#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_২৯
#ইসরাত_ইতি
🚫কঠোর ভাবে প্রাপ্তমনস্কদের জন্য।
🚫শিক্ষা ও সাহিত্যের সাথে আমার এই কল্পিত ঘটনাগুলোর লিখিত শব্দগুলোর কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
আজ বহুদিন পরে মামা-ভাগ্নিতে শহরের ব্যস্ত রাস্তার পাশে আইসক্রিম স্টলের সামনে দাঁড়িয়ে আইসক্রিম খাচ্ছে। আজ শেহাও এসেছে ইনায়া-ইশমামের সাথে ইনায়ার ভার্সিটিতে।
শেহার উদ্দেশ্য ছিলো সম্পূর্ণ ভিন্ন। সে চায় ইশমামকে ইনায়া-প্রিতমের ব্যাপারে বোঝাতে, বাড়িতে সেরকমের সুযোগ নেই তাই এখানে এসেছে। শেহা তিন মামার আদরের ভাগ্নি,আর যাই হোক ওর মামারা ওকে কখনও বকবে না,ওর কথাটা বোঝার চেষ্টা করবে অন্তত। ভার্সিটিতে ইনুকে রেখে তাই মামাকে ধরে বেঁধে নিয়ে এসেছে আইসক্রিম খেতে।
ইশমাম চিন্তিত মুখে আইসক্রিম খেতে থাকে। শেহা সুযোগ বুঝে খুব সাহস করে বলে,“ছোটো মামা!”
ইশমাম কিছু মুহূর্ত চুপ থেকে জবাব দেয়,“ঐ ছেলেটির ব্যপারে বোঝাতে এলে আগেই বলছি মা, তোকে বকতে আমার ভীষণ খারাপ লাগবে!”
_মামা শোনো তো!
_না,শুনবো না। আইসক্রিম খাওয়া হয়ে গিয়েছে? চল ভার্সিটিতে। ওর ক্লাস শেষ বোধ হয়।
না শেহাকে কিছু বলতে দিলো,না বোঝাতে দিলো। ভাগ্নির হাত ধরে টানতে টানতে ভার্সিটিতে পৌঁছেই ইশমাম ইনায়ার ক্লাসমেটদের থেকে জানতে পারলো ইনায়া ঘন্টাখানেক আগেই বেরিয়েছে।
ইশমাম মির্জা কিছুক্ষণ থ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল চুপচাপ। শেহা দ্রুত নিজের ফোন বের করে ইনায়াকে কল দিতে যাবে তখনই ওর মাথায় এসেছে ইনায়ার সাথে কোনো ফোন নেই। একটা উটকো দুশ্চিন্তা মুহুর্তেই ওর মাথায় হানা দিলো। ঘা'ড় ঘুরিয়ে দেখলো ছোটোমামাকে। ইশমাম ততক্ষণে ধীর স্থির বলে ওঠে,“জলদি ইহানকে কল দে শেহা!”
____
নিউমার্কেট কাজী অফিসের বারান্দায় একটা বেঞ্চিতে চুপচাপ মাথা নিচু করে বসে আছে ইনায়া। তার বিমূঢ় দৃষ্টি তার হাতের নখে, মনে চলছিলো তখন দোলাচল। একবার মন বলছে এখান থেকে ছুটে চলে যেতে, আরেকবার প্রিতমের দিকে তাকালেই কোন অদৃশ্য বস্তু ইনায়াকে আটকে দিচ্ছে। যত ভয়াবহ তুফান চলছিল ওর মনে,বাইরে থেকে ওকে লাগছিল যারপরনাই শান্ত।
জামি, সাফওয়ান, শুভ হতবুদ্ধি হয়ে দেখছে প্রিতমকে। যে বারান্দার একপাশে দাঁড়িয়ে আরো একটা সিগারেট ধরিয়েছে ততক্ষণে। কাজী ভেতরে কাগজপত্র সব রেডি করেছে, ভেতরে আরো একটি বিয়ে সম্পন্ন হচ্ছে বলে তাদের অপেক্ষা করতে হচ্ছে কিছু সময়।
জামির মেজাজ বিগড়ে যাচ্ছে, এক ঝটকায় প্রিতমের হাত থেকে সিগারেট কে'ড়ে নিয়ে মেঝেতে ফেলে পা দিয়ে পিষে দিয়ে বলে,“হচ্ছে টা কি প্রিতম!”
_বিয়ে।
অবিচল কন্ঠে জবাব দেয়।
_আচ্ছা তুই এমন করছিস কেন একটু বলবি? তুই ইনায়াকে বলেছিস বিয়েটা গোপন থাকবে। অথচ তোর পরিকল্পনা ভয়ংকর। তুই ইনায়াকে ধোঁকা দিচ্ছিস একপ্রকার!
_এভ্রিথিং ইজ ফেয়ার ইন লাভ অ্যান্ড ওয়ার। শুনিস নি?
জামি প্রিতমের এমন খাপছাড়া আচরণে প্রচন্ড বিরক্ত হয়, উত্তেজিত না হয়ে ধীরে ধীরে বলে,“দেখ! ওকে নিব্বি বললেও আমরা এটা মানি ও একটা সরল মেয়ে, ওর মনটা খুব স্বচ্ছ। সম্পর্কের শুরুতেই তুই এমন শঠতা করবি ওর সাথে? বেচারি কষ্ট পাবে।”
_কষ্ট? এই চারদিনে যা কষ্ট পাওয়ার পেয়েছে খামোখা! আর পাবে না আই প্রমিজ। আমি পেতে দেবো না।
_ও ভীষণ রিয়াক্ট করবে প্রিতম।
_ওকে মানানোর উপায় আমার জানা আছে!
ওরা তিনবন্ধুই ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে প্রিতমের দিকে। প্রিতম ঘা'ড় ঘুরিয়ে একপলক দূরে বসে থাকা ইনুকে দেখলো। জামি বলে উঠলো,“তুই হয়তো ঠিক নেই প্রিতম,ইনায়ার প্রতি তোর ভালোবাসার থেকেও ইরফানের প্রতি প্রতিহিংসা কাজ করছে বেশি। তাই ভালোমন্দ বুঝছিস না।”
_তাই? তোরা আমার অনুভূতি এতো পড়ে ফেলেছিস?
ওরা চুপ হয়ে যায়। প্রিতম বলে,“যা করছি,যেভাবে করছি সবটা আমার ভালোবাসা পাওয়ার জন্য-ই করছি। অ্যান্ড ডোন্ট ট্রাই টু জাজ মাই ফিলিংস টুওয়ার্ডস ইনু! ওটা ততটাই স্বচ্ছ যতটা আমার বোনদের প্রতি আমার ভালবাসা স্বচ্ছ!”
ওরা তিনজন চুপ। প্রিতমের মুখ টা হঠাৎ কঠিন হয়ে যায়,দাতে দাঁত চেপে বলে,“ফাজলামির সীমা অতিক্রম করে দিয়েছে সবাই! শুধু আমার ক্লাস আর অওকাত নিয়ে কথা। আর কিছু ইংলিশ গালাগাল,বাপ মা তুলে। আজ এখানে আমার আর ইনুর বিয়ে হবে, ওদের ঐ অহংকার, ঔদ্ধত্য গুড়িয়ে আমি আমার বৌ নিয়ে যাবো।”
জামিরা তিনবন্ধুই আর কোনো কথা বাড়ায় না। প্রিতম চলে যায় ইনুর কাছে।
প্রিতম নির্দিষ্ট দূরত্বে যাওয়ার পরে জামি শুভ-সাফওয়ানকে বলে,“দেখলি কেমন উন্মাদ আচরণ করছে?”
শুভ বলে,“তো? আর কি করবে? কত ধৈর্য্য ধরবে? শান্ত মানুষ ক্ষে'পে গেলে সামলানো মুশকিল। অযথা ওকে ক্ষেপিয়েছে ইরফান। এখন বুঝুক।”
_তুই সাপোর্ট করছিস ওর এই পাগলামি? খু'না খু'নি হয়ে যাবে বুঝেছিস?
_বা'ল হবে! ছেলে মেয়ে প্রাপ্তবয়স্ক,একেবারে সবকটার নামে মামলা দেবে প্রিতম। আর তুই প্রিতমকে সাপোর্ট করতে না পারলে যা গিয়ে পরে ইরফানের গলা ধরে কাদিস। তবুও এখানে এখন ভ্যাজর ভ্যাজর করিস না।
সাফওয়ান বলে,“ঠিক বলেছিস শুভ। এ কদিন প্রিতমের ওপর দিয়ে কি গিয়েছে আমি জানি। পরিবারের ইমোশন, পরিবারের ফিলিংস, যত্তসব ছাতার মাথা। দু'জন মানুষ ভালো থাকতে চাইলেই এদের চুলকানি শুরু হয়ে যায়। এরা সন্তানদের ভালো চাইতে চাইতে তাদের ভালোই থাকতে দিতে চায়না। আমি প্রিতমের সাথে আছি। ইনায়া-প্রিতম দুজন দুজনের সাথে ভালো থাকবে। বাকি সব গোল্লায় যাক।”
_আর ইশমাম মির্জা?
_দু বছর পরে নাতি নাতনির “ওয়া ওয়া” শুনলে সব হ্যাডাম উবে যাবে সুন্দর আঙ্কেলের।
শুভ সাফওয়ান একসাথে হেসে ওঠে। জামি মলিন মুখে দূরে বসা ইনায়া প্রিতমকে দেখে। জেদের বসে তার বন্ধু নিজের জন্য কোনো নতুন বিপদ ডেকে আনছে কিনা তা নিয়ে তার ভীষণ দুশ্চিন্তা হচ্ছে।
প্রিতম গিয়ে ইনায়ার পাশে বসে ইনায়ার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। ইনায়া মাথা নিচু করে রেখেছে। প্রিতমকে দেখে নিচুস্বরে বলে,“প্রিতম খুব ভয় করছে আমার।”
প্রিতম হাসলো। ইনায়ার ওড়না টা মাথায় টেনে দিলো আলতো হাতে, নরম গলায় বললো,“একটা সাইন দেবে। তিনবার কবুল বলবে। ব্যস এটুকুই। ভয় কিসের পাগল!”
ইনায়ার মনে তবুও দোলাচল,অস্থির হয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলে,“আমি বরং যাই প্রিতম,আমাকে আজকের রাতটা ভাবতে দাও!”
হাত টেনে ধরলো প্রিতম। টেনে বসিয়ে দিলো পাশে। দু'হাতে ইনায়ার দু গাল আগলে ধরে বলে,“হেই ইনু! আমাকে ভালবাসার আগে তোমার ভাবা উচিত ছিলো না? এখন সম্পর্ককে হালাল বানানোর কথা আসাতে এতো কেনো ভাবতে চাইছো?”
ইনায়া চুপ হয়ে গেল মুহুর্তেই। কাজী ততক্ষণে ওদের ডেকে পাঠিয়েছে। নির্লিপ্ত ইনায়ার নরম তুলতুলে হাতটা আগলে ধরে প্রিতম উঠে দাঁড়ায়। ইনায়া সম্মোহিতের মতো চলে যাচ্ছিলো শুধু,মস্তিস্ক তার কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে।
পাঁচ লাখ মোহরানা ধার্য করে প্রিতম বিয়ে করতে চায় তার প্রেয়সীকে। ইনায়া কবুল বলার আগেও মলিন মুখে প্রিতমের দিকে চায়। প্রিতম নম্রস্বরে বলে,“দেরী করো না ইনু। বাড়ির সবাই দুশ্চিন্তা করছে তোমার জন্য!”
শুভ আর সাফওয়ান পাশ থেকে বলে চলেছে,“একটা সাইন ইনায়া। একটা সাইন। তারপর দু'জনেই নিশ্চিন্ত,কেউ আলাদা করতে পারবে না তোমাদের!”
ইনায়ার দিমাগ কিছুক্ষণের জন্য একপাক্ষিক ভাবলো, প্রিতমের হাসি হাসি মুখটাই দেখলো সে শুধু। অতঃপর আস্তে ধীরে কম্পিত স্বরে আওড়াল,“কবুল। কবুল। কবুল।”
নেপালে ব্যগ বিনিময়ের পরে, বাংলাদেশে ফিরে মন বিনিময়ের পরে নিউমার্কেট কাজী অফিসে রেজিস্ট্রেশন পেপারে সই বিনিময় পর্যন্ত এসে ওরা থামলো অবশেষে। হাত থেকে কলম ফেলে দিয়ে ইনায়া নির্জীব হয়ে বসে রইলো চুপচাপ। ততক্ষণে প্রিতমের কিছু মেয়ে বন্ধুরাও এসেছে। কাজী অফিস প্রিতমের বন্ধু বান্ধবীর উল্লাসে গমগম করছিলো।
শুধু ফ্যাকাশে মুখে বসে আছে ইনায়া। কাজীর টাকা পরিশোধ করে প্রিতম ওদের সবাইকে চুপ হয়ে যেতে বললো। সবাই চুপ হলো। তারপর পকেট থেকে ফোন বের করে ইনায়ার দিকে একপলক তাকাল,ইনায়া ঘুনাক্ষরেও আন্দাজ করতে পারেনি কি ঘটতে চলেছে। সে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে প্রিতমের হাতের দিকে। প্রিতম শান্ত ভঙ্গিতে ইরফানের নাম্বারটা ডায়াল করলো তার অন্য একটা নাম্বার থেকে। ওপাশ থেকে ইরফান ফোনটা রিসিভ করতেই প্রিতম অস্বাভাবিক শান্ত স্বরে বললো,“মেজো দাদান! আমি আপনার ভগ্নিপতি প্রিতম আহসান বলছি। দশমিনিট আগে ইনু আর আমি বিয়ে করেছি মেজো দাদান। এসে দোয়া করে যান! নিউমার্কেট কাজী অফিস।”
ইনায়া আঁতকে উঠে দাঁড়িয়ে পরলো। রুদ্ধশ্বাসে ছুটে এসে ছো মেরে প্রিতমের হাত থেকে ফোনটা নিয়ে চেঁ'চি'য়ে উঠলো,“কি করছো কি প্রিতম! তুমি কেন জানিয়েছো দাদানকে? বিয়েটা তো গোপন থাকার কথা ছিলো!”
সবাই অপ্রস্তুত হয়ে পরেছে ভীষণ। প্রিতম নিশ্চুপ চেয়ে আছে ইনায়ার চোখের দিকে। ইনায়া নিমিষেই নিস্তেজ হয়ে পরে, ক্ষীণ স্বরে বলে,“তুমি এটা কি করলে প্রিতম! কেনো করলে?”
____
প্রেরণাদের অ্যাপার্টমেন্টের গেটের ঠিক সামনে এসে লাল বিএমডব্লিউটার গতি শ্লথ হয়। স্বাদে আহ্লাদের ম্যানেজার সাব্বির আড়চোখে ড্রাইভিং সিটে বসা ইহান তাজওয়ার মির্জাকে দেখে একটা ফাঁকা ঢোক গিলে বলে,“ভাই এটাই। আটতলায়,ইউনিট ফোর।”
ইহান গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়ালো। সাব্বির নেমে দাঁড়িয়ে বললো,“ভাই। আমি এখন যাই! রেস্তোরাঁ ফাঁকা রেখে এসেছি।”
_আচ্ছা যাও।
বলেই ইহান লম্বা কদমে রোজ গার্ডেন অ্যাপার্টমেন্টের গ্রাউন্ড ফ্লোরের এলিভেটরের দিকে এগিয়ে গেলো।
প্রেরণা তখন রান্না সেরে সদ্য গোসল সেরেছে। শুদ্ধ খুব এক্সাইটেড,আজ মাম্মা সব তার পছন্দের ডিশ রান্না করেছে বলে।
তোয়ালে দিয়ে মাথা মুছতে মুছতে প্রেরণা ফোনটা হাতে তুলে নেয়,প্রিতম বড্ড দেরী করে ফেলেছে। ওকে ফোন দিতে গেলেই কলিং বেলের আওয়াজে প্রেরণা কলটা কেটে দেয়। ভেবেছে হয়তো প্রিতম এসেছে। দ্রুতপায়ে হেঁটে গিয়ে দরজার লুকিং গ্লাস না দেখে দরজা খুলে দিতেই চ'ম'কে ওঠে সে।
শুদ্ধু গুটিগুটি পায়ে এসে প্রনমির ঘরের দরজার পর্দা ধরে দাঁড়িয়ে উঁকি দেয় লিভিং রুমে।
ইহান তাকিয়ে আছে প্রেরণার দিকে। প্রেরণা ব্যস্ত হাতে আঁচল টেনে ডান কাঁধে তোলে,তার হাতে আধভেজা তোয়ালে।
হতবাক হয়ে বলে,“আপনি!”
_আপনাদের বাড়িতে ইনু এসেছিলো?
রাশভারী গম্ভীর আওয়াজ ইহানের।
প্রেরণা একটা ঢোক গিললো। ইহান নিরেট স্বরে আবারও শুধায়,“প্রিতম কোথায়?”
আমতা আমতা করছে প্রেরণা, অতঃপর একটু দম নিয়ে বললো,“শুনুন। ইনায়া এসেছিলো। প্রিতম ওকে আপনাদের বাড়িতে পৌঁছে দিতে গিয়েছে। চিন্তার কিছু নেই।”
ইহান কয়েক পল প্রেরণার বিব্রত মুখটার দিকে চেয়ে থেকে বলে,“আপনি আমার সাথে আসুন প্রেরণা। ওরা দুজন নিউমার্কেট কাজী অফিসে বিয়ে করে নিয়েছে।”
____
রেস্তোরাঁয় মুখোমুখি বসে আছে ইনশিরাহ আর সাঈম। গত কয়েকদিন যাবত ইনায়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ইনশিরাহ ডিপ্রেসড হয়ে পরেছে ভীষণ। সাঈমের সাথে সরাসরি কথা বলতে এসেছে সে। মেন্যু কার্ড হাতে নিয়ে সাঈম ফিচেল হেসে বললো,“আর কিছু অর্ডার করবো?”
_আমি খেতে আসিনি সাঈম।
_রেস্তোরায় গান শুনতে এসেছি তবে?
ইনশিরাহ সাঈমের মুখের দিকে তাকায়, শুকনো গলায় বলে,“সাঈম আমার মনে হয় এখন তোমার পাপার সাথে আমাদের ব্যাপারে কথা বলা উচিৎ! আমিও বলতে চলেছি পাপার সাথে।”
_তুমি বিয়ের জন্য প্রস্তুত?
সাথে সাথে সাঈম প্রশ্নটি করে।
ইনশিরাহ উপর নিচ মাথা ঝাঁকায়। সাঈম কিছুক্ষণ ইনশিরাহর দিকে তাকিয়ে থেকে বলে,“আচ্ছা বলবো কথা। তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রস্তুতি নেবো!”
ইনশিরাহ হাসার চেষ্টা করলো,হাসতে পারলো না। দিনকে দিন অগোছালো হয়ে যাচ্ছে সে। তার মনে হচ্ছে সে চোরাবালিতে ডুবে যাচ্ছে। সাঈম ওর একটা হাতের ওপর হাত রাখতেই ইনশিরাহ হাতটা সরিয়ে নেয়।
পাশ থেকে কেউ বলে ওঠে,“ইশি না?”
ইনশিরাহ তড়াক করে লাফিয়ে উঠে ডানে দেখলো। আপন দাঁড়িয়ে আছে,ইহান তাজওয়ারের ডান হাত।
মাস্কের নিচে শুকনো মুখটা আরো শুকিয়ে যায় ওর। আপন আবারও বলে,“তুমি ইশি না?”
আপন ইনশিরাহ আর সাঈমকে অবাক হয়ে দেখছিলো। ইনশিরাহ অপ্রস্তুতের মতো বলে,“নাহ,আমি পুর্ণা!”
দাঁড়াল না ইনশিরাহ। সাঈমকে কিছু না বলে ছুটতে ছুটতে বেড়িয়ে যায় রেস্তোরাঁ থেকে। আপন বিব্রত হয়ে চলে যায় সেখান থেকে। আর সাঈম বসে থাকে চুপচাপ।
____
ব্যস্ত হাতে পার্সের জিপার খুলে ফোন আর কার্ড দু'টো পার্সে ভরে নেয় প্রেরণা। মেজাজ তু'ঙ্গে তার,অথচ হাবভাব শান্ত। তাড়াহুড়ো করলেও কাজগুলো করছে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে।
ইহান প্রেরণাদের লিভিং রুমের সোফাতে থমথমে মুখ নিয়ে বসে আছে। অপেক্ষা করছে প্রেরণার জন্য। শুদ্ধ বেশ কিছুক্ষণ পর্দা ধরে দাঁড়িয়ে থেকে গুটি গুটি পায়ে বেড়িয়ে আসে। অবাক চোখে সাদা রঙের পাঞ্জাবি পরিহিত লম্বা মানুষটিকে দেখছে সে। চুপচাপ শান্ত বাচ্চা হলেও শুদ্ধ স্বভাবত কৌতুহলী। নতুন কাউকে সে খুব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পর্যবেক্ষণ করে। তার হাত একটি খেলনা রোবট পুলিশ। যেটি সচল ছিলো,হঠাৎ সেটি থেকে যান্ত্রিক স্বর বলে ওঠে,“ডোন্ট মুভ! ইউ আর আন্ডার অ্যারেস্ট।”
ইহান মাথা তুলে সামনে তাকাল তৎক্ষণাৎ। শুদ্ধ ঠিক তার চোখের সামনে,কয়েক গজ দূরেই দাঁড়িয়ে আছে। ইহান একদৃষ্টে বাচ্চাটার চোখের দিকে তাকিয়ে আছে। এই প্রথম ছেলেটিকে কাছ থেকে দেখছে সে। চোখ দু'টো একেবারে মায়ের মতো নীল। সমুদ্রসম নীল। তবে চেহারার গঠন ইহানের কাছে খুব পরিচিত লাগছে। কেমন অদ্ভুত ভাবে বাচ্চাটাকে তার খুবই মায়া মায়া লাগছে। তার ভ্রু যুগল গুটিয়ে যায় খানিক, চোখে মুখে অদম্য বিস্ময়,কি যেন একটা রয়েছে শিশুটির মুখমন্ডলে। কিছু মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে ইহান ডান হাত সামান্য তুলে অস্ফুটে বলে,“হ্যালো!”
শুদ্ধ খুবই ডিসিপ্লিনড। সেও তৎক্ষণাৎ হাত তুলে রোবটিক ভঙ্গিতে বলে,“হ্যালো!”
_হোয়্যাটস ইয়র নেম বাচ্চা!
_মাই নেম ইজ শুদ্ধ ইবনে ওয়া......
প্রেরণা এসে দাড়িয়ে ব্যস্ত ভঙ্গিতে বলতে লাগলো,“শুদ্ধ! বাবা ভাত খেয়ে নিও মিস জেনির হাতে,মাম্মা যাবে আর আসবে।”
প্রনমি ততক্ষণে ঘর থেকে বেরোয় ছড়ি হাতে, উদ্বিগ্নতার সাথে বলতে থাকে,“কি হয়েছে আপু! বলবে তো?”
_এসে বলবো। তুই ঘরে যা।
ইহান উঠে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ দেখলো প্রনমিকেও। ভদ্রমহিলার একটা অন্ধ বোন আছে সেটি অবশ্য সে জানতো না। প্রিতমের থেকে শোনেনি। বিমূঢ় হয়ে কিছুক্ষণ প্রনমিকে দেখে প্রেরণার দিকে তাকায় সে। প্রেরণা তাড়াহুড়ো লাগিয়ে বলে,“চলুন।”
গাড়িতে দু'জনেই চুপচাপ,খানিক বাদে প্রেরণা নীরবতা ভেঙে বলে,“আপনি ওখানে যাননি কেন। আটকাতে পারতেন ওদের!”
ইহান শান্ত স্বরে বলে,“বিয়েটা হয়ে গিয়েছে। প্রিতম ইরফানকে ফোন দিয়েছে। আপনাকে প্রয়োজন এখন,গিয়ে ভাইকে বোঝাবেন। আমি ওর গাঁয়ে হাত তুলতে চাচ্ছি না।”
প্রেরণা চকিতে ফিরে চায় ইহানের দিকে। ইহান স্বাভাবিক ভাবে ড্রাইভ করছে।
মুখ ঘুরিয়ে প্রেরণা দৃষ্টি জানালার বাইরে রাখে, অতঃপর নিয়ে নেয় তাৎক্ষণিকভাবে একটা সিদ্ধান্ত। তাকে মাথা ঠান্ডা করে পরিস্থিতি সামলাতে হবে। নিজের রাগ অভিমান পাশে সরিয়ে রেখে যা করার করতে হবে। এমন টালমাটাল অবস্থায় মেজাজ হারালে চলবে না।
____
নিউমার্কেট কাজী অফিস রোডে জ্যাম লেগে গিয়েছে মির্জা বাড়ির গাড়িতে। গাড়ি থেকে নেমে রুদ্ধশ্বাসে কাজী অফিসের দিকে হেঁটে চলেছে ইশমাম,শেহা,সামিন, ইলহাম। ঠিক তখনই ইরফান এসে পৌঁছেছে সেখানে। বাইক থামিয়ে বাবা-চাচাদের পাত্তা না দিয়ে একপ্রকার দৌড়ে যায় কাজী অফিসের দিকে।
কাজী বিব্রত হয়ে বসে আছে। তার আর কিইবা করার থাকবে!
ইনায়া মেঝেতে বসে দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে কাঁদছে, নিশ্চুপ কাঁদছে। ওর দু'পাশে বসে প্রিতমের দুজন মেয়ে বন্ধু ওকে শান্ত করার চেষ্টা করছে। শান্ত হতে পারছে না ইনায়া।
প্রিতম গিয়ে হাঁটু গেঁড়ে ওর মুখোমুখি বসে ইনায়ার হাত দু'টো নিজের মুঠোর মধ্যে আগলে নেয়। ইনায়া তাকায় না প্রিতমের দিকে। প্রিতম ক্ষীণ স্বরে ডাকে,“ইনু! পাগলামী তো তুমিও কত করেছো আমাকে পেতে, করোনি? আজ আমি একটু করলাম তোমায় পেতে! খুব বড় অন্যায় তো করিনি তাই না?”
ইনায়া নাক টানে, দৃষ্টি ঘুরিয়ে প্রিতমের দিকে রেখে কাঁদতে কাঁদতে বলে,“পাগলামি? এটা তোমার জেদ নয় তা কিভাবে বুঝবো? তোমার ছটফটানি দেখে ভেবেছি আমাকে হারানোর ভয় তোমাকে জেঁকে বসেছে, বিয়েটা হয়ে থাকলে তুমি নিশ্চিন্ত থাকবে তাই রাজি হয়েছি। কিন্তু এখন আমি গোটা ব্যপারটায় অন্য ইঙ্গিত পাচ্ছি প্রিতম! বলো না,সত্যিই কি জেদ করলে?”
প্রিতম চুপচাপ দেখছিলো ওকে। বাকিরা সবাই ঠাঁয় দাঁড়িয়ে। আচমকা কাজী অফিসের মেইন গেট ভারী হয়ে ওঠে একাধিক লোকের পদধ্বনিতে।
সবার প্রথমেই ইরফান ঢুকলো কাজী অফিসে, তার পেছনে ক্রমান্বয়ে ঢুকলো ইশমাম,সামিন, ইলহাম আর শেহা।
পাপাকে দেখে উঠে দাঁড়িয়ে যায় ইনায়া। তার শরীর কাঁপছে।
ইশমাম এসে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে মেয়ের মুখের দিকে বোকার মতো তাকিয়ে আছে।
শুরুটা হয় ইরফানের হাতে। শুরুতেই গিয়ে সবার সামনে ইনায়াকে স্বশব্দে এক চ'ড় মারতেই ইনায়া ভারী শরীরটা নিয়ে একটা কাঠের চেয়ারে পরে যায়। ওকে প্রিতম ধরে উঠিয়ে নিজের সাথে মিশিয়ে নিলো, প্রিতমকে ইরফান কিছুই বলে না,না ওর দিকে তাকায়। ওকে তো ইরফান পরে দেখবে।
অগ্নিমূর্তি ধারণ করে সে তাকায় কাজীর দিকে। বৃদ্ধ কাজী ইরফানের অমন দৃষ্টি দেখে কাঁপতে শুরু করে দেয়। একটা ঢোক গিলে ফেলার আগেই ইরফান দু কদম কাজীর দিকে এগিয়ে গিয়ে চেঁচিয়ে ওঠে,“বুইড়া কাজী! এটা কি করেছেন! কাগজ দিন, ওদের বিয়ের কাগজ দিন নয়তো...”
কাজী বুঝতে পারছেনা এখানে তার দোষ কোথায়? সামিন এক ধ'ম'কে ইরফানকে থামতে বলে প্রিতমের পা থেকে মাথা পর্যন্ত দেখে। দেখে ইনায়াকেও। অতঃপর ইনায়াকে বলে,“ছোটো আম্মা! কিভাবে পারলে তুমি এটা?”
ইনায়া কাঁদছে,প্রিতমের থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে দুকদম এগিয়ে এসে বড় বাবাকে বলে,“বড় বাবা আমার কথা শোনো,আমি...!”
ইশমাম তখন ধপ করে একটা চেয়ারে বসে পরে। চমকে ওঠে ইনায়া।
কাজী অফিসের ঠিক সামনে এসে থামে ইনশিরাহর গোলাপী স্কুটি। রেস্তোরাঁ থেকে বেড়িয়েই বড় দাদানের ফোন পেয়ে ছুটতে ছুটতে এসেছে। কাজী অফিসের ভেতরে গিয়ে পরিস্থিতি দেখে সে হতবুদ্ধি হয়ে দাঁড়িয়ে যায়। দৃষ্টি ঘুরিয়ে প্রত্যেককে দেখছে সে।
গাড়ি থেকে নেমে প্রেরণা ছুটে যায় অফিসের ভেতরে। তার পিছু পিছু ইহান।
কাজীর রুমে ঢোকার আগে প্রেরণা দম নিয়ে নেয়। তারপর হুরমুর করে ঢুকে শুরুতেই সবার মুখের দিকে একপলক করে তাকায়।
ইহান গিয়ে প্রিতমের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বলে,“বড্ড বাড়াবাড়ি করে ফেললে প্রিতম!”
প্রিতম ইহানকে কিছু না বলে ইশমামের দিকে এগিয়ে যায়, নিচুস্বরে বলে,“দোয়া করুন বাবা। আমার বৌকে আমি বাড়িতে নিয়ে যেতে চাই।”
তখনই প্রিতমের কলার চেপে ধরলো ইরফান, খেকিয়ে উঠে বললো,“কাউকে নিতে পারবি না তুই। এই বিয়ে কেউ মানি না আমরা কুত্তা।”
প্রিতম ম্লান হাসলো, ইরফানের হাত থেকে নিজের কলার ছাড়িয়ে নিয়ে ইরফানের কাঁধে হাত রেখে শান্ত স্বরে বললো,“আমি আর ইনু মানি।”
ইশমাম উঠে দাঁড়ায়, বজ্রকণ্ঠে বলে,“তুমি আমার মেয়ের ব্রেইন ওয়াশ করেছো স্কাউন্ড্রেল!”
প্রিতম ঘুরে ইনায়ার দিকে তাকায়,নরম গলায় শুধায়,“ইনু, ওনাদের বলো,আমি তোমার ব্রেইন ওয়াশ করেছি?”
ইনায়া অসহায়ের মতো একপলক পাপাকে দেখে, একপলক প্রিতমকে। তারপর কিছু না বলে মাথা নিচু করে নেয়। শেহা আর ইনশিরাহ গিয়ে ওকে ধরলো দুপাশ থেকে।
ইহান বোনের নির্লিপ্ততা দেখে প্রেরণার দিকে তাকিয়ে বলে,“আপনার ভাইকে বোঝান। আমার বোনের সারা জীবনের প্রশ্ন। ছেলেখেলা নয় এটা।”
_ছেলেখেলা করিনি। ভালোবেসেছি,বিয়ে করেছি!
ইহানের মুখের ওপর বলে দেয় প্রিতম।
প্রেরণা ভাইয়ের কাছে এগিয়ে যায়, ভাইকে সে পরে দেখে নেবে। তবে এতো গুলো লোকের হাত থেকে ভাইকে বাঁচাতে হবে। ঝোঁকের মাথায় একটা ভুল করেছে। ওর মাথার ওপর প্রেরণা ছাড়া কেউ নেই,ভাইয়ের প্রতি অভিমান জমলেও সেটা দেখানোর অনেক সময় পাবে প্রেরণা।
সে ঘুরে সামিন, ইশমাম,ইহান,ইলহামের দিকে তাকিয়ে ধীরস্থির বলতে শুরু করে,“দেখুন এটা ওরা ভুল করেছে। তবে এখন আমাদের মনে হচ্ছে ঠান্ডা মাথায় বসে আলোচনা করা উচিত।”
_কিসের আলোচনা? আপনার ভাইকে আমি কো'পাবো এখন! তারপর ওর লাশের সাথে বসে বসে আলোচনা করবেন আপনি একা একা!
প্রেরণা শিউরে ওঠে ইরফান কথায়। ইরফান এলোমেলো দৃষ্টিতে আশেপাশে দেখে একটা চেয়ার তুলে হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে প্রিতমকে মারতেই যাবে,প্রেরণা ভাইকে আড়াল করে নেয় তখন। আর ইরফানকে ফেরায় ইহান। বেশ বেগ পেতে হয়েছে ইরফানকে নিয়ন্ত্রণে আনতে তার। ইলহাম আর সামিনের ধ'ম'ক খেয়ে থেমেছে। তবে ফুঁসছে সে ক্ষ্যাপা বাঘটার মতো।
ইহান এবার প্রিতমকে সরাসরি বলে দেয়,“বিয়েটাকে ছেলে খেলা করে ছাড়লে তুমি। তোমার কাছে কোন বিশ্বাসে বোন দেবো? বাড়িতে যাও। আমি আমার বোনকে নিয়ে যাচ্ছি।”
_কেন? আমার বৌ আমার বাড়িতে যাবে!
_এটা ঝোঁকের বশে বিয়ে। আমাদের ভাবতে হবে।
ইহান স্পষ্ট বলে দেয়।
ইরফান আবারও গিয়ে কলার চেপে ধরতে চায় প্রিতমের। প্রেরণা চেঁ'চি'য়ে উঠে সামিনকে বলে,“আচ্ছা এখানে আপনারা কিভাবে এই ষাঁড়টাকে এসব করতে এলাউ করছেন? আমরা তো ঠান্ডা মাথায় কথা বলতেই পারি তাই না?”
ইরফান ক্ষে'পে যায় প্রেরণার ওপর, চেঁচিয়ে ওঠে,“জ্ঞানী সম্মানীয় আপা ! ভাইকে আমার বোনের পেছনে লেলিয়ে দিয়ে এখন এখানে জ্ঞান বিতরণ করতে এসেছেন?”
সামিন ধ'ম'কায় ইরফানকে। ইরফান তবুও বলতে থাকে,“এই বিয়ে মানি না। মামলা ঠুকবো ঐ কুত্তার নামে,আমার বোনকে জিম্মি করে বিয়ে করেছে,ভুয়া বিয়ে। ছোটো বাবা চলো এসপি অফিসে। এক্ষুনি।”
প্রেরণা ম্লান হাসলো, ইহান ইরফান,এমনকি প্রত্যেকের মুখের দিকেই তাকিয়ে বললো,“তবে তাই হোক! চলুন এসপি অফিসে।”
চলমান......