ফন্ট সাইজ:
থিম:
বধূ কোন আলো লাগল চোখে ২

পর্ব 30

লেখক: ইসরাত ইতি

#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_৩০ [ ১ম অংশ ]
#ইসরাত_ইতি

🚫কঠোর ভাবে প্রাপ্তমনস্কদের জন্য।

🚫শিক্ষা ও সাহিত্যের সাথে আমার এই কল্পিত ঘটনাগুলোর লিখিত শব্দগুলোর কোনো সম্পৃক্ততা নেই।

[ ১ম অংশ ]

এসপি মুঈন ফরাজী বিয়ের কাগজ দেখছে।
তার কক্ষের ভেতরে রয়েছে মির্জা ফ্যামিলি এবং আহসান ফ্যামিলি,রয়েছে প্রিতমের বন্ধু বান্ধবীরা।

সামিন,ইহান, ইলহাম প্রত্যেকেই খুব ভালো করে জানে এসপি অফিসে কিছুই হবে না,তবুও ইশমাম আর ইরফানের জেদের কাছে হার মেনে অযথা এখানে আসতে হয়েছে।
কাজী সাহেবকেও সাথে করে নিয়ে এসেছে তারা। বৃদ্ধ কাজী কক্ষের এক কোণে একটি চেয়ারে বসে আছে লটকানো মুখটা নিয়ে।
আজ থেকে বহু বছর আগে তার বাবা ঐ মির্জা বাড়ির বড় ছেলে ইয়াসার মির্জার জোরপূর্বক বিয়ের কাজী ছিলেন,বাবার থেকে সেই বিয়ের লোমহর্ষক গল্প বহুবার শুনেছে। আজ সে ঐ বাড়ির মেয়ের এমন অদ্ভুত বিয়ের কাজী হলো। এদের বাড়িতে কি স্বাভাবিক বিয়ে হয়না?

ইনায়াকে তখনও ইনশিরাহ আর শেহা দুপাশ থেকে ধরে রেখেছে শক্ত করে,মেয়েটা কেমন নিস্তেজ হয়ে পরেছে। ইশমামও পাশেই একটা চেয়ারে মলিন মুখ করে বসে আছে।

ইলহাম মির্জা তার ভাতিজিকে বলে,“মা একটিবার তোর পাপার মুখটাও তোর চোখের সামনে ভেসে উঠলো না এমন একটা কান্ড ঘটানোর আগে?”

ইনায়া কোনো জবাব দেয়না। কিন্তু প্রেরণা বলে ওঠে,“আচ্ছা আংকেল ওকে কেন এভাবে কোনঠাসা করছেন সবাই? ও বিয়ে করেছে বলে ও ওর পাপাকে ভালোবাসে না এটা একটা হাস্যকর কথা বলছেন না বারবার? আর বারবার বলছেন দুদিনের ভালোবাসার কথা। “দুদিনের ভালোবাসা” শব্দটি বলে এভাবে জাজ করছেন কেন ওর অনুভূতি? আপনাদের জীবনে প্রেম ভালোবাসা আসেনি বলে বাকিদের টা এভাবে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে দেখার কি আছে? মানছি একটা ভুল করেছে ওরা, সবসময় যে মানুষকে বিবেক দিয়েই ভাবতে হবে এমন তো নয়! অনেক টালমাটাল পরিস্থিতিতে ছিলো দু'জন, ভালোবাসার মানুষকে পাওয়া না পাওয়ার অনিশ্চয়তায় করে ফেলেছে ভুলটা। মনস্তাত্ত্বিক ত্রুটি বিচ্যুতি তো হতেই পারে তাই না? এভাবে ভিক্টিম ব্লেমিং বন্ধ করুণ, সবসময় যদি বাস্তবিক জ্ঞান আর বুঝ কাজ করতো নিজেকে সামলানোর জন্য তবে এদেশে এতো সাইক্রিয়াটিস্টের প্রয়োজন পরতো না। যেটা আপনাদের কাছে দুদিনের ভালোবাসা সেটার জন্য মানুষ গলায় ফাঁস নেয় কখনো কখনো,দেখেন না? বিষয়টাকে জাজমেন্টাল হয়ে না ভেবে ইনায়ার প্রতি সংবেদনশীল হোন। ও কাউকে খু'ন করেনি।”

চুপ হয়ে যায় ইলহাম। ইহান তাকিয়ে আছে প্রেরণার চোখের দিকে।

ইরফান তখন চেঁ'চি'য়ে ওঠে,“ওরে এই বিশিষ্ট জ্ঞানী আপাকে কেউ চুপ করাও রে!”
পরপর প্রেরণার দিকে ফিরে বলে,“এই ,আপনি এখান থেকে ফুটুন তো! ফুটুন বলছি! ”

_কেন? এটা তোমার শশুর বাড়ী যে তোমার কথায় আমাকে এখান থেকে ফুটতে হবে? বেশি অসুবিধা হলে বলো,সেদিন আমার ভাইকে মারার জন্য কেস ফাইল করে এটাকে তোমার শশুর বাড়ীই বানিয়ে দিয়ে যাই! ছয় মাসের জন্য এই শশুর বাড়িতে থাকতে পারবে।

দাঁতে দাঁত চেপে ইরফানকে বললো প্রেরণা।

মুঈন কাগজপত্র থেকে চোখ সরিয়ে কপাল কুঁ'চ'কে সবার মুখের দিকে তাকায়। অতঃপর গম্ভীর গলায় বলে ওঠে,“হচ্ছে টা কি এখানে! সবাই শান্ত হয়ে বসুন!”

কাগজ গুলো হাত থেকে রেখে মুঈন সামিনের দিকে তাকায়, গম্ভীর হয়েই বলে,“আইনত বিয়ে তো হয়েছে! তা আপনারা এখানে কেন এসেছেন? আমি কি ওদের বিয়ের অনুষ্ঠান করবো?”

কথাটা মুঈন গম্ভীর কন্ঠে বললেও প্রিতমের বন্ধু বান্ধবীরা হাসিতে ফেটে পরে। মুঈন ওদের দিকে রাগী চোখে তাকালে সবাই দমে যায়।

ইশমাম বলে ওঠে,“ওই ছেলেটা আমার মেয়েকে ফুঁসলিয়ে বিয়ে করেছে। ওর নামে কেস ঠুকবো আমি!”

মুঈন ইশমামের দিকে কিছু সময় চেয়ে থেকে বলে,“স্যরি , ২০ বছরের একটা মেয়েকে ফুঁসলিয়ে বিয়ে করার শাস্তি হিসেবে কোনো আইন প্রনয়ন হয়নি এখন অবধি। আপনার মেয়ে প্রাপ্তবয়স্ক। জোরপূর্বক বিয়ে করলে আইন আপনাদের সাহায্য করতো।”

তারপর মুঈন ইনায়ার দিকে তাকিয়ে জানতে চায়,“তোমাকে জোর করেছে কোনপ্রকার?”

ইনায়ার দু'চোখে পানি। মাথা নিচু করে ডানে বামে মাথা নে'ড়ে উত্তর দেয়,“নাহ।”

ইরফান ইনায়ার থেকে তার রক্তচক্ষুর দৃষ্টি ঘুরিয়ে এবার কাজীর দিকে ঘুরে দাঁড়ায়, দাঁত কিড়মিড় করে বলে,“এই বুড়ো কাজী, হাজী, পাজী! বাবার অনুমতি ব্যতীত যে বিয়ে বাতিল হয় তা জানেন না? আপনি কি বিয়ে পড়িয়েছেন ওদের? এই বিয়ে অবৈধ কাজীর বাচ্চা!”

সামিন এক ধ'ম'কে থামিয়ে দেয় ইরফানকে। ইলহাম আর ইহানও ধ'ম'কে ওঠে।

প্রেরণা তখন চেঁচিয়ে বলে ওঠে,“বাহ! তুমি তো অনেকে হাদিস জানো দেখছি মাওলানা ইরফান মির্জা!”

সবার দৃষ্টি যায় প্রেরণার মুখের দিকে। প্রেরণা বলতে থাকে,“ওদের বিয়েতে শরীয়তের দৃষ্টিতে কিছু অসঙ্গতি থেকে গিয়েছে শুধু,বিয়েটা মিথ্যা হয়ে যায়নি। আর এই অসঙ্গতিটুকু এখানেই দূর হবে। আবার বিয়ে হবে।”

_এখানে তালাক হবে।
ইরফানও নাছোড়বান্দা।

কাজী সাহেব তখন বলতে লাগলেন,“অভিভাবককের থেকে মাফ চেয়ে নতুন জীবন শুরু করুক বর বৌ।এর প্রতিকার হিসেবে তালাকের মতো দুর্ঘটনা ঘটলে তা হবে আরেকটি অন্যায়।

অবশ্য যদি ‘কুফু’ (সমতা) রক্ষা না হয় বা অভিভাবক মারাত্মক কোনো সমস্যা দেখেন, তাহলে তারা সন্তানকে বিবাহবিচ্ছেদের কথা বলার অধিকার রাখে। এক্ষেত্রে যদি তারা তালাকের কথা বলে, তাহলে দেখতে হবে, তাদের কথা সঠিক ও যুক্তিসংগত কি না?

যদি অভিভাবকের কথা সঠিক ও যুক্তিসংগত হয় এবং সে কারণে তালাক ছাড়া আর কোনো পথ বাকি না থাকে, পাশাপাশি যদি তালাক দেওয়ার দ্বারা তার ব্যভিচারে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা না থাকে, তাহলে মা-বাবার সন্তুষ্টির জন্য তালাক দেওয়া যাবে।

পক্ষান্তরে তালাকের কারণ যদি যৌক্তিক না হয়, তাহলে তালাক দেওয়া জায়েজ হবে না। এখন আপনারা কুফু বা সমতা বিবেচনা করুন। হটকারী হবেন না!”

কাজীর কথা সবাই মন দিয়ে শুনলো। প্রেরণা বলে,“আমার ভাই চরিত্রবান, উপার্জন করে,দেখতে শুনতে ভালো। বৌয়ের অধিকার যথাযথ ভাবে রক্ষা করবে। সমতা বজায় আছে।”

_সমতা? আমার মেয়ের পড়াশোনা, লাইফস্টাইল, প্রত্যেক সেমিস্টারের চার লাখ টাকা করে জমা দিতে হয় ভার্সিটিতে, ভেবে বলছো তো? পারবে তোমার সুদর্শন ভাই?

ইশমাম গম্ভীর হয়ে বলে প্রেরণাকে। প্রেরণা ম্লান হেসে বললো,“ঠিক পারবে।”

_কিভাবে পারবে?

_যেভাবে পারুক। শুধু শশুরবাড়িতে হাত না পাতলেই তো হবে তাই না?

প্রেরণা ঘুরে সামিনের দিকে তাকায়, নম্রস্বরে বলে,“আঙ্কেল ! আপনার কথা অনেক শুনেছি। আপনি সবথেকে প্রবীণ মানুষ। আশা করছি একজন সুবিবেচকও। বলুন,ছেলেমেয়েদুটো ভুল করেছে বলে ওদের সাথে আরেকটা অন্যায় করবো এখন? শুধু আমাদের মনের জ্বলন কমানোর জন্য? ভেবে বলুন আঙ্কেল।”

সামিন সবার মুখের দিকে এক এক করে তাকায়। ভীষণ দ্বিধায় পরেছে সে। তখনই মুঈন বলে ওঠে,“বিয়েটা মেনে নিয়ে দু পক্ষ সমঝোতায় চলে যান। এটা নিয়ে বাড়াবাড়ি করে আমার মনে হয়না এগোতে পারবেন। কারণ আইনের মাধ্যমে আপনারা কোনো সুরাহা পাচ্ছেন না আ'ম স্যরি!”

ইহান প্রেরণার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর কন্ঠে বলে,“আমার বোনকে আপাতত বাড়িতে নিয়ে যাই। আমরা দু'পক্ষের লোক বসে বরং আজ সন্ধ্যার পরে আলোচনা করি প্রেরণা।”

_আপনাদের ভাবাভাবির কাঁথা পুড়ি! যা সিদ্ধান্ত হবে এখানেই হবে। আপনারা এই মেয়েটিকে বাড়িতে নিয়ে টর্চার করবেননা না তার গ্যারান্টি কি?
উঁচু গলায় বলে ওঠে সে।

ইহান ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে। শহরের একজন ক্ষমতাশালী পলিটিশিয়ানকে কথায় কথায় দমিয়ে দিচ্ছে ভদ্রমহিলা‌। অবাক সে নিজেকে দেখে!

সামিন ততক্ষণে নীরবতা ভেঙে বলে,“বিয়ে হবে আবারও। এখানে কাজী আবারও বিয়ে পরাবে।”

ইশমাম ভাইয়ের কথায় চুপ করে বসে পরে বেঞ্চিতে। ইরফান রক্তচক্ষু দিয়ে দেখলো বড় বাবাকে,হাত দু'টো মুষ্টিবদ্ধ করলো সে।

বিয়ে পড়ানো হলো আবারও, ইনায়া আর প্রিতম আবারও কবুল বললো। ইনায়া এবার কবুল বলেছে রোবটের মত। কাজী হেসে সামিনকে বলে,“ আসুন আমরা ওদের জন্য দোয়া করি।”

হৈ হৈ করে ওঠে প্রিতমের বন্ধুবান্ধব। প্রিতম হাসলো বিশ্বজয়ের হাসি। ঘা'ড় ঘুরিয়ে ইনায়াকে দেখলো সে, ইনায়া মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে।
তার দুপাশে দাঁড়িয়ে আছে শেহা, ইনশিরাহ।

ইরফান তেলে বেগুনে জ্বলছে। হাত নিশপিশ করছে তার। চেঁচালো ইশমামের ওপর,“ছোটো বাবা তোমার মেয়েকে ওর সাথে সত্যিই বিয়ে দেবে?”

ইশমাম একটা কথাও বললো না আর। হাত মুষ্টিবদ্ধ করে ইরফান দেয়ালে সজোরে এক ঘু'ষি বসিয়ে দিয়ে সামিন আর ইহানকে বললো,“পস্তাবে। বহুত পস্তাবে। আমার আদরের বোনটাকে খালে ভাসিয়ে দিয়েছো না? পস্তাবে তোমরা!”

তারপর সবাইকে হতবাক করে দিয়ে ইরফান মুঈনের কেবিনের দরজায় একটা লাত্থি বসিয়ে গটগট করে পুলিশ সুপারের কার্যালয় থেকে বেরিয়ে যায়।

ওরা সবাই হতবাক হয়ে দেখলো ইরফান মির্জার প্রস্থান। ইলহাম মুঈনকে বললো,“ও একটু অমন।”

মুঈন বলে,“ঠিকাছে,আপনারা আপনাদের কাজ শেষ করুন।”

এখন দোয়াপাঠ হবে। প্রিতমের বন্ধুরা গোপনে ফোনের ক্যামেরা অন করে রাখলো প্রমাণ রেখে দিতে। যাতে মির্জা বাড়ির বড়লোক গুলো আর অস্বীকার না করতে পারে এ বিয়ে।

পরিস্থিতি যথেষ্ট শান্ত এখন। কাজী নতুন বর বৌয়ের উদ্দেশ্য দোয়াপাঠ করতে শুরু করলেন। প্রেরণা গিয়ে ইনায়ার মাথায় তার ওড়না তুলে দিলো। নিজেও আঁচল টেনে ঘোমটা দিয়ে মোনাজাত ধরলো। শেহাও মাথায় ওড়না টানলো, ওখানে উপস্থিত মেয়েগুলো একপাশে দাঁড়িয়ে ।
শুধু ইনশিরাহ মাথায় ঘোমটা দিতে পারলো না, সে শার্ট প্যান্ট পরে আছে, ঘোমটা কিভাবে দেবে? সবার দিকে তাকিয়ে আছে বোকার মতো। মাথা ঢাকবে কি করে বুঝতে পারছে না। তারপর শেহাকে ফিসফিসিয়ে বললো,“তোর ওড়নার অর্ধেকটা আমি মাথায় রাখি?”

শেহা হেসে অনুমতি দিলো, ওর অর্ধেক ওড়না ইনশিরাহ নিজের মাথায় টেনে নিলো। মুঈনের দৃষ্টি আচমকা গিয়ে ইনশিরাহতে আটকায়। অদ্ভুত ভঙ্গিতে অন্যের ওড়নার অর্ধেক মাথায় তুলে মোনাজাত ধরছে টমবয়। মুঈনের গম্ভীর মুখে, ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠেছে অস্পষ্ট হাসি। কি অদ্ভুত একটা মেয়ে! অথচ মুঈন বিরক্ত হতে পারে না! কিছু পল ইনশিরাহকে দেখে মুঈন চোখ সরিয়ে নিয়ে কাজী সাহেবের নির্দেশে দুহাত তুলে মোনাজাত ধরলো।

বর বৌয়ের উদ্দেশ্যে দোয়াপাঠ শেষ করতেই প্রেরণা এসে দাঁড়াল ইহানের মুখোমুখি, একপলক সবাইকে দেখে নিয়ে ইহানকে বললো,“এখন আপনার বোন আর বোন জামাইকে আপনাদের বাড়িতে নিয়ে যান। আপনাদের এখানের কি নিয়ম জানা নেই। তবে আমাদের ওখানকার প্রচলিত নিয়মে বর বৌয়ের বাসর হয়ে মেয়ের বাড়িতে, নিয়ে যান। সন্ধ্যায় আপনার আর সামিন আঙ্কেলের সাথে আমি বসবো, আলোচনা করতে, আমার ভাইয়ের বৌ আমি অনুষ্ঠান করেই নেবো।”

অতঃপর ইশমামের সামনে গিয়ে দাঁড়ায় প্রেরণা,নরম গলায় অনুরোধের সুরে বলে,“আঙ্কেল! মেয়ে জামাইকে নিয়ে যান।”

_কোথাও যাবে না ওরা।
চেঁচিয়ে উঠলো ইশমাম মির্জা। মুঈনের কক্ষে উপস্থিত সবাই অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল।

সামিন ভাইকে বললো,“মানে? বিয়ে তো মেনে নিলি।”

ইশমাম হেসে কঠিন গলায় বললো,“বিয়ে মেনে নিয়েছি যাতে তোমার আদরের ভাতিজি তার পবিত্র ভালোবাসার সাথে “অবৈধ বিয়ে” ট্যাগ লাগিয়ে সংসার না করে। বিয়ে মেনে আমার বাপের দায়িত্ব পালন করেছি! তোমাদের শান্তি দিয়েছি! তবে ঐ মেয়ে আমার বাড়িতে যাবে না। কোনদিন না।

ইনায়া দু'চোখ তুলে পাপার দিকে তাকাল। প্রিতম তাকাল ইনায়ার দিকে।

_ছোটোবাবা এখন তুমি বাড়াবাড়ি করছো।
কঠিন গলায় বলে ইহান। পর পর ইশমামকে ধমকায় সামিন আর ইলহাম।
ইশমামের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। সে ইনায়ার দিকে তাকিয়ে বলে,“সুখে থাকো। স্বামীর সাথে শশুর বাড়িতে চলে যাও।”

ইনায়া ঠায় দাঁড়িয়ে, একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে পাপার দিকে। তার চোখে এখন পানিও নেই। শুধু অস্ফুটে বললো,“একটিবার মাম্মার কাছে যাবো পাপা।”

_উমহু! কোনো দরকার নেই মা। তুমি তোমার সংসারে যাও। মন দিয়ে সংসার করো। তোমার মাম্মা তোমার এই রূপ দেখলে আঘাত পাবে। এতো বড় উপকার আর করো না দয়া করে।

ইনশিরাহ তার ছোটোবাবা আর ইনায়াকে দেখছিলো। সে কল্পনায় ইশমামের স্থানে সামিনকে আর ইনায়ার স্থানে নিজেকে দেখে ঘুরে পাপার দিকে তাকায়। আনমনে মাথা নিচু হয়ে যায় তার।

ইশমাম ঘুরে সামিন, ইলহাম, ইহান, ইনশিরাহ,শেহা সবাইকে দেখে বলে,“আজ এই মেয়েকে ঐ বাড়িতে নিয়ে গেলে আমি আর আমার বৌ বাড়িছাড়া হবো। চললাম। তোমরা ওকে ওর স্বামীর বাড়িতে দিয়ে এসো।”

দাঁড়াল না ইশমাম। হন্তদন্ত হয়ে সেও বেরিয়ে যায়।

ইহান আর সামিন শুকনো মুখে দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে রয়। ইনায়া মেঝেতে বসে পরেছে ধপ করে। ইনশিরাহ আর শেহা ছুটে এসে ধরলো ওকে।

প্রেরণা ভীষণ চিন্তায় পরে গেলেও সামিনের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়,বিনয়ের সহিত “আঙ্কেল আমি বরং ওদের বাড়িতে নিয়ে যাই। আপনি আপনার ছোটোভাইকে বোঝান। আমি সন্ধ্যায় আপনার সাথে যোগাযোগ করবো।”

সামিন আবারও ইহানের দিকে তাকায়। ইহান অস্ফুটে বললো,“চলো, আর কি করার আছে?”

সামিন নির্লিপ্ত ইনায়ার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো। ইলহাম কপালে চুমু খেলো ইনায়ার, ইহান বোনকে দীর্ঘসময় জরিয়ে ধরে রাখলো। ইনশিরাহ আর শেহা তো আগলেই রেখেছে মেয়েটাকে। ইনায়া কোনোকিছুতেই কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছিলো না,সে দাঁড়িয়ে আছে জড়বস্তুর মতো। প্রিতম একদৃষ্টে দেখছে ইনায়াকে। অতঃপর প্রেরণা সামিন,ইহান, ইলহামের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে ইনায়া,প্রিতম আর ওর সব বন্ধু বান্ধবকে নিয়ে বেরিয়ে যায় এসপি অফিস থেকে।

কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রয় মির্জা বাড়ির সদস্যরা। অতঃপর মুঈনকে বলে তাঁরাও বেরিয়ে যায়।

সবাই চলে যাওয়ার পরে মুঈন ফরাজী তার চেয়ারে গা এলিয়ে দিয়ে বসে থাকে। ঠোঁটে তার হাসি। এতক্ষণ ধরে একটা পরিবারের মান অভিমান দেখলো সে।

মুঈন মনে মনে আওড়ায়,“কি অদ্ভুত একটা পরিবার! অদ্ভুত সব মানুষ। অদ্ভুত তাদের বিয়ে!”

____

বাইকের স্পিড বাড়িয়েও শান্তি পাচ্ছে না ইরফান। উশৃঙ্খলভাবে রাস্তার সব গাড়িকে ওভারটেক করে বাড়ির দিকে ছুটছে সে। ক্রোধে ফেটে পরছে সে, বড় বাবা,পাপা,বড় দাদান এমনকি শেষ পর্যন্ত ছোটো বাবার নির্লিপ্ততায় সে ভীষণ ক্ষে'পেছে সবার প্রতি। রক্ত টগবগ করে ফুটছে মির্জা বাড়ির রগচটা পাগল পাগল মেজাজী ছেলেটির।

বাড়িতে ঢুকেই দেখলো লিভিং রুমে পরী আর রিতু বসে আছে। আলো তখন খাবার টেবিলে দুপুরের খাবার পরিবেশন করছিলো, ইরফানের দিকে তাকিয়ে বললো,“এই ব্যাপার কি বলতো, তোর বড় বাবা, তোর পাপা,ইহান,তোর ছোট বাবা,শেহা, ইনশিরাহ। ওদের কাউকেই ফোনে পাচ্ছি না। ইনায়া কোথায়? দুপুরের খাবার কেউ খাবে না নাকি,সবাই লাপাত্তা!”

ইরফান বড় মায়ের কথার জবাব না দিয়ে হন্তদন্ত দোতলায় চলে যায়। আলোরা তিন জা ভীষণ অবাক। মনে হচ্ছে আজ একটু বেশিই চটেছে ইরফান মির্জা! ব্যাপার কি!

ঘরে ঢুকে ইরফান দরজা বন্ধ করে বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে রইলো দীর্ঘসময়। উঠে তার বক্সিং পিলোটাকে বেশ কিছুক্ষণ পাঞ্চ করে একটা নার্ভ ঠান্ডা করার অষুধ খেয়ে বিছানায় শুয়ে পরলো আবারও। তার পাগল পাগল লাগছে, খু'ন চাপছে মাথায়। এখনি ঠান্ডা হতে হবে, নয়তো কার প্রাণটা বের করে দেয় কে জানে!

খানিক বাদেই বাড়িতে ঢুকলো ইশমাম। ক্লান্ত পায়ে হেঁটে সে লিভিং রুমের দিকে এগোতেই অসুস্থ পরী উঠে দাঁড়ায়। আলো আর রিতুও পাশে দাঁড়িয়ে। পরী নিচুস্বরে বলে ওঠে,“কি ব্যাপার বলেন তো। লাঞ্চের সময় হয়ে এসেছে,আজ কারো কোনো পাত্তা নেই? বাকিরা কোথায়? মেয়ে কোথায়?”

ইশমাম ওদের তিন জা'য়ের দিকেই একপলক করে তাকাল। অতঃপর ক্ষীণস্বরে পরীকে বললো,“তোমার মেয়ে বিয়ে করে নিয়েছে পরী। বাকিরা সবাই তাকে শশুরবাড়িতে তুলে দিতে গিয়েছে।”

চলমান....

[ ২য় অংশের লিংক কমেন্টে পাবেন ]#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_৩০ [২য় অংশ]
#ইসরাত_ইতি

[ ২য় অংশ ]
[ ১ম অংশের লিংক কমেন্টে ]

ভাই আর ভাইয়ের বৌকে নিয়ে প্রেরণা নিজের অ্যাপার্টমেন্টে ঢুকলো। ওদের সাথে প্রিতমের সব বন্ধুরাও এসেছে । ফ্ল্যাটে ঢুকেই প্রেরণা ইনায়ার হাত ধরে একটা সোফাতে বসিয়ে এসির পাওয়ার বাড়িয়ে দিলো। তারপর প্রেরণা চেঁচিয়ে মিস জেনিকে ডেকে বললো,“মিস জেনি। জলদি ছোট ফুপিকে কল করে আসতে বলুন। আমি ভীষণ ব্যস্ত। তাড়াতাড়ি।”

প্রনমি আর শুদ্ধ বেরিয়ে এলো ঘর থেকে। প্রনমি জানতে চায়,“কি হয়েছে আপু? ভাইয়া কোথায়?”

প্রেরণা একগ্লাস পানি খেয়ে প্রনমির হাত ধরে টেনে এনে ইনায়ার পাশে বসিয়ে দিলো। বললো,“এটা তোর ভাবী প্রনমি। কিছুক্ষণ আগে প্রিতম আর ওর বিয়ে হয়েছে।”

অবাক প্রনমি। হাত দিয়ে হাতরে ইনায়ার হাতটা ধরলো আলতো করে। বিস্ময় কাটিয়ে উঠে প্রেরণাকে কিছু বলার আগেই প্রেরণা উঠে দাঁড়িয়ে প্রিতমের সব বন্ধু বান্ধবীদের দিকে তাকিয়ে বললো,“কোমর বাধো সবাই। আমি একা কিছুই পারবো না।”

জামিরা সবাই হাসলো। হাত পা ছড়িয়ে মেঝেতে বসে পরে এতক্ষণে সবাই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো।

ইনায়া এসপি অফিস থেকে থেকে বেরোনোর পর থেকেই নিশ্চুপ,না কারো সাথে কথা বলেছে,না কোনোদিকে তাকিয়েছে। শুধু মাথা নিচু করেই রেখেছে।

প্রিতম সোফাতে ওর পাশেই চুপচাপ বসে আছে। চশমার নিচ থেকে নীলচোখ দু'টো তেরছা নজরে দেখলো তার অভিমানী নতুন বৌকে। মেয়েটি যে ভীষণ ক্ষেপেছে তার উপর তা তো নিশ্চিত বোঝা যাচ্ছে।

প্রেরণা ওদের বসিয়ে রেখে একটা বাটিতে দু'টো মিষ্টি আর এক গ্লাস দুধ এনে ইনায়া প্রিতমের মুখোমুখি বসলো। এটাকে বলে “দুধমধু” রিচুয়াল। শাওকাত আর তার বিয়ের পরে ফুপিও এমন করেছিলো,প্রেরণার মনে আছে, শাওকাতের আধা খাওয়া মিষ্টি জোর করে প্রেরণাকে খাইয়েছিলো ফুপি।
সে একটা মিষ্টি তুলে প্রিতমকে আর ইনায়াকে অল্প করে খাইয়ে,দুধটাও অল্প করে খাইয়ে দেয়। ওরা বিনা বাক্য ব্যয়ে প্রেরণার কথা শুনলো।
তারপর প্রেরণা টিস্যু পেপার দিয়ে দু'জনের মুখ মুছে দিয়ে প্রিতমের দিকে তাকায়।

প্রিতম তার আপুর দিকে হাসি হাসি মুখ করে তাকিয়ে আছে, ঠিক তখনই প্রেরণা ঠাশ ঠাশ করে দু'টো জোরালো চ'ড় ভাইয়ের দুই গালে দিয়ে কঠিন চোখে তাকিয়ে থাকে ভাইয়ের মুখের দিকে।

চ'ড়ের শব্দে কেঁপে ওঠে প্রনমি। শুদ্ধ খালামনির কোলের মধ্যে বসে পরে মাম্মার রাগী ভাব দেখে। হতভম্ব প্রিতমের বন্ধু বান্ধবীরা। হতভম্ব প্রিতম। ইনায়াও চ'ম'কে উঠেছে।
প্রিতম দু হাতে দু গাল চেপে ধরে রেখে বললো,“আপু!”

প্রেরণা ফুঁসছে। এতক্ষণে সে ভাইয়ের প্রতি জমে থাকা সব রাগ উগ্রে দিয়ে চেঁচায়,“কার্ড দে আহাম্মক। তোর কার্ড দে। বেয়াদব কোথাকার। এক্ষুনি দে।”

প্রিতম ভীত চোখে বোনের দিকে তাকিয়ে থেকে পকেট থেকে ক্রেডিট কার্ড বের করে দেয় বোনের হাতে।

প্রেরণা উঠে দাঁড়ায়। মিস জেনিকে বলে,“অ্যাপার্টমেন্টের সব মহিলাদের খবর দিয়েছি। তারা আসবে বৌ দেখতে। মিষ্টি খাইয়ে দেবেন সবাইকে। আমি একটু শপিং-এ বেরোচ্ছি। এই বেয়াদবকে আর ওর বৌকে কিছু খেতে দিন। জামিদেরও খেতে দিন। আমি যাবো আর আসবো।”

প্রেরণা প্রনমিকে উদ্দেশ্য করে বলে,“প্রনমি ভাবীর পাশে বসে থাকবি। গল্প করবি। ঠিক আছে?”

প্রনমি মাথা নাড়ায়। প্রেরণা কিছু না খেয়ে আবারও বেরিয়ে যায় ফ্ল্যাট থেকে । প্রিতমের সব বন্ধুরা মাথা ঘুরিয়ে প্রিতমের দিকে তাকায়। প্রিতম তব্দা খেয়ে তখনও দু'গালে হাত চেপে ধরে বসে আছে।

শুদ্ধ এগিয়ে এসে মুখ হাসি হাসি করে বলে,“মাম্মা তোমাকে মে'রেছে কেন মামা?”

প্রিতম কোনো জবাব দেয়না। তেরছা নজরে আবারও বৌকে দেখে, ইনায়া মাথা নিচু করেই বসে আছে।

জামি শুদ্ধকে বলে,“মাম্মা তোমার মামাকে দোয়া করে দিয়েছে শুদ্ধ মামা। তার বিবাহিত জীবন যেন সুখের হয়। এটা বড়বোন জাতীয় দোয়া। এই দোয়া দু গালে দিতে হয়। এ দোয়ার অনেক ফজিলত। ঐ যে তোমার মামার পাশে যে বসে আছে, সে তোমার মামী।”

_মামী?
শুদ্ধ অবাক হয়ে জানতে চায়।

_হু মামী। মামার বৌ।

শুদ্ধ জানেনা মামার বৌ কি। সে অবাক চোখে দেখছিলো গোলুমোলু পুতুলের মতো আন্টিটাকে। প্রনমি জামিকে বলে,“জামি ভাইয়া! ভাবী অনেক সুন্দর তাইনা? ইশশ আমার না খুব দেখতে ইচ্ছে করছে ভাবীকে।”

ইনায়া এতক্ষণে মাথা তুলে প্রনমির দিকে তাকায়। নিজের সমস্ত মন খারাপ পাশে সরিয়ে রেখে প্রনমির হাত দুটো ধরে , তারপর তার হাত দু'টো নিজের গালে ছুঁইয়ে বলে,“তুমি আমায় ছুঁয়ে দেখো আমি সুন্দর কি না।”

এক নিমিষেই, সামান্য আন্তরিকতায় প্রনমির ভীষণ পছন্দ হয়ে যায় তার ভাবীকে। জামি প্রিতমের দিকে তাকিয়ে বললো,“ওমা! তোর বৌ তো কথা বললো প্রিতম।”

ইনায়া সেসব পাত্তা না দিয়ে রাগী গলায় মিস জেনিকে বললো,“আন্টি আমাকে একটা রুম দেখিয়ে দিন তো,আমি কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেবো।”

মিস জেনি প্রিতমের দিকে তাকায়। প্রিতম তখনও আপুর চ'ড়ের ঘোরে ছিল, থমথমে মুখে খুব সাহস ইনায়াকে বলে,“আমার রুম ওদিকে।”

ইনায়া একবার তাকালও না প্রিতমের দিকে, প্রনমিকে বললো,“আমাকে তোমার রুমে নিয়ে চলো প্রনমি।”

_____

মাথায় হাত রেখে পরী কিছুক্ষণ কাঁদল। তার দুই জা দু'পাশ থেকে তাকে ধরে আছে।
বাড়িতে কিছুক্ষণ আগে একটা দূর্ঘটনা ঘটে যেতে পারতো,তবে ঘটেনি। পরীর যতটা উত্তেজিত হবার কথা ছিলো,পরী হয়নি। শুধু অঝোরে চোখের জল ফেলছে, একটু পরপর ইশমামকে বলছে,“ওকে একটু আমার সামনে নিয়ে আসেন। আমি ওকে কিছু প্রশ্ন করতে চাই। নিয়ে আসেন।”

বাড়িতে সামিন, ইলহাম,ইহান, ইনশিরাহ, শেহা সবাই পৌঁছেছে। লিভিং রুমে বিশাল জটলা। সবাই মলিন মুখে দেখছে ক্রন্দনরত পরীকে।

ইশমাম তার স্ত্রীকে বলে,“কেদো না। এখন অসুস্থ হয়ে আমাকে আর ভুগিও না পরী। প্লিজ থামো।”

রিতু ভয়ে ভয়ে জানতে চায়,“ছেলেটি কেমনতর? এভাবে হুট করে বিয়ে করলো জেদ দেখিয়ে !”

সামিন বসলো সোফাতে, নরম গলায় বলল,“এখন এসব বলে তো লাভ ক্ষতি কিছুই হবে না রিতু। এখন আমাদের সবাইকে ঠান্ডা মাথায় এগোতে হবে। মেয়ে জামাইকে মেনে নিয়ে ওদের পথটা সহজ করতে হবে, দু'জনের ক্যারিয়ার পরে আছে সামনে। ইনু সাইনটিস্ট হবে। ওর কত স্বপ্ন! আমরা এমন করলে মেয়েটা ভে'ঙে পরবে।”

ইশমাম চেঁচিয়ে উঠলো,“ক্যারিয়ার? ক্যারিয়ারের কথা নিজেই ভাবছে না ও। আর ভাইয়া তোমাদের এসব আহ্লাদ দেখলে আমার রাগ উঠে যাচ্ছে। প্লিজ বন্ধ করো এসব!”

আলো ইশমামকে থামিয়ে দিয়ে বললো,“সব শুনলাম। কিন্তু তুমি আসলেই বাড়াবাড়ি করছো ইশমাম। তোমার ভাইয়া যা সিদ্ধান্ত নিয়েছে সেটাই সঠিক আমার মনে হয়। মেয়ে আমাদের,কষ্ট পেলে কষ্ট আমাদের বুকেই লাগবে। মেয়ে জামাইকে মেনে নেওয়া উচিত আমাদের।”

_হ্যা ওর কষ্টই বোঝো তোমরা,যে মেয়েটা নিজের বাবা মায়ের কথা একটি বার ভাবলোও না।

_ভাবলো না বলে ইনু তার বাবা মাকে ভালোবাসে না এমন তো নয়। একটু নরম হও ইশমাম। আমি আর তোমার ভাইয়া সন্ধ্যায় গিয়ে মেয়ে জামাইকে নিয়ে আসবো। প্লিজ শান্ত হও। এতো জেদ দেখিও না। টিপিক্যাল মান্ধাতা আমলের বাবার মতো করছো তুমি। শান্ত ভাইয়া আর ইশিতা আপুর বিয়েতে তো এমন করোনি তুমি!

_শান্ত আর ঐ প্রিতম এক হলো? শান্ত ভাগিয়ে নিয়ে বিয়ে করেছিলো আমার বোনকে? চেয়ে নিয়েছে, অনুরোধ করেছে।

_তো প্রিতম চাইতে এলেও তো রাজি হওনি। ঘাড়ত্যারামি করেছো, অপমান করেছো।

ইশমাম ম্লান হাসলো,বললো,“বিষয়টা ইনশিরাহর হলে এভাবে বলতে? কখনোই না। একজন বাবার সেন্টিমেন্ট নিজেদের সেন্টিমেন্ট দিয়ে মাপতে এসোনা প্লিজ। আজ ইনশিরাহ ওভাবে তোমাদের মত ছাড়া কাউকে পেতে চাইলে তোমরাও এতোটা মহান হতে পারতে না। আমার মতোই জাজমেন্টাল আচরণ করতে।”

আলো চুপ হয়ে যায়। লিভিং রুমের এক কোণে দাঁড়িয়ে ইনশিরাহ মাম্মা আর ছোটোবাবার কথোপকথন শুনছিলো মাথা নিচু করে।

সামিন তখন বলে ওঠে,“কি করতাম জানিনা। তবে চেষ্টা করতাম আমার মেয়ের সুখটাই আগে দেখতে।”

ইনশিরাহ ঘুরে পাপার দিকে তাকায়,তার মুখ থমথমে।

ইশমাম হাসলো। উঠে দাঁড়িয়ে পরীর হাত ধরে টেনে তুলে বললো,“সেটা এমন পরিস্থিতি এলেই দেখা যাবে ভাইয়া,দেখবো তখন তুমি কি করো। তবে প্লিজ এখন আমায় আর আমার স্ত্রীকে ফোর্স করো না। একটা অকৃতজ্ঞ মেয়ে, নিজের মৃত্যুর ঝুঁকি নিয়ে যে মা ওকে জন্ম দিলো,সে যে অসুস্থ সেটাও মাথায় ঢুকলো না ওর। তোমরা ওকে আর ওর স্বামীকে নিয়ে নাচানাচি করো,তবে ওর বাড়িতে গিয়ে। এ বাড়িতে আনতে পারবে না। খবরদার।”

_____

প্রেরণা ফিরেছে দেড় ঘন্টার মাথায়। তখন প্রায় মাগরিবের ওয়াক্ত হয়ে গিয়েছে। প্রিতমের বন্ধুরা কেউ যায়নি। সবাই হাতে হাতে গোটা ফ্ল্যাটটাই গুছিয়ে নিয়েছে।

প্রেরণা দেড় ঘণ্টার শপিংয়ে ইনায়ার জন্য একটা বেশ দামী শাড়ি কিনেছে। বিয়ের শাড়ি। আর কিনেছে কিছু স্টিচড ড্রেস। কসমেটিকস,টয়লেট্রিজ, জু'তো, মোটামুটি প্রিতমের গত সপ্তাহে উপার্জন করা সত্তর হাজার টাকা পুরোটাই খরচ করেছে ওর বৌয়ের জন্য। কাজটা করে একটা পৈশাচিক আনন্দ পেয়েছে প্রেরণা। প্রিতমের কার্ড টা খালি এখন। ফতুর হয়ে বসে থাকুক বেয়াদবটা।

প্রেরণার ইচ্ছে করলো নিজের টাকায় আরো কিছু নিতে। পরে ভাবলো ইনায়াকে নিয়ে আসবে, সে নিজের পছন্দ অনুযায়ী পরে কিনবে।

বাড়িতে ফিরে সবাইকে শপিং দেখাচ্ছিল সে। নতুন বৌ দেখতে এসেছে অ্যাপার্টমেন্টের মহিলারা। তারা এসে দেখলো নতুন বৌ ঘুমিয়ে আছে প্রনমির ঘরে।

প্রিতম বন্ধুদের নিয়ে নিজের রুমে চুপচাপ বসে আছে শুকনো মুখ করে, বৌয়ের সামনে বোনের চ'ড় খেয়ে সে ভীষণ অপমানবোধ করছে।

প্রেরণা এসে শুনেছে সবাই খেলেও ইনায়া খায়নি, ইনায়া খায়নি বলে প্রিতমও খায়নি।

শপিং রেখে উঠে দাঁড়ায় প্রেরণা। প্রনমির ঘরে গিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে আদরের সহিত ডেকে ঘুম থেকে ওঠালো ইনায়াকে।

তারপর তাকে টেনে লিভিং রুমে এনে প্রতিবেশীদের দেখালেন ঘুম ঘুম চোখের মিষ্টি একটা বৌকে।

সন্ধ্যা নাগাদ ইনায়াকে গোসল করিয়ে তাকে তার বিয়ের শাড়িটা পরিয়ে দিলো প্রেরণা। ইনায়া চুপচাপ বাধ্য মেয়ের মতো দাঁড়িয়ে আছে। শাড়িটা পরিয়ে প্রেরণা তৃপ্তি নিয়ে দেখতে থাকে ভাইয়ের বৌকে।
ভারী স্বাস্থ্যের একটা আদুরে মেয়ে। গোটাটাই মনে হচ্ছে একটা গোলাপ। যা বুঝলো প্রেরণা,মেয়েটি স্বচ্ছ। তার ভাইটা সুখী হলেই হলো। তার আর কিছু চাই না। প্রেরণা চিন্তায় ছিলো ভাইয়ের কপালে কেমন মেয়ে জুটবে সে ব্যপারে। আজ দুশ্চিন্তা কিছুটা কমলো প্রেরণার। ভাইয়ের ওপর রাগ থাকলেও মনে মনে ভাইয়ের প্রতি খুশি এমন একটা মিষ্টি মেয়েকে বাছার জন্য। প্রেরণার অর্ধেক পরিশ্রম কমে গিয়েছে। এখন প্রনমির জন্য একজন বিশুদ্ধ মানুষকে পেলেই প্রেরণা নিশ্চিন্ত!

ইনায়া নির্লিপ্ত হয়েই দাঁড়িয়ে। ওকে আরেকবার দেখে প্রেরণা গভীর নিঃশ্বাস ফেলে। ভাইয়ের বৌয়ের মন খারাপের কারণ তার জানা।

সে ইনায়াকে জোর করে টেনে নিয়ে ডাইনিং টেবিলের চেয়ারে বসিয়ে গরম ভাত মাংসের ঝোল মেখে খাইয়ে দিলো, না খেতে চাইলে জোর করে,রেগে ধ'ম'কে খাওয়াল। তারপর নিজেও খেলো। সারাদিনে কিছু খায়নি সে।

প্রিতম ঘর থেকে বেরিয়ে দেখছিলো বোন আর বৌকে। তারও ভীষণ খিদে পেয়েছিল, আপু এতোটাই রেগে আছে তার ওপর যে তাকে একবার সাধলোও না।
মুচকি হাসলো প্রিতম, আড়চোখে একবার লাল শাড়িতে মোড়ানো স্নিগ্ধ মুখটাকে দেখলো। শত্রুর বোনও একটিবার চোখ তুলে দেখছে না তাকে।

খাওয়া শেষে প্রেরণা ইনায়াকে নিজের ঘরে নিয়ে বসালো। ডান হাতে মেয়েটার থুতনি কিছুটা উপরে তুলে নরম গলায় বলে,“সামিন আঙ্কেলকে ফোন করেছিলাম বিশ মিনিট আগে। সে বোঝাচ্ছে ইশমাম আঙ্কেলকে। মানলে মানবে,না মানলে কি করবো জানো? কাল তুমি,প্রিতম,আমি সবাই গিয়ে আঙ্কেল আন্টির পা ধরে ঝুলে থাকবো। যতক্ষন না মানবে ততক্ষণ ছাড়বোই না।

ইনায়া মাথা নুইয়ে নেয়। প্রেরণা বুঝলো এতো সহজে মেয়েটির মন ভালো হবার নয়। সে স্নেহমাখা দৃষ্টিতে দেখতে থাকলো ভাইয়ের বৌকে।

শুদ্ধ তার মামার বন্ধুদের সাথে লিভিং রুমে বল নিয়ে খেলছে। প্রিতমের বান্ধবীরা প্রিতমের ঘর সাজিয়ে দিচ্ছে তাজা ফুল দিয়ে। প্রেরণার ফ্ল্যাট টা গম গম করছে হাসি, আনন্দে।

ইনায়াকে তখন প্রনমির ঘরে রেখে প্রেরণা ফুপির সাথে বসে পরবর্তী পরিকল্পনা করে নিলো। মুবিনা কিছুক্ষণ আগেই পৌঁছেছে। ভাতিজির সাথে বসে প্রিতমের বিয়ের অনুষ্ঠান সূচি বানিয়ে নেয়।

মিস জেনি ব্যস্ত রান্নাঘরে।
প্রেরণা ফুপির সাথে আলোচনা সেরে উঠে মিস জেনিকে ডেকে তার হাতে একটা নতুন পাঞ্জাবি ধরিয়ে দিয়ে বললো,“ঐ বেয়াদবটাকে বলুন গোসল সেরে পরে নিতে এটা, যান।”

_____

ঠিক রাত আটটা নাগাদ প্রিতমের সব বন্ধুরা চলে গেলো খাওয়া দাওয়া করে। প্রেরণা ইনায়াকে প্রনমির ঘরে রেখে প্রিতমের ঘরে ঢুকলো,ইনায়ার জন্যে কেনা সবকিছু গুছিয়ে রাখলো কেবিনেটে।

প্রিতম বন্ধুদের অ্যাপার্টমেন্টের গেট পর্যন্ত পৌঁছে দিতে গিয়েছে। একটা গোটা দিন সবাই কম খাটনি খাটেনি। প্রিতমকে নতুন জীবনের শুভেচ্ছা জানিয়ে সবাই চলে যায়।

প্রিতম প্রফুল্ল মনে ঘুরে এলিভেটরের দিকে পা বাড়াতেই দাঁড়িয়ে পরলো হঠাৎ। পাঞ্জাবির পকেট থেকে ফোনটা বের করে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে গুগলের সার্চ বারে লিখলো,“বৌয়ের রাগ কমানোর উপায়।”

গুগল উত্তর দিলো,“১.ধৈর্য্য নিয়ে তার অভিযোগ শুনন। ছোটো বড় সব অভিযোগ। তাকে বলতে দিন যতক্ষন বলতে চায়। চেঁচাতে দিন, কাঁদতে দিন।

২.তারপর তার কাছে ক্ষমা চান ভদ্রতার সহিত।

৩.ওপরের দুটো উপায় কাজে না দিলে বৌকে কাছে টেনে নরম আদরে ভরিয়ে দিন। স্ত্রীরা স্বামীর কাছে এখানেই গলে যায়।”

প্রিতম আর্টিকেলটা দেখে হাসলো। নরম আদর? আজ কাছে গেলে প্রিতম মা'র খাবে ইরফান মির্জার ঐ শান্তশিষ্ট বোনের হাতে।

প্রিতম সার্চ বারে আরেকটা প্রশ্ন লিখে ফেলে,“বাসর রাতে স্ত্রীরা স্বামীদের কাছ থেকে কেমন আচরণ আশা করে?”

দুয়েকটা আর্টিকেল চোখে পরলো প্রিতমের। সে একটাতে ঢুকলো, তাতে লেখা,“বাসর রাত স্বামী-স্ত্রীর জীবনের একটি বিশেষ রাত। দু'জনে একসাথে পথচলা শুরু হয় এই রাত থেকে। দু'জন মানুষ শারীরিক ও মানসিক ভাবে দুজনের কাছে সমর্পিত হবার রাত এটি। তবে অনেক স্বামীই এই রাতটিকে শুধু স্ত্রীর সহিত শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনের রাত বলে মনে করে। তাদের কাছে মনে হয় এ রাতে স্ত্রীর সাথে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন না করলে তাদের জীবন বৃথা হয়ে যাবে। তাই বৌয়ের মন না বুঝেই নিজেদের অধিকার আদায়ে তারা ঝাঁপিয়ে পরে। প্রথম রাতে শারীরিক সম্পর্ক স্থাপন ৮৯% মেয়েদের কাছে বিব্রতকর লাগে। একজন দায়িত্ববান স্বামী হিসেবে আপনাকে এই ব্যপারে সচেতন হতে হবে। বৌ পালিয়ে যাচ্ছে না। বৌয়ের মন বুঝে পদক্ষেপ গ্রহণ করুন।”

প্রিতম একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে আর্টিকেলের দিকে। তারপর ফোনটা অফ করে পাঞ্জাবির পকেটে ঢুকিয়ে নিতে নিতে অস্ফুটে বলে,“ওরে বধূরে।”

চলমান.....

#নোট

গুগলে এসব কিছু নেই। এসব ভুগিচুগি ইতি বানিয়ে লিখছে।

আর বাই দ্য ওয়ে, আপনারা এতো হাইপার হয়ে যাচ্ছেন কেন গল্পটি পড়ে?
গল্পটাকে লাইটলি নিন। পারলে দেখছি গল্পের মধ্যে ঢুকে চরিত্রদের মে'রে আসেন। এতে তো বিপদ। আমার গল্প কাল্পনিক, সিনেমার ভুগিচুগি কাহিনী। এতো সিরিয়াসলি নেওয়ার কিছু নেই। গল্পটি ফুরিয়ে যাবে,নটে গাছটি মুরিয়ে যাবে।

আগামী দুদিন সম্ভবত গল্প পাবেন না। সম্ভবত।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 30 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন