ফন্ট সাইজ:
থিম:
বধূ কোন আলো লাগল চোখে ২

পর্ব 23

লেখক: ইসরাত ইতি

#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_২৩
#ইসরাত_ইতি

🚫কঠোর ভাবে প্রাপ্তমনস্কদের জন্য।

🚫শিক্ষা ও সাহিত্যের সাথে আমার এই কল্পিত ঘটনাগুলোর লিখিত শব্দগুলোর কোনো সম্পৃক্ততা নেই।

তড়াই পুলিশ স্টেশনের বাইরে সাংবাদিকদের জটলা। তাদের সাথে ব্রিফিং শেষে পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা কম্পিউটার অপারেটিং রুমে এসে পৌঁছায়,যেখানে ইনায়া,প্রিতম এবং জামি রয়েছে।
মিসেস মৈথি ইনায়াকে জরিয়ে ধরে কাঁ'দছে। এ গালে,ও গালে,দুগালে অসংখ্য চুমু খেয়ে ফোপাচ্ছে ভদ্রমহিলা। ইনায়া নিজের ভোগান্তি ভুলে মৈথিকে সান্ত্বনা দিতে তৎপর হলো। ইনায়ার পাঁচ বান্ধবী দূরে দাঁড়িয়ে কাঁদছে,তারা একটু এসেছিলো ইনায়ার কাছে,ইনায়াকে জরিয়ে ধরতে,কিন্তু ইরফান মির্জার অগ্নিদৃষ্টিতে সবাই দমে যায়,পা বাড়ানোর সাহস করলো না আর সামনে।
কামরার দুপাশে দুটো জটলা। একপাশে প্রেরণা,প্রিতম,জামি এবং অন্যপাশে ইনায়ার পরিবার।
প্রেরণা চুপচাপ বসে আছে মাথাব্যথার ওষুধ খেয়ে। অল্পতেই মাথা ধরে তার, অসহনীয় যন্ত্রণা হয়। দাঁতে দাঁত চেপে হজম করছে যন্ত্রণা টুকু। এখান থেকে জলদি বেরোতে পারলে হোমস্টেতে গিয়ে একটু বিশ্রাম নেবে। ওদিকে প্রেরণার ফুপি মুবিনা জানিয়েছে শুদ্ধ দুদিন ধরে ভাত খায়নি। ধৈর্য্যের বাধ ভেঙ্গে যাচ্ছে যেন প্রেরণার।

তখনই ইহানের গলার স্বর কানে যেতেই প্রেরণা মাথা তুলে তাকায়। ইহান কখন ওদের কাছটাতে এসে দাঁড়িয়েছে সে টের-ই পায়নি। পরমুহূর্তে উঠে দাঁড়ায় সে। ইহান এসে দাঁড়িয়েছে প্রিতমের মুখোমুখি। শান্ত দৃষ্টি দু'চোখে। ধীরে ধীরে এক হাত প্রিতমের পিঠে রেখে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের নিমিত্তে মুখ থেকে অস্ফুটে বের করলো,“সবসময়ের জন্য কৃতজ্ঞ থাকবো। তুমি, তোমরা খুবই ভালো ছেলে।”

প্রিতম আর জামি স্মিত হাসলো। ইনায়া মাথা ঘুরিয়ে দেখছে ওদের। তার গোটা মনোযোগটাই প্রিতমের দিকে। বড় দাদান এই নিয়ে যে কয়বার প্রিতমকে শুকরিয়া জানিয়েছে ততবার ইনায়া পুলকিত হয়েছে। কেনো এমন হচ্ছে সে জানে না।
আড়চোখে ইনায়া একবার তার মেজো দাদানের দিকে তাকালো। এক কোণে বুকে হাত বেঁধে টানটান হয়ে দাঁড়িয়ে আছে শান্ত হয়ে। ইনায়া তবুও ভয় পাচ্ছে। মেজো দাদানের শান্ত, কঠিন সব রূপকেই সে ভয় পায়। বড় দাদানের কঠোর রূপ ইনায়াকে কখনো আ'ত'ঙ্কি'ত করে না। বড় দাদান সবসময় পারফেক্ট।

কিছুক্ষণ আগের ঘটনা গুলো ইনায়ার মস্তিস্কে হানা দেয় পুনর্বার। থানায় পৌঁছাতেই ঘুম ভে'ঙে যায় ইনায়ার। সবাই যখন পুলিশের লোকগুলোর সাথে কথা বলতে ব্যস্ত তখন ইরফান এসে ওর মুখোমুখি বসে, খুবই ঠাণ্ডা স্বরে ওকে জিজ্ঞেস করে,“ওরা তোর সাথে কোনো অশোভন আচরণ করেনি তো? দেখ আমাকে স্পষ্ট বলবি। এখানেই পুঁতে দিয়ে রেখে যাবো দু'টোকে তাহলে!”

“দাদান!”

ইনায়া রা'গে, দুঃখে বাকরুদ্ধ হওয়ার আগে জোরালো চিৎকার দিয়ে ইরফানকে থামিয়ে দিয়েছিলো। সবাই তখন ওকে অবাক হয়ে দেখেছে। ইনায়ার রাগে কান্না পাচ্ছিলো। কি করে দাদান এমন ভাবতে পারে! পরমুহূর্তে ইরফানের স্বভাব-চরিত্রের কথা ভেবে আর কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায়নি সে।
ছোটো বেলা থেকেই মেজো দাদান আর বড় দাদানের ভালোবাসা আর স্নেহে পার্থক্য খুঁজে পেয়েছে সে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ইনায়াকে কখনো একটা কুকুর তাড়া করলে বড় দাদান সবসময় আগে ইনায়াকে সুরক্ষিত করতো,আদর করে ভয় দূর করতো ইনায়ার, তারপর কুকুরটাকে প্রতিহত করতো। অপরদিকে ইরফান ছিলো পুরোপুরি বিপরীত,তার আগে কুকুরটাকে না মা'রা পর্যন্ত শান্তি হয় না, একবার কুকুর মা'রতে গিয়ে কুকুরের কামড় খেয়ে অপারেশন থিয়েটার অবধি গিয়েছিলো। আরো একটি ঘটনা মনে পরলো ইনায়ার, ছোটোবেলায় বাড়ির বড়রা একদিন কেউ-ই বাড়িতে ছিলো না, তখন বাড়িতে ছিলো ইহান, ইরফান, ইনশিরাহ, ইনায়া,শেহা আর দ্রীপ্ত। দ্রীপ্ত স্বভাবত খুব দস্যি ছিলো, ইনশিরাহর পোষা বিড়ালটাকে বড্ড জ্বালাচ্ছিলো। বিড়ালটা হঠাৎ দ্রীপ্তকে মারাত্মক আক্রমণ করে বসে। দ্রীপ্ত আহত হয় খুব। ঐ সময় বড় দাদান দ্রীপ্তকে কোলে নিয়ে যখন হসপিটালে ছুটছিলো তখন মেজো দাদান ইনশিরাহ আপুর পোষা বিড়ালটাকে আ'ছাড় মেরে মেরে মে'রেই ফেলেছিলো।
ঐ ঘটনার পরে মেজো দাদানকে সাইক্রিয়াটিস্ট দেখানোর সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছিলো। কিছু বছরের মধ্যে মেজো দাদানের স্বভাবে নম্রতা প্রকাশ পেলো। বড়রাও দুশ্চিন্তা মুক্ত হলো। কিন্তু আবার সেই আগের মতো অবস্থা হয়ে যাচ্ছে দিনকে দিন। ভীষণ প্রতিশোধ পরায়ণ হয়ে উঠেছে মেজো দাদান। বিশেষ করে ভাইবোনের ব্যাপারে হলে তো কথাই নেই।

ইহানের গলার আওয়াজে ঘোর কে'টে যায় ইনায়ার। ইহান ওর দিকে তাকিয়ে বললো,“হসপিটাল যেতে হবে। যাস্ট ফর নরমাল মেডিকেল চেকাপ।”

ইনায়া আড়চোখে আবারও মেজো দাদানকে দেখলো। তার দৃষ্টি অনুসরণ করে ইহানও তাকালো ইরফানের দিকে, অতঃপর এগিয়ে গেলো সে।
দাঁতে দাঁত চেপে কঠিন গলায় বললো,“প্রিতম আর জামিকে ধন্যবাদ বলে আয়।”

ইরফান তাকিয়ে আছে ইহানের দিকে। ইহানের গলার তেজ বেড়ে যায়।

“প্রিতমকে আর জামিকে ধন্যবাদ দিয়ে আয়। শুনলি তো থানায় এসে সবটা! তোর সাত বছরের শত্রুতা থাকতে পারে,তবে ও ইনুকে বাঁ'চতে হেল্প করেছে। যা গিয়ে কৃতজ্ঞতা জানা।”

পোটকা মাছের মতো ফুলে আছে ইরফানের গম্ভীর মুখটা। গমগম করে বললো,“তুমি তো দশবার জানালে!”

_ইরফান...

_হ্যা হ্যা আমিও কৃতজ্ঞ। আর রাঞ্চির ইন্সিডেন্ট টা সাডেন রিয়াক্ট ছিলো, ওভাবে ইনুর হাত ধরে রেখেছিলো তাই মেজাজ টা খিচে...

_পরিস্থিতি বুঝে রিয়াক্ট করতে শেখ। ওর গার্ডিয়ানের সামনে আমার মুখটা ছোট করিস বারবার।

ইরফান ভাইয়ের কথায় তার দিকে চোখ ছোট ছোট করে তাকালো, দৃষ্টি ঘুরিয়ে একবার দূরে প্রেরণাকেও দেখলো। পুনর্বার দাদানের দিকে তাকালো।
ইহান ভ্রু উচায়,“হোয়্যাট!”

ভাইয়ের ধ'ম'কে এগিয়ে যায় ইরফান। চঞ্চল পায়ে গিয়ে প্রিতমের পেছনে দাঁড়ায়। প্রিতম তখন প্রনমির সাথে ফোনে কথা বলছিলো,পিছু ফিরে তাকাতেই একটা ধাক্কার মতো খায়। তাকিয়ে থাকে অপলক। প্রেরণাও আশ্চর্য হয়ে গিয়েছে। ওদের দ্বিতীয় দফায় অবাক করে দিয়ে ইরফান বললো,“আমার বোন জেনেও এতো হেল্প করেছিস। তার জন্য থ্যাংকস।”

প্রেরণা দাঁড়ালো না,এগিয়ে গেলো ইনায়ার দিকে। মেয়েটার সাথে একটু কথা বলা প্রয়োজন। কোনো অসুবিধা আছে কিনা তাই জানতে হবে।

এবার আলাদা এক কোণে দাঁড়িয়ে প্রিতম আর ইরফান। জামি দূরে একটা সিটে বসে জুস খাচ্ছিলো। প্রেরণা চলে যেতেই ইরফান পুনরায় তার আগের রূপে ফিরে এলো। দাঁতে দাঁত চেপে নিচু স্বরে প্রিতমকে বললো,“মেয়ে দেখলে তোর একটু বেশিই হেল্প করতে ইচ্ছে হয়। ভার্সিটির মেয়েগুলো এজন্য তোর পিছে পিছে লাফাতো।”

প্রিতম একটুও অবাক হলো না ইরফানের এমন বহুরূপী আচরণে। এর মতো সাইকোপ্যাথের থেকে আর কিই বা আশা করা যায়। একটা প্রহসনের হাসি হেসে বললো,“তুই কখনো শোধরাবি না তাই না? ইহান তাজওয়ার মির্জা সত্যিই তোর ভাই? ইহান ভাইয়ার নখের যোগ্য নোস তুই।”

ইরফান আরো এক কদম প্রিতমের অভিমুখে এগিয়ে গেলো, চাঁপা স্বরে দাঁত খিচিয়ে বললো,“আর তুই খুব ভালো? ভার্সিটিতে গ্রুপ স্টাডির অজুহাতে বগলের নিচে মেয়ে নিয়ে ঘুরতিস। শা'লা লু'চ্চা!”

প্রিতম বহু কষ্টে নিজের ক্রোধ সংবরণ করলো। হাত মুষ্টিবদ্ধ তার। ইহান পুলিশের সাথে কথা শেষ করে ওদের দিকে এগিয়ে যেতেই দু'জন নিজেদের কথোপকথন থামিয়ে হাসি হাসি মুখ করে ফেললো। ইরফান দাদানকে দেখিয়ে দেখিয়ে আরও একবার প্রিতমকে বললো,“থ্যাংকস!”

প্রিতমও মুখ হাসি হাসি করে বললো,“ইট ওয়াজ মাই ডিউটি!”

ইহান সন্তুষ্ট হলো দুজনের শান্ত আচরণে। কিন্তু একটু আগের সাপে নেউলে কাহিনী ইহানের অগোচরেই থেকে গেলো।

পুলিশের সহায়তায় নেপালি সময় দুপুর দু'টোয় প্রিতম,ইনায়া আর জামির মেডিকেল চেকাপ করানোর জন্য নিয়ে যাওয়া হলো রাঞ্চি আর্মি হসপিটালে। একঘন্টা পরে যখন সবাই ছাড় পেলো তখন মিসেস মৈথি ইহানকে প্রস্তাব দিলো পোখারা তার বাপের বাড়িতে থেকে যাওয়ার। ইহান বললো,“না আন্টি। ছোটো মা অসুস্থ। আজকেই বেরোতে হবে আমাদের।”

ইনায়াকে বিষন্ন মনে বসে থাকতে দেখে প্রেরণা আবারও এগিয়ে যায় মেয়েটার কাছে। পাশে বসে ইনায়ার দিকে তাকাতেই ইনায়া একটা শুকনো হাসি ফিরিয়ে দেয়। প্রেরণা স্নেহমাখা কন্ঠে বললো,“মন খারাপ মাম্মার জন্যে?”

উপর নিচু মাথা ঝাঁকায় ইনায়া। প্রেরণা তার হাতটা ইনায়ার হাতের ওপর রেখে বললো,“উনি খুব দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠবে। দোয়া রইলো।”

দূরে দাঁড়িয়ে একপলক ইনায়া আর প্রেরণাকে দেখে ইহান এগিয়ে যায়। প্রেরণা তাকে দেখে উঠে দাঁড়িয়ে চলে যেতে নিলে ইহান বললো,“শুনুন।”

ঘুরে তাকালো প্রেরণা। ইহান খুবই বিনয়ী সুরে বললো,“যদি কিছু মনে না করতেন আমি আমাদের সাথে আপনাদের যাওয়ার ব্যবস্থা করতে পারি বিশেষ ভাবে। নয়তো কিছু আইনি জটিলতায় দেড়ি হবে আরও একদিন।”

প্রেরণা হাসলো,“আমার ভাই আপনার বোনকে হেল্প করেছে বলে শোধ করছেন?”

ইহান স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে প্রেরণার দিকে। কিছু পল বাদে বললো,“সেটা কখনও শোধ করতে পারবো না, আমি শুধু আমাদের তরফ থেকে একটা হেল্প করতে চাইছি। ভাবলাম আপনাদেরও বাড়ি ফেরার তাড়া আছে।”

প্রেরণা চুপ করে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলো। তারপর অনেকটা সংকোচ নিয়ে বললো,“ভালো হয় তবে। আসলে আমার ছেলেটা আমাকে ছেড়ে কখনো থাকেনি।”

শেষের কথাটা বলার সময় ইহান খেয়াল করলো ভদ্রমহিলার কন্ঠের দৃঢ়তা টুকু নেই, বরং রয়েছে ঔদাসীন্য।

_ঠিক আছে। আমি নাগোরকোট ফোর্সের কাছে প্রেয়ার দেবো। আপনারা বিকেলেই যেতে পারবেন।

প্রেরণা ম্লান হেসে মাথা ঝাঁকিয়ে চলে গেলো প্রিতম আর জামির কাছে। ইহান কিছুক্ষণ দেখলো তাকে। আর ইহানকে দেখলো ইরফান। সে কিছুটা দূরেই বুকে হাত বেঁধে দেয়ালের সাথে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এতোটা মনোযোগী দৃষ্টিতে কোনো মেয়েকে লক্ষ্য করেনি তার দাদান। আর তাছাড়াও, ভদ্রমহিলাকে দেখলে তার অতি ভদ্রলোক দাদানের ভদ্রলোকিপনা যেন উপচে পরে। এটাই দেখছে ইরফান,শান্ত ভঙ্গিতে।

★★★

পুলিশ সুপারের কার্যালয়ের ঠিক সামনে নো পার্কিং জোনে দাঁড় করানো একটি লাল টেসলা। গাড়িটা কার সেটি সম্পর্কে এ আপিসের কমবেশি সবাই অবগত। তাই বেশি কেউ ঘাটালো না বিষয়টা। বর্তমানের “জি হুজুরি” আইনের-ই অনুসারী তারা। আগ বাড়িয়ে কিছু বলতে গেলেই দেখা যাবে থানার বরকর্তা স্বয়ং নিজেই এই গাড়ির মালিকের পা চাটতে চাটতে জিভ পাতলা করে ফেলেছে। অবশ্য এমনটা তো হয়ে-ই এসেছে। এ থানার কর্মকর্তা বোয়ালদের কাজ হলো সাপের গালেও চুমু খাওয়া আর ব্যঙের গালেও চুমু খাওয়া।

আধাঘণ্টার বেশি হয়ে গিয়েছে লাবিব চৌধুরী নতুন সুপারিনটেনডেন্ট মুঈন ফরাজীর কেবিনে বসে আছে। তার সামনে এক কাপ চা। যা কিনা দশমিনিট আগেই ঠান্ডা হয়ে গিয়েছে।

আরো পনেরো মিনিট অতিবাহিত হবার পর একজন কনস্টেবল কেবিনে ঢুকতেই লাবিব বিরক্ত ভঙ্গিতে তাকিয়ে বলে,“চ্যাহ! এই তোমাদের স্যার কি বিবাহিত নাকি?”

কনস্টেবল হাসলো,“তেল দেওয়া হাসি” বলতে চলতি একটি কথা আছে, সে হাসি। বললো,“স্যার অবিবাহিত। আর স্যার কিছু নতুন অফিসারদের ট্রেনিং দিচ্ছেন। আর আধাঘণ্টা পরেই অফিসে ঢুকবেন।”

লাবিব শান্ত ভঙ্গিতে বসে আছে। কনস্টেবল দিপু রুলিং পার্টির মনোনীত এমপিপুত্রকে কিঞ্চিত খুশি করার নিমিত্তে বললো,“আরেক কাপ চা দিই?”

লাবিব কিছু বললো না। তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে কেবল দেখছিলো নতুন অফিসারের ছবিটা।

মুঈন ঢুকলো খানিক বাদেই। গাঁয়ে ইউনিফর্ম,মুখে গাম্ভীর্য। তার টেবিলের ওপর একটি বিশালাকার ফুলের তোড়া। লাবিব কে একপলক দেখে গিয়ে নিজের চেয়ারে বসতেই লাবিব হাত বাড়িয়ে দিলো করমর্দনের জন্য। মুঈন হাত মিলিয়ে বললো,“আপনি..”

_লাবিব চৌধুরী। লিয়াকত চৌধুরীর বড় ছেলে।

_বলুন আপনাকে কিভাবে সাহায্য করতে পারি।

লাবিব হাসলো,বললো,“সাহায্য? আসলে নতুন অফিসারকে দেখতে, পরিচিত হতে এলাম যাতে তিনি আগামী দিনগুলোতে আমাকে সত্যিই সাহায্য করতে পারেন।”

মুঈন কথাটার জবাব না দিয়ে চুপচাপ চেয়ে রইল। লাবিব শুরু করলো রাজ্যের খেজুরে আলাপ। মুঈন বুঝতে পেরেছে তরুণ নেতার উদ্দেশ্য এটি নয়। আসলেই তাই। লাবিব একটা রঙিন ফিতে দিয়ে সাজানো খাম মুঈনের দিকে এগিয়ে দিয়ে বললো,“এটা সনাতনী পদ্ধতি উপহার দেওয়ার। আসলে আপনার একাউন্ট নাম্বার টা ছিলো না তাই!”

মুঈন খামটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো। কোন রকম প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত না করে নির্লিপ্ত হয়ে লাবিবের মুখের দিকে তাকিয়ে বললো,“এটা কি আপনার দলের সাংগঠনিক সম্পাদকের বিরুদ্ধে মাদক মামলার তদন্ত এগোতে না দেওয়ার জন্যে দেওয়া হলো? আমি সরাসরি প্রশ্ন করি, এবং সরাসরি উত্তর পছন্দ করি। বলুন।”

লাবিব ধূর্ত হাসি হেসে বললো,“আরেহ না। ওরকম কর্মীর জন্য লাবিব ঘুষ দেবে? মোটেই না। ঘুষ হলে টেবিলের নিচ থেকে দিতাম। এখন টেবিলের ওপর থেকে দিচ্ছি। এটা উপহার,তোওফা। তোওফা কবুল করুন। ”

মুঈন একদৃষ্টে কিছুক্ষণ খামটার দিকে তাকিয়ে থেকে একটা ক্ষুদ্র শ্বাস ছে'ড়ে বললো,“থানা রোডের এতিমখানায় দাতাদের লিস্টে আপনার দলের নাম নেই । এটা ওখানে জমা দিয়ে নাম লিখিয়ে যাবেন।”

_আপনি নিন না! আপনিই করুন এই সওয়াবের কাজটা।

_না।
দৃঢ় উত্তর মুঈনের। পর পর বললো,“আমি সওয়াবের কাজ গুলো আমার উপার্জিত অর্থের কিছু অংশ দিয়ে করতে পছন্দ করি।”

লাবিব মুঈনের প্রত্যাখানে অবিচল থাকলো,তার মুখ ছেয়ে আছে স্বভাবসুলভ ধূর্ত সেই হাসিটা। খামটা পাঞ্জাবির পকেটে ঢুকিয়ে বললো,“ব্যাপার না। আরেকদিন আসবো। উপহার কিনে নিয়ে আসবো। ভাবিকে সালাম আর বাচ্চাদের আদর দেবেন আমার তরফ থেকে। সহি সালামত থাকবেন। আপনারা সহি সালামত থাকলেই তো আমরাও থাকবো।”

মুঈনের সাথে আরেকদফা করমর্দন করে উঠে দাঁড়ায় লাবিব। বাইরে দাঁড় করানো গাড়িটার কাছে এসে উঠে বসতেই দলীয় কর্মীর দিকে তাকিয়ে বলে,“অফিসারের হিস্ট্রি টা একটু মুখস্থ করতে মন চাচ্ছে।”

_নতুন নতুন একটু গরম আছে ভাই। আস্তে আস্তে আবহাওয়া বুঝে ফেলবে বাকিদের মতো। তবে মির্জা বাড়ির সাথে ওঠাবসাটা একটু বেশিই।

_মির্জাদের সাথে? কেনো? কোন আনন্দে?

কর্মী কাঁধ নাচিয়ে বললো,“কি জানি!”

_মেয়ে দেবে নাকি!
খ্যাক করে হেঁসে ফেললো লাবিব। হাসতে হাসতে মুখটা আবারও মলিন হয়ে গেলো। কেউ উপহার ফিরিয়ে দিলে তার ভীষণ খারাপ লাগে।

মুঈন সবেমাত্র কটেজের দরজায় পা রাখতেই শুনতে পেলো ভেতরে দুজন পুরুষ রমনীর কন্ঠস্বর। ওনারা এই কটেজের কেয়ার টেকার এবং বুয়া। দু'জন তখন ড্রয়িং রুমের মেঝেতে বসে টিভি দেখছিল। মুঈনকে দেখে লাইলি বুয়া উঠে দাঁড়ায়,পান খাওয়া লাল দাঁত বের করে বলে,“স্যার আজ সব বাংলা খাওন রানছি। সব টেবিলে দেওয়া হইছে। আমরা অখন যাই।”

_যান, বাচ্চার জন্য কিছু খাবার নিয়ে যাবেন। আমি প্রতিদিন বলতে পারবো না। আমার মনে থাকে না ‌।

লাইলি বুয়া খুশি হয়। এই স্যারকে তার ভীষণ রকমের পছন্দ। রাগী রাগী তবে সাফ দিলের মানুষ। লাইলি মানুষ চিনতে ভুল করে না। বাচ্চার জন্য কিছু খাবার নিয়ে লাইলি মুঈনকে বললো,“স্যার আফনের পোশাক ঝুরিতে রাখবেন। ওয়াশিং মেশিন তো নষ্ট। আমি কাল সকালে এসে ধুয়ে দেবো।”

লাইলি আর তার স্বামী মোসাদ্দেক চলে যায়। তিন রুমের কটেজে মুঈন তখন একা, রোজকার মতো একা। ফ্রেশ হওয়ার আগে মুঈন একবার মনে করলো মির্জা বাড়ির কথা। পরী আন্টির অবস্থার কিছুটা উন্নতি হয়েছে। আজ সারাদিনে খোঁজ নেওয়া হয়নি। পরী আন্টিকে মুঈনের খুব মনে আছে। সপ্তাহান্তে একদিন এতিমখানায় চেকাপের জন্য যেতো পরী,তারা তখন ডাকতো “পরী ডাক্তার”।

সামিনের ফোনে ফোন করলো মুঈন। কিছুক্ষণ বাদে ফোনটা রিসিভ হলো। মুঈন কিছু বলার আগেই ওপাশ থেকে ভেসে এলো অপ্রত্যাশিত নারীর সুমিষ্ট চিকন কন্ঠস্বর, সবিনয়ে সালাম দিলো।

মুঈন অবাক হলো কিছুটা, সালামের জবাব দিয়ে বললো,“আমি মুঈন।”

_জি বুঝতে পেরেছি। নাম্বারটা সেইভ করা।

_আসলে সামিন বাবা...

_পাপা,ছোটো বাবা নামাজ আদায় করতে গিয়েছেন হসপিটালের মসজিদে। কিছু জরুরি?

মুঈন ট্রিমছাট দেওয়া চুলে ঘাড়ের কাছটাতে হাত বুলিয়ে বললো,“পরী আন্টির খবর।”

_ছোটমা কথা বলতে পারছেন। ইনুর সাথে কথা বলিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাকে কাল-পরশু মুম্বাই নিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ছোটো বাবা। সমস্যাটা পুরনো ছোটো মায়ের। এর আগেও দুবার গিয়েছিলো। এখন শুধু ইনু বাংলাদেশে এসে পৌঁছানোর অপেক্ষা। ওর সাথে দেখা করেই...

একনাগাড়ে বলে দিলো ইনশিরাহ। মুঈন শুধু “আচ্ছা” বলে ফোন কে'টে দিলো।

একটা ঘর বাদে গোটা কটেজ অন্ধকার। মুঈন ইউনিফর্ম ছেড়ে ওয়াশরুমে ঢুকে শাওয়ার ছেড়ে দাঁড়িয়ে রইলো। দীর্ঘ সময়ের গোসল সেরে পোশাক পরে নিয়ে খেতে বসলো মুঈন। একটা একটা করে সবকটা ঢাকনা তুলে দেখলো প্রচুর রান্না। এই লাইলি বুয়াও, সবকিছু অতিরিক্ত পরিমাণে রাঁধবে,যেন মুঈনের বৌ আর চারটা বাচ্চাও তার সাথে থাকে।

কথাটা ভাবতে গিয়ে হাসলো মুঈন। খেলো সামান্য। বাকিটা ফ্রিজে তুলে ব্রাশ করে টিভির সামনে বসলো। এইতো রোজকার রুটিন। অবশ্য একটা পরিবার থাকলে চিত্রটা ভিন্ন হতো।
রোজ ডিউটি থেকে ফিরে দেখতো গোটা কটেজ অগোছালো। কেউ দু'টো নরম হাতে মুঈনের ইউনিফর্মের বোতাম খুলতে খুলতে মুঈনের কাছে বাচ্চাদের নামে নালিশ জানাতো। মুঈন ওসব কিছু না শুনে চু'মু খেয়ে তাকে চুপ করিয়ে দিতো।
বাচ্চাদের নিয়ে রাতের খাবার শেষ করে, দাঁত ব্রাশ করার পরে কিছুক্ষণ বাচ্চাদের পিঠে তুলে ঘোড়া ঘোড়া খেলতো। তারপর মুঈন আর সেই নরম দু'টো হাতের মালকিন দুপাশে শুয়ে বাচ্চাদের মাঝে রেখে রাজ্যের গল্প শুনিয়ে ঘুম পাড়াতো। আর তারপর? তারপর কখনো কখনো রাতে মুঈন আর সেই নরম হাতের মালকিন আলাদা ঘরে গিয়ে ঘুমিয়ে যেতো,নয়তো কখনো কখনো সেই আলাদা ঘরে দীর্ঘ রাত জেগে থাকতো দুজন।

টিভি অফ করে উঠে দাঁড়ায় মুঈন। নিজের চিন্তাভাবনা দেখে হাসলো সে। বুঝতে পারলো বিয়ে অতি জরুরী ফরজ হয়ে উঠেছে তার জীবনে। বয়সের পাশে বত্রিশের বুড়ো ট্যাগ লেগে যাওয়ার আগেই বাঙালি মুসলিম ম্যাট্রিমোনি সাইটে একটা অ্যাকাউন্ট খোলা দরকার। কলিগরাও তাই বলে।

চলমান.....

অসুস্থ। এমন অবস্থায় ছোটো ছোটো পর্ব নিয়েই খুশি থাকতে হবে।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 23 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন