ফন্ট সাইজ:
থিম:
বধূ কোন আলো লাগল চোখে ২

পর্ব 24

লেখক: ইসরাত ইতি

#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_২৪ [ ১ম অংশ ]
#ইসরাত_ইতি

🚫কঠোর ভাবে প্রাপ্তমনস্কদের জন্য।

🚫শিক্ষা ও সাহিত্যের সাথে আমার এই কল্পিত ঘটনাগুলোর লিখিত শব্দগুলোর কোনো সম্পৃক্ততা নেই।

[ ১ম অংশ ]

নিউকেয়ার হসপিটালের কার্ডিওলজি বিভাগের তেরো নাম্বার কেবিনে তখন ছিলো পরী এবং ইনশিরাহ। ইনশিরাহ পরীর চুল আঁচড়ে বিনুনি করে দিলো দুপাশে দুটো। একেবারেই খুকিদের মতো লাগছে রুগ্ন মধ্যবয়সী এই মহিলাকে। হসপিটালের আকাশী রঙের ফতুয়ার নিচে একটি শীর্ণকায় শরীর। চোখে মুখে উৎকণ্ঠা। একটু পরপর জানতে চাইছে তার মেয়ে কখন ফিরবে। ধৈর্য্য ফুরিয়ে গিয়েছে তৃষ্ণার্ত মাতৃ আত্মার।

হসপিটালে বর্তমানে ইনশিরাহ একাই রয়েছে। আলোর প্রেশার বেড়ে যাওয়ায় সে বাড়িতে চলে গিয়েছিল। এবং আবারও ফিরছে রিতুকে সাথে নিয়ে। বাড়ির তিন কর্তা গিয়েছেন এয়ারপোর্টে।

ছোটো মাকে স্যুপ খাইয়ে, ওষুধ খাইয়ে ক্লান্ত ভঙ্গিতে হেঁটে ইনশিরাহ কেবিনের মিররের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে হাসি পেলো তার। চার দিনের নির্ঘুম রাত তার ডাগর ডাগর চোখ দু'টোর নিচে ইঞ্চিখানেক কালি লেপ্টে দিয়েছে। তাকে দেখাচ্ছে ভারী অদ্ভুত। গায়ের ঢিলেঢালা শার্ট টা স্থানে স্থানে কুঁ'চ'কে গিয়েছে। অনেকটা শুকিয়েছে ইনশিরাহ। কন্ঠনালীর নিচে বিউটি বোনের গর্তে পানি রেখে মাছ চাষ করা যাবে,দেখে এমন মনে হচ্ছে। ভেবে হাসলো আরেক দফা।

ফোনের দিকে দৃষ্টি যায় তার। সাঈমের সাথে দীর্ঘসময় কোনো বার্তালাপ হয়নি। নিশ্চয়ই গাল ফুলিয়ে বসে আছে। দুমিনিট ওকে সময় দেওয়া দরকার ভেবে ফোনটা হাতে নিয়ে চলে যায় সে ওয়েটিং রুমের দিকে।

হসপিটালের গেটের কাছে এসে ক্যাব থামলো। দরজা খুলে বেরিয়ে এলো কুড়ি বছর বয়সী স্নিগ্ধ সুন্দরী এক তরুণী। পরনে তার সাদামাটা থ্রিপিস। ওড়নাটা মার্জিত ভাবে দু কাঁধে তুলে দিয়েছে। চুল গুলো বিনুনি করা। তরুণীর পাশের সিট থেকে নামলো তার বাবা সোহানুর ইসলাম শান্ত।
শেহা বাবার দিকে তাকিয়ে তাড়াহুড়ো লাগিয়ে বললো,“এসো।”

এসে ধরলো বাবার এক হাত। শান্ত মেয়ের দিকে তাকিয়ে ম্লান হাসলো। মেয়েটি ইদানিং তার সাথে এমন আচরণ করে যেন মেয়েটি তার মা এবং সে নিতান্তই একটি শিশু, সেরকম করেই আগলে রাখে তাকে।

শেহা বাবার হাত ধরে এগিয়ে চলছে। তেরো ঘন্টার জার্নিতে শরীর দুর্বল হলেও মস্তিস্ক চনমনে। এতো বড় বিপদের পরে একটু স্বস্তির মুহূর্ত,সবার সাথে দেখা হবে এটা ভেবেই ভীষণ উত্তেজিত সে।
পায়ে পায়ে বাপ বেটিতে এগিয়ে চলেছে কার্ডিওলজি বিভাগের দিকটাতে। আলো আর রিতু ততক্ষণে এসে উপস্থিত। ওরা কেউই শেহা আর শান্তর আসার কথা জানতো না। উঠে দাঁড়িয়ে অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে দু'জনের দিকে। শেহা আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারলো না। মুচকি হেসে ছুটে গেলো অসুস্থ ছোটো মামীর কাছে। বেডে তখন আধশোয়া হয়ে ছিলো পরী। ছোটো মামীর গলা জরিয়ে ধরে এ গালে,ও গালে চুমু খেলো। উঠে দাঁড়িয়ে বড় মামী আর মেজো মামীর দু গালেও চুমু খেলো সে। এটা শেহার ছোটোবেলার অভ্যেস। মামা বাড়িতে এলেই তার সর্বপ্রথম কাজ ছিলো মামাদের আর মামীদের কোলে চ'ড়ে চুমু খাওয়া,তাদের থেকে চুমু নেওয়া।

শান্ত পরীর অসুস্থতার খোঁজ নিয়ে একপাশে দাঁড়িয়ে আছে চুপচাপ। আলোরা তিন জা-ই মানুষটাকে দেখলো। কেমন বয়সের থেকেও অনেকটা বুড়ো লাগছে শান্তকে। একাকীত্ব বুঝি মানুষকে এভাবে এলোমেলো করে দেয়! লোকটাকে বহুবার বিয়ে করিয়ে দিতে চেয়েছিলো সামিনেরা তিন ভাই। কখনও রাজি হয়নি শান্ত।

শেহাকে টেনে কোলে বসিয়ে নিলো আলো। এটা শেহার বড়মামী সে-ই ছোটোবেলা থেকেই করে। শেহাকে কোলে নিয়ে বসে থাকে। দু'হাতে আগলে ধরে সবসময় আদুরে গলায় আলো বলে,“তোর গা থেকে একেবারে ইশিতা আপুর গন্ধ পাই আমি।”

____

সাঈমের নির্বাচিত ক্যাফের সামনে স্কুটি দাড় করালো ইনশিরাহ। টেবিল নাম্বার থার্টি ফাইভ বুক করা । ত্রস্ত পায়ে হেঁটে কফি শপের টেরেসে উঠলো। পর্দা সরিয়ে কেবিনে ঢুকতেই দেখতে পেলো সাঈম বসে আছে। তার হাতের আঙ্গুলে একটা ব্যান্ডেজ।

ইনশিরাহ বসে পরলো সামনের চেয়ার টেনে। সাঈমের হাতের আঙ্গুলটা ধরে উলটে পালটে দেখলো কিছুক্ষণ। সাঈম হাত সরিয়ে নিয়ে গম্ভীর হয়ে বললো,“এখন ধরছো কেনো? তোমার জাত যাবে।”

ইনশিরাহ কিছু বললো না জবাবে। সাঈম জানে এখন বোমা মারলেও এর মুখ থেকে একটা কথাও বেরোবে না এই প্রসঙ্গে। তাই প্রসঙ্গ পালটে বলে,“ ইনায়ারা পৌঁছেছে?”

_হয়তো।

কেবিনের বাইরে মৃদু আওয়াজে মিউজিক চলছিলো। পরিবেশটা কেমন নিস্তব্ধ। সাঈম উঠে ইনশিরাহর পাশে বসতেই ইনশিরাহ গুটিয়ে গেলো আরেক পাশে। সাঈম হেসে বললো,“আমি লিমিট ক্রস করতে আসিনি। তোমায় খুব কাছ থেকে দেখার জন্য এসে বসলাম। কি হাল করেছো চেহারার।”

ইনশিরাহ অস্বস্তি নিয়ে আশেপাশে তাকিয়ে বললো,“আমি উঠছি। দাদান রা এসে যাবে এক্ষুনি।”

_পাপা ইনায়ার ব্যাপারে সমবেদনা জানাতে তোমার ছোটো চাচাকে ফোন করেছিলো। তিনি ফোনটা ধরলেনই না।

ইনশিরাহ মাথা তুলে সাঈমের দিকে তাকায়। সাঈম বলে,“প্লিজ ডোন্ট মাইন্ড বাট তোমাদের পরিবারের সবার মাঝে একটা নাক উঁচু ভাব আছে।”

ইনশিরাহ কিছু মুহূর্ত চুপ থেকে বললো,“ছয় বছর আমার পেছনে হত্যে দিয়ে পরে থাকার পরে এখন বুঝতে পারলে এটা?"

থতমত খেলো সাঈম। নিজেকে শুধরে নিয়ে বললো,“আমি অভিযোগ করিনি। প্লিজ জান,রা'গ করছো কেন!”

ইনশিরাহ খানিকটা নরম হয়ে বললো,“আংকেলের বিষয়টা জেনে ভালো লাগছে। তবে ছোট বাবার উপর দিয়ে কি যাচ্ছে তা তো বোঝোই। এ কদিন ছোটো বাবার ফোন আমার কাছেই ছিলো বেশিরভাগ সময়।”

সাঈম প্রসঙ্গ পুরোপুরি পাল্টে ফেলে বললো,“আরে বাদ দাও তো। তুমি যাও। দেড়ি হয়ে যাচ্ছে তোমার।”

ইনশিরাহ তাড়াহুড়ো করে বেরিয়ে যাওয়ার পরে সাঈমও কেবিন থেকে বেরোয়। ওর বন্ধুরা সবাই বাইরের একটা টেবিলে বসেছিলো। সাঈম গিয়ে তাদের পাশে বসতেই ওর এক বন্ধু বলে ওঠে,“অমন করে দৌড়ে বেরিয়ে গেলো কেনো। কিছু করেছিস নাকি!”

সাঈম বিরক্তি প্রকাশ করে বললো,“সে সুযোগ নেই।”

ওর তিন বন্ধুই অবাক হলো মনে হচ্ছে। একজন গলার স্বর খাদে নামিয়ে সাঈমকে বললো,“এরকম একটা মরামাছকে কিভাবে টলারেট করছিস? আমি বুঝি না হারাম রিলেশনশিপে জরিয়ে এদের এতো সতীপনা আসে কোত্থেকে!”

সাঈম তার বন্ধুর কথাটা শুনলো,তবে বললো না কিছু। চোখ মুখ কঠিন করে তাকিয়ে আছে ইনশিরাহর প্রস্থানের দিকে ‌। তার মস্তিস্কের অভ্যন্তরে কি চলছে সেকথা সে-ই জানে!

___

এয়ারপোর্টে অপেক্ষারত ইশমাম,সামিন,ইলহাম। ঠিক রাত দশটা নাগাদ ওদের ফ্লাইট এসে পৌঁছানোর কথা। কথা হয়েছিলো ইহানের সাথে।

বোনকে নিয়ে দু'ভাই কাস্টম অফিসারের ডেস্কে তখন। ইনায়া বারবার মাথা ঘুরিয়ে আশেপাশে কাউকে খুঁজছিলো মনে হচ্ছে। একই ফ্লাইটে এসেছে ওরা। ইনায়ার প্লেনের সিট প্রেরণার পাশেই ছিলো। দীর্ঘসময় দুজনের আলাপচারিতা হয়েছে। ইনায়া খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জানতে পেরেছে অনেক কিছু প্রিতমের ব্যাপারে। ওদের পরিবারটাকে ভীষণ পছন্দ হয়েছে ইনায়ার। খুবই ভদ্র এবং ভালোবাসায় মাখা একটি পরিবার তিন ভাইবোনের, একে বারে মায়া মায়া। ঠিক ইনায়াদের মতো। ইনায়া বুঝতে পারছে না এমন একটি পরিবারের ছেলেকে মেজো দাদান বারবার “লাফাঙ্গা” কেনো বলে! আর প্রেরণা আপুর তো তুলনা-ই হয়না। এতো সুন্দর করে কথা বলে যেন মনে হয় কবিতা আবৃত্তি করছে। শুধু শুনতেই ইচ্ছে করছিলো ইনায়ার।

কিছুক্ষণ আগে ইনায়ারা প্রেরণাদের থেকে আলাদা হয়ে যায়। তারপর আর দেখা হয়নি। আশেপাশে খুঁজছে তাই। দেখা হলে শেষবারের মতো প্রিতম আর জামিকে ধন্যবাদ দেবে সে। ইরফান বোনের দিকে শীতল চোখে তাকিয়ে আছে, কঠিন গলায় বলে,“কাউকে খুজছিস?”

ইনায়া শুধু মাথা নাড়লো। ইহান ওদের দিকে তাকিয়ে বললো,“চল বেরোই। সবাই বাইরে অপেক্ষা করছে।”

কথাটি বলে ইহান ইনায়ার হাতটা ধরলো শক্ত করে। ভিড়ের মধ্যে ইনায়ার হাঁটতে ভীষণ অসুবিধা তাই।

দাদানদের সাথে পায়ে পা মিলিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলো ইনায়া,তবে ঠিকই বারেবারে পিছু ফিরে চাইলো সে। যদি তাদের দেখা মেলে। যদি মেলে!
অদ্ভুত অনুভূতির উদ্রেক হয়েছে তার অন্তঃপুরে, যে অনুভূতির সাথে ইনায়া পরিচিত নয়, একেবারেই নয়। যে অনুভূতি নতুন, যে অনুভূতি প্রথম।

আকাশকুসুম ভাবতে ভাবতে কারো সাথে ধাক্কা খেলো ইনায়া। ব্যাথাও পেলো। ইহান বোনকে আগলে নিয়ে অন্যপাশে টেনে দাঁড় করালো, ইরফান তখন লোকটাকে একটা ঝাড়ি মে'রে ঘুরে দাঁড়িয়ে ইনায়ার মাথায় সপাটে একটা গাট্টা মেরে রাগী গলায় বললো,“কাকে খুজছিস তুই? ঠিকভাবে হাট নয়তো....”

ইনায়া ঠিক ভাবেই হাঁটছে এবার। এয়ারপোর্ট থেকে বেরোতেই চোখে পরলো পাপাকে। মস্তিস্ক থেকে সব চিন্তা কোথায় মিলিয়ে গেলো। ভারি শরীর নিয়ে ছুটতে ছুটতে পাপার গাঁয়ে আছড়ে পরলো। তারপর আবার, আরও এক দফা কেঁদে ভাসালো বাপ-বেটি।
_____

নিউকেয়ার হসপিটালের কার্ডিওলজি বিভাগে মির্জা বাড়ির পুনর্মিলনী অনুষ্ঠিত হয়েছে ঠিক রাত বারোটায়। ইনায়া ফিরে এসেছে,মায়ের বুকে। এসে মাম্মার বুকে মুখ লুকিয়েছে ঘন্টাখানিক হলো। শীর্ণকায় দুটি হাতে মেয়েকে আঁকড়ে ধরে আছে পরী। সবার বারণ সত্ত্বেও কাঁদছে ভীষণ। কত আদরের গর্ভের ফুল তার। ইনায়া পেটে আসার পরে পরীর কিছু কম্প্লিকেসি ধরা পরে। কলিগদের পরামর্শ ছিলো বাচ্চাটা নষ্ট করে দিতে। বেঁচে থাকলে কত বেবি নেওয়া যাবে! পরী কারও কথায় তার মাতৃত্ব নষ্ট করেনি, নিজের প্রানের মায়া করেনি তখন পরী।
হুহু করে কাঁদছে সে, গোঙানির মত আওয়াজ হচ্ছে। হাতে ক্যানুলা লাগনো তার।
ইশমাম বারবার কড়া করে বারণ করছে কাঁদতে।

ইনায়া মাথা তুললো। দু'হাতে মাম্মার চোখ মুছে নিজেও শান্ত হলো। এতক্ষণে ইনায়া কেবিনের চারিদিকে চোখ বোলালো। শেহা আর ফুপা এসেছে, আজান মামা,আয়াত মামা এসেছে। এই মাত্র ওদের দেখেছে সে। গিয়ে এক এক করে সবাইকে ধরলো। শেহাকে জরিয়ে ধরে রাখলো দীর্ঘসময়।

পরিস্থিতি তখন শান্ত, সবার হৃদয় শান্ত হয়েছে বলে। ইশমাম ইহানের দিকে তাকিয়ে বললো,“ওকে যে ছেলে দু'টো হেল্প করেছে আমি তাদের সাথে কথা বলতে চাই।”

_বলবে, অনেক সময় আছে। এখন প্লিজ ছোটো মাকে নিয়ে ভাবো। তোমাদের ফ্লাইট কয়টায়?

_কাল সকালে। এখান থেকেই যাবো।

ইনায়া আবারও ছুটে এলো মায়ের কাছে। ট্রিটমেন্টের জন্য এর আগেও দুবার মুম্বাইতে আম্বানি হসপিটালে গিয়েছে তারা। এবার গেলে এক মাসের আগে ফিরতে পারবে না। হৃদযন্ত্রের অবস্থা বড়ই জটিল পরীর।

মেয়েকে আবারও জরিয়ে ধরে পরী গালে চু'মু খেয়ে বললো,“এসবের জন্য তুই একেবারেই দায়ী না মা। একদম কাদবি না। আমরা ফিরবো তো খুব শিগগিরই।”

____

গ্রীষ্মের মাঝামাঝি সময়টা। নেপাল থেকে ফেরার দিন সাতেক কে'টে গিয়েছে। প্রেরণা এই সাত দিনে রেস্তোরাঁয় যায়নি। শুদ্ধর দুদিন ধরে সর্দিকাশি। স্কুল থেকে ছুটি নেওয়া হয়েছে। অসুস্থ বাচ্চাটা মাম্মাকে ছেড়ে থাকতে পারেনা। মায়ের কোলে গুটিসুটি মেরে আছে ছেলেটা।

ছেলের মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে প্রেরণা একটু ঝিমুনির মতো দিচ্ছিলো। শুদ্ধর কথায় তার তন্দ্রা কে'টে যায়। শুদ্ধ মিহি স্বরে ডাকে,“মাম্মা।”

_হু বাবা! কিছু বলবে?

_মাম্মা রোলার কোস্টার চড়বো।

_নিয়ে যাবো তো! তুমি একটু সুস্থ হলেই নিয়ে যাবো বাবা।

শুদ্ধ চুপ হয়ে যায়। ছেলেটা প্রয়োজনের বেশি একটা কথাও বলতে চায়না। প্রেরনা ছেলের কপালে একটা চুমু খেয়ে বলে,“হঠাৎ রোলার কোস্টার চড়ার ইচ্ছে হলো যে?”

_রিকুর পাপা আজ ওকে নিয়ে গিয়েছিল, রিকু তখন কলে বললো।

প্রেরনা ছেলের মুখের দিকে তাকায়। শুদ্ধ বলতে থাকে,“জানো মাম্মা,রিকুর পাপা ওকে নতুন একটা রোবো-কার কিনে দিয়েছে।”

_তোমাকেও একটা নতুন রোবো-কার কিনে দেবো বাবা।

_আমার চাইনা রোবো কার।

_তবে কি চাই তোমার?

শুদ্ধ বুঝতে পারছে না ওর কি চাই। ওর শুধু ফাঁকা ফাঁকা লাগে, আশেপাশে বন্ধু বান্ধবের দিকে তাকালে ওর কেমন কান্না কান্না পায়। ওর অতটুকু মস্তিস্ক ধরতে পারছে না ওর শূন্যতা টা ঠিক কোথায়। শুধু এটুকু বোঝে ওর অনেক কিছু নেই যা অন্যদের আছে। যা অন্যরা পেয়েছে,ও কখনোই পায়নি সেটি। অতটুকু মস্তিস্ক শুধু এটুকুই বুঝতে পারে।

প্রেরণা নিশ্চুপ ছেলেকে বুকের সাথে মিশিয়ে নেয়। তখনই তার ফোন বেজে ওঠে, রেস্তোরাঁ থেকে সাব্বির ফোন দিয়েছে। কলটা রিসিভ করতেই সাব্বির ওপাশ থেকে বলে ওঠে,“ম্যাম এখানে একটা ঝামেলা হয়ে গিয়েছে। ”

প্রেরনা উঠে বসে। কল কে'টে প্রিতমকে ডাকতে গিয়েও ডাকলো না, ছেলেটা কতবড় ধকল সামলে এসেছে। কদিন বিশ্রাম নিক। প্রেরণা মিস জেনিকে ডাকলো, মিস জেনি চলে আসতেই প্রেরনা পার্স তুলে হাতে নিয়ে বলে,“মিস জেনি একটু শুদ্ধকে জরিয়ে ধরে শুয়ে থাকুন। আমি রেস্তোরাঁয় যাবো আর আসবো।”

যাওয়ার আগে প্রেরণা ছেলের মুখের দিকে তাকালো। শুদ্ধ চুপচাপ তাকিয়ে আছে মাম্মার দিকে। ছেলেটা বড় হয়ে গিয়েছে। মাম্মার অসুবিধে বোঝে। বায়না ধরে না, অযথা কাঁদে না।

একটা তপ্ত শ্বাস ফেলে প্রেরণা। আচ্ছা কেমন হতো যদি প্রেরণার একটা ঝামেলা বিহীন জীবন থাকতো, যদি এই খেটে খাওয়া, পুরুষের সাথে পাল্লা দেওয়া জীবন না থাকতো। কেমন হতো যদি মেজর ওয়াসীত বেঁচে থাকতো?
সে তখন অবশ্যই গৃহিণী থাকতো, কখনোই উপার্জনে নামতো না সে তবে। শুদ্ধকে চব্বিশ ঘন্টা সময় দিতো, স্বামীর সেবা করতো, স্বামীর কাছে এটা সেটা বায়না করতো। ছুটির দিনে শাওকাত তাকে আর ছেলেকে নিয়ে ঘুরতে বেরোতো। শাওকাত ছেলের সব বায়না পূরন করতো। কেমন হতো তবে?
প্রেরণা তো এই কর্মের জীবন চায়নি, সে সন্তুষ্ট ছিলো একটা সংসারী জীবনে। কেনো সংসার টা তার করা হলো না চার বছরের বেশি!

চলমান....

২য় অংশের লিংক কমেন্টে।#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_২৪
#ইসরাত_ইতি

[ ২য় অংশ ]
১ম অংশের লিংক কমেন্টে।

আর দাঁড়াল না প্রেরণা। বেরিয়ে গেলো ঘর থেকে। রেস্তোরাঁয় পৌঁছে দেখলো আজ বিকেলে কাস্টমার নেই রেস্তোরাঁয়। কিছুটা অবাক হয়ে প্রেরণা ভেতরে ঢুকলো , গোটা রেস্তোরাঁ ওলোটপালোট হয়ে আছে। হতভম্ব প্রেরণা যা জানতে পারলো তা হলো, রুলিং পার্টির কিছু ছেলেপুলে আর অপজিশন পার্টির কিছু ছেলেপুলের মাঝে ঝামেলা হয়েছে প্রেরণার রেস্তোরাঁতে। দু'টো চেয়ার ভে'ঙেছে একে অপরকে মা'রতে গিয়ে। অনেক কষ্টে দু'টো দলকে স্টাফরা সরাতে পেরেছে।

প্রেরণা রীতিমতো বাকরুদ্ধ। মেজাজের খেই হারিয়ে ফেললো হঠাৎ। সাব্বিরকে কড়া ধ'মক দিয়ে বললো,“চেয়ার দু'টোর দাম নয় হাজার টাকা। জরিমানা করলে না কেন ওদের?”

সাব্বির ভীত হয়ে বলে,“ম্যাম ওদের কাছে কিভাবে চাইবো?”

_কিভাবে চাইবে মানে ? যেভাবে চাওয়ার সেভাবে চাইবে। পাতি গুন্ডা ফুন্ডা এই প্রেরণা আহসান ভয় পায় না।

একটা চেয়ারে ধপ করে বসে পরলো প্রেরণা। এই শহরে রেস্তোরাঁ ব্যবসা টিকিয়ে রাখাটা অত্যন্ত কঠিন সে বুঝে গিয়েছে প্রথম বছরেই। তবুও সাহস করে এগিয়েছে এতদূর। মাঝে মাঝে কিছু উটকো ঝামেলা এসে গলায় ঝুলে পরে শুধু। সাব্বিরের দিকে তাকিয়ে বললো,“কারা ভে'ঙেছে? নাম বলো। টাকা আমি চাইবো।”

সাব্বির অস্ফুটে বললো,“ম্যাম চেয়ার ভে'ঙেছে ইহান তাজওয়ার মির্জার দলের তিনজন ছেলে।”

প্রেরণা কিছুটা অবাক,কিছুটা বিব্রত। সাব্বিরের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলে,“ঠিকাছে চলো হাতে হাতে সবাই সবকিছু গুছিয়ে ফেলি।”

_ম্যাম টাকা চাইবেন না?

_পরে। চলো কাজে লেগে পরি।

স্টাফরা আপত্তি তুললো,“ম্যাম এসব আপনাকে করতে হবে না। আমি বসুন।”

_কেন? করলে আমার জাত যাবে? বেশি কথা না বলে সব গুছিয়ে সবাই কিচেনে যাও, কাস্টমার আসতে শুরু করেছে। বিকেলটা লস হয়ে যাবে আমার।

____

ইহান রাগী চোখে তার দলের তিনজন ছেলের দিকে তাকিয়ে আছে। দলের কর্মী হিসেবে ওরাই সবচে বেশি রগ'চটা। তবে ইহানের সামনে নেতানো খইয়ের মতো চুপসে আছে।

ইহান চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। পাঞ্জাবির হাতা গুটিয়ে নিয়ে আবারও একবার অগ্নিদৃষ্টিতে ঘুরে তাকায় ছেলে তিনটার দিকে। চোয়াল শক্ত করে বলে,“এটাই লাস্ট। আর একবার এমন হলে ঘা'ড় ধরে দল থেকে বের করে দেবো মাইন্ড ইট।”

_ভাই কি করবো! ঐ লাবিবের দলের আসিন আর রানা আপনার নামে আজে বাজে মস্করা করছিলো তাই মেজাজ টা!

ইহান আর দাঁড়ালো না। ঘরে ইরফান,বাইরে এরা। ইহানের মন মেজাজ বিগড়ে দেয়ার জন্য এরাই যথেষ্ট। একটা লম্বা শ্বাস ফেলে বললো,“আয় আমার সাথে।”

চুপচাপ তিনজন ইহানের পিছু পিছু গিয়ে বসলো গাড়িতে। বাকি ছেলেরা বাইক নিয়ে ছুটলো ইহানের গাড়ি অনুসরণ করে। গাড়ি থামলো গিয়ে ঠিক স্বাদে আহ্লাদের সামনে।

নেমে দাঁড়িয়ে আশেপাশে তাকালো ইহান। কখনও এখানে আসেনি সে। তাকে ঘিরে তার ছেলেরা দাঁড়িয়ে। ইহান হেঁটে সোজা রেস্তোরাঁর ভেতরে ঢুকলো। ভেতরে পা রাখতেই দাঁড়িয়ে পরলো সে। বিশালাকার একটি রেস্তোরাঁ, রাজকীয় চোখ ধাঁধানো ডেকোরেশন। ভাতের হোটেলে এতো শৌখিনতা ঠিক কেউ করে না।

কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে ইহান সামনে এগিয়ে যায়। প্রেরনা ভেতরে ঝাড়ু হাতে দাঁড়িয়ে সবকিছু পরিষ্কার করছিলো।
কিছুটা সামনে গিয়েই ইহান দাঁড়িয়ে পরে। তার দৃষ্টি প্রেরণার দিকে । লম্বা বিনুনি, সাদামাটা শাড়ি। কাজ করছে যেন একজন স্টাফ, মালকিন নয়।
ইহানকে সবার প্রথমে দেখতে পায় সাব্বির, পরে বাকি স্টাফেরা। তাদের চোখ ছানাবড়া। ইহান তাজওয়ার মির্জা তাদের রেস্তোরাঁয়! সাব্বির দ্রুত ছুটলো প্রেরণার কাছে । তাড়াহুড়ো লাগিয়ে বললো,“ম্যাম নেতা এসেছে।”

ইহান টানটান দাঁড়িয়ে। প্রেরনার মেজাজ তখনও তু'ঙ্গে ছিলো, ওদিকে ফিরেই কর্কশ কন্ঠে বললো,“কোন নেতা? নেতা ফেতা সব ঝা'টা মেরে বের করো। এতো প্যারা আমি নিতে পারছি না। আই ওয়ান্ট মাই রেস্টুরেন্টে নিট অ্যান্ড ক্লিন!”

হতভম্ব স্টাফরা, হতভম্ব ইহানের দলের ছেলেরা। মুখ হা হয়ে আছে সবার। শুধু ইহান শান্ত চোখে দেখছিলো প্রেরণাকে, কোনো অজানা কারণে তার ঠোঁটে একপেশে অস্পষ্ট হাসি।

শেফ আফ্রা এগিয়ে গিয়ে ফিসফিসিয়ে প্রেরণাকে বললো,“ম্যাম ওদিকে তাকান তো।”

প্রেরণা সাথে সাথে ঘুরে দাঁড়ালো। ঘুরে দাঁড়াতেই চ'ম'কে গেলো কিছুটা। ঝাড়ু হাতে, কোমরে শাড়ির আঁচল গোঁজা ভদ্রমহিলাকে দেখলো ইহান বার কয়েক, অতঃপর ফিরিয়ে নিলো চোখ। আফ্রা কপাল চাপড়াচ্ছে তাদের মালকিনের কান্ড দেখে, ঝাড়ু হাতে ইহান তাজওয়ার মির্জার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। দাঁতে দাঁত চেপে আফ্রা বললো,“ম্যাম ঝাড়ু।”

প্রেরণা ঝাড়ু হাত থেকে ফেলে দ্রুত কোমরে গুজে রাখা আঁচল টেনে ডান কাঁধে জরিয়ে নিলো।

ইহান আবারও তাকালো প্রেরণার দিকে। হাসার চেষ্টা করলো আন্তরিক হাসি। প্রেরণা কয়েক কদম এগিয়ে আসতেই ইহান তাকে কিছু না বলে তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলে গুলোকে চোখ দিয়ে ইশারা করতেই ছেলে তিনটা এগিয়ে গেলো প্রেরণার দিকে, বিনয়ী সুরে প্রেরণার কাছে ভাঙচুরের ঘটনার জন্য ক্ষমা চাইলো।

প্রেরণা ওদেরও দেখলো,দেখলো ইহানকেও। ইহান তার রাশভারী কন্ঠে বললো,“আপনার স্টাফদের সাথে বাজে আচরণ করেনি আমার দলের ছেলেরা। দু'টো চেয়ার ভে'ঙেছে শুধু। জরিমানা দিতে এসেছে ওরা। ওরা আন্তরিক ভাবে দুঃখিত।”

প্রেরণা চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে। ইহান ম্যানেজার সাব্বিরের কাছে জরিমানা দিয়ে প্রেরণার দিকে একপলক তাকালো। প্রেরণা লজ্জিত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে। মনে খচখচানি তার। ঝাটা মারার কথাটা শুনে ফেললো কি না ভদ্রলোক! নেতা শ্রেনীর লোককে খেপিয়ে দেওয়ার মতো বুদ্ধিহীনা প্রেরণা নয়। এরা যত ভদ্রলোক-ই হোক না কেন, রক্তে একটা প্রতিহিংসার ব্যাপার থাকেই। তাকে তার বিজনেস টিকিয়ে রাখতে হবে।

ইহান তাজওয়ার মির্জা শুনেছে কি না, খেপেছে কিনা তার দৃষ্টি দেখে বুঝতে পারলো না প্রেরণা। ইহান শান্ত ভঙ্গিতে প্রেরণাকে আরও একবার দেখে ঘুরে দাঁড়াতেই প্রেরণা বললো,“শুনুন।”

ইহান দাঁড়ালো।

_ইনায়া কেমন আছে? ইনায়ার মাম্মা কেমন আছে?

_ইনায়া ভালো আছে। ছোটো মায়ের ট্রিটমেন্ট চলছে মুম্বাইয়ে।

সংক্ষিপ্ত উত্তর ইহানের। তারপর বললো,“প্রিতম আর জামিকে আমার দলীয় অফিসে চায়ের নিমন্ত্রণ রইলো। বলে দেবেন ওদের।”

প্রেরণা চুপচাপ শুনলো। ইহান চলে গেলো ছেলেদের নিয়ে রেস্তোরাঁ থেকে।

_____

মাম্মা পাপার সাথে কথা বলে এক রাশ মন খারাপ ঘিরে ধরলো ইনায়াকে। খুব শিগগিরই যে তারা আসবেন সে ব্যাপারে কোনো নিশ্চয়তা দেয়নি ইশমাম। মনখারাপ নিয়ে রুমে বন্দি করে রেখেছে নিজেকে। বাড়ি ভর্তি মেহমান। ইনায়ার কোথাও যেতে ইচ্ছে করে না। কেমন উদাস লাগে খুব, কারণটা ইনায়ার অজানা। ফোন পাশে রেখে বিছানায় কিছুক্ষণের জন্য শুয়ে পরতেই শেহা ঢুকলো তার ঘরে। মেয়েটার হাতে মোটা একটা বই, চোখে চশমা। শান্তর মেয়ে শান্তর মতোই মোটা ফ্রেমের চশমা পরে।
বইটা টেবিলের ওপর রেখে শেহা ঘুরে তাকায় ইনায়ার দিকে, কোনো রকম ভণিতা না করে সরাসরি বলে,“তোর ব্যাপার কি? আমার সাথে গল্প করছিস না । আসার পর থেকে কেমন গুমরে থাকিস। প্রেমে পরেছিস?”

ইনায়া চ'মকালো। জোরে জোরে শ্বাস ফেললো। শেহা বাঁকা হেসে বললো,“চমকাচ্ছিস কেনো? প্রেমে পড়া দোষের কিছু না।”

ইনায়া নিশ্চুপ। শেহা বললো,“নিচে আয়। আজান মামা আর আয়াত মামা বাজার থেকে বড় মামীর জন্য তেত্রিশ পদের মাছ কিনে এনেছে। সবাইকে দেখাবে বলে ডেকেছে।”

শেহা চলে গেলেও ইনায়া কিছুক্ষণ ঝিম মে'রে পরে থাকে। তারপর চোরের মতো আশেপাশে তাকিয়ে চুপি চুপি ফোনটা তুলে নিয়ে তার একটা বিকল্প অ্যাকাউন্ট থেকে প্রিতমের অ্যাকাউন্টের আপডেট দেখে। লোকটার প্রফেশনাল অ্যাকাউন্ট এটা। কিছুক্ষণ আগে এই অ্যাকাউন্ট থেকে তার কাজ সংক্রান্ত কিছু ডকুমেন্ট পোস্ট করেছে। ইনায়া তার বিকল্প অ্যাকাউন্ট থেকে বেরিয়ে তার আসল অ্যাকাউন্টে ঢুকে প্রথমেই প্রিতমকে আনব্লক করলো। কাজটি করতে গিয়ে ইনায়া টের পেলো তার বুক ঢিপ ঢিপ করছে। একটা নিষিদ্ধ আনন্দ বয়ে চলেছে তার বুকে।
সাত-সাতটা দিন নিজেকে সংবরণ করলেও আর পারলো না ইনায়া। মন ও মস্তিস্কের দ্বন্দে মন জিতে যায়, ব্যস্ত হাতে প্রিতমকে মেসেজ করে দেয়,“প্রিতম...প্রেরণা আপু কেমন আছেন?”

একটা বোকা বোকা কাজ করে ইনায়ার নিজেকে একটুও বোকা লাগছে না। সে শ্বাস রোধ করে বসে আছে উত্তরের অপেক্ষায়। বেহায়া মনকে বোঝালো, এই শেষ। উত্তর পাঠালে আর কখনও ঐ লোককে মেসেজ সে করবে না। না মানে না।

প্রিতম কম্পিউটারের সামনে বসেছিলো। দেখবে না দেখবেনা করেও ফোনটা হাতে তুলে নিয়ে দেখলো ইনায়ার মেসেজটি। একদৃষ্টে দীর্ঘসময় মেসেজটিকে দেখে প্রিতম ফোনটা হাত থেকে নিচে রাখলো। প্রিতম অবুঝ ছেলে নয়, যা হয়েছে হয়েছে, মেয়েটি সরল। বাস্তবতা বোঝে কম। ইনফ্যাচুয়েশনে ভুগছে। কিছুদিন ভুগবে। তারপর কেটে যাবে ব্যস!

নিচতলায় নামার সময় শেহার দেখা হলো ইরফানের সাথে। দাঁড়িয়ে পরলো সে। ইরফান অফিসে যাওয়ার জন্য তৈরি হয়েছে। সব সময় হুডি আর থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট পরে থাকা ইরফান আজ শার্টের সাথে গলায় টাই বেঁধেছে। শেহা নম্রস্বরে বললো,“টাই-য়ের নট বাধা হয়নি তোমার।”

_তাই? তুই বেঁধে দিয়ে যা শেহু।
শেহা দাঁড়িয়ে থাকে চুপচাপ,এগোয় না। ইরফান আদেশের সুরে বললো,“কিরে শুনতে পেলি না?”

ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলো শেহা। কাঁপা কাঁপা হাতে ইরফানের টাইয়ের নট বেঁধে দেয়। ইরফান শেহাকে দেখে মিষ্টি করে হেসে বলে,“তুই একেবারে লক্ষি। আর এবাড়িতে দু'টো অপদার্থ থাকে বুঝলি। একটা ভেবলি আর একটা কেউটে। কোনো কাজের না। ওদের কপালে স্বামীও জুটবে অপদার্থ। তবে তুই চিন্তা করিস না শেহু, তোকে আমি নিজে দাঁড়িয়ে থেকে পৃথিবীর সবথেকে পার্ফেক্ট ছেলেটির সাথে বিয়ে দেবো।”

শেহার মাথায় স্বভাব সুলভ মৃদু চাপড় মে'রে চলে যায় ইরফান।
শেহা একদৃষ্টে কিছুক্ষণ ইরফানকে দেখে নিজের মাথায় হাত রাখে। কিছু মুহূর্ত চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে সেও নিচে নামে।

ইরফান বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। শেহা গিয়ে বসলো ওর বড়মামীর কাছে। লিভিং রুমে ছিলো আলো,রিতু, ইনশিরাহ,আজান,আয়াত।

কাজের বুয়ারা আজান আয়াতের আনা মাছগুলোকে কে'টে ধুয়ে নিচ্ছে। আলো ভাইদের রাগী গলায় বলে,“এমন পাগলামির মানে হয়? তোদের দুলাভাই জানতে পারলে বকবে তোদের।”

আয়াত চুপচাপ দাঁড়িয়ে হাসলো। আজান বলে,“আমরা বিদেশে থাকি। বাবা মায়ের মৃত্যুর পরে তুমি তো বাপের বাড়ি কখনো যাও-ই না। বোনকে বাজার করেও খাওয়াবো না?”

_সেজন্য তেত্রিশ পদের মাছ? এগুলো রাখবো কই? তিনটা ফ্রিজেও তো ধরবে না।

শেহার পাশে এসে বসলো রিতু। শেহা ফিসফিসিয়ে রিতুকে বললো,“এদের মাঝে কোনটা আজান মামা আর কোনটা আয়াত মামা আমি এখনও ধরতে পারি না।”

রিতু নিচুস্বরে বলে,“তুই কি ধরবি? ওদের বৌ-রাই তো ধরতে পারে না। কানাডায় আগে একসাথে বৌ নিয়ে থাকতো দুই ভাই। একবার ভালোবাসা দিবসে আজানের বৌ,তোর মারিয়া মামি ভুল করে আয়াতকে গোলাপ দিয়েছিলো। তারপর থেকে দুই ভাই যার যার বৌ নিয়ে আলাদা ফ্ল্যাটে থাকে।”

শেহা মুখে ওরনা চেপে হাসছে। পাশে বসা ছিলো ইনশিরাহ,ফোন টিপতে টিপতে সেও হেসে ফেললো।

এপাশে বসা আলো আর আজান-আয়াত কেউই ওদের হাসির কারণ বুঝতে পারলো না।
আলো ডাইনিং টেবিলের দিকটাতে গিয়ে রিতুকে ডেকে বললো,“একি ইরফান তো টিফিন বক্স নিয়ে গেলো না রিতু। তুমি খেয়াল করলে না?”

_খেয়াল করলে কি হতো ভাবী? ও তো অফিসে গিয়ে খায়না এসব। বাইরের আজেবাজে খাবার খায়। একটা ভালো কথাও যদি শোনে।

_শুনবে ধীরে ধীরে। এইতোহ অফিসে বসতে শুরু করেছে। আস্তে ধীরে শুধরে যাবে।

_হু,সেদিন আর এলো। অফিসে গিয়েও ওর মেজাজ দেখিয়ে বেড়ায়। গতকাল তোমার ইলহাম ভাইয়ার কাছে শুনলাম, সেদিন একজন স্টাফকে ইরফান কি বললো জানো? বললো,“ঠিকঠাক ভাবে হিসেব না দিতে পারলে অফিসের ছাদ থেকে ধাক্কা মে'রে নিচে ফেলে দেবো।”

আলো ম্লান হাসলো রিতুর কথায়। রিতু বললো,“হেসো না তো ভাবী। স্টাফ কাজ না করলে তার চাকরি নিয়ে নেয় শুনেছি, তোমাদের ছেলে ছাদ থেকে ফেলে দেবে। এখন বোঝো, এ কেমন ছেলে তোমাদের।”

বাড়ির সবাই হাসছিলো। রিতু উদাস গলায় বলতে লাগলো,“আল্লাহ জানেন এই ছেলেকে কে বিয়ে করবে! সে মেয়ের জীবন শেষ হয়ে যাবে পুরো।”

শেহা মাথা তুলে তার মেজো মামীর দিকে এক পলক তাকিয়ে আবারও মাথাটা নিচু করে বসে থাকে চুপচাপ। রিতু অনর্গল তার জা'য়ের কাছে ইরফানের কর্মকাণ্ডের ফিরিস্তি দিতে থাকলো।

কিছুক্ষণ সেসব শুনে আলো চলে আসে দোতলায়। তার হাতে একটা নকশি কাঁথা ছিলো। গত দু'দিন ধরে এটা নিয়ে সেলাই করছে সে।
ইহানের দরজা খোলা পেয়ে আলো দরজার কাছে গিয়ে বলল,“আসব ইহান।”

_হ্যা বড় মা।

আলো ভেতরে ঢুকে দেখলো ইহান তৈরি হচ্ছিলো।

_কোথাও বেরোবি?

_হ্যা, সম্মেলনে।

আলো বসলো একটা চেয়ারে,বললো,“পরী আর তোর ছোটোবাবার সাথে কথা হয়েছে তোর? আমি ফোনে পাচ্ছি না।”

ইহান পাঞ্জাবির হাতা গুটিয়ে নিয়ে আলোর সামনে এসে মেঝেতে ঝুকে বসলো। মাথাটা বড় মা'র কোলে রেখে বললো,“হয়েছে কথা।”

ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে আলো হেসে বললো,“কি ব্যাপার। আজ আমার ছোটো ইহানকে দেখছি মনে হচ্ছে।”

_তুমিই তো বলো,আমি তোমার সে-ই ছোটো ইহান।

_ছোটো? দুদিন বাদে বৌ আনবো তোর জন্য। আচ্ছা ভালো কথা,তোকে একটা মেয়ের ছবি পাঠালাম। তুই দেখলি না কেনো?

_ইচ্ছে করেনি।

_তাহলে কি ইচ্ছা করে তোর?

ইহান চুপ। আলো ছেলের মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বললো,“কেন এমন করছিস ইহান। খুলে তো বল। বিয়ে তো করতেই হবে তাই না? আচ্ছা কাউকে পছন্দ থাকলে তো বলে দিতে পারিস। যেমন হোক,আমি মেনে নেবো।”

ইহান মাথা তুলে বড় মা'র দিকে তাকিয়ে লজ্জা পাওয়ার মতো করে বলে,“এমন কিছুই না বড় মা।”

আলো খুবই তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ছেলের দিকে, কিছুক্ষণ ছেলেকে দেখলো,“তাহলে এমন লজ্জা পাচ্ছিস কেন?”

ইহান হেসে ফেলে,“কি সব যা তা বলছো বড় মা বলো তো!”

_আছে নাকি পছন্দ?

_আরে ওমন কিছুই না বড় মা।

_তবে কেমন কিছু?

ইহান বড় মা'র মুখের দিকে তাকিয়ে বলে,“এমনিই কিছুটা ভালো লেগেছে। মুগ্ধতা। এটুকুই।”

আলোর চোখে মুখে চাপা আনন্দের ছটা, উত্তেজিত হয়ে গিয়েছে একপ্রকার। খুশি চেপে রেখে বললো,“কেমন দেখতে? কোথাকার মেয়ে? বয়স কত? পড়াশোনা করে? কোথায় থাকে? সুন্দরী?”

ইহান হতভম্ব হয়ে আলোর দিকে তাকিয়ে আছে। পর পর বললো,“বড় মা তুমি পাগল? বলেছি তো এমন কিছুই না। ওনাকে ভালো লেগেছে, রেসপেক্ট থেকে জন্মেছে এটা। এর বাইরে কিছুই না।”

_আচ্ছা বুঝলাম। তুই মেয়ের ছবি দেখা। মেয়ে সুন্দরী?

ইহান নিচুস্বরে বলে,“জানিনা।”

আলোর ছেলের মাথায় চাপড় মেরে বললো,“মেয়েদের মতো লজ্জা পাচ্ছিস কেন? বি আ ম্যান।”

_বড়মা, মাকে এসব ভুলেও বলবে না তুমি। আমাকে পাগল করে দেবে তবে। বিষয়টা ওমন কিছুই না। বুঝেছো?

_আচ্ছা বুঝলাম তো। তুই বল দেখতে কেমন মেয়েটি।

_সুন্দরী। চোখ দু'টো সবথেকে বেশি সুন্দর ওনার। সমুদ্র নীল চোখ,যেন শতাব্দীর নীল অন্ধকার।

আলো হা করে তাকিয়ে আছে ছেলের মুখের দিকে। ইহান উঠে দাঁড়ায়, চেহারায় গাম্ভীর্য ফিরিয়ে এনে বলে,“এটা নিয়ে জা'য়ের সাথে গসিপ করবে না দয়া করে। তোমাকে সব বলি তাই বললাম!”

চলমান.....

#বিশেষ_নোট

আপনারা বলেন আমি আগের মতো নিয়মিত নই কেন। এলোমেলো সময়ে গল্প কেনো দিই। যারা আমার নতুন পাঠক তারা হয়তো বিষয়টি জানেন না, তাদের জন্য বলছি, আমার গতবছর নভেম্বরে একটা মিসক্যারেজ হয় এবং তার সাথে এক্টোপিক প্রেগন্যান্সিও ধরা পরে। সার্জারির প্রয়োজন হয় তখন। আমার প্রথম বেবীও সি-সেকশনে হয়েছিলো। তো ঐ এক্টোপিক প্রেগন্যান্সির সার্জারির পরে মাত্র দশদিন বিশ্রাম নিয়েই আমি #আরেকটি_বার গল্পটা কনটিনিউ করেছিলাম। তবে এখন শরীরটা প্রায় অচল আমার। এছাড়াও নানাবিধ শারীরিক জটিলতা তো আছেই। দিনদিন একটা প্রতিবন্ধীর থেকে কম কিছু হচ্ছি না আমি। তার ওপর একটা চার বছরের ছেলে বেবির প্রপার টেক কেয়ার করে অসুস্থ শরীর নিয়ে ঘরের কাজও আমাকেই করতে হয়, আমার কোনো হেল্পিং হ্যান্ড নেই। প্লাস পড়াশোনা। এই সিচুয়েশনে যারা আছেন তারা বুঝবেন। লেখালেখিটা এর ভেতরে যে কনটিনিউ করতে পারছি এটাই অনেক। আমার লেখা পড়লেই বুঝবেন আমি দ্রুত লিখি। নেহায়েৎ শুরু করেছি গল্পটা, শেষ তো করতেই হবে। তবে আমার গল্প দেওয়ার সময় নিয়ে কেউ আক্ষেপ করবেন না প্লিজ। যখন পারি দেবো। বেশি তো অপেক্ষা করাই না আপনাদের। এই বিষয়ে আর কখনও আমি কিচ্ছু বলবো না। আজ বুঝলে বুঝবেন ,না বুঝলেও অসুবিধা নেই।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 24 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন