ফন্ট সাইজ:
থিম:
বধূ কোন আলো লাগল চোখে ২

পর্ব 28

লেখক: ইসরাত ইতি

#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_২৮ [ ১ম অংশ ]
#ইসরাত_ইতি

🚫কঠোর ভাবে প্রাপ্তমনস্কদের জন্য।

🚫শিক্ষা ও সাহিত্যের সাথে আমার এই কল্পিত ঘটনাগুলোর লিখিত শব্দগুলোর কোনো সম্পৃক্ততা নেই।

[ ২য় ও ৩য় অংশের লিংক কমেন্টে পাবেন ]

ঘরে ঢুকে প্রেরণা দরজা বন্ধ করে বিছানার ওপর পরে রইলো চুপচাপ। শুদ্ধ দেখেছে তার মাম্মা এসেছে, সে তখন গেমস খেলছিলো কম্পিউটারে। গুটি গুটি পায়ে তার প্লে রুম থেকে বেরিয়ে এসে প্রেরণার দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে ডাকে,“মাম্মা! দরজা খোলো মাম্মা!”

প্রেরণা কোনো জবাব দেয়না, শুদ্ধ অনবরত ডেকে চলেছে,“মাম্মা!”

খানিক বাদে প্রেরণা উঠে বসে দু'চোখ মুছে নিলো, দ্রুত উঠে দাঁড়িয়ে একটা মাথা ব্যথার ওষুধ খেয়ে নিয়ে দরজা খুলে ছেলেকে কোলে তুলে নিলো।

শুদ্ধ মায়ের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। সে বুঝতে পারছে না তার মায়ের কি হয়েছে। শুধু বুঝতে পেরেছে মাম্মার হয়তো মন খারাপ। কিন্তু সে তো কোন দুষ্টুমি করেনি! হোমওয়ার্কও করে নিয়েছে চুপচাপ। তবে মাম্মার মন খারাপ কেন?

প্রেরণা ছেলের দু'গালে চু'মু খেয়ে ছেলের মুখের দিকে চেয়ে রয়। দিনকে দিন ছেলেটা চেহারা পাচ্ছে একেবারে বাপের মতোন। মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টায় ব্যর্থ হলো প্রেরণা,নরম গলায় বললো,“মাম্মা একটু গোসল করে নিক? তারপর মাম্মা আইসক্রিম বানাবে শুদ্ধর জন্য!”

শুদ্ধকে বাইরে পাঠিয়ে প্রেরণা গোসলের জন্য শাড়ি,টাওয়াল, বাথরোব গুছিয়ে নিতেই তার ফোনের রিংটোন বেজে ওঠে। ফোনটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে জামির কন্ঠস্বর শুনতে পাওয়া যায়।

বিকেলে প্রেসক্লাবের সামনে সমাবেশের মাঝখানে ইহান ইরফানের ফোনকল পেয়েছে। সে সমাবেশ ফেলে চলে আসতে পারেনি তৎক্ষণাৎ, এর মাঝে দ্য মুন টকসে এসে পৌঁছেছে ইশমাম মির্জা, সে তার প্রফেসর বন্ধুর বাড়িতে বৈকালিক চা'য়ের দাওয়াত গ্রহণ করতে গিয়েছিলো।

মুন টকসের প্রধান ফটকের সামনে ইশমাম মির্জার গাড়ি এসে থামে। ইরফানের ফোন পাওয়ার পনেরো মিনিটের মাথায় সে এসে উপস্থিত। দ্রুত পায়ে বিশালাকার এড়িয়ায় প্রবেশ করতেই মুন টকসের সর্বদক্ষিণের বাগানের কাছে জটলা দেখে সে এগিয়ে যায়। যত কাছে এগোচ্ছিল ওদের,তত ইশমামের কদম ধীর হচ্ছিলো। ভ্রু যুগল কুঁচকে উঠেছে তার। বিমূঢ় হয়ে সে সবার মুখের দিকে তাকায়। ইনশিরাহ,ইনায়া, ইরফান, ইরফানের কিছু বন্ধুকে দেখে দৃষ্টি গিয়ে প্রিতমের দিকে স্থির হতেই তার মুখটা মলিন হলো।
জামি আর সাফওয়ান ততক্ষণে এসেছে, প্রিতমের পাশে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে তারা।
ইশমাম সে-ই উচ্ছন্নে যাওয়া ছেলে তিনটিকে দেখতে পেয়ে চোয়াল শক্ত করে ফেলে, বাকিসব দুশ্চিন্তা ভুলে ক্ষুব্ধ কন্ঠে বলে ওঠে,“তোমরা এখানে?”

ইরফান প্রিতমের দিকে আঙুল উঁচিয়ে বলে,“ও একটা লাফাঙ্গা ছোটো বাবা, তোমার জামাই হতে চায়। ইনুর ব্রেইন ওয়াশ করছে।”

ইনু চোখের পানি মুছে সামনে এগিয়ে আসে তৎক্ষণাৎ,বুক ভরে নিঃশ্বাস নিয়ে সব লাজ-ভয় ভুলে বলে,“কেউ আমার ব্রেইন ওয়াশ করেনি দাদান! কেউ না! ওটা আমি ছিলাম। আমি ওর পিছে পরে ছিলাম!”

বিস্ময়ে বাকহারা ইশমাম মির্জা ফ্যালফ্যাল করে মেয়ের মুখের দিকে চেয়ে রয় কিছু পল, অতঃপর ঘুরে প্রিতমের মুখের দিকে তাকাতেই প্রিতম শান্ত ভঙ্গিতে, নম্রস্বরে বলে,“আংকেল! আংকেল সেদিন যা হয়েছিলো সেসব মিসআন্ডারস্ট্যান্ডিং ট্রাস্ট মি আমি অমন ছেলে নই! আই ক্যান এক্সপ্লেইন!”

জামি আর সাফওয়ান দু'জনেই অনুরোধের সুরে বলে,“আংকেল একটা ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে। প্লিজ আগে ঠান্ডা মাথায় শুনুন আমাদের কথা।”

কে শোনে কার কথা, ইশমামের রাগে গাঁ কাঁপছে, চ'ড় টা বসাতেই যাচ্ছিলো প্রিতমের গালে তক্ষুনি ইনায়া ছুটে এসে পাপাকে ফিরিয়ে নিয়ে কেঁদে বলে,“ও পাপা। ও প্রিতম। ওই যে জামি! নেপাল? শোনোনি? আমাকে বাঁচিয়েছে। তুমি এমন করো না পাপা!”

ইনশিরাহ পাংশুবর্ণের মুখটি নিয়ে দেখছিলো সবকিছু। ইনায়ার কান্না তার ভালো লাগছে না মোটেই, অস্ফুটে ইশমামকে খুব সাহস করে বললো,“ছোটো বাবা। উনি তো প্রিতম।”

ইশমাম দ্বিতীয় বারের মতো হতভম্ব হয়ে নিষ্পলক চেয়ে থাকে প্রিতমের দিকে। ইরফান তখন দুই বোনের মুখের দিকে চোখ লাল করে তাকিয়েছে। ইনশিরাহ সেসব পাত্তা না দিয়ে সাহস করে বললো,“এখানে সিনক্রিয়েট না করি! আমরা ঠান্ডা মাথায় আলোচনা করি। চল ইরফান।”

ইরফান ঘুরে প্রিতমের দিকে তাকায়, দাঁতে দাঁত চেপে পুনরায় বলে,“তোর অওকাদ কি আমার বোনকে পেতে চাস?”

ইনায়া তখনই ইশমামের বাহু ধরে ঝাকুনি দিয়ে বলতে থাকলো,“পাপা ও খুব ভালো ছেলে। নেপালের কথা ভুলে গেলে? এসব প্লিজ বন্ধ করো ওর সাথে। প্লিজ!”

ইশমাম হতবাক হয়ে মেয়েকে দেখছে, সেদিনের সে-ই ছোটো ইনু আজ একটা ছেলেকে ডিফেন্ড করছে তার সামনে ! মেয়ের চোখে পানি ঐ উটকো ছেলেটার জন্য। ইশমাম একটা লম্বা শ্বাস ফেলে প্রিতমের দিকে তাকায়, তারপর অত্যন্ত শান্ত স্বরে দু'টো বাক্য আওড়ায়,“তুমি আমার মেয়েকে আমার কাছে ফিরিয়ে দিয়েছো, সেজন্য আমি চির কৃতজ্ঞ থাকলাম তোমার প্রতি। কিন্তু আমি আমার মেয়ে তোমাকে দেবো না।”
শেষের কথাটায় দৃঢ়তা ছিল ইশমামের। প্রিতম শুধু মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে। ইনায়া পাপাকে পুনরায় ঝাকুনি দিয়ে বলে,“পাপা ও খুব ভালো.....”

ততক্ষণে ইরফান ইনায়াকে আরেকটা চ'ড় মারতে গেলে এবার প্রিতম ফেরায়। এবার প্রিতম খানিকটা ক্ষুব্ধ হয়ে বলে,“ভাই তুই ওর? একজন ভাইয়ের লিমিট ক্রস করছিস তুই ইরফান। এতো বড় মেয়ের গাঁয়ে হাত তুলছিস বারবার। অসভ্যের মতো।”

ইরফান ঘুরে আরেকটা ঘু'ষি মেরে দেয় প্রিতমকে। ইশমাম মির্জা এসবের কিছুই দেখছিলো না,সে জমে গিয়েছে পুরো মেয়ের চোখের পানি আর ছটফটানি দেখে। এতোটা গভীরে চলে গিয়েছে মেয়ে! এই মেয়ের কি করবে সে এখন?

প্রিতম ইরফানকে এবারও পাল্টা আঘাত করে না,টিস্যু পেপার বের করে নাকের রক্ত মুছে নেয়। ইনশিরাহ এক হাতে ইরফানকে টেনে ধরে চেঁ'চি'য়ে ওঠে,“বড় দাদানকে আসতে দে না! থাম তোর দোহাই লাগে!”

দ্য মুন টকসের প্রধান ফটকের কাছে আরও একটি গাড়ি এসে থামে। গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়ালো ইহান। ততক্ষণে বিপরীত পার্শ্ব থেকে তরিৎবেগে ছুটে আসা স্কুটি এসে তার গাড়ির পাশেই থামে। গোসল না করে,না খেয়েই ছুটেছে প্রেরণা আহসান। মাথা থেকে হেলমেট খুলে স্কুটির সাথে ঝুলিয়ে রেখে ঘুরে দাঁড়াতেই থ'ম'কে দাঁড়িয়ে যায়।

কিছু পল দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে থেকে গম্ভীরতার সাথেই বললো,“আপনি!”

বারবার,প্রতিবার, এভাবে, এখানে-ওখানে, যেখানে-সেখানে, ঝামেলায় কিংবা দুর্ঘটনায় দুজনের আগন্তুক দুজন। কে জানে ডেসটিনি কতটুকু ভেবে রেখেছে এদের কথা, কতটুকু পিছু নিয়েছে এদের!

প্রেরণা আর উত্তরের অপেক্ষা না করে দ্য মুন টকসে ঢুকলো, ইহানও তার পিছু পিছু। দেখলো তাদের গন্তব্য একই দিকে। অবাক হলো না ইহান, প্রিতম যেখানে সেখানেই যে তার সমুদ্র নীলা ঝামেলাময়ী থাকবে তা তো নিশ্চিত।

প্রেরণা ছুটে গিয়ে ভাইকে ধরলো। উদ্ভ্রান্তের মতো ভাইয়ের আহত মুখবিবর ছুঁয়ে দিচ্ছিলো। বুকটা হুহু করে ওঠে প্রেরণার। প্রিতম বোনকে শান্ত হতে বললেও সে শান্ত হয়না।

ইহান গিয়ে দাঁড়াতেই ইরফান উঁচু গলায় বলে ওঠে,“এই যে দাদান। এসো! তোমার চোখে আদর্শ ছেলে প্রিতম, যাকে তুমি দলীয় অফিসে ডেকে ডেকে চায়ের আড্ডা দাও, এবার তোমার বোনকে ধরে টান দিয়েছে। এখন কি করবে তুমি?”

অবাক ইহান,অবাক প্রেরণা। প্রিতম স্থির দাঁড়িয়ে। ইনায়া কেঁ'দে চলেছে।
ইহান বোন আর চাচাকে দেখে নিয়ে ঘুরে ইরফানের দিকে তাকায়, ইরফান পুনরায় বলে,“কি? আদর্শ ছেলেকে ভগ্নিপতি বানাতে ইচ্ছে হচ্ছে তোমার এখন? ট্রাস্ট মি দাদান। তুমি এমনটা ভেবে থাকলে এখানে ওর লা'শ পরবে।”

প্রেরণা যেন আঁতকে উঠলো উগ্র ছেলেটির এমন কথাতে। অসহায়ের মতো ভাইয়ের মুখের দিকে তাকালো, তার চোখদুটো যেন ভাইকে বলছিলো,“এত নির্বোধ মানুষ হয়? কেনো করলি বোকামি?”

ইহান স্থির দাঁড়িয়ে আছে। প্রিতম একটা লম্বা শ্বাস ফেলে বলে ওঠে,“ভাইয়া আমি শুধু এটুকুই বলতে পারি ইনু আমার কাছে ভালো থাকবে!”

এবার আরও একবার প্রিতমের কলার চেপে ধরে ইরফান,“ইনু ভালো থাকবে? আমার সরল বোনটার ব্রেইনটা তো পুরো দখলে নিয়েছিস চালবাজ রোডসাইড রাস্কেল! এই তোর অওকাদ কি আমার বোনকে পাওয়ার? বাস্টার্ড!”

পরিবেশ টা দমবন্ধকর হয়ে উঠেছে ধীরে ধীরে। শান্ত প্রেরণা হঠাৎ বাঘিনীর মতো নিজের ভাইকে ইরফানের হাত থেকে ছাড়িয়ে নিয়ে অগ্নিদৃষ্টি দিয়ে ইরফানের দিকে তাকায়, সিংহীর মতো গর্জন দেয়,“আর একবার এমন কথা বললে জুতার বাড়ি পরবে তোমার মুখে বড়লোকের অসভ্য বর্বর ছেলে। বাস্টার্ড কাকে বলছো? কতবড় দুঃসাহস তোমার আমার ভাইকে জারজ বলছো। একেবারে জুতা মেরে মুখ ভে'ঙে দেবো তোমার।”

ইহান অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে প্রেরণার দিকে। ইরফানও প্রেরণার এমন রুপে হালকা চ'মকালেও কঠিন চোখে তাকিয়ে থাকে, হাত মুষ্টিবদ্ধ তার, মেয়ে বলে কিছু বলছে না। তবে যা বলার প্রিতমকে বলবে আজ।

ইশমাম মেয়ের এমনতর কান্না দেখে একটা বেঞ্চিতে ধপ করে বসে পরে। আর কোন কিছু দেখতে,শুনতে ইচ্ছে করছে না তার। সে ভীষণ আহত হয়েছে মেয়ের কান্ডে।

প্রেরণা ঘুরে ইহানের দিকে তাকায়,কন্ঠে দৃঢ়তা নিয়েই বলে,“আমার ভাই আপনার বোনের ব্রেইন ওয়াশ করেছে কি না সেটা আপনার ননীর পুতুল বোনকে জিজ্ঞেস করলেই বোঝা যাবে।”

রাগে কাঁপছে প্রেরণার গা,হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে ইনায়াকে বলে,“ও তোমাকে কোনোভাবে জোর করে সম্পর্কে এনেছে?”

ইনায়া নিশ্চুপ কাঁদতে কাঁদতে দুপাশে মাথা নাড়ায়। প্রেরণা বলতে থাকে,“তোমার বয়স বিশ রাইট?”

ইনায়া উপর নিচে মাথা ঝাকাতেই প্রেরণা ঘুরে তাকায় ইহানের দিকে,কাঠ কাঠ বলে,“একটা বিশ বছরের এডাল্ট মেয়েকে ফুঁসলিয়ে নিয়েছে আমার ভাই? তার ব্রেইন ওয়াশ করেছে? সে কিছুই বোঝেনা ভালোমন্দ?”

ইহান একপলক ইনুকে দেখে,এক পলক প্রিতমকে। ছোটোবাবাকেও দেখলো সে।
এদিকে ইরফান ঐ ভদ্রমহিলার সামনে ভাইয়ের নির্লিপ্ততা দেখে ক্ষেপে যায়, চেঁচিয়ে ওঠে,“তুমি কোথায় আটকেছো দাদান? বোনকে এই রোডসাইড লাফাঙ্গার কাছে বিয়ে দেবে?”

প্রেরণা আবারও ইরফানের দিকে চোখ লাল করে তাকায়, বজ্রকণ্ঠে বলে,“আমার বয়েই গিয়েছে তোমার মতো অসভ্য ছেলের ফ্যামিলির মেয়েকে আমার ভাইয়ের বৌ বানিয়ে আমার ভাইকে বিপদে ফেলতে। তোমরা তোমাদের ননীর পুতুল বোনকে সাজিয়ে গুছিয়ে শোকেসে তুলে রাখো গিয়ে,আমার ভাই ইন ফিউচার কখনো তোমার বোনের ত্রি সীমানায় যাবে না।”

ইনশিরাহ মলিন মুখে ছোটোবাবার পাশে বসে সব দেখছিলো। মনে মনে প্রার্থনা করছিলো এই পরিস্থিতি যেন অন্তত বড় দাদান সামলে নেয়।

প্রিতমের হাত ধরে টানছে প্রেরণা, প্রিতম নড়ছে না। সে ইনায়ার চোখের দিকে তাকিয়ে আছে। ইনায়া শুধু কেঁদে যাচ্ছিলো। প্রিতম এবার অনেকটা দম নিয়ে ইহানের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়, এ কমাসে ইহানের প্রতি ভীষণ শ্রদ্ধা এসেছে তার,তাই সে সাহস পেয়েছে, তার দৃঢ় বিশ্বাস ইহান তাকে মানবেই! বলে ওঠে,“ভাইয়া। আপনি আমাকে দেখছেন এতদিন ধরে। আপনি ঠান্ডা মাথায় ভেবে বলুন,আমার কি কোনো যোগ্যতা নেই ইনুকে পাওয়ার? ওকে বিয়ে করার?”

ইহান একপলক করে ইনায়া, ইশমাম, ইরফান সবার মুখের দিকে তাকায়, কিছুক্ষণ চুপ থেকে প্রিতমের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত ঠান্ডা স্বরে বলে,“আই নো তুমি একটা ভালো ছেলে প্রিতম, তবে বিয়ে- সম্পর্ক এসব কোন ছেলেখেলা নয়। আমাকে তোমাদের বিষয়টি নিয়ে অনেক ভাবতে হবে, আই হোওপ তুমি আর কোনো বাড়াবাড়ি করবে না।”

_ভাবতে হবে?
উচু গলায় বলে ওঠে প্রেরণা, ইহান প্রেরণার মুখের দিকে তাকায়।

প্রেরণা রাগ নিয়েই বলে,“আমার ভাই আজ কোন শিল্পপতির ছেলে হলে ভাবনা চিন্তা সব এখানেই করে ফেলতেন। আপনার ছোটোভাইয়ের কথা অনুযায়ী সে রোডসাইড রাস্কেল কিনা তাই ভাবতে হবে রাইট ? আর এ দুমাসে বাড়েবাড়ে প্রিতমকে ডেকে নিয়ে চা খাইয়ে বোনের জীবন বাঁচানোর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার জন্য আপনার প্রতিও চির কৃতজ্ঞ আমরা ইহান মির্জা। হোয়্যাটেভার! যান বোনকে নিয়ে, ভাবাভাবির কিছু নেই, আমি আপনার বোনকে ভাইয়ের বৌ করবো না।”

ইনায়ার অমন নিশ্চুপ কান্না দেখে প্রিতম ধৈর্য্যহারা হয়ে পরছিলো, সে গিয়ে ইশমামের হাত ধরলো,“আঙ্কেল বিশ্বাস করুন আমার সম্পর্কে আপনার ধারণা ভুল,আমি মোটেও বখে যাওয়া ছেলে নই।”

ইশমাম এক ঝটকায় নিজের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে অন্যদিকে ফিরে থাকে। প্রিতম ইহানের সামনে এসে দাঁড়ায়,“ভাইয়া!”

_প্রিতম। আমি বলেছি আমাদের ভাবতে দাও, আমার বোন এখনও ছোটো। ঠিক ভুল ও বোঝেনা। মোহে পরে তোমাকে হ্যা বলেছে হয়তো.....

প্রিতম একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে ইহানের দিকে। ইহান তাজওয়ার মির্জা খুবই ভদ্রভাবে তাকে রিজেক্ট করেছে বোনের জন্য সেটা সে বুঝে নিলো।

প্রেরণা তাচ্ছিল্যের সাথে হেসে ওঠে। ইহান থমথমে মুখে তাকিয়ে আছে প্রেরণার চোখের দিকে। প্রেরণা হাসি থামিয়ে মুখ কঠিন করে ভাইকে বলে,“তামাশা না করে চল এখান থেকে!”

ইনায়া কাঁদতে কাঁদতে বসে পরলো এবার, ইরফান গিয়ে ওকে ধরে টেনে ওঠালো,“ চল বাড়িতে চল।”

এদিকে প্রেরণা নিজের গায়ের সর্বোচ্চ শক্তি খাটিয়ে প্রিতমকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে। প্রিতম শুধু দেখছিলো কাঁদতে থাকা ইনায়াকে। এই দিনটি তো আসার ছিলো। হসপিটালের সেই দিনগুলোতে বারবার বুঝিয়েছিলো মেয়েটিকে, বোঝেনি, প্রিতমকেও স্থির থাকতে দেয়নি। এখন জ্বলছে বড়লোকের আহ্লাদী আর পোড়াচ্ছে প্রিতমকেও।

চলমান.....

[ ২য় অংশের লিংক কমেন্টে ]#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_২৮ [ ২য় অংশ ]
#ইসরাত_ইতি

[ ২য় অংশ ]

[ ১ম অংশের লিংক কমেন্টে পাবেন ]

মির্জা বাড়িতে সন্ধ্যা নাগাদ পারিবারিক বৈঠক বসেছে। সবার আহ্লাদী ইনু প্রেম করছে সেটা শুনে সবাই যতটা না অবাক হয়েছে, ইশমামের থেকে প্রিতমের দ্য আওয়ার্সের ঘটনা শুনে সবাই হতভম্ব, অপ্রীতিকর শক ছিলো খবরটি তাদের কাছে।

অসুস্থ পরী তখনও টের পায়নি কিছু। নিজের ঘরে ঘুমোচ্ছিলো মাগরিবের নামাজ আদায় করে। পারিবারিক বৈঠক বসেছে নিচতলায়। উপস্থিত সামিন, ইলহাম, ইশমাম,আলো,রিতু এবং শান্ত। শান্ত বিকেলে চলে এসেছে শেহাকে নিয়ে।

দ্য মুন টকস থেকে ইনায়ার দুই ভাই তাকে কিছুক্ষণ আগে বাড়িতে এনেছে। বাড়িতে ফেরার পরে রুমে শুয়ে আছে চুপচাপ ইনায়া, ইনশিরাহ অন্ধকার রুমে বোনের পাশে বসে আছে,ডান হাতটা বোনের মাথায় তার। ইনায়া কেঁ'দে চলেছে অবিরত। শেহা ঘরে ঢুকে লাইট জ্বেলে ইনায়ার পাশে গিয়ে বসে।

লিভিং রুমে দাঁড়িয়ে আছে ইহান,তার ঠিক পাশে ইরফান। ইহানের সামনে আজ প্রিতমকে ইচ্ছেমত মনের আশ মিটিয়ে মা'রতে পারেনি, শেষ পর্যায়ে প্রিতমের ঐ বোন ওকে ইরফানের নাকের ডগার সামনে থেকে নিয়ে গেলো, দাদান তাকে আটকেছে সে যাতে প্রিতমকে না মারে। মনে মনে দাদানের প্রতি ক্ষুব্ধ সে ভীষণ।

আলোচনার এক পর্যায়ে ইহান সবার মুখের দিকে তাকিয়ে বলে,“ইনু ছোটো। ওকে এভাবে ধ'মকা ধ'মকি করার মানে দেখছি না। এসব তো হতেই পারে তাইনা? আর তাছাড়া বিষয়টি নিয়ে তোমরা সবাই ঠান্ডা মাথায় ভাবো,আমি এটাই চাই ছোটো বাবা। তোমার মুখে দ্য আওয়ার্সের ঘটনা শুনলাম, তবে ছোট বাবা এমন কত শত ফলস পজিশনে আমরা পরি তাই না? তাই বলে কি একটা ইন্সিডেন্ট আমাদের গোটা চরিত্রকে তুলে ধরে?”

ইরফান উঁচু গলায় বলে,“তুমি আবার ঐ প্রিতমকে ডিফেন্ড করছো? কাম অন দাদান তুমি কতটুকু চেনো ওকে?”

ইশমাম কিছুই বলছে না, বিমূঢ় দৃষ্টিতে মেঝের দিকে তাকিয়ে সে। সামিন এতক্ষণ ধরে ইরফানের কথা, ইশমামের কথা, ইহানের কথা সবকিছু শুনেছে। কিছুক্ষণ চুপ থেকে ইহানের দিকে তাকিয়ে বলে,“ঐ ছেলেটির সাথে আমি একটু কথা বলতে চাই।”

_কেন? ইনুকে বিয়ে দেবে তুমি ওর সাথে?
দাঁতে দাঁত চেপে বড় বাবাকে প্রশ্ন করলো ইরফান।

_না । আমি শুধু ছেলেটাকে একটু যাচাই করবো, ওদের অনুভূতি কতটুকু সিরিয়াস সেটাও দেখাবো। ইনায়া পড়াশোনা করছে, এখনই বিয়ে? হাস্যকর! সেসব অনেক পরের ব্যাপার। আগে ছেলেটিকে দেখতে চাই। ইলহাম কি বলিস?

বড় ভাইয়ের মতামতকে পূর্ণ সমর্থন করলো ইলহাম। তবে ইশমাম বেঁকে বসলো, কঠিন গলায় বড় ভাইকে বলে,“যাচাই মানে? ছেলেটা ইনায়াকে হেল্প করেছে,আমি বললাম তো আমি চির কৃতজ্ঞ। তবে আমার মেয়ের লাইফের ব্যপারে সিদ্ধান্ত টাও আমাকেই নিতে দাও ভাইয়া। তোমরা এই ব্যাপারটাকে লাই দেবে না ভুলেও। ওই মেয়ে ইনফ্যাচুয়েশনে ভুগছে। দুদিন কাদুক, আমেরিকা গেলে ওসব প্রিতমের কথা ভুলে ক্যারিয়ারমুখী হবে। ”

ইহান ছোটো বাবাকে কিছু বলতে যাবে, ইশমাম তাকে থামিয়ে দিয়ে বলে,“আমি আমার ডিসিশন থেকে নড়বো না ইহান।”

ইরফানের মুখে বিজয়ীর হাসি। বড় ভাইয়ের লটকানো মুখের দিকে তাকিয়ে হাসছে সে নিশ্চুপ।

বাড়ির সভা ভে'ঙে যাওয়ার পরে আলো আর রিতু ইশমামের সাথে আলাপ করতে চেয়েছিল ঠান্ডা মাথায়, ইশমাম তাদের সাফ জানিয়ে দিয়েছে এই ব্যাপারে আর কোন কথা নয়!

পুরো রাস্তায় প্রিতম চুপচাপ ছিলো। প্রেরণাও তাকে কিছুই বলেনি এখন অবধি। বাড়িতে ঢুকে ভাইয়ের চোট পাওয়া মুখে ওষুধ লাগিয়ে দিতে দিতে নরম গলায় বললো,“কেনো তুইও দিলিনা পালটা দুইটা ঘুষি বেয়াদবটাকে?”

প্রিতম ম্লান হাসলো। প্রেরণা ভাইয়ের মুখোমুখি বসে দু'হাতে ভাইয়ের দু'গাল আগলে ধরলো। নম্রস্বরে বললো,“কেনো করলি এমন বোকামি? তুই কি এতোই অবুঝ প্রিতম?”

প্রিতম মাথাটা নিচু করে রাখে কোনো জবাব না দিয়ে। প্রেরণা কিছু সময় ভাইকে দেখে নিয়ে পুনর্বার বলে,“মেয়েটিকে খুব পছন্দ?”

প্রিতম মৃদু নাড়ে মাথাটা,মুখে বললো না কিছুই।

প্রেরণা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মেঝেতে ভাইয়ের পাশে বসে রইলো দীর্ঘসময়। তার অবস্থা হয়েছে না যযৌ ন তস্থৌ। মুন টকসে উগ্র মেজাজ দেখিয়ে চলে এসেছে সে ঠিকই। তবে ভাইয়ের অনুভূতি এতটাও হালকা চোখে দেখেনা প্রেরণা। তার অতি বুঝদার, ভদ্র ভাইটা জীবনে প্রথম এতোটা এগিয়েছে, কিভাবে এই অনুভূতি ছাইচাপা দিতে বলবে প্রেরণা? আদৌও তা হয় কি?

আবারও একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে প্রেরণা বলে,“পরিস্থিতি ঠান্ডা হোক ওদের বাড়ির। আমি কথা বলবো ইহান মির্জার সাথে। উনি বুঝবেন ঠিকই। দুদিন পরে যাবো ইশমাম মির্জার কাছে, সামিন ইয়াসার মির্জার কাছে। তুই বিশ্রাম নে। আর কিছু করিস না।”

পাপার সিদ্ধান্ত শুনে নিস্তেজ বসে রইলো ইনায়া। সে তো আমেরিকা যেতে চায়, তবে এখনই না। কোনোভাবেই না। প্রিতম আর তার সম্পর্কের এই টালমাটাল অবস্থায় সে কিছুতেই কোথাও যাবে না। তাদের সম্পর্ক না মেনে নিলে কোথাও যাবে না ইনায়া।

শেহা আর ইনশিরাহকে জোর করে ঘর থেকে বের করে দিয়ে ইনায়া দরজা চাপিয়ে ঠেস দিয়ে মেঝেতে বসে রইলো কতক্ষন। পরী উঠেছে ঘন্টা খানেক আগেই। তাকে এই ব্যাপারে কেউ কিছু না জানানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই অবস্থায় উত্তেজিত হলে বিরাট অসুবিধা।

ঠিক রাত দশটায় ইনায়ার ফোনে প্রিতমের কল আসে। বুক ফাটা কান্না দমিয়ে কলটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে প্রিতম নরম গলায় বলে,“ইনু?”

_হু।
কান্না দমানোর প্রচেষ্টা ব্যর্থ। প্রিতম বলে,“তোমাকে কেউ মে'রেছে তারপর? কেউ গাঁয়ে হাত তুলেছে?”

_নাহ।
কেঁ'দে ফেলে ইনায়া। প্রিতম বলে,“কাদার দরকার নেই, শোনো, আমি আর আপু তোমার পাপার কাছে আবার যাবো। বারবার যাবো। যতক্ষন না মানবে ততক্ষণ যাবো। কেঁদো না।”

এবার কান্নায় ভেঙে পরলো ইনায়া। গলা দিয়ে বেরোতে চাইছে না কথা, কোনোমতে বলতে পেরেছিলো ইশমাম চায় সে আমেরিকা চলে যাক। ইশমাম কতটা ক্ষেপেছে সব বললো প্রিতমকে।

ঠিক তখনই ইনায়ার কান থেকে ফোন ছিনিয়ে নেয় কেউ। ইনায়া ঘুরে তাকাতেই আঁতকে উঠলো। দু'পা এগিয়ে গিয়ে বললো,“দাদান ফোনটা....”

এক আ'ছাড়ে ফোনটা ভা'ঙে ইরফান। তারপর শান্ত চোখে ইনায়ার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলে,“আমেরিকা যাওয়ার আগে নতুন ফোন নিয়ে দেবো তোকে।”

কাঁদতে কাঁদতে বসে পরে ইনায়া। মাম্মা সবটা জেনে যাবে সেই ভয়ে জোরে চেঁচাতেও পারছে না। ইরফান এদিক ওদিক তাকিয়ে ড্রেসিং টেবিলের সামনে থেকে নেইলপেইন্ট রিমোভারের বোতলটা নিয়ে এসে ইনায়ার একটা হাত খপ করে ধরলো। ঢেলে দিলো পুরো বোতলটা ইনায়ার নখে, একটা ক্লিনিং নাইফ দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে ওঠাতে থাকে “পি” অক্ষর।

ইনায়া ব্যাথায় চেঁ'চি'য়ে ওঠে, সেদিকে ইরফানের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। সে ব্যস্ত বোনের নখ থেকে তার শত্রুর নামের প্রথম অক্ষর মুছতে।

চাঁপা আওয়াজ শুনে দোতলার বারান্দা থেকে ছুটে আসে শেহা। এই দৃশ্য দেখে সে আতংকে জমে যায়। একছুটে ইনায়াকে ছাড়িয়ে নিয়ে ইরফানকে বলে,“করছো কি?”

_ছাড় ওকে শেহু! ওর হাত দে।

_ও কি দোষ করেছে?
ভীষণ জোরালো শেহার আওয়াজ।

ইরফান লাল চোখে ইনায়ার দিকে তাকিয়েই শেহাকে বললো,“আমার শত্রু জেনেও প্রেম করতে গিয়েছে। ওর সাহস দেখ! ভালোবাসা মাই ফুট!”

শেহা এবার ইনায়াকে টেনে সম্পূর্ণ আড়াল করলো তার পেছনে। ইরফানের চোখে চোখ রেখে নরম গলায় বললো,“কেন? ভালোবাসা বুঝি অন্যায়?”

রাগ ধরে গেলো ইরফানের। শেহার দিকে রাগী চোখে তাকিয়ে বলে,“একেবারে সিনেমার ডায়লোগ কপচাবি না। ওর নখ থেকে ওসব মুছবি পাঁচ মিনিটে। নয়তো ওর আঙ্গুল কাটবো আমি।”

হনহনিয়ে বেড়িয়ে গেলো ইরফান ইনায়ার ঘর থেকে। শেহাকে জরিয়ে ধরে কাঁদতে লাগলো ইনায়া।

____

আজ দুদিন হয়েছে প্রেরণা রেস্তোরাঁয় যায়নি। মাইগ্রেনের অসুখটা ইদানিং বড্ড জ্বালাচ্ছে তাকে। বাড়িতেই পরে আছে সে। অনেক ভেবেচিন্তে-ই সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে ইহানের কাছে যাওয়ার। লোকটাকে দেখে অতটা অবুঝ মনে হয়নি, দুই হাজার পঞ্চাশে এসে ভালোবাসা-বাসির সম্পর্কের বিরুদ্ধে এমন একরোখা আচরণ করবে ইহান তাজওয়ার,প্রেরণার তা মনে হয়না। মাথা ব্যথাটা খানিক কমলে যাবে প্রেরণা ভাইকে নিয়ে, দুদিন ধরে উদ্ভ্রান্তের মতো কম্পিউটারের সামনে শুধু বসে থাকে প্রিতম। প্রেরণা জানতে পেরেছে ইনায়াকে ফোনে পায়নি সেদিন রাতের পর থেকে। বুঝতে বাকি নেই মেয়েটাকে কিভাবে চাপ দেওয়া হচ্ছে। ভীষণ রাগ উঠে যায় এই ব্যাপারটিতে প্রেরণার। অশিক্ষিত বর্বরের মতো আচরণ। অথচ এই পরিবার শহরের সবথেকে নামডাক ওয়ালা পরিবার।

ঘর থেকে বেরিয়ে কিছুক্ষণ শুদ্ধর হোমওয়ার্ক দেখিয়ে দিয়ে প্রেরণা কিচেনে ঢুকলো। আজ অনেকটা দিন পর রাঁধবে সে। রাতে ভাইবোন দুটিকে একসাথে নিয়ে খাবে। প্রিতমের মন ভালো করা দরকার।
রাঁধতে গিয়ে আবারও আনমনে হয়ে ওঠে সে। সেদিনের পরে রেস্তোরাঁর বিষয়টি নিয়ে ভাববার ফুরসৎ মেলেনি তার। সাগর ভুঁইয়ার এধরণের আচরণ চুপচাপ হজম করেছে সে রেস্তোরাঁর কথা ভেবে। তবে এখন? এখন কি করবে সে?
রেস্তোরাঁর দালান ছেড়ে দেওয়া প্রেরণার পক্ষে অসম্ভব। আশেপাশে নির্দিষ্ট এরিয়ায় এমন দালান সে পাবে না। দূরে কোথাও যে চলে যাবে তাও অসম্ভব। তার ওটা ভাতের হোটেল, কোনো শৌখিন রেস্তোরাঁ নয় যে মানুষ অতদূর শখ করে খেতে যাবে। তাকে যে শিল্প প্রতিষ্ঠানের এলাকাতেই ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রাখতে হবে!

আর কিছু ভাবতে পারলো না প্রেরণা। তরকারির পোড়া গন্ধ তার নাকে লাগে। অন্যমনস্কতায় পুড়িয়ে ফেলেছে তরকারি।

মনটাই খারাপ হয়ে গেলো তার, তড়িঘড়ি করে চুলা অফ করতেই শুনতে পেলো রুমে তার ফোন বেজে চলেছে। কড়াই নামিয়ে রেখে ছুটে গেলো সে‌। জামি তাকে ফোন দিচ্ছে। ফোনটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে জামি কান্নামিশ্রিত কন্ঠে চেঁচিয়ে ওঠে,“আপু! প্রিতমকে স্পোর্টস ক্লাবের পেছনে কেউ মেরে রেখে গিয়েছে। ওকে হসপিটালে নিয়ে যাচ্ছি আমরা। তুমি এসো।”

হাত থেকে ফোনটা পরে যায় প্রেরণার। দু'চোখ ছাপিয়ে জল আসলো না আর। শুধু নিস্তেজ হয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলো চুপচাপ।

____

দুদিন ধরে নিজেকে রুমবন্দি করে আছে ইনায়া। ইশমাম মেয়ের সাথে দু'দিন কোনো কথাই বলেনি। তবে ইনায়ার ভার্সিটিতে গিয়েছিলো একাডেমিক ট্রান্সক্রিপ্ট তুলতে,ইনায়া শুনেছে। মেয়েকে সে সাথে নিয়ে যাবে-ই ফ্লোরিডাতে।

ইনশিরাহ,শেহা সন্ধ্যা থেকে দুবার এসেছিলো তার ঘরে। ইনায়া শেহাকে অনেক অনুরোধ করে তার ফোনটা নিয়ে প্রিতমকে কল করেছিলো। প্রিতমের ফোন বন্ধ দেখা গিয়েছে বারবার।

ঠিক রাত সাড়ে দশটায় শেহার নাম্বারে রুশফির কল আসে। শেহা ফোনটা নিয়ে ছুটে এসে ইনায়াকে দেয় । কলটা রিসিভ করে কানে ধরতেই রুশফি জানায় প্রিতম হসপিটালে।

মুখ চেপে ধরে বসে পরলো ইনায়া। শেহা ওর পাশে বসে পরে ওকে ধরলো। ইনায়া বড় বড় শ্বাস নিচ্ছে। কন্ঠনালীর ভেতরে কান্নাকে দমিয়ে রেখে শেহাকে কোনোমতে বললো,“মেজো দাদান কই?”

শেহার উত্তরের অপেক্ষা না করে ইনায়া উঠে ছুটে গেল ইরফানের ঘরে। বিধ্বস্ত প্রায় সে, দ্রুতপায়ে ইরফানের ঘরে ঢুকে ইরফানের মুখোমুখি দাঁড়ায় গিয়ে। ইরফান সবেমাত্র বাড়িতে ফিরে শার্ট পাল্টেছে। বোনের দিকে শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে সে। ইনায়া নিজের ক্রোধটুকু মেজো দাদানের ওপর উগ্রে দিয়ে চেঁচিয়ে উঠলো,“কেন মারলে তুমি ওকে আবার? কি শান্তি পেলে? জবাব দাও!”

____

বুকের পাঁজরে আঘাত লেগেছে প্রিতমের। এক্স-রে হয়েছে তার কিছুক্ষণ আগে। চেহারায় বিভিন্ন স্থানে গভীর তা'জা ক্ষত। যে মে'রেছে,সে যে তার পুরোটা রাগ উগ্রে দিয়েছে তা স্পষ্টত বোঝাই যাচ্ছে।
ঘুমের ইনজেকশন দেওয়া হয়েছে প্রিতমকে। প্রেরণা ভাইয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে কেবিন থেকে বেরোয়। বাইরে জামি-সাফোয়ান আর শুভ দাঁড়িয়ে। প্রেরণা ম্লান হেসে বললো,“তোমরা অনেক দৌড়াদৌড়ি করেছো ভাই। এখন বাড়িতে গিয়ে ঘুমাও। আমি আছি।”

ওরা নড়লো না একচুলও। প্রেরণার ফোন বেজে ওঠে,কলটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে শুদ্ধর কান্নামিশ্রিত কন্ঠ,“মাম্মা তুমি আসছো না কেন? আবারও আমাকে ফাঁকি দিয়ে নেপাল গিয়েছো তুমি?”

প্রেরণা একটা গভীর নিঃশ্বাস ফেলে বাচ্চাটিকে অনেক বুঝিয়ে ফোন কাটতে পারলো অবশেষে। অতঃপর জামিদের দিকে তাকিয়ে খুবই শান্তস্বরে বললো,“বুঝলে জামি। তোমাদের এই শহরটাও আমাদের তিন ভাইবোনকে চাইছে না। আসলে সেই রাশিয়া থেকে দুর্ভাগ্য আমাদের খেদিয়ে এখান থেকে ওখানে নিয়ে যাচ্ছে তো যাচ্ছেই। ব্যপার না, প্রেরণা দৌড়াতে ভীষণ অভ্যস্ত। আজীবন দৌড়ে যাবে।”

ওরা কিছু বললো না। প্রেরণা বলতে থাকলো,“শুধু কষ্ট হয় জামি জানো।‌ আমার দুর্ভাগ্যের সব শত্রুতা আমার ছেলের সাথে। ছেলেটা বাবাকে তো পেলোই না,আমাকেও ছেলেটার কাছে স্থির হয়ে দু দন্ড বসতে দেয়না এই দূর্ভাগ্য। এই দূর্ভাগ্যকে আমি কখনো ক্ষমা করবো না জামি।”

গলা ধরে আসে প্রেরণার, শ্বাস ফেলে দ্রুত। তখনই হসপিটালে পা রাখে ইহান তাজওয়ার মির্জা।
রিসিপশনে গিয়ে প্রিতমের রুম নাম্বার জেনে লম্বা পা ফেলে ইহান লিফটে ওঠে। চারতলায় প্রিতমের কেবিন। কেবিন নাম্বার চারশো বারোর সামনে এসে দাঁড়ায় ইহান। আবারও প্রেরণার মুখোমুখি হয় সে।

প্রেরণা মাথা তুলে কয়েকপল দেখলো লোকটাকে,তার দৃষ্টিতে কোনো অনুভূতি নেই। ফিরিয়ে নিলো চোখ।

ইহান দম ফেলে এগিয়ে আসছে, ধীর কদমে,প্রেরণার কাছে। জামিদের দিকে তাকিয়ে ধীর স্থির বলে,“ডাক্তার কি বলেছে?”

_ঠিক আছে ভাইয়া। দুদিনেই যেতে পারবো। ঘুমাচ্ছে প্রিতম।

_আর কোনো জটিলতা?

_না ভাইয়া।

স্বস্তি পেলো ইহান । অতঃপর প্রেরণার মুখোমুখি একটা বেঞ্চিতে বসে পরলো। শুভ্র পাঞ্জাবির গলার কাছের দু'টো বোতাম লাগায়নি সে। জামির ফোন পেয়ে টি-শার্ট খুলে কোনোমতে পাঞ্জাবিটা পরে ছুটেছে এখানে।

রাত গভীর হচ্ছে ধীরে ধীরে। জামিদের প্রেরণা পাঠিয়ে দিয়েছে কিছুক্ষণ আগে জোরপূর্বক । ইহান বসে আছে তখনও, আরচোখে তার নীলিমাকে একপলক দেখে,নীরবতা ভেঙে বলে ওঠে,“আপনার কি ইরফানকে সন্দেহ হচ্ছে?”

প্রেরণা ম্লান হাসলো মাথা নিচু করেই, নিচু স্বরে বললো,“ভয় নেই। সন্দেহ হলেও কেস ফাইল করবো না। নিশ্চিন্তে বাড়ি যান আপনি।”

নিস্তেজ, অনুভূতিশূন্য প্রেরণা। ইহান কিছু মুহূর্ত চুপ থেকে বলে,

_ইনায়া খুব ভেঙে পরেছে...

_বোনকে গিয়ে বোঝান। জানেন সন্ধ্যা বেলাতেও আমি আপনার ফোন নাম্বারটা খুঁজছিলাম, প্রিতম-ইনায়ার ব্যপারে আপনার কাছে অনুরোধ করবো বলে। বাট এখন আমি একেবারে শেষ সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমার। ওদের সম্পর্ক না হওয়াই ভালো। বোনকে বোঝান। আমিও ভাইকে বোঝাবো।

জবাবে কিছু না বলে ইহান চুপচাপ বসে আছে।‌ তার দৃষ্টি প্রেরণার মুখের দিকে। এসব ব্যপারে কোনো কথাই ইহান বললো না, কিন্তু হঠাৎ কোনো সংকোচ ছাড়াই বলে উঠলো,“আপনার ছোটো ছেলেটা কার কাছে রয়েছে এখন এতো রাতে?”

ইহান নিজেও বিব্রত এমন অপ্রাসঙ্গিক প্রশ্নটি করে, প্রেরণাও চোখ তুলে তাকায়। তারপর নিচুগলায় বলে,“গভর্নেস রয়েছেন।”

চলমান.....

[ ৩য় অংশের লিংক কমেন্টে ]#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_২৮ [ ৩য় অংশ ]
#ইসরাত_ইতি

[৩য় অংশ]

[ ১ম ও ২য় অংশের লিংক কমেন্টে ]

আরো বিশ মিনিট ইহান চুপচাপ বসেছিলো হসপিটালে। তারপর সেখান থেকে বেরিয়ে যায়।

রাত তখন দুইটা। শান্তি নীড়ের পরিবেশ এখন থমথমে, নিস্তব্ধ। ইনায়া ইরফানের ওপর চেঁচামেচি শুরু করার মুহুর্তেই ইহান চলে এসেছিলো ওদের মাঝে। ইনায়াকে সরিয়ে ঘরে ঢুকিয়ে ইনশিরাহ আর শেহাকে বলে গিয়েছিলো দেখাশোনা করতে।

বাড়ির বড়রা কেউ তখনও এসব শোনেনি। বাড়িতে গিয়ে ইহান প্রথমেই ইনায়ার ঘরে ঢুকলো, জেগে আছে তিনবোন-ই। ইনু হাঁটুতে মাথা ঠেকিয়ে বসেছিল। ইহান চুপচাপ উঁকি দিয়ে সরাসরি ইরফানের ঘরে ঢুকে ইরফানের মুখোমুখি দাঁড়ায়। তেজী গলায় বলে,“কেন করলি এমন?”

ইরফান শীতল চোখে দাদানের দিকে তাকিয়ে। ইহান দু কদম এগিয়ে যায়। গলার স্বর আরও খানিকটা উঁচুতে তুলে চেঁচায় ইহান,“আন্সার মি ইরফান! ওদের এতো ভোগান্তি দিচ্ছিস কেন?”

_ওদের? আর কাদের দাদান?
স্বাভাবিক গলায় বলে ইরফান, পরপর বলে,“ওহহ ! ঐ মহিলা! কি হয়েছে? এতো কেনো খারাপ লাগছে তোমার?”

_মানে?

_মানে ঐ মহিলার সাথে তোমার এতো কি যে ওনার লুচ্চা ভাইয়ের কাছে নিজের সরল বোনটিকে বিয়ে দেওয়ার জন্য উঠেপড়ে লেগেছো?

_মাইন্ড ইয়র ল্যাঙ্গুয়েজ ইরফান,মা'র খাবি তুই আমার হাতে।
চেঁচালো ইহান!

ইরফান হাসলো, তারপর বললো,“তুমি আর তোমার আদরের ছোট বোনের রুচি অত্যন্ত জঘন্য!”

বিমূঢ় চেয়ে আছে ইহান। ভাই বোনের গাঁয়ে সে কখনও হাত তোলেনি, আজও সেটুকু ধৈর্য্য রাখলো। তবে চেঁ'চি'য়ে গোটা বাড়ি মাথায় তুললো ইহান। ঘর থেকে বেরিয়ে এলো বাড়ির বড়রা,ঘুম ঘুম চোখে ইহানের থেকে জানতে চাইলো কি হয়েছে। ইহান ইরফানের দিকে অগ্নিদৃষ্টি রেখেই ইলহামকে বলে,“পাপা! তোমার ছোটো ছেলের জন্য সাইক্রিয়াটিস্টের কাছে কাল অ্যাপয়নেমেন্ট দিয়ে রাখবে নয়তো খুব শিগগিরই আমি ওকে সংশোধনাগারে পাঠিয়ে দেবো। ও সবকিছুর মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছে!”

বড়রা সবাই বুঝতে পারছে না কিছুই। ইহান কঠিন মুখ নিয়েই নিজের ঘরে চলে যায়। বড়রা ইরফানের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে,আর ইরফান সবার মুখের সামনে রুমের দরজাটা ধপ করে লাগিয়ে দিয়ে বিছানায় টানটান হয়ে শুয়ে পরে।

কপালের দু'পাশের রগ দপদপ করছে। ওষুধ খেয়েও কাজ হচ্ছে না। মেজাজ টা কিছুতেই শান্ত হচ্ছে না ইরফানের, প্রিতমকে মে'রেও না। তার ক্ষোভ এখন অন্য ব্যাপারে। ঐ প্রিতমের জন্য ইনায়া ওর দিকে তেড়ে এসেছে আজ,যে মেয়েটা কখনো উঁচু গলায় কথা বলেনি ওর সাথে, আর দাদান! আজ ইরফানকে উন্মাদ ঘোষণা করে দিলো সবার মতো! এর পেছনে প্রিতম যতটুকু দায়ী,ওর ওই আপু তার বেশি দায়ী। প্রচন্ড রাগ চেপে আছে ইরফানের মাথায়। আজ স্পোর্টস ক্লাবে বন্ধুরা যখন বলছিলো,“কিরে ইরফান! কলেজ লাইফের শুরু থেকে তোর ভাগের সব ট্রফি ছিনিয়ে নিতে নিতে তোর বোনটাকেও তো নিয়ে নিচ্ছে প্রিতম।” তখন থেকে এই ক্ষোভ চে'পে বসেছে। যা চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়ছে তো বাড়ছেই।

____

দরজা বন্ধ করার দীর্ঘসময় পরে দরজায় টোকা পরলো ইহানের। তখনও জেগেই ছিলো সে। নানা রকমের চিন্তা করতে ব্যস্ত তার মস্তিস্ক। উঠে বসে প্রশ্বস্ত উদোম শরীরে একটা টি-শার্ট পরে নিয়ে দরজা খুলে দেখলো ইনায়া দাঁড়িয়ে আছে ভেজা চোখে। ইহান কিছু বলার আগেই ইনায়া এক প্রকার ঝাঁপিয়ে পরে ইহানে হাত ধরে ঝাঁকিয়ে বললো,“ও দাদান। প্লিজ বলো না ও কতটা চোট পেয়েছে।”

ইনশিরাহ আর শেহাও ইহানের ঘরে ঢুকেছে। ঘরে ঢুকেই শেহা দরজা বন্ধ করে দিলো।

ইহান গম্ভীর হয়ে দাঁড়িয়ে, ইনশিরাহ খুব সাহস করে বলে,“বলো, ওনার বেশি ক্ষতি হয়েছে?”

ইহান ধীর স্থির জবাব দেয়,“না। দুদিন পরেই বাড়ি যেতে পারবে। সামান্য চোট!”

ইনু ইহানের হাত ধরে আবারও ঝাঁকুনি দিয়ে বলে,“দাদান তুমি বলো এটা কি ভুল করেছি আমি? ও কি খারাপ ছেলে? পাপাকে একটু বোঝাও দাদান। আচ্ছা আমি আমার পড়াশোনা একেবারে খারাপ করবো না, আমি ফ্লোরিডাও যাবো ‌। তবুও যেন পাপা ওকে মেনে নেয়।”

ইহান বোনের মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলে,“ওর আপু ভীষণ চ'টে আছে। বিষয়টা এগোতে বারণ করেছে, তুই ঘরে যা ইনু। আমাকেও ভাবতে দে।”

ইনায়া করুণ দৃষ্টিতে বড় দাদানের দিকে তাকিয়ে আছে। চোখ ফেটে এখনই জল আসবে যেন। ইহান বোনের মাথায় হাত বুলিয়ে বললো,“আমি শেষ চেষ্টা করবো, বড় বাবাকে আর পাপাকে ধরবো,ওনারা ছোটো বাবাকে শান্ত করবে। ঠিকাছে? ও সুস্থ হোক।”

শেহাকে বলল,“ওকে ঘরে নিয়ে যা। আমি ঘুমাবো।”

ইনশিরাহ দাদানকে দেখছিলো একদৃষ্টে। কি সুন্দর ইনায়াকে সাপোর্ট করছে দাদান, আর তার বেলায় এই চিত্রটা যে সম্পূর্ণ ভিন্ন হবে তা তো নিশ্চিত! সেদিন কেমন রুপ দেখাবে দাদান? ইনশিরাহর প্রতি মোটেও নরম হবে কি? দাম দেবে কি ইনশিরাহর ইচ্ছের প্রতি? পাপা আর মাম্মাকে মানাতে পাশে থাকবে ইনশিরাহর ? উত্তর “না।”

শেহা ইনায়াকে নিয়ে চলে গেলে ইহান ঘা'ড় ঘুরিয়ে ইনশিরাহর দিকে তাকায়।

“কিছু বলবি ইশি?”

ইনশিরাহ মাথা নিচু করে দু'পাশে মাথা ঝাঁকায়। অতঃপর চুপচাপ বেড়িয়ে যায় ঘর থেকে।

____

প্রিতমকে একদিন বাদেই বাড়িতে এনেছে প্রেরণা। খুব দ্রুত সেরে উঠবে সে বাড়িতে এলেই,এমনটাই মনে হয়েছে প্রেরণার। ভাইয়ের জন্য রেস্তোরাঁয় গিয়ে অল্প সময় থেকেছে দুদিন। সাগর ভুঁইয়ার বিষয়টা মাথা থেকে ঝেরেই ফেলেছে। সামনে যা হবে দেখা যাবে,এটা ভেবে।

বেড সাইড টেবিলে এক বক্স ওষুধ রাখা। যেগুলো প্রিতমের খেতে হচ্ছে। মুখমন্ডলের চার স্থানে নিউস্ট্রিপ ব্যন্ড লাগানো তার। শরীরে পেটে আর বুকের কাছটাতেই ব্যথা। ঘুষি দু'টো যায়গা বুঝে দিয়েছে ইরফান।

প্রেরণা একগ্লাস জুস নিয়ে ঘরে ঢুকে ভাইয়ের হাতে দেয়। প্রিতম ম্লান হেসে চুপচাপ নিয়ে নেয় গ্লাসটা ‌।
ভাইয়ের ঠিক পাশেই বসলো প্রেরণা, বললো,“কিভাবে কি হয়েছে খুলে বল!”

প্রিতম এক চুমুকেই জুসটা খেলো। গ্লাসটা পাশে রেখে ঠাণ্ডা স্বরে বললো,“কিছুই হয়নি।”

_যাবি থানাতে? ওর নামে কেস করবি? আমি চাইনি শুরুতে, গতকাল রাতে ভেবে দেখলাম ওকে দমাতে হবে। উন্মাদ ছেলে একটা। তুই চাইলে এক্ষুনি থানায় চল।

_না।
একশব্দে দৃঢ়তা নিয়ে বলে প্রিতম। পরপর তার ঠোঁটের কোণে দেখা যায় এক রহস্যময় হাসি। প্রেরণা জানতে চায়না সে হাসির কারণ। উঠে রান্নাঘরে যায়। প্রিতম বিছানায় শুয়ে শুয়ে গত পরশু রাতের কথা ভাবছে। স্পোর্টস ক্লাব থেকে বেরিয়ে ক্লাবের পেছনের পার্কিং লটে বাইকের কাছে যেতেই ইরফান আর নিক্সনের মুখোমুখি হয় সে। ইরফানের বন্ধুরা ওকে কুৎসিত ভাষায় গালিগালাজ করলেও সে পাত্তা না দিয়ে চলে যেতে নেয়। ইরফান বরাবরের মতো ওর পথ আগলে দাঁড়িয়ে অপমান জনক কথা ছুড়ে দেয়, বরাবরের মতো প্রিতমের অওকাদ নিয়ে প্রশ্ন তোলে। এক কথায় দুই কথায় ক্ষেপে উঠে ইরফানই প্রথম আঘাতটা করে। প্রিতম তবুও ঠান্ডা থেকে শুধু বলতে চাইছিলো প্রিতমের ওপর এমন অহেতুক প্রতিহিংসা জমিয়ে না রাখতে। দিয়ে দেবে সব ট্রফি মেডেল,এই ক্লাবের প্রেসিডেন্টশীপ।
এসব শুনে জিদ দাউ দাউ করে জ্বলতে লাগলো ইরফানের শিরায়।

ঘুষি দুয়েকটা প্রিতমও মারেনি এমন নয়। তবে জামিরা কেউই ছিলো না সেখানে। প্রিতম ছিলো একা।

দৃশ্যটা কল্পনা করতে করতে প্রিতমের ক্ষত বিক্ষত চেহারা কঠিন হলো। মগজ ফুটছে,মস্তিস্কে ইরফানের বলা কথাগুলো বারবার প্রতিধ্বনিত হচ্ছে,“তোর অওকাদ কি? রাস্তার ছেলে। রোডসাইড রাস্কেল!”

দু'হাতে চুল খামচে ধরে বসে রইলো চুপচাপ প্রিতম। মনে আগুন জ্বলছে, অসহ্য লাগছে এ দহন।

কলিং বেলের আওয়াজ পেয়ে তোয়ালেতে হাত মুছে নিয়ে প্রেরণা গিয়ে দরজা খুলে দেয়।

প্রিতমও উঠে দাঁড়ায়, ক্লান্ত পায়ে হেঁটে ঘর থেকে বেরিয়ে লিভিং রুমে যেতেই সে থ'ম'কে যায়।

দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে ইনায়া। মাথায় ওড়না দেয়া বৌদের মতো করে। প্রেরণা ইনায়াকে দেখা মাত্রই ভীষণ ক্ষে'পে যায়, ভদ্রতার সব সংজ্ঞা ভুলে গিয়ে চড়াও হয় মেয়েটার ওপর, সামনে দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে বলে,“এখানে কেনো এসেছো? গেট লস্ট!”

প্রিতম ইনায়াকে পা থেকে মাথা অবধি দেখে। মাত্র দুদিনে কিছুটা রোগা লাগছে ইনায়ার গোলগাল মুখটা। প্রিতম একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে।

প্রেরণা দ্বিতীয় বারের মতো খেকিয়ে ওঠে,“আই সেইড গেট লস্ট ইনায়া।”
ওসব যেনো কিছুই শুনতে পেলো না ইনায়া। ঘরের ভেতর ঢুকেই জরিয়ে ধরে প্রেরণাকে। অতঃপর হুহু করে কেঁদে ফেলে।

ইনায়ার এমন কান্ডে থতমত খেয়ে যায় প্রেরণা। নিজেকে সামলে নিয়ে পুনর্বার ধমকাতে চাইলো মেয়েটাকে। কেনো জানি পারলো না সে। একটা হাত নিজের অজান্তেই ইনায়ার মাথায় রাখলো। ইনায়া তখন বলতে লাগলো,“আপু আপনি দাদানকে বলেছেন আপনি প্রিতমকে ভুলিয়ে দেবেন আমাকে? আমাদের সম্পর্ক মানবেন না? আপু প্লিজ এমনটা করবেন না। প্লিজ আপু আপনি দাদানের সাথে কথা বলুন। আপনি আমার বড় বাবার সাথে কথা বলুন। আমি জানি ওনারা মানবে। আমাদের বিয়ে দিতে হবে না আপু। আমরা অপেক্ষা করবো। কিন্তু যেন আমাদের আলাদা না করা হয়। আপনি একটাবার আমার বড়বাবার কাছে যান আপু। বড়বাবা পাপার মতো রাগী নন। আপনি প্লিজ আমার পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের সাথে কথা বলুন। আমি আর হ্যাংলা হতে পারছি না আপু।”
কাঁদছে আর পাগলের মতো প্রলাপ বকছে ইনায়া। প্রিতম দূরে দাঁড়িয়ে শুধু দেখছিলো মেয়েটিকে। মেয়েটি সত্যিই ভীষণ বেহায়া, সবসময় প্রমাণ করে এসেছে।

লিভিং রুমে এসে দাঁড়ায় মিস জেনি আর প্রনমি। ইনায়াকে নিজের থেকে এবার আলাদা করলো প্রেরণা। দু'হাতে ইনায়ার চোখ মুছিয়ে দিয়ে নরম গলায় বললো,“আচ্ছা শান্ত হও। আগে বলো তুমি এখানে এলে কিভাবে?”

_পাপার সাথে ভার্সিটি গিয়েছিলাম। আজ আমার ভর্তি ক্যানসেল করতে এসেছে পাপা। পাপা আমাকে ভার্সিটি রেখে আমার ফুপাতো বোনকে নিয়ে কোথাও গিয়েছে। আমি এখানে এলাম ঠিকানা খুঁজে খুঁজে।

প্রেরণা অবাক,অস্ফুটে বললো,“মেয়ে তুমি বড্ড বোকা। এখন এটা নিয়ে কত বড় ঝামেলা হবে ভেবেছো?”

ইনায়া বলতে লাগলো,“আপনি প্লিজ বড় দাদানের সাথে কথা বলুন।”

_সে পরে দেখা যাবে। তুমি যাও। এক্ষুনি যাও বাড়িতে।

ইনায়া ভেজা দু'টো চোখে প্রিতমকে দেখলো। প্রিতমও তার দিকেই একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে।

প্রেরণা আবারও বললো,“কি হলো যাও! ঝামেলা হবে , ইনায়া তুমি কেন অবুঝপনা করছো?”

_আপু।
প্রিতম এবার মুখ খুললো। প্রেরণা ভাইয়ের দিকে তাকায়। প্রিতম ইনুর দিকে দৃষ্টি স্থির রেখে প্রেরণাকে বললো,“ওকে আমি পৌঁছে দিই?”

_অসম্ভব! পাগল হলি তুই?
প্রেরণা চেঁচিয়ে উঠলো। প্রিতম অনুরোধের সুরে বললো,“মাঝ রাস্তা পর্যন্ত! প্লিজ আপু!”

ভাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে খানিকটা মায়া লাগলো প্রেরণার। কিছুক্ষণ চুপ থেকে বললো,“নিউ মার্কেট পর্যন্ত। জলদি চলে আসবি!”

তারপর ইনায়ার গালে হাত রাখলো প্রেরণা,“বাড়িতে যাও। দেখছি কি করা যায়। পরিবেশ ঠান্ডা হোক।”

ঘরে ঢুকে নিজের ওয়ালেট আর ফোনটা নিয়ে প্রিতম বেড়িয়ে পরলো ইনায়াকে নিয়ে। একটা ক্যাব নিলো তারা।

নির্দিষ্ট গতিতে ছুটছে ক্যাব, দুজন পাশাপাশি বসে। ইনায়া মাথা নিচু করে আছে। প্রিতম ওকে দেখে একপেশে হাসলো। তারপর একটা সিগারেট ধরিয়ে নেয়। ইনায়া ভীষণ অবাক প্রিতমের এমন আচরণে। এভাবে সিগারেট খাওয়া প্রিতমের সাথে ঠিক যায়না। সিগারেটটা অর্ধেক শেষ করে প্রিতম ইনায়ার দিকে তাকালো। একহাতে টেনে ইনায়াকে নিজের কাছাকাছি এনে নরম গলায় বলতে লাগলো,“ইনু! তুমি আমাকে ছেড়ে থাকতে পারবে জান?”

আবারও মনে হাহাকার শুরু হয় ইনায়ার। দুপাশে মাথা ঝাঁকিয়ে জানিয়ে দেয় উত্তর। প্রিতম ফিচেল হাসলো। ক্যাব ড্রাইভারকে উপেক্ষা করেই ইনায়ার আরো কাছে গিয়ে তার কপালের একপাশে একটা আলতো চুমু খেয়ে খুবই নরম গলায়, আবদারের সুরে বলে,“আমায় বিয়ে করবে জান?”

_বিয়ে?
বিস্ময়ের সুর ইনায়ার গলায়। প্রিতম বলে,“হু। বিয়ে করবে এখন আমায়?”

ইনায়া বিমূঢ় চেয়ে রয়। বলে,“এখন?”

_হ্যা এখন জান। চলো বিয়েটা করে রাখি!

_কিন্তু প্রিতম আমার পরিবার?

_আর আমি? তাছাড়া এই বিয়ে গোপন থাকবে জান। তারপর তুমি আমেরিকায় গেলেও আমার কোনো ভয় থাকবে না।

ইনায়া চিন্তিত হয়ে পরলো, প্রিতমকে আজ অস্বাভাবিক লাগছে , ভীষণ জেদি লাগছে। সে বললো,“আমার ভয় করছে প্রিতম। পাপা মাম্মাকে ঠকানো হবে যে!”

_আর আমাকে ঠকিয়ে আমেরিকা চলে যাবে তুমি?

ইনায়া চুপ করে তাকিয়ে আছে প্রিতমের দিকে। প্রিতমের চোয়াল শক্ত হয়ে ওঠে হঠাৎ, গম্ভীর হয়ে বলে,“আজ আমাকে বিয়ে না করলে আমি ভাববো তুমি আমাকে ভালোবাসো না।”

_প্রিতম এমন পাগলামী কেন করছো তুমি!

_বিয়ে করবে না কি করবে না? আন্সার মি!

_প্রিতম!

_আন্সার মি!

ইনায়া নিশ্চুপ বসে আছে মাথা নিচু করে। প্রিতম ম্লান হাসলো। ফোনটা বের করে প্রথমেই কল লাগালো জামির নাম্বারে,ফোনটা রিসিভ হতেই বললো,“তোরা তিনজন নিউমার্কেট কাজী অফিসে আয়।”

ফোন কে'টে প্রিতম ইনায়ার দিকে তাকায়। ইনায়া কাঁপা কাঁপা গলায় বলে,“ভুল হচ্ছে প্রিতম।”

_আমাকে ভালোবাসাটা ভুল ছিলো না? এটাও বলো!

ইনায়া চুপ হয়ে যায়। প্রিতম মেয়েটিকে একহাতে আগলে ধরে চোখের পানি মুছিয়ে দিয়ে বলে,“বিয়ে টা হয়ে গেলে সব ঠিক হয়ে যাবে জান। দেখবে।”

ইনায়া আর ভাবতে পারছে না কিছু। প্রিতমের উতলাভাব তাকেও নরম করে দিচ্ছে। চোখ বুজে সে প্রিতমের কাঁধে মাথা রেখে বসে থাকে। প্রিতম মেয়েটির মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে জানালার বাইরে দৃষ্টি দেয়। ঠোঁটে তাঁর বিজয়ীর হাসি। কি যেন বলে ইরফান তাকে সবসময়? রাস্তার ছেলে,অওকাদ কি! আজ রাস্তার ছেলের অওকাদ দেখে বুক চাপড়াবে ইরফান মির্জা। প্রিতমের বৌ সন্ধ্যার আগে থাকবে প্রিতমের ঘরে। ইরফানের নাকের ডগা দিয়ে নিয়ে যাবে প্রিতম আজ ইরফানের বোনকে,বৌ বানিয়ে।

চলমান.....

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 28 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন