#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_২৭
#ইসরাত_ইতি
🚫কঠোর ভাবে প্রাপ্তমনস্কদের জন্য।
🚫শিক্ষা ও সাহিত্যের সাথে আমার এই কল্পিত ঘটনাগুলোর লিখিত শব্দগুলোর কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
ভীষণ বিরক্ত ইনায়া লটকানো মুখে ওয়াফেল খেয়ে চলেছে। আড়চোখে পাপাকে একপলক দেখে পুনরায় ফোন হাতে তুলে নেয় সে। শেষের কিছু মেসেজ প্রিতম দেখেওনি এখন অবধি। চিন্তিত হয়ে পরলো ইনায়া,প্রিতমের এমন করার কারণ কি?
সাফওয়ান ঘা'ড় ঘুরিয়ে জামির দিকে তাকাল। জামি বুকে হাত চেপে লম্বা লম্বা শ্বাস নিচ্ছে। এতক্ষণে সে জেনে গিয়েছে তার “অকাজের” ব্যপারে। দুঃখী দুঃখী মুখ করে বন্ধু প্রিতমের দিকে তাকালো, কাঁচুমাচু হয়ে বললো,“দোস্ত! আমি তোর লাভস্টোরিতে ভিলেন হতে চাইনি বিশ্বাস কর!”
প্রিতম বিমূঢ় হয়ে বসে আছে। কোনও উপায়ন্তর খুঁজে না পেয়ে উঠে দাঁড়ায়, সাফওয়ান বললো,“কোথায় যাচ্ছিস?”
_বাড়িতে।
_বাড়িতে মানে? হবু শশুরের সাথে দেখা করবি না?
প্রিতম জামির কথায় রেগেমেগে আবারও ওর দিকে কঠিন দৃষ্টি দিয়ে তাকিয়ে রয়। জামি ফাঁকা ঢোক গিলে আওড়ায়,“প্লিজ এভাবে আমাকেই দোষী করিস না। তুই-ও তো সুন্দর আঙ্কেলের সাথে ঝগড়া করেছিলিস তাই না?”
প্রিতম আবারও বসে পরলো সিঁড়িতে। মানুষজন,যারা রেস্টুরেন্টে ঢুকছিলো তারা ওকে কৌতুহলী হয়ে দেখে চলেছে। প্রিতম শুকনো গলায় বললো,“এখন আমি কি করবো! একে তো ইরফান রয়েছেই । তার ওপর এই লোক, এই লোককে আমি কিভাবে মানাবো?”
জামি বসে পরলো প্রিতমের পাশে,“দোস্ত। আমি বলছি। কিচ্ছু হবে না। চল আগে পরিচিত হই।”
_পরিচিত? গেলেই শুরু করবে “ইউ ব্লাডি স্কা'উন্ড্রেল! ইউ ব্লাডি বাস্টার্ড!”,
আমি যাবো না!
মাথা নাড়ায় প্রিতম বলতে বলতে। করুণ কন্ঠস্বর প্রিতমের।
পুনর্বার উঠে দাঁড়ায় সে। সাফওয়ান বলে,“দোস্ত এখন একটাই উপায়। তুই ইনায়ার সাথে বিষয়টা নিয়ে আলাপ কর। ওর তো জানা দরকার।”
মুখটা আরও পাংশুবর্ণের হয়ে ওঠে প্রিতমের। অসহায়ের মত আশেপাশে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে। ইনায়াকে কিভাবে বলবে সে তার বাবাকে কি কি বলেছে। কিভাবে? অনেকটা ছোট হয়ে যাবে প্রিতম!
____
বাড়িতে ফিরে সোজা নিজের ঘরে ঢুকে স্লাইডিং ডোর টেনে লক করে বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে পরেছে ইনায়া। হাতের ব্যস্ত আঙুল তখন কিবোর্ডে প্রিতমের নাম্বারটা ডায়াল করছিলো। প্রিতমের প্রতি রাগে তার মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছে । পাপাকে নানা কথায় পাক্কা দুই ঘণ্টা বসিয়ে রেখেছিলো ওয়াফেল পয়েন্টে।
প্রিতমের ফোনের রিং বাজছে প্রিতম শুনেছে, তার ফোনটা রিসিভ করার কোন তাড়া নেই আজ। ফোন রিসিভ করে একগাদা মিথ্যা বলতে হবে ইনায়াকে,যা সে একদমই চাচ্ছে না এখন। কিন্তু ওদিকে ইনায়া থামার পাত্রী নয়। প্রিতম সম্পর্কের এ'কদিনে বুঝতে পেরেছে মেয়েটি অনেক জেদি,অন্তত প্রিতমের ব্যাপারে, ভীষণ অবুজপনা করে, বাচ্চামো করে। খুব সেনসিটিভ ধরণের অবুঝ প্রেমিকা প্রিতমের।
বরাবরের মতো জেদী মেয়েটার কাছে হার মেনে প্রিতম ফোনটা রিসিভ করলো। ওপাশ থেকে সুমিষ্ট কন্ঠে প্রেমিকার ঝারি,“প্রিতম তুমি কোথায়?”
_আমি বাড়িতে।
_বাড়িতে মানে? আজ কি কথা ছিলো তোমার মনে নেই? আমি পাপাকে নিয়ে পাক্কা দুই ঘণ্টা ওয়াফেল পয়েন্টে বসে থেকেছি আর তুমি বাড়িতে!
প্রিতম ফোঁস শব্দে নিঃশ্বাস ফেললো,মিথ্যা কথা বললো সে,“সরি ইনু হঠাৎ মাথাটা ধরেছে তাই আর বের হইনি!”
ইনায়া নরম হলো। ব্যস্ত হয়ে পরলো প্রিতমের মাথাব্যথা নিয়ে। প্রিতম ওষুধ খেয়েছে কি না,কপালে বাম লাগিয়েছে কিনা, আরও নানা ধরণের “প্রেমিকার যত্ন” যাকে বলে চলতি ভাষায়।
প্রিতম কিছুক্ষণ চুপ থেকে অস্ফুটে বললো,“ইনু!”
_হু,বলো।
_আচ্ছা তোমার পাপা টিভি দেখেন না? সোস্যাল মিডিয়া সাইটে অ্যাক্টিভ নন ইনু?
ইনায়া অবাক হলো এমন প্রশ্নে,“কেনো প্রিতম?”
প্রিতম এবার বলতে লাগলো,“না মানে নেপালে টেরোরিস্টের ঘটনায় টিভি দেখে থাকলে তো আমার ছবি তিনি দেখেছেন তাইনা?”
_আসলে পাপা তো মাম্মাকে নিয়েই দৌড়াদৌড়ি করেছে তাই হয়তো দেখেননি। কিন্তু প্রিতম,এখন এসব কথা কেনো বলছো?
আরো কিছুটা সময় নেয় প্রিতম, অতঃপর বলে,“ইনু। কাল বিকেলে আমার সাথে দ্য মুন টকসে দেখা করবে?”
ইনায়া পুলকিত হলো। নতুন নতুন প্রেমে পরা তরুণীরা প্রেমিকের সাথে দেখা করার জন্য এক পা বাড়িয়ে রাখে। ভেতরে ভীষণ খুশি ইনায়া, মুখে শুধু বললো,“আচ্ছা।”
_আচ্ছা তবে রাখছি ইনু? আমি একটু ঘুমাবো।
প্রিতমের মাথা ব্যথা দেখে ইনায়া আর জেদ করলো না,নয়তো প্রিতম এতো জলদি ফোন কে'টে দিতেই পারতো না। প্রেমিকা ভীষণ অবুঝ আর জেদী তার।
ফোন কেটে ফোনটাকে দূরে ছুড়ে মারে প্রিতম। বিছানায় বসে আছে সে। দু'হাতে চুল খামচে ধরে রেখেছে। আগামীকাল দেখা করে ইনায়াকে সবকিছু খুলে বলবেই সে, তারপর যা হবে দেখা যাবে।
প্রেরণা ভাইকে রাতের খাবার খেতে ডেকে যাচ্ছে সেই তখন থেকে। প্রিতম খেতেও যায়নি। চশমা খুলে বেডসাইডের টেবিলে রেখে বিছানায় টানটান হয়ে শুয়ে পরলো প্রিতম। মস্তিস্কে অস্থিরতা বিরাজমান। ঘুম এলো না দ্রুত।
সে রাতে প্রিতম ঘুমের মধ্যে তার জীবনের সবথেকে কুৎসিত স্বপ্নটি দেখলো।
স্বপ্নটি ছিলো,প্রিতমের লা'শ জরিয়ে ধরে হাহাকার করছে ইনায়া। বুক চাপড়ে কাঁদছে মেয়েটা। পাশে পিস্তল হাতে দাঁড়িয়ে ইশমাম মির্জা এবং তার ভাইপো ইরফান মির্জা গা দুলিয়ে হাসছে। দানবীয় হাসি। একটু পরপর দু'জনেই সমস্বরে চেঁ'চি'য়ে বলছে,“ব্লাডি স্কাউন্ড্রেল!”
____
ইরফান আজ ব্যক্তিগত কারণে অফিসে যায়নি। বাড়িতে নিজের ঘরে কিছুক্ষণ হিসেবপত্রে খামোখা চোখ বুলিয়ে উঠে দাঁড়ায়। শরীরটাকে নেড়েচেড়ে খানিক ফ্রি হ্যান্ড এক্সারসাইজ করে দোতলার লিভিং রুমে গিয়ে একটা কুশন আগলে এলোমেলো হয়ে বসে পরলো ডিভানে। বহুদিন ছন্নছাড়া হয়ে থাকেনি সে। কেমন “জেন্টেলম্যান জেন্টেলম্যান” হয়ে থেকে তার বিরক্তি ধরে গিয়েছে।
বাড়িতে সে আজ থেকে গিয়েছে সম্পূর্ণ গোপন একটি কাজে। ইদানিং কিছু উড়ো খবর তার কানে এসেছে,সে ব্যাপারেই তদন্ত করতে চাচ্ছে ইরফান। তবে তার তদন্তের প্রক্রিয়া ভিন্ন। কোনো জিজ্ঞাসাবাদ নয়,কোনো ধ'মকা ধ'মকি নয়, শুধু তার ঈগলের চোখ দিয়ে একপলক দেখলেই বুঝতে পারবে অপর প্রান্তের মানুষটার পেটের খবর। তারপর সোজা এনকাউন্টার।
বাঁকা হাসলো ইরফান। অতঃপর মাথায় হুডির ক্যাপ তুলে দিয়ে হাক ছাড়লো,“ইনু কফি লাগবে!”
ইনায়া প্রেমিককে দেখাবে বলে লাল টুকটুকে বৌ বৌ সাজছিলো। লাল রঙের সালোয়ার কামিজ পরে,ওড়নাটা সুন্দর করে মাথায় তুলেছিলো,নিজেকে বৌ লাগছে কিনা এটা দেখতে। পাতলা গোলাপ পাপড়ির মতো ঠোঁটে লিপগ্লস দিতে থাকা হাত দু'টো ভাইয়ের চিৎকারে স্থির হয়। তড়িঘড়ি করে টিস্যু পেপার দিয়ে নিজের সব সাজ মুছে লম্বা কদমে,ছুটতে ছুটতে ঘরের বাইরে গিয়ে বলে,“আনছি দাদান।”
ইদানিং ইনায়া ইরফানের সামনে পরতে চায়না মোটেই। বড়দাদানেরও সামনে পরতে চায়না সে। তার ভাই দু'টো প্রখর বুদ্ধিমান তা সে জানে। তাই কিছুটা এরিয়ে চলছে। চোখ দেখে পেটের কথা বলে দেয় এরা। অমন বোকা-সরল মেজো মায়ের পেটে এমন দু'টো ঈগলের বাচ্চা কি করে জন্ম নিলো সেটাই ভাবায় ইনায়াকে।
কফির মগ মেজো দাদানের সামনে সেন্টার টেবিলের ওপর রেখে তারাহুরো করে ঘুরে দাড়াতেই ইরফান হাতের ম্যাগাজিন রেখে গম্ভীর গলায় বললো,“শোন!”
দাঁড়িয়ে পরলো ইনু। কোনো অজানা আতঙ্কে বুক কাঁপছে তার। ঐ যে কথায় আছে না? চোরের মনে পুলিশ পুলিশ করা।
_হ্যা দাদান।
_বোস এখানে।
ইনায়া কলের পুতুলের মতো বসলো মাথা নিচু করে। তার দৃষ্টি হাতের নখে। ইরফান কয়েকপলক বোনের হাতের দিকে তাকিয়ে খপ করে ইনায়ার বা হাতটা ধরলো।
ইনায়া ঘাবড়েছে ভীষণ, আর ইরফান তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে ইনায়ার হাতের নেইলপেইন্ট দেখছিলো। ইনায়া একটা ঢোক গিললো আতঙ্কে। প্রত্যেকটা নখে সে অত্যন্ত সুনিপুণ ভাবে ইংরেজি অক্ষর “পি” পেইন্ট করেছে প্রিতমকে আজ দেখাবে বলে। এসব এখন মেজো দাদান দেখে নিলে তার কল্লা যাবে নির্ঘাত।
নিঃশ্বাস বন্ধ করে বসে আছে ইনু। ইরফান কিছুই বললো না “পি” এর ব্যাপারে। শুধু বললো,“এতো বড় নখ রাখবি না। এগুলো জঘন্য লাগে। এই নখ জিনিস টা অপ্রয়োজনীয়। নখ রাখা একটি অসভ্য চর্চা, বুনো আর জংলি লাগে। আয় নেলকাটার নিয়ে আয়। কেটে দিই।”
_কেটে নেবো দাদান আমি। আর কিছু বলবে?
আমতা আমতা করছে ইনায়া।
_তুই আমেরিকা পড়তে যেতে চাস না কেন? কত লাফাতি আগে সেখানে পড়তে যাওয়ার জন্য। সেকেন্ড সেমিস্টারের আগে তোর চান্স এলো,এখন গাইগুই করছিস কেন ছোটোবাবার সাথে?
শান্ত গলার স্বর ইরফানের।
ইনায়া এলোমেলো দৃষ্টিতে চারপাশে তাকায়। সে এখান থেকে পালাতে চায় দ্রুত। ইরফান শান্ত চোখে বোনকে কিছুসময় দেখে বলে,“যা ঘরে,রাতে এ নিয়ে কথা হবে।”
ইনায়া হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো যেনো। তৎক্ষণাৎ উঠে দাঁড়ায়,ঘুরে রুমের দিকে পা বাড়াতেই ইরফান আবৃত্তির মতো বলে ওঠে,“স্ফুলিঙ্গ তার পাখায় পেলো ক্ষণকালের ছন্দ, উড়ে গিয়েই ফুরিয়ে গেলো তাতেই তার আনন্দ!”
ইনায়া ঘুরে দাদানের দিকে তাকিয়ে দেখলো সে একমনে একটি ম্যাগাজিন পড়ছে। দাদানের আবৃত্তি করা কবিতার মানে বোঝার জন্য ব্রেইনকে চাপ না দিয়ে ইনায়া ঘরে ঢোকে আবারও আয়নার সামনে বসে, গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে সাজতে থাকে প্রিতমের জন্য।
ইরফান হাতের ম্যাগাজিন রেখে ফোন তুলে নেয়, একটা নাম্বার ডায়াল করে কানে ধরে,ফোনটা রিসিভ হতেই ওপাশের ব্যক্তিকে ইরফান বলে,“হয়তো আর কিছুক্ষণের মধ্যেই বেরোবে। তুই আমাকে আপডেট জানাস।”
____
সকাল ন'টায় এসে রেস্তোরাঁয় ঢুকেছে প্রেরণা। এখন বিকেল পাঁচটা বেজে গিয়েছে। এর মাঝে পাঁচ মিনিটের জন্য কাজের বিরতি নেয়নি সে। আজ মাসের এক তারিখ,স্টাফদের স্যালারি শিট করেছে সে লাঞ্চের পরে। বাড়িতে ফোন করে শুদ্ধর খবরটিও নিতে পারেনি।
সাব্বির প্রেরণার ডেস্কের সামনে এসে দাঁড়ায়। প্রেরণার দৃষ্টি তখন ল্যাপটপে নিবদ্ধ। চোখ না তুলেই বলে,“আচ্ছা শোনো, আমার চার বছরের চুক্তির মেয়াদ শেষ হতে চলেছে। দালান মালিকের সাথে এবার যে আবার বসতে হয় আমার। তুমি সাহল ভুঁইয়ার নাম্বারটা আমাকে টেক্সট করে দাও, আমি কথা বলবো তার সাথে দেখা করে। ”
_সাহল ভুঁইয়া? ম্যাম যতদূর জানি উনি ওনার ওয়াইফ নিয়ে ব্যাংকক গিয়েছেন।
_তাহলে ওনাদের অফিসের দায়িত্বে কে?
_ওনার বাবা-ই তো আছে। আপনি সাগর ভুঁইয়ার সাথে সরাসরি কথা বলুন ম্যাম। উনি আপনার সাথে কথা বলতে চাচ্ছেন,আমাকে ওনাদের অফিস ম্যানেজার ফোন করেছিলো।
প্রেরণা ভ্রু কুঁচকে ফেলে,“আমার সাথে?”
বেশি ভাবলো না প্রেরণা। বুঝতে পারলো কারণটা। দালানের ব্যপারেই কথা হবে হয়তো।
দুপুরে খেলোও না প্রেরণা। বাড়িতে ফোন করে শুদ্ধর সাথে মিনিট দুয়েক কথা বলে বেড়িয়ে পরলো সে। এই দালানটি নিয়ে তার দুশ্চিন্তার শেষ নেই। শহরের কেন্দ্রবিন্দুতে উপযুক্ত একটি স্থান,ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রমরমা। তিন চার পার্টি ইতোমধ্যে সাহল ভুঁইয়ার কাছে দালানটা বেশি অ্যাডভান্স দিয়ে ভাড়া নেওয়ার প্রস্তাব রেখেছে, উড়োখবর প্রেরণার কানে এসেছে। মালিকের ইচ্ছে হলে তাদের দালানটা দিয়ে দিলে প্রেরণা মাঝ নদীতে পরবে। রেস্তোরাঁ এখান থেকে সরিয়ে নেওয়া অসম্ভব,ব্যবসা লাটে উঠে যাবে তবে।
ভুঁইয়া ট্রেডার্সের মেইন অফিসে এর আগে কখনও প্রেরণা আসেনি। এর আগে সাহল ভুঁইয়ার সাথে যে ক'বার দেখা হয়েছে, তাদের ঝিলবাড়ি শাখা অফিসে দেখা হয়েছে।
প্রেরণাকে বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো না। অফিস সহকারী এসে প্রেরণাকে ভেতরে যেতে বললে প্রেরণা শাড়ির আঁচল ডান কাঁধে জরিয়ে,পার্স হাতে উঠে দাঁড়ায়।
ভেতরে সাগর ভুঁইয়া বসে আছে। প্রেরণা ঢুকে বিনয়ের সহিত সালাম দিলে তিনি ফিচেল হেসে সালামের জবাব দেন এবং প্রেরণাকে বসতে বলেন।
প্রেরণা বসতেই একজন মেয়ে দু কাপ কফি দিয়ে যায় কেবিনে। প্রেরণা এতো কফির ধার ধারলো না, তার বড্ড তাড়া, অকপটে বলতে লাগলো,“আমাকে ডেকেছিলেন? দালানের চুক্তির ব্যাপারে আমিও কথা বলতে চাই।”
সাগর ভুঁইয়া মৃদু হাসলেন। প্রেরণা বলতে লাগলো,“আমি সামনের মাসের এক তারিখের আগেই উকিলের থেকে কাগজ এনে বসবো আপনাদের সাথে, আরো চার বছরের চুক্তিতে যেতে যাচ্ছি। ভাড়া আপনাদের বাড়িয়ে দেবো নেক্সট মান্থ থেকে। আশা করছি আর কোনো বিষয়ে আপনাদের দোনামোনা নেই। অন্য পার্টি দেখার কোনো প্রয়োজন নেই।”
একনাগাড়ে কথাগুলো বলে থামলো প্রেরণা, সাগর ভুইয়া এতক্ষনে মুখ খুললেন,“সেসব ব্যাপারে কথা পরে বলা যাবে। আমি এখানে তোমাকে অন্য একটি বিশেষ ব্যাপারে কথা বলতে ডেকেছি।”
প্রেরণা কিছুটা অবাক। সাগর ভুঁইয়া হাতের ইশারায় প্রেরণাকে কফি নিতে বললেও সে নেয়না। তাকিয়ে থাকে শুধু। সাগর ভুঁইয়া কোনো রকমের সংকোচ ছাড়াই প্রেরণাকে বলে,“আমি তোমাকে বিয়ে করতে চাই প্রেরণা।”
হতভম্ব বাকরুদ্ধ প্রেরণা মিনিট খানেক বিমূঢ় হয়ে তাকিয়ে রইলো তার সামনে বসে থাকা ষাট ছুঁই ছুঁই বৃদ্ধের মুখের দিকে। ভেতরে ভেতরে ভীষণ চ'ম'কে গিয়েছে সে তবে ঠান্ডা গলায় বলে,“আপনি কি আমার সাথে মজা করছেন?”
সাগর ভুঁইয়া মাথা নাড়ে,বলে,“দীর্ঘবছর একা থাকার পরে মনে হলো একজন সঙ্গী প্রয়োজন আমার। তুমিও নিঃসঙ্গ। এতো কম বয়সে জীবনের ঘাত প্রতিঘাত পেরিয়ে এখান অবধি এসেছো। তোমাকে আমার ভীষণ পছন্দ হয়েছে প্রেরণা।”
ক্রোধ সংবরণের সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে প্রেরণা। হাতের পার্সটাকে খামচে ধরে,নিচু স্বরে বলে,“আপনি আমার বাবার বয়সী আঙ্কেল! আপনার মুখে এমন কথা..”
_রানী বানিয়ে রাখবো তোমায়।
পাল্টা জবাব দিয়ে থামলো কয়েক মুহূর্ত। পর পর বলে উঠলো,“এতো খাটনি,এতো সংগ্রামের কোনো দরকার পরবে না। আর ঐ রেস্তোরাঁ, ঐ দালানটাই তোমার নামে লিখে দেবো।”
এখন অবধি কথাগুলো সাগর ভুঁইয়া বরফ ঠাণ্ডা গলাতেই বলে এসেছেন। প্রেরণা রেগেমেগে উঠে দাঁড়ায়। সাগর ভুঁইয়া বলে ওঠে,“ভেবে চিন্তে জানিও। কোনো তাড়াহুড়োর দরকার নেই।”
প্রেরণা বুঝতে পারলো না তার কি করা উচিত,কি বলা উচিত। তার শুধু পালাতে ইচ্ছে করছে এখান থেকে। দৌড়ে পালাতে।
ঠিক ছুটেই সে সাগর ভুঁইয়ার অফিস থেকে বেরিয়েছে। সাগর ভুঁইয়া নিজের চেয়ারে বসে বসে হাসছিলেন। মেয়েটিকে তার ভীষণ পছন্দ হয়েছে। বিধবা অসহায় একটি মেয়ে, একটি দুধের শিশু নিয়ে সংগ্রাম করে। নেক নিয়তে পাশে থাকতে চেয়েছে সে, দুজন দুজনের নিঃসঙ্গতা চমৎকার ভাবে দূর করতে পারবে,তার এটিই মনে হয়েছে। আর তাছাড়া। বিধবা বিয়ে করা অতি সওয়াবের কাজ।
আজ স্কুটি নিয়ে আসেনি প্রেরণা। ক্যাবের সিটে গা এলিয়ে দিয়ে বসে আছে উদ্ভ্রান্তের মতো। এসব প্রেরণার সয়ে গিয়েছে বহু আগেই। এসব নতুন নয় তার কাছে। শাওকাতের মৃত্যুর পর থেকে এই ভদ্র সমাজের ভদ্রলোকদের থেকে পরকীয়ার প্রস্তাব থেকে শুরু করে বিবাহের প্রস্তাব পেতে পেতে ক্লান্ত প্রেরণা। সবাই শুধু প্রেরণাকে সাহায্য করতে চায়। আর ইশারায় বুঝিয়ে দেয় তারাও কিছু ফায়দা চায় প্রেরণার থেকে।
চোখ বেয়ে হঠাৎ দু-ফোটা তরল গড়িয়ে পরে তার। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে পাশে ফিরে তাকাতেই দেখলো শাওকাত ওয়াসীতকে। তাকিয়ে আছে প্রেরণার দিকে,মুখ হাসি হাসি। প্রেরণার রাগ উঠে গেলো হঠাৎ স্বার্থপর মানুষটার উপরে। চোখ মুছে মুখ ফিরিয়ে নিলো সে।
_____
লাল,সাদা,নীল ফুলগুলোকে নাচিয়ে যাচ্ছে শেষ বিকেলের উত্তাল বাতাস। পার্কের বেঞ্চিতে উদ্ভ্রান্তের মতো বসে আছে এক অতি সুদর্শন তরুণ। তাকিয়ে আছে ফুলের গাছগুলোর দিকে, চোখে মোটা কালো ফ্রেমের চশমা। প্রেয়সীর অপেক্ষায় সে।
তাকে বেশিক্ষণ অপেক্ষা না করিয়ে ইনায়া এলো। সুন্দর একটি সালোয়ার কামিজ পরনে। চুলগুলো খুলে রেখেছে। সেজেছে অল্পস্বল্প। দ্য মুন টকসের গেট পেরিয়ে চঞ্চল পায়ে এগিয়ে আসছে প্রিতমের স্থির করা স্থানে। বেঞ্চিতে ওদিকে ফিরে বসে আছে তার মানুষ টা, পা টিপে টিপে এগিয়ে যাচ্ছে সে। শুকনো পাতার মড়মড় শব্দে প্রিতম চকিতে ফিরে তাকাতেই দেখে ইনায়াকে। ইনায়া হেসে ফেলে, গিয়ে বসলো প্রিতমের পাশে। রোজকার মতো প্রিতমের চোখ থেকে চশমা টা খুলে নিয়ে নিজে চোখে লাগিয়ে বলে,“এবার বলো। কেন এতো জরুরী তলব!”
শার্টের হাতা গুটিয়ে নিতে নিতে সিড়ি থেকে এক প্রকার লাফিয়ে লাফিয়ে নামছে ইরফান। ওর চেহারার দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে বাড়ির গিন্নিরা। মুখ থমথমে ইরফানের। কিছু কি ঘটেছে? কি ঘটেছে?
ইরফানের পিছু পিছু ছুটে নামছে ইনশিরাহ। চুলগুলোও ঠিকঠাক মতো ক্লাচারে আটকে নিতে পারলো না সে। ইরফান কড়া গলায় আদেশ করেছে তার সাথে যেতে হবে। ভীষণ ক্রোধান্বিত ইরফান, এতটা শীতল, ভয়ংকর ভাব ওর মাঝে কখনও দেখেনি ইনশিরাহ। বিনা বাক্য ব্যয়ে ইরফানের সাথে যাচ্ছে।
বাড়ির মহিলাদের সব প্রশ্ন উপেক্ষা করে ইরফান বেড়িয়ে যায়। বাইকের পিছনে ইনশিরাহ বসেছে। ইরফানের ফোনটা অনবরত বেজে চলেছে । সে রিসিভ করছে না। বাইকের স্পিড মাত্রাধিক। ইনশিরাহ চেঁ'চি'য়ে স্পিড কমাতে বলছে বারবার, ইরফান কমায় না। কি হয়েছে সেটাও বলে না ইরফান। কিছুদূর গিয়ে বাইকটা হঠাৎ থামিয়ে বাজতে থাকা ফোনটা রিসিভ করে কানে ধরে কাউকে বলে,“দ্য মুন টকসে আয়!”
প্রিতম আমতা আমতা করছিলো। অনেকটা সংকোচ পাশে সরিয়ে সেদিন রাতে দ্য আওয়ার্সের ঘটনা ইনায়াকে বলার পর থেকে ইনায়া শুকনো মুখে চুপচাপ বসে আছে। কোনো কথা বলছে না। প্রিতম একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে,“কাম অন ইনু। কিছু একটা বলো!”
ইনায়া তাকাল ওর দিকে। কি বলবে সে? ইনায়া পাপাকে তো চেনে। এতটা সহজ হবে না সব সামলে নেওয়া। হাত পা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে তার চিন্তা করেই।
প্রিতম আর কোন কথা বাড়ায় না, দু'জনে চুপচাপ বসে থাকে মিনিট পাঁচেক। ঠিক তখনই দ্য মুন টকসের প্রধান ফটক দিয়ে ঢোকে তিনটা বাইক। প্রথম বাইকটাকতে ছিলো ইরফান এবং ইনশিরাহ, বাকি দু'টোতে ইরফানের দুজন বন্ধু।
ইনু প্রিতমের প্রেম কাহিনীর প্রথম ট্রাজেডি তাদের থেকে কয়েকশ'মিটার দূরে এসে বাইক থামিয়েছে। ওরা দুজন তখনও টের পায়নি। যখন টের পেয়েছে তখন বড্ড দেরী হয়ে গিয়েছে।
তড়াক করে লাফিয়ে উঠলো ইনায়া। প্রিতম উঠে দাঁড়াল আস্তে ধীরে। তার দৃষ্টি ইরফানের চোখের দিকে। মুহুর্তেই বুঝে নিলো তার সাথে কি হতে চলেছে এখন।
নড়লো না একচুলও প্রিতম। আগুনে ইচ্ছাকৃত ঝাঁপ দিলে পানির কাছে ছুটতে নেই পালিয়ে।
ইরফান দ্রুততার সাথে হেটে এসে দাঁড়াল প্রিতমের মুখোমুখি। ইনশিরাহ অবাক চোখে ইনুকে দেখছিলো, ঘটনা কি বুঝতে অসুবিধা হয়নি তার।
ঝড়ের আগে শান্ত, নিস্তব্ধ পরিবেশ। ইনু বোকার মতো সাহস দেখিয়ে তার মেজো দাদানকে বললো,“দাদান ও ....”
বোনের দিকে শান্ত দৃষ্টিতে তাকায় ইরফান। ইনায়া তাতেই দমে যায়। গলা থেকে কিছুই বের হয় না।
ইরফান আজ প্রথম বারের মতো ইনুর গাঁয়ে হাত তুললো। ঠিক হাত তোলা নয়। হ্যাচকা টানে ইনায়াকে প্রিতমের পাশ থেকে সরিয়ে নিয়ে একপ্রকার ধাক্কা মেরে ফেললো ইনশিরাহর গাঁয়ে।
কাঁপছে ইনু। ইনশিরাহ বোনকে আগলে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ইরফান ঘুরে প্রিতমের দিকে তাকায়। প্রিতম একটা দম ফেলে মুখ খোলে এবার,তার বলা প্রথম কথাটি ছিলো,“ট্রাস্ট মি! আমি তোর বোনকে ভালো রাখবো ইরফান!”
কথাটা শুনতেই ইরফান হাসলো বাঁকা করে, পর পর ক্রোধে ফেটে পরে সবেগে একটা ঘুষি মে'রে দিলো প্রিতমের নাক বরাবর। ছিটকে পরে ভে'ঙে যায় প্রিতমের চশমা।
চ'ম'কে ওঠে সবাই, আতঙ্কে মিইয়ে যায় ইনায়া। ভীষণ কান্না পাচ্ছে তার। শুধু বলতে চাইলো,“দাদান ওকে মেরো না..”
পারলো না বলতে,মুখ থেকে শব্দ বের করার আগেই ইরফান সপাটে ওর কানের নিচে একটা চ'ড় মারে।
ইনায়া গিয়ে হুমরি খেয়ে পরলো পাথরের বেঞ্চিতে। অত ভারী শরীরটা এভাবে পরে যাওয়ায় ব্যথা পেলো খুব। ইনায়া দেখতে পেলো তার সামনে সবকিছু অন্ধকার হয়ে যাচ্ছে,মাথা ঝিমঝিম করছে,কান জ্বলছে।
ইনশিরাহ হতবাক হয়ে ছুটে গেলো,বোনকে উঠিয়ে ভয়ার্ত চোখে ইরফানের দিকে তাকায়। ভয়ংকর রূপ ধারণ করেছে ইরফান আজ। ইনশিরাহর মনে হচ্ছে চ'ড়টা তার গালেই পরেছে।
প্রিতম দু'পা এগিয়ে গিয়ে ইনায়াকে নরম গলায় শুধায়,“ঠিক আছো ইনু?”
দ্বিতীয় দফায় প্রিতমকে ঘুষি মারে ইরফান। এবারের ঘুষিতে নাক বেয়ে রক্ত ঝরছে প্রিতমের। নিজেকে সামলে নেওয়ার আগে আরেকটা ঘুষি পরলো, তারপর আরেকটা, তারপর আরেকটা।
প্রিতম শান্ত হয়ে আছে, তার কেনো জানি ইরফানকে পাল্টা আঘাত করতে ইচ্ছে করছে না, এই প্রথম বার প্রিতম ইরফানের মা'র হজম করে নিলো, ইরফান ইনুর ভাই তাই। শুধু বলতে চাইলো,“চল আমরা ঠান্ডা মাথায় বসে কথা বলি।”
প্রিতমের কলার চেপে ধরলো ইরফান। খেকিয়ে উঠলো মুহুর্তেই,“আমার বোনকে ডেট করতে তোর সাহস কিভাবে হয় স্কাউন্ড্রেল!”
ইনায়া কাঁদছিল। তার শরীরটা কাঁপছে। প্রিতম আবারও বললো,“তোর বোন আমার কাছে ভালো থাকবে।”
ইরফান প্রিতমের কলার ছেড়ে দেয়, পকেট থেকে ফোন বের করে প্রথমেই ইশমামকে ফোন লাগায়,বলে,“এক্ষুনি দ্য মুন টকসে এসো ছোটো বাবা। এক্ষুনি!”
ফোন কেটে ইরফান দ্রুত কল দেয় ইহানকে। ফোনটা রিসিভ হতেই ইরফান দাঁতে দাঁত চেপে ভাইকে বলে,“দ্য মুন টকসে এসো দাদান। তোমার চোখে আদর্শ ছেলে প্রিতমকে এসে আমার থেকে বাঁচাও পারলে।”
চলমান.......
[ ২৮০০+ শব্দ! আর পারলাম না। বাকিটা জানবেন আগামী পর্বে ]