ফন্ট সাইজ:
থিম:
বধূ কোন আলো লাগল চোখে ২

পর্ব 22

লেখক: ইসরাত ইতি

#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_২২
#ইসরাত_ইতি

🚫কঠোর ভাবে প্রাপ্তমনস্কদের জন্য।

🚫শিক্ষা ও সাহিত্যের সাথে আমার এই কল্পিত ঘটনাগুলোর লিখিত শব্দগুলোর কোনো সম্পৃক্ততা নেই।

ক্যাব চালকের কথায় ইহান খানিকটা অপ্রস্তুত হয়ে তাকালো। ক্যাব চালক দ্বিতীয় বার বললো,“স্যার আপনার ওয়াইফ...”

কিছুটা বিব্রত ভঙ্গিতে,বিনয়ী সুরে ইহান ক্যাব চালককে বললো,“উনি আমার স্ত্রী নন।”

এবার বিব্রত হবার পালা এলো ক্যাব চালকের। লজ্জিত ভঙ্গিতে বলল,“স্যরি স্যার। আসলে একসাথে উঠলেন আর.....”

_ইটস ওকে!
ঠান্ডা গলায় জবাব দিলো ইহান। তার দৃষ্টি বাইরে প্রেরনার দিকে। ভদ্রমহিলাকে দেখে মনে হচ্ছে তার সাহায্য প্রয়োজন। কিন্তু ইহান অযাচিত সাহায্য করতে গেলে যদি সেটা বিরক্তি হয়ে দাঁড়ায় তাই আর কিছু ভাবলো না সে।
ঠাঁয় বসে থাকলো তিনমিনিট। ক্যাব চালক একটু উঁচু গলায় প্রেরনাকে বললো,“ম্যাম সাহায্য লাগবে?”

প্রেরনা জবাব দিচ্ছে না। বুকে হাত দিয়ে হাপাচ্ছে। ইহান এবার জড়তা কাটিয়ে ক্যাব থেকে একটা পানির বোতল নিয়ে নেমে দাঁড়ালো, লম্বা কদমে এগিয়ে গেলো প্রেরনার দিকে। মুখে কিছু বললো না শুধু পানির বোতল এগিয়ে দিলো প্রেরনার সামনে।

ফরসা মুখটা লালচে হয়ে আছে। কপালে বিন্দু বিন্দু ঘামের ফোঁটা জমেছে। ল্যাম্পোস্টের আলোতে তা চকচক করছে। নীলমণির চোখের দৃষ্টি ঘোলাটে। ইহান তাকিয়ে আছে নির্নিমেষ। প্রেরনা কোনো সংকোচ ছাড়াই কাঁপা কাঁপা হাতে বোতলটা নিয়ে নায়। তার গোটা শরীরটাই কাঁপছে।
মুখে পানির ঝাপটা দিয়ে, সামান্য কুলি করলো সে। ইহানের গম্ভীর পুরুষালি কন্ঠ তাকে শুধায়,“আর ইউ ওকে?”

প্রেরনা দু'পাশে মাথা ঝাঁকিয়ে কম্পিত হাতে তার পার্স থেকে ব্যাংকিং কার্ডটা বের করে ইহানের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো,“যদি কিছু মনে না করেন ঐ স্টোর থেকে আমার জন্য কিছু প্যাকেটজাত খাবার এনে দিলে খুব উপকৃত হতাম। আসলে আমার বোধহয় আর দাঁড়ানোর শক্তি নেই।”

ইহান প্রেরনার হাতের কার্ডটার দিকে তাকিয়ে আছে। প্রেরনা ততক্ষণে একটু ধাতস্থ হয়। ইহানের চোখের দিকে তাকিয়ে বলে,“প্লিজ।”

ইহান ম্লান হাসে। তারপর আশেপাশে তাকিয়ে একজন রোডসাইড ফল বিক্রেতা মহিলাকে ডেকে অনুরোধের সুরে বলে,“আন্টি ওনাকে একটু ধরে গাড়ীতে বসিয়ে দিন। উনি অসুস্থ।”

নেপালি ভদ্রমহিলা প্রেরনাকে ধরে। প্রেরনা তার হাতের কার্ডটা তখনও ইহানের দিকে এগিয়ে ধরে কোনোমতে বললো,“এটা নিন।”

ইহান আবারও প্রেরনার হাতের দিকে তাকায়। তারপর কার্ডটা না নিয়েই চলে যায়।

সিটে পিঠ হেলিয়ে দু'চোখ বুজে আছে প্রেরনা। শাড়ির আঁচলটা ডান কাঁধে জরানো। শীত লাগছে বেশ। শালটা সাথে করে আনেনি। নাগোরকোটে যে হোমস্টেতে প্রেরনা উঠেছে সেখানে ফেলে এসেছে।
খানিক বাদে ইহান এলো। তার হাতে একটা প্যাকেট এবং পানির বোতল। সিটে বসে সেগুলো প্রেরনার হাতে দিয়ে ক্যাব ড্রাইভারকে বললো গাড়ি চালাতে।

গতি আগের থেকে কিছুটা বাড়িয়ে ক্যাব চলছে গন্তব্যের দিকে। প্রেরনা প্যাকেট খুলে দেখলো দুটো স্যান্ডউইচ আর রাইস কেক। চুপচাপ,বিনা বাক্য ব্যয়ে সামান্য পরিমাণ খেলো সেখান থেকে। তারপর পার্স থেকে একটা ওষুধ বের করে খেয়ে নিলো।
ইহান আড়চোখে একপলক প্রেরনাকে দেখে তার দৃষ্টি জানালার বাইরে রাখে। ইরফানকে কল করছে, ইরফান কলটা রিসিভ করছে না। ওদিকে দুবার ইনশিরাহ কল করেছে, ইশমাম কল করেছে। এতোবার বুঝিয়ে বলার পরেও বুঝতে চাইছে না কেউ।

প্রেরনা টিস্যু দিয়ে মুখটা মুছে এবার ইহানের দিকে তাকিয়ে বলে,“ধন্যবাদ।”

ইহান পুনরায় একপলক তাকিয়ে আবারও চোখ সরিয়ে নেয় কোনো জবাব না দিয়ে। প্রেরনা একটা হাঁফ ছেড়ে বললো,“খেয়াল করিনি ইনায়া মির্জাও ছিলো লিস্টে।”

_আমিও দেখিনি প্রিতম আর জামিকে।

প্রেরনা ম্লান হাসলো। ইহান প্রেরনার সে হাসির কারণ জানতে চাইলো না, খানিক বাদে বললো,“ভাইয়ের জন্য অনেক দৌড় ঝাঁপ করেন!”

_আপনিও দেখছি।
প্রেরনাও জবাব দেয়।

ইহান ভদ্রমহিলার মুখের দিকে আবারও তাকালো। এভাবে বার বার কোনো ভদ্রমহিলার মুখের দিকে তাকিয়ে কথা বলা অসৌজন্যতা, তবুও হয়ে যাচ্ছে। সে আসলে ভীষণ আশ্চর্য হচ্ছে। ভদ্রমহিলা মুখ থুবড়ে পরতে পরতে উঠে দাঁড়ায়, একা, সম্পুর্ন একা একটি মেয়ে হয়ে ভিনদেশে, অচেনা শহরে ভাইয়ের খোঁজে মরিয়া হয়ে রাত বিরেতে ছুটছে। সাহস প্রশংসার দাবি রাখে।

প্রেরনা ইহানের দিকে তাকাতেই সে চোখ সরিয়ে নেয়। প্রেরনা মৃদু আওয়াজে বলে,“পেয়ে যাবেন বোনকে। প্রার্থনা করি সে ভালো আছে।”

ইহান কিছু বললো না। তারও উচিত ছিলো প্রেরনাকে সান্ত্বনাবাণী দেওয়ার। কিন্তু সে যা বুঝেছে ভদ্রমহিলার এসবের প্রয়োজন নেই। সে যথেষ্ঠ শান্ত,শক্ত।

ক্যাব তড়াই পুলিশ স্টেশনে ওদের নামিয়ে দেয়। শারীরিক ভাবে প্রেরনা ঠিকঠাক কিছুটা। ইহান ক্যাব থেকে নেমে বিল পরিশোধ করে প্রেরনাকে বলে,“আপনি আমার পেছনে আসুন।”

প্রেরনা হাঁটছে। দুর্বল কদমে শাড়ি সামলে নিয়ে এগিয়ে চলছে ইহানের পিছুপিছু। একজন স্বল্পপরিচিত কিংবা পুরোটাই অপরিচিত লোকের পিছু পিছু।

★★★

বিশাখী থেকে ভুটান-মিয়ানমার-নেপাল সীমান্তে পাঁচ বার চক্কর দিয়েছে ইউ-এইচ-৬০ ব্ল্যাক হ্যক।

নিখোঁজ বন্দিদের অনুসন্ধান প্রক্রিয়া চলছে।

এদিকে তখন দাউদাউ করে আগুন জ্বলছে। ডালপালা গুলো আধা শুকনো থাকায় আগুন ধরাতে প্রিতমের বেশ বেগ পোহাতে হয়েছে। অবশেষে সে সফল। মুখে বিজয়ীর হাসি। তিনজন তিন দিকে বসে দৃষ্টি আগুনে নিবদ্ধ রেখেছে। মশার অস্তিত্ব ধ্বংস হয়েছে কিছুটা,জামিও তাই শান্ত।

ইনায়ার শীতশীত লাগছিলো খুব, আগুন টুকু পেয়ে আরামবোধ করছে মেয়েটা এখন। মুখের সন্তুষ্টির হাঁসি। আড়চোখে ইনায়া আরো একবার প্রিতমের দিকে তাকাতেই এবার প্রিতমের চোখে চোখাচোখি হয়। দু'জনেই বিব্রত হয়ে পরে, চোখ সরিয়ে নেয়।

জামি খুব বুদ্ধিমান ছেলে। তেরছা নজরে সবটা দেখছে সে। এবার মনে মনে প্রস্তুতি নিচ্ছে আর একবার দু'জন দু'জনের দিকে তাকালেই কিছু বলে দেবে দু'জনকে।

তিনজন তিন প্রান্তে বিচ্ছিন্ন হয়ে বসে আছে। ঠিক তখনই বজ্রধ্বনির আওয়াজে ওদের ঝিমিয়ে পরা মস্তিস্ক সজাগ হয়। তৎক্ষণাৎ আশেপাশে তাকায় ওরা। চারপাশ কাঁপিয়ে দিচ্ছে আওয়াজটা। ওদের মাথার উপর দিয়ে উড়ে চলে যায় ইউ-এইচ-৬০ ব্ল্যাক হ্যক।

কানে তালা লেগে গেলো তিনজনের। চোখ বড়বড় করে একে অপরকে তিন সেকেন্ড দেখে তারা। অচল,ক্লান্ত মস্তিস্ক বিষয়টা ধারণ করতে আরো কিছুক্ষণ সময় নিলো। হতভম্ব ভাব কাটিয়ে জামি উঠে দাঁড়িয়ে আগুন সমেত একটা ডাল তুলে নেয় হাতে। দু'পাশে নাড়িয়ে বি'কট আওয়াজে চেঁচিয়ে ওঠে,“হেল্প আস!”

উঠে দাঁড়ায় প্রিতম,উঠে দাঁড়ায় ইনায়া। তীব্র উত্তেজনায় হতবুদ্ধি হয়ে গিয়েছে ওরা। নিজেদের ধাতস্থ করে জ্বলন্ত ডাল হাতে তুলে নিয়ে চেঁচিয়ে চলেছে,“হেল্প আস!”

লাগাতার চেঁ'চি'য়েই যাচ্ছে তিনজন। গলা ভেঙে যাওয়ার মতো অবস্থা প্রায়।

কিন্তু কিছুক্ষণ যেতেই চেঁচামেচি থামিয়ে উদাস চোখে এঁকে অপরের দিকে তাকায় ওরা। রেসকিউ হেলিকপ্টার ততক্ষণে চলে গিয়েছে ওদের ছাড়িয়ে। শুনতে পায়নি কেউ ওদের।

মনক্ষুণ্ণ হয়ে ধপ করে বসে পরে জামি। বসে পরে ইনায়াও।

প্রিতম আশেপাশে তাকায়। পরিবেশটা আগের থেকেও বেশি আলোকিত লাগছে। খুব সম্ভবত ভোর হবে খানিক বাদেই। একটা লম্বা শ্বাস ফেলে সেও বসলো। জামি বললো,“শা'লা কপালই খারাপ। নিশ্চয়ই মরণ ডাকছে আমাদের। নয়তো কত কাছ থেকে ওরা গেলো। আমাদের ডাক শুনলোই না?”

_হয়তো। পাখার আওয়াজে শোনেনি।

জামি মুখে চ বর্গীয় শব্দ করে বলে,“চল যে যত পাপ করেছি জীবনে তার জন্য ক্ষমা চাই সৃষ্টি কর্তার কাছে।”

প্রিতম আর ইনায়া উদাস জামির কথা খুব মন দিয়ে শুনছিলো। জামি বলতে লাগলো,“কি? তোরা মনে হচ্ছে কোনো পাপ করিস নি?”

ইনায়া বললো,“করেছি তো। প্রচুর মিথ্যা কথা বলেছি আমি।”

প্রিতম জামি আর ইনায়ার কথোপকথন শুনে মনে মনে হাসলো। দু'জনেই একই প্রকৃতির ভাবলো প্রিতম। হুট করে ইনায়ার দিকে চোখ চলে যায় তার। কি কি মিথ্যা কথা বলেছে তার বিবরণ দিচ্ছে জামির কাছে,হাত নেড়ে নেড়ে মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে কথা বলছে। প্রিতম একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে ইনায়ার দিকে।
মেয়েটা জামির ভাষায় নিব্বি, তবে প্রিতমের এমনটা মনে হচ্ছে না এখন আর। মেয়েটি যা একটু আদুরে। তবে বুঝদার খুবই, বাধ্যও খুব। শিশুসুলভ স্নিগ্ধ একটি ব্যাপার রয়েছে মেয়েটির মাঝে। যা ওর বয়সী মেয়েদের নেই বর্তমানে।

ভাবতে ভাবতে প্রিতম নিজের প্রতি নিজেই বেশ অবাক হলো। এতো কেনো জাজ করছে মেয়েটিকে সে। থাক না যেমন থাকার। তাতে তার কি? লাজুক হেঁসে চোখ নামিয়ে প্রিতম আগুনের দিকে তাকিয়ে থাকে।
শত্রুর বোন, তিনদিনের সঙ্গী ছিলো প্রিতমের। আর কি? আর কিছুই না মেয়েটা। তাকে এতো জাজ করার দরকার নেই। কোনোই দরকার নেই।

অন্ধকার কে'টে যেতে শুরু করেছে, ওরা টের পেলো। আবারও দীর্ঘ সময়ের নীরবতা। আলো না ফুটলে কোথাও যাবে না তারা,এটাই সিদ্ধান্ত। ঘুম না হওয়ায় হাই তুলছিলো সবাই। তিনজনের চোখে মুখে ক্লান্তির ছটা।
হুট করে তখনই কানে এলো আবারও সেই আকাশ কাঁপানো বিকট শব্দ। উঠে দাঁড়ালো তিনজনই। হেলিকপ্টারটা ঘুরে আবারও চলে এলো তাদের কাছে।

জামি আবার দুহাত নে'ড়ে লাফিয়ে লাফিয়ে ডাকতে থাকে,“হেল্প আস!”

ইনায়াও জামিকে অনুসরণ করে চেঁচায়। দাঁড়িয়ে আছে প্রিতম। সে আর চেঁচানোর প্রয়োজন বোধ করে না। তার আর বুঝতে বাকি নেই তাদের রেসকিউ করতেই এসেছে সামরিক হেলিকপ্টারটা।

ওদের ঠিক মাথার ওপর কিছুটা উঁচুতেই এসে স্থির হয়েছে ইউ-এইচ-৬০ ব্ল্যাক হ্যক। ওরা তিনজন বাতাসের দাপটে ঠিকভাবে দাঁড়িয়ে থাকতেও পারছে না। উল্টেপাল্টে পরে যাওয়ার মতো অবস্থা তিনজনের।
জামি একটা গাছ জাপটে ধরে থাকে। ইনায়া খেই হারিয়ে পরে যেতে নিলে প্রিতম এসে তাকে আরো একবার ধরলো। ইনায়া তাকাল, নিঃসংকোচে শক্ত করে ধরে থাকলো প্রিতমের শার্ট। একজন সেনা ইতিমধ্যে শরীরে দড়ি বেঁধে ঝাঁপিয়ে পরেছে নিচে।

জামি কিছু বলতে যাবে ঠিক তখনই সেনা বললো,“ভাগ্যিস আগুন জ্বেলেছিলে নয়তো আরো ক'দিন থাকতে হতো এই মাউন্টে।”

প্রিতম চেঁচিয়ে বললো,“এটা কোন যায়গা?”

_এটা তড়াই থেকে দক্ষিণে। সীমান্তের কাছাকাছি। চলো তোমাদের উঠতে হবে। সবাই প্রস্তুত?

ওরা তিনজন মাথা ঝাকালো।
সেনা প্রথমে ইনায়াকে হুক পরিয়ে দিয়ে হেলিকপ্টারে ওঠালো। তারপর জামিকে। তারপর প্রিতমকে।

উত্তেজনায় বাকরুদ্ধ হয়ে আছে ইনায়া। পাথরের মতো বসে আছে একজন নেপালি সেনার পাশে। প্রিতম ওর দিকে তাকিয়ে বললো,“কি হলো?”

_আমরা সত্যিই বিপদমুক্ত?
অস্ফুটে বেরোলো কথাটা ইনায়ার মুখ থেকে।

প্রিতম হাসলো। মাথা ঝাঁকিয়ে বললো,“হ্যা, শত্রুর বোন।”

★★★

তড়াই পুলিশ স্টেশনে ইরফান আগেই পৌঁছে খোঁজ খবর নিয়ে বসেছিলো। জরুরি ভিত্তিতে পুলিশ ফোর্স বেরিয়েছে বন্দিদের জিম্মায় নিতে। রেসকিউ করে বন্দিদের নাগোরকোট আর্মি ক্যাম্পে নেওয়ার আগে এখানে নিয়ে আসা হবে।
ইহান আর প্রেরণা গিয়ে দাঁড়াল তখন। ইরফান মাথা তুলে দেখলো প্রেরণাকে। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে সে উঠে ইহানকে বলে বোনকে নিয়ে আসছে।

প্রেরণা দুকদম এগিয়ে যায় সামনে, খানিকটা কাতর হয়ে বলে,“আর আমার ভাইয়েরা?”

প্রেরণা বুঝতে পেরেছে সে ভুল মানুষকে প্রশ্ন ছুড়েছে তাই ঘুরে দাঁড়িয়ে দায়িত্বরত একজন পুলিশ কর্মকর্তাকে শুধালো,“প্রিতম আহসান এবং জামি রহমান?”

_মিস,খবর পেয়েছি একজন মেয়ে এবং দুজন ছেলে। আশা করছি তারাই হবে।

প্রেরণা বুকে হাত চেপে কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ করে দাঁড়িয়ে থেকে একটা গভীর নিঃশ্বাস ফেললো। তারপর একটা চেয়ারে ধপ করে বসে পরলো।

তড়াই পুলিশ স্টেশন থেকে দেড় কিলোমিটার দক্ষিণে রাঞ্চি স্টেডিয়াম। ইউ-এইচ-৬০ ব্ল্যা হ্যক টা তিনজন উদ্ধারকৃত বাংলাদেশী হস্টেজ নিয়ে অবতরণ করলো এখানে।
পুলিশের ফোর্স আগেই পৌঁছেছে। প্রেরণা, ইহান,ইরফান পৌঁছাল কিছু সময় আগে। খবর পেয়ে পোখারা থেকে ইমার্জেন্সি ফ্লাইটে রওনা দিয়েছে মিসেস মৈথি আর ইনায়ার পাঁচ বান্ধবী।

হেলিকপ্টার ল্যান্ড করার সাথে সাথে স্টেডিয়ামে অপেক্ষমান সাংবাদিকরা সরব হয়ে ছুটলো হেলিকপ্টারের কাছে।

শ্বাসরুদ্ধকর মুহূর্ত। প্রেরনা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে নিজের মনকে শক্ত রাখার। এতদূর পর্যন্ত যখন শক্ত থাকতে পেরেছে এখন কেঁদে কি লাভ হবে? বরং তা হাস্যকর হবে।

কিছুটা দূরত্বে ইহান আর ইরফান দুই ভাই টান টান হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হেলিকপ্টার থেকে সেনাদের সহযোগিতায় এক এক করে নামলো জামি,ইনায়া এবং সবশেষে প্রিতম। ওরা বিধ্বস্ত প্রায়। ইনায়ার গাঁয়েও শক্তি ফুরিয়ে এসেছে। দুর্বল শরীরে মাটিতে পা রাখার সাথে সাথে শরীর ভে'ঙে পরে যেতে চাইলো নাজুক মেয়েটা। পেছন থেকে আবারও ওকে ধরে ফেললো প্রিতম,শক্ত হাতে।

ইরফান মির্জা বোনকে রেখে তাকিয়ে আছে প্রিতমের ধরে থাকা বোনের হাতের দিকে। হুট করেই চোয়াল শক্ত হয়ে উঠলো তার অজানা কারনে।

আর এক মুহূর্তও দাঁড়িয়ে না থেকে এগিয়ে গেলো ইরফান,ইহান। ভাইকে দেখতে পেয়ে ছুটলো প্রেরণাও।

ইনায়া ঠিক হয়ে দাঁড়িয়ে ঘুরে তাকায় প্রিতমের দিকে,ধীরে ধীরে তার দৃষ্টি এসে নামে নিজের হাতে। যে হাত প্রিতম শক্ত করে ধরে ফেলেছে। দু'জন দু'জনের দিকে তাকিয়ে আছে। ইনায়া নির্নিমেষ দেখছে কালো মোটা ফ্রেমের চশমার নিচে গভীর নীল চোখ দু'টোকে, বিশ্বস্ত দুটি চোখকে।
হঠাৎ বাহুতে টান অনুভুত হতেই ইনায়ার ঘোর কাটে। ইরফান এসে বোনকে একপ্রকার ছো মেরে প্রিতমের হাত থেকে ছাড়িয়ে নেয়। ইনায়া বাকরুদ্ধ হয়ে কয়েকপল দুই দাদানকে দেখতে পেয়ে ঝাঁপিয়ে পরলো ইহানের গাঁয়ে। ফুঁপিয়ে উঠলো সে।

ইহান বোনের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। নরম গলায় বলছে,“সব ঠিক আছে বুড়ি! সব!”
ইরফান ঘাড় ঘুরিয়ে আবারও দেখলো প্রিতম আর জামিকে। ওরা দুজনও তাকিয়ে আছে ইরফানের দিকে।

প্রেরনা এগিয়ে গিয়ে ভাইকে জরিয়ে ধরলো। প্রিতম একটা লম্বা শ্বাস ছেড়ে বললো,“আপু আ'ম ফাইন। কিচ্ছু হয়নি। কিচ্ছু না।”

সাংবাদিকরা ওদের সবাইকে ঘিরে রেখেছে। ইরফান বোনকে ইহানের থেকে সরিয়ে এনে নিজের দিকে ঘুরিয়ে দাড় করালো। ইনায়া কাঁদছে। ইরফান ইনায়ার দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বলে,“সব ঠিক আছে। আমরা দেশে ফিরবো আজই। বাড়িতে ফিরবো।”

ইনায়ার গাঁয়ে প্রিতমের ব্রাউন জ্যাকেট টা ততক্ষণে চোখে পরে ইরফানের। এই জ্যাকেট টা প্রিতমের তা সে জানে। ভ্রু যুগল গুটিয়ে আসে তার। একপলক প্রিতমের দিকে তাকায় সে। তারপর বোনের দিকে তাকিয়ে ঠান্ডা গলায় বলে,“এটা পরেছিস কেন!”

ইনায়া কিছু বলতে যাবে তার আগেই ইরফান খানিক ধ'ম'কের সুরে বলে,“খোল এটা।”

ইনায়া ঘাবড়ালো ইরফানের ধ'ম'কে। সাথে সাথে জ্যাকেটটা খুলতেই ইরফান নিজের জ্যাকেট খুলে বোনকে পরতে বলে বোনের হাত থেকে প্রিতমের জ্যাকেটটা নিয়ে নিচে ছুড়ে ফেলে দেয়।

ইনায়া তখনও শীতে কাপছিলো, ইহান বোনের হাতে নিজের জ্যাকেটটাও খুলে দিয়ে দেয়। ইনায়া দুই দাদানের জ্যাকেট গাঁয়ে চাপিয়ে তাকিয়ে থাকে নিচে পরে থাকা প্রিতমের জ্যাকেটের দিকে।

প্রিতমও দেখছে অযত্নে,ধুলোয় পরে থাকা নিজের জ্যাকেট।

জামিও দেখেছে দৃশ্যটি। সে তার প্রিয় বন্ধুর মুখের দিকে তাকায়। প্রিতমের দৃষ্টি তখনও নিজের ধূলোমাখা জ্যাকেটের দিকে।

ইনায়া একটা ঢোক গিলে ইহানের দিকে তাকিয়ে বললো,“দাদান ওই জামি ভাইয়া আর প্রিতম,ওনারা আমাকে সেইভ করেছে....”

বাক্যটা সম্পূর্ণ করতে পারলো না ইনায়া। ইরফান খপ করে বোনের হাতটা তার শক্ত হাতের মুঠোয় নিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বললো,“চল এখন!”

প্রেরণা তাকিয়ে দেখছে ইরফান নামের রগ'চটা ছেলেটার ঔদ্ধত্যপূর্ন আচরণ। ইহানও ইরফানের এমন আচরণে বেশ বিব্রত, তাও এই পরিস্থিতিতে। একপলক ইনায়ার দিকে তাকালো সে, মেয়েটা কিছু একটা বলতে চাচ্ছে। অথচ ইরফান তার হাত ধরে টানছে কোনো কিছু না শুনেই।

প্রেরণা ইরফানের থেকে দৃষ্টি সরিয়ে ভাইয়ের দিকে তাকায়। নম্রস্বরে বলে,“চল এখন। থানায় যেতে হবে আমাদের।”

সাংবাদিকদের সরিয়ে দিয়েছে সেনাবাহিনীর লোক। পুলিশের দু'টো গাড়ি এসেছে উদ্ধারকৃত বন্দিদের নিতে। প্রেরণা প্রিতম আর জামিকে নিয়ে একটা গাড়ির দিকে এগিয়ে যায়। ইরফানও ইনায়াকে নিয়ে আরেকটা গাড়ির দিকে এগোতে থাকে। একজন সেনা এসে ইহানের সাথে কিছু কথা বলে করমর্দন করে চলে যায়।

গাড়িতে ওঠার আগ মুহূর্তে ইনায়া মাথা ঘুরিয়ে প্রিতমের দিকে তাকায়। প্রিতমও শান্ত চোখে তাকেই দেখছিলো চুপচাপ, তারপর স্মিত হেসে গাড়িতে উঠে বোনের পাশে বসে। ইনায়া কয়েক পল দাঁড়িয়ে থাকে অযথা, হঠাৎ তার হাতে টান লাগতেই চ'ম'কে ওঠে সে। ইরফান ইনায়াকে টেনে গাড়িতে বসিয়ে দেয়।
ইহান মাথা ঘুরিয়ে প্রেরণা প্রিতমদের আরো একবার দেখে উঠে পরে গাড়ীতে। সে বসেছে ইনায়ার পাশে। আর ইরফান বসেছে সামনের সারির সিটে।
গাড়ি চলতে শুরু করে। ওদের গাড়িতে তিনজন নেপালি পুলিশ অফিসারও ছিলো।
রাঞ্চি এরিয়া ছাড়িয়ে গেলে ইনায়াদের গাড়ি প্রিতমদের গাড়ি থেকে অনেকটা সামনে চলে যায়। ইনায়া দুর্বল শরীরটা সিটে হেলিয়ে দিয়ে ঝিমুচ্ছিলো। উঁচুনিচু মসৃণ রাস্তায় গাড়ির দুলুনিতে ঘুমিয়ে পরলো কিছুক্ষণ বাদেই। মাথা ঠেকলো বড় দাদানের কাঁধে। সামনের সিটে বসে মিররে ইরফান বোনের মুখের দিকেই তাকিয়ে ছিলো দীর্ঘসময়। মুখভঙ্গি শান্ত কিন্তু দৃষ্টি তীক্ষ্ম। হুট করে নীরবতা ভেঙে ইরফান ইনায়াকে বলে ওঠে,“ওরা আর তুই এক হলি কিভাবে?”

কঠিন ছিলো বাচনভঙ্গি। ইনায়া ঘুমিয়ে আছে,সারা দিলো না। ইহান ঘুমন্ত বোনের মাথাটা ঠিক করে দিয়ে ইরফানকে ধ'ম'কের সুরে বললো,“এখন ওকে জেরা করার সময়? স্টপ!”

চলমান.....

ভীষণ অসুস্থ। ঠিকঠাক ভাবে সাজিয়ে গুছিয়ে পর্বটা লিখতেও পারিনি। মানিয়ে নাও। আর কিছুদিন অনিয়ম হবে হয়তো। শারীরিক ভাবে ফিট নই আমি।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 22 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন