ফন্ট সাইজ:
থিম:
বধূ কোন আলো লাগল চোখে ২

পর্ব 31

লেখক: ইসরাত ইতি

#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_৩১ [ ১ম অংশ ]
#ইসরাত_ইতি

🚫কঠোর ভাবে প্রাপ্তমনস্কদের জন্য।

🚫শিক্ষা ও সাহিত্যের সাথে আমার এই কল্পিত ঘটনাগুলোর লিখিত শব্দগুলোর কোনো সম্পৃক্ততা নেই।

[ ১ম অংশ ]

পুরো খাটটাকেই এমন ভাবে সাজানো হয়েছে, মনে হচ্ছে এটি একটি বাগান। বাগানে ফুটেছে হরেক রঙের গোলাপ ফুল। রোজ গার্ডেন অ্যাপার্টমেন্টের অপজিটে একটা বড় কাঁচা ফুলের দোকান রয়েছে। ওখানে সাত রঙের গোলাপ থাকবে-ই। লাল , গোলাপী, সাদা, হলুদ, নীল, বাদামী, প্রেরণা সবকটা রঙ-ই অর্ডার করেছিলো শুধুমাত্র কালো গোলাপ বাদে।
প্রিতমের বান্ধবীরা দারুণ সাজিয়েছে বাসরের খাট। প্রেরণা সন্তর্পণে বিছানার একপাশে বসলো যেন ডেকোরেশন নষ্ট না হয়ে যায়। তারপর মাঝখানটায় দৃষ্টি দিলো,সেখানে হলুদ গোলাপের পাপড়ি দিয়ে লেখা “ইনায়া+প্রিতম”।
একদৃষ্টে দেখছে প্রেরণা। শাওকাত আর তার বাসরের খাটটা সাজানো হয়েছিলো লাল গোলাপ দিয়ে। টাটকা তাজা গোলাপ। মনে পরতেই প্রেরণা ম্লান হাসলো,সে রাতে শাওকাত ওয়াসীতের বিশালাকার রুমে গোলাপে সাজানো বিছানায় প্রেরণাকে ফুপি বসিয়ে রেখে চলে গিয়েছিল। চারিদিকে ছড়িয়ে পরেছিলো গোলাপের মিষ্টি সুবাস। কিন্তু প্রেরণা ভয়ে জবুথবু হয়ে বসেছিলো। একটা নীল রঙের বেনারসী আর সামান্য স্বর্নালংকার ছিলো গাঁয়ে। মাথায় ছিলো ঘোমটা। ঐ সময়টিতে তার খুব কান্না পাচ্ছিলো। প্রনমি তখন বেশ ছোটো-ই , ঘুমানোর সময়ে প্রেরণাকে জরিয়ে ধরে ঘুমায়। আজ থেকে মেয়েটা আপুকে পাবে না, চেনে না,জানে না একটা লোক,তার সাথে আজ থেকে এক বিছানায় ঘুমাতে হবে প্রেরণার। ভয়, আতঙ্ক, হতাশা সবকিছু তাকে ক্রমশ দখল করছিলো।
নিচ তলায় তখন শাওকাতের হাঁকডাক শোনা যাচ্ছিলো। লোকটার কন্ঠস্বর ভারী,হাস্কি। স্বাভাবিক কথা বললেও প্রেরণার মনে হয় কাউকে অর্ডার করছে, ধ'ম'ক দিচ্ছে। বেশ কয়েকবার প্রেরণা দেখেছে লোকটিকে,তবে খুব কাছ থেকে দেখেছে আজ সন্ধ্যায়, কবুল বলার সময়ে। লোকটা সুদর্শন, ভীষণ লম্বা, সুঠামদেহী। আর প্রেরণা একটা খ্যাংরাকাঠি। লোকটার অর্ধেক প্রেরণা।

শাওকাত বাড়ির কেয়ারটেকার গুলোকে মেইন গেট বন্ধের নির্দেশ দিয়ে ঘরে ঢুকলো রাত যখন এগারোটা। ঘরে ঢুকে দেখলো তার বিছানায় এক পাশে জবুথবু হয়ে বসে আছে নীল বেনারসী পরিহিতা একগুচ্ছ স্নিগ্ধ নীলিমা। নীল চোখের কারণে প্রথম দর্শনে মেয়েটিকে “নীলিমা” নাম উপহার দিয়েছিলো শাওকাত মনে মনে।

ধীরে ধীরে শাওকাত বিছানার কাছে যত এগোচ্ছিল,প্রেরণা ভয় আর আড়ষ্টতায় জমে যাচ্ছিল। তার পানির তেষ্টা পাচ্ছিল।
শাওকাত গিয়ে প্রেরণার মুখোমুখি বিছানায় বসলো। ম্যান পারফিউমের কড়া সুগন্ধ গোলাপের সুবাস ধামাচাপা দিয়ে দিলো। মাথা নিচু করেই ছিলো প্রেরণা। হঠাৎ দানবীয় একটা হাত তার শীর্ণকায় নরম হাতটা ধরে গম্ভীর কন্ঠে বলে,“মেজর শাওকাত ওয়াসীত শরীফের স্ত্রী। তাকাও।”

অর্ডার দেওয়ার মতো করে বলেছিলো শাওকাত। প্রেরণা চ'ম'কে উঠে ধীরে ধীরে চোখ দুটো তুলে শাওকাতের দিকে তাকাতেই আরও ভীত হয়ে পরে। মানুষটার মুখভঙ্গি গম্ভীর দেখা যাচ্ছে, রাগী রাগী ভাব। বকবে নাকি প্রেরণাকে?

দু'চোখের নীলিমায় শাওকাত কিছু সময়ের জন্য ডুব দিলো। গম্ভীর মুখভঙ্গি,রাগী রাগী হাবভাব। প্রেরণা একটা ঢোক গিললো। কি হবে এখন,কি হতে চলেছে এসব আকাশ কুসুম ভাবনায় তলিয়ে যাওয়ার মুহূর্তে শাওকাত বলে ওঠে,“বিদ্রোহী কবিতাটা আরেকবার আবৃত্তি করে শোনাও তো। পুরোটা।”

প্রেরণা চ'ম'কালো,অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো মানুষটার দিকে। শাওকাতের মুখভঙ্গি তখন বদলে গিয়েছে নিমেষেই। হোহো করে হেসে উঠলো মানুষটা। কিছুক্ষণ হেসে,হাসি থামিয়ে বললো,“সেদিন তোমার ফুপির ফ্যামিলি প্রোগ্রামে কাজী নজরুলের বিদ্রোহী আর নির্মলেন্দু গুণের শুধু তোমার জন্য, দু'টো কবিতা আবৃত্তি করেছিলে। বাট তোমার কন্ঠে বিদ্রোহের কবিতা ভালোবাসার কবিতার থেকেও বেশি মানায়, যা আমাকে পা থেকে মাথা অবধি নাড়িয়ে দেয় প্রেরণা।”

বাসর রাতের স্মৃতিচারণ করে আনমনে হেসে ফেললো প্রেরণা। সেদিন রাতে ঐ পাগল লোকটা প্রেরণাকে দিয়ে বিদ্রোহী কবিতা পুরোটাই আবৃত্তি করিয়ে ছেড়েছিলো। প্রেরণা লোকটার পাগলামি দেখে শেষে কাঁদো কাঁদো হয়ে বলেছিলো,“আমি ফুপির কাছে যাবো।”

জোরে হেসে উঠলো প্রেরণা,চোখের কোণে যেটুকু পানি জমলো,শাড়ির আঁচলে মুছে নিলো। মিস জেনি এসে দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে ডাকে,“প্রেরণা!”

_জি।

_প্রিতমের বৌকে এখন এ ঘরে পাঠাবো কিনা, তোমার ফুপি জানতে চাইছে।

প্রেরণা উঠে দাঁড়িয়ে বলে,“হ্যা। রাত নয়টা বেজে গিয়েছে। ওরা ক্লান্ত, বিশ্রাম প্রয়োজন। পাঠিয়ে দিন।”

মিস জেনিকে কথাগুলো বলে প্রেরণা চলে গেলো পশ্চিমের খোলা বারান্দায়। আজ রাতটা পূর্নিমার রাত। শাওকাতের সাথে তার বাসর রাতেও ছিলো পূর্নিমা। গভীর রাতে তাকে পাঁজাকোলা করে শাওকাত ছাদেও গিয়েছিলো একবার সে রাতে, নীলিমাকে নিয়ে জ্যোৎস্না স্নান করতে।
কিছুক্ষণ চাঁদটার দিকে তাকিয়ে থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে দিলো প্রেরণা। আজ শাওকাত থাকলে প্রেরণা আবদার করতো সমুদ্রের ধারে নিয়ে যাওয়ার জন্য। পূর্নিমার আলোয় সমুদ্রের গর্জন শুনতে ইচ্ছে করছে প্রেরণার।

“আপু।”

প্রিতমের ডাকে প্রেরণা চোখ মুছে ঘুরে দাঁড়ায়। মুখভঙ্গি গম্ভীর করে ভাইয়ের ওপর চেঁচিয়ে ওঠে,“তুই! যা এখান থেকে।”

প্রিতম এগিয়ে গেলো, বোনের হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় পুরে আবারও বললো,“এই আপু! রাগ কমাও না প্লিজ।”

প্রেরণা এক ঝটকায় ছাড়িয়ে নিলো হাত, রেগেমেগে বললো,“রেগে নেই আমি।”

_চ'ড় তো মারলে? আর কি করলে রাগ কমবে তোমার? বলো।

_যাবি তুই এখান থেকে? আর তুই, আমার সাথে কখনও কথা বলবি না আর।

ভীষণ ক্ষেপে আছে প্রিতমের বোন,ভীষণ। আপু সহজে রাগেনা প্রিতমের ওপর। রেগে গেলে মুশকিল। বোনের রাগ কমানোর জন্য প্রিতম অবশেষে প্রেরণার অভাবনীয় কাজটা করে বসলো। মেঝেতে ঝুঁকে বসে আপুর পা জড়িয়ে ধরলো।

ঘটনার আকস্মিকতায় প্রেরণা ভীষণ চ'ম'কেছে। চেঁচিয়ে উঠে বলছে,“করছিস কি! ছাড়,ছাড় বলছি!”

_না তুমি আগে বলো তুমি রেগে নেই।

_ছাড় প্রিতম। তোর বৌয়ের কাছে যা।

_না তুমি বলো,আমাকে মাফ করেছো!

_আগে পা ছাড়। বলছি!

প্রিতম বোনের পা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। প্রেরণা চেঁচিয়ে হাঁপিয়ে গিয়েছে ততক্ষণে। হাঁপাতে হাঁপাতে বলে,“যা মাফ করলাম। এটা কেমন কান্ড! পা ধরবি কেন!”

_এতো রেগে গিয়েছো কেন তবে!

_রেগে তো তোর বৌও আছে, তারও পা ধর গিয়ে, যা।

প্রিতম হাসলো,লজ্জিত ভঙ্গিতে হাসলো। সে হাঁসি দেখে প্রেরণার হৃদয় জুড়ালো। এক নিমিষে নিজের চাপা রাগ উবিয়ে দিয়ে ভাইয়ের ফর্সা গালে হাত রেখে বললো,“যা। নতুন জীবনের জন্য শুভকামনা।”

প্রিতম মাথা নিচু করে মুচকি হাসলো, আবারও বোনের হাত দুটো নিজের মুঠিতে নিয়ে বললো,“আপু। একটু ন্যাকা, তবে ভীষণ ভীষণ ভীষণ ভালো। মানিয়ে নিও প্লিজ।”

প্রেরণা হেসে ফেলে,ভাইয়ের বাহুতে আলতো চাপড় মেরে বলে,“যাবি তুই!”

_যাবো। সত্যি বলছি। অনেক কেয়ারিং, মোটেও অহংকারী নয়। ভীষণ ভালো রাখবে আমাদের।

প্রেরণা ভাইয়ের চোখের দিকে চেয়ে রয়। বৌয়ের প্রশংসা করতে গিয়ে প্রিতমের চোখদুটো জ্বলজ্বল করছিলো খুশিতে। প্রেরণা নরম গলায় ভাইকে বললো,“আচ্ছা দেখবো সেসব। যা এখন ঘরে, ওকে বোঝাবি অনেক। মন খারাপ ভীষণ। যা।”

_____

শান্তিনীড়ে রাতে খাবারের টেবিলে বিরাজ করছে পিনপতন নীরবতা। অথচ এতো গুলো মানুষ সশরীরে উপস্থিত। শুধু অনুপস্থিত রয়েছে ইশমাম,পরী আর ইরফান। আলো সবাইকেই ডেকে এসেছে বারবার গিয়ে, আসেনি কেউ।

ইহান,সামিন, ইনশিরাহ, ইলহাম নিশ্চুপ খাচ্ছিল। শুধু শেহা নীরবতা ভেঙে একবার তার মেজো মামীকে বললো,“তোমার মেজো ছেলে খাবে না মামী?”

রিতু বললো,“কি জানি। কেউই তো ভিড়তে পারছি না রুমের আশেপাশে। গেলেই বলছে “গেট লস্ট! ” তুই একটু গিয়ে দেখবি? তোকে মনে হয়না বকবে।”

শেহা মাথা নাড়ায়। আলো সামিনকে বললো,“তখন ছেলের বড়বোন ফোন দিয়েছে শুনলাম। কি বললো?”

_ঐ তো জানতে চাইলো ইশমাম-পরীর কথা। কাল সকালে আসবে বলেছে এ বাড়িতে।

ইহান খেতে খেতে মাথা তুলে বড় বাবার দিকে তাকায়। আলো স্বামীকে বলে,“বড় বোনের বয়স কত?”

_বেশি হবে না। আমাদের ইহানের ছোটো,ধরো এই সাতাশ আঠাশ।

_এতো ছোটো? এ গার্ডিয়ান? আর কোনো মুরব্বি নেই?

সামিন হেসে বললো,“হেলাফেলা করো না আলো। বয়স শুনে নাক সিটকিও না। বুঝ ব্যবস্থা চমৎকার মেয়েটির। দেখলে বুঝবে। আমার তো ভীষণ পছন্দ হয়েছে মেয়েটিকে,আমাদের ইনুর সুবিধা অসুবিধা নিয়ে চিন্তা করতে হবে না।”

শেহা খাওয়া শেষ করে পারিবারিক আলাপ আলোচনায় অংশ না নিয়ে সোজা গেলো ছোটো মামা-মামীর রুমে। গিয়ে দেখলো মামী কাঁদতে কাঁদতে ক্লান্ত হয়ে ঘুমাচ্ছে,মামা মামীর মাথার পাশে বসে আছে চুপচাপ।
বিরক্ত না করে শেহা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বেরিয়ে আসে। তারপর গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে যায় ইরফানের ঘরের দিকে। দরজায় টোকা দেওয়ার সাথে সাথে ওপাশ থেকে ইরফানের গম্ভীর আওয়াজ শুনতে পাওয়া যায়,“গেট লস্ট ফ্রম হিয়ার!”

শেহা কিছু মুহূর্ত চুপটি করে দাঁড়িয়ে থেকে বললো,“আমি শেহু।”

ইরফান জবাব দিলো,“গেট লস্ট শেহু।”

শেহু আনমনে হাসলো দাঁড়িয়ে। তারপর বললো,“খাবে না?”

আর কোনো জবাব দেয়না ইরফান। শেহা আরও কিছুক্ষণ চুপ করে সেখানটায় দাঁড়িয়ে থেকে চলে যায় নিজের ঘরে।

______

একদৃষ্টে বিছানায় ফুলের পাপড়ি দিয়ে লেখা “প্রিতম+ইনায়া” লেখাটাকে দেখছিলো ইনায়া। প্রিতমের ফুপি আর মিস জেনি কিছুক্ষণ আগে তাকে এই ঘরে বসিয়ে দিয়ে গিয়েছে। গোলাপের সুবাসে আলোড়িত হয়ে গিয়েছে চারপাশ।

প্রনমির ঘর থেকে রবীন্দ্র সঙ্গীতের আওয়াজ ভেসে আসছে। মেয়েটির গানের গলা চমৎকার।‌ শুধু শুনতেই ইচ্ছে করে। মেজো দাদানের মতো ভালো গান গায় প্রনমি। মেজো দাদানের কথা মনে পরতেই ইনায়ার মন খারাপ আরও বেড়ে যায়। মনে পরে যায় ছোটোবেলার কথা। মাম্মা পাপার কথা ভেবেই ইনায়া কুল পাচ্ছিল না,এর মাঝে আরো একরাশ গ্লানি এসে ভর করলো তার মাঝে।

খানিক বাদে দরজায় আওয়াজ হলো। ইনায়া মাথা তুলে তাকিয়ে দেখলো প্রিতমকে। মুহুর্তেই নিভে যাওয়া রাগটা মাথাচাড়া দিয়ে উঠলো ইনায়ার। প্রিতম হাসি হাসি মুখেই ঘরে ঢুকছিলো। ইনায়া তার মুখের দিকে তাকিয়ে চেঁচিয়ে বলে উঠলো,“মিথ্যুক! মিথ্যাবাদী! বাটপার কোথাকার।”

প্রিতম দাঁড়িয়ে পরলো। কালো মোটা ফ্রেমের চশমার নিচে দুটি অবাক নীল চোখ। হতভম্ব ভাব কাটিয়ে দুকদম ইনুর দিকে এগিয়ে এসে বললো,“ইনু! সব শুনবো তোমার কথা। আগে আমার কথা শোনো।”

ততক্ষণে ইনায়া এদিক ওদিক তাকিয়ে বালিশ থেকে শুরু করে,বেড সাইডের টেবিলের ওপর রাখা মোবাইলের চার্জার ,প্রিতমের লেন্সবক্স, এসির রিমোট, সবকিছু একটা একটা করে ছুঁড়তে থাকে প্রিতমের দিকে,আর প্রিতম একটা একটা করে সব কিছু ধরে ফেলছে। নিব্বি ইনায়ার এমন বাচ্চামোতে দাঁত বের করে হেসে ফেললো প্রিতম,যা দেখে ইনায়ার গাঁয়ের জ্বলন দ্বিগুণ বেড়ে যায়। দুম করে উঠে দাঁড়িয়ে এদিক ওদিক তাকিয়ে টেবিলের ওপর থেকে প্রিতমের ল্যাপটপ তুলে নিয়ে ছুড়ে মারতে যাবে ঠিক তখনই প্রিতম চেঁ'চি'য়ে ওঠে,“এই ইনু! এটা করো না লক্ষ্মীটি! ওটা আমার রুজি-রুটির মাধ্যম। ভেঙো না ওটা। লাখ লাখ টাকার কোড আছে ওটাতে কোনো ব্যাকআপ ছাড়াই। শান্ত হও। শান্ত হও।”

ইনায়া হাত থেকে ল্যাপটপ টা সরিয়ে রাখলো টেবিলে। প্রিতমের ঠোঁটে হাসি ফুটলো,তবে সে হাসি স্থায়ী হলো না কয়েক পলকও। ইনায়া শাড়ি সামলে ছুটে এলো তার দিকে, তারপর ধাক্কা মেরে প্রিতমকে ঘরের বাইরে বের করে দিয়ে দরজা বন্ধ করে দিলো।

_____

খেয়েদেয়ে যে যার রুমে ঢুকেছে, দোতলার লিভিং রুমে তখন পায়চারি করছিলো এ বাড়ির বড় মেয়ে ইনশিরাহ। লিভিং রুমের বাতি নেভানো,বারান্দা থেকে আসা আলোতে সে কক্ষময় হেঁটে বেরাচ্ছিলো। আজ ইশমাম আর ইনায়ার এসপি অফিসের ঘটনার পর থেকে তার মনে দোলাচল শুরু হয়েছে, যার খবর সে ছাড়া পৃথিবীর কেউ জানে না। কোনও কিছুতেই স্বস্তি পাচ্ছেনা সে। স্থির হয়ে বসতেও পারছে না।
ইনশিরাহ মাম্মা পাপার ঘরের দিকে তাকায়। ওঘরে মাম্মা পাপার আওয়াজ শোনা যাচ্ছে,তারা হয়তো শুয়ে পরেনি এখনও।
ফোঁস শব্দে একটা নিঃশ্বাস ফেলে ইনশিরাহ এগিয়ে গেলো। ঘরের দরজা খোলা, ইনশিরাহ ভেতরে ঢুকে দেখলো সামিন একটা ম্যাগাজিন নিয়ে বসে আছে আর আলো তার পাশে চুপচাপ বসে আছে।

ইনশিরাহকে দেখে দু'জনেই অবাক। ইনশিরাহ কয়েক পল ওদের দেখে ত্রস্ত পায়ে হেঁটে গিয়ে মাম্মার গলা জড়িয়ে ধরে শুয়ে পরলো তার পাশে।

আলো মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললো,“ওমাহ! এতো আহ্লাদ কেন? উদ্দেশ্য কি?”

ইনশিরাহ চুপ করে শুধু মায়ের গাঁয়ের গন্ধ নিচ্ছিলো, সামিন ম্যাগাজিন রেখে উঠে বসলো। মা মেয়ের দিকে তাকিয়ে তৃপ্তির হাসি হাসলো, ইনশিরাহকে বললো,“কি আম্মা? মায়ের সাথে ঘুমাবেন আজ? আমি যাবো অন্য রুমে।”

মাকে শক্ত করে জরিয়ে ধরে রেখেই ইনশিরাহ বললো,“না তুমিও থাকো। আমি একটু পরে চলে যাবো।”

সামিন বললো,“ইনুটার কথা ভেবে খুব খারাপ লাগছে। নিশ্চয়ই অনেক কাঁদছে মেয়েটা।”

আলো বলে,“হু। পরী আর ইশমাম মেনে নিলেই পারে বলুন। একদিন তো ঠিকই মানবে।”

মাম্মা পাপার কথোপকথন শুকনো মুখে শুনছে ইনশিরাহ। তাকে নিশ্চুপ দেখে সামিন বৌয়ের কানে কিছু একটা বললো ফিসফিসিয়ে। আলো কিছু মুহুর্ত চুপ থেকে প্রসঙ্গ পাল্টে বলে,“মা!”

_হু।

সামিন একপাশে, মাঝখানে আলো, একপাশে ইনশিরাহ। আলো মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলতে থাকলো,“একটা কথা বলবো মা?”

_বলো।

_আচ্ছা মুঈনকে তোর কেমন ছেলে মনে হয়?

ইনশিরাহ মাথা তুলে তাকায় মায়ের মুখপানে। হঠাৎ এমন প্রশ্নে সে খানিকটা অবাক। সামিন অত্যন্ত আগ্রহী হয়ে দেখছে মেয়েকে। স্ত্রীর সাথে এতক্ষণ ধরে এই বিষয়টি নিয়েই বিশদ আলোচনা করেছে সে।

ইনশিরাহ নিচুস্বরে বললো,“কেমন মনে হবে?”

_ওকে কেমন লাগে মানুষ হিসেবে?

_ভালোই লাগে। সত্যি বলতে শুরুতে পছন্দ ছিল না, তবে এখন লোকটাকে বেশ ভালো মানুষ মনে হয়। আ জেন্টলম্যান। একথা বলছো কেন মাম্মা?

আলো উঠে বসলো,সামিনও উঠে বসলো। তাদের দেখাদেখি ইনশিরাহও উঠে বসলো। সামিন আলো দুজন দুজনের মুখের দিকে একপলক দেখে, অতঃপর আলো বলে,“এখন একটা কথা বলবো তোকে, তুই রেগে যাসনা প্লিজ মা, একটু বুঝিস আমাদের কেমন?”

ইনশিরাহ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে মায়ের দিকে। আলো একটু থেমে বলে ওঠে,“মুঈনকে না তোর পাপার আর আমার খুব পছন্দ মা, তোর জন্য। মনে মনে আমরা অনেক কিছু ভেবে রেখেছি।”

ইনশিরাহ নিঃশ্বাস বন্ধ করে একদৃষ্টে তার বাবা মায়ের চেহারার সারল্য মেপে নিলো। আলো আর সামিন মেয়ের প্রতিক্রিয়া ধরতে পারলো না, তড়িঘড়ি করে বলে,“আমরা কিছু ঠিক করিনি মা। রিল্যাক্স! আমরা কিছু ঠিক করিনি। এটা শুধু তোর পাপা আর আমার মনে আছে। বাবা মা আমরা, দুশ্চিন্তা হয় এ যুগে মেয়ের বিয়ে নিয়ে, আশেপাশে একটা বিয়েও দুমাসের বেশি টিকছে না। তবে টেনশন নিসনা,তোর অমতে কিছুই হবেনা।”

মাথা নুইয়ে নিলো ইনশিরাহ। সামিন আদুরে গলায় বললো,“রেগে গেলেন আম্মা? আরে বোকা আমরা সত্যিই কিছু ঠিক করিনি। মুঈনও জানে না। তুমি যদি অনুমতি দিতে তবেই আমি এগোতাম। নাহলে কিছুই না।”

নিশ্চুপ হয়ে রয় ইনশিরাহ। আলো মেয়ের কাঁধে হাত রেখে বলে,“তোদের অ্যারেঞ্জ ম্যারেজে অনেক অস্বস্তি জানি, তবে তোর কোনো পছন্দ থাকলে আমরা মেনে নিতাম। ”

ইনশিরাহ নিস্পলক দেখছে মাকে। সামিন মেয়ে বৌয়ের দিকে আরেকটু এগিয়ে বসে বলতে থাকে,“আম্মা, অ্যারেঞ্জ ম্যারেজ নিয়ে ভয় পাওয়ার কিছু নেই আম্মা। তোমার আর মুঈনের সম্মতি পেলে তোমাদের অনেক সময় দেবো আমরা। সত্যি বলছি।”

ইনশিরাহ নিজের নীরবতা বজায় রাখে। সামিন বলে,“আচ্ছা ঘরে যাও। তুমি নিজেকে সময় দাও। ভাবো। কোনো জোরাজুরি নেই আম্মা। যাও।”

ইনশিরাহ বসলো না আর এক মুহূর্তও। উঠে দ্রুতপায়ে হেঁটে বেড়িয়ে যায় ঘর থেকে। আলো সামিনকে বলে,“রেগে গেলো নাকি!”

_আরে না। লজ্জা পেয়েছে। যাইহোক, পরে তুমি চুপিচুপি আবারও মতামত নিও। চাপ দেবে না,ঠিকাছে?

চলমান.....

২য় অংশের লিংক কমেন্টে।#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_৩১ [ ২য় অংশ ]
#ইসরাত_ইতি

[ ২য় অংশ ]
( ১ম অংশের লিংক কমেন্টে )

[ ১৮+ সতর্কতা। এই পর্বের শেষ প্যারার ওপরের প্যারাটিতে রোমান্টিক দৃশ্যের বর্ণনা রয়েছে। চাইলে স্কিপ করবেন ]

দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে প্রিতম। দরজার ওপাশে দরজার কপাটে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ইনায়া। প্রিতম শান্ত গলায় বললো,“ইনু। দরজা খুলে দাও। আর কখনও এমন করবো না।”

_মিথ্যাবাদী, ধুরন্ধর কোথাকার! যাও এখান থেকে।
চেঁ'চি'য়েই জবাব দেয় ইনায়া। এমন ভাবে চেঁচালো, শুনতে পেলো সবাই। ঘুমন্ত শুদ্ধকে রেখে প্রেরণা ঘর থেকে বেরিয়ে এলো।

ভাইকে নিজের ঘরের বাইরে বালিশ, রিমোট,চার্জার আগলে ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সে হতবাক। যা বোঝার বুঝে নিয়ে সে এগিয়ে গেলো। ইনায়া তখনও কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগলো,“পাপা,বড় বাবা, মেজো বাবা,দাদানরা কখনো আমাকে বোকা বানায়নি। আমি ভেবেছি তুমি আমার কাছে একটা খোলা বই, মুখস্থ তুমি। এখন বুঝতে পারছি তুমি নতুন কেউ প্রিতম।”

চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো প্রিতম। প্রেরণা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে দরজায় ধাক্কা দেয়,“ইনু দরজা খোলো।”

প্রেরণার গলার আওয়াজ শুনে ইনু নিজেকে ধাতস্থ করলো, অভদ্রতা করবে না সে, চুপচাপ দরজা খুলে দিল।

প্রেরণা ঘরে ঢুকে দরজা ভিজিয়ে দিয়ে ইনায়ার দিকে ঘুরে তাকালো। মেয়েটার চোখ ফুলে গিয়েছে কেঁদে।

প্রেরণা ইনায়ার হাত টেনে ধরে বিছানায় নিয়ে বসিয়ে ইনায়ার মুখোমুখি বসলো। নরম হয়েই বললো,“কি হয়েছে? এমন করছো কেন?”

_আপনার ভাই শুরুতেই আমার সাথে মিথ্যাচার করলো আপু। বিষয়টা আমি মানতেই পারছি না।
আবারও কেঁদে ওঠে ইনায়া।

প্রেরণা ইনায়ার গালে হাত রাখলো, বললো,“ইনায়া। আমার ভাইকে বা তোমাকে কাউকেই আমি সাপোর্ট করছি না। তোমাদের পরিস্থিতি বিবেচনা করে দেখলেও আমার তোমার পরিবারের মানুষ গুলোর কথা ভেবে বারবার খুব রাগ উঠছে তোমাদের ওপর জানো? আমি সেসব দেখাচ্ছি? না। কারণ আমি ব্যক্তিজীবনেও কি ঘটেছে সেটা নিয়ে বেশি ভাবিনা। ভাবি শুধু সামনে কি করে সবটা পারফেক্ট করা যায়। যা করেছো করেছো,এখন সবটা গুছিয়ে নিতে আমি চাই তোমাদের সাহায্য করতে। দোষ প্রিতম করেছে তোমার কাছে, অবশ্যই ওকে তুমি শাস্তি দেবে। তাই বলে এ রাত টা নষ্ট করলে বোকামি করবে ইনায়া।”

ইনায়া চোখ তুলে প্রেরণার দিকে তাকায়। প্রেরণা বলতে লাগলো,“এই রাতটা বাকিটা জীবন তোমার মন মস্তিষ্কে স্মৃতিতে অম্লান থাকবে, এরপর বহু রাত স্বামী স্ত্রীতে কাটাবে ইনায়া, তবে কখনো এ রাত ফিরে পাবে না বোকা মেয়ে।”

মাথা নিচু করে নেয় ইনায়া। প্রেরণা একটা হাত ইনায়ার কাঁধে রাখলো। বললো,“আন্টি সুস্থ আছে, খবর নিয়েছি। বারবার তোমাকে দেখতে চাইছে। আঙ্কেল টা একটু রেগে আছে। এখন স্বামী-স্ত্রীতে মিলে ভাবো,প্ল্যান করো কি করে তার রাগ ভাঙাবে। কি? মা বাবার দোয়া নিয়ে প্রিতমের সাথে সংসার করতে চাও কি চাওনা?”

উপর নিচে মৃদু মাথা নেড়ে ইনায়া বললো,“চাই।”

_তাহলে দুজন নফল নামাজ আদায় করে নতুন সফর শুরু করো। কেমন?

_কিন্তু আপনার ভাইকে দেখলেই আমার রাগ উঠে যাচ্ছে।

_সেক্ষেত্রে চোখ বন্ধ করে রাখো, তবুও দুটিতে এ রাতটা নষ্ট না করে একসাথে থাকো।

ইনায়া চুপ হয়ে যায়। প্রেরণা সরল মেয়েটিকে দেখে হাসে। অতিমাত্রায় সরল মেয়েটি,খুব সহজেই বুঝানো যায়,নিয়ন্ত্রণে আনা যায়। তার ভাইটা আসলেই আহাম্মক,এমন মেয়েকে অযথা কষ্ট দিলো।

সে উঠে ইনায়াকে আবারও ওযু করিয়ে শাড়িটা ঠিকঠাক করে দিয়ে,ঘরে দু'টো জায়নামাজ বিছিয়ে দিয়ে যায়। বাইরে বেরিয়ে সে প্রিতমকে বলে,“যা গাধা।”

প্রিতম থমথমে মুখে দাঁড়িয়ে ছিলো, বললো,“পশ্চিম রনাঙ্গন নিশ্চুপ?”

হাসলো প্রেরণা,“হুম।”

ঘরে ঢুকে প্রিতম তেরছা নজরে ইনায়াকে দেখলো। আঁচল টেনে ঘোমটা দেওয়াতে মেয়েটিকে পরিনত লাগছে, প্রিতমের চোখ জুড়িয়ে যাচ্ছে, হৃদয়ে প্রশান্তি লাগছে। কোনও কথা না বলে হাত থেকে চার্জার,বালিশ, রিমোট যথাস্থানে রেখে প্রিতম জায়নামাজের দিকে এগিয়ে যায়। ইনায়া চোখ তুলে প্রিতমকে একটিবার না দেখলেও সে প্রিতমের কদম অনুসরণ করে গিয়ে জায়নামাজে দাঁড়ায়।

নতুন বিবাহিত স্বামী স্ত্রীতে মিলে নফল নামাজ আদায় করে উঠে দাঁড়ায়। ইনায়া জায়নামাজ গুছিয়ে বিছানার কাছে চলে যেতে নিলে হঠাৎ তার হাতে টান অনুভব করে, দেখতে পায় প্রিতম তার হাত টেনে ধরে তাকে নিজের সাথে মিশিয়ে নিয়েছে ততক্ষণে। ইনায়া চমকালেও শান্ত থাকলো। থমথমে,অভিমানী মুখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে রাখলো।

গোলগাল ফোলা ফোলা,নরম আদুরে গালে পরম আদরে প্রিতম দীর্ঘসময় ধরে একটা চুমু খেলো। ইনায়ার বুক কাঁপছে অজানা আতঙ্কে, লজ্জায়। অভিমানে তখনও মেলায়নি চোখ।
প্রিতম ইনায়াকে আগলায় শক্ত হাতে। ইনায়া সংকোচ আর চাপা রাগের বশে নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে গেলে প্রিতম আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রাখলো ওকে। লম্বায় ইনায়া তার বুক পর্যন্ত। বুকের সাথে চেপে ধরলো ছটফট করতে থাকা ইনায়াকে।
এখন অবধি কেউ কোনো কথা বলেনি কারো সাথে। শুধু চলছিলো এমন আদুরে ধস্তাধস্তি।
হুট করে প্রিতম তার বৌকে শান্ত করার উদ্দেশ্যে একটা দুঃসাহসী কাজ করে বসলো। পাঁজাকোলা করে কোলে তুলে নিতে গেলো সত্তর কেজির ইনায়াকে।
ভীষণ অবাক ইনায়া। প্রিতম সর্বোচ্চ বিশ সেকেন্ড মেয়েটিকে কোলে তুলে রাখতে পেরেছিলো। বিছানার কাছে এগিয়ে যায় সে, হঠাৎ টাল হারিয়ে ইনায়া সহ ধপ করে পরে গেলো নরম বিছানায়।

বি'কট আওয়াজ হলো খাটে। চ'ম'কে উঠলো দু'জনেই। প্রিতমের মুখ গিয়ে ঠেকেছে ইনায়ার ঘাড়ে। হাঁপাতে হাঁপাতে বললো,“আমার খাটটা বুঝি ভে'ঙেই গেলো ইনু।”

আতঙ্কে প্রিতমের গলা জরিয়ে ধরেছিল ইনায়া, প্রিতমের কথায় হুট করে দু'চোখ বন্ধ রেখেই খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে সে। প্রিতম মুখ তুলে ইনায়াকে দেখে, কত দীর্ঘ সময় পরে প্রানোচ্ছল মেয়েটি হাসলো প্রাণ খোলা হাসি।

ধীরে ধীরে প্রিতম অনুরোধের সুরে বললো,“এই হাসিটা কি ধরে রাখা যায়না আজ রাতে? রাগটা যদি কাল থেকে কনটিনিউ করতে। খুব উপকৃত হতাম ইনু।”

ইনায়া দৃষ্টি মেলে দেখলো প্রিতমকে। প্রিতম আবারও ইনায়ার দু'গালে চুমু খেয়ে তার ঘাড়ে নাক ডুবিয়ে বলে,“কাল সকাল থেকে, বৌ , শশুর, শাশুড়ির মা'র খাওয়ার জন্য পিঠে বস্তা বেঁধে নেবে এই প্রিতম তবুও আজ রাতটা আমাকে ছাড় দাও,আমার করা অন্যায়কে আনদেখা করো, অপরাধটাকে লাই দাও। প্লিজ ইনু।”

ছটফট করছে প্রিতম আহসান। নিজের করা অন্যায়ের ক্ষমা না চেয়ে উলটো আবদার করছে হ্যাংলার মতো। তার বধূ টের পাচ্ছে, সে আড়ষ্টতায় বিছানার সাথে মিশে গেলো। বিছানার চাদর খামচে ধরলো শক্ত করে। কিছুক্ষণ চুপচাপ ওভাবেই দুজন পরে রইলো। অতঃপর ইনায়া অস্ফুটে বললো,“কাল সকাল থেকে তুমি আমার সাথে আর কথা বলবে না।”

প্রিতম বধূর উষ্ণতায় আচ্ছন্ন হয়ে ঘা'ড়ে চু'মু খেয়ে ঘোর লাগা কন্ঠে বলে,“যথা আজ্ঞা।”

ইনায়া কেঁপে উঠে প্রিতমের চুল খামচে ধরে অস্ফুটে আওড়াল,“কাল সকাল থেকে আমাকে ইনু বলে ডাকবে না।”

ঘা'ড় থেকে মুখ তুলে কানের লতিতে চুমু খায় প্রিতম, ঘোরের মধ্যে জবাব দেয়,“যথা আজ্ঞা।”

ইনায়া দু'চোখ বন্ধ করে জরিয়ে ধরলো প্রিতমের গলা, বললো,“কাল সকাল থেকে এভাবে কখনো আবদার করবে না।”

প্রিতম ইনায়ার শাড়ির আঁচলে হাত দিলো সমস্ত সংকোচ সরিয়ে,নম্রহয়ে বললো,“যথা আজ্ঞা।”

ইনায়া জমে গেলো, অনুভূতিকে সামলাতে না পেরে মুখ ঢেকে ফেললো লজ্জায়। মুখ ঢেকে ফেলার আগে বললো,“কাল সকাল থেকে একজন মিথ্যাবাদী প্রেমিককে যেন আমি আমার ত্রিসীমানায় না দেখি, যেন দেখি একজন চমৎকার স্বামীকে। আমার মাম্মা পাপার যোগ্য জামাইকে।”

ভীষণ অধৈর্য হাতে ব্লাউজের সাথে শাড়ির আঁচল আটকে রাখা সেফটিপিনটাকে খুলে ফেললো প্রিতম। খুলতে গিয়ে হাতে সেফটিপিন টা বিধলো, সেসব কিছু পাত্তা না দিয়ে আঁচল টা শরীর থেকে একটানে সরিয়ে দিয়ে প্রিতম বললো,“যথা আজ্ঞা বধূ।”

ইনায়া আরও কোনো নিষেধাজ্ঞা প্রিতমের ওপর আরোপিত করার আগে তার ওষ্ঠরোধ করে দিলো প্রিতম। ভীষণ চ'ম'কেছে ইনায়া,তবে সয়ে নিলো এমন উৎপীড়ন পরমুহূর্তেই।

দু'টো পৃথিবী মিলেমিশে একাকার হলো কিছুক্ষণ। স্বামীর প্রথম ছোঁয়া,স্নেহ,আদরে সিক্ত হলো মির্জা বাড়ির আদরের ছোট মেয়েটি। অভিমান, অভিযোগ, কলোহ কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে ঝিরিঝিরি ছন্দে ভালোবাসা হতে থাকলো তখন। কারো বধূ হওয়ার প্রথম ধাপ পেরোলো ইনায়া মির্জা।

_____

গোটা মুখটাতে লাল ছোপ ছোপ দাগ পরেছে মেয়েটার। কেউ খুব বাজে ভাবে আঘাত করেছে মুখটাতে। গাঁয়ের শাড়ি এলোমেলো। হাতে পায়ে মা'রের দাগ। ইরফান এগিয়ে গেলো মেয়েটির কাছে, মেয়েটির মুখটা দেখতে।

ইনায়া মাথা তুলে তাকাতেই ইরফান প্রচন্ড জোরালো ধাক্কা খেলো। ছুটে গিয়ে বোনের সামনে বসে পরলো, বললো,“কি হয়েছে ইনু? তোকে এভাবে কে মেরেছে?”

ইনায়া হাউমাউ করে কেঁদে উঠে ইরফানকে জরিয়ে ধরে বললো,“প্রিতম মে'রেছে দাদান।”

_প্রিতম?

_হ্যা দাদান। আমি একটুও ভালো নেই দাদান। ও আমাকে বিয়ে করেছে তোমার থেকে শোধ তুলতে। খুব মা'রে আমাকে দাদান। এই যে দেখো,আমার হাত দেখো।

ইনায়া হাত বাড়িয়ে দিলো ইরফানের দিকে। ইরফান দেখতে পায় খুব বিশ্রী ভাবে ঝলছে গিয়েছে হাতটা।
ইনায়া কাঁদতে কাঁদতে বলে,“ওরা আমাকে সবসময় খুব টর্চার করে দাদান। আমি রান্না জানিনা দেখে ওর বড় বোনটা আমার হাত পুড়িয়ে দিয়েছে দেখো। আর ও, ও আমাকে সবসময় বলে তোমাদের থেকে টাকা নিয়ে ওকে দিতে।

ইরফান ফুঁসছে। ভীষণ ফুঁসছে। ইনায়া বলে,“সেদিন ও আমাকে সিগারেট খেয়ে ছেকা লাগিয়ে দিলো দাদান। দেখবে?”

ইনায়া পেটের কাছ থেকে শাড়ির আঁচল সরানোর আগেই ইরফান তড়াক করে লাফিয়ে উঠলো।
ঘনঘন উষ্ণ শ্বাস ফেলছে ইরফান। হৃদপিন্ডটা বিশ্রীভাবে লাফাচ্ছে।
সে যে এতক্ষণ স্বপ্ন দেখছিলো সেটা বুঝতে আরো মিনিট দুয়েক সময় লাগে তার। তবে বুঝতে পারলেও সে শান্ত হতে পারেনি।
অসহ্য ক্রোধে ফেটে পরলো সে, চোখের সামনে ইনায়ার কান্নামাখা মুখটা ভেসে ওঠে শুধু। আরও সে দেখলো ঐ প্রিতম হাসছে পৈশাচিক হাসি।

দু'হাতে চুল খামচে ধরে থাকলো কিছুক্ষণ। তারপর লাফিয়ে নামলো বিছানা থেকে। উদোম শরীরে একটা শার্ট জরিয়ে সে বাইকের চাবি নিয়ে লম্বা কদমে হেটে গেলে সিঁড়ির কাছে। ইনশিরাহ তখন দোতলার লিভিং রুমে নির্ঘুম পায়চারি করছিলো। ইরফানকে ওভাবে বেরিয়ে যেতে দেখে সে ছুট লাগালো চিন্তিত হয়ে।

ধুপধাপ শব্দ করে সিড়ি ভাঙছে ইরফান। ইনশিরাহ পেছন থেকে চাপা স্বরে বলে যাচ্ছে,“কোথায় যাচ্ছিস তুই এতো রাতে?”

ইরফান জবাব না দিয়ে সদর দরজা পেরোলো। ইনশিরাহও গেলো তার পিছু পিছু,হাত ধরে টানলো ইরফানের,শান্ত করার চেষ্টা করে বললো,“থাম বলছি ইরফান।”

কে শোনে কার কথা, বাইক স্টার্ট করাতে ইনশিরাহ পেছনে চেপে বসলো অগত্যা।

ইনশিরাহর অসংখ্য প্রশ্ন চুপচাপ শুনছিলো ইরফান। বাইক কাজীপাড়া রোডে ঢুকতেই ইনশিরাহ ঘাবড়ে গেলো । এদিকে তো প্রিতমের বাসা সে শুনেছে। তবে কি আরও একটা অঘটন ঘটতে চলেছে!

ঠিক রোজ গার্ডেনের সামনে বাইক দাঁড়িয়ে পরলো। রাত তখন আনুমানিক দেড়টা। নিস্তব্ধ গোটা কলোনি, পাতা পরলেও শব্দ পাওয়া যাচ্ছে। ইরফান জানে আটতলায় প্রিতমদের এপার্টমেন্ট‌।

আশেপাশে তাকিয়ে একটা ইটের ছোটো টুকরো তুলে নেয় সে, অনেকটা পিছিয়ে ঠিক আটতলার জানালা লক্ষ্য করে ঢিল টা সজোরে ছুড়ে মেরে চেঁচিয়ে ওঠে ইরফান,“ঐ প্রিতম! আমার বোন দে কুত্তা।”

ঢিলটা গিয়ে পরেছে চারতলার একটা জানালায়। ইনশিরাহ কপাল চাপড়াতে থাকে ভাইয়ের কান্ড দেখে। কেন যে বোকামি করে তখন সবাইকে ডেকে তুললো না! রাগে নিজের চুল ছিঁড়তে ইচ্ছে করছে তার।

ইরফান আরো একটা ঢিল তুলে ছুঁড়ে মারে আট তলা লক্ষ্য করে,কিন্তু ঢিলটা এবার গিয়ে পরলো তিনতলাতে। সে বজ্রকণ্ঠে আবারও চেঁ'চি'য়ে ওঠে,“আমার বোন দে শালা।”

চলমান.......

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে পর্ব 31 শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন