#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_৩২
#ইসরাত_ইতি
🚫কঠোর ভাবে প্রাপ্তমনস্কদের জন্য।
🚫শিক্ষা ও সাহিত্যের সাথে আমার এই কল্পিত ঘটনাগুলোর লিখিত শব্দগুলোর কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
রোজ গার্ডেনের মেইন গেট লক করা। চেঁচামেচির শব্দে সিকিউরিটি গার্ডের ঘুম ভেঙে যায়। লক খুলতে খুলতে সে চেঁচায়,“হচ্ছে টা কি এখানে!”
ইনশিরাহ ছুটে গিয়ে ভাইয়ের হাত ধরে টানতে লাগলো, দাঁতে দাঁত চেপে বললো,“ভাই! লক্ষি ভাই! আমাদের দু'জনকে থানায় পুরবে ওরা। দোহাই তোর। চল।”
কে শোনে কার কথা। শ্যামলা বর্ণের মুখটায় লাল আভা দেখা যাচ্ছে নিয়ন আলোয়। ক্রোধ চক্রবৃদ্ধি হারে বাড়ছে। অতি অল্পবয়সী সিকিউরিটি গার্ড একটু মেজাজ দেখিয়ে ইরফানের দিকে তেড়ে আসছিলো ইরফানকে ধমকাতে। ইরফান এদিক ওদিক তাকিয়ে আরেকটা ইটের টুকরা হাতে তুলে নিতেই সিকিউরিটি গার্ড দৌড়ে পালিয়ে যাওয়ার মতো করে গেটের ভেতর ঢুকে গেট লক করে দেয়।
ইরফান তখন লোহার গেটে একটা লাথি মেরে বলে,“এই গেট খোল! এই সিকিউরিটির বাচ্চা,গেট খোল।”
সিকিউরিটি গার্ড ভীষণ ঘাবড়েছে। একা এভাবে এই লোকের সামনে যাওয়াটা নিরাপদ নয়। সে তাই দৌড়ে চলে যায় ইন্টারকমের কাছে,সোস্যাইটির সবাইকে এলার্ট করতে হবে।
ইরফান তখনও লোহার গেটে পরপর লাত্থি মেরে চেঁ'চি'য়ে যাচ্ছে,“প্রিতম আমার বোন দে!”
নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছিলো প্রেরণা, নিজের জন্য একটি বড় মগের এক মগ কড়া কফি বানিয়ে আয়েশ করে নিজের ঘরের বেলকোনিতে দোলনায় বসলো। নিস্তব্ধ রাতের ঝিমুনির মাঝে অমন হেরে গলার চিল্লাপাল্লা কানে যেতেই বিষম খেলো প্রেরণা। হাতের মগ থেকে ছলকে পরলো কফি।
কাশতে কাশতে তড়াক করে লাফিয়ে উঠে দাঁড়ায়। কফির মগ রেখে দৌড়ে যায় পশ্চিমের বারান্দায়। নিচে উকি মেরে দেখলো গেটের সামনে ইরফান আর ইনশিরাহ দাঁড়িয়ে। ইরফান সমানে চেঁচিয়ে যাচ্ছে,“আমার বোনের গাঁয়ে হাত তুললে তোকে তোর গুষ্টি সহ পুঁতে দিয়ে যাবো আই সোয়্যার শা'লা লুচ্চা!”
প্রেরণার চোয়াল শক্ত হলো। নিমিষেই রাগ উঠে গেলো মাথায়। সোস্যাইটিতে তাদের মানসম্মান সব শেষ করে দিয়ে যাবে এই ষাঁড়টা আজ নির্ঘাত। দৌড়ে গেলো প্রেরণা ফুপির ঘরে। মুবিনা অসুস্থ মুরব্বি, বেঘোরে ঘুমাচ্ছে, প্রেরণা ডাকতে চাইলেও ডাকলো না। ছুটে বেরিয়ে গেলো ফ্ল্যাট থেকে,দশ তলায় গিয়ে রাদিফদের ফ্ল্যাটে নক করতেই দরজা খুলে দেয় রাদিফ। এতো রাতে তার প্রেরণা জানকে দেখে তার যে খুশিতে আত্মহারা হয়ে যাওয়ার অবস্থা প্রায়। গদগদ হয়ে বললো,“আরে প্রেরণা....সরি আপু তুমি!”
ব্যস্ত ভঙ্গিতে প্রেরণা বললো,“একটু আন্টি আঙ্কেলকে ডেকে দাও তো।”
_মম আর ড্যাড বাড়িতে নেই, এসো বসো!
প্রেরণার শরীর জ্বলতে শুরু করে রাদিফের এমন আচরণে। সে ঘুরে এলিভেটরের দিকে যেতে যেতে বলে,“বসতে আসিনি।”
রাদিফ হাসলো পৈশাচিক হাসি। ক্ষীণ স্বরে বিড়বিড়ালো,“তো অন্যকিছু করতাম!”
বলেই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে রাদিফ। ডান হাতের কনুইয়ের ভাজে রীতিমতো চুলকে যাচ্ছে সে,এক সিরিঞ্জ মাল ভরতে হবে শরীরে। কবে যে এই মহিলা তার চোখের ভাষা বুঝতে পারবে! একটু বেশিই ইনোসেন্ট এই মহিলা। রাদিফের কাছে ইনোসেন্ট মেয়েদের আরো বেশি ভালো লাগে।
প্রেরণা আবারও আটতলায় এলো। ইরফান তখনও চেঁ'চি'য়ে যাচ্ছে। মেজাজ তু'ঙ্গে প্রেরণার। সোস্যাইটির পুরুষ গুলো তিনদিনের সরকারি ছুটি পেয়ে গ্রুপে সাজেক গিয়েছে তাই হয়তো কেউ নামছে না এখনো, তবে ঐ সিকিউরিটি গার্ডকে খুব দ্রুত বদলাতে হবে। প্রেরণা ফোন হাতে তুলে নিয়েই একটু থামে। কিছু একটা চিন্তা করে অনেকটা সংকোচ আর দ্বিধা নিয়ে খুঁজে খুঁজে ইহান তাজওয়ারের নাম্বারটা ডায়াল করে, নাম্বারটা সন্ধ্যায় সে নিয়েছিলো প্রিতমের থেকে।
ইহান তখন নিজের ঘরে জেগেই ছিলো। মাঝে মাঝে কিছু রাত তার নির্ঘুম কাটে,অযথাই। আজ সেই রাত সম্ভবত। দুবার রিং হতেই ইহান কলটা রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে অপ্রত্যাশিত নারী রাগী রাগী গলায় বলে,“আমি প্রেরণা বলছি।”
কিছুসময়ের নীরবতা ঘিরে রেখেছে ইহানকে। সে টের পেলো এক নিমিষে কেমন অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে তার ভেতরে। ইহান আরো কিছু মুহূর্ত চুপ থেকে বললো,“জি বলুন।”
ইহানের গলার স্বর যতটাই শান্ত-সভ্য ছিলো প্রেরণার গলার স্বর ততটাই ক্ষিপ্ত, ঝাঁঝ নিয়ে বলে,“আপনার ভাই কোথায়?”
_ঘরে,কেন?
_ঘরে? আমাদের অ্যাপার্টমেন্টের সামনে এসে উশৃঙ্খলতার সীমা পার করে দিয়েছে আপনার ভাই।
_মানে?
ইহান বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াল। প্রেরণা সব বলে দিলো ইহানকে। ইহান শুধু শুনে যাচ্ছিলো। সবটা জানিয়ে প্রেরণা বললো,“আচ্ছা আপনারা এই ষাড়টাকে কেন বেঁধে রাখেন না? কেন ওকে খোলা রাখেন?”
ইহান প্রেরণার বলা হয়ে গেলে গম্ভীর কন্ঠে বলে,“আসছি।”
ফোন কেটে প্রেরণা আটতলার এক,দুই ইউনিটের দুজন মহিলাদের ডেকে তুলে নিচে নামে।
ইরফান পরপর আরও দুবার লাথি মারে গেটে। ইনশিরাহ কিছুক্ষণ ওকে টানাটানি করে ক্লান্ত হয়ে পরলো। তারপর ফোন বের করে দ্রুত আঙ্গুল চালিয়ে বড় দাদানকে কল করলো।
ইহান ফোনটা রিসিভ করতেই ইনশিরাহ ব্যস্ত ভঙ্গিতে বলে,“দাদান শোন,আমি আর ইরফান কাজীপাড়া রোডে....”
_এখন জানিয়ে খুব উপকার করলি। এখন ফোন রাখ ইডিয়ট কোথাকার। আ'ম অন দ্য ওয়ে।
দাঁতে দাঁত চেপে ইহান ধ'ম'কায় বোনকে।
____
স্বামীর উষ্ণ উদোম বুকের সাথে লেপ্টে ছিল ইনু। দীর্ঘসময় ধরে দু'জনে নিশ্চুপ। ইনুর সিল্কি চুলের মাঝে বিচরণ করছে প্রিতমের আদুরে আঙ্গুল। এক হাত দিয়ে আগলে ধরে শুয়ে ছিলো তার ইনুকে। বাধ্য মেয়ের মতো চুপটি করে ছিল ইনায়া। রাতের নিস্তব্ধতা, ক্লান্তি, পরিপূর্ণতায়, প্রাপ্তির আনন্দে, স্বস্তিতে দু'জনের ঝিমুনির মতো এসে যাচ্ছিলো। প্রিতম ইনুর চুলে হাত বুলিয়ে দেওয়ায় খুব আরামবোধ করছিলো ইনায়া,ঘুম এসে যাচ্ছে তার। ইনায়া ঘুমঘুম কন্ঠে বলতে লাগলো,“মাম্মার সাথে একটু কথা বলতে ইচ্ছে করছে প্রিতম।”
মেয়েটিকে আরো মিশিয়ে নিয়ে প্রিতম বললো,“কাল মায়ের কোলেই তুলে দেবো আহ্লাদী ইনুকে।”
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ইনায়া বলে,“খুব বড় অন্যায় করেছি মাম্মার সাথে। দেখবে মানাতে পারবো না। কোনও কাজ হবে না, চেয়েও দেখবে না মাম্মা আমাকে।”
_এ দায় কেবল আমার। আমাকেই বুঝতে দিও!
বলেই একটু থামলো প্রিতম। ঘা'ড়ের কাছে আদর দিলো ওর, অতঃপর বললো,“সেক্ষেত্রে আরেকটা পথ অবলম্বন করতে হবে।”
_কি?
_ওনাদের একটা নাতি নাতনি গিফট করে দেবো জলদি জলদি। এটা মা বাবাকে বিয়ে মানানোর ওল্ড ফ্যাশন উপায়,তবে কাজে দেয়।
ইনায়া কপাল কুঁ'চ'কে সরু চোখে তাকাল প্রিতমের দিকে। প্রিতম হেসে ফেললো। ইনায়া পরপর বলে উঠলো,“কেন করলে এমন পাগলামী প্রিতম? আরেকটু ধৈর্য্য ধরা যেত না?”
_তুমি কেন তবে পাগলের মতো ছুটে এসেছিলে আপুর পা ধরতে? ধৈর্য্য ধরে বসে থাকতে। তারপর যেদিন তোমার হিটলার পাপা আর তার সেনাপতি বিটকেল মেজো দাদান আমাকে খুশি খুশি মেনে নিতো,সেদিন বিয়ে করতাম।
ইনায়া চুপ হয়ে হয়। প্রিতম দু'হাতে ওর গাল দু'টো আগলে ধরে বলে,“এতো যোগ্যতা তো আমার নেই তোমাকে জয় করার। তাই চুরি করলাম। আমি রোডসাইড রাস্কেল কিনা!”
প্রিতম আর কথা না বলে আদুরে বৌকে মনের শখ মিটিয়ে আজ রাতের শেষ একটা লম্বা চুমু উপহার দিতেই যাচ্ছিলো, ঠিক তখন ইরফানের অমন হাক ডাকের ক্ষীণ আওয়াজ শুনে চ'ম'কে উঠলো দু'জনে। একে অপরের দিকে হতবিহ্বল হয়ে চেয়ে আছে দু'জনেই।
ইনায়া অস্ফুটে বলে,“এটা মেজো দাদানের গলা না!”
_আরে ধূর। ভ্রম আমাদের। একটা আতঙ্ক হয়ে গিয়েছে ও আমাদের জীবনে তাই এভাবে ভ্রম হচ্ছে।
_আরে না,এটা মেজো দাদানই।
ইরফান তখন চেঁচাচ্ছে,“এই শালা,সাহস থাকলে গেট খুলে দেখ। আমার বোনকে তো আমি নিয়েই যাবো।”
প্রিতমের মেজাজটা প্রচন্ড খারাপ হয়ে গেলো,বিরক্তিতে মুখ তেঁতো হয় তার। মুখে চ বর্গীয় শব্দ করে বলে,“আপদটা এখানেও চলে এসেছে। ওর কি সময়জ্ঞান বলতেও কিছু নেই!”
এলোমেলো শাড়ি গায়ে জড়িয়ে তড়াক করে লাফিয়ে উঠে বসলো ইনায়া, প্রিতম শক্ত হাতে একটানে আবারও ওকে শুইয়ে দিলো। কঠিন গলায় বললো,“কোথায় যাচ্ছো?”
_দাদান এসেছে তো!
_ওকে আপ্যায়ন করার জন্য আপু আছে। তোমার যেতে হবে না।
ইনায়া নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বললো,“চেচাচ্ছে তখন থেকে।”
ওকে আরো শক্ত করে ধরে রাখলো প্রিতম। বললো,“চড় খাওয়ার শখ হয়েছে ঐ পাগলের হাতে আবারও ? এখানে চুপচাপ শুয়ে থাকো। একদম বেরোবে না।”
প্রনমির ঘুম ভাঙে আচমকা। এমনিতেও পাতা পরার শব্দ হলেই তার ঘুম ভেঙ্গে যায়। উঠে বসে ঘনঘন শ্বাস ফেললো কিছুক্ষণ। মস্তিস্ক সজাগ হতেই টের পেলো সেই কন্ঠস্বর। প্রনমি কন্ঠস্বর কখনও ভোলেনা । ওর এক ইন্দ্রিয় অচল হলেও বাকি ইন্দ্রিয় গুলো বেশ ক্ষমতাধর।
বেলকোনির কাছে এগিয়ে গিয়ে কন্ঠ শুনেই চিনতে পারলো সে। ঐ লোকটা এখানে কি করছে! সবচেয়ে বড় কথা ঐ লোকটা ভাইয়াকে কেনো গালাগাল দিচ্ছে! পরপর দু'টো প্রশ্নের উত্তর জানতে চাইলো সে।
ঘুম ঘুম গলায় মিস জেনিকে ডেকে ওঠে প্রনমি। মিস জেনি এলে প্রনমি চিন্তিত ভঙ্গিতে বলে,“কি হয়েছে মিস জেনি? ঐ লোকটাকে আমি চিনি। উনি কি করছেন এখানে?”
মিস জেনি বললো,“আরে ও নাকি ইনায়ার সে খরুস মেজো ভাইটা। এখানে এসেছে বোনকে নিতে। কান্ড দেখো। এ তো পুরো পাগলা।”
ভাঙা ভাঙা বাংলাতে মিস জেনি বললো।
আটতলার দুই ইউনিটের দুজন ভাবীকে নিয়ে প্রেরণা নিচে নামলো। সোস্যাইটির মানুষগুলো তখন সবাই নেমে এসেছে গ্রাউন্ড ফ্লোরে। এই অ্যাপার্টমেন্টের তিন আর চারতলা একটা সিম কোম্পানির শাখা অফিস,তাই জানালা ভাঙলেও বিষয়টা নিয়ে অত শোরগোল হয়নি।
হাজার হোক,ঐ ছেলেটি এখন আত্মীয় প্রেরণার। আত্মীয়দের সাথে এতো মুখ কালাকালি প্রেরণা করতে চায়না। তাই সবাইকে বুঝিয়ে বললো ব্যাপারটা। সবাই ক্ষেপে গিয়েছিলো। সবাইকে প্রেরণা অনুরোধ করলো ধৈর্য্য ধরতে,সে দেখবে।
সিকিউরিটিকে দিয়ে মেইন গেট খুলে প্রেরণা একাই বেরোলো। ত্রস্ত পায়ে হেঁটে মুখোমুখি হলো ইরফানের। ইনশিরাহ একপাশে লটকানো মুখ নিয়ে দাঁড়িয়ে। ভাইকে ফেলে যেতেও পারছে না আর এখানে থাকলে ভাইয়ের সাথে তারও যে পিন্ডি চটকানো হবে তা নিশ্চিত,তবুও দাঁড়িয়ে ভাইয়ের অপকর্ম দেখছে।
প্রেরণাকে দেখে ইরফান চেঁচানো বন্ধ করে গেটের দিকে যাওয়া ধরলে প্রেরণা এক হাত দিয়ে ওর পথ আগলে দাঁড়ালো। শান্ত গলায় বললো,“কোথায় যাচ্ছো?”
_বোনকে নিতে।
_দাওয়াত দিইনি তো। বৌভাত দুদিন পরে। নাইওরি সেদিন নেবে।
ইরফান প্রেরণার দিকে ক্ষুব্ধ দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো। প্রেরণার মুখ হাসিহাসি। বললো,“বোন আর বোন জামাই ঘুমাচ্ছে। তাদের সাথে দেখা হবে না। চা মিষ্টি খেতে চাইলে বলো, তবে ঘরে নিয়ে যাবো,নচেৎ নয়। ”
শান্তস্বরে বললো প্রেরণা।
_আমি বলেছি না আমি আমার বোনকে নিয়ে যাবো? আপনি আর আপনার ভাই পারলে ঠেকান।
চেঁচিয়ে উঠলো ইরফান।
ঠিক সে মুহূর্তে ইহান তাজওয়ারের গাড়ি এসে থামলো সেখানে। ওরা চেয়ে দেখলো সবাই। গাড়িতে ইহান একাই ছিলো।
____
প্রনমি তখন থেকে ছটফট করছে নিচে নামার জন্য। মিস জেনি বাধ সাধে,“কি দরকার তোমার? প্রেরণা সামলে নেবে তো।”
_তাহলে আপনি কেন যাচ্ছেন?
_সবটা দেখতে, কোনো ঝামেলা হলো কি না।
_ও,আমি অন্ধ বলে কিছু দেখার নেই আমার? লোকটা প্রচন্ড উগ্র। আপু একা গিয়েছে। আমিও যাবো।
_না মামনি তুমি যাবে না।
_আপনারা সবাই আমার সাথে এমন করেন। সবসময়। যেন আমি কিচ্ছু নই। আমি মানুষ নই।
ভীষণ রেগেছে প্রনমি। কন্ঠে তা প্রকাশ পায়। মিস জেনি হার মানলেন। এসে প্রনমির বাহু ধরে বললেন,“এসো তবে।”
ইহান গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়িয়ে শুরুতেই ভাইয়ের দিকে শীতল চোখে তাকায়। ইরফান চোয়াল শক্ত করে দাঁড়িয়েছিল। ইহান তাকে বরফ ঠাণ্ডা গলায় বলে,“গাড়িতে ওঠ!”
একপলক ইনশিরাহর দিকেও দৃষ্টি দিলো ইহান। ইনশিরাহ চুপচাপ গিয়ে গাড়িতে বসলো। তারপর ইহান যা করলো সেটার জন্য প্রেরণা প্রস্তুত ছিলো না। ইহানের এই রুপের সাথে প্রেরণা পরিচিত নয়।
ইরফানকে ধাক্কাতে ধাক্কাতে সোজা গাড়ির কাছে নিলো ইহান। ক্ষুব্ধ ইরফান তখন আরও ক্ষুব্ধ হয়ে উঠলো। বলতে থাকলো,“আমি বোনকে নিয়েই যাবো দাদান ট্রাস্ট মি!”
ইহান যেন ওকথা শুনছিলো না, কপালের শিরা দৃশ্যমান হলো রাগে, চুপচাপ দরজা খুলে এক হাতে ভাইকে ঠেলে বসানোর চেষ্টা করছিল।
ইনশিরাহ গাড়ির ভেতরে বসে জানালা থেকে মাথা বের করে দেখছিল তার দুই ভাইয়ের ধস্তাধস্তি।
প্রেরণা ভীষণ অপ্রস্তুত হয়ে পরেছে। এখন এদের কিভাবে থামাবে সে। ঠিক তখনই মিস জেনি আর প্রনমি গেটের বাইরে এসে দাঁড়ায়। প্রনমি উৎকণ্ঠা নিয়ে চেঁচায়,“আপু।”
প্রেরণা ঘুরে তাকায়। ইনশিরাহও উকি দেয়। বাকি রইলো ইহান ইরফান, দু'জনে থেমে গিয়েছে তখন। একটা স্বল্পপরিচিত চিকন নারীকন্ঠ ইরফানকে বাধ্য করলো ঘুরে তাকাতে।
প্রনমি আবারও বললো,“আপু কি হলো। ভাইয়াকে ডাকবো? পুলিশ ডাকবো?”
_না। কাউকে ডাকতে হবে না। তুই কেন এসেছিস এখানে?
_ঐ উগ্র লোকটা চলে গিয়েছে?
প্রেরণা চুপ হয়ে রয়।
একটা লং কুর্তি,পাজামা পরনে তার,ওড়নাটাকে খুবই শালীন ভাবে আড়াআড়ি কাঁধে ফেলে রেখেছে। মিস জেনি ধরে রেখেছে তাকে। চুলে দু'টো বিনুনি করা। কেমন ঘুম ঘুম ফোলা মুখ, ঠিক যতটা বয়স প্রনমির,তার থেকে বাচ্চা লাগছে। আঠারোর প্রনমিকে পনেরোর কিশোরী লাগছে।
তাকে নির্নিমেষ অবলোকন করছে একজোড়া কালো-বাদামী ঈগল চোখের তীক্ষ্ম দৃষ্টি। পা থেকে মাথা অবধি মেপে নিলো মেয়েটিকে,মিলিয়ে নিলো নিজের সন্দেহ। সময় গড়ায়,চোখ ফেরায় না সে। দাঁড়িয়ে আছে ঠায়,পুরো পৃথিবীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে মনযোগ।
ইহানের দিকে ফিরে প্রেরণা বললো,“আমার ছোটো বোন। প্রনমি আহসান।”
তারপর প্রণমিকে বললো,“এখানে তোর ভাবীর ভাইবোনেরা দাঁড়িয়ে আছে প্রনমি। সালাম দে।”
প্রনমি সালাম দিলে ইহান আর ইনশিরাহ সালামের জবাব দিলো।
অবিচল দাঁড়িয়ে একদৃষ্টে ইরফান দেখছে প্রনমিকে। মুখের হাসি,চোখের নীলাভ মনি, গালের লাল তিল, সারল্যতায় ভরা একটি গোলগাল মুখ, মিহি কন্ঠস্বর। হুবহু মিলে গিয়েছে।
ইহান স্মিত হেসে বললো,“তোমার সাথে দেখা হয়ে ভালো লাগলো প্রনমি।”
জবাবে প্রনমি হাসলো। ইরফান শুধু ফ্যালফ্যাল করে দেখছিলো সেই আগন্তুক মেয়েটিকে, পৃথিবীর সব হুঁশ জ্ঞান হারিয়ে।
ইহান এবার প্রেরণাকে বললো,“আজকের এই বিষয়টির জন্য আন্তরিক ভাবে দুঃখিত। ইনায়া কেমন আছে?”
_সন্ধ্যা থেকে মন ভীষণ খারাপ ছিলো, অনেক বুঝিয়েছি। খুবই মিষ্টি আপনার বোন, অল্পতেই বোঝানো যায়, আপনার ভাইয়ের কথা অনুযায়ী , ব্রেইন ওয়াশ করা যায়।
হেসে ফেললো প্রেরণা। তারপর বললো ,“পরী আন্টির কি অবস্থা?”
_আছে আর কি!
_কাল যাবো আপনাদের ওখানে ওদের দুজনকে নিয়ে। ইনায়াকে বলেছি সবাই পা ধরে ঝুলে থাকবো।
কথাটা বলতে গিয়ে প্রেরণা আবারও হাসলো। ইহান এভাবে হাসতে দেখেনি প্রেরণাকে। প্রেরণা তখন বললো,“আপনারা তিনভাইবোন চা মিষ্টি খেয়ে যান।”
আড়চোখে একবার ইরফানকে দেখে নিয়ে প্রেরণা ইরফানকে শুনিয়ে শুনিয়ে বললো,“কাল বোন জামাইকে নিয়ে যাবো আপনাদের বাড়িতে নাইওরি। এতো রাতে ওদের ঘুম থেকে ডেকে তুলে দেখাতে পারলাম না বলে দুঃখিত।”
ইহান আর ইনশিরাহ আন্তরিক হাসে। তারপর প্রেরণার থেকে বিদায় নিয়ে ইরফানের বাহু ধরে একপ্রকার ধাক্কা দিয়েই গাড়িতে বসিয়ে দেয়। এবার ইরফান কোনো গাইগুই করলো না আর। এতক্ষণের ক্রোধ উবে গিয়ে তার চোখ দু'টোতে হতভম্ব ভাব। ঘা'ড় ঘুরিয়ে আবারও দেখলো প্রনমিকে। ইহান ততক্ষণে গাড়ি স্টার্ট করেছে।
প্রেরণা ওদের দৃষ্টি সীমার বাইরে না যাওয়া পর্যন্ত দাঁড়িয়ে রইল চুপচাপ।
____
প্রেরণা প্রনমিকে নিয়ে যখন ঘরে ঢুকলো তখন রাত সাড়ে তিনটা। সোস্যাইটির লোকদের বুঝিয়ে এসেছে ভালো করে। ঘরে ঢুকে দেখলো প্রিতম ইনায়ার ঘরের বাতি তখনও জ্বলছে। মিষ্টি করে হাসলো প্রেরণা। এ রাতে গল্প ফুরায় না। কতশত গল্প।
আসলেও তাই, ইনায়ার টিয়াপাখির মতো ঠোঁট দুটো নেড়ে ছোটোবেলা থেকে শুরু করে বড়বেলা,সব গল্প বলে যাচ্ছে। প্রিতম একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে শুধু শুনে যাচ্ছে। হঠাৎ প্রিতম ফোন হাতে নিয়ে প্রেরণাকে কল করে জানতে চাইলো,“সব শান্ত হয়েছে আপু?”
প্রেরণা ওপাশ থেকে জবাব দিলো,“হু। ইহান মির্জা এসেছিলেন।”
ফোন কে'টে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে ওরা দুজনেই।
একসময় ইনায়া খিদে পেয়েছে বললে প্রিতম উঠে ইনায়ার পছন্দের লাজানিয়া গরম করে নিয়ে খাইয়ে দিলো। খাওয়া শেষে টিস্যু পেপার দিয়ে মুখ মুছিয়ে দেওয়ার সময় ইনায়া শুধু দেখলো লোকটাকে। প্রিতম বললো,“কি দেখছো?”
_এখন সকাল হয়ে গিয়েছে। আমি কি আমার রাগটা কনটিনিউ করতে পারি?
মেকি রাগ দেখিয়ে বললো ইনায়া।
প্রিতম হেসে বুকে টেনে নিল মেয়েটিকে। হুট করে ইনায়া আবারও কেঁদে ফেললো। প্রিতম হতভম্ব,“আবার কাদছো কেনো?”
_আমি । আমি তোমাকেও ভীষণ ভালোবাসি,আর মাম্মা পাপাকেও। আমার তিনজনকেই চাই। আমাকে এনে দাও মাম্মা পাপাকে।
প্রিতম আগলে নিলো মেয়েটিকে। তীব্র গ্লানি চেপে রেখে ইনুর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বললো,“পাবে।”
____
গতি কিছুটা বাড়িয়ে গাড়ি চালাচ্ছে ইহান। ফ্রন্ট মিররে সে ইরফানের দিকে বেশ কয়েকবার তাকিয়েছে। এতো বড় অপকর্ম করে এখন অস্বাভাবিক শান্ত। হুট করেই এমন ভোল পাল্টেছে তাতে অবাক হয়নি ইহান। ইরফানের অ্যাংগার ইস্যু এমনই,হুট করে মানুষ খু'ন করার রাগ চাপে আবার হুট করেই নিভে যায়।
বাড়ির ভেতরে অপেক্ষারত সামিন,আলো, ইলহাম, ইশমাম,রিতু।
ইরফানকে দেখেই বকাবকি শুরু করে দিয়েছে ইলহাম। লাগাম ছাড়া ধমকাধমকি করছে যা ইরফানের গা সওয়া হয়ে গিয়েছে।
ইরফান যেন ওকথা শুনছেই না। চোয়াল শক্ত করে মেঝের দিকে দৃষ্টি দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
ইহান তখন হাতের ফোন থেকে একটি নাম্বার ডায়াল করে কানে ধরে বলে,“জি আসসালামুয়ালাইকুম। দুঃখিত এতো রাতে ডিস্টার্ব করার জন্য। আমিই মেসেজ করেছিলাম। হ্যা আমার গোটা এক মাসের অ্যাপয়েনমেন্ট স্কেজিওল চাই। পেশেন্টের অবস্থা গুরুতর। ইমার্জেন্সি কেস এটা।”
ওটা একটা মিছিমিছি কল ছিলো। ইহান শুধু ইরফানকে শুনিয়েছে।
সবাই ইহানের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে রয়। সামিন জানতে চায় ইহান কার সাথে কথা বলেছে। জবাবে ইহান বললো,“সাইক্রিয়াটিস্ট ডক্টর ক্যামেলিয়ার কাউন্সিলিং একাডেমীতে।”
ইরফান ভাইয়ের দিকে তাকায়। ইহান হন্তদন্ত হয়ে দোতলায় উঠলে ইরফানও যায় তার পিছু পিছু।
নিচতলায় ইশমাম তার বড় দুই ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে বলে,“তো তোমাদের মেয়ে জামাই সকালে আসছে?”
সামিন ঠান্ডা গলায় বলে,“হ্যা।”
_ঠিকাছে তবে আমি আর আমার বৌ বেরিয়ে যাবো সকাল সকাল।
সামিন ভাইয়ের দিকে শীতল চোখে তাকিয়ে বলে,“পারলে যাবি।”
_দেখতে চাও পারি কি না?
_হ্যা দেখতে চাই ।
দোতলায় লিভিং রুমের কাছে দাঁড়িয়ে ইরফান শান্ত গলায় ভাইকে ডেকে বলে,“আমি পাগল?”
ইহান দাঁড়ালো। বললো,“আজকের পরে কোনো সন্দেহ রইল না।”
_যখন বোনটাকে এবিউজ করে ছুঁড়ে ফেলে দেবে তখনও বলো এই কথা।
ইহান ঘুরে এসে ইরফানের মুখোমুখি দাঁড়াল। রাগী গলায় বললো,“একটু বেশি বলে ফেলছিস না? এনাফ ইজ এনাফ। প্রিতম একটা ভুল করেছে, তুই উস্কেছিস ওকে,কতটা জঘন্য ভাবে মেরেছিস। বারবার আমার পার্টি অফিসে এসে হাতেপায়ে ধরে অনুরোধ করা ছেলেটা হঠাৎ এমন আচরণ করে বসেছে তোর জন্য। ও এমন টাইপ ছেলে নয়।”
_সেটাই তো বলছি। বিয়েটা ও শোধ তুলতে করেছে। আমার মারের শোধ নিতে। ও বোনকে এবিউজ করবে।
_করবে না। একটা এতো বড় বিপদে নিজের লাইফের কথা না ভেবে একটা মেয়েকে,যে শত্রুর বোন,তাকে আগলে রাখা, ঐ অবস্থায় তার থেকে কোনো সুযোগ না নেওয়া,এমন একটা ছেলে একটি মেয়েকে এবিউজ করবে এটা আমি আপাতত বিশ্বাস করছি না। বাকিটা আমার বোনের কপাল। যেটা ও নিজে বেছেছে। আর আমার কাছে দোষী হলো দু'জনেই। প্রিতম একা নয়। এখন এই দোষের কি শাস্তি হয় আমার জানা নেই, তবে ওদের আলাদা আমি করতে চাইবো না।
ইরফান বাঁকা হেসে বললো,“হ্যা! তাইতো! প্রিতম তো খুব লক্ষী ছেলে। কারণ ও প্রেরণা আহসানের ভাই। তাইনা দাদান?”
ইহান একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে ভাইয়ের দিকে। ইরফান দুকদম এগিয়ে এসে ভাইকে বলে,“মাম্মাকে বলবো তার বড় ছেলে একটা আধবুড়ি এক বাচ্চার মায়ের কাছে ইদানিং ভদ্রলোক সাজতে যায়? বলে দেই? বলে দেই মাম্মাকে?”
ইহান একটা লম্বা শ্বাস ফেলে বললো,“তোকে আমি যাস্ট নিতে পারছি না আর!”
কথাটি বলে গটগট করে ইহান চলে যায়। ইরফান কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে একটা পৈশাচিক হাসি হেসে শিষ বাজাতে বাজাতে ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলো।
অতঃপর ধীরপায়ে হেটে বিছানার কাছে গিয়ে টানটান হয়ে শুয়ে পরলো সে। কিছুক্ষণ নীরব থেকে দু'চোখ বন্ধ করতেই প্রনমির মুখটা হঠাৎ ভেসে উঠলো তার চোখে। চোখ মেলে তাকাল সে, দাঁতে দাঁত চেপে প্রনমিকে উদ্দেশ্য করে বলে,“তো তুমি প্রিতমের বোন। বাকি ছয় মার্কও কাটা তোমার।”
চলমান.......