্যার গাউফুন টিমের বাকিদের ধরা সম্ভব হয়নি। ওরা ভুটান সীমান্তের দিকে গিয়েছে সম্ভবত। স্যার যে তিনজন বন্দিদের অনুসন্ধান পাওয়া যায়নি তারা তিনজনই বাংলাদেশী। প্রিতম আহসান,জামি রহমান এবং ইনায়া মির্জা। তড়াইয়ের আশেপাশে ওদের খোঁজ চলছে। মাউন্ট স্যাংঞ্জার কাছে কিছু ডিটেক্ট করা গিয়েছে। হোপফুললি ওদের পেয়ে যাবো।”

ইহান ইরফান এক পলক লোকটার দিকে তাকালো। নিস্তব্ধ পরিবেশ চুড়মার করে ভেঙে ইরফান বি'কট চিৎকারে ইহানকে বলে,“দাদান চলো!”

ওরা দাঁড়ালো না আর এক মুহূর্তও। এক প্রকার ছুটে বেরিয়ে গেলো আর্মি ক্যাম্প থেকে। কি করবে ঠিক নেই,কি হয়েছে জানে না। শুধু জানে বোন আছে, বোনকে নিতে ছুটলো দুই ভাই।

প্রেরনাও দাঁড়াল না। সেনাদের চোখের সামনে থেকে দ্রুত সরে আর্মি ক্যাম্প থেকে বেরোলো। গন্তব্যের ঠিক নেই, পাশে কেউ নেই। শুধু আছে অদম্য ইচ্ছা শক্তি, অপরিমেয় ধৈর্য্যশক্তি,অক্ষয়িষ্ণু মানসিক শক্তি।

নাগোরকোট থেকে তড়াই অবধি ট্রান্সপোর্ট সার্ভিসের ওপর অনির্দিষ্টকালের জন্য নিষেধাজ্ঞা বসিয়েছে নাগোরকোট পুলিশ। তবে কিছু ইমার্জেন্সি ক্যাব আধাঘণ্টা অন্তর অন্তর যাত্রী পরিসেবা দিচ্ছে।

হাই-ওয়েতে উঠে ইহান আর ইরফান সৌভাগ্যক্রমে একটা ক্যাব পেয়েছে। তবে ক্যাবটিতে একটাই সিট। ইরফান হাশফাশ করছিলো। দাদানের দিকে তাকিয়ে বললো,“অপেক্ষা করতে পারবো না দাদান। তুমি নেক্সট ক্যাবে এসো। আমি চললাম।”

চোখের পলকেই লাফিয়ে উঠলো ক্যাবে। ইহান দাঁড়িয়ে আছে। ক্যাব ছেড়ে দিয়েছে ততক্ষণে। ইরফান চেঁ'চি'য়ে বলছে,“দাদান বাড়িতে জানিয়ে দাও বোন আছে!”

ঠাঁয় দাঁড়িয়ে রইলো ইহান। চঞ্চল ছেলেটা কখন কি করে বসে বোঝা দুষ্কর। হাতের ঘড়িতে সময় দেখে সে।

আধাঘণ্টা তাকে অপেক্ষা করতে হয়নি। পুতালিবাজার এরিয়া থেকে একটা ক্যাব এসে হাইওয়েতে হাজির হয় বিশ মিনিটের মাথায়।

প্রেরনা দ্রুত হাঁটছে। এতো লম্বা জার্নিতে শাড়ি এলোমেলো হয়ে গিয়েছে পুরো। পেঁচিয়ে পরতে চাইছে যেন। তার হাতের ফোনটা অবিরত বেজে চলেছে । জামির মা-বাবার ফোন। রিসিভ করতে পারলো না প্রেরনা। ক্যাব দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তড়িঘড়ি করে ছুটে উঠে বসে, ততক্ষণে ইহান ক্যাবের আরেকপাশের দরজা খুলে উঠলো।
প্রেরনা তাকিয়ে আছে ইহানের দিকে। ইহানও তাই। ক্যাব ড্রাইভার স্পষ্ট ইংরেজিতে বললো,“কোন পয়েন্ট?”

ইহান আর প্রেরনা দুজন দুজনের দিকে তাকিয়েই অস্ফুটে বললো,“তড়াই পুলিশ স্টেশন।”

★★★

নিজের স্ত্রীর নরম হাত দু'টো মুঠি করে ধরে রেখেছে ইশমাম। পরী শুধু স্বামীর দিকে তাকিয়ে আছে, নিস্প্রান দু'টো চোখে। ভদ্রমহিলার দু'চোখের নিচে কালি জমেছে। কালসিটে পরেছে সুশ্রী মুখটাতে। ইশমাম মির্জা ফোঁস শব্দে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে স্ত্রীর চোখে চোখ রেখে বলে,“আমি খুব ব্যর্থ বাবা।”

দু'চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পরলো পরীর। অস্ফুটে আবারও আওড়ালো,“আমার মেয়েকে এনে দিন।”

হুহু করে কেঁদে ওঠে ইশমাম। কাঁদছে পরীও। কেবিনের বাইরে দাঁড়িয়ে দরজার কাচ গলিয়ে ইনশিরাহ এই দৃশ্যটা দেখে চোখ সরিয়ে নেয়। বাড়ির সবাইকে জোর করে বাড়িতে পাঠিয়ে থেকে গিয়েছে সামিন, ইনশিরাহ আর ইশমাম। তিনরাত ধরে হসপিটালেই থেকেছে মেয়েটা। উষ্কখুষ্ক চুল একটা ক্লাচারে আটকে রাখা। ঘুরে দাঁড়াতেই দেখতে পায় মুঈনকে। কিছু সময় তার দিকে তাকিয়ে থাকে ইনশিরাহ।
তারপর একটা লম্বা শ্বাস ফেলে এগিয়ে যায়। ব'লিষ্ঠদেহী গম্ভীর পুরুষটি তার দিকে এগোতে থাকা এলোমেলো মেয়েটিকে দেখে বিব্রত হয় খুব। আবারও সেই অদ্ভুত অস্বস্তি। চোখ সরিয়ে অন্যদিকে তাকায় সে। ইনশিরাহ গিয়ে মুঈনের মুখোমুখি দাঁড়ায়। কন্ঠে কোমলতা ঢেলে বলে,“দুরাত ধরে আমাদের পরিবারের পাশে আছেন। আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ।”

মুঈন অপলক তাকিয়ে আছে ইনশিরাহর দিকে। না কোনো জবাব দেয়, না কঠিন চেহারায় কোনো পরিবর্তন আনে। ইনশিরাহ বলতে থাকে,“আপনার তো ডিউটি আছে। আপনি বিশ্রাম নিন অনুগ্রহ করে!”

মুঈন তবুও দাঁড়িয়ে রইলো। ইনশিরাহ যাকে জাঁদরেল হিসেবে জানে সে যে নিজের অদ্ভুত অনুভূতির অস্বস্তি লুকোতে চেহারা অস্বাভাবিক কঠিন করে রাখে সেটি সম্পর্কে ইনশিরাহ তো জানতেই পারলো না। ঘুরে দাঁড়ায় ইনশিরাহ, তখনই তার ফোন বেজে ওঠে, ইহানের ফোনকল।

কাঁপা হাতে ফোনটা রিসিভ করে সে। মুঈন ফরাজী তাকিয়ে আছে তার কাঁপতে থাকা হাতের দিকে।

দুমিনিট নিরব থেকে ইহানের কথা শুনলো ইনশিরাহ। পরপর কেঁদে ফেললো সে।

মুঈনের মুখভঙ্গি বদলে গেলো। এগিয়ে গেলো দুকদম। কাঠিন্যতার খোলস থেকে বেরিয়ে সে নরম গলায় বললো,“হেই ইনশিরাহ! স্টপ বিহেভিং সো নেইভ। পরী আন্টি সুস্থ হয়নি। টেল মি? ইহান কি বলল?”

ইনশিরাহ কান্নার দমকে কেঁপে কেঁপে উঠছে। মুঈন অধৈর্য হলো, নিজেই ইহানের নাম্বার ডায়াল করলো। তখনই ইনশিরাহ হাঁপাতে হাঁপাতে বললো,“বোনুর খোঁজ পাওয়া গিয়েছে।”

ক্যাব এগিয়ে চলেছে নির্দিষ্ট গতিতে। প্রেরনা খেই হারিয়ে ধ'ম'কে দুবার গতি বাড়াতে বলেছে-ও। উদ্বিগ্নতায়, অস্থিরতায়, উৎকণ্ঠায় প্রেরণা হাশফাশ করছিলো। ইহান ইনশিরাহর সাথে কথা বলে নীরব হয়ে আছে। প্রেরনার সাথে তার কথা হয়নি কোনো। অথচ দু'জনেই পাশাপাশি দু'টো সিটে বসে।
প্রেরনা হঠাৎ টের পেলো তার বমি পাচ্ছে। পাবেই তো। দীর্ঘ আঠেরো ঘন্টা ধরে পেট খালি। চার বছর ধরে খাওয়াদাওয়ায় অনিয়ম করা প্রেরণা গ্যাসট্রিকের সমস্যায় ভুগছে বেশ। বমি সে করেই দেবে সম্ভবত। উঁচু গলায় ক্যাব ড্রাইভারকে গাড়ি থামাতে বললো প্রেরনা। ইহান তাকালো প্রেরনার দিকে।
ততক্ষণে প্রেরনা ক্যাব থেকে দ্রুত নেমে কিছুটা দূরে গিয়ে হরহর করে বমি করে দেয়। পুরো পেট খালি। পানির মতো বস্তু নির্গত হয়েছে।

ইহান চুপচাপ বসে আছে প্রেরনার দিকে দৃষ্টি দিয়ে। সে ভীষণ অপ্রস্তুত হয়ে পরেছে। কি করবে বুঝতে পারছে না। ক্যাব ড্রাইভার ইহানকে বললো,“স্যার আপনার ওয়াইফ বমি করছে। যান গিয়ে ধরুন!”

চলমান.....

বানানের প্রচুর ভুল,রিচেক দিতে পারিনি। মানিয়ে নিন। পরে এডিট করে দেবো।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 21 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন