#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_৩৩ [ ১ম অংশ ]
#ইসরাত_ইতি
🚫কঠোর ভাবে প্রাপ্তমনস্কদের জন্য।
🚫শিক্ষা ও সাহিত্যের সাথে আমার এই কল্পিত ঘটনাগুলোর লিখিত শব্দগুলোর কোনো সম্পৃক্ততা নেই।
[ ১ম অংশ ]
সকাল সকাল মির্জা বাড়িতে তোরজোর চলছে মেহমান আপ্যায়নের। ইলহাম মির্জা অতি ব্যস্ত সব দেখভাল করার কাজে। সামিন আর ইলহাম কেউই অফিসে যাননি আজ। আলো আর রিতু ব্যস্ত রান্নাঘরে,বুয়াদের কাজ কর্মের তদারকি করতে। আজ বাড়িতে কাছের কিছু মানুষজন দাওয়াত দিয়েছে সামিন। ইশমাম যে একটা গন্ডগোল পাকাতে পারে তা নিশ্চিত, তাই বাড়িটাকে ছোটো খাটো অনুষ্ঠান বাড়ি বানিয়ে ফেলার পরিকল্পনা তার।
জামিল, রাহাত,তৌফ এছাড়াও আরও অনেক ঘনিষ্ঠ লোক নিমন্ত্রিত দুপুরের ভোজে। তবে সামিনের বিশেষ অতিথি মুঈন ফরাজী। যাকে সামিন কিছুক্ষণ আগে দু'বার ফোন করে নিমন্ত্রণ জানিয়েছেন।
ইনশিরাহ আর শেহা ব্যস্ত সামিনের সাথে দোতলা গুছিয়ে নিতে। যত যাই হোক, নতুন জামাই। সবকিছু চকাচক রাখতে হবে।
কাজ করতে করতে সামিনের সাথে হেসে কুটিকুটি হচ্ছিল ইনশিরাহ আর শেহা। ইনায়া বিয়ের পরে কি কি কাজ করবে সে নিয়ে বিশদ আলোচনা চলছে।
তবে এসব কিছুই রাগিয়ে দিচ্ছিলো পুবের ঘরে বসে থাকা ইশমামকে। তার সমস্ত শরীর জ্বলছিল বিরক্তিতে। বাড়ি থেকে বেড়োবো বেড়োবো করেও সে বেড়োচ্ছিল না। কারণ পরী বেঁকে বসেছে। মায়ের মন, যারপরনাই দুর্বল মেয়েটার জন্য। কদিন আগে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরেছে মেয়েটা। তখন মরতে বসেছিল পরী। এখন এই সামান্য বিয়ে থা নিয়ে মেয়েটাকে ত্যাজ্য করবে পরী? কখনোই যে সে পারবে না।
ইশমাম ধমকেছে পরীকে,পরী মানছে না। একটু দেখবে মেয়েকে। জেদ ধরছে। অগত্যা ইশমাম মুখ লটকিয়ে বসে আছে চুপচাপ ঘরে।
হাসি থামিয়ে ইনশিরাহ বলে,“পাপা চুপিচুপি হাসো। ছোটো বাবা ক্ষেপছে।”
_ক্ষেপুক। আমাকে থ্রেট দেয় বাড়ি থেকে চলে যাবে। এখন যাচ্ছে না কেন? এখন বসে আছে কেন ঘরে ঘাপটি মেরে? এবাড়ির সবাই শুধু কথায় কথায় বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেতে চায়। শুধু আমিই চাইলাম না এ জীবনে।
আক্ষেপের সুরে বলে সামিন।
ইনশিরাহ আর শেহা হাসলো, তারপর ছুটে গিয়ে সামিনকে দুপাশ থেকে জরিয়ে ধরে বললো,“বটগাছটা কিভাবে শিকড় উপড়ে যাবে বলোতো?”
ঘাপটি মেরে যে শুধু ইশমাম মির্জা বসে আছে তা নয়, আরও একজন এখন অবধি নিজের ঘরে ঘাপটি মে'রেই আছে। সে হলো এ বাড়ির নব্য ছোটো জামাতা প্রিতম আহসানের বিটকেল মেজো সম্বন্ধী ইরফান মির্জা। দরজা এখন অবধি বন্ধ। ওপাশে কি হচ্ছে জানে না এ বাড়ির কেউ । এ নিয়ে ঘন্টাখানেক গোলটেবিল বৈঠক বসেছিলো সবার,কারণটা কেউ ধরতে পারছে না। এমন জ্বলামুখী হঠাৎ এমন নিভে গেল কিভাবে?
ইহান সকাল সকাল বেড়িয়েছে তার পার্টির কাজে। ঠিক সময়ে ফিরবে বলেছে। সব কাজ বাড়ির অন্যান্য সদস্যদের দেখার নির্দেশনা দিয়ে গিয়েছে।
সকাল আটটা থেকে ভাইয়ের বৌকে তৈরি করছে প্রেরণা। একটার পর একটা শাড়ি গায়ে রেখে দেখছে,পরিয়েও দেখছে। চোখে মুখে কিশোরী সুলভ উত্তেজনা,যেন পুতুল সাজাচ্ছে সে। কোনটা পরাবে, কিভাবে সাজাবে হিমশিম খাচ্ছে। ব্লাউজ আর পেটিকোট পরে বোকার মতো দাঁড়িয়ে আছে ইনায়া, সে তার ননদের পাগলামি দেখছে। কেমন হঠাৎ করে শিশুর মতো হয়ে গিয়েছে প্রেরণা।
প্রেরণা ইনায়ার চোখে চোখ মেলাতেই হেসে ফেলে,বলে,“আসলে আমি খুবই এক্সাইটেড ইনায়া। প্রনমি প্রিতম আমার কাছে ছেলেমেয়ের মতো। ওদের নতুন জীবনের শুরু নিয়ে আমি সত্যিই ভীষণ এক্সাইটেড। নিজের উত্তেজনাকে দমিয়ে রাখতে পারছি না। তুমি বিরক্ত হচ্ছো নাতো?”
ইনায়া হেসে দু'পাশে মাথা ঝাঁকায়। অবশেষে প্রেরণা একটা কাঁচা হলুদ রঙের ইক্কত শাড়ি পরিয়ে দেয় ইনায়াকে। খুব সুন্দর করে হালকা মেকআপ লাগিয়ে অল্পস্বল্প স্বর্ণের গয়না পরিয়ে দেয়,যা সে নিজের উপার্জন থেকে ভাইয়ের বৌ আর প্রনমির জন্য গড়েছিলো। কারণ প্রেরণার বাবা মায়ের রেখে যাওয়া তাদের তো কোন গহনা সম্পত্তি নেই।
ইনায়াকে সাজিয়ে তিনবার মাশাআল্লাহ বলে ওঠে প্রেরণা। তখনই প্রিতম দরজায় এসে দাঁড়ায়।
প্রেরণা ভাই আর ভাইয়ের বৌকে একা ছেড়ে দিয়ে চলে যায়। তাকেও তৈরি হতে হবে, আজ আপাতত মিষ্টি নিয়ে ইনায়ার বাবা মায়ের আনুষ্ঠানিক দোয়া নিতে যাবে প্রেরণা,শুদ্ধ,প্রিতম আর ইনায়া। বাকিরা যাবেনা। যদি আজ মন কষাকষি দূর হয় দুই পরিবারের তবে তো অনুষ্ঠান হবেই সামনে।
প্রিতম ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে একটা সাদা পাঞ্জাবি নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকলো। আজ শশুর বাড়ীতে সে প্রথম যাবে, পাঞ্জাবি পরে যাবে। শাশুড়ির ঝাড়ুর বাড়ি, শশুরের ঘা'ড় ধাক্কা সে সেজে গুজেই খেতে যাবে।
ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে ইনুকে নিজের কাছে টেনে কিছুক্ষণ দু'গালে আদর দিয়ে বললো,“ভয় হচ্ছে?”
উপর নিচে মাথা ঝাঁকায় ইনু। প্রিতম ওর কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলে,“আমার আরও বেশি হচ্ছে ইনু। এখানে হাত দিয়ে দেখো।”
ইনায়ার হাতটা টেনে নিজের বুকের বা পাশে রাখে প্রিতম। ইনায়া চুপচাপ প্রিতমের হৃদকম্পন অনুভব করছিল। অত কাছাকাছি দু'জনের অনুভূতি গাঢ় হতে থাকলে,কাছে আসা আরেকটু বাড়লে বাইরে থেকে প্রেরণার গলার আওয়াজ শুনতে পাওয়া যায়,“এই প্রিতম,তোর মেজো চাচাশ্বশুর ফোন করেছে। চল বেড়োই এক্ষুনি।”
_____
ইনায়া প্রিতম শান্তিনীড়ে পা রাখলো ঘড়ি ধরা ঠিক এগারোটায়। গেটের কাছ থেকে ওদের এগিয়ে নিতে এসেছে শেহা আর ইনশিরাহ।
শান্তিনীড়ের লিভিং রুমে প্রবেশের দরজায় ইলহাম আর সামিনের সাথে দেখা হলো প্রিতমদের। চাচা শশুরদের সামনে বারবার বিনয়ে নুয়ে যাচ্ছিলো প্রিতম।
শেহা এসবের কারণে চুপিচুপি ইনায়ার কানে বললো,“তোর স্বামী কয় লিটার তেল নিয়ে এসেছে সবাইকে মাখাতে? বারবার বিনয়ে এতো নুয়ে গেলে আবার কুঁজো না হয়ে যায়।”
বলেই হেসে লুটোপুটি খেয়েছে শেহা আর ইনশিরাহ।
আলো আর রিতু দেখলো ইনায়ার বরকে। সত্যি বলতে সব কাদাজল পাশে সরিয়ে রেখে প্রথম দর্শনে জামাইকে পছন্দ হওয়ার কথাই ছিলো। অতিমাত্রায় সুদর্শন,লম্বা একজন যুবক শুভ্র পাঞ্জাবি পরনে। ভদ্র সভ্য দেখতে।
রিতুর পোড়া হাত কতটুকু সেরেছে,আলোর ব্লাড প্রেশার নিয়ন্ত্রণে এসেছে কিনা প্রিতম জানতে চাইলো তাদের কাছে, ইনুর সাথে সম্পর্কের পর থেকে এ বাড়ির প্রত্যেকের কুষ্ঠি মুখস্থ প্রিতমের। ইনু সারাদিন সেসবই বকবক করতো।
ইনু তার বড় মা আর মেজো মাকে জরিয়ে ধরে কেঁদে মাফ চাইলো কিছুক্ষণ। ওদের বসানো হয়েছে নিচতলার লিভিং রুমে। দেওয়া হয়েছিলো জুস খেতে।
তারপর সামিনের পরামর্শে মেহমানদের দোতলার লিভিং রুমে নিয়ে যাওয়া হলো। ইশমাম তখন নিজের ঘর থেকে বের হয়েছিলো, মুখোমুখি হলো প্রিতম ইনায়ার। ইনায়া তাকিয়ে আছে পাপার দিকে। ইশমাম একপলকে দেখে নিলো তার মেয়েকে, গায়ে কাচা হলুদ রঙের শাড়ি,মাথায় ঘোমটা,গলায় হালকা পাতলা সোনার গহনা। ছোটোবেলায় স্কুলের যেমন খুশি তেমন সাজো কম্পিটিশনে ইনুকে এভাবে সাজাতো পরী। ইনু সবসময় বৌ সাজতে চাইতো।
তার আদরের মেয়েকে এই বেশে দেখে ক্ষনিকের জন্য আপ্লুত হলো ইশমাম। পরপর দৃষ্টি ঘুরিয়ে পাশে দাঁড়ানো সাদা পাঞ্জাবি পরিহিত প্রিতমের দিকে যেতেই মেজাজ বিগড়ালো তার। চোয়াল হলো শক্ত।
প্রিতম বিনয়ের সহিত বললো,“আসসালামুআলাইকুম বাবা।”
ইশমাম শুধু সালামের জবাব দিলো। অতঃপর হেঁটে সেখান থেকে চলে গেলো। ইনায়া ছুটে গেলো বাবার পিছুপিছু।
পেছন থেকে বাবাকে শক্ত করে জরিয়ে ধরে কান্নামিশ্রিত কন্ঠে বলে ওঠে,“পাপাহ।”
ইশমাম থমকালো। কিছুক্ষণ চুপ থেকে স্বাভাবিক গলায় বললো,“যাও বিশ্রাম করো।”
তারপর মেয়ের হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে চলে গেল সেখান থেকে।
সবাই মুখ মলিন করে সে দৃশ্য দেখলো। তারপর শেহা আর ইনশিরাহ প্রিতমকে নিয়ে পরীর ঘরে ঢুকলো। বিছানায় চুপচাপ বসেছিল সে পা ঝুলিয়ে। প্রিতম প্রথমে সালাম দিলে পরী মাথা নে'ড়ে জবাব দেয় সালামের। তারপর গিয়ে সরাসরি হাঁটু গেড়ে পরীর পায়ের কাছটাতে বসে পরলো প্রিতম।
পরী কিছুটা চ'মকালো। কয়েকপলক প্রিতমকে দেখে চোখ ফিরিয়ে আবারও দেখে এবং আবারও চোখ ফিরিয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে থাকে সে।
প্রিতম নরম গলায় বলল,“কেমন আছেন মা?”
পরী প্রিতমের দিকে তাকালো,কড়া গলায় বললো,“কেমন থাকি চাও তুমি?”
ইনায়া চুপিচুপি ঢুকলো ঘরে। পরী মেয়েকেও এক পলক দেখে চোখ ফিরিয়ে নিলো,অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নিল। শুধু আড়চোখে প্রিতমকে পর্যবেক্ষণ করছে সে। সুদর্শন একটি ছেলে। মেয়ের পাশে কতটুকু মানিয়েছে পরী না চাইতেও তার অবচেতন মন মেপে নিচ্ছে।
ইনায়া ছুটে এসে প্রিতমের পাশে বসে পরলো, মাথা থেকে খুলে গেল ঘোমটা। মাম্মার হাতটা মুঠি করে ধরে বুকে টেনে মাকে ডাকছে কেঁদে কেঁদে। পরী জবাব দেয়না। মেয়েটাকে সশরীরে দেখতে পেয়েছে,স্বস্তি পেয়েছে। তার ডাকের জবাব দেওয়ার প্রয়োজন বোধ করে না সে।
প্রিতম তখন নম্রস্বরে বলে,“মা,ওর কোন দোষ নেই।”
_ওর কোনো দোষ নেই?
পরী চেঁচিয়ে ওঠে।
প্রিতম একটা লম্বা শ্বাস ফেলে,বলতে থাকে,
_মা,ওর দোষ শুধু ও আমাকে ভালোবেসেছে। এছাড়া কোনো দোষ নেই। ও প্রাণপন চেষ্টা করেছে সবাইকে মানাতে শেষ পর্যন্ত। আমিই ওকে বোকা বানিয়ে বিয়েটা করেছি। একপ্রকার ওর সরলতার সুযোগ নিয়েছি।
_কেন করেছো এমন?
রাগ নিয়ে জানতে চায় পরী।
_ওকে পেতে।
বরফ ঠাণ্ডা গলায় জবাব দেয় প্রিতম।
_পাওয়া হয়ে গিয়েছে? তবে আমার কাছে এখন কেন এসেছো দোয়া নিতে? বৌ তো কালই ঘরে তুলেছো,এখন এসব নাটক কেন?
_কারন আমার মা বাবা নেই। যা করেছি হটকারী হয়ে, ভীষণ লজ্জিত আমি,আমি চাইনা ইনুকে আপনারা দূরে ঠেলে দিন। ও ভিক্টিম মা। ও আপনাদের দুজনকেই খুব ভালোবাসে। ওকে কোনো কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে শাস্তি দেবেন না।
_সেটাই , তোমার মা বাবা নেই সেজন্যই মা বাবার গুরুত্ব ততটা বোঝোনা। বোঝোনি সন্তান এমন করলে মা বাবার কোথায় লাগে।
পরীর কথাটায় প্রিতমের মা বাবার মুখটা তার চোখের সামনে ভেসে উঠলো। প্রিতম ফিচেল হেসে ক্লান্ত গলায় বললো,“হয়তো।”
পরী কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে,“ও অনেক আদরের আমার। নেপালে যা করেছো তার জন্য তোমার প্রতি কৃতজ্ঞ। এনি ওয়ে,শশুর বাড়ি প্রথমদিন এসেছো, বৌ নিয়ে খেয়ে দেয়ে চলে যাও।”
প্রিতম তখনও পা জড়িয়ে বসে আছে পরীর। পরী বলে,“কি হলো! তোমাদের যেতে বলেছি তো!”
প্রিতমও কিছু মুহূর্ত চুপ থেকে নরম গলায় বললো,“আপনি বেড়ে খাওয়াবেন না মা?”
____
পরীর ঘরে প্রিতম-পরী-ইনায়া দীর্ঘসময় ধরে আছে। ওখানে কি হচ্ছে তা নিয়ে চিন্তিত ইনশিরাহ। এদিকে ছোটোবাবা নিচে ব্যাকইয়ার্ডে জামিল চাচ্চুদের কাছে গিয়েছে। ছোটোবাবার এতো ঠান্ডা ভাব-ও হজম হচ্ছিলো না ইনশিরাহর। তারা বসে আছে লিভিং রুমে,সেখানে প্রেরণা আর শুদ্ধ রয়েছে। শেহার সাথে গল্প করছিল প্রেরণা। শুদ্ধ ভদ্র ছেলেটির মতো পাশে চুপচাপ বসে আছে। সামিন আর ইলহাম গিয়ে তখন সেখানে উপস্থিত হয়। প্রেরণা উঠে দাঁড়ায়। সামিন ওকে বসতে বলে টুকটাক আলোচনা শুরু করতে লাগলো প্রিতমের ব্যাপারে। ইহান তখনও বাড়িতে ফেরেনি। আজ বাড়িতে মেহমান থাকবে,অথচ তার আজকেই এতো ব্যস্ততা পরে গেলো।
শুদ্ধকে কোলে নিয়ে বসেছে ইনশিরাহ। শেহা ওর সাথে দুষ্টুমি করছিলো,গাল টানছিল,ওর কথা শুনছিলো। অমন লক্ষিমন্ত আদুরে বাচ্চাকে যে কারো লুফে নিতে ইচ্ছে করবে।
সামিন চিন্তিত ভঙ্গিতে ইলহামকে বলে,“ওরা এখনও বেরোচ্ছে না কেন? পরী উত্তেজিত হয়ে অসুস্থ না হয়ে পরে।”
প্রেরণা সামিনের কথার জবাবে বলে,“আমার ভাই সামলে নেবে। চিন্তা করার কিছু নেই আংকেল।”
শুদ্ধ তখন ইনশিরাহর কোল থেকে নেমে এসে তার মাম্মার কানে ফিসফিসিয়ে বললো,“মাম্মা আমার হিসু পেয়েছে।”
প্রেরণা আশেপাশে তাকিয়ে বিব্রত ভঙ্গিতে শেহাকে বললো,“ওকে একটু ওয়াশরুমে নিয়ে যাবে বোন? ওকে দেখিয়ে দিলেই পারবে ওয়াশরুম টা।”
বলেই প্রেরণা সামিনের কথার জবাব দিতে ব্যস্ত হয়ে পরলো।
শেহা মাথা নেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে শুদ্ধর হাত ধরে এদিক ওদিক তাকিয়ে ইহানের রুমে ঢুকে পরে। ইহানের রুমটাই নিকটে ছিলো। শুদ্ধ ওয়াশরুমে ঢুকে দরজা ভিরিয়ে দেয় বুঝদার মানুষের মতো,শেহাকে গম্ভীর গলায় বলে,“আমি পারবো আন্টি। আপনি ভেতরে ঢুকবেন না।”
শেহা হেসে ফেললো,বললো,“একদম ঢুকবো না বাচ্চা।”
শুদ্ধকে দেখেই শেহা বুঝেছে ওয়েল ট্রেইনড, খুবই গোছালো বাচ্চা। বাইরে দাঁড়িয়ে সে হাসছে। ঠিক তখনই ইনশিরাহ লিভিং রুম থেকে ডেকে ওঠে,“শেহু নিচে মাম্মা ডাকছে। একটু আয় না, ইমার্জেন্সি নাকি।”
শেহা তখন শুদ্ধকে বলে,“আমি যাবো?”
_জি আন্টি।
শুদ্ধও জবাব দেয়।
ইহান তখন সবে ফিরেছে বাড়িতে। দোতলায় উঠেই সে দাঁড়িয়ে পরে প্রেরণাকে সামিন আর ইলহামের সাথে গল্প করতে দেখে। প্রেরণার চোখে চোখ পরতেই প্রেরণা সালাম দিলে সে জবাব দিয়ে নিজের ঘরে চলে যায়। অনেকটা ক্লান্ত সে,গোসলের উদ্দেশ্যে টাওয়াল হাতে নিয়ে ওয়াশরুমের দিকে এগিয়ে গিয়ে ধাক্কা দিয়ে ওয়াশরুমের ভিরিয়ে রাখা দরজা খুলতেই অবাক হয়ে তাকিয়ে রয়।
শুদ্ধ তখন নিজের প্যান্টের জিপার আটকে নিতে ব্যস্ত। অতটুকু বাচ্চা হলেও সে লজ্জা পেয়েছে। ইহান তখনও অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলো। অতঃপর ইহান দরজাটা পুনরায় টেনে দিয়ে দুষ্টুমির সুরে বলে,“আমি কিছু দেখিনি বাচ্চা।”
শুদ্ধ ভেতর থেকে কোন জবাব না দিয়ে বেরিয়ে আসে চুপচাপ। ফ্যালফ্যাল করে ইহানের দিকে কিছু মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে বলে,“আপনি নক করে ঢোকেননি কেন আঙ্কেল। এগুলো ব্যাড ম্যানার্স।”
আদুরে গলায় বললো, গম্ভীর হয়ে। ইহানের বড্ড হাসি পেলো এমন আচরণে। সে বললো,“তাই? জানতাম নাতো!”
শুদ্ধ বলতে লাগলো,“হ্যা। মাম্মা বলেছে এমন করে কোথাও ঢুকে পরতে নেই, আগে নক করে নিতে হয়।”
ইহান কয়েকপল ওকে দেখে বলে,“তোমার মাম্মা শিখিয়েছে?”
_জি।
ইহান তখন একপলক আশেপাশে,দরজার দিকে দেখে শুদ্ধর গাল টেনে দিয়ে বললো,“তা তোমার মাম্মাকে বলবে আমাকেও কিছু ম্যানার্স শিখিয়ে দিতে? আমিও না তোমার মাম্মার কাছে ম্যানার্স শিখতে চাই।”
শুদ্ধ অবাক হয় তাকিয়ে বললো,“আপনার মাম্মা আপনাকে ম্যানার্স শেখায়নি?”
ইহান দু'পাশে মাথা নেড়ে দুঃখী দুঃখী মুখ করে বলে,“শিখিয়েছে। ভুলে গিয়েছি। এখন তোমার মাম্মা শেখালে ভালো হতো।”
শুদ্ধ বললো,“আচ্ছা বলবো।”
_সত্যিই বলবে?
_হ্যা।
ইহান সরল হেসে বললো,
_না থাক, বলতে হবে না।
শুদ্ধকে কোলে নিয়ে ইহান বিছানায় বসলো। অপরিচিত আঙ্কেলদের কোলে বসতে বারণ করেছে মাম্মা তাই শুদ্ধ বলে,“আমি মাম্মার কাছে যাবো।”
_যাবে। আচ্ছা বলো তুমি কোন ক্লাসে পড়ো?
_প্লে-ওয়ান।
বাচ্চারটার চেহারা থেকে চোখ ফেরাচ্ছিল না ইহান। কেমন মায়া মায়া একপ্রকার। সহজে চোখ ফেরানো যায়না।
তখনই দরজার বাইরে এসে দাঁড়ায় প্রেরণা। অপ্রস্তুত হয়ে দরজার ঠিক পাশেই দাঁড়িয়ে বলে,“দুঃখিত। ও বিরক্ত করেনি তো? কোন দুষ্টুমি করেছে কি?”
ইহান হেসে শুদ্ধকে কোল থেকে নামিয়ে উঠে দাঁড়ায়,বলে,“না। আমাকে ম্যানার্স শিখিয়েছে। খুব লক্ষি আপনার ছেলে।”
চলমান....
[ ২য় অংশের লিংক কমেন্টে ]#বধূ_কোন_আলো_লাগলো_চোখে [ দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ ]
#পর্ব_৩৩ [ ২য় অংশ ]
#ইসরাত_ইতি
[ ২য় অংশ ]
( ১ম অংশের লিংক কমেন্টে )
ইনশিরাহ আর শেহাকে দেখে তেঁতে ওঠে আলো। বলে,“তোরা কোথায় ঘাপটি মেরেছিলি? আমি আর রিতু দু'জনে পারি এতো ছুটতে? এতো লোক খাবে,একটু টেবিল সেট কর। ইহান কত রোদ থেকে এলো,ওকে কাজে বলবো এখন?
ইনশিরাহ আর শেহা যথা আজ্ঞা বলে ছুটে যায় টেবিলের কাছে। তাদের বাড়ির ঘনিষ্ঠ মানুষ গুলো ছাড়াও নিমন্ত্রিত প্রতিবেশীরা। এসে জামাইকে দেখে যাবে। এমনিতেই খবরটা ছড়িয়ে গিয়েছে সর্বোত্র। এসব নিয়ে রাখঢাক করা মানে বিষয়টাকে দুর্বলতা ভাবা। সামিন সেটা চায়না। সবাই জামাই দেখুক।
ইশমাম তখনও ব্যাক ইয়ার্ড থেকে ফেরেনি। জামিলদের সাথে আড্ডা দিচ্ছে, এবং সে এসবে অংশ নিতে চাচ্ছেও না। আর ইরফান তো রুম থেকেই বেরোয়নি। রুমের ভেতর থেকে কোনো আওয়াজও শুনতে পাচ্ছিলো না কেউ।
শেহা আর ইনশিরাহ টেবিল সেট করতে ব্যস্ত। আজ বিশাল ভোজন সভা হবে বাড়িতে, পুরুষরা আগে খাবে, তবুও এক টেবিলে পোষাবে না। দাড়োয়ান ভাইকে ডেকে স্টোররুম থেকে আরও একটি টেবিল ঠেলতে ঠেলতে আনিয়ে দু'টো বিশালাকার টেবিলকে জুরে দেওয়া হলো। ওপরে এক্সক্লুসিভ টেবিল ক্লথ। ইনশিরাহ সবচেয়ে ইউনিক ডিনারসেট নামিয়ে সেট করছিলো টেবিল তখন পাশ থেকে শেহা আচমকা বলে ওঠে,“ইরফান মির্জা তো কিছুই খায়নি আপু, তার খাবার টা আমি চুপ করে তাকে বুঝিয়ে মাথা ঠাণ্ডা করে দিয়ে আসবো ঘরে? সে তো আসবে না এখানে আর এলেও ইনুর জামাইকে মা'রবে। তার না আসাই ভালো। তার থেকে আমিই যাই,খাবারটা দিয়ে আসি!”
ইনশিরাহ অবাক হবার মতো করে বলে,“পাগল তুই? তোর কান খসিয়ে ফেলবে চ'ড় মেরে ওর কাছে গেলে এখন। আর ওর খাওয়া নিয়ে এতো ভাবতে হবে না। ওর রুমের ফ্রিজ ভর্তি খাবার। ওর একমাস হয়ে যাবে তাতে। সিংহটা ঘুমিয়ে আছে তুই কেন তার নাকে সুরসুরি দিতে চাচ্ছিস বোন? আজ রাতের কাহিনী শুনিসনি?”
শেহা চুপ হয়ে যায়। মনযোগ দিয়ে সব গুছিয়ে রাখছিল দুবোন। হঠাৎ কলিং বেল বেজে উঠতেই ইনশিরাহ দ্রুতপায়ে হেঁটে সদর দরজার কাছে গিয়ে দরজা খুলে দিতেই এক সমুদ্র অস্বস্তি ঘিরে ধরে তাকে।
মুঈন তার চোখের দিকে তাকিয়ে আছে। ধীরে ধীরে সে বুদ্ধিদীপ্ত দু'টো গভীর চোখের দৃষ্টি ইনশিরাহকে পা থেকে মাথা অবধি দেখে নিলো। একটা নীল সাদা মিশেলে চুড়িদার পরনে ইনশিরাহর। গায়ে ওড়না চাপিয়েছে আজ। বাড়িতে মেহমান আসবে তাই রিতু ধ'ম'কে পরিয়েছে এসব। কানে দুলছে দুল। চুল গুলো খোলা তার। তাকে আর টমবয় লাগছে না। তাকে যা লাগছে তা মুঈনের আধো অচেতন মস্তিস্ক ব্যাখ্যা করতে পারছে না। মুঈন কখনও ইনশিরাহকে অলংকার পরতে দেখেনি, বিস্ময়াভিভূত দুটি চোখ নির্নিমেষ অবলোকন করছিলো নিষিদ্ধ নারীকে। যার উপমা হিসেবে মুঈন চাঁদ বলেছিলো। মুঈন আজ সিভিল ড্রেসে। কাকতালীয় ভাবে তার শার্টের রং নীল। শ্যামলা মানুষদের নীলে খুব একটা মানায়না। তবে ওদের দু'জনকেই মানিয়েছে। সানগ্লাসটা কিছু মুহুর্ত আগে গলায় ঝুলিয়েছে মুঈন। টানটান হয়ে দাঁড়িয়ে সে। শ্যামলা মুখটার মুখভঙ্গি স্বভাবসুলভ গম্ভীর।
ইনশিরাহ অস্বস্তি নিয়ে ধীরে ধীরে দরজার একপাশে সরে যায়। সেদিন রাতের পর থেকে মুঈনের সাথে দুবার দেখা হলো, ইনশিরাহর ভীষণ অস্বস্তি হয় এখন লোকটাকে দেখলে। মুখটা শুকিয়ে একটুখানি হয়ে যায়। সেদিন রাতে মাম্মা পাপা ওকে মুঈনের ব্যাপারে কথা বলার সময় ইনশিরাহ দেখেছে মাম্মা পাপার চোখ দু'টো চকচক করছিলো খুশিতে। মুঈনের প্রতি ভীষণ ভালোবাসা রয়েছে আলো সামিনের, ইনশিরাহ তা মেপে নিয়েছে। সাথে বুঝে নিয়েছে সামনে বিরাট ঝড় আসতে চলেছে। যে ঝড় ইনশিরাহকে কি করবে, কোথায় ভাসিয়ে নিয়ে যাবে ইনশিরাহ জানে না।
মুঈন তেরছা নজরে ইনশিরাহকে দেখে ঘরের ভেতরে চলে যায়। ইনশিরাহও যায় পিছুপিছু।
রান্নাঘরে ব্যস্ত আলো আর রিতু। ইনশিরাহ গিয়ে নিচুস্বরে বললো,“মাম্মা উনি এসেছেন।”
_উনি?
_মুঈন।
আলো উকি মেরে তাকালো,মুঈন সালাম দিতেই মিষ্টি করে হেসে সালামের জবাব দিয়ে বসতে বললো। তারপর ইনশিরাহকে বললো,“ওকে একগ্লাস জুস দিয়ে তোর পাপাকে ডেকে দে। সে এসে সঙ্গ দিক।”
আলো চলে যায় ব্যাক ইয়ার্ডে ইশমামদের কাছে। ইনশিরাহ ঠাঁয় দাঁড়িয়ে । রিতু বলে,“কি রে যা জুস দিয়ে আয়।”
ইনশিরাহ ক্ষীণস্বরে বললো,“তুমি যাও।”
_দেখছিস আমার হাত আটকা।
_তো বুয়াদের বলো।
ভীষণ রেগে যায় রিতু,“মেহমানদের আপ্যায়ন করবে বুয়ারা?”
_শেহাকে বলো।
_ওকে ওপরে পাঠিয়েছি দোতলায় মেহমানদের কাছে।
একটা লম্বা শ্বাস ফেলে ইনশিরাহ এক গ্লাস ঠাণ্ডা জুস নিয়ে এগিয়ে যায় মুঈনের কাছে। মুঈন চোখ তুলে দেখলো ওকে, বেহায়া চোখ দুটো তার শত হুমকি ধামকি অমান্য করে স্থির হয়ে রইলো শ্যামলা বর্ণের পানপাতার মতো মুখটার দিকে। ইনশিরাহ ভীষণ অস্বস্তিতে পরে গিয়েছে আবারও। মুঈনকে গ্লাসটা দিতে গিয়ে সে টের পায়নি,সে যাকে দেখে অস্বস্তি পাচ্ছে,তার থেকে দিগুন অস্বস্তি ঘিরে ফেলেছে ঐ লোকটাকে, মুঈন কোনোমতে ইনশিরাহর হাত থেকে গ্লাসটা নিলো নিঃশ্বাস বন্ধ করে। ইনশিরাহ আস্তে ধীরে বললো,“পাপাকে ডেকে দিচ্ছি।”
সে ঘুরে দাঁড়াতেই মুঈন হুট করে নিজের খেই হারিয়ে বিড়বিড়ালো,“তোমার নামের অর্থ স্বস্তি। তুমি আমাকে এতো অস্বস্তি দাও কেন?”
ইনশিরাহর কদম থামলো। ঘুরে দাঁড়াল মুঈনের দিকে, বললো,“কিছু বললেন!”
মুঈন ভীষণ বিব্রত হলো হলো। নিজেকে সামলে নিয়ে গম্ভীর হয়ে বললো,“গ্লাসটা নিয়ে যাও। খাবো না জুস।”
____
দীর্ঘ দেড় ঘণ্টা পরে পরী তার মেয়ে জামাইকে নিয়ে বেরোলো ঘর থেকে। ইনায়ার চোখে মুখে তখন চাপা আনন্দের ছটা। একহাতে মাকে ধরে আছে একপাশ থেকে।
শেহা আর ইনশিরাহ ছুটে গিয়ে ধরলো ইনায়াকে, চেঁচালো,“কিরে ছোটো মা মানলো?”
ভেজা চোখ মুছে ইনায়া উপর-নিচ মাথা ঝাঁকায়। প্রিতম তার অসুস্থ শাশুরির হাত ধরে নিয়ে আসছে। শাশুড়ির হাতে পায়ে ধরে দীর্ঘ মান অভিমানের পালা শেষ করে সে বড় বোনের দিকে তাকিয়ে দু আঙ্গুলে ভিক্টোরি সাইন দেখিয়ে হাসলো বিশ্বজয়ের হাসি।
প্রেরণা ভাইয়ের কান্ড দেখে হেসে অস্ফুটে বললো,“ছাগল একটা।”
দোতলায় তখন ইলহাম,ইহান,প্রেরণা দাঁড়িয়ে। সামিন গিয়েছে নিচতলায় মুঈনের কাছে। প্রেরণা গিয়ে প্রিতমের শাশুড়িকে সালাম দিয়ে নিজের পরিচয় দিয়ে কোলাকুলি করলো।
ইলহাম সবাইকে তা'ড়া দিলো নিচে খেতে যেতে। প্রেরণা কোলে তুলে নিলো শুদ্ধকে।
সবাই নিচে চলে গেলেও শেহা গেলো না, ধীরপায়ে হেটে সে ইরফানের ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে পরলো। তারপর হেসে বললো,“ও রা'গী মির্জা খুলবে না দরজা?”
ওপাশে নীরবতা। শেহা কান পাতলো কিছু শুনতে,তবে কিছুই শোনা গেলো না। সে আবারও বলে ওঠে,“একবার বাইরে এসে দেখো আমাদের ইনু কতটা খুশি। একটু দেখে যাও। মাথা ঠান্ডা করে এসো।”
নিস্তব্ধতা কাটে না। শেহা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চলে যায় সেখান থেকে।
খাবার টেবিলে উপস্থিত অতিথিদের সাথে এবাড়ির ছোটো জামাইয়ের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন সামিন।
প্রিতম সবার মধ্যমণি। তার একপাশে সামিন বসেছে, আরেকপাশে মুঈন।
ওখানে ইশমাম মির্জাও খেতে বসেছেন। তাকে আলো আর রিতু গিয়ে অনুনয় বিনয় করে তবেই আনতে পেরেছে।
বাড়ির বড় ছেলে হিসেবে এতোবড় ভোজনসভায় ইহান একাই পরিবেশন করে দিচ্ছিল সবাইকে।
প্রেরণা খেতে বসেনি পুরুষদের সাথে। সে শুদ্ধকে খাইয়ে দিচ্ছিলো।
আলো রিতু শুধু দাঁড়িয়ে দেখছিলো কার কি লাগবে। খেতে খেতে প্রিতমের ব্যাপারেই কথা বলছিলেন সবাই।
ইনশিরাহ,শেহা লিভিং রুমের একটা সোফায় পরীকে জরিয়ে ধরে বসে আছে। ওদের চোখের সামনে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য দেখে দুবোন মিটিমিটি হাসছে।
প্রিতমের চেয়ারের পেছনে,কিছুটা দূরে ইনায়া ঘোমটা দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ইহান প্রিতমকে এটা সেটা দিচ্ছে প্লেটে তুলে। আর ইনায়ার মুখে চাপা আনন্দের ছটা। আড়চোখে বারবার পাপাকেও দেখছে ইনায়া। ইশমাম রাগী রাগী মুখে খাচ্ছে।
ইনশিরাহ আর শেহা পরীকে দু'গালে চু'মু খায় ধন্যবাদ সরূপ,এতো জলদি ইনুকে মেনে নেওয়ার জন্য। পরী হেসে ওদের বললো,“শুরুতে আমাকে জানালে কোনো ঝামেলা-ই হতো না। ইশমাম মির্জাকে আমি মানিয়ে নিতাম। তবে এতোটা জলঘোলা হতোই না।”
ইনশিরাহ ঘা'ড় ঘুরিয়ে আবারও ইনায়াকে দেখে পরীকে বললো,“তবে যা-ই বলো ছোটো মা,আমাদের নেকুরানীকে দেখো, বর খাচ্ছে আর সে পেছনে দাঁড়িয়ে আছে আদিখ্যেতা করে। ও তো জামাই পাগলা হবে পুরো।”
পরী হাসলো। হঠাৎ রিতু এলো সেখানে, ইনশিরাহর কথা শুনে ওর পাশে বসে পরে বললো,“ওকে এতো পচানোর প্রয়োজন নেই। তোরাও হবি মনের মতো বর পেলে।”
ইনশিরাহ আর শেহা দু'জনেই লাজুক হাসলো। রিতুর কথাটি শুনে যে যার মনের মানুষের সাথে এমন একটি সুন্দর দৃশ্য কল্পনা করে ফেললো দু'জনেই।
তখন আলোও কল্পনা করছিলো আরও সুন্দর একটি দৃশ্য। সে কল্পনা করে ফেলেছে ঠিক এখন যেভাবে খাচ্ছে প্রিতম আর থানার এসপি পাশাপাশি বসে, এরা একসময় দুই ভায়রা-ভাই হবে। আর ইহান এভাবে তাদের পরিবেশন করে দেবে খাবার।
একটা অভূতপূর্ব পারিবারিক ভোজনসভার দৃশ্য,একটি একান্নবর্তী পরিবারের।
খাওয়া-দাওয়া শেষে এবার মিষ্টি মুখের পালা। ইশমাম লিভিং রুমের এককোণে থমথমে মুখে বসে আছে। সবকিছু তার কাছে অসহ্য লাগছে তবুও সামাজিকতা রক্ষায়, প্রতিবেশীর সামনে থাকতে হচ্ছে।
এপাশটাতে প্রেরণা কথা বলছে সামিন আর ইলহামের সাথে। ছোটোখাটো একটা অনুষ্ঠান হলেও করতে চায়,অনুরোধ জানিয়েছে প্রেরণা। সামিন তখন হেসে বলেছে,“দেখো, আমাদের পরিবারে আরো একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য রয়েছে। সে আমার বোন জামাই। তার ছুটি পেতে পাঁচ ছদিন সময় লাগবে। অনুষ্ঠানটা একটু পিছিয়ে দাও।”
প্রেরণা রাজি হলো। একপাশে লাজুক মুখে বসে আছে প্রিতম আর ইনায়া। শেহা আর ইনশিরাহ তাদের কাছে বসে আছে।
একসময় শেহা টেনে ইনুকে আড়ালে নিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করে,“ভাইয়া খুব রোমান্টিক তাইনা?”
লজ্জা রাঙ্গা মুখে ইনায়া বলে,“হু।”
_হু। চেহারা দেখেই বুঝেছি। আচ্ছা কাল রাতের কথা বল। কিছুমিছু হয়েছে? রোমান্টিক কিছু?
ইনায়ার কান দুটো গরম হলো লাজে, মেকি রাগ দেখিয়ে শেহাকে বললো,“নিজে বিয়ে করে দেখে নে। আমারটা কেনো জানতে চাইছিস?”
শেহাও হেসে বলে,“আমার যার সাথে বিয়ে হবে তার মাথায় দু'টো শিং আছে। রোমান্টিকতা তার থেকে আশাই করিনা আমি। সে শুধু অন্যকে গুতোতে জানে।”
ইনায়া অবাক হয়ে বললো,“কার সাথে বিয়ে হবে তোর?”
শেহা থতমত খেয়ে যায়,বলে,“আরে এমনিই বললাম। চল দুলাভাইয়ের কাছে।”
মুরব্বিদের সাথে কথাবার্তা শেষ করে একটা প্রিচে দু'টো মিষ্টি নিয়ে প্রেরণা ইশমামের পাশে বসলো। ইশমাম অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নিলো। প্রেরণা হেসে বললো,“মাথাটা কি এখনও গরম আঙ্কেল?”
ইশমাম নিশ্চুপ। মেয়েটির এতো আন্তরিক হাসি উপেক্ষা করতে ইচ্ছে করছে না,তবুও মনের আক্রোশ যে কমেনি!
প্রেরণা দূরে বসা প্রিতম ইনায়াকে দেখিয়ে বললো,“ওদিকে তাকান। ওদের দেখুন।”
ইশমাম প্রেরণার হাতের নিশানা অনুসরণ করে প্রিতম-ইনায়াকে দেখে বললো,“দেখলাম।”
_কেমন লাগছে? একটুও কি ওদের হাসি ভালো লাগছে না?
_না, আমি দেখতে পাচ্ছি একটা বোকা বিশবছরের মেয়েকে যাকে একটি চতুর ছেলে বোকা বানিয়ে বিয়ে করেছে। এবং এসব দেখে আমি তোমাদের মতো একটুও মুগ্ধ হতে পারছি না। স্যরি।
_____
বিদায়ের সময়টিতে,এক এক করে আবারও সবার থেকে দোয়া নিলো প্রিতম ইনায়া। মেজো দাদানের ঘরের দরজায় এ নিয়ে পাঁচবার গিয়েছে ইনায়া, কেঁদে ডাকলেও দরজা খোলেনি ইরফান।
ইনায়াকে শেহা সবার সামনে বলে,“তোর বই পত্র সব গাড়িতে তুলে দিতে বলি ইনু । সামনে তোর সেমিস্টার ফাইনাল।”
লিভিং রুমের একপাশে দাঁড়ানো ইশমাম মির্জা তখন বলে ওঠে,“কেন? বই ওর স্বামী কিনে দিতে পারবে না? সামান্য বই?”
ভাইয়ের এমন অপমান সূচক কথাতে ক্ষুব্ধ সামিন ইলহাম। প্রিতম আর প্রেরণা শুধু তাকিয়ে আছে ইশমামের দিকে। ইশমাম তখন প্রিতমের চোখে চোখ রেখে বলে,“বড় বাড়ির মেয়েকে জেদ দেখিয়ে বিয়ে করে নেওয়া সহজ,তবে তার ভার বহন করা কঠিন।”
প্রিতম শুকনো মুখে বোনের দিকে একপলক তাকায়। প্রেরণা চোখের ইশারায় ভাইকে কিছু বলে। প্রিতম তার শশুরের দিকে তাকিয়ে বিনয়ী হয়ে বলে,“আসছি বাবা। দোয়া করবেন। ইনুর পড়াশোনা নিয়ে চিন্তা করতে হবে না।”
অতঃপর গিয়ে ইহানের সামনে দাঁড়িয়ে তার থেকে বিদায় নিয়ে নিজের চাচি শাশুড়িদের সামনে দাঁড়িয়ে প্রিতম বলে,“বড় মা, মেজো মা। আমার মেজো সম্বন্ধীকে আমার সালাম দেবেন। তার সাথে আজ দেখা না হওয়ায় আক্ষেপ থেকে গেলো আমার। আপনাদের মেয়েকে নিয়ে আবার আসবো।”
প্রিতম যখন কথাগুলো বলছিলো, দোতলার রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে চুপচাপ,শান্ত হয়ে তাকে দেখছিলো ইরফান। মিনিট পাঁচেক আগে ঘর থেকে বেড়িয়েছে সে।
চলমান.....