#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_২৬ [ ১ম অংশ ]
#ইসরাত_ইতি
🚫কঠোর ভাবে প্রাপ্তমনস্কদের জন্য।
🚫শিক্ষা ও সাহিত্যের সাথে আমার এই কল্পিত ঘটনাগুলোর লিখিত শব্দগুলোর কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
[ ১ম অংশ ]
“নিব্বি আর প্রিতম?”
এতোটাই জোরালো ছিলো ওদের সম্বোধন,ইনায়া চ'ম'কে উঠলো শুনে। ঘুরে প্রিতমের তিন বন্ধুর দিকে তাকিয়ে থাকে, দৃষ্টিতে তার হতভম্ব ভাব।
মুখ থেকে মাস্ক খুলে ফেলে প্রিতমের পাশ ঘেঁষে দাঁড়ায়। ওরা তিন বন্ধু তখনও ঘোরের মধ্যে ছিলো, জামি তো ধপ করে পাথরের বেঞ্চিতে বসে পরলো। ওকে নকল করলো সাফওয়ান এবং শুভও।
প্রিতম শান্ত দৃষ্টিতে কয়েক পল ওর তিন বন্ধুকে দেখে ফোঁস শব্দে একটা লম্বা শ্বাস ফেলে ইনায়ার দিকে তাকায়, নিচুস্বরে বলে,“গরম লাগছে? কোল্ড ড্রিংকস খাবে?”
ইনায়া মাথা ঝাকালো।
“ঠিকাছে তুমি বসো। আমি নিয়ে আসছি।”
বলেই প্রিতম কাছের একটা কোলড্রিংকস বুথে ঢুকলো। ইনায়া বসে পরলো ওদের তিন বন্ধুর সামনে। আড়চোখে সবার দিকে তাকিয়ে দেখতে পেলো ওরা তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে ইনায়াকেই দেখছে, মুখভঙ্গি থমথমে। ইনায়া একটা ঢোক গিলে নিল,আমতা আমতা করে বললো,“কেমন আছেন ভাইয়ারা!”
তিনজন একই সাথে,বরফ ঠাণ্ডা গলায় বলে উঠলো,“শ'কে আছি শত্রুর বোন।”
ইনায়া লটকানো মুখ নিয়ে বসে রইলো মাথা নিচু করে। নীরবতা ভাঙলো জামি। টেবিলে সজোরে একটা চাপড় মে'রে দাঁতে দাঁত চেপে বললো,“বলেছিলাম না দূরে থাকতে আমার বন্ধুর থেকে?”
ইনায়ার কোন হেলদোল নেই,সে চুপ করেই রইলো। প্রিতম এসে ইনায়ার পাশে বসলো, এক এক করে ইনায়ার হাতে কোল্ড ড্রিংকস,টিস্যু পেপার ধরিয়ে দিলো। যেন প্রিতম কাজগুলো করতে অভ্যস্ত ভীষণ।
ওরা তিন বন্ধু শুকনো মুখে সেটাই খেয়াল করছে। প্রিতম আদুরে গলায় ইনায়াকে বললো,“জ্বর এসেছিলো আবারও?”
মাথা নাড়ায় ইনায়া। সে ব্যস্ত কোল্ডড্রিংকস গিলতে। শত্রুর বোনের সাথে এতো “লুতুপুতু” ভাব ভালোবাসা দেখে ফুসছিলো ওরা তিন বন্ধু,এবার আর ধৈর্য্য রাখতে পারলো না জামি, দাঁতে খিচিয়ে বললো,“এবার বলবি? অঘটন টা কিভাবে ঘটলো?”
প্রিতম ওদের দিকে তাকায়,“বলবো। শোন....”
খেতে খেতে হঠাৎ কাশি উঠে গেলো ইনায়ার। প্রিতম কথা থামিয়ে ওকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পরলো।
এই দৃশ্য আর হজম হচ্ছিলো না জামিদের। রেগেমেগে উঠে দাঁড়িয়ে বলে,“এই আমরা চললাম।”
_দাড়া! বলছি তো!
ধ'ম'ক খেয়ে তিনজন পুনরায় বসলো। প্রিতম আশেপাশে এলোমেলো দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলে,“হয়ে গিয়েছে। অ্যান্ড আ'ম হেল্পলেস! ফেঁসে গিয়েছি আমি!”
ইনায়া আড়চোখে কয়েক পল প্রিতমকে দেখে নিয়ে লজ্জা রাঙ্গা মুখটা নিচু করে বসে থাকে।
জামি বললো,“কে আগে এগিয়েছে?”
প্রিতম আর ইনায়া দুজন দুজনের দিকে তাকায়। তাদের দৃষ্টি কথা বলছে। কি বলছে সেটা জামিরা বুঝতে পারছে না।
সাফওয়ান বললো,“কি হলো,বল কে আগে এগিয়েছে?”
প্রিতম আর ইনায়া দুজন দুজনের দিকে দৃষ্টি রেখেই বললো,“আমি!”
চ'মকালো দু'জনেই। লজ্জা পেয়ে গেলো দু'জনেই। তবে ওদের লজ্জা দেখে রাগে গাঁ রিরি করছে জামিদের।
প্রিতম জামির দিকে তাকাল, তারপর অত্যন্ত ঠান্ডা স্বরে বললো,“এতো অবাক হওয়ার কিছু নেই।”
_অবাক? কিসের অবাক? দ্য গ্রেট প্রেরণা আহসানের দ্য গ্রেট বুঝদার ভাই প্রিতম আহসান একটা আহাম্মকের মতো কাজ করলে অবাক হবো কেন? একটুও অবাক হচ্ছি না!”
জামির ক্রোধ নিয়ন্ত্রনের চেষ্টা সফল হয়না। প্রিতম শুকনো মুখে একপলক বন্ধুদের দিকে তাকায়, একপলক ইনায়ার দিকে। শুভ বলে ওঠে,“কি ঘটেছে বিস্তারিত বল।”
বিস্তারিত? অনুভূতির বিস্তারিত ব্যখ্যা কিভাবে দেয়? বুঝতে পারছে না প্রিতম-ইনায়া। তবে যা হয়েছে এই দুমাসে,যা কিছুর মধ্যে দিয়ে দু'টো মন গিয়েছে,বর্ণনায় তার বাদ যায়নি কিছুই। ইনায়ার মেসেজ দিতে থাকা, কিছুদিন প্রিতমের তাকে ইগনোর করা। যখন ইনায়া মেসেজ দেওয়া বন্ধ করে দিলো তখন প্রিতমের ইনায়াকে মেসেজ দেওয়া। সবকিছুই বলতে লাগলো বন্ধুদের সাথে। যেসব কিছু তার বন্ধুরা কখনও জানেনি।
শুরুতে প্রিতমের উপেক্ষা বুঝতে মোটেও অসুবিধা হয়নি ইনায়ার। নিজেই গুটিয়ে নিয়েছিলো নিজেকে। তারপর হঠাৎ একদিন মেসেজ টা প্রিতমের থেকেই এসেছিলো। ইহানের দলীয় অফিসে প্রায়-ই যাওয়া আসা লেগে থাকতো জামি-প্রিতমের। ইহানের থেকেই অল্পস্বল্প জানতে পারে ইনায়ার অসুখের ব্যাপারে, নিউমোনিয়া বাঁধিয়ে হসপিটালাইজড সে।
সংযমের শক্ত বাধ টা ভেঙে প্রিতম লুকিয়ে লুকিয়ে দেখতে গিয়েছিলো ইনায়াকে। তখন উপেক্ষা ইনায়া করেছিলো প্রিতমকে। কড়া করে শুনিয়ে দিয়েছিলো কঠিন কঠিন কথা। বলেছিলো,“পাপা,বড় বাবা,মেজো বাবা,দাদানদের পরে এতোটা হ্যাংলা আমি আর কারো সাথে হইনি! আপনি যান, বোকামি করে দিয়ে ফেলেছি অত মেসেজ। আর কখনও দেবো না।”
প্রিতম সেদিন চুপ করে ইনায়ার মুখের দিকে তাকিয়ে ছিলো। বাচ্চাসুলভ তরুণীর এতো অহেতুক অভিমান দেখে তার খুব হাসি পেয়েছিল। বাস্তবতা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন একটি মন,এই মনে প্রিতমের জন্য অনুভূতি সৃষ্টি করলে সে যে ঘোর বিপদে পরবে তা এখনও ঠাওর করতে পারছে না তরুণী।
প্রিতম সেদিন কিছু না বলেই চলে এসেছিল হসপিটাল থেকে। ইনায়ার সেদিন হঠাৎ খুব কান্না পেয়েছিল। তার মনে হচ্ছিল সে যদি মোটা না হতো তাহলে লোকটা অন্তত ইগনোর না করে ভদ্রভাবে দু'টো উত্তর পাঠিয়ে দিতো। ইনায়া কি বেহায়ার মতো তার পিছু পরে থাকতো নাকি? চেনা জানা হয়েই থেকে যেতো সবসময়। নিজের শরীরের দিকে তাকিয়ে ইনায়া ভেবেছিলো তার এই মোটা ভারী স্বাস্থ্যের জন্য সে বুঝি কোনো সুন্দর ছেলের চেনা জানা হয়েও থাকার যোগ্য নয়।
হসপিটাল থেকে ফিরে নিজেকে ঘরবন্দি করে রেখেছিলো ইনায়া। তখন মাম্মা-পাপাও ছিলো না দেশে। নিজের প্রতি বিতৃষ্ণা ধরে গিয়েছিলো তার । ডিপ্রেশনে ভাসতে ভাসতে মন কোথাও গিয়ে ঠেকলো, করে ফেললো আরও একটি বোকামি। ডাক্তারের নিষেধ অমান্য করে নিজের চর্বি কমানোর জন্য কৃত্রিম হেল্থ ড্রিংকস খেতে শুরু করলো বাড়ির সবাইকে লুকিয়ে, যা ছিল তার জন্য মরণঘাতী।
এক সপ্তাহের মাথায় অসুস্থ হলে,আবারও তাকে হসপিটালে নেওয়া হয়। প্রিতম রুশফির থেকে এসব শুনে ছুটে গিয়েছিলো হসপিটালে। কখনও রেগে,কখনও নম্রস্বরে দীর্ঘসময় বুঝিয়েছিলো ইনায়াকে। ইনায়া সেদিনও চুপ করে ছিলো।
সুস্থ হয়ে বাড়িতে ফিরে নিজের মনকে যখন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে এনেছিলো,পড়াশোনায় মনোযোগী হয়ে উঠেছিল ঠিক তখনই, একদিন প্রিতমের বাইকে এক সুন্দরী-স্লিম মেয়ে দেখে মাঝ রাস্তায়-ই কান্নায় ভেঙে পরেছিল ইনায়া।
বাড়িতে ফিরে ঘরের দরজা বন্ধ করে প্রিতমকে ফোন করে অনেক কথা শুনিয়েছিলো সেদিন। প্রিতম আসলে তাকে তার ভারী স্বাস্থ্যের জন্যেই রিজেক্ট করেছে,অন্য কোনো কারণ নেই। এটাই ছিলো তার কথার সারমর্ম।
বন্ধুরা ছাড়া ইনায়ার মনের এই তান্ডব বাড়ির কেউই জানতে পারেনি। সেদিন রাতে ইনায়া জ্বরে পরে যায়। তিনদিন ভুগে পুনর্বার হসপিটালে স্থান হয় তার। সেদিনও গভীর রাতে প্রিতম গিয়েছিলো হসপিটালে। তার পরেরদিনও গিয়েছিলো, তার পরেরদিনও!
উপেক্ষা করতে করতে বুঝদার প্রিতম আহসান নিজেই কখন অবুঝের মতো পিছলে গেলো বিশের এই মিষ্টি দেখতে, শান্ত অবুঝ মেয়েটির প্রেমে তা ঘুনাক্ষরেও টের পায়নি সে। হসপিটালের দিনগুলোতে, শেষ দিন যখন প্রিতম খেই হারিয়ে ইনায়ার হাতের একটা আঙ্গুল ধরে ফেলেছিলো তখন ঐ কথাটা প্রিতমের মাথায় একবারের জন্যও আসেনি,“এর পরিণতি খুব খারাপ হতেও পারে।”
আসেনি কথাটি প্রিতমের মাথাতে। তারপর? তারপর থেকে প্রতিদিন,প্রতি মুহূর্তে টেক্সট,কল অনুভূতিকে লাই-আস্কারা সব কিছু দেওয়া হলো। বেহায়ার মতো তরতরিয়ে বাড়তে থাকলো অনুভূতি। যে অনুভূতি ইনায়ার মতো বড়লোকের আহ্লাদী,নিব্বি মেয়েগুলো এড়াতে পারেনা, যে অনুভূতি প্রিতমের মতো বাস্তববাদী বুঝদার ছেলেগুলোও এড়াতে পারে না। কারন এই অনুভূতি হবারই ছিলো, ডেসটিনি হাত ধুয়ে পেছনে পরেছিলো দুজনের যে!
গালে হাত দিয়ে ওরা তিন বন্ধু প্রিতম-ইনায়ার দিকে তাকিয়ে আছে। প্রিতম সংক্ষেপে সবটা বলে চুপ হয়ে যায়। তার দৃষ্টি নত।
জামিরা তিনজন-ই একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে দিয়ে একসাথে বলে ওঠে,“হু বুঝলাম।”
_কি বুঝলি?
প্রিতম ওদের মুখের দিকে তাকিয়ে জানতে চায়। জামি বলে,“আমার কাছে মনে হয়েছে নিব্বা-নিব্বির প্রেম কাহিনী শুনলাম এতক্ষণ ধরে।”
ইনায়া-প্রিতম হতাশ হয়ে তাকিয়ে আছে ওদের দিকে। সাফওয়ান মাঝখান থেকে বলে ওঠে,“তোরা কি আদৌও ভাবছিস না বিষয়টা অতটা সহজ হবে না তোদের সামনে? নাকি পাঙ্খা মেলে উড়তে উড়তে ভুলে গিয়েছিস ইরফান মির্জার কথা?”
প্রিতম ইনায়ার দিকে একপলক তাকায়, অতঃপর সাফওয়ানের কথার জবাবে বলে,“ভুলিনি। ইহান ভাইয়াকে মানিয়ে নিতে পারলে ওকেও ম্যানেজ করা যাবে তাই আপাতত ওসব ছোটোখাটো ঝামেলা নিয়ে ভাবতে চাচ্ছি না।”
_ছোটোও?
চেঁ'চি'য়ে ওঠে জামি। প্রত্যেকেই হকচকায়। ডান হাতের তর্জনী আর বৃদ্ধাঙ্গুল দিয়ে সাইজ বোঝানোর ইশারা করে জামি আবারও বলে,“ছোটো? ইরফান মির্জাকে তোর ছোটোখাটো ঝামেলা মনে হয়?”
পরপর শুভ বলে,“প্যায়ার মে আন্ধা হোগায়া। ফরিং হয়ে উড়ছিস। পরে যখন ধপ করে নিচে পরবি তখন চিৎকার দিয়ে কেঁদে কুল পাবি না।”
____
প্রেসক্লাবের সভাপতি প্রেরণার দিকে তাকিয়ে বললো,“তো বলুন। আপনার সর্বমোট কত টাকার ক্ষতি হয়েছে।”
সাব্বির ক্যালকুলেটর হাতে পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলো, প্রেরণার বদলে উত্তরটা সে দেয়,“জি দুই লক্ষ তেতাল্লিশ হাজার সাতশ টাকা।”
দুই দলের সবাই সালিশে উপস্থিত। পরিবেশ স্বাভাবিক শান্ত, এখন অবধি কোনো দলের কেউ-ই উচ্চবাচ্য করেনি। আর ইহান তাজওয়ার মির্জার উপস্থিতিতে তার দলের ছেলেরা তো একেবারেই সাহস করবে না এমন দুঃসাহস দেখানোর।
সাগর ভুঁইয়া দৃষ্টি স্থির রেখেছে প্রেরণার দিকে, এ নিয়ে বার দুয়েক দেখা হয়েছে তার সাথে প্রেরণার, অনেক শুনেছে সে প্রেরণার কথা অনেকের কাছে, তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দেখছে তাকে। পুরুষ মানুষগুলোর থেকে অনেকটা দূরে দাঁড়িয়ে আছে প্রেরণা। মাথায় অর্ধেক ঘোমটা তুলে রাখা। সবিনয়ে বলে ওঠে,“আমি যদি ক্ষতিপূরণ টা না পাই তবে আইনি লড়াইয়ে যাওয়া ব্যতীত আমার কোনো উপায় থাকবে না। আশা রাখছি আপনারা দুই দলই বিষয়টাতে সমঝোতা করবেন।”
ইহান একপলক ঘা'ড় ঘুরিয়ে দেখলো প্রেরণাকে। জানালার কাঁচ গলিয়ে আসা শেষ বিকেলের আলোয় শুভ্র ত্বকে কমলা ছাট এনেছে। ঐ মুখমন্ডল ঠিক যেন এক ফালি কমলা রঙের রোদ।
ইহান চোখ নামিয়ে নিয়ে রাশভারী আওয়াজে বলে,“আমার ছেলেদের ক্ষতিপূরণ দিতে অসুবিধা নেই।”
লাবিব দোনামোনা করলেও ইহান তাজওয়ার মির্জা এই সালিশে মাহাত্ম্য দেখিয়ে নাম কিনে নেবে সেটা সে চুপচাপ দেখতে পারবে না, অগত্যা সেও জানিয়ে দিলো ক্ষতিপূরণ দেওয়া হবে তার ছেলেদের পক্ষ থেকে।
প্রেসক্লাবের সভাপতি এবং বাকি দুজন সদস্য উকিল ডেকে একটা স্ট্যাম্প পেপারে উভয়ের থেকে সই-সাবুদ নিয়ে সবটা সামলে দেয়। সৌজন্যতার খাতিরে প্রেরণা সবার জন্য চা-নাস্তার ব্যবস্থা করে।
সালিশ ভা'ঙে ঠিক মাগরিবের আজানের আধাঘণ্টা পূর্বে। এক এক করে বেরিয়ে যায় প্রেস ক্লাবের সদস্য এবং লাবিব চৌধুরীর লোকজন। ইহানও উঠে দাঁড়ায়, সাগর ভুইয়া একপলক তাকিয়ে থেকে বললো,“তোমার বাপ-চাচাদের শরীর ভালো?”
_জি আলহামদুলিল্লাহ।
সংক্ষিপ্ত উত্তর ইহানের।
দলের ছেলেদের নিয়ে বেড়িয়ে যাওয়ার আগে ইহান শেষ বারের মতো প্রেরণার দিকে তাকায়। সৌজন্যতার খাতিরে বলে,“আসছি।”
প্রেরণাও মৃদু স্বরে বলে,“জি।”
_আবার কোনো অসুবিধা হলে জানাবেন।
_আর মনে হচ্ছে হবে না,যদি আপনারা আপনাদের দলের ছেলেদের সঠিক শিক্ষা দেন।
হেসেই বললো প্রেরণা। কন্ঠে তেজ নেই এখন।
ইহান প্রধান ফটকের দিকে পা বাড়াতেই একপেশে হাসলো। হাসলো কারণ তার অবচেতন মন প্রেরণাকে বলেছে,“আবার ঝামেলা হোক।”
নিজের কান্ডে নিজেই বেশ বিব্রত ইহান । গম্ভীর মুখে অহেতুক হাসি। ছেলেগুলো ভাইকে দেখছে কৌতুহলী হয়ে। ইহান মুখে গাম্ভীর্য ফিরিয়ে এনে ওদের বলে,“হোয়্যাট?”
_কিছু না ভাই।
গাড়ির কাছে এসে দাঁড়াল ইহান। ছেলেদের ভালো করে হুমকি দিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছে, ভবিষ্যতে স্বাদে আহ্লাদে থেকে দূরে থাকতে।
বেচারা ইহান তাজওয়ার মির্জা তখনও বুঝতে পারেনি, ছেলেগুলো স্বাদে আহ্লাদে থেকে দূরে থাকলেও সে থাকতে পারবে না।
কারন? ডেসটিনি!
____
সন্ধ্যা হয়ে এসেছে প্রায়। বাড়ি থেকে বারবার কল আসছে ইনায়ার নাম্বারে। ফোনটা তার সাইলেন্ট মোডে ছিলো, তখনও টের পায়নি। ইনায়া ব্যস্ত “লাজানিয়া”খেতে। জামিরা তিন বন্ধু চলে যাওয়ার পরে প্রিতম তাকে নিয়ে এসেছে এখানে। শহরের সবথেকে প্রসিদ্ধ ইটালিয়ান রেস্টুরেন্ট এটি।
তাড়াহুড়ো করে খাচ্ছিল ইনায়া। এক্ষুনি বেরোতে হবে। আশেপাশেও তাকাচ্ছে না সে। প্রিতম একদৃষ্টে ইনায়ার দিকে তাকিয়ে হাসছিল মিটিমিটি।
ইনায়া খেতে খেতে একপলক চোখ তুলে তাকাতেই প্রিতম চোখ নামিয়ে নেয়। গালভর্তি লাজানিয়া নিয়ে ইনায়া গমগম করে বলে,“কি দেখছো!”
_কিছু না। তুমি খাও।
অস্ফুটে বললো প্রিতম।
_আমাদের পরিকল্পনার কথা মাথায় আছে?
_জি আছে।
বাধ্য ছেলের মতো জবাব প্রিতমের।
ইনায়া আবারও মনোযোগী হয়ে ওঠে। হঠাৎ বলে,“আচ্ছা শোনো, পার্সেল করে দিতে বলো তো ওয়েটারকে।”
_কেন? বাড়িতে নিয়ে খাবে?
_না,এগুলো আমি এখানেই খাবো। তুমি আরো দু'টো পার্সেল করে দিতে বলো।
পার্সেল দু'টো হাতে নিয়ে দাড়িয়ে আছে প্রিতম। ইনায়ার সাথে তার যু'দ্ধ গিয়েছে বিল পে করা নিয়ে। ইনায়া কিছুতেই পার্সেল দু'টোর বিল প্রিতমকে দিতে দেবে না। অগত্যা হার মেনে নেয় প্রিতম। ইনায়াকে ক্যাবে তুলে দেওয়ার আগে পার্সেল দু'টো তাকে দিতে গেলে ইনায়া হেসে বলে,“এগুলো তুমি নেবে। এগুলো প্রণমিকে তার ভাবী আর শুদ্ধকে তার মামী দিয়েছে। ওদের বলবে কিন্তু!”
হাসলো প্রিতম,মুগ্ধতা নিয়ে তার নিব্বি প্রেয়সীকে দেখতে থাকলো।
ক্যাব ছেড়ে দেওয়ার পরেও প্রিতম সেখানে দীর্ঘসময় দাঁড়িয়ে ছিল। সুদর্শন চেহারায় লেপ্টে আছে সন্তুষ্টির হাসি। স্নিগ্ধ,নির্মল,সরল হাসি।
____
অফিস থেকে সরাসরি শপিং ম'লে এসেছে ইরফান। তার পরনে ফরমাল প্যান্ট,শার্ট এবং টাই। বন্ধুরা হঠাৎ ফোনে জানিয়েছে ওরা সবাই এখানে। ইরফান গ্যাংয়ের অন্যতম সদস্য অধরা,যার কিনা দুমাস বাদেই বিয়ে, তার হবু বরের সাথে শপিংয়ে এসেছে সে, হবু বরকে বন্ধুদের সাথে পরিচয় করিয়ে দেবে আজ।
ওরা সবাই ম'লের ফুড লাউঞ্জে বসে আড্ডা দিচ্ছিলো। হঠাৎ ইরফানের ফোন বেজে উঠলে ইরফান ফোন নিয়ে খানিক দূরে গিয়ে দাঁড়াল, শপিং মলের কিড জোনের ঠিক পাশেই।
ফোনের ওপাশ থেকে রাফি বললো,“দোস্ত ইনায়া কোথায়?”
_ইনায়া এখন বাড়িতে। কেনো?
_বাড়িতে? না মানে আজ ওয়েসক্যাফের সামনে একটা ছেলের সাথে একটা মেয়েকে দেখলাম বুঝলি। ছেলেটার মাথায় হেলমেট ছিলো আর মেয়েটার মুখে মাস্ক। আমার এক পলকের দেখায় মনে হলো মেয়েটা আমাদের ইনু।
ইরফানের মুখভঙ্গি গম্ভীর হয়ে উঠলো হুট করেই। বললো,“আচ্ছা দেখছি রাখ!”
ফোন কে'টে চিন্তিত ভঙ্গিতে ইরফান ঘুরে দাঁড়াতেই তার পা দুটো পুনরায় স্থির হলো। নির্নিমেষ চাহনি সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটার পা থেকে মাথা অবধি ছেয়ে গেলো।
একটুও নড়লো না ইরফান, একটুও না। কপালের ভাজ শিথিল হলো তার। তাকিয়ে রইল অপলক।
প্রনমিকে কিড জোনে রেখে মিস জেনি গিয়েছে ওয়াশরুমে। ডায়াবেটিসের পেশেন্ট কি না! যত্রতত্র প্রয়োজন পরে ওয়াশরুমের।
প্রণমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলো, বাচ্চারা হৈহৈ করে খেলছে। ভিডিও গেমের রিমোট কন্ট্রোলার হাতে দৌড়াদৌড়ি করছিলো দু'টো আট ন'বছরের ছেলে। ছুটতে ছুটতে এসে প্রণমির গায়ে পরতেই প্রণমি আঁতকে উঠে পিছিয়ে গিয়ে দেয়ালের সাথে বারি খেলো হঠাৎ। হাত থেকে ছড়িটা পরে গেল তার।
ইরফান স্থির দৃষ্টিতে সবটা দেখছিলো। অতঃপর ধীর কদমে এগিয়ে গিয়ে কয়েক মুহূর্ত প্রনমির চোখের দিকে তাকিয়ে থেকে ঝুঁকে ছড়িটা হাতে তুলে নেয়।
_কে!
ভীত কন্ঠ প্রনমির। গলা কাঁপছে তার।
প্রনমি আবার বলল,“মিস জেনি?”
ইরফান প্রনমির চোখ থেকে দৃষ্টি সরিয়ে বলে,“আচ্ছা তোমার বাবা মা কি সবসময় এখানে তোমাকে ল্যাং খেতে রেখে যায় একা?”
চমকায় প্রনমি। খুব কাছে দাঁড়িয়ে আছে লোকটা,সে বুঝতে পারলো কন্ঠ শুনে। ঘাবড়ে গিয়ে নিজের গাঁয়ের ওরনা ঠিক করতে ব্যস্ত হলো।
ইরফান সেটি দেখে হাসলো বক্র হাসি। তাচ্ছিল্য নিয়ে বললো,“ভয় নেই! আমি ছেলেধরা নই।”
_কি চাই?
কাঠ কাঠ বলতে চাইলো প্রনমি। পারলো না।
ইরফান বরফ ঠাণ্ডা গলায় বললো,“তোমার ছড়িটা দিতে চাই। হাত পাতো।”
প্রনমি বিব্রত ভঙ্গিতে হাত পাতলো। ইরফান ছড়িটা হাতে তুলে দিয়ে আবারও প্রনমিকে ভালো করে খেয়াল করলো। চোখ, ঠোঁট,গাল, গালের লাল তিল, চোখের মণি, সব দেখলো।
মিস জেনি এসে দাঁড়াল সেখানে। বললো,“কি হয়েছে প্রনমি?”
প্রনমি নড়েচড়ে উঠে বললো,“মিস জেনি এসেছেন?”
ইরফান হেসে বললো,“জিনি? তুমি জিনি নিয়ে ঘোরো নাকি!”
প্রনমি বিরক্ত হয় খুব। মিস জেনি এসে ধরতেই সে কন্ঠে বিরক্তিভাব ফুটিয়ে বলে,“তাড়াতাড়ি চলুন এখান থেকে।”
ওদের প্রস্থান দেখে ইরফান বাঁকা করে হাসলো। দীর্ঘসময় সেদিকে তাকিয়ে থেকে বিড়বিড় করে বলে,“এই মেয়ের কাপাকাপির রো'গ আছে। তাই আরো দুই মার্ক কাটা।”
চলমান.......
২য় অংশের লিংক কমেন্টে।#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_২৬ [ ২য় অংশ ]
#ইসরাত_ইতি
[ ২য় অংশ ]
১ম অংশের লিংক কমেন্টে।
মির্জা বাড়ির বড় বৌ আলো বাড়াবাড়ি করে। এ কথাটি ইনশিরাহ হাড়ে-মজ্জায় বিশ্বাস করে। আজ যেন সে-ই বাড়াবাড়ির মাত্রা ছাড়িয়ে গিয়েছে।
আলো তার হাতে একটি কমলা রঙের জামদানী শাড়ি নিয়ে অগ্নিমূর্তি রূপ ধারণ করে আছে।
ইনশিরাহ থোরা-ই পাত্তা দিলো সেসব। সে ব্যস্ত ভঙ্গিতে নিজের শার্টের হাতা ফোল্ড করে পার্স ব্যগ আর ফোনটা হাতে তুলে নেয় ।
আজ শিল্পকলা একাডেমীতে “সানশাইন স্কুল” নামে প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য, বিদেশি সংস্থার অনুদানে নির্মিত স্কুলে বার্ষিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উদযাপিত হবে। ইনশিরাহ সেই ফাউন্ডেশনের সর্বকনিষ্ঠ সদস্য হিসেবে আজ পুরষ্কার পেতে চলেছে। প্রতিবন্ধী শিশুদের জন্য এই বিদেশি সংস্থাটি আজ প্রায় তেরো বছর ধরে কাজ করে যাচ্ছে এই শহরে। ইনশিরাহ তখন ক্লাস নাইনে পড়তো,তখন থেকেই শিশু এবং পশু পাখিদের নিয়ে কাজ করা তিন-চারটে স্বেচ্ছাসেবক সংস্থার সাথে যুক্ত সে।
ঘরের বাইরে আর পা রাখতে পারলো না ইনশিরাহ। তার মাতারানী দরজা আটকেই দাঁড়িয়ে আছে। আজ আলো কিছুতেই মেয়েকে শার্ট প্যান্ট পরে শিল্পকলা একাডেমীতে যেতে দেবে না,পণ নিয়েছে সে।
ইনশিরাহ মায়ের সাথে কিছুক্ষণ চেঁচামেচি করে হার মেনে নেয়। তবুও মৃদু আওয়াজ তুলে দুয়েকবার বলতে চেয়েছিলো,“তাই বলে শাড়ি?”
_হ্যা শাড়ি। সুন্দর করে, পরিপাটি করে পরিয়ে দেবো তোকে। অনেক মার্জিত লাগবে তোকে।
_মাম্মা আমি কখনো পরেছি শাড়ি?
_না পরিসনি। আজ পরবি। কত বড় একটা পুরস্কার পাচ্ছিস। অকর্মার ঢেকি মেয়ে কিছু মহান কাজ করে পুরস্কার হাতিয়ে নিচ্ছে। এভাবে শার্ট প্যান্ট পরে গেছো মেয়েদের মতো আমি যেতে দেবো না না না।
একটা লম্বা শ্বাস ফেললো ইনশিরাহ। মিনমিন করে বললো,“যা ইচ্ছা করো। তবে আমার বিরক্তি ধরে গেলে কিন্তু রাস্তায় খুলে টুলে ফেলে দেবো বলে দিলাম।
আলো অত্যন্ত নিপুণ হাতে তার সবচেয়ে প্রিয় কমলা জামদানীটা মেয়েকে পরিয়ে দিতে থাকে। ইনশিরাহ মোমের পুতুলের মতো দাঁড়িয়ে আছে চুপচাপ। একবার ভাবলো,পরেই দেখা যাক! কি আছে এই বারো-হাতি লম্বা কাপড়ের টুকরোটাতে। যে সব মেয়েরা পাগল এর জন্য।
ইনশিরাহর শাড়ির কুচি গুছিয়ে নিতে নিতে আলো বলে,“এই শাড়িটা আমারও জীবনে পরা প্রথম শাড়ি জানিস। পুরনো ডিজাইন। এখনকার জামদানির সাথে মিলবে না।”
_বুঝলাম।
আলো মিটিমিটি হাসছে। ইনশিরাহ বলে,“হাসছো কেনো?”
আলো একটা মৃদু শ্বাস ফেলে আনমনে মেয়েকে বলতে শুরু করল,“সেদিন আমাদের কলেজের প্রোগ্রাম ছিল। আমি ছিলাম উপস্থাপনার দায়িত্বে। তোর পাপার সাথে তখন আমার ভীষণ রকমের শত্রুতা। নাম শুনলেই ইচ্ছে করতো খু'ন করে ফেলি। তিনি ছিলেন অনুষ্ঠানের অতিথি। সেদিন কি হয়েছিল জানিস?”
_কি হয়েছিলো?
_ব্যাজ পরাতে গিয়ে তোর পাপার গায়ে সেফটিপিন ফুটিয়ে দিয়েছিলাম আমি। ইচ্ছাকৃত ভাবে।
হেসে ফেললো আলো বলতে গিয়ে। ইনশিরাহ হা হয়ে গিয়েছে পুরো, বিস্মিত কন্ঠে বলে,“তুমি খুব ত্যাদোড় ছিলে মাম্মা! সো লেইম!”
আলো হাসছে তো হাসছেই। হঠাৎ হাসি থামিয়ে বলে,“তা একটু ছিলাম। আজ শাড়িটা নামাতেই সেদিনের সেই দৃশ্য গুলো চোখের সামনে ভাসতে শুরু করলো। অনুষ্ঠান শেষে আমি তড়িঘড়ি করে তোর পাপা আর তার চ্যালা-প্যালাদের চোখ বাঁচিয়ে পালাতে গিয়ে তাদের ঠিক সামনেই পরে যাই। তোর জামিল,তৌফ,রাহাত চাচ্চুরা আমাকে জ্বালানোর জন্য চেঁ'চি'য়ে বলতে লাগলো,“শিরায় শিরায় রক্ত। আমরা ইয়াসার ভাইয়ের ভক্ত।”
ইনশিরাহ হেসে ফেললো। আলো মেয়ের বুকে শাড়ির আঁচল তুলে দিয়ে মেয়ের দিকে তাকায়। নিমিষেই চোখ দুটো জ্বলজ্বল করে ওঠে আলোর। উজ্জ্বল শ্যামলা বর্ণের মুখটা তীব্র মোহনীয় লাগছে গায়ে কমলা রং জড়াতেই। ইনশিরাহ দেখতে হুবহু আলোর মতো। শ্যামলা, পানপাতার মতো মুখ, ডাগর ডাগর চোখ,লালচে ঠোঁট। দেখলে মনে হবে সে-ই আলো। উচ্চতায় একটু যা গড়মিল। আলো পাঁচ ফুট তিন আর ইনশিরাহ পাঁচ ফুট ছয়। ছেলে হলে উচ্চতায় পাপাকে ছাড়িয়ে যেতো নির্ঘাত।
মেয়ের চুলগুলো আচরে একটা বিনুনি করে দেয় আলো। মুখেও হালকা পাউডার লাগিয়ে দেয়। ইনশিরাহ গাইগুই করেও আটকাতে পারেনি। তার কাছে হঠাৎ ভালো লাগছে মায়ের এই পুতুল সাজানো আনন্দ। যেন এক কিশোরী তার পুতুলের বিয়ে দেবে বলে সাজিয়ে দিচ্ছে।
দরজায় এসে দাঁড়ালেন সামিন। অনুষ্ঠানে তিনিও নিমন্ত্রিত আজ, তার মেয়ে পুরষ্কার পাবে তা-ই। ঘরে ঢুকে মেয়ের দিকে তাকাতেই কিছুক্ষণ ঠাঁয় দাঁড়িয়ে রইলো সামিন। তারপর আস্তে ধীরে আলোকে বললো,“ও আছিয়া। আমার ছেলেটাকে কোথাও দেখছি না,এই মেয়েটা কে?”
ইনশিরাহ হেসে পাপাকে জরিয়ে ধরলো। সামিন আর আলোও হাসছে। শান্তিনীড়ের দোতলার পশ্চিমের মাঝের ঘরটা হাসির ঝংকারে মুখরিত হচ্ছে।
সামিন ইনশিরাহকেও প্রথম শাড়ি পরা উপলক্ষে টাকা দেয় দুই হাজার। ইনশিরাহ পাপার থেকে জোর করে এক হাজার টাকা বেশি নেয়,কারন সে বড় মেয়ে তা-ই।
গাড়ি শিল্পকলা একাডেমীর সামনে পার্কিং লটে রাখতেই ইনশিরাহ দ্রুত নামে গাড়ি থেকে। সামিন মেয়ের ছটফটানি দেখছে। আজ তার কাঁধে প্রচুর দায়িত্ব রয়েছে। অনুষ্ঠানের সেচ্ছাসেবিকা সে।
সামিন মেয়ের কাজ দেখে শান্তি পায়। মেয়েটিকে সবাই যত অকর্মার ঢেকি বলুক,সামিন জানে তার মেয়েটি একরোখা হলেও কাজের। যে দায়িত্ব দেওয়া হয় সেটি সে নিখুঁত ভাবে পালন করে। পরীর অসুস্থতায় সামিন দেখেছে ইনশিরাহর দায়িত্বজ্ঞান।
বৃহৎ একাডেমীর মিলনায়তন রুমে অনুষ্ঠান শুরু হতে আরো আধাঘণ্টা বাকি। উপস্থাপনার জন্য মঞ্চে এসে উপস্থিত হয়ে আবৃত্তিকার শোভন দাস আর কেয়া সরকার।
ইনশিরাহ সেচ্ছাসেবিকা। প্রশ্বস্ত কক্ষ গমগম করছিলো। কমপক্ষে পাচ-ছ'শ মানুষ ঠাসা কক্ষটিতে। সারি সারি চেয়ার দখল করে আছে প্রতিবন্ধী শিশুরা, খেলাঘর ক্লাবের গুণীজন, অতিথিবৃন্দ, সংস্থ্যার সদস্য এবং দর্শক। সামিনকে দর্শক সারিতে বসিয়ে রেখে ইনশিরাহ গিয়েছে তার সহ-সেচ্ছাসেবিকাদের কাছে।
দফায় দফায় প্রশংসিত হচ্ছে সে শাড়ি পরার দরুন। আলো মেয়েকে শাড়ি পরিয়ে সতের-আঠারোটির মতো সেফটিপিন লাগিয়ে দিয়েছে বিভিন্ন স্থানে,যাতে শাড়ি হুটহাট খুলে না যায়।
অনুষ্ঠান শুরু করার আগে অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথিদের নাম ঘোষণা করেছে উপস্থাপক। জেলা প্রশাসক বিপুল দাস, এ আসনের সাংসদ লিয়াকত চৌধুরীর পরে পুলিশ সুপার মুঈন ফরাজীর নামটা উচ্চারিত হতেই ইনশিরাহ খানিকটা অবাক হয়ে তার পাপার দিকে চায়।
সামিনও জানতো না মুঈন এই অনুষ্ঠানের অতিথি। সেও কিছুটা অবাক। কক্ষের দরজা দিয়ে এক এক করে অতিথিরা ঢুকে পরতেই স্বেচ্ছাসেবকরা তৎপর হয়ে ওঠে ব্যাজ পরিয়ে দিতে।
ইনশিরাহ চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। পাশের মেয়েটি তা'ড়া দিতেই সেও এগিয়ে যায়।
“এখন অতিথিদেরকে ব্যাজ পরিয়ে দেওয়ার মধ্য দিয়ে আমাদের বাৎসরিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের শুভারম্ভ হবে....”
উপস্থাপিকার কথাতে অতিথিরা আসন গ্রহণ না করে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে। মুঈন একাডেমীর অনুরোধে বহু কাজ ফেলে ঘন্টাখানেকের জন্য এসেছে। তার গায়ে ইউনিফর্ম। মাথায় ক্যাপ।
ইনশিরাহ স্বাভাবিক ভঙ্গিমায় এগিয়ে আসছে ধীর কদমে। হাতে ফুলের তোড়া এবং ব্যাজ।
মুঈনের দৃষ্টিসীমার ভেতরে চলে আসে কমলা রঙের এক টুকরো অস্বস্তি। প্রথম দর্শনেই মুঈন ফরাজী তাকিয়ে থাকে নির্নিমেষ। শুরুতে সে ভেবেছে হয়তো চোখের ধাঁধা, একবার দুবার করে চোখের পাতা ফেলে সে টের পেলো তার অস্বস্তি কমলা শাড়ি জরিয়ে তার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। চুলে আবার বিনুনি করেছে টমবয়। মুঈনের কপট হাসি পেল,কিন্তু থানার জাঁদরেল অফিসারের মুখভঙ্গি গম্ভীর।
যার চোখে মুগ্ধতা ঘিরে থাকলেও বোঝা দায় এই লোক রেগে আছে নাকি ঠিকঠাক? লম্বা,সুশ্রী, ফিনফিনে গড়নের মেয়েটি আজ শরীরে কমলা শাড়ি জরিয়ে নিজের নারীত্বের কোমলতা লোক জানাজানি করে দিয়েছে। যা সে ঢেকে রাখে ঢিলেঢালা শার্টের নিচে। দাঁড়িয়ে নেই ছেলেদের মতো, মুখভঙ্গিতে নেই পুরুষালি কাঠিন্যতা।
ইনশিরাহ ভদ্রভাবে আরো দুকদম এগিয়ে মুখ হাসি হাসি করে অতিথিদের সামনে। লিয়াকত চৌধুরী তাদের অপজিশন, তাকেও ইনশিরাহ বিনয়ী ভঙ্গিতে ব্যাজ পরিয়ে দেয়। শেষে এসে মুঈনের সামনে দাড়াতেই ভদ্রভাবে হাসে ইনশিরাহ,নির্মল হাসি। লোকটাকে সে তাদের পারিবারিক বন্ধু হিসেবে দেখেছে একভাবে, পেশাগত দিকে লোকটা জাঁদরেল, গম্ভীর তা ইনশিরাহ তো জানেই।
হাত বাড়িয়ে ব্যাজটা পরাতে যাবে অমনি মুঈন কিছুটা চ'ম'কে ওঠে। হুট করে একরাশ অস্থিরতা তাকে পায়ের পাতা থেকে মাথা অবধি কব্জা করে বসলো। হাঁসফাঁস করতে লাগলো মুঈন। আচমকা সে টের পেলো বুকের বাম পাশটাতে অস্বাভাবিক উৎপীড়ন শুরু হয়েছে, হৃদস্পন্দনের আওয়াজে হচ্ছে জোরালো। মুঈন একটা ফাঁকা ঢোক গিলে নেয়, তার মনে হচ্ছে মেয়েটা এই শব্দগুলো শুনে ফেলবে।
দাঁতে দাঁত চেপে মুখবিবর আরো আরো কঠিন করে দাঁড়িয়ে থাকে সে। ইনশিরাহ ব্যাজ পরিয়ে মুঈনের হাতে ফুলের তোড়া দিয়ে চলে যায়।
রেখে যায় মুঈনের কাছে একরাশ অস্বস্তি আর বিড়ম্বনা।
সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান শুরু হয়ে গিয়েছে। বাচ্চারা একের পর একে পারফরম্যান্স দেখিয়ে যাচ্ছে।
মুঈন অতিথি আসন থেকে উঠে এসে সবিনয়ে দর্শক আসনে, সামিনের পাশে এসে বসে,সামিনের সাথে কথা বলতে থাকে।
মঞ্চে তখন আবৃত্তিকার আবৃত্তি করছিলো “নিদ্রিতা।”
“কমলফুলবিমল শেজখানি,
নিলীন তাহে কোমল তনুলতা।
মুখের পানে চাহিনু অনিমেষে,
বাজিল বুকে সুখের মতো ব্যথা।”
মুঈন সামিনের সাথে কথা বলতে বলতে দু একবার মঞ্চের একপাশে দাঁড়িয়ে থাকা শাড়ি পরিহিত রমনীদের মাঝখানে জ্বলজ্বল করতে থাকা কমলা রঙে শ্যামবতীকে দেখে। একটা নিষিদ্ধ কাজ করছে মুঈন,তার এমন মনে হলো। দ্রুত চোখ নামিয়ে নিয়ে সামিন বাবার কথায় মনোযোগী হয়ে ওঠে।
পুরষ্কার বিতরণীর মুহূর্ত এসে গেলে, সানশাইনের সর্বকনিষ্ঠ ডেডিকেটেড সদস্য হিসেবে ঘোষণা করা হয় ইনশিরাহর নাম। অতিথিরা তখন মঞ্চে পুরষ্কার বিতরণের জন্য। লিয়াকত চৌধুরীর হাত থেকে পুরস্কার গ্রহণ করে ইনশিরাহ মুঈনের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। মুঈনের হাতে সার্টিফিকেট। ইনশিরাহর হাতে সার্টিফিকেটটা তুলে দিতে গিয়ে আরো একবার তার মুখপানে চায় মুঈন। অদ্ভুত দোলাচল মনে,মস্তিস্কে। আবারও সেই অস্থিরতা, আবারও সেই জোরালো আওয়াজ।
তাঁর হঠাৎ মনে হলো আবৃত্তিকার এখনও তাকে উদ্দেশ্য করে বলে চলেছে,“মুখের পানে চেয়ো না অনিমেষে, বাজিবে বুকে সুখের মতো ব্যথা।”
_____
পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ইনায়া ইশমামকে আজ ধরে নিয়ে এসেছে ওয়াফেল পয়েন্টে। ইন্ডিয়া থেকে ফেরার পর থেকে আগের ইশমাম মির্জার কিচ্ছুটি নেই যেন। শুকিয়ে গিয়েছে অনেক। স্ত্রীর চিকিৎসায় দৌড়াদৌড়ি করতে গিয়ে শরীর ভেঙে গিয়েছে। মেয়ের বায়না পূরণ করতে তাকে নিয়ে এখানে ওয়াফেল খেতে এসেছে।
পাপাকে নিয়ে ইনায়া একটা টেবিল বুক করে বসলো। তার দৃষ্টি আশেপাশে প্রিতমকে খুঁজছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী তারা এমন ভাব করবে যেন তাদের কাকতালীয় ভাবে দেখা হয়েছে, তারপর প্রিতমকে পরিচয় করিয়ে দেবে ইশমামের সাথে।
কিন্তু প্রিতম বড্ড দেরী করে ফেলছে আজ। ইনায়া বিরক্ত ভঙ্গিতে বারবার ফোনের দিকে তাকাচ্ছিলো।
রেস্টুরেন্টের দরজা ঠেলে প্রিতম, জামি আর সাফওয়ান ভেতরে পা রাখতেই থ'ম'কে দাঁড়িয়ে পরে। তাদের ঠিক সোজাসুজি বসে আছে ইনায়া আর ইশমাম।
প্রিতম,জামি, সাফওয়ান একপলক ইনায়ার দিকে তাকায়, একপলক ইশমামের দিকে তাকায়। প্রিতম আর সাফওয়ান তব্দা খেয়ে দুজন দুজনকে দেখে। অতঃপর দুজন দুজনের মুখের দিকে বোকার মতো কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে। জামি বলে,“ঐ তো তোর বৌ,পাশের টা মনে হচ্ছে তোর শশুর। চল যাই।”
জামি পা বাড়াতে গেলে হ্যাচকা টানে প্রিতম তাকে পেছনে নিয়ে আসে। এক মুহুর্তও সেখানে না দাঁড়িয়ে সাফওয়ান আর প্রিতম জামিকে টানতে টানতে রেস্টুরেন্ট থেকে বের করে।
বাইরে দাঁড়িয়ে তিন বন্ধু হাপাচ্ছে। জামি কিছুই বুঝতে পারেনি তখনও। সেদিন রাতে মাতাল হয়ে দ্য আওয়ার্সের সামনে জামি রহমান কি অকাজ করেছিলো তা জামি নেশা কাটতেই খেয়ে বসে আছে। ইশমামকে সে চিনতে পারেনি।
সাফওয়ান হাঁপাতে হাঁপাতে প্রিতমকে বলে,“তুই! তুই আর কি কি অঘটন ঘটানো বাকি রেখেছিস বলবি?”
জামি বললো,“চ্যাহ! এই কি হয়েছে বলবি তো।”
প্রিতমের চোয়াল শক্ত হলো,জামিকে বললো,“তোর কিচ্ছু মনে নেই?”
_না তো। কি?
প্রিতমের ইচ্ছে করলো ঘুষি মেরে জামির চেহারার নকশা বদলে দিতে। সে ধপ করে রেস্টুরেন্টের বাইরে সিড়িতে বসে পরলো। তার পাশে বসে পরলো সাফওয়ান।
ওদিকে পাপাকে লুকিয়ে একের পর এক মেসেজ দিয়ে চলেছে ইনায়া। প্রিতম শুকনো মুখে চেক করলো সেসব। একটা বড় দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো,“এটাই বাকি ছিলো। আমি শেষ রে সাফওয়ান! ইনু আর আমি এ যুগের রোমিও জুলিয়েট হবো। আমি শেষ!”
চলমান.....
[ এখানে প্রেরণা আর ইনায়া-ই গল্পের মেইন নায়িকা,বাকিরা সবাই সাইড ক্যারেক্টার এটা আপনাদের ভুল ধারণা। ইনশিরাহ,প্রনমি,শেহা সবার কাহিনী আসবে আস্তে ধীরে। তাদের কাহিনী হবে আরো বিস্তৃত। এটুকু সেই প্রথম থেকে আপনাদের বোঝাতে পারছি না এতো বলেও। ত্রিশ পর্ব ইনায়া-প্রিতমকে পেলে বাকি জুটিদেরও ত্রিশ পর্ব করে পাবেন। একজনের কাহিনী শেষে আরেকজনের কাহিনী, এটাই প্যাটার্ন আমার গল্পের। পাঁচ ভাইবোনের কাহিনী একসাথে শুরু করে জগাখিচুড়ী করবো?
বাই দ্য ওয়ে,কাইলগো পর্বে একটা ফাডাফাডি হইবো 😁 আপানারা রেডি? ]